ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনা-১ (বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বরগুনা জেলার প্রধান উপদেষ্টা মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ। ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতি, দলীয় সিদ্ধান্তে আমিরের প্রভাব, সংসদে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন, নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নে দলের অবস্থান, এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নসহ ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেছেন এশিয়া পোস্টের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ
এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনার দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৯ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। আপনি ছাড়া কেউ পাস করতে পারেনি। জনগণ আপনাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার কারণ কী?
মাহমুদুল হাসান: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৯ আসনে নির্বাচন করেছে। আপনার মনে থাকার কথা যে, আমরা ইসলামকে সামনে রেখে একটি সমঝোতা করেছিলাম। পরে সেই সমঝোতায় ইসলাম ও শরিয়া প্রশ্নকে আড়াল করে দেওয়া হয়। ফলে মনোনয়ন প্রত্যাহারের মাত্র কয়েক দিন আগে আমরা শরিয়া প্রশ্নকে সামনে রেখে একক নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিই। এতে দেশব্যাপী নির্বাচন করার পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাইনি।
সারা বিশ্বেই শরিয়াভিত্তিক রাজনীতি নানা অপশক্তির রোষানলের শিকার হয়। বাংলাদেশেও শরিয়াভিত্তিক রাজনীতিকে মেইনস্ট্রিমিং হতে না দেওয়ার নানারকম অপতৎপরতা ছিল। আমাদের ভোটের ফলাফলে এর প্রভাব ছিল। এর মধ্যেই বরগুনা-১ এ আল্লাহর রহমতে এবং জনগণের সমর্থনে আমরা বিজয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ।
এশিয়া পোস্ট: শোনা যায়, চরমোনাই পীরের একক সিদ্ধান্তে ইসলামী আন্দোলনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দলীয় বিপর্যয়ের পেছনে এক ব্যক্তির সিদ্ধান্তের কোনো প্রভাব রয়েছে কি না?
মাহমুদুল হাসান: প্রথম কথা হলো, আমরা এটাকে বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করছি না। বরং শরিয়াকে মুখ্য করে বহু অপশক্তির বিরুদ্ধে একক লড়াই করে টিকে থাকাকে সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছি। হ্যাঁ, আমাদের আরও উন্নতি করার সুযোগ আছে। সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। কেন্দ্রীয় কমিটি কাজ করছে।
দ্বিতীয় কথা হলো, ইসলামী আন্দোলন পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি সংগঠন। প্রতিটি সিদ্ধান্ত স্তরে স্তরে পরামর্শ করে নেওয়া হয়। সমঝোতায় যাওয়া এবং সেখান থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা, আমেলা, এমপি পদপ্রার্থী এবং দেশের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ করেই নেওয়া হয়েছে। ফলে আপনি যা শুনেছেন তা যথার্থ নয়। একক সিদ্ধান্তে ইসলামী আন্দোলনের কার্যক্রম পরিচালিত হয় না।
এশিয়া পোস্ট: সব বিষয়ে ইসলামি শরিয়াকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলে আপনার দল। দেশে শরিয়া আইন বাস্তবায়নে সংসদ সদস্য হিসেবে কী কী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছেন?
মাহমুদুল হাসান: শরিয়া হলো, একগুচ্ছ বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের আলোকে নির্মিত জীবনবোধ, প্রত্যহ জীবনের আচার-প্রথা, সংস্কৃতি, অভ্যাস, সমাজ কাঠামো, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আইন। শরিয়াকে এমন বিস্তৃত দৃষ্টিতে বিবেচনা করলে আপনি দেখবেন, আমরা মানে বাংলাদেশের মানুষ এর মধ্যেই শরিয়ার অধিকাংশ বিষয় মান্য করে। ফলে শরিয়াকে প্রাধান্য দেওয়ার মানে শুধুই আইন নয়। আইন শরিয়ার একটা অংশ।
সংসদ সদস্য হিসেবে আমার এখন নজর থাকবে, কোনো আইনেই যেন শরিয়া ও শরিয়ার উদ্দেশ্যবিরোধী কিছু না থাকে। বিষয়টা জটিল। যেমন ধরেন, সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় আলাদা করার যে অধ্যাদেশ সেখানে শরিয়া কমপ্লায়েন্স কী বা তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? এগুলো বিস্তারিত বলার জায়গা এটা নয়।
এশিয়া পোস্ট: সংসদে ইসলামী আন্দোলনের একমাত্র সদস্য আপনি। সংসদ অধিবেশনে আপনাকে সময় দেওয়া বা আপনার প্রস্তাবনা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন?
মাহমুদুল হাসান: না।
এশিয়া পোস্ট: আপনার দলের ইশতেহারে নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ আছে, আপনার দল নারীর ক্ষমতায়নে রক্ষণশীল। নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় আপনি কাজ করবেন কীভাবে?
মাহমুদুল হাসান: আমরা বারংবার বলেছি, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেই আদিষ্ট। এটা আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও বটে। তবে কথা হলো, নারীর ক্ষমতায়ন, মর্যাদা ও অধিকারের সংজ্ঞা কী হবে? এর সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করবে? আমরা বলি, আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐহিত্য ও বোধ-বিশ্বাসের আলোকে এর সংজ্ঞা নির্ধারণ হবে। এই মূলনীতি মানলে আপনি দেখবেন, আমরাই নারীর স্বার্থরক্ষায় বেশি অগ্রগামী।
এশিয়া পোস্ট: আপনার এলাকার নারীর চাকরি ও কর্মসংস্থান নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
মাহমুদুল হাসান: নারীদের চাকরি ও কর্মসংস্থানের ব্যাপারে সরকারি আইন অনুযায়ী যেসব সুযোগ-সুবিধা আছে, সেগুলো যেন আমার এলাকার নারীরা পায়, সে জন্য সর্বোচ্চ কাজ করব। আমার পক্ষ থেকেও সর্বোচ্চ সহযোগিতা থাকবে, যাতে নারীরা নিরাপদে ধর্মীয় নীতি অনুযায়ী কাজ করে স্বাবলম্বী হতে পারে।
এশিয়া পোস্ট: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, আপনার এলাকার একজন নারী কর্মকর্তার কাছ থেকে ক্রেস্ট নেওয়ায় আপনার দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একজন আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।
মাহমুদুল হাসান: শরিয়া ও ইসলামের নির্দেশনা সবার জন্যই সমান। ইসলাম যা হারাম করেছে, তা সবার জন্যই হারাম। আমার জন্যও। ফলে আমাদের মুহতারাম নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম, শায়েখে চরমোনাইর কথা যথার্থ বলেই আমি মনে করি।
এশিয়া পোস্ট: আপনার এলাকার অর্থনীতির অন্যতম উৎস কৃষিকাজ ও মাছ ধরা। কৃষক ও জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে আপনি কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
মাহমুদুল হাসান: আমার এলাকার অর্থনীতি উন্নয়নে কৃষক ও জেলেরা বড় ভূমিকা পালন করছেন। কৃষক ও জেলেদের পাশে আছি। তাদের চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সহযোগী হব। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে তাদের জন্য যথাযথ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে কাজ করছি।
ব্যক্তিগতভাবে তাদের নিয়ে স্বপ্ন ও পদক্ষেপ আছে আমার। তাদের জীবনমান উন্নয়নে আমি সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করব ইনশাআল্লাহ। তাদের বিষয়ে আমার কাজ চলমান রয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: আপনার এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নের অবস্থা বেশ নাজুক। প্রায় সড়ক ভাঙাচুরা। এর মধ্যে নদীভাঙনও অন্যতম সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধানে আপনার পরিকল্পা কী?
মাহমুদুল হাসান: অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সড়ক পুনর্নির্মাণ ও নদীভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধের জন্য ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট সরকারি সব দপ্তরে যোগাযোগ হয়েছে। শীঘ্রই এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কাজ শুরু হবে ইনশাআল্লাহ।
এশিয়া পোস্ট: বরগুনা-১ আসনে যোগাযোগ ব্যবস্থার অবনতির কারণে কৃষিজাত পণ্য ও মাছ বাজারে পৌঁছাতে দেরি হয়। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন জেলে ও কৃষক। মুখ থুবড়ে পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতি। গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নে কোনো কর্মসূচি আছে আপনার?
মাহমুদুল হাসান: যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি জন্য বরগুনা-বাকেরগঞ্জ সড়ক এবং পায়রা নদীতে সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে চেষ্টা অব্যাহত আছে।
এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মাহমুদুল হাসান: আপনাকেও ধন্যবাদ।



