ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

ঢাকার রাস্তা : আন্দোলনের প্রেমে পড়া যানজট

অনলাইন ডেস্ক
  ২৩ মে ২০২৫, ২১:২০
ঢাকার রাস্তায় যানজট। ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা শহরের রাস্তাগুলো যেন একেকটা নাটকের মঞ্চ। আর এই মঞ্চে প্রতিদিনই কোনো না কোনো নাটক মঞ্চস্থ হয়। নাটকের নাম? আন্দোলন! এই আন্দোলনের নাটকের প্রধান চরিত্র হলো রাস্তা ব্লক আর সঙ্গে অতিথি শিল্পী হিসেবে যানজট। দর্শক? আমরা, ঢাকার সাধারণ মানুষ, যারা এই নাটক দেখতে দেখতে জীবনের কয়েকটা বছর রাস্তায় কাটিয়ে দিচ্ছি।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

আন্দোলনের ঢাকাই রেসিপি
ঢাকায় আন্দোলনের রেসিপিটা বড্ড সহজ। প্রথমে একটা ইস্যু বাছাই করুন। ইস্যু যে কোনো কিছু হতে পারে- বাসের ভাড়া বাড়ানো, বিদ্যুৎ বিলের দাম, কিংবা কারও কথা মনঃকষ্টের কারণ হওয়া। এবার একদল লোক জোগাড় করুন, কয়েকটা ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে দিন, আর সোজা চলে যান শাহবাগ। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিন, ব্যাস! আন্দোলন রেডি। এরপর যানজট নিজে থেকেই হাজির হবে, কারণ ঢাকার রাস্তাগুলো যেন আন্দোলনের জন্যই অপেক্ষা করে থাকে।

ঢাকার যানজট আর আন্দোলনের মধ্যে যেন একটা অলিখিত প্রেমের সম্পর্ক। একটি ছাড়া আরেকটি অসম্পূর্ণ। আন্দোলন শুরু হলেই যানজট এসে হাত ধরে বলে, ‘চিন্তা করিস না, আমি আছি!’ ফলে একটা ছোট্ট মিছিল মোহাচ্ছন্নের মতো পুরো শহরকে থমকে দেয়। অফিসগামী মানুষ, স্কুলের বাস, অ্যাম্বুলেন্স- সবাই যেন এই প্রেমের নাটকের পার্শ্বচরিত্র। কেউ কেউ বাসের মধ্যে বসে ফেসবুকে লাইভ দেন, কেউ আবার ট্রাফিকের মধ্যে সেলফি তুলে ক্যাপশন দেন, ‘ঢাকার জীবন, ভালোবাসার জীবন!’

এই আন্দোলন আর যানজটের মিলনে যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তা হলো সাধারণ মানুষের ধৈর্য। ধরা যাক, আপনি সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছেন। রাস্তায় দেখলেন, একটা মিছিলের কারণে বাস থেমে আছে। ড্রাইভার বললেন, ‘ভাই, আরেকটু অপেক্ষা করেন, এখনই রাস্তা খুলবে।’ কিন্তু সেই ‘এখনই’ যেন ঢাকার সময়ের হিসেবে এক ঘণ্টা পর। এর মধ্যে বাসের ভেতরে একজন চাচা ফোনের স্পিকারে গান বাজাচ্ছেন, আরেকজন ভাই টিকটকের জন্য ভিডিও বানাচ্ছেন। এরইমাঝে আবার একদল আসবে, হাতে তালি দিয়ে ১০ টাকা করে নিয়ে যাবে। আপনি শুধু জানালা দিয়ে তাকিয়ে ভাববেন, ‘এই শহরে বেঁচে থাকাটাই একটা আন্দোলন!’

এখন প্রশ্ন হলো, এই আন্দোলন আর যানজটের প্রেমকাহিনি থেকে ঢাকাকে মুক্তি দেওয়ার উপায় কী? একটা উপায় হতে পারে, আন্দোলনের জন্য আলাদা একটা ‘আন্দোলন পার্ক’ বানানো। সেখানে সবাই গিয়ে স্লোগান দিক, ব্যানার টানাক, কিন্তু রাস্তা যেন ফাঁকা থাকে। আরেকটা উপায় হলো, প্রতিটি মিছিলের সঙ্গে একটা ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট টিম থাকুক, যারা নিশ্চিত করবে যে আন্দোলন হলেও যানজট না হয়। তবে এই স্বপ্নগুলো বাস্তবে আনতে গেলে হয়তো আরেকটা আন্দোলন লাগবে, আর সেটাও ঢাকার রাস্তায়!

ঢাকার রাস্তা আর আন্দোলনের এই প্রেমকাহিনি যেন চিরন্তন। আমরা, ঢাকার বাসিন্দারা, এই নাটকের দর্শক হয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছি। তবে একটা কথা মনে রাখা দরকার- ঢাকা শহর শুধু আন্দোলন আর যানজটের নয়, এটি আমাদের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর বেঁচে থাকার গল্পের শহর। তাই পরের বার যখন রাস্তায় আটকে যাবেন, একটু হেসে নেবেন। কারণ, এই যানজটের মধ্যেও ঢাকা আমাদের শেখায়, ধৈর্য আর হাসির মাঝেই জীবনের মজা!

নিজের চামড়া ফেলে দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও
নিজের চামড়া ফেলা দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও—এ বাক্যটি এখন আর শুধু একটি ব্যঙ্গ নয়, বরং চামড়া খাত নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার নগ্ন প্রতিফলন। একদিকে ঈদুল আজহার মতো উৎসবে লাখ লাখ পশু কোরবানির মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগৃহীত হয়, অন্যদিকে প্রতি বছর আমদানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার প্রক্রিয়াজাত চামড়া বিদেশ থেকে আনতে হয়। এ চিত্র শুধু বাণিজ্য ঘাটতির নয়, এটি রাজনৈতিক ও নীতিগত ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ প্রতি বছর ঈদের সময় কমবেশি এক কোটি কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ (বিশেষত ছাগলের চামড়া) সংরক্ষণের অভাবে পচে যায়। এ চামড়া ফেলে দেওয়া বা মাটিচাপা দেওয়ার কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। মূলত চামড়া সংরক্ষণে ত্রুটি, হিমায়িত পরিবহনের অভাব, অদক্ষ বাজার ব্যবস্থা ও অগ্রিম অর্থায়ন না থাকায় এমন অপচয় হয়। ফলে একদিকে কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে অস্থিরতা ও অনাস্থা জন্ম নেয়। অপচয়ের এ বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ১১ হাজার ৭১৮ টন চামড়া আমদানি করেছে। এজন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। এ আমদানিকৃত চামড়া দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন রপ্তানিযোগ্য পণ্য—জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ইত্যাদি। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ পরিমাণ চামড়া যদি দেশেই উৎপন্ন হতো, তাহলে এত বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যেত না। বাংলাদেশে উৎপাদিত চামড়ার একটি বড় অংশই আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো যেমন নাইকি, অ্যাডিডাস তাদের চামড়া সংগ্রহ করে শুধু এলডব্লিউজি (লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ) সার্টিফায়েড ট্যানারি থেকে। অথচ বিশ্বের প্রায় ১ হাজার ২৮৫টি ট্যানারি এ সার্টিফিকেশন অর্জন করলেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি ট্যানারি এ মান অর্জন করতে পেরেছে। এ ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হচ্ছে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থাপিত সিইটিপি (সেন্ট্রাল এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) সম্পূর্ণরূপে কার্যকর নয়। নির্ধারিত পরিশোধন ক্ষমতা থাকলেও কোরবানির মৌসুমে চাহিদা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বর্জ্য যথাযথভাবে শোধন করা সম্ভব হয় না। ফলে পরিবেশ দূষণের কারণে এলডব্লিউজি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের ট্যানারি পরিদর্শনই বন্ধ করে দিয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশি ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না। তারা বাধ্য হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কমমূল্যে চামড়া বিক্রি করতে। অন্যদিকে বিদেশি ফিনিশড চামড়া আমদানি করে নিজেদের রপ্তানির চেইন বজায় রাখে। ২০০৩ সালে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী গঠনের ঘোষণা দিয়ে হেমায়েতপুরে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো ট্যানারিগুলোকে ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন শিল্প এলাকা গড়ে তোলা। কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি আজও অসম্পূর্ণ। ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে ১৪২টি চালু থাকলেও সিইটিপি এখনো আংশিক কাজ করে, ফলে নির্গত বর্জ্য ঠিকমতো পরিশোধিত হয় না। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডাম্পিং ইয়ার্ডের দুর্বলতার কারণে ধলেশ্বরী নদী ভয়াবহ দূষণের শিকার, যা দেশের চামড়াশিল্পকে পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে পরিণত করেছে। ঈদুল আজহার সময় উৎপাদিত চামড়ার প্রায় ৯০ শতাংশ স্থানীয় হাটে বিক্রি হয়। কিন্তু এ বাজারে নেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী, নেই মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা, নেই অগ্রিম অর্থায়নের নিশ্চয়তা। ৮৫ শতাংশ বিক্রেতা অপ্রশিক্ষিত এবং প্রান্তিক পর্যায়ে চাঁদাবাজি, পরিবহন দুর্নীতি ও হাটব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা চামড়ার দামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্যবসায়ীদের ৬৫ শতাংশের বেশি মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চামড়া কিনে থাকে, যেটি মূলত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ। ফলে সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন হয় না, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চামড়াশিল্পে যুক্ত রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, বিসিক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মতো একাধিক সংস্থা, কিন্তু তাদের মধ্যে নেই কার্যকর সমন্বয়। ২০১৭ সালে সিইটিপি অপূর্ণ থাকা অবস্থায় ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত এক বড় ধরনের অব্যবস্থাপনার জন্ম দেয়। আমদানি ও রপ্তানি নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, শুল্ক সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আমলাতান্ত্রিক হয়রানি উদ্যোক্তাদের জন্য আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা দুরূহ হয়ে পড়ে। চামড়ার মৌসুমে লবণের সংকট, বাড়তি দাম ও হিমায়িত পরিবহনের অভাবে অনেক সময় কাঁচা চামড়া দ্রুত পচে যায়। দেশে এখনো কেন্দ্রীয় কোনো লবণ ডিপো গড়ে ওঠেনি, যা মৌসুমি চাহিদা মেটাতে পারত। ট্যানারিদের ৭৮ শতাংশই মনে করেন, কেন্দ্রীয় লবণ ডিপো স্থাপন এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প রাজনৈতিকভাবে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত, যা সরকারের নির্বিচার সহায়তা, অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও বৈদেশিক নীতির সুবিধা ভোগ করে আজ বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিপরীতে চামড়াশিল্প রাজনৈতিক সদিচ্ছা থেকে বঞ্চিত। এটি একটি ভোট-অপ্রাসঙ্গিক খাত হওয়ায় এর উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকে মুখবন্ধে, বাস্তবায়নে নয়। ফলে কর্মসংস্থানের দিক থেকেও পিছিয়ে। পোশাকশিল্প যেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে কাজ দিয়েছে, সেখানে চামড়াশিল্প এখনো আড়াই লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। চামড়াশিল্পকে দাঁড় করাতে হলে প্রয়োজন নির্দিষ্ট ও কার্যকর উদ্যোগ। সিইটিপি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করে পরিবেশদূষণ বন্ধ করতে হবে। অন্তত ২০টি ট্যানারিকে এলডব্লিউজি সার্টিফায়েড করতে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দিতে হবে। কাঁচা চামড়ার সুষ্ঠু সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় লবণ ডিপো স্থাপন এবং পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা, অগ্রিম অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বাজার ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতে হবে। সর্বোপরি, ২০১৯ সালে গৃহীত ‘চামড়া শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা’ বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি প্রয়োজন। বাংলাদেশের চামড়াশিল্প সম্ভাবনাময় এক খাত, যা নিজস্ব কাঁচামাল, দক্ষ জনবল এবং ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে। এ খাতের সংকট কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যার নয়, এটি মূলত নৈতিক, নীতিগত এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যেদিন এ শিল্পকে শুধু একটি খাত নয়, বরং একটি দায়িত্ব ও সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হবে, সেদিন চামড়াশিল্পও পোশাকশিল্পের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠবে। l আগামীকাল পড়ুন: চামড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ গন্তব্য লেখক: সাংবাদিক
নিজের চামড়া ফেলে দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও
রাজনীতির হটস্পটে রাজরোগ
ইনিয়ে-বিনিয়ে নয়, ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউডে যে যা পারছেন বলছেন। কেউ কাউকে আর ছেড়ে কথা বলছেন না। মন যা চায়, মুখে যা আসে, তা-ই বলে দিচ্ছেন। যেন আজন্মের শত্রু। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ফ্রন্টলাইনার শিক্ষার্থীদের গড়া এনসিপি আগামী ২১ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ না হলে দুর্বার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে নেমে পড়েছে তারা। বিএনপি সরাসরি টার্গেটে তাদের। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে এনসিপি নেতারা বলেছেন, বিএনপি স্থানীয় নির্বাচন ভয় পায়। তাই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। আরেকটি এক-এগারো ঘটাতে মব সৃষ্টি করে মেয়র হতে চাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। বিএনপি নেতাদের কথাবার্তাও সাফ কথার মতো ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউড। ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা না করলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। বর্তমান সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করা উপদেষ্টাদের অব্যাহতির দাবিও জোরালো। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের পদত্যাগও চান। বৃহস্পতিবার বিএনপি-এনসিপি নেতাদের এমন মাতবোলের এক দিন আগে বুধবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্যও ছিল স্বচ্ছ-পরিষ্কার। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন তিনি। বক্তব্যটা দিয়েছেন ঢাকা সেনানিবাসের সেনা প্রাঙ্গণে অফিসার্স অ্যাড্রেসে। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তার অবস্থান আগের মতোই। দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের অধিকার একটি নির্বাচিত সরকারেরই রয়েছে। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে আরও বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। বাদ পড়েনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর-সংক্রান্ত বিষয়ও। বলেন, রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত একটি নির্বাচিত সরকার থেকেই আসতে হবে। তা করতে হবে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। দেখতে হবে জাতীয় স্বার্থ। পলিটিক্যাল কনসেনসাসের মাধ্যমে সেটা হতে হবে। ‘মব ভায়োলেন্স’র বিরুদ্ধেও কঠোর বার্তা দিয়েছেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সেনাবাহিনী এখন আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। সংঘবদ্ধ জনতার নামে বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা আর সহ্য করা হবে না। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে স্থানীয় মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের মতামত প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করে যাওয়ার কথাও বলেন সেনাপ্রধান। এর পরদিনই রাতেই আকস্মিক আরেক ঘটনা। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সেনানিবাসের ৬২৪ জনকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তা জানানো হয় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। বলা হয়, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিগত সরকারের পতনের পর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতির মাঝে সরকারি দপ্তর, থানাগুলোয় হামলা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর আক্রমণ এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, মব জাস্টিস, চুরি, ডাকাতিসহ বিবিধ বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব সেনানিবাসে প্রাণ রক্ষার্থে রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক আশ্রয় চান। উদ্ভূত আকস্মিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আশ্রয় প্রার্থীদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের চেয়ে তখন তাদের জীবন বাঁচানো প্রাধান্য পায়। তাই ২৪ জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ৫ জন বিচারক, ১৯ জন অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা, ৫১৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাসহ বিবিধ ১২ জন ও ৫১ জন পরিবার-পরিজনসহ সর্বমোট ৬২৬ জনকে বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় দেয় সেনাবাহিনী। শুধু মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে আশ্রয় প্রার্থীদের জীবন রক্ষা করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। পরিস্থিতি উন্নয়নের পর আশ্রয় গ্রহণকারীদের বেশিরভাগই এক-দুই দিনের মধ্যেই সেনানিবাস ত্যাগ করেন। পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়িয়ে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে, সবাইকে এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে আইএসপিআর। এদিকে কিছু ঘটনা ও জনাকয়েকের কারণে নানা মহলের চোখরাঙানি হজম করতে হচ্ছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। আক্রমণাত্মক ভাষায় শুনতে হচ্ছে নানা তিতা কথাও। এর মাঝেই তার উপস্থাপিত ও পরিচয় করে দেওয়া মাস্টারমাইন্ডখ্যাত তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ফেসবুক স্ট্যাটাস। দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে আগের বিভাজনমূলক বক্তব্য ও শব্দচয়নের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ব্যক্তির আদর্শ, সম্মান ও আবেগের চেয়ে দেশ বড়। সরকারে আর একদিনও থাকলে অভ্যুত্থানের সব শক্তির প্রতি সম্মান ও সংবেদনশীলতা রেখে কাজ করতে চান। পুরাতন বন্দোবস্তের বিভেদকামী স্লোগান ও তকমাবাজি, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে হত্যাযোগ্য করে তোলে, সেগুলো পরিহার করলেই ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে বলে এই উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের শত্রুরা ‘ঐক্যবদ্ধ ও আগ্রাসী’ উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে। দেশপ্রেমিক জনগণ যারা জুলাই অভ্যুত্থানে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, তাদের সামনে দীর্ঘ পরীক্ষা। এ পরীক্ষা ঐক্যের ও ধৈর্যের। এ পরীক্ষা উতরে যেতেই হবে বলে মনে করেন মাহফুজ আলম। রাজনীতিতে ভুল করার অর্থই হলো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। এজন্যই রাজনীতিবিদরা সমস্যার সম্মুখীন হলে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়ে থাকেন। যুগ যুগ ধরেই এ প্রথা চলে আসছে। কিন্তু ৫ আগস্টের বিপ্লবীরা সেই পথ মাড়াচ্ছেন না। তারপরও মাহফুজ আলম ভুল স্বীকারের একটি নজির দেখিয়েছেন। কীসের মধ্যে কী-এর মতো সেদিনই প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার পদ ছেড়ে এনসিপির শীর্ষনেতা আলোচিত সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। এর আগে খবর রটে প্রফেসর ইউনূস অভ্যুত্থানের নায়কদের কারও কারও কাজে ভীষণ বিরক্ত। তিনি তাদের ডেকে বলেছেন, তোমরা সংযত হও, নইলে আমি পদত্যাগ করব। এ বক্তব্য সামনে এনে আরেকটি ক্যাচাল বাধানোর আয়োজনের নমুনাও রয়েছে। কবে, কখন, কোথায় প্রফেসর ইউনূস ‘অভ্যুত্থানের নায়ক’দের ডেকেছেন এবং এ কথা বলেছেন—তার কোনো তথ্য বা ইঙ্গিত কিন্তু নেই। যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত নির্বাচন, সেখানে টেনে আনা হচ্ছে সাইডলাইনের নানা বিষয়। সেনাপ্রধানের বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে নানা রং মাখিয়ে। সেখানে তিনি একটা নির্বাচিত সরকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা-সার্বভৌমত্বের জন্য চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন আর গত ৯ মাস সেনাবাহিনীকে অবজ্ঞা করার অভিযোগ এনেছেন। মব সন্ত্রাস বন্ধ করার কথা বলার পরদিন যদিও দেশের তিনটি আদালতে সেই ঘটনা আবার ঘটেছে। গত জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভূমিকা রাখার জন্য যে সেনাবাহিনীকে অভিনন্দিত করেছে, সেই বাহিনী কেন আজ অবজ্ঞার অভিযোগ তুলছে? সরকার থেকে সেনাবাহিনীকে দূরে সরিয়ে দেওয়া—একজন বিদেশি নাগরিককে এনে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বানানোর পেছনে কাদের ইন্ধন রয়েছে, তা অবশ্যই খোঁজা দরকার। সেনাবাহিনীর প্রধানের বক্তব্যের পর থেকে দেশে আবার ঐক্যের ডাকাডাকি চলছে। সমন্বয়করা ডাকছেন, জামায়াত ডাকছে-এনসিপি ডাকছে। গত ৯ মাসে কারা ঐক্য বরবাদ করেছে, কারা আন্দোলনের শক্তিকে কোণঠাসা করেছে, নানা ট্যাগ দিয়ে কলহ তৈরি করেছে। এমনকি ১৫ বছর বহু নির্যাতন ভোগ করা এবং সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখা বিএনপিকে টেম্পোস্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে? এসবের বিশ্লেষণও আছে। ঘাঁটাঘাঁটি করলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। মূত্রত্যাগের কথা তো উচ্চারণই হয়ে গেছে। বিএনপির প্রতি এনসিপিসহ কারও কারও অবজ্ঞা, দলটির ১৫ বছরের ত্যাগকে অস্বীকার করার প্রবণতায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই দলের নেতা শামসুজ্জামান দুদু বলে ফেলেছেন কথাটি। এ নিয়ে সমানে ট্রল চলছে। কত স্পিডে কত পরিমাণ মূত্রত্যাগ করলে সেই স্রোতে কেউ বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়বে— এমন টিপ্পনীও কাটা হচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে বিএনপি। দলের নেতাকর্মীরা একাধিকবার নির্যাতন, গ্রেপ্তার ও টার্গেট কিলিংয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এটাও সত্য, বিএনপির কিছু নেতা দিনে বিএনপি আর রাতে আওয়ামী লীগ করে আত্মরক্ষা খুঁজেছেন। জুলাই বিপ্লবের পর যথারীতি তারা ‘অতি বিপ্লবী’ সেজেছেন। সেখানে বহুমূত্র প্রসঙ্গ বেমানান। আবার ট্রলের যুগে এসে রাজনীতিতে এখন রম্য-বিনোদনও খাটে না। প্রতিপক্ষকে ভাসিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল ও পরিভাষা এখন রীতিমতো ভাইরাল। তবে নেতাদের মুখে পেশাবের উচ্চারণ কিন্তু আজই প্রথম নয়। শামসুজ্জামান দুদুর আদর্শিক নেতা শতাব্দীর মহিরুহ মওলানা ভাসানী এ ক্ষেত্রে অনন্য। ওই সময়ের আর্কাইভে দেখা যায় মওলানা ভাসানীর বক্তব্যে ‘মুত’ শব্দটির দেখা মেলে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর শাসক দল আওয়ামী লীগের তরুণ নেতারাও বয়োবৃদ্ধ জননেতা মওলানা ভাসানীর যাচ্ছেতাই সমালোচনা শুরু করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। মওলানার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে, তার মানসিক চিকিৎসা দরকার, অশীতিপর বুড়োর এখন রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া উচিত—এমন নানা মন্তব্য করে চটানোর চেষ্টা চলত। শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে পল্টনের এক জনসভায় মওলানা বলে বসেন, ‘মনি-রাজ্জাক-তোফায়েল জীবনে যত পেশাব করেছি তত পানিও তোরা খাস নাই।’ এ বক্তব্যের পর মওলানার ওই পেশাবের এমনই তেজ ও ট্রল ছড়ায়, যা কিছুদিন বাজারে চলেছে সমানে। মওলানা ভাসানীর মুখে তা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তরুণ তুর্কি নেতারা জনমের ধাক্কা খেয়ে লা-জওয়াব হয়ে যান। মওলানার বিরুদ্ধ-সমালোচনায় তালা পড়েছিল তাদের সবার মুখেই। মওলানার যুগ আর নেই। আর সবাই ভাসানীও নন। লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
রাজনীতির হটস্পটে রাজরোগ
হ-য-ব-র-ল সমাজব্যবস্থার দিন শেষ
সুমিষ্ট সুগন্ধ আর রঙের আভিজাত্যে অনন্য বিচিত্রা ফুলের ইংরেজি নাম টুডে-ইয়াসটারডে-টুমোরো। প্রকৃতির নির্দিষ্ট সময়ে রং পরিবর্তন করে, বিচিত্র ফুল বিচিত্রা। অন্যদিকে প্রকৃতির অংশ বিচিত্র মানুষ, বিচিত্র তার চিন্তাভাবনা। যেমন—বাংলাদেশে মানুষের বিচিত্র চিন্তাভাবনায় এখন হ-য-ব-র-ল বর্তমান সমাজব্যবস্থা, যা নিয়ে বুধসমাজে, ব্যক্তিগত মতাদর্শ দ্বারা কমবেশি নিয়ন্ত্রিত, জ্ঞানী-গুণীদের বিভিন্ন মিডিয়ায় চলছে আলোচনা। পাশাপাশি বিশ্বের ‘অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মঞ্চে’, সিস্টেম চিন্তাবিদদের বিতর্ক চলছে বাংলাদেশের দুরারোগ্য দুর্নীতি নিয়ে। বর্তমান সমাজব্যবস্থা নিয়ে জনগণের জ্ঞানীয় তথ্য ও আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে অনেক প্রশ্ন। যেমন, বর্তমান সমাজব্যবস্থা কী? কোন তন্ত্রবাদীর দর্শনে চলছে বর্তমান সমাজব্যবস্থা? কেন দ্রুত ওঠানামা করছে সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের ব্যারোমিটার? এই প্রশ্নগুলো সামনে রেখে আজকের নিবন্ধ। স্থানীয়, আঞ্চলিক, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আন্তঃবিভাগীয় বহুমাত্রিক বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের চিন্তাভাবনার জালে হৃদয় ও স্নায়ুতন্ত্রের কেন্দ্রীয় অঙ্গের বিক্রিয়ার ফলাফল বর্তমান সমাজব্যবস্থা। যার মধ্যে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতি আমাদের জীবনের প্রবহমান ধারায় এক অসাধারণ বলয়। এ বলয়ের অভাবে শৃঙ্খলিত জীবনযাপনের সরল পদ্ধতি অনুসরণ করা যায় না। দীর্ঘদিন শৃঙ্খলিত জীবনযাপনের অনুপস্থিতিতে পৃথিবীর যে কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষ ফিরে যেতে পারে মধ্যযুগে। যখন সমাজ থেকেও নেই; মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বসবাস করত, ক্যানিবালিজম প্রথার প্রচলন ছিল বিধায় দুর্বল গোত্রের ওপর শক্তিশালী গোত্র আক্রমণ বা অত্যাচার করলে, দুর্বল গোত্রকে রক্ষা করার জন্য কোনো আইনসম্মত ব্যবস্থা কাজ করত না। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যযুগীয় ক্যানিবালিজম প্রথা বাংলাদেশে ধারণ করেছে বিভিন্ন আঙ্গিকে, অনেকটা দুরারোগ্য দুর্নীতির মহামারিতে। তাই দুর্বৃত্ত-ধনিকদের দেখতে পাচ্ছেন গাড়িতে। ওরা ‘ব্ল্যাক ফ্লাই’ মাছির মতো বিষাক্ত। স্বার্থের দ্বন্দ্বে ওরা অন্যকে করে রক্তাক্ত। এমন দ্বন্দ্বের সমাজে দেখা দেয় মানুষের ‘নাটকীয় জীবনের পথচলা’। ষড়যন্ত্র তত্ত্বমতে, এ নাটকীয় জীবনের পথচলা সমাজে অদৃশ্য রাজত্ব করে ‘বিজ্ঞাপন’। হয়তো তাই, তবলার তারানা বাজানোর মতো দ্রুতগতিতে বিজ্ঞাপনের চাদরে ঢাকতে শুরু করেছে অনিন্দনীয় দেশের দৃষ্টিনন্দন সমাজব্যবস্থা প্রবর্তন, যা অনেকটা দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক বংগ জন হুর পরিচালনায় সত্য জীবনের ঘটনা অবলম্বনে অস্কারজয়ী ‘পরজীবী’ (প্যারাসাইট) মুভির মতো। পরজীবী মুভিতে অনেক অপ্রকাশ্য বার্তার মধ্যে একটি হলো—রৈখিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল পুঁজিবাদী সমাজ মধ্যযুগের ক্যানিবালিজম (রূপক অর্থে) প্রথার দিকে ধাবমান। এ ধরনের পুঁজিবাদী সমাজের কথা ভেবে অষ্টাদশ শতাব্দীতে খ্যাতিমান চিন্তাবিদরা বলেছিলেন, ‘সমকালীন সমাজ কাঠামো ব্যক্তির বিকাশের পথে অন্তরায়, যা মানুষকে মানুষের মুখোমুখি করে দেয়, তাকে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে বাধ্য করে।’ নৃতাত্ত্বিক যুগের বিজ্ঞানীদের মতে, সবুজবান্ধব সমাজ গঠন তথা সমকালীন সমাজ কাঠামো নিয়ে মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল, আছে কিংবা থাকবে। তাই, গত আশির দশকে বাংলাদেশি শিল্পী তপন চৌধুরীর গাওয়া ‘যেতে যেতে কেন পড়ে বাধা’ গানটি সমাজ জীবনে বেশি প্রাসঙ্গিক বললে ভুল হবে না। কারণ এ গানের কথার মতো—‘আমাদের দিন যায় রাত আসে, মাস যায় বছর আসে আর সুন্দর দেশের স্বপ্ন আমাদের চোখের মণিতে ভাসে’। হয়তো তাই, সুন্দর দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য গত বছর ৮ আগস্ট থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অনেক বক্তব্যে বলেছেন, ওপরে বর্ণিত সমাজের কথা, সাধারণ মানুষের কথা, বৈষম্যহীন দেশের কথা, চার কোটি গরিব জনপদের কথা, গণতন্ত্রের কথা এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নের কথা। যেমন—গত এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন ২০২৫-এর অনুষ্ঠানে উৎসাহব্যঞ্জক ভাষণে বাংলাদেশে ব্যবসা নিয়ে আসার জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, ‘বিশ্বকে বদলে দেওয়ার মতো অভিনব সব ধারণা রয়েছে বাংলাদেশের।’ ড. ইউনূসের বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলনের ভাষণ নিবিষ্ট মনে শ্রবণকারী দেশপ্রেমিক জনগণ জানতে চায়, উৎসাহব্যঞ্জক ভাষণের লক্ষ্য কোনটি? (ক) চীনের মতো অর্থনৈতিক হাব তৈরি করা, (খ) মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল ২০৩০-এর মাধ্যমে দেশের উন্নতি করা এবং (গ) বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অর্থনীতির কোন মডেল নিয়ে দেশে ব্যবসা করতে আসবেন: রৈখিক (linear) নাকি বৃত্ত (circular)? জনগণ আরও জানতে চায়, দেশে টেকসই অর্থনীতির নীতিনির্ধারক কারা? এ প্রশ্নের ব্যবচ্ছেদে দেখা যায় (i) রাজনৈতিক বলয়ে অর্থনীতির স্বরূপ অনুধাবন করা প্রয়োজন; (ii) গত বছরে পতিত সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে বানানো হয়েছিল সাক্ষীগোপাল; এ অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটুক তা জনগণ ও বুধসমাজের কেউই চান না এবং (iii) জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক সুদৃঢ় ও স্বচ্ছ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। হয়তো এ সম্পর্কের অভাবে বাংলাদেশের আশপাশে বলিষ্ঠ জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটলেও ঘটতে পারে। এজন্যই কি ড. ইউনূস বলেছেন, ‘এমন বিশ্বে আমরা বাস করি, প্রতিনিয়ত যুদ্ধের হুমকি আমাদের ঘিরে থাকে।’ কাজেই এ পরিস্থিতির মধ্যে প্রস্তুতি না নেওয়াটা ‘আত্মঘাতী’। এ বিবৃতির অর্থ দাঁড়ায়, দেশ এখন গভীর ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি। তাই দেশের জনগণ আতঙ্কিত। ওপরে বর্ণিত দেশের বিবৃতি শুনে আতঙ্কিত জনগণের উদ্দেশে দেশের বিচক্ষণ রাজনৈতিক ছত্রপতিদের মধ্যে বিপুল জনসমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘জাতীয়তাবাদী শক্তি ঐক্যবদ্ধ থাকলে কোনো ষড়যন্ত্র কাজে আসবে না।’ অন্যদিকে, সমাজচিন্তকদের মতে, ড. ইউনূসের বক্তব্যে সুস্পষ্ট বলিষ্ঠ (উগ্র) জাতীয়তাবাদের লক্ষণ প্রতীয়মান। উগ্র জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশে নতুন যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে। যেমন—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) জার্মান সেনাবাহিনীর বর্বর বৃক্ষটির মূলে পানি দিয়েছিল উগ্র জাতীয়তাবাদ। এ আলোচ্য বিষয়ের সূত্র ধরে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের মানুষ উগ্র জাতীয়তাবাদ নিয়ে যতটা চিন্তিত, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত বর্তমান সমাজব্যবস্থা তথা দেশের উন্নতি নিয়ে। কারণ ষড়যন্ত্র তত্ত্বমতে, বর্তমানে দেশে সংস্কারের নামে, রাজনীতির নামে, ভূরাজনীতির নামে, অর্থনীতির নামে, বৈদেশিক সাহায্যের নামে দেশের ভেতরে এক ধরনের ভীতিকর, এক ধরনের অস্থিতিশীলতা, এক ধরনের অরাজকতা, এক ধরনের অনিশ্চয়তা এবং এক ধরনের নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হতে চলেছে। অন্তনীল মনের প্রশ্ন, দেশে এ ধরনের অবস্থা তৈরি করার জন্য পৃষ্ঠপোষকতা করছে কারা? প্রিয় পাঠক, প্রশ্নের উত্তরটা পেতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যানিমেটর ও কার্টুনিস্ট Walter Crawford Kelly Jr. (১৯১৩-১৯৭৩)-এর তৈরি পোগো কার্টুনের বিখ্যাত একটি লাইনের মধ্যে। লাইনটি হলো—‘আমরা শত্রুর সঙ্গে দেখা করেছি এবং সে আমাদের।’ ওপরের অনুচ্ছেদে অদৃশ্য শক্তির পোগো কার্টুন পরোক্ষভাবে বলে দিয়েছে, বিজ্ঞাপনের রাজত্ব পরিচালনা গোষ্ঠী বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মুখটাকে ঢেকে, মুখোশটাকে জীবিত রাখার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ আমাদের সমাজে সাধারণ মানুষের সম্ভাবনা নিয়ে চলছে রাজনীতি ও কূটনীতি, যা বন্ধ করা অতীব জরুরি। নতুবা মেক্সিকোর টিলটেপেক গ্রামের (Tiltepec Village, where everyone turns blind) মতো আমাদের সমাজ হবে অন্ধ। তাই বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির ক্ষয়িষ্ণু সময়ে পচে না গিয়ে টিকে থাকা রাজনৈতিক ছত্রপতিরা বর্তমান সমাজ বা দেশ নিয়ে আলোচনার কথা বলতে চেয়েছেন এইভাবে, অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে, বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় সামুদ্রিক লাল অ্যালগি শৈবালের দ্বীপ দারুচিনিতে বসে আলোচনার বিষয় হতে পারে ‘পৃথিবীতে সুখ ও শান্তির মডেল বাংলাদেশ’। আলোচনার এখনই আদর্শ সময়। আমন্ত্রিত মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যদি তাদের অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে এখন তাদের আকাঙ্ক্ষাকে একবিন্দুতে মেলাতে পারা যায়, তাহলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই দেশের রাজনৈতিক ছত্রপতিদের আলোচনার পরিকল্পনা চূড়ান্তভাবে সফল হবে। ফলে দেশে বিজ্ঞাপনের রাজত্বের পরিবর্তে রাজ্য পরিচালনা করবে সুশৃঙ্খলভাবে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। হয়তো তখন থেকে (১) সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি আমাদের জীবনের প্রবহমান ধারায় এক অসাধারণ বলয়ের চাকা ঘুরবে; (২) দুর্বৃত্ত-ধনিকরা পলায়নের দিন গুনবে; (৩) সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের ব্যারোমিটার দ্রুত ওঠানামা করবে না; (৪) শুরু হবে সবুজবান্ধব সমাজ গড়া এবং (৫) বিচিত্রা ফুলের মতো সুমিষ্ট সুগন্ধে মারুত বহিবে বাংলার ঘরে ঘরে। প্রিয় পাঠক, দেশের ঠিক এমন অবস্থায় আপনার মুখের মিষ্টি হাসি আমাদের তথা বিশ্ববাসীকে বলে দেবে বর্তমান ‘হ-য-ব-র-ল সমাজব্যবস্থার দিন শেষ, সুখ ও শান্তির বাংলাদেশ’। লেখক: সমাজবিজ্ঞানী, টেকসই রিনিউবল এনার্জি ও সার্কুলার অর্থনীতি এক্সপার্ট
হ-য-ব-র-ল সমাজব্যবস্থার দিন শেষ
চারদিক / পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা
জাদুঘর সমাজের দর্পণ। জাদুঘর জাতির শিকড় সন্ধান করে। পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যত ঐতিহাসিক নিদর্শন জমা হচ্ছে, তারই প্রতিচ্ছবি হলো জাদুঘর। জাদুঘর মানেই হারিয়ে যাওয়া ব্যতিক্রমী অদ্ভুত জিনিসের সংগ্রহশালা। জাদুঘর জাতির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্যের বিশাল সংগ্রহভান্ডার। এ সমৃদ্ধ সংগ্রহের মাধ্যমে জাদুঘর জনগণের সঙ্গে সেতুবন্ধ তৈরি করে। জাদুঘর বলতে বোঝায় এমন একটি ভবন বা প্রতিষ্ঠান যেখানে পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহের সংগ্রহ সংরক্ষিত থাকে। জাদুঘরে বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বস্তুসমূহ সংগ্রহ করে সংরক্ষিত করা হয় এবং সেগুলো আঁধারের মধ্যে রেখে স্থায়ী অথবা অস্থায়ীভাবে জনসাধারণের সমক্ষে প্রদর্শন করা হয়। ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি বহন করে জাদুঘর। এখানে অদ্ভুত ও উদ্ভট সবকিছুর সংগ্রহ দেখা ও জানার কৌতূহল নিয়ে দর্শনার্থীদের আগমন ঘটে। মাউসিয়ন থেকে জাদুঘর। জাদুঘর শব্দটির উৎপত্তি ধ্রুপদি বা আভিজাত্যপূর্ণ। গ্রিক ভাষায়, মাউসিয়নের অর্থ মিউজদের আসন এবং এটি দার্শনিক প্রতিষ্ঠান বা চিন্তাভাবনার স্থানকে নির্দেশ করে। জাদুঘরে ইংরেজি মিউজিয়াম শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ থেকে। ২৮০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রথম জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর এই প্রথম জাদুঘরে ছিল নিদর্শন-সংগ্রহশালা ও লাইব্রেরি, ছিল উদ্ভিদউদ্যান ও উন্মুক্ত চিড়িয়াখানা। তবে এটা ছিল মূলত দর্শন চর্চাকেন্দ্র। পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যত ইতিহাস জমা হচ্ছে, তারই প্রতিচ্ছবি হলো জাদুঘর। জাদুঘরের ইংরেজি মিউজিয়াম শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ মিউজয়ন থেকে, যার অর্থ কাব্যাদির অধিষ্ঠাত্রী দেবীর মন্দির। বাংলায় জাদুঘর কথার অর্থ হলো, যে গৃহে অদ্ভুত অদ্ভুত পদার্থসমূহের সংগ্রহ আছে এবং যা দেখে মন্ত্রমুগ্ধ বা বশীভূত হতে হয়। তবে জাদুঘরে যে এক ধরনের মায়া আছে, তা অনস্বীকার্য। জাদুঘরের এ সত্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মায়া; রয়েছে বিস্ময়, যা দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হতে হয়। উপমহাদেশে জাদুঘরের ধারণাটি এসেছে ব্রিটিশদের মাধ্যমে। এ অঞ্চলের জাতিতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, ভূতাত্ত্বিক এবং প্রাণীবিষয়ক নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যাপারে উদ্যোগী হন ভারতীয় এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যরা। ১৮০৮ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির পৃষ্ঠপোষক লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে জমি দিয়ে জাদুঘরের জন্য ভবন নির্মাণ করেন। ১৮১৪ সালে উপমহাদেশের প্রথম জাদুঘর এশিয়াটিক সোসাইটি মিউজিয়ামের জন্ম ও প্রতিষ্ঠা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের মোট ১৮০টি দেশের ২৮ হাজার জাদুঘর যুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিশাল সংগ্রহভান্ডার। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি হাজার হাজার দর্শক জাদুঘর পরিদর্শন করে দেশের গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে জানতে পারছে। বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর হচ্ছে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। ১৯১০ সাল দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় শরৎকুমার রায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯১৩ সালে। বাংলাদেশে শতাধিক জাদুঘর আছে। তবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরই দেশের প্রধান জাদুঘর হিসেবে বিবেচিত। জাতীয় জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, আহসান মঞ্জিল জাদুঘর, বরেন্দ্র জাদুঘরসহ পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে আছে এসব জাদুঘর; যা ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষা, গবেষণা এবং বিনোদনের খোরাক মেটাচ্ছে বাঙালির। পৃথিবীর বিখ্যাত জাদুঘরগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের ল্যুভর মিউজিয়াম, প্যারিসে গিমে জাদুঘর, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে মাদাম তুসোর মোমের জাদুঘর, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, রোমান ক্যাথলিক চার্চের ভ্যাটিকান জাদুঘর, যুক্তরাষ্ট্রের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট, মিশরীয় ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম, স্পেনের মাদ্রিদে প্রাদো মিউজিয়াম, ইতালির উজিফি গ্যালারি ইত্যাদি। আর বিশ্বের সব থেকে ছোট জাদুঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ওয়ারলে মিউজিয়াম। এটি দেখতে একটি পুরোনো টেলিফোন বক্সের মতো। বিশ্বের বৃহত্তম জাদুঘর হলো প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর, যেখানে ৩৫ হাজারের বেশি শিল্পকর্ম রয়েছে। আমস্টারডামে যে জাদুঘাটি রয়েছে, সেটি দেখতে অনেকটা একজন মানুষের মতো। জাদুঘরগুলো আমাদের অতীতের জীবন্ত স্মৃতি এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০৩টি জাদুঘর রয়েছে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কিছু জাদুঘর—ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর, আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর, সোনারগাঁয়ে চারু ও কারুশিল্প জাদুঘর, বুড়িগঙ্গার তীরে আহসান মঞ্জিল জাদুঘর, ঢাকার পলাশীতে আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর, ঢাকার নিমতলা এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘর, ঢাকার বিজয় সরণিতে বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘর, ঢাকার রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাদুঘর, ঢাকা মিরপুরে বাংলাদেশ মুদ্রা জাদুঘর, ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বিজয় কেতন জাদুঘর, ঢাকার সোনারগাঁও শিল্পাচার্য জয়নুল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, রংপুর জাদুঘর, রংপুরের তাজহাট প্যালেস রংপুর জাদুঘর, লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্য জাদুঘর, খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর, ময়মনসিংহ জাদুঘর, জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা, রাঙ্গামাটিতে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক জাদুঘর, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর, সিলেটে ওসমানী জাদুঘর। তা ছাড়া বর্তমানে জেলা ও উপজেলা শহরে জাদুঘর গড়ে উঠেছে। জাদুঘরের নিদর্শনগুলো ইতিহাসের সাক্ষী। তবে সব জাদুঘরই পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের সংগ্রহশালা নয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা এমন ভিন্ন রকমের জাদুঘর রয়েছে। মেক্সিকোর ক্যারিবীয় সাগর উপকূলে জলতলের কানকুন জাদুঘর, রাশিয়ায় ভাঙা সম্পর্কের নিদর্শন জাদুঘর, ভারতের নয়াদিল্লিতে টয়লেট জাদুঘর, নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে বিড়ালদের জাদুঘর, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে গণিতের জাদুঘর। এমন অদ্ভুত ও উদ্ভট দারুণ মজার জাদুঘরের কিছু নিদর্শন দেখার সুযোগ পান দর্শনার্থীরা। প্রকাশ ঘোষ বিধান পাইকগাছা, খুলনা
পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের সমাপ্তির সূচনা
একটা সময় ছিল যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রায় এককভাবেই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ছিল তখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। গাজার মতো পশ্চিম তীরে যুদ্ধাবস্থা না থাকলেও সেখানে ইসরায়েল সরকারের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও কূটনৈতিক প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আর আন্তর্জাতিক আইনকে অবজ্ঞা করে ফিলিস্তিনের পূর্ণ ভূখণ্ডের ওপর তেল আবিবের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নে সমর্থন দিতে প্রস্তুত ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নেতানিয়াহু মনে করছিলেন, তার গাজাকে সম্পূর্ণভাবে দখল করার ইচ্ছা পূরণ হতে যাচ্ছে। যেই ভূমি বহু বছর ধরে ইসরায়েলের দমনমূলক অবরোধ প্রতিহত করে আসছে, সেই ভূমি যেন তার অস্তিত্বের শেষ অধ্যায়ে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো দেখে মনে হচ্ছে যে, নেতানিয়াহুর আগ্রাসী অভিলাষগুলোর গতি রোধ হতে চলেছে। ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রশংসা কুড়িয়েছেন বিবি। তিনি ইসরায়েলের নাগরিকদের শুধু দীর্ঘস্থায়িত্বই নয়, একই সঙ্গে অভূতপূর্ব সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ প্রতিশ্রুতির নিদর্শন হিসেবে তিনি অনেক দিন ধরেই একটি দৃষ্টিনন্দন উপকরণ ব্যবহার করে আসছেন। আর সেটি হলো মধ্যপ্রাচ্যের একটি প্রতীকী মানচিত্র। তার ভাষ্যমতে, সেটা ‘নব্য মধ্যপ্রাচ্য’, যেখানে তিনি কল্পনা করেছেন ইসরায়েলের নেতৃত্বাধীন একটি ঐক্যবদ্ধ সবুজ অঞ্চল। এ মানচিত্রটা যেন অগণিত আশীর্বাদে গড়া ভবিষ্যতের একটি দৃষ্টান্ত। তবে এ মানচিত্রে যে একটা দেশ অনুপস্থিত, সেটা হলো ফিলিস্তিন। ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পূর্বেকার ফিলিস্তিনের কোনো নিশান যেমন এখানে নেই, তেমনই বর্তমান ফিলিস্তিনের স্বায়ত্তশাসিত দুটো অঞ্চল, গাজা আর পশ্চিম তীরের কোনো চিহ্নও এ মানচিত্রে নেই। ২০২৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নেতানিয়াহু এ মানচিত্র উন্মোচন করেন। তার দাম্ভিক ভাষণের দরুন অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের খুব অল্পসংখ্যক প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আর যারা উপস্থিত ছিলেন, তাদের মাঝেও সমর্থন বা উচ্ছ্বাসের কোনো ছাপ ছিল না। কিন্তু তাদের অসম্মতি, নেতানিয়াহু, তার চরমপন্থি সমর্থকগোষ্ঠী বা ইসরায়েলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের জন্য তেমন গুরুত্ব বহন করে না। কারণ ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের সমর্থনের মূল ভিত্তি হলো পশ্চিমা বিশ্বের গুটিকয়েক পরাশক্তি রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কিছু দেশের সমর্থনের কারণেই ইসরায়েল তার দখলদারী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের চালানো আক্রমণকে ব্যবহার করে ইসরায়েল পশ্চিমা বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক মহলের সহানুভূতি অর্জন করে। সেটাকে পুঁজি করে ইসরায়েলের সরকার যেমন একদিকে তাদের চলমান অবৈধ কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে শুরু করে, অন্যদিকে পাল্টা আক্রমণ চালানোর জোর প্রস্তুতি নিতে থাকে। তবে বিশ্ববাসী যখন বুঝতে পারে যে, ইসরায়েলের পাল্টা আক্রমণটা কোনো নিরাপত্তাজনিত পদক্ষেপ না, বরং গণহত্যার অভিযানে রূপ নিতে শুরু করেছে, তখন এই সহানুভূতির মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ক্রমেই এটা সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, গাজার অধিবাসীদের নির্মূলীকরণ এবং ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধনই ইসরায়েলি বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজার বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞের চিত্র যখন বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেতে থাকে, তখন ইসরায়েলের প্রতি বিভিন্ন দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে বিরূপ মনোভাব তৈরি হতে শুরু করে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের জন্য দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র রাষ্ট্রের সরকারগুলো বিপাকে পড়ে যায়। ৫০ হাজারেরও অধিক সংখ্যক মানুষ এ গণহত্যায় প্রাণ হারিয়েছে, যাদের অধিকাংশই ছিল নারী ও শিশু। এ ঘৃণ্য হত্যাযজ্ঞের সাফাই গাওয়া বা এর যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা দেওয়া এখন ইসরায়েলের বন্ধুদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যের মতো কিছু দেশ ইসরায়েলের ওপর আংশিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবে আবার ফ্রান্সের মতো কিছু দেশে সাধারণ নাগরিকদের ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে দেওয়া হচ্ছে না, যদিও সরকারের পররাষ্ট্রনীতি মোতাবেক তারা সবাই যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। এসব কারণে পশ্চিমা বিশ্বে ইসরায়েলপন্থি প্রচারণা ক্রমেই অসংলগ্ন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনে আমেরিকার সরকার ইসরায়েলের প্রতি অটল সমর্থন বজায় রাখে। তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে ইসরায়েল তার পরিকল্পিত লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হলে, তাদের প্রতি বাইডেন প্রশাসনের প্রকাশ্য সমর্থন ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকে। ইসরায়েলের ওপর কোনো জোর চাপ প্রয়োগ না করলেও, তিনি ২০২৪-এর মাঝামাঝি সময়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান। নভেম্বর মাসের নির্বাচনে বাইডেনের ডেমোক্রেটিক পার্টির হেরে যাওয়ার পেছনে ইসরায়েলের প্রতি ঢালাও সমর্থন একটি অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এরপর দ্বিতীয় দফায় আগমন ঘটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ফিলিস্তিনের পাশাপাশি লেভান্ত অঞ্চলের অন্যান্য রাষ্ট্র যেমন লেবানন, সিরিয়া প্রভৃতি দেশকে নিয়ে ইসরায়েলের পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে বলে ধারণা করেছিলেন নেতানিয়াহু এবং তার সমর্থকরা। ওয়াশিংটনকে ব্যবহার করে তারা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উৎখাত করা, ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর শক্তি খর্বকরণ, সিরিয়ার ভৌগোলিক বিভাজন—এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল। আর এর জন্য যেন নিজেদের বড় রকমের কোনো ক্ষতি না হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য তারা আমেরিকার সহযোগিতার অপেক্ষা করছিল। প্রাথমিকভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এ পরিকল্পনাকে সমর্থন দেন। তিনি ইসরায়েলকে পূর্বের থেকে অধিক শক্তিশালী বোমা সরবরাহ করেন, ইরানকে সরাসরি হুমকি দেন, হুতিদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান জোরদার করেন এবং গাজার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দখল ও সেখানকার জনসংখ্যাকে উৎখাত করার ব্যাপারে স্পষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর প্রত্যাশাগুলোর সম্পূর্ণ বাস্তব রূপান্তর ঘটেনি। তার আশা এবং প্রতিশ্রুতিগুলো অপূর্ণই রয়ে গেছে। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা কেউ কেউ প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন যে, ট্রাম্প কি ইচ্ছাকৃতভাবেই নেতানিয়াহুকে বিভ্রান্ত করেছিলেন, নাকি পরবর্তীকালে লাভ ও লোকসানের হিসাব কষে নিজের অবস্থান ও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলেছেন? এ দুটোর ভেতরে দ্বিতীয়টাই বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। ইরানকে ভয় দেখানোর প্রচেষ্টা কার্যত নিষ্ফল প্রমাণিত হয়েছে। তবে পরে ওমানে এবং ইতালির রোম শহরে তেহরান ও ওয়াশিংটন ডিসির মধ্যে কূটনৈতিক বৈঠকের আয়োজন করা হয়। হুতিদের তৎপরতার কারণে চলতি মাসে ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান শিথিল করতে বাধ্য হয়। গত শুক্রবার মার্কিন সামরিক বাহিনী ঘোষণা করে, এ অঞ্চল থেকে তারা হ্যারি এস ট্রুম্যান বিমানবাহী জাহাজটি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের অনুপস্থিতিতে গত সপ্তাহে হামাস এবং ওয়াশিংটন ডিসি একটি সমঝোতার চুক্তি ঘোষণা করে, যার আওতায় মার্কিন-ইসরায়েলি নাগরিক এডান আলেকজান্ডারকে মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয় হামাস। এ নাটকীয় পালাবদলের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে যখন ট্রাম্প গত সপ্তাহে রিয়াদে অনুষ্ঠিত একটি মার্কিন-সৌদি বিনিয়োগ ফোরামে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধির পক্ষে কথা বলেন, সিরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এ নতুন নকশায় যার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি, তিনি হলেন নেতানিয়াহু। তবে এ পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে নেতানিয়াহু যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তার জন্য বরাবরের মতো গাজাকেই মূল্য দিতে হয়েছে। গাজার হাসপাতালগুলোয় আক্রমণ চালিয়েছে ইসরায়েল, বিশেষ করে নাসের ও ইউরোপীয় হাসপাতালে চিকিৎসারত রোগীদের লক্ষ্য করে। এমনিতেই এ অঞ্চলের মানুষ নিরুপায়, তদুপরি সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোর ওপর এ নিষ্ঠুর হামলা চালিয়ে নেতানিয়াহু ওয়াশিংটন ডিসি ও আরব বিশ্বের নেতাদের এ হুঁশিয়ারি দিয়ে দিলেন যে, তাদের নীতির পরিবর্তন হলেও ইসরায়েলের নীতির কোনো পরিবর্তন হবে না। আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রাঙ্গণে ইসরায়েলের সমর্থন ক্রমাগত কমে চলেছে, তাই শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নেতানিয়াহু সামরিক অভিযানে নতুন মাত্রা যুক্ত করতে উদ্যত হয়েছেন। এ বর্ধমান উত্তেজনার কারণে ফিলিস্তিনে প্রাণহানির সংখ্যা বিপজ্জনক হারে বেড়ে চলেছে। এর সঙ্গে দেখা দিচ্ছে তীব্র খাদ্যসংকট। অনেক জায়গায়ই দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে, যার জন্য ভুক্তভোগী হতে চলেছে প্রায় ২০ লাখ মানুষ। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন, তা নিশ্চিত হয়ে বলা মুশকিল। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চয়তার সঙ্গে বলা যায়, সেটা হলো যে, তার ব্যক্তিগত রাজনীতির ভিত্তি ক্রমাগত নড়বড়ে হয়ে চলেছে। নিজের দেশের অভ্যন্তরে তিনি ব্যাপক বিরোধিতার সম্মুখীন হতে শুরু করেছেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তার নিন্দুকের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। তার প্রধানতম মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও ইসরায়েলবিষয়ক নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে যেন আসন্ন সময়ে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে চলেছে। আশা করা যায় যেন একই সঙ্গে ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক নীতিগুলোরও সমাপ্তি ঘটে। লেখক: সাংবাদিক, লেখক ও ‘দ্য ফিলিস্তিন ক্রনিকল’ পত্রিকার সম্পাদক এবং ‘সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক। নিবন্ধটি আরব নিউজের মতামত বিভাগ থেকে অনুবাদ করেছেন অ্যালেক্স শেখ
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের সমাপ্তির সূচনা
নিজের চামড়া ফেলে দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও
নিজের চামড়া ফেলে দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও
নিজের চামড়া ফেলা দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও—এ বাক্যটি এখন আর শুধু একটি ব্যঙ্গ নয়, বরং চামড়া খাত নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার নগ্ন প্রতিফলন। একদিকে ঈদুল আজহার মতো উৎসবে লাখ লাখ পশু কোরবানির মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগৃহীত হয়, অন্যদিকে প্রতি বছর আমদানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার প্রক্রিয়াজাত চামড়া বিদেশ থেকে আনতে হয়। এ চিত্র শুধু বাণিজ্য ঘাটতির নয়, এটি রাজনৈতিক ও নীতিগত ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ প্রতি বছর ঈদের সময় কমবেশি এক কোটি কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ (বিশেষত ছাগলের চামড়া) সংরক্ষণের অভাবে পচে যায়। এ চামড়া ফেলে দেওয়া বা মাটিচাপা দেওয়ার কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। মূলত চামড়া সংরক্ষণে ত্রুটি, হিমায়িত পরিবহনের অভাব, অদক্ষ বাজার ব্যবস্থা ও অগ্রিম অর্থায়ন না থাকায় এমন অপচয় হয়। ফলে একদিকে কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে অস্থিরতা ও অনাস্থা জন্ম নেয়। অপচয়ের এ বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ১১ হাজার ৭১৮ টন চামড়া আমদানি করেছে। এজন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। এ আমদানিকৃত চামড়া দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন রপ্তানিযোগ্য পণ্য—জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ইত্যাদি। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ পরিমাণ চামড়া যদি দেশেই উৎপন্ন হতো, তাহলে এত বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যেত না। বাংলাদেশে উৎপাদিত চামড়ার একটি বড় অংশই আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো যেমন নাইকি, অ্যাডিডাস তাদের চামড়া সংগ্রহ করে শুধু এলডব্লিউজি (লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ) সার্টিফায়েড ট্যানারি থেকে। অথচ বিশ্বের প্রায় ১ হাজার ২৮৫টি ট্যানারি এ সার্টিফিকেশন অর্জন করলেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি ট্যানারি এ মান অর্জন করতে পেরেছে। এ ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হচ্ছে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থাপিত সিইটিপি (সেন্ট্রাল এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) সম্পূর্ণরূপে কার্যকর নয়। নির্ধারিত পরিশোধন ক্ষমতা থাকলেও কোরবানির মৌসুমে চাহিদা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বর্জ্য যথাযথভাবে শোধন করা সম্ভব হয় না। ফলে পরিবেশ দূষণের কারণে এলডব্লিউজি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের ট্যানারি পরিদর্শনই বন্ধ করে দিয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশি ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না। তারা বাধ্য হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কমমূল্যে চামড়া বিক্রি করতে। অন্যদিকে বিদেশি ফিনিশড চামড়া আমদানি করে নিজেদের রপ্তানির চেইন বজায় রাখে। ২০০৩ সালে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী গঠনের ঘোষণা দিয়ে হেমায়েতপুরে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো ট্যানারিগুলোকে ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন শিল্প এলাকা গড়ে তোলা। কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি আজও অসম্পূর্ণ। ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে ১৪২টি চালু থাকলেও সিইটিপি এখনো আংশিক কাজ করে, ফলে নির্গত বর্জ্য ঠিকমতো পরিশোধিত হয় না। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডাম্পিং ইয়ার্ডের দুর্বলতার কারণে ধলেশ্বরী নদী ভয়াবহ দূষণের শিকার, যা দেশের চামড়াশিল্পকে পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে পরিণত করেছে। ঈদুল আজহার সময় উৎপাদিত চামড়ার প্রায় ৯০ শতাংশ স্থানীয় হাটে বিক্রি হয়। কিন্তু এ বাজারে নেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী, নেই মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা, নেই অগ্রিম অর্থায়নের নিশ্চয়তা। ৮৫ শতাংশ বিক্রেতা অপ্রশিক্ষিত এবং প্রান্তিক পর্যায়ে চাঁদাবাজি, পরিবহন দুর্নীতি ও হাটব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা চামড়ার দামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্যবসায়ীদের ৬৫ শতাংশের বেশি মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চামড়া কিনে থাকে, যেটি মূলত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ। ফলে সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন হয় না, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চামড়াশিল্পে যুক্ত রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, বিসিক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মতো একাধিক সংস্থা, কিন্তু তাদের মধ্যে নেই কার্যকর সমন্বয়। ২০১৭ সালে সিইটিপি অপূর্ণ থাকা অবস্থায় ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত এক বড় ধরনের অব্যবস্থাপনার জন্ম দেয়। আমদানি ও রপ্তানি নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, শুল্ক সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আমলাতান্ত্রিক হয়রানি উদ্যোক্তাদের জন্য আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা দুরূহ হয়ে পড়ে। চামড়ার মৌসুমে লবণের সংকট, বাড়তি দাম ও হিমায়িত পরিবহনের অভাবে অনেক সময় কাঁচা চামড়া দ্রুত পচে যায়। দেশে এখনো কেন্দ্রীয় কোনো লবণ ডিপো গড়ে ওঠেনি, যা মৌসুমি চাহিদা মেটাতে পারত। ট্যানারিদের ৭৮ শতাংশই মনে করেন, কেন্দ্রীয় লবণ ডিপো স্থাপন এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প রাজনৈতিকভাবে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত, যা সরকারের নির্বিচার সহায়তা, অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও বৈদেশিক নীতির সুবিধা ভোগ করে আজ বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিপরীতে চামড়াশিল্প রাজনৈতিক সদিচ্ছা থেকে বঞ্চিত। এটি একটি ভোট-অপ্রাসঙ্গিক খাত হওয়ায় এর উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকে মুখবন্ধে, বাস্তবায়নে নয়। ফলে কর্মসংস্থানের দিক থেকেও পিছিয়ে। পোশাকশিল্প যেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে কাজ দিয়েছে, সেখানে চামড়াশিল্প এখনো আড়াই লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। চামড়াশিল্পকে দাঁড় করাতে হলে প্রয়োজন নির্দিষ্ট ও কার্যকর উদ্যোগ। সিইটিপি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করে পরিবেশদূষণ বন্ধ করতে হবে। অন্তত ২০টি ট্যানারিকে এলডব্লিউজি সার্টিফায়েড করতে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দিতে হবে। কাঁচা চামড়ার সুষ্ঠু সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় লবণ ডিপো স্থাপন এবং পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা, অগ্রিম অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বাজার ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতে হবে। সর্বোপরি, ২০১৯ সালে গৃহীত ‘চামড়া শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা’ বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি প্রয়োজন। বাংলাদেশের চামড়াশিল্প সম্ভাবনাময় এক খাত, যা নিজস্ব কাঁচামাল, দক্ষ জনবল এবং ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে। এ খাতের সংকট কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যার নয়, এটি মূলত নৈতিক, নীতিগত এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যেদিন এ শিল্পকে শুধু একটি খাত নয়, বরং একটি দায়িত্ব ও সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হবে, সেদিন চামড়াশিল্পও পোশাকশিল্পের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠবে। l আগামীকাল পড়ুন: চামড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ গন্তব্য লেখক: সাংবাদিক
রাজনীতির হটস্পটে রাজরোগ
রাজনীতির হটস্পটে রাজরোগ
ইনিয়ে-বিনিয়ে নয়, ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউডে যে যা পারছেন বলছেন। কেউ কাউকে আর ছেড়ে কথা বলছেন না। মন যা চায়, মুখে যা আসে, তা-ই বলে দিচ্ছেন। যেন আজন্মের শত্রু। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ফ্রন্টলাইনার শিক্ষার্থীদের গড়া এনসিপি আগামী ২১ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ না হলে দুর্বার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে নেমে পড়েছে তারা। বিএনপি সরাসরি টার্গেটে তাদের। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে এনসিপি নেতারা বলেছেন, বিএনপি স্থানীয় নির্বাচন ভয় পায়। তাই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। আরেকটি এক-এগারো ঘটাতে মব সৃষ্টি করে মেয়র হতে চাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। বিএনপি নেতাদের কথাবার্তাও সাফ কথার মতো ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউড। ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা না করলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। বর্তমান সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করা উপদেষ্টাদের অব্যাহতির দাবিও জোরালো। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের পদত্যাগও চান। বৃহস্পতিবার বিএনপি-এনসিপি নেতাদের এমন মাতবোলের এক দিন আগে বুধবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্যও ছিল স্বচ্ছ-পরিষ্কার। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন তিনি। বক্তব্যটা দিয়েছেন ঢাকা সেনানিবাসের সেনা প্রাঙ্গণে অফিসার্স অ্যাড্রেসে। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তার অবস্থান আগের মতোই। দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের অধিকার একটি নির্বাচিত সরকারেরই রয়েছে। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে আরও বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। বাদ পড়েনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর-সংক্রান্ত বিষয়ও। বলেন, রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত একটি নির্বাচিত সরকার থেকেই আসতে হবে। তা করতে হবে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। দেখতে হবে জাতীয় স্বার্থ। পলিটিক্যাল কনসেনসাসের মাধ্যমে সেটা হতে হবে। ‘মব ভায়োলেন্স’র বিরুদ্ধেও কঠোর বার্তা দিয়েছেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সেনাবাহিনী এখন আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। সংঘবদ্ধ জনতার নামে বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা আর সহ্য করা হবে না। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে স্থানীয় মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের মতামত প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করে যাওয়ার কথাও বলেন সেনাপ্রধান। এর পরদিনই রাতেই আকস্মিক আরেক ঘটনা। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সেনানিবাসের ৬২৪ জনকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তা জানানো হয় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। বলা হয়, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিগত সরকারের পতনের পর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতির মাঝে সরকারি দপ্তর, থানাগুলোয় হামলা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর আক্রমণ এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, মব জাস্টিস, চুরি, ডাকাতিসহ বিবিধ বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব সেনানিবাসে প্রাণ রক্ষার্থে রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক আশ্রয় চান। উদ্ভূত আকস্মিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আশ্রয় প্রার্থীদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের চেয়ে তখন তাদের জীবন বাঁচানো প্রাধান্য পায়। তাই ২৪ জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ৫ জন বিচারক, ১৯ জন অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা, ৫১৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাসহ বিবিধ ১২ জন ও ৫১ জন পরিবার-পরিজনসহ সর্বমোট ৬২৬ জনকে বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় দেয় সেনাবাহিনী। শুধু মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে আশ্রয় প্রার্থীদের জীবন রক্ষা করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। পরিস্থিতি উন্নয়নের পর আশ্রয় গ্রহণকারীদের বেশিরভাগই এক-দুই দিনের মধ্যেই সেনানিবাস ত্যাগ করেন। পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়িয়ে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে, সবাইকে এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে আইএসপিআর। এদিকে কিছু ঘটনা ও জনাকয়েকের কারণে নানা মহলের চোখরাঙানি হজম করতে হচ্ছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। আক্রমণাত্মক ভাষায় শুনতে হচ্ছে নানা তিতা কথাও। এর মাঝেই তার উপস্থাপিত ও পরিচয় করে দেওয়া মাস্টারমাইন্ডখ্যাত তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ফেসবুক স্ট্যাটাস। দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে আগের বিভাজনমূলক বক্তব্য ও শব্দচয়নের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ব্যক্তির আদর্শ, সম্মান ও আবেগের চেয়ে দেশ বড়। সরকারে আর একদিনও থাকলে অভ্যুত্থানের সব শক্তির প্রতি সম্মান ও সংবেদনশীলতা রেখে কাজ করতে চান। পুরাতন বন্দোবস্তের বিভেদকামী স্লোগান ও তকমাবাজি, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে হত্যাযোগ্য করে তোলে, সেগুলো পরিহার করলেই ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে বলে এই উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের শত্রুরা ‘ঐক্যবদ্ধ ও আগ্রাসী’ উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে। দেশপ্রেমিক জনগণ যারা জুলাই অভ্যুত্থানে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, তাদের সামনে দীর্ঘ পরীক্ষা। এ পরীক্ষা ঐক্যের ও ধৈর্যের। এ পরীক্ষা উতরে যেতেই হবে বলে মনে করেন মাহফুজ আলম। রাজনীতিতে ভুল করার অর্থই হলো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। এজন্যই রাজনীতিবিদরা সমস্যার সম্মুখীন হলে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়ে থাকেন। যুগ যুগ ধরেই এ প্রথা চলে আসছে। কিন্তু ৫ আগস্টের বিপ্লবীরা সেই পথ মাড়াচ্ছেন না। তারপরও মাহফুজ আলম ভুল স্বীকারের একটি নজির দেখিয়েছেন। কীসের মধ্যে কী-এর মতো সেদিনই প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার পদ ছেড়ে এনসিপির শীর্ষনেতা আলোচিত সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। এর আগে খবর রটে প্রফেসর ইউনূস অভ্যুত্থানের নায়কদের কারও কারও কাজে ভীষণ বিরক্ত। তিনি তাদের ডেকে বলেছেন, তোমরা সংযত হও, নইলে আমি পদত্যাগ করব। এ বক্তব্য সামনে এনে আরেকটি ক্যাচাল বাধানোর আয়োজনের নমুনাও রয়েছে। কবে, কখন, কোথায় প্রফেসর ইউনূস ‘অভ্যুত্থানের নায়ক’দের ডেকেছেন এবং এ কথা বলেছেন—তার কোনো তথ্য বা ইঙ্গিত কিন্তু নেই। যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত নির্বাচন, সেখানে টেনে আনা হচ্ছে সাইডলাইনের নানা বিষয়। সেনাপ্রধানের বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে নানা রং মাখিয়ে। সেখানে তিনি একটা নির্বাচিত সরকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা-সার্বভৌমত্বের জন্য চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন আর গত ৯ মাস সেনাবাহিনীকে অবজ্ঞা করার অভিযোগ এনেছেন। মব সন্ত্রাস বন্ধ করার কথা বলার পরদিন যদিও দেশের তিনটি আদালতে সেই ঘটনা আবার ঘটেছে। গত জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভূমিকা রাখার জন্য যে সেনাবাহিনীকে অভিনন্দিত করেছে, সেই বাহিনী কেন আজ অবজ্ঞার অভিযোগ তুলছে? সরকার থেকে সেনাবাহিনীকে দূরে সরিয়ে দেওয়া—একজন বিদেশি নাগরিককে এনে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বানানোর পেছনে কাদের ইন্ধন রয়েছে, তা অবশ্যই খোঁজা দরকার। সেনাবাহিনীর প্রধানের বক্তব্যের পর থেকে দেশে আবার ঐক্যের ডাকাডাকি চলছে। সমন্বয়করা ডাকছেন, জামায়াত ডাকছে-এনসিপি ডাকছে। গত ৯ মাসে কারা ঐক্য বরবাদ করেছে, কারা আন্দোলনের শক্তিকে কোণঠাসা করেছে, নানা ট্যাগ দিয়ে কলহ তৈরি করেছে। এমনকি ১৫ বছর বহু নির্যাতন ভোগ করা এবং সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখা বিএনপিকে টেম্পোস্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে? এসবের বিশ্লেষণও আছে। ঘাঁটাঘাঁটি করলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। মূত্রত্যাগের কথা তো উচ্চারণই হয়ে গেছে। বিএনপির প্রতি এনসিপিসহ কারও কারও অবজ্ঞা, দলটির ১৫ বছরের ত্যাগকে অস্বীকার করার প্রবণতায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই দলের নেতা শামসুজ্জামান দুদু বলে ফেলেছেন কথাটি। এ নিয়ে সমানে ট্রল চলছে। কত স্পিডে কত পরিমাণ মূত্রত্যাগ করলে সেই স্রোতে কেউ বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়বে— এমন টিপ্পনীও কাটা হচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে বিএনপি। দলের নেতাকর্মীরা একাধিকবার নির্যাতন, গ্রেপ্তার ও টার্গেট কিলিংয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এটাও সত্য, বিএনপির কিছু নেতা দিনে বিএনপি আর রাতে আওয়ামী লীগ করে আত্মরক্ষা খুঁজেছেন। জুলাই বিপ্লবের পর যথারীতি তারা ‘অতি বিপ্লবী’ সেজেছেন। সেখানে বহুমূত্র প্রসঙ্গ বেমানান। আবার ট্রলের যুগে এসে রাজনীতিতে এখন রম্য-বিনোদনও খাটে না। প্রতিপক্ষকে ভাসিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল ও পরিভাষা এখন রীতিমতো ভাইরাল। তবে নেতাদের মুখে পেশাবের উচ্চারণ কিন্তু আজই প্রথম নয়। শামসুজ্জামান দুদুর আদর্শিক নেতা শতাব্দীর মহিরুহ মওলানা ভাসানী এ ক্ষেত্রে অনন্য। ওই সময়ের আর্কাইভে দেখা যায় মওলানা ভাসানীর বক্তব্যে ‘মুত’ শব্দটির দেখা মেলে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর শাসক দল আওয়ামী লীগের তরুণ নেতারাও বয়োবৃদ্ধ জননেতা মওলানা ভাসানীর যাচ্ছেতাই সমালোচনা শুরু করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। মওলানার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে, তার মানসিক চিকিৎসা দরকার, অশীতিপর বুড়োর এখন রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া উচিত—এমন নানা মন্তব্য করে চটানোর চেষ্টা চলত। শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে পল্টনের এক জনসভায় মওলানা বলে বসেন, ‘মনি-রাজ্জাক-তোফায়েল জীবনে যত পেশাব করেছি তত পানিও তোরা খাস নাই।’ এ বক্তব্যের পর মওলানার ওই পেশাবের এমনই তেজ ও ট্রল ছড়ায়, যা কিছুদিন বাজারে চলেছে সমানে। মওলানা ভাসানীর মুখে তা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তরুণ তুর্কি নেতারা জনমের ধাক্কা খেয়ে লা-জওয়াব হয়ে যান। মওলানার বিরুদ্ধ-সমালোচনায় তালা পড়েছিল তাদের সবার মুখেই। মওলানার যুগ আর নেই। আর সবাই ভাসানীও নন। লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
হ-য-ব-র-ল সমাজব্যবস্থার দিন শেষ
হ-য-ব-র-ল সমাজব্যবস্থার দিন শেষ
সুমিষ্ট সুগন্ধ আর রঙের আভিজাত্যে অনন্য বিচিত্রা ফুলের ইংরেজি নাম টুডে-ইয়াসটারডে-টুমোরো। প্রকৃতির নির্দিষ্ট সময়ে রং পরিবর্তন করে, বিচিত্র ফুল বিচিত্রা। অন্যদিকে প্রকৃতির অংশ বিচিত্র মানুষ, বিচিত্র তার চিন্তাভাবনা। যেমন—বাংলাদেশে মানুষের বিচিত্র চিন্তাভাবনায় এখন হ-য-ব-র-ল বর্তমান সমাজব্যবস্থা, যা নিয়ে বুধসমাজে, ব্যক্তিগত মতাদর্শ দ্বারা কমবেশি নিয়ন্ত্রিত, জ্ঞানী-গুণীদের বিভিন্ন মিডিয়ায় চলছে আলোচনা। পাশাপাশি বিশ্বের ‘অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মঞ্চে’, সিস্টেম চিন্তাবিদদের বিতর্ক চলছে বাংলাদেশের দুরারোগ্য দুর্নীতি নিয়ে। বর্তমান সমাজব্যবস্থা নিয়ে জনগণের জ্ঞানীয় তথ্য ও আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে অনেক প্রশ্ন। যেমন, বর্তমান সমাজব্যবস্থা কী? কোন তন্ত্রবাদীর দর্শনে চলছে বর্তমান সমাজব্যবস্থা? কেন দ্রুত ওঠানামা করছে সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের ব্যারোমিটার? এই প্রশ্নগুলো সামনে রেখে আজকের নিবন্ধ। স্থানীয়, আঞ্চলিক, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আন্তঃবিভাগীয় বহুমাত্রিক বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের চিন্তাভাবনার জালে হৃদয় ও স্নায়ুতন্ত্রের কেন্দ্রীয় অঙ্গের বিক্রিয়ার ফলাফল বর্তমান সমাজব্যবস্থা। যার মধ্যে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতি আমাদের জীবনের প্রবহমান ধারায় এক অসাধারণ বলয়। এ বলয়ের অভাবে শৃঙ্খলিত জীবনযাপনের সরল পদ্ধতি অনুসরণ করা যায় না। দীর্ঘদিন শৃঙ্খলিত জীবনযাপনের অনুপস্থিতিতে পৃথিবীর যে কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষ ফিরে যেতে পারে মধ্যযুগে। যখন সমাজ থেকেও নেই; মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বসবাস করত, ক্যানিবালিজম প্রথার প্রচলন ছিল বিধায় দুর্বল গোত্রের ওপর শক্তিশালী গোত্র আক্রমণ বা অত্যাচার করলে, দুর্বল গোত্রকে রক্ষা করার জন্য কোনো আইনসম্মত ব্যবস্থা কাজ করত না। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যযুগীয় ক্যানিবালিজম প্রথা বাংলাদেশে ধারণ করেছে বিভিন্ন আঙ্গিকে, অনেকটা দুরারোগ্য দুর্নীতির মহামারিতে। তাই দুর্বৃত্ত-ধনিকদের দেখতে পাচ্ছেন গাড়িতে। ওরা ‘ব্ল্যাক ফ্লাই’ মাছির মতো বিষাক্ত। স্বার্থের দ্বন্দ্বে ওরা অন্যকে করে রক্তাক্ত। এমন দ্বন্দ্বের সমাজে দেখা দেয় মানুষের ‘নাটকীয় জীবনের পথচলা’। ষড়যন্ত্র তত্ত্বমতে, এ নাটকীয় জীবনের পথচলা সমাজে অদৃশ্য রাজত্ব করে ‘বিজ্ঞাপন’। হয়তো তাই, তবলার তারানা বাজানোর মতো দ্রুতগতিতে বিজ্ঞাপনের চাদরে ঢাকতে শুরু করেছে অনিন্দনীয় দেশের দৃষ্টিনন্দন সমাজব্যবস্থা প্রবর্তন, যা অনেকটা দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক বংগ জন হুর পরিচালনায় সত্য জীবনের ঘটনা অবলম্বনে অস্কারজয়ী ‘পরজীবী’ (প্যারাসাইট) মুভির মতো। পরজীবী মুভিতে অনেক অপ্রকাশ্য বার্তার মধ্যে একটি হলো—রৈখিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল পুঁজিবাদী সমাজ মধ্যযুগের ক্যানিবালিজম (রূপক অর্থে) প্রথার দিকে ধাবমান। এ ধরনের পুঁজিবাদী সমাজের কথা ভেবে অষ্টাদশ শতাব্দীতে খ্যাতিমান চিন্তাবিদরা বলেছিলেন, ‘সমকালীন সমাজ কাঠামো ব্যক্তির বিকাশের পথে অন্তরায়, যা মানুষকে মানুষের মুখোমুখি করে দেয়, তাকে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে বাধ্য করে।’ নৃতাত্ত্বিক যুগের বিজ্ঞানীদের মতে, সবুজবান্ধব সমাজ গঠন তথা সমকালীন সমাজ কাঠামো নিয়ে মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল, আছে কিংবা থাকবে। তাই, গত আশির দশকে বাংলাদেশি শিল্পী তপন চৌধুরীর গাওয়া ‘যেতে যেতে কেন পড়ে বাধা’ গানটি সমাজ জীবনে বেশি প্রাসঙ্গিক বললে ভুল হবে না। কারণ এ গানের কথার মতো—‘আমাদের দিন যায় রাত আসে, মাস যায় বছর আসে আর সুন্দর দেশের স্বপ্ন আমাদের চোখের মণিতে ভাসে’। হয়তো তাই, সুন্দর দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য গত বছর ৮ আগস্ট থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অনেক বক্তব্যে বলেছেন, ওপরে বর্ণিত সমাজের কথা, সাধারণ মানুষের কথা, বৈষম্যহীন দেশের কথা, চার কোটি গরিব জনপদের কথা, গণতন্ত্রের কথা এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নের কথা। যেমন—গত এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন ২০২৫-এর অনুষ্ঠানে উৎসাহব্যঞ্জক ভাষণে বাংলাদেশে ব্যবসা নিয়ে আসার জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, ‘বিশ্বকে বদলে দেওয়ার মতো অভিনব সব ধারণা রয়েছে বাংলাদেশের।’ ড. ইউনূসের বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলনের ভাষণ নিবিষ্ট মনে শ্রবণকারী দেশপ্রেমিক জনগণ জানতে চায়, উৎসাহব্যঞ্জক ভাষণের লক্ষ্য কোনটি? (ক) চীনের মতো অর্থনৈতিক হাব তৈরি করা, (খ) মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল ২০৩০-এর মাধ্যমে দেশের উন্নতি করা এবং (গ) বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অর্থনীতির কোন মডেল নিয়ে দেশে ব্যবসা করতে আসবেন: রৈখিক (linear) নাকি বৃত্ত (circular)? জনগণ আরও জানতে চায়, দেশে টেকসই অর্থনীতির নীতিনির্ধারক কারা? এ প্রশ্নের ব্যবচ্ছেদে দেখা যায় (i) রাজনৈতিক বলয়ে অর্থনীতির স্বরূপ অনুধাবন করা প্রয়োজন; (ii) গত বছরে পতিত সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে বানানো হয়েছিল সাক্ষীগোপাল; এ অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটুক তা জনগণ ও বুধসমাজের কেউই চান না এবং (iii) জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক সুদৃঢ় ও স্বচ্ছ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। হয়তো এ সম্পর্কের অভাবে বাংলাদেশের আশপাশে বলিষ্ঠ জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটলেও ঘটতে পারে। এজন্যই কি ড. ইউনূস বলেছেন, ‘এমন বিশ্বে আমরা বাস করি, প্রতিনিয়ত যুদ্ধের হুমকি আমাদের ঘিরে থাকে।’ কাজেই এ পরিস্থিতির মধ্যে প্রস্তুতি না নেওয়াটা ‘আত্মঘাতী’। এ বিবৃতির অর্থ দাঁড়ায়, দেশ এখন গভীর ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি। তাই দেশের জনগণ আতঙ্কিত। ওপরে বর্ণিত দেশের বিবৃতি শুনে আতঙ্কিত জনগণের উদ্দেশে দেশের বিচক্ষণ রাজনৈতিক ছত্রপতিদের মধ্যে বিপুল জনসমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘জাতীয়তাবাদী শক্তি ঐক্যবদ্ধ থাকলে কোনো ষড়যন্ত্র কাজে আসবে না।’ অন্যদিকে, সমাজচিন্তকদের মতে, ড. ইউনূসের বক্তব্যে সুস্পষ্ট বলিষ্ঠ (উগ্র) জাতীয়তাবাদের লক্ষণ প্রতীয়মান। উগ্র জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশে নতুন যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে। যেমন—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) জার্মান সেনাবাহিনীর বর্বর বৃক্ষটির মূলে পানি দিয়েছিল উগ্র জাতীয়তাবাদ। এ আলোচ্য বিষয়ের সূত্র ধরে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের মানুষ উগ্র জাতীয়তাবাদ নিয়ে যতটা চিন্তিত, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত বর্তমান সমাজব্যবস্থা তথা দেশের উন্নতি নিয়ে। কারণ ষড়যন্ত্র তত্ত্বমতে, বর্তমানে দেশে সংস্কারের নামে, রাজনীতির নামে, ভূরাজনীতির নামে, অর্থনীতির নামে, বৈদেশিক সাহায্যের নামে দেশের ভেতরে এক ধরনের ভীতিকর, এক ধরনের অস্থিতিশীলতা, এক ধরনের অরাজকতা, এক ধরনের অনিশ্চয়তা এবং এক ধরনের নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হতে চলেছে। অন্তনীল মনের প্রশ্ন, দেশে এ ধরনের অবস্থা তৈরি করার জন্য পৃষ্ঠপোষকতা করছে কারা? প্রিয় পাঠক, প্রশ্নের উত্তরটা পেতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যানিমেটর ও কার্টুনিস্ট Walter Crawford Kelly Jr. (১৯১৩-১৯৭৩)-এর তৈরি পোগো কার্টুনের বিখ্যাত একটি লাইনের মধ্যে। লাইনটি হলো—‘আমরা শত্রুর সঙ্গে দেখা করেছি এবং সে আমাদের।’ ওপরের অনুচ্ছেদে অদৃশ্য শক্তির পোগো কার্টুন পরোক্ষভাবে বলে দিয়েছে, বিজ্ঞাপনের রাজত্ব পরিচালনা গোষ্ঠী বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মুখটাকে ঢেকে, মুখোশটাকে জীবিত রাখার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ আমাদের সমাজে সাধারণ মানুষের সম্ভাবনা নিয়ে চলছে রাজনীতি ও কূটনীতি, যা বন্ধ করা অতীব জরুরি। নতুবা মেক্সিকোর টিলটেপেক গ্রামের (Tiltepec Village, where everyone turns blind) মতো আমাদের সমাজ হবে অন্ধ। তাই বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির ক্ষয়িষ্ণু সময়ে পচে না গিয়ে টিকে থাকা রাজনৈতিক ছত্রপতিরা বর্তমান সমাজ বা দেশ নিয়ে আলোচনার কথা বলতে চেয়েছেন এইভাবে, অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে, বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় সামুদ্রিক লাল অ্যালগি শৈবালের দ্বীপ দারুচিনিতে বসে আলোচনার বিষয় হতে পারে ‘পৃথিবীতে সুখ ও শান্তির মডেল বাংলাদেশ’। আলোচনার এখনই আদর্শ সময়। আমন্ত্রিত মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যদি তাদের অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে এখন তাদের আকাঙ্ক্ষাকে একবিন্দুতে মেলাতে পারা যায়, তাহলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই দেশের রাজনৈতিক ছত্রপতিদের আলোচনার পরিকল্পনা চূড়ান্তভাবে সফল হবে। ফলে দেশে বিজ্ঞাপনের রাজত্বের পরিবর্তে রাজ্য পরিচালনা করবে সুশৃঙ্খলভাবে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। হয়তো তখন থেকে (১) সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি আমাদের জীবনের প্রবহমান ধারায় এক অসাধারণ বলয়ের চাকা ঘুরবে; (২) দুর্বৃত্ত-ধনিকরা পলায়নের দিন গুনবে; (৩) সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের ব্যারোমিটার দ্রুত ওঠানামা করবে না; (৪) শুরু হবে সবুজবান্ধব সমাজ গড়া এবং (৫) বিচিত্রা ফুলের মতো সুমিষ্ট সুগন্ধে মারুত বহিবে বাংলার ঘরে ঘরে। প্রিয় পাঠক, দেশের ঠিক এমন অবস্থায় আপনার মুখের মিষ্টি হাসি আমাদের তথা বিশ্ববাসীকে বলে দেবে বর্তমান ‘হ-য-ব-র-ল সমাজব্যবস্থার দিন শেষ, সুখ ও শান্তির বাংলাদেশ’। লেখক: সমাজবিজ্ঞানী, টেকসই রিনিউবল এনার্জি ও সার্কুলার অর্থনীতি এক্সপার্ট
পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা
চারদিক / পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা
জাদুঘর সমাজের দর্পণ। জাদুঘর জাতির শিকড় সন্ধান করে। পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যত ঐতিহাসিক নিদর্শন জমা হচ্ছে, তারই প্রতিচ্ছবি হলো জাদুঘর। জাদুঘর মানেই হারিয়ে যাওয়া ব্যতিক্রমী অদ্ভুত জিনিসের সংগ্রহশালা। জাদুঘর জাতির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্যের বিশাল সংগ্রহভান্ডার। এ সমৃদ্ধ সংগ্রহের মাধ্যমে জাদুঘর জনগণের সঙ্গে সেতুবন্ধ তৈরি করে। জাদুঘর বলতে বোঝায় এমন একটি ভবন বা প্রতিষ্ঠান যেখানে পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহের সংগ্রহ সংরক্ষিত থাকে। জাদুঘরে বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বস্তুসমূহ সংগ্রহ করে সংরক্ষিত করা হয় এবং সেগুলো আঁধারের মধ্যে রেখে স্থায়ী অথবা অস্থায়ীভাবে জনসাধারণের সমক্ষে প্রদর্শন করা হয়। ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি বহন করে জাদুঘর। এখানে অদ্ভুত ও উদ্ভট সবকিছুর সংগ্রহ দেখা ও জানার কৌতূহল নিয়ে দর্শনার্থীদের আগমন ঘটে। মাউসিয়ন থেকে জাদুঘর। জাদুঘর শব্দটির উৎপত্তি ধ্রুপদি বা আভিজাত্যপূর্ণ। গ্রিক ভাষায়, মাউসিয়নের অর্থ মিউজদের আসন এবং এটি দার্শনিক প্রতিষ্ঠান বা চিন্তাভাবনার স্থানকে নির্দেশ করে। জাদুঘরে ইংরেজি মিউজিয়াম শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ থেকে। ২৮০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রথম জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর এই প্রথম জাদুঘরে ছিল নিদর্শন-সংগ্রহশালা ও লাইব্রেরি, ছিল উদ্ভিদউদ্যান ও উন্মুক্ত চিড়িয়াখানা। তবে এটা ছিল মূলত দর্শন চর্চাকেন্দ্র। পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যত ইতিহাস জমা হচ্ছে, তারই প্রতিচ্ছবি হলো জাদুঘর। জাদুঘরের ইংরেজি মিউজিয়াম শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ মিউজয়ন থেকে, যার অর্থ কাব্যাদির অধিষ্ঠাত্রী দেবীর মন্দির। বাংলায় জাদুঘর কথার অর্থ হলো, যে গৃহে অদ্ভুত অদ্ভুত পদার্থসমূহের সংগ্রহ আছে এবং যা দেখে মন্ত্রমুগ্ধ বা বশীভূত হতে হয়। তবে জাদুঘরে যে এক ধরনের মায়া আছে, তা অনস্বীকার্য। জাদুঘরের এ সত্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মায়া; রয়েছে বিস্ময়, যা দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হতে হয়। উপমহাদেশে জাদুঘরের ধারণাটি এসেছে ব্রিটিশদের মাধ্যমে। এ অঞ্চলের জাতিতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, ভূতাত্ত্বিক এবং প্রাণীবিষয়ক নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যাপারে উদ্যোগী হন ভারতীয় এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যরা। ১৮০৮ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির পৃষ্ঠপোষক লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে জমি দিয়ে জাদুঘরের জন্য ভবন নির্মাণ করেন। ১৮১৪ সালে উপমহাদেশের প্রথম জাদুঘর এশিয়াটিক সোসাইটি মিউজিয়ামের জন্ম ও প্রতিষ্ঠা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের মোট ১৮০টি দেশের ২৮ হাজার জাদুঘর যুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিশাল সংগ্রহভান্ডার। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি হাজার হাজার দর্শক জাদুঘর পরিদর্শন করে দেশের গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে জানতে পারছে। বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর হচ্ছে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। ১৯১০ সাল দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় শরৎকুমার রায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯১৩ সালে। বাংলাদেশে শতাধিক জাদুঘর আছে। তবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরই দেশের প্রধান জাদুঘর হিসেবে বিবেচিত। জাতীয় জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, আহসান মঞ্জিল জাদুঘর, বরেন্দ্র জাদুঘরসহ পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে আছে এসব জাদুঘর; যা ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষা, গবেষণা এবং বিনোদনের খোরাক মেটাচ্ছে বাঙালির। পৃথিবীর বিখ্যাত জাদুঘরগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের ল্যুভর মিউজিয়াম, প্যারিসে গিমে জাদুঘর, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে মাদাম তুসোর মোমের জাদুঘর, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, রোমান ক্যাথলিক চার্চের ভ্যাটিকান জাদুঘর, যুক্তরাষ্ট্রের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট, মিশরীয় ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম, স্পেনের মাদ্রিদে প্রাদো মিউজিয়াম, ইতালির উজিফি গ্যালারি ইত্যাদি। আর বিশ্বের সব থেকে ছোট জাদুঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ওয়ারলে মিউজিয়াম। এটি দেখতে একটি পুরোনো টেলিফোন বক্সের মতো। বিশ্বের বৃহত্তম জাদুঘর হলো প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর, যেখানে ৩৫ হাজারের বেশি শিল্পকর্ম রয়েছে। আমস্টারডামে যে জাদুঘাটি রয়েছে, সেটি দেখতে অনেকটা একজন মানুষের মতো। জাদুঘরগুলো আমাদের অতীতের জীবন্ত স্মৃতি এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০৩টি জাদুঘর রয়েছে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কিছু জাদুঘর—ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর, আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর, সোনারগাঁয়ে চারু ও কারুশিল্প জাদুঘর, বুড়িগঙ্গার তীরে আহসান মঞ্জিল জাদুঘর, ঢাকার পলাশীতে আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর, ঢাকার নিমতলা এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘর, ঢাকার বিজয় সরণিতে বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘর, ঢাকার রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাদুঘর, ঢাকা মিরপুরে বাংলাদেশ মুদ্রা জাদুঘর, ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বিজয় কেতন জাদুঘর, ঢাকার সোনারগাঁও শিল্পাচার্য জয়নুল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, রংপুর জাদুঘর, রংপুরের তাজহাট প্যালেস রংপুর জাদুঘর, লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্য জাদুঘর, খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর, ময়মনসিংহ জাদুঘর, জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা, রাঙ্গামাটিতে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক জাদুঘর, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর, সিলেটে ওসমানী জাদুঘর। তা ছাড়া বর্তমানে জেলা ও উপজেলা শহরে জাদুঘর গড়ে উঠেছে। জাদুঘরের নিদর্শনগুলো ইতিহাসের সাক্ষী। তবে সব জাদুঘরই পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের সংগ্রহশালা নয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা এমন ভিন্ন রকমের জাদুঘর রয়েছে। মেক্সিকোর ক্যারিবীয় সাগর উপকূলে জলতলের কানকুন জাদুঘর, রাশিয়ায় ভাঙা সম্পর্কের নিদর্শন জাদুঘর, ভারতের নয়াদিল্লিতে টয়লেট জাদুঘর, নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে বিড়ালদের জাদুঘর, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে গণিতের জাদুঘর। এমন অদ্ভুত ও উদ্ভট দারুণ মজার জাদুঘরের কিছু নিদর্শন দেখার সুযোগ পান দর্শনার্থীরা। প্রকাশ ঘোষ বিধান পাইকগাছা, খুলনা