বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. মফিজুর রহমান (ছদ্মনাম) সকালবেলা সবেমাত্র তার প্রিয় দার্জিলিং চায়ে চুমুক দিয়েছেন, এমন সময় তার খাসকামরার দরজা সজোরে খুলে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকলেন একাডেমির প্রধান আভিধানিক (ডিকশনারি সম্পাদক) অধ্যাপক তোফাজ্জল হোসেন। তার এক হাতে একটি দৈনিক পত্রিকা, অন্য হাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি ফাইল এবং বগলের নিচে একটি হেলমেট।
মহাপরিচালক ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘কী ব্যাপার তোফাজ্জল সাহেব? আপনি অফিসে হেলমেট নিয়ে এসেছেন কেন? আর আপনার চেহারা এমন ফ্যাকাশে কেন? কোনো নতুন শব্দের বানান নিয়ে আবার ফেসবুকে ট্রল শুরু হয়েছে নাকি? ‘গরু’ বানানে কি আবার কেউ হ্রস্ব-উ কারের বদলে দীর্ঘ-ঊ কার দিয়ে বসেছে?’
তোফাজ্জল সাহেব ঢোক গিলে বললেন, “স্যার, পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ। ‘গরু’ বানান নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। সমস্যা শুরু হয়েছে ‘গুপ্ত’ নিয়ে। এই একটা শব্দের কারণে দেশে রীতিমতো গৃহযুদ্ধ লেগে যাওয়ার উপক্রম। চট্টগ্রামের এক কলেজে এই শব্দ নিয়ে মারামারি করে ২০ জনের মাথা ফেটেছে, একজনের পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন! আর এখন…”
“আর এখন কী?” মহাপরিচালক চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন।
“আর এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে লাল খামে জরুরি নোটিশ এসেছে। তারা বলেছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাংলা একাডেমিকে ‘গুপ্ত’ শব্দের একটি সর্বজনীন, অরাজনৈতিক, নিরীহ এবং ‘অহিংস’ অর্থ নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। নইলে আমাদের সবার চাকরি নট। শুধু তাই নয়, স্যার, নিচতলায় দুই দলের ছাত্রনেতারা এসে অবস্থান নিয়েছে। একদল বলছে ‘গুপ্ত’ শব্দটাকে অভিধান থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে হবে, আরেক দল বলছে শব্দটা অভিধানে রাখতে হবে, তবে ব্র্যাকেটে লিখে দিতে হবে যে এটা শুধু বিরোধী দলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য!”
মহাপরিচালক ড. মফিজুর রহমান দুই হাতে মাথা চেপে ধরলেন। তার মনে হলো, সাহিত্য চর্চা ও অভিধান প্রণয়নের মতো এমন নিরীহ পেশায় না এসে যদি তিনি বর্ডার গার্ডে যোগ দিতেন, তবে জীবনটা অনেক বেশি নিরাপদ ও শান্তিময় হতো।
‘গুপ্’ ধাতুর ময়নাতদন্ত ও ইমারজেন্সি মিটিং:
বেলা ১১টায় বাংলা একাডেমির সভাকক্ষে জরুরি সভা ডাকা হলো। দেশের বাঘা বাঘা ভাষাবিজ্ঞানী, ব্যাকরণবিদ, এবং কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপককে ঘুম থেকে ডেকে আনা হয়েছে। সভার বিষয়বস্তু: ‘গুপ্ত’ শব্দের রাজনৈতিক পুনর্বাসন।
সভার শুরুতে মহাপরিচালক গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘উপস্থিত সুধীমণ্ডলী, আপনারা নিশ্চয়ই জানেন দেশ আজ এক গভীর ভাষাতাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি। একটি মাত্র শব্দ, যার জন্ম আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে, সেটি আজ আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আমাদের আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই ‘গুপ্ত’ শব্দটিকে আমরা কীভাবে নিষ্ক্রিয় করতে পারি। বোম ডিসপোজাল ইউনিটের মতো আজ আমাদের ওয়ার্ড ডিসপোজাল ইউনিট হিসেবে কাজ করতে হবে।’
প্রবীণ ভাষাবিজ্ঞানী ড. আসজাদুল হক তার মোটা চশমার ফ্রেমটা ঠিক করে বললেন, ‘কিন্তু স্যার, এটা তো ব্যাকরণগতভাবে অসম্ভব। সংস্কৃত ‘গুপ্’ ধাতুর সঙ্গে ‘ক্ত’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘গুপ্ত’ শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ হলো যা গোপন করা হয়েছে বা লুক্কায়িত। আমরা তো আর ব্যাকরণের ধাতু পরিবর্তন করতে পারি না। হাজার হাজার বছর ধরে…।’
তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে এক তরুণ গবেষক টেবিল চাপড়ে বলে উঠলেন, ‘রাখেন আপনার ‘গুপ্’ ধাতু! দেশে যখন মানুষের পায়ের গোড়ালি থাকে না, তখন আপনার ধাতুর কী দরকার? আপনি কি জানেন এই ধাতুর কারণে কতগুলো মায়ের বুক খালি হওয়ার জোগাড় হয়েছে? আমি প্রস্তাব করছি, ‘গুপ্’ ধাতুকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক। এটি একটি প্রতিক্রিয়াশীল ধাতু। এটি বৈষম্যমূলক ধাতু।’
ড. আসজাদুল হক হতবাক হয়ে বললেন, ‘ধাতু আবার প্রতিক্রিয়াশীল হয় কীভাবে।’
তরুণ গবেষক খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘অবশ্যই হয়। যে ধাতু প্রকাশ্যে থাকতে পারে না, যে ধাতু লুকিয়ে থাকে, তাকে কোনোভাবেই প্রগতিশীল বলা যায় না। আমি তো মনে করি কৌটিল্য তার অর্থশাস্ত্রে এই ‘গুপ্তচর’ শব্দটা বানিয়েছিলেনই আজকের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করার জন্য। এটা প্রাচীন ভারতের একটা মাস্টারপ্ল্যান।’
মহাপরিচালক হাত তুলে সবাইকে শান্ত করলেন। ‘দয়া করে ইতিহাস আর ব্যাকরণ নিয়ে ঝগড়া করবেন না। আমাদের প্র্যাকটিক্যাল সমাধানে আসতে হবে। আমরা যদি অভিধান থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দটা বাদ দিয়ে দিই, তাহলে কী কী সমস্যা হতে পারে, তার একটা তালিকা করুন।’
শব্দার্থ বদলের মহোৎসব ও অভিধানের সংকট
তালিকা করতে গিয়ে দেখা গেল, পরিস্থিতি ‘প্যান্ডোরাস বক্স’ খোলার চেয়েও ভয়ংকর। ‘গুপ্ত’ শব্দটা বাদ দিলে বাংলা ভাষার অর্ধেক রোমাঞ্চ আর সাহিত্যিক সৌন্দর্য ধসে পড়বে।
প্রধান আভিধানিক তোফাজ্জল সাহেব একে একে সমস্যাগুলো তুলে ধরতে লাগলেন:
গুপ্তধন: “স্যার, ‘গুপ্ত’ বাদ দিলে ‘গুপ্তধন’-এর কী হবে? আমাদের রূপকথার গল্পগুলোতে তো আর ‘প্রকাশ্যধন’ বলা যাবে না। আলি বাবা ও চল্লিশ চোর কি তাহলে ‘প্রকাশ্য গুহায়’ ‘ওপেন ধন’ খুঁজবে? আর ট্রেজার হান্ট বা গুপ্তধন খোঁজার যে থ্রিলার বইগুলো আছে, সেগুলোর নাম কী হবে? ‘জনসম্মুখে রক্ষিত ধনতন্ত্র’?”
গুপ্তচর:
‘সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘গুপ্তচর’ নিয়ে। জেমস বন্ড থেকে শুরু করে মাসুদ রানা—এঁদের পেশা কী হবে? আমরা কি তাদের ‘তথ্য-উন্নয়ন কর্মী’ বা ‘সরাসরি সম্প্রচারিত এজেন্ট’ বলব? জেমস বন্ড কি এসে বলবে, ‘মাই নেম ইজ বন্ড, জেমস বন্ড, আমি একজন প্রকাশ্য-চর’?”
গুপ্তহত্যা:
‘পত্রিকায় রোজ লেখা হয় ‘গুপ্তহত্যা’। এখন কি লিখতে হবে ‘অজ্ঞাত পরিচয়ে ওপেন-হত্যা’ বা ‘সারপ্রাইজ কিলিং’?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের চরম সংকট (গুপ্তাঙ্গ):
“স্যার, সবচেয়ে সেনসিটিভ বিষয় হলো চিকিৎসাবিজ্ঞান। অ্যানাটমি বইয়ে ‘গুপ্তাঙ্গ’ বলে একটা শব্দ আছে। এখন চিকিৎসকরা তো মহাবিপদে পড়েছেন। এক রোগী নাকি কাল ডাক্তারকে গিয়ে বলেছে, ‘ডাক্তার সাহেব, আমার প্রকাশ্যাঙ্গে ইনফেকশন হয়েছে!’ ডাক্তার তো শুনে বেহুঁশ। এখন আমরা কি অভিধানে লিখব— ‘যে অঙ্গ সাধারণত কাপড়ে ঢাকা থাকে কিন্তু রাজনৈতিক কারণে যাকে আর গুপ্ত বলা যাবে না’?”
গুপ্ত সমিতি:
ইতিহাসের বই থেকে বাংলার বিপ্লবীদের কী হবে? ‘অনুশীলন সমিতি’ বা ‘যুগান্তর’ দল তো ছিল গুপ্ত সমিতি। মাস্টারদা সূর্য সেন কি তাহলে ‘গুপ্ত’ ছিলেন না? ইতিহাস বইয়ের লেখকরা ফোন করে জানতে চাইছেন, তারা কি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ‘প্রকাশ্য বিপ্লব’ লিখে ইতিহাস পাল্টে ফেলবেন কি না।
সব শুনে মহাপরিচালক ড. মফিজুর রহমান ঘামতে শুরু করলেন। তিনি পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন। “বুঝতে পারছি, শব্দটা বাদ দেওয়া যাবে না। তাহলে এর অর্থ পরিবর্তন করে দেওয়া হোক। ‘গুপ্ত’ মানে লিখে দেওয়া হোক— ‘এমন কিছু যা আসলে প্রকাশ্য, কিন্তু দেখার সুবিধার্থে একটু আড়ালে রাখা হয়েছে’।”
দেশজুড়ে ‘গুপ্ত’ আতঙ্ক ও নাম পরিবর্তনের হিড়িক
বাংলা একাডেমিতে যখন রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছে, তখন সারা দেশে ‘গুপ্ত’ শব্দটি নিয়ে শুরু হয়েছে চরম সোশ্যাল হিস্টেরিয়া।
সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন সেসব নিরীহ মানুষ, যাদের নামের শেষে ‘গুপ্ত’ পদবি যুক্ত আছে। সেনগুপ্ত, দাশগুপ্ত, দত্তগুপ্ত—এই পদবির মানুষেরা হঠাৎ করেই নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে চরম আতঙ্কে ভুগছেন।
পরদিন সকালে ঢাকা জজকোর্টের সামনে নোটারি পাবলিকের অফিসে দেখা গেল বিশাল লম্বা লাইন। সবার হাতে এফিডেভিট বা হলফনামার কাগজ।
নোটারি পাবলিকের এক উকিল ক্লান্ত গলায় ডাকলেন, “পরবর্তী জন আসুন। আপনার নাম কী?”
লোকটি কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আজ্ঞে, আমার নাম ভবেশ দাশগুপ্ত।”
উকিল চমকে উঠে বললেন, “আস্তে! আস্তে বলুন! কেউ শুনে ফেললে আপনাকে ধরে পিটুনি দেবে। আপনি কি জানেন না দেশে এখন ‘গুপ্ত’ নিষিদ্ধ? তা, কী করতে চান?”
ভবেশ বাবু বললেন, “স্যার, আমার পদবিটা বদলে দিন। পাড়ার মোড়ে দাঁড়ালে ছেলেপেলেরা আমাকে দেখে বলছে, ‘ঐ দেখ, একটা গুপ্ত যাচ্ছে! নিশ্চয়ই ও ভেতরে ভেতরে অন্য কোনো দলের স্লিপার সেল!’ আমার তো স্যার ভয়ে রাতে ঘুম হচ্ছে না। আমার পদবিটা পরিবর্তন করে ‘দাশ-প্রকাশ্য’ করে দিন। অথবা ‘দাশ-স্বচ্ছ’ করে দিন। ট্রান্সপারেন্সি থাকা দরকার, স্যার।”
পাশের লাইন থেকে আরেক ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “আমার নাম সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত। আমি আজ থেকে ‘সমরেন্দ্র সেন-ওপেন’। ফেসবুকে নাম বদলে দিয়েছি। কেউ আমাকে আর ‘গুপ্ত’ বলে সন্দেহ করতে পারবে না। আমি এখন থেকে পুরোপুরি ওপেন সোর্স!”
শুধু তাই নয়, ইতিহাস বইতেও সেলফ-সেন্সরশিপ শুরু হয়ে গেল। স্কুলের এক প্রধান শিক্ষক তার নিজস্ব উদ্যোগে ইতিহাসের বই থেকে ‘গুপ্ত সাম্রাজ্য’ অধ্যায়ের ওপর কালো কালি লেপে দিয়েছেন। তিনি ছাত্রদের পড়াচ্ছেন, “প্রাচীন ভারতে মৌর্য সাম্রাজ্যের পর একটি সাম্রাজ্য এসেছিল, যার নাম মুখে আনা নিষেধ। তবে তারা খুব ক্ষমতাশালী ছিল। প্রথম চন্দ্র[সেন্সরড] ছিলেন এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।”
হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবারের মেনু থেকেও ‘গুপ্ত’ শব্দটি উধাও হয়ে গেল। পুরান ঢাকার এক বিখ্যাত কাবাবের দোকানের স্পেশাল আইটেম ছিল ‘গুপ্ত কাবাব’ (ভেতরে কিমা লুকানো থাকে বলে এই নাম)। মালিক ভয়ে সেই রাতেই সাইনবোর্ড পাল্টে লিখলেন: “এখানে ১০০% প্রকাশ্য কাবাব পাওয়া যায়। কাবাবের ভেতরে কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক কিমা লুকানো নেই। সব ওপেন।”
ছাত্রনেতাদের আলটিমেটাম ও একাডেমির ঘেরাও:
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই বাংলা একাডেমি চত্বরে স্লোগান শোনা গেল।
“গুপ্ত শব্দের আস্তানা—ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও!”
“যে শব্দ গোড়ালি কাটে—সেই শব্দের গালে গালে, জুতো মারো তালে তালে!”
দুই দলের ছাত্রনেতারা এসে সোজা মহাপরিচালকের রুমে ঢুকে পড়লেন।
প্রথম দলের নেতা টেবিল চাপড়ে বললেন, “স্যার, অভিধানে ‘গুপ্ত’ শব্দের পাশে স্পষ্ট করে লিখে দিতে হবে যে, ‘যারা প্রকাশ্যে এক কথা বলে আর ভেতরে অন্য এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে, তারাই গুপ্ত’ এবং ব্র্যাকেটে আমাদের বিরোধী দলের নাম লিখে দিতে হবে। এটা আমাদের এক দফা দাবি।”
দ্বিতীয় দলের নেতা তেড়ে এসে বললেন, “কক্ষনো না! আমরা প্রকাশ্যে রাজনীতি করি। আমাদের গঠনতন্ত্র ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। আমরা কেন গুপ্ত হতে যাব? অভিধানে লিখতে হবে— ‘গুপ্ত মানে হলো একটি ঐতিহাসিক মিথ্যাচার, যা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য ব্যবহার করা হয়।’ এবং এর সমার্থক শব্দ হিসেবে লিখতে হবে— ‘প্রোপাগান্ডা’ বা ‘গুজব’।”
মহাপরিচালক দুই দলের মাঝখানে বসে কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “বাবারা, তোরা একটু শান্ত হ। অভিধান তো আর পলিটিক্যাল ম্যানিফেস্টো না যে যখন খুশি ব্র্যাকেটে দলের নাম ঢুকিয়ে দেব। হরিনাথ দে, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ—এরা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে তোরা কি তাদেরকেও ঘেরাও করতি?”
প্রথম নেতা বললেন, “শহীদুল্লাহ সাহেব বেঁচে থাকলে তাকেও বলতাম আপডেট হতে। যুগ পাল্টেছে স্যার। এখন শব্দ মানেই অস্ত্র। আপনি যদি আমাদের কথামতো অভিধান না ছাপেন, তাহলে আমরা বাংলা একাডেমির বইমেলায় ‘গুপ্ত’ প্রকাশনীগুলোর স্টল ভাঙচুর করব।”
মহাপরিচালক অবাক হয়ে বললেন, ‘গুপ্ত প্রকাশনী আবার কোনটা?’
নেতা বললেন, “যাদের বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে ভেতরে কী লেখা আছে বোঝা যায় না, তারাই গুপ্ত প্রকাশনী!”
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ভাষাবিজ্ঞানী ড. আসজাদুল হক একটা অভিনব প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, “দেখুন, আমরা একটা আপস-মীমাংসায় আসতে পারি। আমরা অভিধানে ‘গুপ্ত’ শব্দের তিনটি আলাদা অর্থ দেব।
অর্থ ১ (ঐতিহাসিক): যা লুক্কায়িত (যেমন: গুপ্তধন)।
অর্থ ২ (রাজনৈতিক-অভিযোগ): প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহৃত একটি মারাত্মক বিশেষ্য বা বিশেষণ।
অর্থ ৩ (চিকিৎসাবিজ্ঞান): যা প্রকাশ করা যায় না।
আর সবচেয়ে বড় কথা, আমরা শব্দের নিচে সিগারেটের প্যাকেটের মতো একটা সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ জুড়ে দেব।”
ছাত্রনেতারা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। ‘সতর্কীকরণ? সেটা আবার কী?’
ড. আসজাদুল হক খসড়া পড়ে শোনালেন:
“সতর্কীকরণ: ‘গুপ্ত’ শব্দটি একটি দাহ্য ও বিপজ্জনক শব্দ। যত্রতত্র, বিশেষ করে কলেজের দেয়ালে, প্রতিপক্ষের পোস্টে বা চায়ের দোকানে এই শব্দ ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর। এর অতিরিক্ত ব্যবহারে লাঠিসোঁটা, কিরিচ, ইটপাটকেল উড়ে আসতে পারে, ক্লাস বাতিল হতে পারে এবং সর্বোপরি পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলা একাডেমি নিজ দায়িত্বে এই শব্দ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে।”
প্রস্তাব শুনে প্রথম দলের নেতা একটু নরম হলেন। ‘হুম, সতর্কীকরণ থাকলে মন্দ হয় না। মানুষ অন্তত ভয় পাবে।’
দ্বিতীয় দলের নেতা বললেন, ‘ঠিক আছে, তবে সতর্কীকরণের ফন্ট সাইজ বড় হতে হবে। আর লাল কালিতে ছাপতে হবে।”
টকশোতে ‘গুপ্ত’ বিতর্ক:
সেদিন রাতেই দেশের সব কটি টিভি চ্যানেলে প্রাইম টাইম টকশো শুরু হলো। আলোচনার একমাত্র বিষয়: ‘গুপ্ত শব্দের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সমাজতাত্ত্বিক প্রভাব।’
একটি বেসরকারি চ্যানেলের টকশোতে সঞ্চালক অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বললেন, “দর্শক, আজ আমরা আলোচনা করব এমন একটি শব্দ নিয়ে, যা আমাদের জাতীয় জীবনে এক অভূতপূর্ব বিভাজন তৈরি করেছে। আজ আমাদের স্টুডিওতে উপস্থিত আছেন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী, একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং একজন ব্যাকরণবিদ।”
সঞ্চালক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দিকে ফিরে বললেন, ‘আপনার কাছে প্রথমেই জানতে চাই, এই যে হঠাৎ করে আমাদের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটল, এর পেছনে কি কোনো গুপ্ত ষড়যন্ত্র আছে? ইলুমিনাতি বা ফ্রিমেসনদের মতো কেউ কি এখানে কলকাঠি নাড়ছে?”
বিশ্লেষক গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “দেখুন, বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। প্রাচীন বাভারিয়ায় যেমন ইলুমিনাতি ছিল, আমাদের দেশেও এখন পলিটিক্যাল ইলুমিনাতি তৈরি হয়েছে। এরা প্রকাশ্যে নিরীহ, কিন্তু ভেতরে হাইলি একটিভ। আমার তো মনে হয় ‘গুপ্ত’ শব্দটি একটি কোডওয়ার্ড। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের মধ্যে সিগন্যাল আদান-প্রদান করছে। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের দেয়ালের লেখাটি কোনো সাধারণ গ্রাফিতি ছিল না, এটি ছিল একটি সাংকেতিক মেসেজ!”
ব্যাকরণবিদ রেগে গিয়ে বললেন, “আরে ভাই, আপনারা সব কিছুতেই ষড়যন্ত্র খোঁজেন কেন? ‘গুপ্ত’ একটি সাধারণ বিশেষণ। এর কাজ হলো বিশেষ্যের অবস্থা বোঝানো। আপনারা তো এখন ব্যাকরণকেই রিমান্ডে নেওয়ার ব্যবস্থা করছেন!”
সমাজবিজ্ঞানী চশমা মুছে বললেন, “আমি মনে করি, আমাদের সমাজ এখন একটি ‘পোস্ট-গুপ্ত’ (Post-Gupto) যুগে প্রবেশ করেছে। আগে মানুষ লুকিয়ে প্রেম করত, তাকে বলত গুপ্তপ্রেম। এখন সব ফেসবুকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দিয়ে করে। অর্থাৎ সমাজ থেকে গুপ্ততা হারিয়ে যাচ্ছে। এই যে রাজনীতিতে গুপ্ত নিয়ে এত অ্যালার্জি, তার মূল কারণ হলো আমাদের জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্ম সবকিছুতে স্বচ্ছতা চায়। তারা কোনো ‘হিডেন চার্জ’ পছন্দ করে না, তা মোবাইল বিলেই হোক আর রাজনীতিতেই হোক।”
টকশো যখন তুঙ্গে, তখন হঠাৎ নিচে ব্রেকিং নিউজ স্ক্রল যেতে শুরু করল:
“ব্রেকিং নিউজ: বাংলা একাডেমির নতুন সিদ্ধান্ত—আগামীকাল থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দের বদলে সরকারিভাবে ‘অপ্রকাশ্য-অস্থায়ী-অবস্থান’ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হবে।”
উপসংহার: নতুন শব্দের আগমন ও অনন্ত চক্র
অবশেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে, তিন দিন তিন রাত না ঘুমিয়ে বাংলা একাডেমির বিশেষজ্ঞ কমিটি একটি যুগান্তকারী প্রজ্ঞাপন জারি করল।
প্রজ্ঞাপনে বলা হলো:
“যেহেতু ‘গুপ্ত’ শব্দটি জনমনে ব্যাপক বিভ্রান্তি, ভীতি এবং শারীরিক জখমের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই বৃহত্তর জনস্বার্থে এবং জাতীয় শান্তি রক্ষার্থে অভিধান থেকে আপাতত শব্দটির রাজনৈতিক ব্যবহার স্থগিত করা হলো। কেউ কাউকে রাজনৈতিকভাবে ‘গুপ্ত’ বলতে পারবে না। এর বদলে কেউ যদি কাউকে সন্দেহ করে, তবে তাকে ‘পেন্ডিং-প্রকাশ্য’ বা ‘অপেক্ষমাণ-স্বচ্ছতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে হবে।”
বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পর মহাপরিচালক ড. মফিজুর রহমান স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তিনি জানলার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, বাইরের আকাশ পরিষ্কার। কলেজের ক্যাম্পাসগুলোতে আর মারামারি নেই। দাশগুপ্তরা আবার নিজেদের নামের শেষে ‘গুপ্ত’ লিখছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বইগুলোও রক্ষা পেয়েছে।
তিনি আবার তার প্রিয় দার্জিলিং চায়ে চুমুক দিতে যাবেন, ঠিক তখনই তার খাস কামরার দরজা আবার সজোরে খুলে গেল।
সেই তোফাজ্জল সাহেব। হাতে আবার পত্রিকা, বগলে সেই হেলমেট, আর এবার তিনি রীতিমতো কাঁপছেন।
“কী হলো আবার তোফাজ্জল? এবার তো সব সমাধান করে দিলাম। ‘গুপ্ত’ নিয়ে আর কোনো ঝামেলা আছে নাকি?” মহাপরিচালক বিরক্ত হয়ে বললেন।
তোফাজ্জল সাহেব ঢোক গিলে বললেন, “স্যার, ‘গুপ্ত’ নিয়ে আর কোনো ঝামেলা নেই। কিন্তু... কিন্তু...”
“কিন্তু কী? পরিষ্কার করে বলুন!”
“স্যার, আজ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হলের দেয়ালে নতুন একটা গ্রাফিতি দেখা গেছে। সেখানে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচারের দোসরদের প্রকাশ্যে বিচার চাই।’ কিন্তু রাতের আঁধারে কে বা কারা ‘প্রকাশ্যে’ শব্দটা মুছে সেখানে লিখে দিয়ে গেছে ‘উহ্য’। বাক্যটা দাঁড়িয়েছে— ‘স্বৈরাচারের দোসরদের উহ্য বিচার চাই’।”
মহাপরিচালক লাফিয়ে উঠলেন। “উহ্য? মানে সাইলেন্ট? তাতে কী হয়েছে?”
তোফাজ্জল সাহেব প্রায় কেঁদে ফেলে বললেন, “স্যার, একদল বলছে ‘উহ্য’ মানে হলো বিচার না করে মাফ করে দেওয়া। আরেক দল বলছে ‘উহ্য’ মানে হলো গুম করে দেওয়া। এই নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে আজ সকালে ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আবার ফ্যাক্স এসেছে স্যার... এবার আমাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘উহ্য’ শব্দের মীমাংসা করতে হবে। নিচে ছাত্ররা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তারা জানতে চায় ‘উহ্য’ আসলে কোন দলের এজেন্ট!”
ড. মফিজুর রহমান ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। তার মনে হলো, এই দেশে অভিধান লেখা আর মাইনফিল্ডে হাঁটা একই কথা। তিনি ড্রয়ার থেকে একটি সাদা কাগজ বের করে পদত্যাগপত্র লিখতে শুরু করলেন, যার শিরোনাম দিলেন— “একটি উহ্য-গুপ্ত আভিধানিকের প্রকাশ্য প্রস্থান!”




