ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

সাক্ষাৎকারে মোস্তফা ফিরোজ

ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ আইন বুমেরাং হবে

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার

  ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২২:০৭
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজ। সমসাময়িক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে টেলিভিশন টকশোর সুপরিচিত মুখ। জনপ্রিয় বাংলা নিউজ অ্যানালাইসিস প্ল্যাটফর্ম ‘ভয়েস বাংলা’র সম্পাদক তিনি। এর আগে, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলা ভিশনের বার্তাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ সময়। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-ডিআরইউর এই প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক লেখাপড়া সম্পন্ন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে। এশিয়া পোস্টের আলাপনে মোস্তফা ফিরোজ কথা বলেছেন দেশের সমসাময়িক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক উত্তরণের যাত্রায় গণমাধ্যমে দায়িত্বশীলতা, সরকারি দলের ফ্যাংশন এবং বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবিদ আজম

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

এশিয়া পোস্ট: আপনার বেড়ে ওঠার গল্পটা জানতে চাই। খ্যাতিমান সাংবাদিক হয়ে ওঠার যাত্রায় চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা মেকাবিলা করতে হয়েছে কি না?

মোস্তফা ফিরোজ: আমি খুব খ্যাতিমান হিসেবে গড়ে উঠিনি। সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে, সাধারণ সাংবাদিক হিসেবে গড়ে উঠছি। তবে আমার এই গড়ে ওঠার পেছনে রাজনৈতিক উত্থান-পতন দেখেছি। কলেজ জীবন পার হয়ে যখন নাকি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আমরা পা দিলাম, তখন আমরা এরশাদের স্বৈরশাসনের মুখে পড়লাম। শিক্ষাজীবনের পুরো সময়টাই এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে লেখাপড়া চালিয়ে গেছি। লেখাপড়ার শেষ প্রান্তে এসে সাংবাদিকতায় ঢুকেছি।

আমি নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র। সুতরাং সাংবাদিকতার প্রতি আমার একটা নেশা ছিল। আমরা নব্বইয়ে খুব কাছ থেকে এই সেলিম দেলোয়ার ও রাউফুন বসুনিয়ার মৃত্যু দেখেছি। এগুলো দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। পরে দেখলাম আমার পক্ষে কোনো সরকারি চাকরি করা সম্ভব না। খেয়াল করলাম, সাংবাদিকতাটা অনেক বেশি রাজনীতিনির্ভর।

মানুষের জন্য কিছু করা যায় এমন একটা পেশা সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা বিভাগে পড়তে পড়তেই দেখলাম, আমাদের ডিপার্টমেন্টের অধিকাংশ সহপাঠী সরকারি চাকরিতে গেলেন। আমি কিন্তু চলে গেলাম পত্রিকায়, আমার সর্বশেষ পত্রিকা ছিল ভোরের কাগজ। সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রথম টেরিস্টেরিয়াল- স্যাটেলাইট চ্যানেল একুশে টিভিতে গেলাম।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এটা বন্ধ হয়ে গেল ২০০১ সালে। এরপর এনটিভিতে যাওয়ার পর একটা দুর্ঘটনায় আগুন লাগল। এরপরে মনটা ভেঙে গেল। তারপরে বাংলাভিশনে গিয়ে টানা ১২ বছর কাজ করলাম। সে সময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে কথা বলতে বলতে আমি ফ্যাসিবাদের শিকার হলাম। এরপর করোনার সময়ে ডিজিএফআইয়ের চাপে বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষ আমাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠাল।

তখন প্রতি মুহূর্তে একটা গ্রেপ্তার আতঙ্কে থাকতাম। মিডিয়াতে হয়ে গেলাম একপ্রকার নিষিদ্ধ। টেলিভিশন, পত্রিকা ও অনলাইনসহ কোনো চাকরিতে আমি প্রবেশ করতে পারতাম না। কোনো টেলিভিশন টকশোতে ডাকত না। মানে এমন একটা পরিস্থিতি যে, ‘তুমি দেশ থেকে চলে যাও।’

করোনা পরিস্থিতি যখন তখন আমি চিন্তা করলাম, না এভাবে চুপ থাকা যায় না আমি তখন ‘ভয়েস বাংলা’ শুরু করলাম। আল্লাহর রহমতে খুব দ্রুত বেগে, মানে ছয় মাসের মধ্যেই দেখলাম, লাখ লাখ মানুষ এটি দেখছে, আলোচনা করছে। কিন্তু আমি সতর্ক ছিলাম বরাবরই সাংবাদিকতার বাইরে যাব না। সাংবাদিকদের জীবনটা লড়াই সংগ্রামের, এটা কখনও গোলাপ বিছানো কোনো রাস্তা হবে না। শোয়ার পালঙ্ক হবে না।

অল্পদিনের মধ্যে দেখলাম ‘ভয়েস বাংলা’ অফিসে গোয়েন্দা সংস্থার এত বেশি যাতায়াত, তখন কেউ কেউ বলল প্যানেলসহ কিন্তু উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন করোনা পরিস্থিতি একটু শিথিল হয়ে গেল, আমি তখন চলে গেলাম দেশের বাইরে। কিছুদিন দুবাইতে থাকলাম। দেখলাম, দুবাই খুব এক্সপেনসিভ, সম্ভব না। আর বাংলাদেশের এম্বাসি যদি রিপোর্ট করে আমাকে অ্যারেস্ট করে ফেলবে। তারপর সেখান থেকে চলে গেলাম মালয়েশিয়ায়। সেখানে কিছুদিনের মধ্যেই এম্বাসির নজরদারির মধ্যে পড়ে গেলাম। আমাকে ধাওয়া করা শুরু করল একধরনের। তারপরে আমি চলে আসলাম ব্যাংককের। সেখান থেকে দেশে মাঝেমধ্যে আসতাম দুই বা তিনবার। কিন্তু অধিকাংশ সময় ব্যাংকক থেকে বেশ দূরে একটু রিমোট এরিয়ায়। তারপর যেদিন হাসিনা সরকারের পতন ঘটল, আমি ৬ আগস্ট দেশে ফিরলাম।

এশিয়া পোস্ট: মাল্টিমিডিয়াকেন্দ্রিক ডিজিটাল বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে মূলধারার গণমাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো অপতথ্য বা গুজব দমনের এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সক্ষমতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মোস্তফা কামাল: গত এক দেড় বছরে অনেক ভালো ভালো প্রতিষ্ঠান, এই যে এশিয়া পোস্ট, দি পোস্ট, চর্চা ও আলাপসহ অনেক সুন্দর সুন্দর আধুনিক অনলাইন গণমাধ্যম আমার নজরে এসেছে। আমি নিয়মিত এগুলো ফলো করি। আমি মনে করি যে আমার প্ল্যাটফর্মের থেকে অনেক শক্তিশালী, দায়িত্বশীল এবং প্রতিশ্রুতিশীল নিয়ে তাদের বিকাশ ঘটেছে। এই বিকাশের পেছনে ইনডিভিজুয়ালি যারা উদ্যোক্তা তাদের কিন্তু অবদান খুব বেশি। এখানে সরকারের কোনো সাপোর্ট নেই। এখানে সাংবাদিক সংগঠনের কোনো সাপোর্ট নেই।

সাংবাদিকতা করতে গেলে তার একটা সেল প্রটেকশন দরকার, সাংবাদিকদের মধ্যে একটা ইউনিটি দরকার। এখন হয়তো মনে হতে পারে গণমাধ্যমের খুবই সুসময় যাচ্ছে, অনেক উদার তারেক রহমানের সরকার। সামনে ছয় মাস বা এক-দেড় বছর পর এটা কোন রূপ নেবে আমরা জানি না। আর সবকিছু তারেক রহমান নিজে কন্ট্রোল করতে পারবেন না। সরকারের চরিত্র পরিবর্তন হতে থাকে। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক প্রশাসনিক এই শক্তিগুলো এরা খুব নিষ্ঠুর এবং তারা আধিপত্য, দখলদারত্ব সুবিধার পেছনে ছোটে। ফলে সামনে যারা থাকে তারা অনেক সময় পুতুল হয়ে যায়।

মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলো বুঝতে পারছে, যে অর্থনৈতিক ক্রাইসিসের কারণে তাদের বাজারটা সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে সবাই ফেসবুক-গুগলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছে। তাদেরও কন্টেন্টগুলো এখানে স্থান পাচ্ছে। ফলে যত বেশি এই কন্টেন্টগুলো আসছে, ততবেশি কিন্তু গুজব আস্তে কমে সরে যাচ্ছে। কিন্তু এই সোশ্যাল মিডিয়ার অপরিহার্যতা আমাদের অনেকেই কিন্তু একসময় অনুভব করেনি। অনেকেই এটা নাক শিটকাতো। আর এটা কী? বলত এটা কোনো মেইন স্ট্রিম না। এটা হলো সেকেন্ড ক্যাটাগরি। মানে এটা নমঃশূদ্রদের একটা জায়গা।

এইভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। কিন্তু দেশ-বিদেশে ডিজিটাল মিডিয়ার ব্যাপক প্রভাব থাকার কারণে এখন কেউ একে আর অস্বীকার কারতে পারছে না। টেলিভিশনের থেকে এই অডিয়েন্সটা বিশাল ব্যাপার। এটাকে তো আমাদের কাজে লাগাতে হবে। পাঁচ-ছয়টা টেলিভিশন ছাড়া অন্য টেলিভিশনগুলো বেতন-ভাতা নিয়মিত দিতে পারে না।

এশিয়া পোস্ট: দেশীয় গণমাধ্যমের ব্যাপারে বড় একটি অভিযোগ, মিডিয়াগুলো সবসময় ক্ষমতার তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদকে বৈধতা উৎপাদনে গণমাধ্যমের ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। তাহলে মিডিয়াগুলো মালিকের ব্যবসায়িক-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের প্রচারযন্ত্র হয়ে থাকছে, নাকি সমাজের দর্পন হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারছে?

মোস্তফা ফিরোজ: গণমাধ্যম মালিকপক্ষের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার হয়েছে, কারণ ওইভাবেই মিডিয়াগুলোকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এতগুলো যে মেইনস্ট্রিম মিডিয়া আছে, কয়জন পেশাদার সাংবাদিকের হাতে আছে? ম্যাক্সিমাম কিন্তু ব্যবসায়িক গ্রুপ, প্রত্যেকেই টেলিভিশন পত্রিকার অনুমোদন নিয়েছে। তার গ্রুপকে সে প্রটেকশন দিয়েছে, তার অনেক অন্যায়, অনেক অনিয়ম, ভূমিদস্যু বা ব্যাংক খেলাপি ঋণের দস্যুতা, সব কিন্তু এই টেলিভিশন বা মিডিয়াকে দিয়ে প্রটেকশন দিয়েছে এবং সেই টেলিভিশনগুলোর প্রধান নির্বাহী বা প্রধান সম্পাদককে তাকে খোঁজা হতো যার সঙ্গে সরকারের ভালো সম্পর্ক আছে কি না, সে তার মালিকের পক্ষে তদবির করতে পারবে কি না। এইভাবে টোটাল সাংবাদিক সমাজকে ব্যবহার করা হয়েছে। পেশাদারত্ব মানে জায়গাটা এখানে আমি বলব, ১০-২০ শতাংশ। বাকি ৮০ ভাগেই হচ্ছে অপসাংবাদিকতা। ব্যবসায়িক কাজে মালিকরা তার রাজনৈতিক স্বার্থে এগুলোকে ব্যবহার করছে। সুতরাং সোশ্যাল মিডিয়াকে ঘিরে যে প্ল্যাটফর্মগুলো এগুলো স্বাধীন, মুক্ত। এগুলোর সম্ভাবনা অনেক বেশি।

এশিয়া পোস্ট: বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকেন্দ্রিক যে সংঘাত-সংকট অব্যাহত আছে, আমেরিকা-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বলা হলেও তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ যথেষ্ট কি না?

মোস্তফা ফিরোজ: আমাদের তো প্রশাসনিক ব্যর্থতা আছে। কিন্তু এই সংকটে আপনি সরাসরি সরকারকে দোষ দিতে পারবেন না। কারণ যখন প্রতিনিয়ত যে জ্বালানির তেলটা সরবরাহ হয় মার্কেটে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পেট্রোল পাম্প থেকে শুরু করে, একজন তৃণমূলের একজন ছোট্ট গ্রাহক প্রত্যেকে স্টোর করার চেষ্টা করছে। বেপরোয়া ভাবে সবাই যে যার মতো মজুত করছে যার কারণে একটা সংকট তৈরি হয়ে গেছে। এই সংকটের চক্রটা ভাঙতে কিন্তু আপনার যথেষ্ট সময় লাগবে।

কালকে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাক আপনি পরশুদিন মনে করবেন তেলের সংকট নেই। কিন্তু আপনি দেখবেন যে সেম অবস্থা। হয়তো সংকটটা কমে আসবে। কিন্তু এই একটা লম্বা সময় সংকটের মধ্যে আমরা পড়ে গেলাম। কিন্তু পদক্ষেপটা কী নিচ্ছে যে এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপটা যতটুকু হওয়া দরকার ততটুকু হয়তো হতে পারছে না। ওই যে মজুতদারি এবং এই যে সমবণ্টন এই জায়গার এই ম্যানেজমেন্টটা তো আমরা এই ধরনের ক্রাইসিস মোকাবিলা করতে তো আমরা অভ্যস্ত না। আগে তো এই ধরনের সংকটটা হয়নি। ফলে এই কারণে সরকার হিমশিম খাচ্ছে, চেষ্টা করছে। কিন্তু ওই যে আমাদের প্রতিটা সমাজের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে এত বেশি করাপশন, তার সঙ্গে পেরে ওঠা যাচ্ছে না।

আমি বাংলাদেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে ঘুরেছি। কোথাও এমন ক্রাইসিস দেখিনি। আপনি বলতে পারেন, সিঙ্গাপুর তো উন্নত দেশ সেখানে তো ক্রাইসিস হবে কী করে? ব্যাংকক বা থাইল্যান্ডও অনেক উন্নত দেশ। কিন্তু নেপালে আমি তিন দিন ছিলাম। আমি সেখানে কোনো তাড়াহুড়ো দেখি নাই। এজ ইট ইজ নরমান। তাহলে কি নেপাল কি এই ক্রাইসিস মোকাবিলা করার জন্য ১০ গুণ জ্বালানি তেল সেখানে নিয়ে আসছে? তা তো না। সেই ক্ষমতাও তো নেপালের এখন নাই। সেখানে নতুন সরকার। মানে আমাদের দেশের পরিস্থিতিটা অদ্ভুত। এ রকম পরিস্থিতি আর কয়টা দেশে আছে এটা একটা গবেষণার বিষয়।

এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দু’রকম মতামত চাউর আছে। কেউ কেউ মনে করেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। নিখুঁত ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে বলে অভিমত অনেকের। কিছু অনিয়মের খবরও গণমাধ্যমে আমরা দেখেছি। নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

মোস্তফা ফিরোজ: এটা মিক্সড। একদম বলা যাবে না যে, একদম খাঁটি নির্বাচন হয়েছে। আবার এটা বলা যাবে না একদম জালজালিয়াতি নির্বাচন হয়েছে। এটা একটু মিশেল একটা অবস্থা। তবে দেখেন, বাংলাদেশে তো বাস্তবতাটা আপনি যদি দেখেন, যে বাস্তবতাটা হলো এই বাংলাদেশের প্রধান দুটি দলের মধ্যে একটি দল নেই। আওয়ামী লীগ নেই। বিএনপির বিশাল ভোট ব্যাংক ঐতিহ্যগতভাবে। হাসিনা পতনের পর ১৮ মাসে মানে যেটা হয়েছে বিএনপি ক্ষতি হইছে, সেই ক্ষতিটা তাদের যথেষ্ট পরিমাণ একটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলছিল।

কিন্তু ওই ঝুঁকিটা পূরণ করার জন্য জামায়াত যেভাবে এগিয়ে এসেছিল শেষের দিকে। কিন্তু তাদের কিছু উগ্রবাদী কথাবার্তা এবং এনসিপির হঠাৎ করে জামায়াতের দিকে চলে যাওয়াটা পুরো জিনিসটা আবার সেই পুরোনো সনাতন জায়গায় চলে গেল। যেখানে জামায়াত ছিল সবসময় সহযোগী বিএনপির, তার আম্ব্রেলার নিচে সে নির্বাচন করত, এখন সে হয়ে গেল প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার পরে আজকে তার যে উত্থান ঘটল। এটাও কিন্তু কম না। এটা হইছে বিএনপির মতো রাজনৈতিক দলের ব্যর্থতার কারণে। কারণ এরশাদ ও হাসিনা পতনের পর যেই রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্নীতি, করাপশন, চাঁদাবাজি, মাস্তানি, দখলদারত্ব এই জায়গাগুলোতে দ্রুতবেগে পূরণ করার চেষ্টা করছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। ফলে এই বদনামটাকে ক্যাপিটাল করছে জামায়াত।

আমি মনে করি এই নির্বাচনে বিএনপির যতটা ভালো করার কথা, প্রকৃত নির্বাচন দিয়ে সেটা কিন্তু হয়নি। এবং সেই সঙ্গে ওই যে ম্যানিপুলেশনের কথা আসছে, আসছে কেন? প্রশাসন তো সবসময় মনে করে, ক্ষমতায় কে এলে তার জন্য সুবিধা হবে। হিসাব-নিকাশ করে দেখছে যে বিএনপি এলে ভালো হবে, বিএনপি বড় দল বিএনপি রিপ্রেজেন্ট করতে পারবে বিএনপি কট্টরপন্থি না সুতরাং তাদের একটা মৌন সমর্থন, মানসিক সমর্থন তা ছিল বিএনপির দিকে। হয়তো সেটাকে ক্যাপিটাল করতে পারছে বিএনপি।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ডিপস্টেটর ক্ষমতা’ বলে একটা কথা চাউর আছে। জনরায় যেমন থাকুক প্রভাবশালী সেই শক্তির মর্জি মতো ক্ষমতার পালাবদল ঘটে থাকে বলে ধারণা প্রচলিত আছে। এই কথার ভিত্তি কতটুকু?

মোস্তফা ফিরোজ: বাংলাদেশে ‘ডিপিস্টেট’ কাল্পনিক একটা বিষয়। কিন্তু এটার আবার এটার একটা বাস্তবতাও আছে। ওয়ান ইলেভেন যে সংঘটিত হলো এটা তো ওদের করা। ডিপিস্টেট কারা? এক-এগারের সিদ্ধান্ত নিল আমেরিকা এবং ইন্ডিয়ান সেনা সেনাবাহিনী। তাই না? এটাই তো ডিপস্টেট। সেই ডিপস্টেটটা কি শেষ হয়ে গেছে? এই ইউনূস সরকারের সময় কি তার ছিল না? এখানে কি সেনাবাহিনীর কোনো ক্ষমতা ছিল না? এখানে কি আমলাতন্ত্র, তার পরে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের কি ক্ষমতা ছিল না? ছিল। এখন অনেকে মনে করে যে তারা হয়তো সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে কে ক্ষমতায় আসবে কে ক্ষমতায় আসবে না। এ জন্য অনেকে বলে তারেক রহমান অনেকটা নির্ভার ছিলেন যে তিনি ক্ষমতায় আসবেনই।

মানে এমন একটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে দেশে নিয়ে আসা হয়েছে, এটা প্রমাণ করার তো কোনো উপায় নেই। কারণ, বিএনপি যেহেতু বড় রাজনৈতিক দল, আওয়ামী লীগ নাই। সুতরাং স্বাভাবিকভাবে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। ১৫ বছর দলটির যে ত্যাগ-তিতিক্ষা আন্দোলন সবকিছু তো বিএনপির নেতৃত্বেই হয়েছে। মাঝখানে শুধু গণঅভ্যুত্থান তার নেতৃত্বে হয়নি। কিন্তু তাই বলে যখন নাকি আবার ওই গণঅভ্যুত্থানের শক্তিটা পেছনে চলে গেল তখন তো আবার সামনে চলে এলো প্রচলিত রাজনৈতিক দল। ফলে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তো বিএনপি প্রধান। একটা সুশীল সমাজ, সামরিক শক্তি, পশ্চিমা শক্তি তাদের কিন্তু একটা পাওয়ার থাকে এই ডিপস্টেটের কারণে।

পাকিস্তানের ইমরান খান প্রধানমন্ত্রীর পদ হারাইয়া ক্ষমতাশূন্য হয়েছে। যেসব দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক কাঠামোগুলো শক্তিশালী থাকে না সেখানে ডিপস্টেটের প্রভাবটা থাকে বেশি। কারণ এখানে বিচারব্যবস্থা নড়বড়ে। যে কোনো কমিশন প্রশাসন সবকিছু থাকে খুবই নড়বড়ে অবস্থায় তখন সেনাবাহিনী যেহেতু একটা প্রতিষ্ঠান তার একটা ক্ষমতা থাকে পুলিশ প্রশাসন এবং পশ্চিমা শক্তি তখন তারা এই ক্ষমতার পালা বদলে ক্ষমতা কে আসবে না আসবে এগুলোর ব্যাপারে তারা কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রভাবে ক্ষমতা যে উল্টে গেছে বা তারা যেভাবে চাইছে তাই হইছে এইটা বলাটা বললে তাহলে আমাদের এই নির্বাচনটা প্রশ্নবিদ্ধ হবে চরমভাবে। আমি প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাই না, কিন্তু নির্বাচনটা যে একেবারে খুবই মানে ফেয়ার হইছে শতভাগ, এটাও বলব না। কিছু কিছু ফলাফল তো অস্বাভাবিক। যেমন নাহিদ ইসলাম, তার জয়টা এটা খুব বিস্ময়কর লাগে। আবার হাসনাত আব্দুল্লাহ জয়টা সঠিক মনে হয়। এ রকম অনেকগুলো হিসাব-নিকাশ আছে, সেই হিসাব-নিকাশে একটা সন্দেহের অবকাশ আছে। তো এটা হয় কেন? ওই যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনি সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থাটা কার্যকর না করতে পারবেন। নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে পালাবদলের এই যদি ধারাবাহিকতা না থাকে, তখন কিন্তু এই ডিপস্টেট মানে আপনার রাজনীতিতে ঘাঁটি গেড়ে বসবে।

এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো সরকার ছিল না। একটি জাতীয় দৈনিক অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘অবৈধ’ বলে উল্লেখ করেছে। তাহলে সেই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন বৈধ হবে কি না?

মোস্তফা ফিরোজ: গণঅভ্যুত্থান তো গণঅভ্যুত্থানই। এটা কোনো সংবিধান-আইন কোনো কিছু মেনে হয় না। গণঅভ্যুত্থানের শক্তি যখন ডিসিশন নেবে সেটা কিন্তু আইন, সেটাই কিন্তু সংবিধান। পৃথিবীর দেশে দেশে তাই হয়। প্রেসিডেন্ট যেহেতু সর্বময় রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তি তিনি সুপ্রিম কোর্টের কাছে মতামত রেফারেন্স চাইলেন সুপ্রিম কোর্ট ১০৬ এর আলোকে একটা রেফারেন্স দিয়ে বলল, যে হ্যাঁ এ রকম পরিস্থিতিতে এ রকম সরকার গঠন করা যায়। এতে আমার মনে হয় না যে সংবিধানের মৌলিক কোনো ঘাটতি হয় বা ব্যত্যয় ঘটছে। সুতরাং এটাকে অবৈধ বলা যাবে না। পৃথিবীর যে কোনো দেশে গণভোট বিপ্লব সংবিধান আইন মেনে হয় না, এটা মাথায় রাখা দরকার।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাহাত্তরের সংবিধানের ভিত্তিতে আমরা চলছি তাই না? তার মানে তাহলে কি স্বাধীনতা যুদ্ধটা কি অসাংবিধানিক? স্বাধীনতাটাই কি অবৈধ, সেটা কি কেউ বলে। স্বাধীনতার পরে যে অস্থায়ী সরকার সেই সরকারের ভিত্তি কী? মুজিবনগর সরকারের ভিত্তি কী, প্রশ্ন তুললে তোলা যায়। যুদ্ধ এবং বিপ্লব অভ্যুত্থান এগুলো কোনো সংবিধান আইনের মানে দ্বারা পরিচালিত হয় না। এগুলোর একটা নিজস্ব শক্তি আছে। জনগণই এর আসল শক্তি। তারা যদি অধিকাংশ জনগণ একটা যুদ্ধ সংগঠিত করে অধিকাংশ জনগণ যদি একটি বিপ্লব একটা অভ্যুত্থান সংগঠিত করে, সেটাই হচ্ছে মূল চেতনা ও ম্যান্ডেট। সেই চেতনার আলোকে পরবর্তীতে আইনকানুন হয় এবং সরকার গঠিত হয়।

সুতরাং এখানে কোনোভাবেই বলার অবকাশ নেই যে এখন এই পর্যায়ে এসে, তাহলে কি আমাদের সরকার অবৈধ? সরকার অবৈধ মানে নির্বাচন অবৈধ। সারা বিশ্বে যেভাবে অভ্যুত্থান বিপ্লবের পর যা হয় বাংলাদেশে সেটি হইছে। ফলে ইউনূস সরকারকে অবৈধ বলার কোনো সুযোগ নেই। সমলোচনা মানে এই না যে ইউনূস সরকার অবৈধ।

এশিয়া পোস্ট: আপনি একটি বক্তব্যে বলেছেন, ইউনূস সরকারের ১৮ মাস শেখ হাসিনার ১৫ বছরের বিভীষিকার চেয়েও বড় বিভীষিকা ছিল। কেন এমনটি মনে হয়েছে?

মোস্তফা ফিরোজ: ড. মোহাম্মদ ইউনূসের মতো লোক যখন এ রকম ক্রাইসিস পিরিয়ডে সবচেয়ে একটা উপযুক্ত লোককে সবাই তাকে মনোনীত করছে এবং ছাত্রদের এই সিলেকশনটা ভালো ছিল এবং কেউ কোনো আপত্তি করেনি।

তো কিন্তু উনি আশাভঙ্গ করেছেন। উনি যেভাবে লম্বা পিরিয়ড সামনে নিয়ে আসছে সংস্কারের নাম করে এবং এর মধ্যে দিয়ে বেশ কিছু ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে, অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। এর মধ্যে সাংবাদিকরা অ্যারেস্ট হয়েছে, মানে জুলাই গণভোটের নামে প্রচুর মিথ্যা মামলায় শত শত মানুষকে মামলা আসামি করা হয়েছে এবং তারা বিনা বিচারে এখন পর্যন্ত আছে। এখানে পরিষ্কার যে মানে জুলাই হত্যাকাণ্ডে ১৪০০ মানুষ মানুষ মারা গেছে। ১৫ বছরের যে প্রতিহিংসার চর্চা হয়েছে, তার চেয়ে একটা ভয়াল পরিস্থিতি তৈরি করেছেন ড. মোহাম্মদ ইউনূস। গোপন বাণিজ্য চুক্তি , চট্টগ্রাম বন্দর চুক্তির মাধ্যমেও উইনুস সরকার বিতর্কিত হয়েছে। গত ১৮ মাসে আবার যেভাবে মব হয়েছে, শতাধিক মাজার ভাঙচুর হয়েছে। তারপরে তৌহিদি জনতার নাম করে বিভিন্ন জায়গায় মব তৈরি করে প্রায় ৩০০ মানুষকে মারা হয়েছে। সব মিলিয়ে এটা একটা ভয়ংকর পরিস্থিতি এবং যারা আমরা হাসিনার সমালোচনা করে ভিকটিম হয়েছি, তারাতো নিরাপদ থাকার কথা।

শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে একটা উগ্রবাদী শক্তির উত্থান ঘটল যেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ৩২ নম্বর দফায় দফায় ভাঙতে চাওয়ার মানে কী? এই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে ৩২ নম্বরের সম্পর্কটা কী? গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যদি সম্পর্ক হয় সেটা সুধাসদন বা গণভবন হইতে পারে। আপনি ৩২ নম্বরকে টার্গেট করলেন কেন? করলেন এই কারণে যে এই ব্যক্তিটা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান পুরুষ, প্রধান নেতা, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি এই সুযোগ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাসভবনে বারবার হানা দিয়ে ইতিহাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। তারপর বলা হলো ৭২-এর সংবিধানকে ছুড়ে ফেলতে হবে, উড়িয়ে দিতে হবে। এটাকে রিসেট বাটন টিপ দিতে হবে। এই কথাগুলো আসা মানে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ ভুলে যাওয়া।

এই গণঅভ্যুত্থান থেকে ইতিহাস শুরু করার প্রয়াস ছিল। তার মানে বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক শক্তি আছে, যারা আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করতে চায় না, সেটা ইতিহাসে পুনর্জীবিত থাকুক সেটা চায় না। এই প্রবণতাগুলো ড. ইউনূস অনুধাবন করতে পারেননি অথবা করলেও তিনি নিশ্চুপ থেকেছেন।

এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার। বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে নতুন কোনো রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবার আশঙ্কা আছে কি না?

মোস্তফা ফিরোজ: এটা ভালো দৃষ্টান্ত না। এখানে বিএনপির একটি স্ববিরোধিতা আছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অনেকেই বলছেন, যে কোনো দল নিষিদ্ধ করার রাজনীতিতে তারা বিশ্বাস করেন না। কিন্তু সেটাই তো হয়ে গেল। তাহলে আপনি সব অধ্যাদেশ মানলেন না কেন? ২০টি অধ্যাদেশ, গুম, বিচার বিভাগ পৃথক্করণ, কেন মেনে নিলেন না? মনে রাখা দরকার বিএনপি কিন্তু যে ভোট পেয়েছে, তা কেবল বিএনপির ভোট ছিল না। যখন দেখা গেল যে মুক্তিযুদ্ধের কোনো শক্তি নেই, গণতান্ত্রিক শক্তি নেই, তখন আওয়ামী লীগের ভোট, গণতান্ত্রিক অনেক রাজনৈতিক দল, সংখ্যালঘু ভোট, সবাই কিন্তু বাঁচার আশায় নিজেদের স্বার্থে দেশের স্বার্থে তারা কিন্তু দলে দলে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। আর যে কখনোই ধানের শীষে ভোট দেয়নি সেও কিন্তু ধানের শীষে ভোট দিয়েছে।

আপনি এসে এখন এইটা আইন করে ফেললেন এটা ঠিক করেননি। কারণ এটা বুমেরাং হবে। আমি তো বললাম ১০-২০ বা ৫০ বছর পরে বিএনপির আজকে যে জনপ্রিয়তা, কালকে তো নাও থাকতে পারে। কোনো ক্ষমতা চিরস্থায়ী না। এটা তো আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা প্রমাণ করে গেছে তার পতনের মধ্যে দিয়ে। সুতরাং আপনি এমন একটা কাজ করলেন যেটার হাত ধরে অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে তখন সেও আরও দুই-চারটা রাজনৈতিক দল তার সুবিধামতো করে নিষিদ্ধ করবে। তখন কী হবে?

এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণহত্যা মামলার প্রধান আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার বিষয় ভারত পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছে। বিষয়টির ওপর দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক কতটা নির্ভর করছে?

মোস্তফা ফিরোজ: ভারতের এই বক্তব্যটা এটা খুবই কূটনৈতিক চাতুর্যে ভরা বক্তব্য। মানে এই না যে তারা রাজি হইছে। খতিয়ে দেখবে মানে কী? শেখ হাসিনার স্ট্যাটাস কী? যদি সে রাজনৈতিক রিফিউজি হয় তাহলে তো ভারত তো আইনগতভাবে তাকে সেখানে সেই দেশে আশ্রয় দিতে বাধ্য। এটা তো ভায়োলেট করতে পারে না। এটা তো আন্তর্জাতিক ভায়োলেশন হবে।

যে একজন রিফিউজিকে আমি জোরপূর্বক তার দেশে সে বিপদের মুখে আমি ঠেলে দিলাম। শেখ হাসিনা তখন রাজনৈতিক দলের প্রধান, সে সে সময়ে সরকার প্রধান। সে মনে করতে পারে যে আমি আমার দেশের সার্বভৌমত্ব, জানমালের নিরাপত্তার জন্য যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তিনি আর্মি পুলিশ বাহিনীকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করার জন্য বলেছে। সেই সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করতে গিয়ে ১৪০০ মানুষ মারা গেছে। সুতরাং এটাকে আমি একেবারে নিশ্চিত করে বলে দিতে পারি যে সে নির্দেশ দিয়েছে? সুতরাং সে হলো খুনি এটা এটা হলো রাজনৈতিক বয়ান। আর প্রকৃতভাবে বিচারের মধ্যে দিয়ে এটা প্রমাণ করাটা হচ্ছে প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়। সুতরাং এইসব গ্রাউন্ডে জাতিসংঘ বলুক আর যেই বলুক না কেন রাজনৈতিক আশ্রয় পাবে না সেটা কিন্তু হয় না।

রাজনৈতিক আশ্রয় আমার যেটা ধারণা যদিও এখনো অফিশিয়ালি ভারত বলেনি রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে কিনা কিন্তু যেহেতু লম্বা সময় ধরে আছে সুতরাং এটা রাজনৈতিক আশ্রয় ছাড়া মানে আর অন্য কোনো স্ট্যাটাসে নেই। কিন্তু যেটা সম্পর্কটা উন্নয়নটা হবে কীভাবে যেটা ইউনূস সরকার বলেছিল, যে হাসিনা থাকুক। আপনার যদি রেখে দিতে চান রাখেন কিন্তু সে যেন উসকানি না দেয়।

সম্ভবত একটা ‘নেগোসিয়েশন’ হতে পারে যে শেখ হাসিনাকে হয়তো বলতে পারে যে আপনি এখানে থাকেন যত বছর থাকেন। কিন্তু আপনি কোনো পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট দিতে পারবেন না, এইটা যদি সে যদি নিশ্চুপ থাকে উসকানি না দেয় তাহলে এটা নিয়ে বিএনপি সরকার আমার ধারণা খুব একটা মাথা ঘামাবে না।

সাক্ষাৎকারে মাওলানা মাহফুজুল হক / অকৃতকার্য ছাত্রকে মাওলানা উপাধি দেওয়া সমর্থন করে না বেফাক
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের কওমি শিক্ষাব্যবস্থা দেখভালের সঙ্গে যুক্ত মাওলানা মুহাম্মাদ মাহফুজুল হক। বর্তমানে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড হিসেবে পরিচিত বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়ার স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং মোহাম্মদপুরের ঐতিহ্যবাহী জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার মহাপরিচালক। দেশের কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক চিত্র, বেফাকের ভূমিকা ও পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ এশিয়া পোস্ট: ২০০৫ সাল থেকে বেফাকের দায়িত্বশীল পদে আছেন। ২০২০ সাল থেকে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। এই দীর্ঘ সময়ে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কী পদক্ষেপ নিয়েছেন? মাহফুজুল হক: ২০০৫ সালে শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহ.) বেফাকের সভাপতি হন, ওই বছরই আমি সহকারী মহাসচিব মনোনীত হই। ২০২০ পর্যন্ত সহকারী মহাসচিব ছিলাম। ওই বছরের অক্টোবরে মহাসচিবের দায়িত্ব পাই। ২০০১ সালে চার দলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। তখন আলেমরা কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির আওতায় আনতে চেয়েছিলেন। এর আগেও চেষ্টা হয়েছে। ২০০৫-২০০৬ সালের দিকে স্বীকৃতি দিতে সরকার কমিটি গঠন করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তখন এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত গেজেট হয়নি। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দিয়ে প্রথম নীতিগত সিদ্ধান্ত গেজেট আকারে প্রকাশ পায়। ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগের আমলে দাওরায়ে হাদিসের সনদ গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন করে স্বীকৃতি লাভ করে। ২০১৮ সালে সংসদে বিল পাসের মধ্য দিয়ে এটি আইনে পরিণত হয়। বেফাকের নামে স্বীকৃতি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু আঞ্চলিক অন্যান্য বোর্ডের কারণে হয়নি। ২০১৭ সালে ছয় বোর্ডের সমন্বয়ে আল-হাইয়াতুল উলয়া গঠন হয়। এটি এই সময়ের বড় অর্জন। এখন বলতে পারি, কওমি মাদ্রাসাগুলো আল-হাইয়াতুল উলয়ার অধীনে এক্যবদ্ধ। এশিয়া পোস্ট: সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় পাবলিক পরীক্ষার ফল ঘোষণার পর দেশব্যাপী উচ্ছ্বাস দেখা যায়। গণমাধ্যমেও আলোচনা হয়। কিন্তু বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফল নিয়ে এমন উচ্ছ্বাস বা আলোচনা দেখা যায় না। এর কারণ কী? মাহফুজুল হক: স্কুল-কলেজের শিক্ষার সঙ্গে বিপুলসংখ্যাক মানুষের সম্পৃক্ততা আছে। সেই তুলনায় কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কম। তবে এবার ফল ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যে ২০ লাখ মানুষ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেছে। অনলাইনেও বেশ আলোচনা হয়েছে। তবে ঈদের আগমুহূর্তে ফল ঘোষণা এবং সময় নির্ধারণে জটিলতার কারণে মিডিয়াকে সেভাবে জানানো যায়নি। ভবিষ্যতে মিডিয়াকে ডাকার চিন্তাভাবনা রয়েছে আমাদের। এশিয়া পোস্ট: অভিযোগ আছে, অকৃতকার্য হওয়ার পরও শিক্ষার্থীরা পরবর্তী ক্লাসে ভর্তি হতে পারেন। এ বিষয়ে বেফাকের সিদ্ধান্ত কী? মাহফুজুল হক: মিশকাতে পরীক্ষা দিতে হলে শরহে বেকায়ার পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে হয়। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ক্লাসেও এমন নিয়ম করা হবে। অকৃতকার্য ছাত্ররা পরবর্তী ক্লাসে ভর্তি হতে পারবে; এমন দৃষ্টিভঙ্গি বেফাক লালন করে না। এ জন্য পর্যায়ক্রমে পরবর্তী ধাপের পরীক্ষার জন্য আগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বাধ্যবাধকতা চালু করছি। মাদ্রাসাগুলোকে প্রস্তুত করছি। তাদের উদ্বুদ্ধ করছি। এশিয়া পোস্ট: কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীরা চাইলে যে কোনো ক্লাসে ভর্তি হতে পারে। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সনদ লাগে না। এর ফলে কি শিক্ষার মান কমছে? মাহফুজুল হক: হাইয়াতুল উলয়ায় সম্মিলিত ছয়টি বোর্ড কাজ করছে। সেখানে এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে কাজ করছি। যোগ্যতা ছাড়া যেন ভর্তি হতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি রাখছি। যে কোনো ক্লাসে ভর্তির বিষয়টি এখন কমে আসছে। একসময় মাদ্রাসাগুলো ইচ্ছামতো পরিচালিত হয়েছে। বোর্ড ছিল না। পরে বোর্ড হলো। বোর্ডের তত্ত্বাবধানে এ দুর্বলতাগুলো ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা হয়েছে। স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে আরেকটু এগিয়েছে। আশা করি, দ্রুত এ ধরনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠব। তবে আগের ক্লাসে উত্তীর্ণ না হওয়া কাউকে পরের ক্লাসে ভর্তি নিলে শিক্ষার মান ক্ষুণ্ন হয়। এশিয়া পোস্ট: বেফাক প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫০ বছর হলো। একটি শিক্ষাবোর্ডে শিক্ষাবান্ধব নিয়ম করতে এত বছর লাগছে কেন? মাহফুজুল হক: স্বীকৃতির আগ পর্যন্ত বেফাক ওইসব মাদ্রাসার সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাদের ওপর আইন চাপানোর মতো শক্তি বেফাকের ছিল না। স্বীকৃতি তো কার্যকর হলো ২০১৭-১৮ সালে। সময় অনেক গেছে, সময়ের মধ্য দিয়ে পরিবেশ ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে আসছে। এশিয়া পোস্ট: আল-হাইয়াতুল উলয়ার পরীক্ষায় ফেল করার পরও অনেক পরীক্ষার্থীকে পাগড়ি দেওয়ার খবর এসেছে। ফেল করা শিক্ষার্থীদেরও মাওলানা উপাধি দেওয়া হচ্ছে। তাহলে পড়াশোনা করে পাস করার প্রয়োজন কী? মাহফুজুল হক: আল-হাইয়াতুল উলয়ার পক্ষ থেকে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে সনদ দেওয়া হয় না। কোনো বিষয়ে ফেল করলে পরের বছর পরীক্ষা দিতে হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে দুর্বলতা আছে। দাওরায়ে হাদিসে ফেল শিক্ষার্থীও যেন সমাজে দায়িত্ব পালন করতে পারে, ওই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্ভবত তারা পাগড়ি দিচ্ছে। খুব দ্রুতই পরিবেশ ঠিক করার চেষ্টা করছি। এখন সার্টিফিকেট দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম বেফাক ও হাইয়াতুল উলয়া। একসময় প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকের গুরুত্ব থাকবে না। তখন ফেল করা শিক্ষার্থীকে সার্টিফিকেট দেওয়া সম্ভব হবে না। এশিয়া পোস্ট: দাওরায়ে হাদিসে ফেল শিক্ষার্থীকে মাওলানা উপাধি বা পাগড়ি দেওয়া ঠিক মনে করেন? মাহফুজুল হক: না। বেফাক তাকে সার্টিফিকেট দেয় না। ভালো প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা শেষে ফলাফল ঘোষণার পর পাগড়ি দেওয়া হয়। সাধারণ প্রতিষ্ঠান বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেকে বার্ষিক পরীক্ষার আগেই পাগড়ি দিয়ে দেন। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন নয়। ফেল ছাত্রকে মাওলানা উপাধি বা পাগড়ি দেওয়া বেফাক সমর্থন করে না। এশিয়া পোস্ট: কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই যত্রতত্র মাদ্রাসা খোলা হচ্ছে। এ বিষয়ে বেফাকের চিন্তাভাবনা কী? মাহফুজুল হক: একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও বেফাকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য কী কী মানদণ্ড থাকা দরকার, এ বিষয়ে কাজ করছি। কিন্ডারগার্টেনও যত্রতত্র হচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন কম হয়। কিন্তু কওমি মাদ্রাসা নিয়ে প্রশ্ন বেশি হয়। তবে যোগ্যতা ছাড়া যত্রতত্র মাদ্রাসা করা ঠিক নয়। এগুলোকে নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসতে সচেষ্ট আছি। এশিয়াপ পোস্ট: সিলেবাস আধুনিকীকরণে বেফাক কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? মাহফুজুল হক: বেফাক প্রতিষ্ঠার পর থেকে সিলেবাস প্রণয়নের কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। কোরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞানার্জনের যে শিক্ষা কার্যক্রম, সেখানে খুব বেশি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। একসময় কওমিতে বাংলা, গণিত, ইংরেজি, ভূগোল ও ইতিহাস ছিল না। বেফাকই প্রথম পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এগুলো পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। পরে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে বাংলা, গণিত ও ইংরেজি যোগ হয়েছে। এখন নবম-দশমেও বাংলা-ইংরেজি যুক্ত হচ্ছে। মিশকাতে ইসলামি অর্থনীতি পড়ানো হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানও সিলেবাসভুক্ত করার চিন্তা আছে। মূল উদ্দেশ্য ঠিক রেখে আমরা সিলেবাস আধুনিকীকরণের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি। এশিয়া পোস্ট: শাপলা চত্বর ও জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির দাবি উঠছে। এ নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী? মাহফুজুল হক: বেফাকে আমাদের স্থায়ী সম্পাদনা পরিষদ আছে। সেখানে শাপলা ও জুলাইয়ে আলেমদের অবদান ও ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রমে জুলাইকে সরকার কীভাবে ধারণ করছে, সেদিকেও নজর রাখছি। সে আলোকে আমাদের শিক্ষা সিলেবাসে এ জাতীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা আছে। এশিয়া পোস্ট: ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রয়োজনে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যবহার করছে। বিষয়টি কীভাবে দেখেন? মাহফুজুল হক: ছাত্ররাও ইসলামি রাজনীতি শিখবে, তবে সেটা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। তার মূল কাজ পড়াশোনা। ধর্মীয় ব্যাপক প্রয়োজন ছাড়া তাদের মাঠে-ময়দানে কাজে লাগানো ঠিক নয়। এতে ছাত্রদের মূল উদ্দেশ্য পড়াশোনা ব্যাহত হবে।   এশিয়া পোস্ট: চাকরির বাজারে মাদ্রাসা শিক্ষা সনদের গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। এ নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষোভ-আক্ষেপ রয়েছে, কিন্তু বিষয়টি সুরাহার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। এখানে বেফাকের কোনো ব্যর্থতা আছে বলে মনে করেন? মাহফুজুল হক: এটার জন্য উদ্যোগ নেই; এ কথার সঙ্গে একমত নই। স্বীকৃতি তো এমনি অর্জন হয়নি। এর পেছনে মুরুব্বিদের যথেষ্ট সংগ্রাম আছে। স্বীকৃতি কার্যকরের চেষ্টা পুরোপুরি অব্যাহত আছে। স্বীকৃতি আদায়ের সময়ও আমাদের প্রথম টার্গেট ছিল নিজস্ব স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট হওয়ার শঙ্কা যেন তৈরি না হয়। আমাদের এসএসসি, এইচএসসি ও অনার্সের সমমান নিতে বলা হচ্ছে। এই স্তরগুলোতে সমমান নেওয়া হলে কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্বলতা দেখা দেবে। যেমন আলিয়া মাদ্রাসায় হচ্ছে। সেখানে দাখিলে ১০০ শিক্ষার্থী থাকলে আলিমে থাকে ৫০ জন। বাকিরা কলেজে চলে যায়। আলিমে ৫০ জন থাকলে পরের ধাপে থাকে ২০ জন। মেধাবীরা কেউ থাকে না। একটা শিক্ষাব্যবস্থায় মেধাবীরাই যদি না থাকে, তাহলে সেটা টিকে থাকে না। আমরা মনে করছি, অল্প দিনের মধ্যে আলিয়া মাদ্রাসা ভ্যানিশ বা নাই হয়ে যাবে। এসএসসি বা এইচএসসির সমমান নিচ্ছি না আমরা। না নেওয়ার কারণে সনদের কার্যকারিতার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা। এটা না নিয়ে কীভাবে সনদ কার্যকর করা যায়, সে চেষ্টা করছি। এশিয়া পোস্ট: সমমান না নিলে চাকরির সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে? মাহফুজুল হক: ২০০৬ সালে যখন দাওরায়ে হাদিসের সনদের নীতিগত গেজেট হয়, সেখানে বলা আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষক পদে আবেদন করা যাবে। এখন কাজি পদে আবেদন করা যাচ্ছে। এই সনদে আমাদের ছাত্রদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ ধর্মীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সুযোগ দেওয়া হলে চাকরির অনেক ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তবে চাকরির বাজার তৈরি করতে গিয়ে মূল জায়গা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। এশিয়া পোস্ট: শিক্ষার্থীরা তো একাডেমিক সমমান নিয়ে চাকরির বিশাল বাজারে প্রবেশ করতে চান। মাহফুজুল হক: আমি মনে করি, ছাত্ররা বুঝতে পারছে না। যদি চাকরিই একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে কওমি মাদ্রাসায় আসার প্রয়োজন কী? সে আলিয়া মাদ্রাসায় পড়ুক। কওমি মাদ্রাসায় যেহেতু এসেছে, তাকে কোরআন-হাদিসের বিজ্ঞ আলেম হতে হবে। কওমি মাদ্রাসায় পড়ার পাশাপাশি স্কুলে সে পরীক্ষা দিক। তবে আগে ভালো আলেম হোক। এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। মাহফুজুল হক: এশিয়া পোস্টের জন্য শুভকামনা। আপনাকেও ধন্যবাদ।
অকৃতকার্য ছাত্রকে মাওলানা উপাধি দেওয়া সমর্থন করে না বেফাক
‘ভারত থেকে পরিচালনার চেষ্টা হলে বাংলাদেশে আ.লীগের ভবিষ্যৎ নেই’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিতে সাংবাদিকতা করার পর আকবর হোসেন যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত ১১ এপ্রিল সেই পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক আয়োজন আলাপন অনুষ্ঠানে তার সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, প্রেস মিনিস্টারের দায়িত্ব, পদত্যাগ এবং বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেছেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর। এশিয়া পোস্ট: বিশ্বের অন্যতম সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। দেশের খবর বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন। আপনার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর গল্পটা দিয়ে আমরা আলোচনা শুরু করতে চাই। আকবর হোসেন: আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন থেকেই মূলত আমার সাংবাদিকতা শুরু। এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় একটি ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে। ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার পর আমি সেখানে ট্রেনি রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিই এবং মোটামুটি দুই বছর তিন মাস কাজ করি। ২০০৫ সালে বিবিসি যখন ঢাকায় লোক নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়, তখন আমি আবেদন করি এবং নির্বাচিত হই। ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর আমি বিবিসিতে যোগ দিয়েছিলাম। এরপর দীর্ঘ সময় সেখানে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এশিয়া পোস্ট: বিবিসিতে কাজ করার সুবাদে ওখানকার কাজের পরিবেশ খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেখানকার সাংবাদিকরা কি আসলেও রাজনীতি ও মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থাকেন, নাকি ব্যক্তিভেদে তাদেরও পক্ষপাত থাকে? আকবর হোসেন: বিবিসি একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজম বা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন করাকে কখনোই উৎসাহিত করে না। সেখানে কাজ করা অবস্থায় আপনি কোনো দলের সমর্থক হতে পারবেন না কিংবা তাদের সরাসরি সমালোচকও হতে পারবেন না। এই নিরপেক্ষতাটুকু বিবিসি খুব কঠোরভাবে বজায় রাখে। বিবিসির একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়া পলিসি আছে। সেখানে কাজ করলে আপনি চাইলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় যা খুশি লিখতে পারবেন না। আপনি এমন কিছু লিখতে পারবেন না যাতে মনে হয় যে আপনি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা কোনো ঘটনায় একটি পক্ষ নিয়েছেন। মানুষ হিসেবে আমাদের অবচেতনে অনেক সময় রাজনৈতিক মতামত চলে আসে, কিন্তু কেউ যদি এই নিয়মগুলো লঙ্ঘন করে, তবে তাকে সতর্ক করা হয়। এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। কারণ একজন রিপোর্টার হিসেবে লোকে যদি মনে করে আপনি পক্ষপাতদুষ্ট, তবে তারা আপনার বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ের ওপর আস্থা হারাবে। এতে প্রতিষ্ঠানের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। এশিয়া পোস্ট: ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে আপনার কী মনে হয়—একই সঙ্গে রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং সাংবাদিকতা করা কি সত্যিই সম্ভব? আকবর হোসেন: এটা আসলে নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর। আপনার প্রফেশনাল ইনটেগ্রিটি বা পেশাদার সততা যদি অনেক শক্তিশালী হয়, তবে আপনি পারবেন। আমি মনে করি, আমরা কেউই রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে নই। কিন্তু প্রশ্ন হলো আপনি ফেয়ার কি না, আপনি অবজেক্টিভ কি না। আপনার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতা করার সময় আপনি ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ বলতে পারছেন কি না, সেটিই বড় বিষয়। আপনি কি উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে ভিকটিম করছেন? যদি আপনি তা না করেন এবং কভারেজের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ থাকেন, তবে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে আমার ব্যক্তিগত মত হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকলে নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশ না করাই শ্রেয়। আপনি যদি স্বতন্ত্র সাংবাদিক হন, তবে ভিন্ন কথা। এশিয়া পোস্ট: বিবিসিতে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আপনার করা এমন কোনো বিশেষ সংবাদের কথা মনে পড়ে যা আপনাকে আজও গর্বিত করে? আকবর হোসেন: নির্দিষ্ট করে একটি ঘটনার কথা বলা কঠিন, কারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমি সাংবাদিকতা করেছি। যেমন বাংলাদেশে যখন ২০০৭ সালে ‘ওয়ান ইলেভেন’ বা জরুরি অবস্থা জারি হলো, সেই সময়টা ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। এরপর সিডর ঘূর্ণিঝড়ের কাভারেজ ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং চ্যালেঞ্জিং। এ ছাড়া ২০০৮ সালের নির্বাচনসহ পরবর্তী বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনা আমি কাভার করেছি। সাংবাদিক হিসেবে প্রতিটি ঘটনাই আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এশিয়া পোস্ট: সাংবাদিকতা ছেড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার হয়েছিলেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে সেই কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? আকবর হোসেন: সত্যি বলতে, আমার সেই অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো ছিল না। আমি ওখানে গিয়ে দেখলাম যে, এই পদের জন্য আসলে সেরকম কোনো কাজ সেখানে নেই। একপর্যায়ে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এই ধরনের পদ বা পজিশন আসলে বন্ধ করে দিলেও কোনো সমস্যা নেই। আমি মনে করি, কাজের মাধ্যমেই আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করি এবং সার্থকতা খুঁজে পাই। কাজ করলে ভুল হবে বা শুদ্ধ হবে, কিন্তু কাজই যদি না থাকে তবে শুধু চাকরি করা আর বেতন নেওয়াটা সুখকর কিছু নয়। সরকারি সিস্টেমটা হয়তো এ রকমই, কিন্তু এটি এমন হওয়া উচিত ছিল না। তবে এই এক বছরে আমি দেখার সুযোগ পেয়েছি যে সরকারি ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে। এশিয়া পোস্ট: এই প্রেস মিনিস্টার পদে সাধারণত সাংবাদিকদেরই কেন নিয়োগ দেওয়া হয়? এর পেছনে কারণ কী বলে আপনি মনে করেন? আকবর হোসেন: যে কোনো কিছু যখন শুরু হয়, তার পেছনে একটি ভালো উদ্দেশ্য থাকে। সরকার সম্ভবত মনে করেছিল যে বাইরে থেকে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা সিস্টেমে আনা দরকার। সাংবাদিকরা যেহেতু গণমাধ্যম সামলাতে অভ্যস্ত, তাই তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে এটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা রাজনীতিতে জড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে এগুলো এক ধরনের পুরস্কার দেওয়ার বিষয়ে পরিণত হয়। আমার মতে, যারা মাঠপর্যায়ে ভালো সাংবাদিকতা করতে চান, তাদের এ ধরনের পদে না যাওয়াই ভালো। আমি নিজে না গেলে হয়তো এই বাস্তবতা বুঝতাম না। এশিয়া পোস্ট: সরকারের পদ পাওয়ার পর আপনি সাংবাদিকতা পেশা ছেড়েছিলেন। এটি কি আপনার দীর্ঘ পেশাজীবনকে কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে? আকবর হোসেন: অবশ্যই করেছে এবং আমি তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করি। আমি যদি আমার পেশাদার জীবনে কয়েকটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি, তবে এটি ছিল অন্যতম। এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি আপনি পদত্যাগ করেছেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার কারণে কি কোনো সংশয় থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? আকবর হোসেন: না, সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। এমনকি আমার সঙ্গে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তারা অনেকেই এখনও কাজ করছেন। আমি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক কারণে পদত্যাগ করেছি। আমি নিজে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি এবং তিনি তাতে সম্মতি দিয়েছেন। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এশিয়া পোস্ট: সমসাময়িক রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ বা অনুপ্রবেশকারী ইস্যু নিয়ে আপনি কথা বলেছেন। এটি আপনার কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো? আকবর হোসেন: আমি দেখলাম যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এটি নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, তাই আমি আমার একটি বিশ্লেষণ দিয়েছি। অতীতে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের পর থেকে যে কোনো সমালোচনাকেই ‘জামায়াত-শিবির’ বলে ট্যাগ দিত। একপর্যায়ে তারা নিজেদের দলের লোককেও সন্দেহ করতে শুরু করল। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিককে ছাত্রলীগের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল এবং তাকেও জামায়াত তকমা দেওয়া হয়েছিল। এই বিষয়টি আওয়ামী লীগকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল। এখন বিএনপি বা অন্য কেউ যদি একই ন্যারেটিভ দাঁড় করায় যে, যারাই সমালোচনা করছে তারাই ‘গুপ্ত’ বা অন্য দলের লোক, তবে এটি তাদের দলের জন্যই ক্ষতির কারণ হবে। বিএনপির তৃণমূল পর্যায়েও এখন অনেকে সমালোচনা করতে ভয় পাচ্ছে যে, তাকে আবার কোনো ট্যাগ দেওয়া হয় কি না। ক্ষমতায় আসার শুরুতেই এ ধরনের বিভেদ তৈরি করা দলের জন্য ভালো নয়। এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে, বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আকবর হোসেন: সমালোচনা হবে সীমাহীন। আপনি তথ্যযুক্তি দিয়ে আমার যত ইচ্ছা সমালোচনা করুন। কিন্তু আমাকে গালি দেওয়ার অধিকার আপনার নেই। সমালোচনা এবং অশ্লীলতাকে এক করে দেখা ঠিক নয়। আপনি যদি কাউকে নোংরা ভাষায় আক্রমণ করেন, তবে তার আইনি প্রতিকার চাওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে। শুধু সমালোচনার কারণে গ্রেপ্তার হওয়া আমি সমর্থন করি না। এশিয়া পোস্ট: রাজশাহীতে একজন শিক্ষিকা লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় একজন বিএনপি নেতার নাম জড়িয়েছে। ক্ষমতাসীনদের বেলায় এমনটা কেন দেখা যায়? আকবর হোসেন: রাজশাহীর ঘটনায় আমি বলেছি যে, একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার এবং দোষীদের শাস্তি হওয়া উচিত। আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন যে, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, স্থানীয় পর্যায়ের কিছু টাউটপ্রকৃতির মানুষ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তারা মনে করে সব অধিকার তাদের। এমনকি আপনি যদি নিজে ক্ষমতা চর্চা নাও করেন, আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার কারণে লোকে আপনাকে অনেক ক্ষমতাবান মনে করবে এবং আপনাকে নানা বিষয়ে জড়ানোর চেষ্টা করবে। এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকেই মূলত এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকারের কার্যক্রমকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? আকবর হোসেন: নির্বাচনের সময় আমি দেশে ছিলাম না, তবে আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যা বলছে, তাতে এই নির্বাচন নিয়ে জনমনে বড় কোনো প্রশ্ন নেই। এটি গ্রহণযোগ্য ছিল। আর সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করার জন্য দুই মাস খুব কম সময়। যে কোনো সরকারকে মূল্যায়ন করতে হলে অন্তত ছয় মাস সময় দেওয়া উচিত। এশিয়া পোস্ট: ‘জুলাই সনদ’ এবং গণভোট নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার পরিণতি কী হতে পারে? আকবর হোসেন: গণভোটে প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ সমর্থন দিয়েছে। আমি মনে করি, জনগণের রায়ের ওপর আর কোনো কথা থাকতে পারে না। বিএনপি যদি জনগণের এই রায়কে অবজ্ঞা করে, তবে তা হবে একটি রাজনৈতিক আত্মহত্যা। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকতে পারে, কিন্তু গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা তাদের জন্য ঠিক হবে না। বিএনপি একটি পরিপক্ব রাজনৈতিক দল এবং আমার ধারণা তারা এমন ভুল পথে হাঁটবে না। এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের আগামী দিনের রাজনীতি সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? আকবর হোসেন: আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা যতদিন ভারত থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, ততদিন বাংলাদেশে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি প্রবল ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ যদি ভারত থেকে না হয়ে অন্য কোনো দেশ থেকে কামব্যাক করার চেষ্টা করত, তবে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু ভারত থেকে কিছু করার চেষ্টা করলে মানুষ মনে করবে এটা ভারত করাচ্ছে। এশিয়া পোস্ট: জুলাই অভ্যুত্থানের সেই আবেগ কি এখনও মানুষের মধ্যে আছে? আকবর হোসেন: অভ্যুত্থানের আবেগ প্রতিদিন রাস্তায় দেখা যাবে না। এ ধরনের ঘটনা যুগে একবার ঘটে। এর মানে এই নয় যে মানুষ ভুলে গেছে। মানুষ যখন দেখবে তাদের অধিকার ঠিকমতো রক্ষিত হচ্ছে না, তখন তারা আবারও প্রতিক্রিয়া দেখাবে। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন সবার মধ্যে আসেনি। একটা গোষ্ঠী সবসময় ব্যবসার ধান্ধায় থাকে, আদর্শ তাদের কাছে বড় বিষয় নয়। তবে দেশের একটি বড় অংশ অবশ্যই পরিবর্তন চায়। এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কতটুকু ছিল এবং কতটুকু পূরণ হয়েছে? আকবর হোসেন: আমি এই সরকারের কোনো নীতিনির্ধারক ছিলাম না, আমি ছিলাম একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তা। তবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এই সরকার অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। পুলিশ বাহিনীকে সচল করার চেষ্টা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং একটি নির্বাচন আয়োজন করা তাদের কাজ ছিল। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে সফলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করাটাই তাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমি খুব বেশি প্রত্যাশা রাখি না, কারণ পরিবর্তন শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে না, জনগণের সচেতনতাও প্রয়োজন। শুধু চাই সরকার যেন সাধারণ মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়। এশিয়া পোস্ট: সংবাদমাধ্যমে ভুল তথ্য বা ডিস-ইনফরমেশন রোধে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি? আকবর হোসেন: যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুল তথ্য ছড়ায়, তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। তবে তাদের জেলে না পাঠিয়ে জরিমানা করা যেতে পারে। জরিমানার ব্যবস্থা থাকলে মানুষ সতর্ক হবে এবং এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবেও দেখা হবে না। বর্তমান সময়ে মূলধারার গণমাধ্যম এই ভুল তথ্যের কারণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাংবাদিকদের মনে রাখতে হবে, ‘প্রথম হওয়ার’ প্রতিযোগিতার চেয়ে ‘শুদ্ধ হওয়া’ বেশি জরুরি। তথ্য যেন নির্ভুল হয়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। এশিয়া পোস্ট: আগামী পাঁচ বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান? আকবর হোসেন: আমি সাংবাদিকতাই করব, এটাই আমার মূল পেশা। আমি নিজের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা করছি যেখানে আমি মূলধারার সাংবাদিকতা বজায় রাখব। আমি আমার সাংবাদিক পরিচয় নিয়ে মানুষের আস্থায় ফিরতে চাই। এশিয়া পোস্ট: চাপের মুখে সাংবাদিকতা করার বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী? আকবর হোসেন: এটি আপনার পেশাদার সততার ওপর নির্ভর করে। আপনার যদি অন্য কোনো স্বার্থের জায়গা থাকে, তবে আপনি চাপ মোকাবিলা করতে পারবেন না। নিজেকে শক্তিশালী এবং সৎ রাখতে পারলে যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। আমি আশা করি, বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন থেকে একটি মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারবে। তবে মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা কেউ উপহার হিসেবে দিয়ে যায় না, এটি কাজের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
‘ভারত থেকে পরিচালনার চেষ্টা হলে বাংলাদেশে আ.লীগের ভবিষ্যৎ নেই’
হেফাজতের শহীদদের ইতিহাস থেকে মোছার ষড়যন্ত্র হয়েছে, কওমি স্বীকৃতি ছিল ধোঁকাবাজি
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে রাতের অন্ধকারে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অংশ নেওয়া মুসল্লিদের ওপর হামলে পড়ে যৌথ বাহিনী। এতে ব্যাপক হতাহতের অভিযোগ ওঠে। সংগঠনটির তৎকালীন আমির শাহ আহমদ শফী দাবি করেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বাতি নিভিয়ে স্মরণকালের নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সাদাপোশাকের অস্ত্রধারীরা। ২০১৩ সালের ৫ মের বিভীষিকাময় সেই ঘটনা, হেফাজতের রাজনীতি, শাপলা চত্বরের শহীদদের তালিকা প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা এবং কওমি সনদের স্বীকৃতিসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ। এশিয়া পোস্ট : হেফাজতে ইসলাম দাবি করে তারা অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু এর দায়িত্বশীল অনেকেই কোনো না-কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সংগঠনের কর্মসূচি নেওয়া কি সম্ভব হয়? আজিজুল হক : আল্লামা শাহ আহমদ শফি ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের নেতৃত্বে একটি বৃহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি অরাজনৈতিক ছিল, আছে, থাকবে। রাজনৈতিক নেতারা এখানে আলেম হিসেবে যুক্ত আছেন। একজন নাগরিক যেমন মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি দলীয় দায়িত্ব পালন করেন, হেফাজতের নেতাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমন। ইসলামের মৌলিক বিষয়ে ইসলামবিদ্বেষী শক্তি চক্রান্ত করলে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সব আলেমের দায়িত্ব এর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা। এই জায়গা থেকে হেফাজতের সঙ্গে যেসব রাজনৈতিক নেতা আছেন, তারা রাজনৈতিক পরিচয়ে হেফাজতে আসেন না, আলেম হিসেবে আসেন। রাজনৈতিক প্রভাবে হেফাজত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে না।  এশিয়া পোস্ট : আল্লামা শাহ আহমদ শফি ও জুনায়েদ বাবুনগরী আমির থাকাকালে হেফাজতের যে প্রভাব ছিল, এখন তা নেই কেন? আজিজুল হক : তারা দুজনই বিখ্যাত আলেম। আল্লামা আহমদ শফি (রহ.) দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রামের মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা ও পরে মাদ্রাসা পরিচালনা করেছেন তিনি। তার লাখো ছাত্র ও অনুসারী আছে। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীও বিখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস ছিলেন। তার বাবাও বড় আলেম ছিলেন। সারা দেশে বাবা-ছেলের লাখো ছাত্র ও অনুসারী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এ দুজনের নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে আলেম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মানুষ পঙ্গপালের মতো হেফাজতের ব্যানারে ছুটে এসেছে। ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীও বিখ্যাত আলেম। দেশে হাদিস ও আধ্যাত্মিক চর্চায় তার পরিবারের অনেক অবদান রয়েছে। তবে আহমদ শফি ও জুনায়েদ বাবুনগরীর যে পরিচিতি, সেটা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেই। কিন্তু আলেম সমাজের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর তার নেতৃত্বে ৬৪ জেলায় হেফাজতকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেছি।  আল্লামা আহমদ শফি ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর সময় হেফাজত যেমন শক্ত অবস্থানে ছিল, এখনও সেই অবস্থান রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩ মে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করে এর প্রমাণ আমরা দিয়েছি।  এশিয়া পোস্ট : শাপলা চত্বরে হেফাজতের ৯৩ কর্মী শহীদ হয়েছেন বলে গত বছরের ৪ মে আপনারা তালিকা প্রকাশ করেছেন। এই তালিকা প্রকাশে ১২ বছর লাগল কেন? আজিজুল হক : শাপলা চত্বরের ঘটনার পর আওয়ামী ফ্যাসিবাদী জালিম গোষ্ঠী আলেমদের ওপর যে পরিমাণ নির্যাতন করেছে, তা বর্ণনাতীত। পুলিশ, র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়ে শহীদ পরিবারের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। শহীদদের অনেকের জানাজা পড়তে দেয়নি। এক মাদ্রাসা শিক্ষকের নিজ মাদ্রাসায়ও তার জানাজা পড়তে বাধা দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত এলাকাবাসী দা-বঁটি নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে ধানক্ষেতে তার জানাজা পড়েন। মরদেহ বাড়ি যাওয়ার আগে র‌্যাব-পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করে রাখে। জানাজা শেষে পরিবারের মাত্র চারজন সদস্য তাকে দাফনের সুযোগ পান।   শাপলা চত্বরের শহীদদের তালিকা করতে তদন্ত কমিটি গঠন করলে আমাদের লোকজনকে তুলে নিয়ে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। শহীদদের তালিকা যেন না হয়, তাদের কথা যেন জাতি জানতে না পারে, তাদের যেন ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টা চালিয়েছে তৎকালীন আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার। এমনকি একজনও শহীদ হয়নি বলে ঘোষণা দেয় তারা। আমাদের শতভাগ চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও সরকারের চাপের কারণে তালিকা করতে পারিনি। ৫ আগস্টের পর প্রকাশ করেছি।  এশিয়া পোস্ট : হেফাজতের শহীদদের তালিকা করার কারণে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তৎকালীন সম্পাদক আদিলুর রহমান খান (পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা) ও পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলানকে কারাভোগ করতে হয়েছে। তারা তালিকা করতে পেরেছিলেন, কিন্তু এত নেতাকর্মী থাকার পরও আপনারা কেন পারেননি? আজিজুল হক : অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। তালিকা করায় আদিল ভাই ও এলান ভাইকে সরকার গ্রেপ্তার করে সাজা দিয়েছে। একটা আন্তর্জাতিক সংস্থার দায়িত্বশীলদের যদি এভাবে সাজা দিতে পারে, সেখানে হেফাজতের দায়িত্বশীলদের তো আন্তর্জাতিক লবিং নেই। আমরা নিরীহ আলেম সমাজ। ফ্যাসিবাদী শক্তিকে মোকাবিলার শক্তি ও সাহস নেই আমাদের। শহীদদের পক্ষে কথা বলায় আমাদের বিরুদ্ধে ৩৫০টির মতো মামলা হয়েছে। এসব মামলায় হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। সরকারের বহুমুখী চাপের কারণে তালিকা করতে পারেনি। এশিয়া পোস্ট : শুধু কি ৯৩ জনই শহীদ হয়েছেন? আজিজুল হক : ৯৩ জন নয়, আরও বেশি হবে। অনেক পরিবার এখনও ভয়ে শহীদদের কথা বলতে চান না। তাদের শঙ্কা, আওয়ামী লীগ আবারও ফিরতে পারলে ফের জুলুমের শিকার হতে হবে তাদের। মিডিয়ায় এসেছে, ২০১৩ সালের ৫ মে জুরাইন কবরস্থানে অনেক বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ীতে ময়লার স্তূপে মানুষের হাড় পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মিডিয়া, মানবধিকার সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, এগুলো হেফাজতের সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের লাশ। বিশেষ করে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম ওই মাসে প্রায় ৫০০ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। এগুলো তো দাফন হয়ে গেছে। পরিবারও জানে না এগুলো কার লাশ। আমরা চেষ্টা করছি তালিকা আরও সমৃদ্ধ করতে।  এশিয়া পোস্ট : কত জন শহীদ হয়েছেন বলে মনে করেন? আজিজুল হক : শহীদদের তালিকা দীর্ঘ হবে। এর সঠিক হিসাব নির্ণয় না করে বলা সম্ভব নয়। এশিয়া পোস্ট : অভিযোগ আছে, শাপলা চত্বরে শহীদদের জন্য বিগত ১২ বছর বিচার চায়নি হেফাজতে ইসলাম। শহীদদের পরিবারের পাশেও দাঁড়ায়নি। এর কারণ কী? আজিজুল হক : কেউ যদি বলে হেফাজত শহীদদের পাশে দাঁড়ায়নি, সেটা ভুল হবে। হেফাজত তার শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী ২০১৩ সালেই শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বিভিন্ন জেলায় টিম গিয়ে সহযোগিতা করেছে। প্রত্যেক পরিবার কম-বেশি হেফাজতের সহযোগিতা পেয়েছে। কোনো পরিবারকে একাধিকবার সহযোগিতা করা হয়েছে। কাউকে ঘর দেওয়া হয়েছে। কারও মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একজন শহীদের নামে মাদ্রাসা করা হয়েছে। তাদের সহযোগিতা করেনি, এটা মিথ্যা প্রচারণা। এশিয়া পোস্ট : ১২ বছর বিচার চেয়েছিলেন? আজিজুল হক : আমরা শতবার সংবাদ সম্মেলন ও মিছিল করে বিচার চেয়েছি। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার; যারা হত্যা করেছে, তারা কি বিচার করবে? জালিমরা তো করবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরপরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হেফাজতের পক্ষে আমি বাদী হয়ে অভিযোগ করেছি। এই মামলায় তৎকালীন সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, মন্ত্রী-এমপিরা জেলে আছেন। বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাক্ষী সংগ্রহ করা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জালিমদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারব। এশিয়া পোস্ট : যে আওয়ামী লীগ সরকার হেফাজত কর্মীদের শহীদ করল, সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে আপনারা শোকরানা মাহফিল করে সম্মান দিলেন। অথচ তখনও হেফাজতের শহীদদের তালিকা করা যায়নি, বিচারও হয়নি। এটা কি হেফাজতের শহীদদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা নয়? আজিজুল হক : এ বিষয়ে জাতির কাছে একটা ভুল বার্তা আছে। হেফাজত একটা আলাদা সংগঠন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড আলাদা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ থাকাটা স্বাভাবিক। শাপলা চত্বরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক থাকতে পারে না। আল্লামা আহমদ শফি তখন হেফাজতের আমির, তখন আবার তিনি কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড আল-হাইয়াতুল উলয়ারও চেয়ারম্যান। শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসকে মুছে দেওয়া ও আলেমদের নিয়ন্ত্রণের কুমতলবে সরকার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই দাবি হেফাজতের ছিল না, এটা কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের দাবি ছিল। সরকার স্বীকৃতি দিয়ে একটা রাজনৈতিক ডিগবাজি খেলেছে। এই স্বীকৃতি একটা কলাপাতা, কোনো মূল্য নেই। স্বীকৃতি দিয়ে ছাত্ররা কিছু করতে পারে না, এটা ধোঁকাবাজি। শোকরানা মাহফিলের আয়োজক ছিল সরকার। সে মাহফিলে খুনি হাসিনার সামরিক সচিব মিয়া মো. জয়নাল আবেদিন দাঁড়িয়ে শাপলা চত্বরের গণহত্যাকে অস্বীকার করলেন। হেফাজতের পক্ষ থেকে তৎকালীন মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী শোকরানা মাহফিলে অংশ নেননি। সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আমিও অংশ নিইনি। বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক আলেম সেখানে ছিলেন না। আমরা জোরালো প্রতিবাদ করে হাসিনার সামরিক সচিবের ওই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। শোকরানা মাহফিলে হেফাজতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আহমদ শফি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন, হেফাজতের আমির হিসেবে নন।  এশিয়া পোস্ট : আপনি বললেন, সনদ দিয়ে ডিগবাজি খেলা হয়েছে এবং শহীদদের রক্তকে মুছে দিতে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এসব জেনেও কেন স্বীকৃতি নিলেন? আজিজুল হক : এটা একান্ত আমার মতামত। সরকারের এই কূটচাল বোঝা সহজ-সরল আলেমদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা স্বীকৃতির নামে আলেম সমাজকে দমিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র করেছে। এশিয়া পোস্ট : ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আয়োজিত শোকরানা মাহফিলে শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেখানে আহমদ শফি (রহ.) থেকে শুরু করে হেফাজতের প্রায় সব বড় নেতা ছিলেন। আপনারা কি তাকে ‘কওমি জননী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন? আজিজুল হক : হেফাজতের নেতাদের ওপর যে আওয়ামী লীগ গণহত্যা চালাল, সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে হেফাজতের পক্ষ থেকে কওমি জননী উপাধি দেওয়া অবাস্তব কথা। হেফাজত তাকে এমন উপাধি দেয়নি। গওহরডাঙ্গা বোর্ডের চেয়ারম্যান মাওলানা রুহুল আমিন, তার বাড়ি গোপালগঞ্জ। তিনি শেখ হাসিনার গৃহপালিত ব্যক্তি। তিনি তার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছেন। হেফাজত বা হেফাজতের নেতারা দেননি। তার সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক নেই, তার সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক। তিনি হাসিনাকে তুষ্ট করতে এ উপাধি দিয়েছেন। এশিয়া পোস্ট : ওই মঞ্চে থাকা হেফাজত নেতারা বা বোর্ড পরে এর প্রতিবাদ করেনি। সংবাদ সম্মেলন করে কি হেফাজত বলেছিল বা কওমি মাদ্রাসার পক্ষে আপনারা বলেছিলেন কি যে আমরা তাকে কওমি জননী উপাধি দিইনি, এটা মাওলানা রুহুল আমিনের ব্যক্তিগত বিষয়? আজিজুল হক : উপস্থিত ব্যক্তিরা কেন প্রতিবাদ করেননি, সেটি তাদের ব্যাপার। জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)-এর পক্ষে আমি বিবৃতি দিয়ে সেটা প্রত্যাখ্যান করেছি। এ উপাধি হেফাজত দেয়নি, জাতিকে জানিয়েছি আমরা। এশিয়া পোস্ট : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আজিজুল হক : আপনাদেরও ধন্যবাদ।
হেফাজতের শহীদদের ইতিহাস থেকে মোছার ষড়যন্ত্র হয়েছে, কওমি স্বীকৃতি ছিল ধোঁকাবাজি
ছাত্রদের কারণেই নতুন জীবন পেয়েছি : ইসহাক সরকার
জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার। যুবদল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর সম্প্রতি এনসিপিতে যোগ দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৩৬৬টি রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছেন। তিনি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। কথা বলেছেন দলবদল, রাজনীতি ও সমসাময়িক বিভিন্ন প্রসঙ্গে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর। এশিয়া পোস্ট : গত কয়েক দিন আগেও আপনি বিএনপির ইসহাক সরকার নামে পরিচিত ছিলেন। এখন এনসিপির ইসহাক সরকার। এই দুই দলের ইসহাক সরকার—কেমন লাগছে, অনুভূতি কেমন? ইসহাক সরকার : খুব ভালো লাগছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো পথচলা এবং নতুন করে আবার শুরু করা—দুইটার মধ্যে অনেক ভিন্নতা আছে। যেহেতু দীর্ঘদিন একসঙ্গে পথ চলেছি, আবার নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। এশিয়া পোস্ট : আপনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন, যুবদলেও ছিলেন একই পদে। আপনার রাজনীতি শুরু করেছেন ছাত্রজীবনে। শুরুর গল্পটা কেমন ছিল? ইসহাক সরকার : প্রথমে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অল্প অল্প করে রাজনীতির ময়দানে আসা শুরু করি। আমার এলাকার এক বড় ভাই ছিলেন, বর্তমানে সাংবাদিক মমিন ভাই। উনার হাত ধরে তৎকালীন ৩৫নং ওয়ার্ড, তৎকালীন ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। প্রথম যখন রাজনীতিতে আসি—মিছিল, মিটিং, সভা, সমাবেশ খুব একটা ভালো লাগত না। আমরা বিএনপির পার্টি অফিসের সামনে এসে বসে পড়তাম, সেখানে নেতারা বক্তব্য রাখতেন। আমরা মাটিতে বসে বক্তব্য শুনতাম। অনেক সময় ডানে-বামে তাকিয়ে দেখতাম যে নেতা আছেন কি না। না থাকলে পেছন থেকে পালিয়ে চলে যেতাম। এভাবে অনেক দিন করার পর আস্তে আস্তে আবার কেন জানি আকর্ষিত হয়ে যাই। আকর্ষণ হওয়ার পর থেকেই পথচলা শুরু। এরপরে আপনার ’৯১-তে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল, এরপর ’৯৬ পর্যন্ত ছিল। ’৯৬ থেকে যখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে চলে গেল বিএনপি, ঠিক তখন থেকেই আমার সক্রিয় রাজনীতিতে একেবারে পথচলা শুরু। এশিয়া পোস্ট : আপনার রাজনীতিতে উত্থান নিয়ে প্রায়ই নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর নাম বলেন। ছাত্রদল বা যুবদলে পদপদবি কি তার কারণেই পেয়েছেন? ইসহাক সরকার : আমরা কঠোর পরিশ্রম করে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এসেছি। তখনও ১০৭টি মিথ্যা মামলায় আমাকে জড়ানো হলো। পুরান ঢাকা মানে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ এবং এর বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। তখন আমাদের পিন্টু ভাই, সাদেক হোসেন খোকা ভাই ছিলেন ওই এলাকার দায়িত্বে। যে কারণে আমরা ব্যাপক ও তীব্র আন্দোলন করতাম। তো আমরা আন্দোলন করেই দায়িত্বে এসেছি। আমরা কোনো ভাইয়ের কারণে আন্দোলনে বা আমাদের দায়িত্বে আসিনি, পদ-পদবিতে আসিনি। আমার বিরুদ্ধে ৯৮ থেকে মামলা শুরু হলো। ৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে ১০৭টি মিথ্যা মামলা করা হলো। আমার পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও একই পরিমাণে মামলা দেওয়া হলো। যখন গ্রেপ্তার হলাম, আমার ছোট ভাই থানাহাজতে খাবার দিতে গেল। তার বয়স ১২ কিংবা ১৩ হবে, হাফেজি পড়ে। তখন কোতোয়ালির ওসি ছিল মনোয়ার হোসেন। স্পষ্ট মনে আছে, মনোয়ার সাহেব যখন রুম থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন আমাকে খাবার দিচ্ছে। তিনি আমার ভাইকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, ‘এই, এটা কে?’ বললাম, ‘মনোয়ার ভাই, আমার ছোট ভাই, খাবার দিতে আসছে।’ মনোয়ার সাহেব বললেন, ‘এই সেন্ট্রি, ওকে অ্যারেস্ট করো। ওকেও ধরো।’ ওকে ধরে আমার সামনে মনোয়ার সাহেব বেদম প্রহার করলেন। আমি তখন লকআপ ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ‘মনোয়ার ভাই, আমার ছোট ভাই তো রাজনীতি করে না। ওকে এভাবে নির্যাতন করছেন? ও তো এগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখে না। আমাকে খাবার দিতে আসছে। ওকে মারবেন না। ওর জীবনটা নষ্ট করে দেবেন না। ও ভয় পেয়ে যাবে।’ কোনো কথাই শুনলেন না। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, সন্ধ্যার পরে ছেড়ে দেব।’ এই কথা বলার পরও তার বিরুদ্ধে প্রায় ১৪টি মামলা করল। আমার বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে ১৫২টি মিথ্যা মামলা করা হলো। তো পরিবারের ওপর টার্গেট করেই একের পর এক মামলা দেওয়া হলো। যেহেতু পুরান ঢাকা আন্দোলনের ক্ষেত্র, আন্দোলনের জায়গা, সেই হিসেবে আমাদের এই মামলাগুলো দেওয়া হতো। প্রতিদিন হরতাল হওয়ামাত্রই আমি থাকি বা না থাকি, আমার বিরুদ্ধে পাঁচটি, সাতটি, ১০টি মামলা দিত। এশিয়া পোস্ট : নিজের রাজনীতির কারণে পরিবারকে এ রকম বেগ পোহাতে হচ্ছে, তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, বিড়ম্বনায় পড়ে যাচ্ছে। নিজেকে কখনো অপরাধী মনে হয়? ইসহাক সরকার : নিজেকে কখনো অপরাধী মনে হয়নি। কারণ, আমার পরিবারের পক্ষ থেকে আমাকে সমর্থন ছিল এবং ভালোবাসাও ছিল। আমার মা-বাবা বৃদ্ধ ছিলেন। আমি যখন ’৯৮ সালে গ্রেপ্তার হলাম, দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর একটানা কারাগারে ছিলাম। কারাগারে থাকা অবস্থায় বাবার মৃত্যুসংবাদ পাই। কারাগারে থাকা অবস্থায় আমাকে যখন প্যারোলে মুক্তির ব্যবস্থা করা হলো, আদালত প্রথমে নাকচ করে দিয়েছেন। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। আমাদের পিন্টু ভাই ম্যাডামের পারমিশন নিয়ে নাসিম সাহেবের সঙ্গে কথা বলেন। তখন আমাকে দুই ঘণ্টার জন্য প্যারোলে নিয়ে আসেন। এশিয়া পোস্ট : আপনার ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং মুহূর্ত কোনটা ছিল? ইসহাক সরকার : আমার পুরো সময়টাই চ্যালেঞ্জিং ছিল। ’৯৮ সাল থেকে জেল খাটা শুরু করলাম, এক দিনের জন্য স্বস্তি পাইনি। জেলখানা থেকে বের হয়ে আসার পরও যখনই জামিনে বের হতাম, আবার আমাকে জেলগেট থেকে গ্রেপ্তার করা হতো। প্রায় আটবার গ্রেপ্তার করেছিল জেলগেট থেকে। আমি জামিনে মুক্ত, হাইকোর্ট মুক্তির অর্ডার দিয়েছেন—‘নট টু অ্যারেস্ট, নট টু হ্যারাস’। মানে তাকে অ্যারেস্টও করা যাবে না, হ্যারাসমেন্টও করা যাবে না। এরপরও আমাকে কারাফটক থেকে প্রায় যতবার জামিন নিয়ে বের হই, ততবারই গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পুরো জীবনটা এভাবেই কেটেছে। বিশেষ করে আমি সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করেছি ৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত। পুরান ঢাকার নয়াবাজার ও বংশাল এলাকায় যখন আন্দোলন করি, তখন আমার সাতজন বন্ধু পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল। আর সবচেয়ে বেশি খারাপ সময় গেছে কিছুদিন আগে, যখন ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা জুলুমের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তখন আমাদের ওপর হুলিয়া এসে পড়ল। আমার বিরুদ্ধে ৩৬৬টি মিথ্যা মামলা করা হলো। আমার পরিবারের বিরুদ্ধে শতাধিক মিথ্যা মামলা হলো। ছোট ভাই, বড় ভাই—সবাই আক্রান্ত হলো। আমি যখন কারাগারে, তখন বাসার সুয়ারেজ লাইন কেটে দিল, বাসার বিদ্যুতের লাইন কেটে দিল। মানে একটা পরিবারের ওপর যত রকম হামলা করা যায়। শেষে আমার দুইটা ছোট বাচ্চার ওপরও মামলা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হলো। আমাকে গুম করে ফেলার চেষ্টা করা হলো। আন্দোলন করতে গিয়ে আমার নিজের হাতে গড়া সাত সহযোদ্ধা—তার মধ্যে আমার আপন ভাতিজাও আছে—তাদের ২০১৩ সালে গুম করে ফেলেছিল। আজও তাদের কোনো খোঁজ পাইনি। সবচেয়ে খারাপ লাগার মুহূর্ত ছিল যখন আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। আমাকে পার্টি থেকে বলা হয়েছিল প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। এশিয়া পোস্ট : রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে খারাপ লাগা বা হতাশার কোনো ঘটনা আছে কি না? ইসহাক সরকার : এবার আমি যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি, তখন একটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। আমাদের ওই এলাকার পাঁচজন প্রার্থী একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে আমরা বিদ্রোহ করি। বিদ্রোহ করার পর আমাদের দাবি ছিল যে আমাদের মধ্য থেকে এই এলাকার স্থানীয় যারা আছেন, তাদের মধ্য থেকেই আপনি যাকেই মনে হয় তাকেই মনোনয়ন দেবেন। আমরা এখানে সবাই নির্যাতিত পরিবার। যেমন আলহাজ নাসিরুদ্দিন আহমেদ পিন্টু ভাইয়ের পরিবার, মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ ভাইয়ের পরিবার, যিনি মৃত্যুঞ্জয়ী জননেতা, মীর মোশারফ হোসেন খোকন ভাই, উনিও নির্যাতিত এবং বারবার নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, মনির চেয়ারম্যান, যিনি মৃত্যুঞ্জয়ী; যাকে আটটি গুলি করা হয়েছিল পার্টির কারণে—উনিও ছিলেন একজন প্রার্থী। আমরা পাঁচজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে পার্টিকে বললাম যে অন্তত আমাদের মধ্য থেকেই যে কাউকে নমিনেশন দেন। কিন্তু পার্টি সেটার ব্যাপারে কোনো কর্ণপাত করেনি। বহিরাগত একজনকে এনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছিল। একে একে সবাইকে পার্টি ডেকে নিয়ে আলাদাভাবে কথা বলে বসিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু একমাত্র আমি ডাক পাইনি। কেন পাইনি, আমি সেটা আজও জানি না বা আমাকে কেন ডাকা হলো না, সেটা বুঝতে পারিনি। তখন খুব খারাপ লেগেছিল। পরে তো আমাকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করে দেয়। কোনো ধরনের চিঠি বা কোনো ধরনের শোকজ বা কোনো কিছু জানানো হয়নি। আমি অনলাইন, টিভি ও সংবাদের মাধ্যমে জানতে পারি যে আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তখন জীবনের ৩০ বছরের দুঃখ-কষ্ট সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছিলাম। সেদিন ভেবেছিলাম, এই পার্টির জন্য এত কষ্ট করলাম, জীবন-যৌবন বিসর্জন দিলাম, পার্টি অন্তত একটিবারের জন্যও আমাকে ডাকতে পারত। আমাকে বললে হয়তো বসে যেতাম। আমি পার্টির আনুগত্যের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল ছিলাম। কারণ, এই পার্টিকে আমি বুকে ধারণ ও লালন করেছি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে আমি অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি। উনি আমাকে স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন এবং সন্তানের মতো আদর করতেন। সেই পার্টির বিরুদ্ধে যাব—এটা আমি কোনো দিনই কল্পনা করতে পারিনি। সেদিনই আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময় গেছে। আমাকে বহিষ্কার করার পর অঝোরে কান্না করেছিলাম। এশিয়া পোস্ট : এবার ভালোটা জানতে চাই। সবচেয়ে ভালো লাগার মুহূর্ত কোনটা ছিল? ইসহাক সরকার : ভালো লাগার মুহূর্তগুলো ছিল, যখন ম্যাডাম খুব কাছ থেকে আদর করতেন। আমি এক দিন ম্যাডামের কাছে হাজির হলাম, ম্যাডাম ট্রিটমেন্টের জন্য হাসপাতালে যাবেন। আমরা তার গুলশানের বাসায় উপস্থিত হলাম। একে একে সবাই দাঁড়িয়ে সালাম বিনিময় করছি। ঠিক ওই মুহূর্তে আমাদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. জেড এম জাহিদ খান বলছেন, ‘ম্যাডাম আসছে।’ ম্যাডাম দেখে বললেন, ‘ইসহাক না? ইসহাক সরকার? ইসহাক সরকার আসছে, ওকে আমি অনেক পছন্দ করি। ওর জীবনের সব অর্জন ও কষ্ট আমি নিজের চোখে দেখেছি। ওকে তোমরা দেখে রাখবা।’ আমার নামেই তিনি চিনতেন আমাকে। শুধু তা-ই নয়, আমি যখন ছোট ইসহাক সরকার, আমার বয়স তখন ২০ বছর—তখন প্রতিটা প্রোগ্রামে ম্যাডাম বক্তব্যের মাঝখানে আমার নাম বলে বলতেন যে ‘ইসহাক সরকার ছোট্ট একটা ছেলে, তার বিরুদ্ধে শতাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়েছে।’ প্রতিটা স্টেজ প্রোগ্রামে ম্যাডাম আমার কথা বলতেন। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এশিয়া পোস্ট : এই ৩০ বছর আপনি বিএনপিতে পার করেছেন—বিএনপির ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠন—সব মিলিয়ে কী পেলেন বিনিময়ে? ইসহাক সরকার : মানুষের ভালোবাসা। সারা দেশের তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের যে ভালোবাসা পেয়েছি, এটা কোনো পদ-পদবি বা অন্য কিছু দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। আমি ইসহাক সরকার সারা জীবন সততা নিয়ে রাজনীতি করেছি। কেউ বলতে পারবে না ইসহাক সরকারের আচরণে কষ্ট পেয়েছে। এরপরও মানুষমাত্রই ভুল হতেই পারে, কিন্তু জানামতে আমি কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলিনি বা কারও ওপরে জুলুম করিনি, অত্যাচার করিনি অথবা একজন নেতা হিসেবে কারও প্রতি অন্যায় কোনো কিছু চাপিয়ে দিয়েছি ইনশাআল্লাহ এটা কেউ বলতে পারবে না। এই যে মানুষের যে ভালোবাসা, এটা কোনো কিছুর বিনিময়ে পাওয়া সম্ভব নয়। আমি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, জনগণের ভালোবাসা পেয়েছি এবং নেতাকর্মীদের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছি—এটাই আমাকে এত দূর নিয়ে এসেছে। আজ আপনি আমাকে এখানে ডেকেছেন। আমি যদি একজন সাধারণ নেতা বা কর্মী হতাম, হয়তো ডাকতেন না। অসাধারণ কিছুটা হয়তো হয়েছি জনগণের ভালোবাসায়, যার কারণে আজ আমাকে এখানে ডেকেছেন। এশিয়া পোস্ট : বিএনপি থেকে ঠিক আছে আপনি অভিমান করেছেন বা আপনাকে রাখা হয়নি। আপনার কাছে কেন উপযুক্ত মনে হলো এনসিপিকে? ইসহাক সরকার : ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও গণবিপ্লবের মধ্য দিয়েই ৫ তারিখের ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে। আমি উপযুক্ত এই কারণে মনে করছি যে ছাত্ররাই কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং আমি সে সময় ছাত্রদের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের পতনের ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছিল যে আমরা ১৭ বছর যে কাজটি করতে পারিনি, তারা সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। আমার দলের সব নেতাকর্মী যার যার অবস্থান থেকে নেমে পড়েছিল, কিন্তু নেতৃত্বের মূল জায়গাটাই ছিল এই ছাত্ররা। ৩৬৬টি মামলার মধ্যে মাত্র পাঁচটি মামলায় আমাকে ২২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আমার উপলব্ধি হলো, এই ছাত্রদের কারণেই আমি পুনরায় নতুন জীবন ফিরে পেলাম। তাদের কারণেই আমাকে হয়তো ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হলো না। তাদের কারণেই আমরা গণতন্ত্র ফিরে পেলাম এবং আমাদের অধিকার ও মানবাধিকার ফিরে পেলাম। এখন আমার মনে হলো এই ছাত্রদের দিয়েই আমাদের দেশের আমূল পরিবর্তন সম্ভব। এই ছাত্রনেতারা যোগ্য ও মেধাবী এবং তারা যে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে, সেটা আমরা আরও অনেক চেষ্টা করলে হয়তো পেরে উঠতাম না। কারণ, আমরা সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে শত শত মিথ্যা মামলা ছিল। আমাদের সিনিয়র নেতাদের জুডিশিয়ারি কিলিং করা হচ্ছিল। কারাগারে পিন্টু ভাইকে হত্যা করা হলো এবং বেছে বেছে চৌধুরী আলমকে গুম করা হলো। এভাবে নেতাকর্মীদের যেভাবে ফ্যাসিবাদের ষড়যন্ত্রে হত্যা ও গুম-খুনের শিকার হতে হচ্ছিল, তাতে আমরা সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আজ আল্লাহর বিশেষ দয়ায় এই ছাত্রদের কারণে আবার প্রাণশক্তি ফিরে পেয়েছি। এশিয়া পোস্ট : জুলাই আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন ব্যক্তিকে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উপস্থাপন করে। আপনার দৃষ্টিতে কাকে মাস্টারমাইন্ড মনে করেন? ইসহাক সরকার : আমি মাস্টারমাইন্ড মনে করি যারা ব্যক্তিগতভাবে রাজপথে নেমে আসছিল, তারাই মাস্টারমাইন্ড। এখানে কেউ বলতে পারবে না যে এককভাবে এই কৃতিত্ব কারও ব্যক্তিগত। আপনি হাসনাত বলেন, সারজিস বলেন বা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন—যাদের কথাই বলেন, কেউ এটার একক মাস্টারমাইন্ড নয়। আমি মনে করি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। এটা কেউ যদি বলে যে, অমুক ব্যক্তি মাস্টারমাইন্ড বা অমুক বিদেশ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে—আমি এটাকে বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি যে এটা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আপনি যখন একজন সাংবাদিক এবং আপনি যখন দেখবেন যে আপনার সন্তান বাহিরে আন্দোলন করতে নেমে গেছে, আপনি বাবা হিসেবে ঘরে বসে থাকতে পারতেন? আমাদের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। আমরা যখন দেখেছি আমাদের সন্তানরা রাজপথে নেমে এসেছে এবং আমাদের কোমলমতি ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছে, তখন সবাই যার যার অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছি। এখানে কেউ আলাদা মাস্টারমাইন্ড নয়। আর যদি আমরা কোনো বিশেষ মাস্টারমাইন্ডের কথা মনে করতাম, তাহলে এই ছাত্র-জনতা ও আপামর জনগণ রাস্তায় নেমে আসত না। এশিয়া পোস্ট : আপনি বলেছেন যে পুরান ঢাকায় আপনার জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থন আছে। যদি এত জনসমর্থন থাকে, তাহলে গত নির্বাচনে আপনি প্রার্থী হয়েছেন, আপনার ভোটের পরিমাণ তুলনামূলক কম। এটা কেন হয়েছে? ইসহাক সরকার : আপনারা তো জানেন নির্বাচনটা কেমন হয়েছে। আমার কাছে তো মনে হয় ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। তিন ঘণ্টা ভোটকেন্দ্রের সামনে যেতে দেয়নি। গণনা করার সময় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমার পোলিং এজেন্ট যারা ছিল, তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে এবং সকালে যারা ঢোকার চেষ্টা করেছিল, তাদের অনেককে বের করে দিয়েছে। সেখানে আমার কাছে মনেই হলো যে ইলেকশনটা ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। কারণ কী? ওখানে ঘোষণা শুনতে পেলাম যে জামায়াতের প্রার্থী পাস করেছে, কিন্তু তিন ঘণ্টা পর ভোরে আবার শুনলাম যে না, বিএনপির প্রার্থী পাস করেছে। তো কে পাস করেছে বা কে ফেল করেছে সেটা বিষয় না। আমি দুই দিনে ৬০০০ গণস্বাক্ষর নিয়েছিলাম। আমি যেহেতু স্বতন্ত্র থেকে দাঁড়িয়েছিলাম, তাই বিধান অনুযায়ী ৬০০০ লোকের সমর্থন থাকা দরকার। আমি সেই স্বাক্ষর দিয়েছি। তো ওই ৬০০০ পরিবার গেল কোথায়? আমাকে তো এত কম ভোট পাওয়ার কথা না। কাজেই আমার কাছে মনে হয়েছে নির্বাচনটা একটু ব্যতিক্রম হয়েছে এবং রেজাল্ট শিটে অনেক পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি। এশিয়া পোস্ট : আপনি এনসিপিকে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আপনাকে দলে পেয়ে এনসিপির কী লাভ হলো? ইসহাক সরকার : এনসিপি কী পেয়েছে না পেয়েছে, সেটা তো আমি জানি না। উনারা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, এতটুকুই বুঝি। পুরান ঢাকায় আমাদের সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা আমি পালন করব। এনসিপির কী লাভ হয়েছে, তা এনসিপিই ভালো বলতে পারবে। কিন্তু আমি মনে করি আমার লাভ হয়েছে। আমি যদি দুই বছর ঘরে বসে থাকতাম, তাহলে রাজনীতির ময়দান থেকে হারিয়ে যেতাম। আর এনসিপিতে ঢুকেছি বিধায় আপনারাই আমাকে স্টুডিওতে ডেকেছেন। যদি প্রবেশ না করতাম, তাহলে হয়তো ডাকতেন না এবং আমার খোঁজও নিতেন না। এশিয়া পোস্ট : আপনার বেশ কয়েকটি বক্তব্য এখন আলোচনায়। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, সেখানে এখন পকেট কমিটি দেওয়া হয় বা সুবিধাবাদীদের পদ দেওয়া হয়। আপনার কাছে এ রকম কেন মনে হয়? ইসহাক সরকার : দেখুন, এটি তো একটা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলে। পদ-পদবি ও নেতৃত্ব তো ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয় না। বিএনপির মতো বা আওয়ামী লীগের মতো দলগুলোতে সংগঠন শক্তিশালী করার নামে একবার ছাত্রদলের নেতা নির্বাচন হয়েছিল, কিন্তু সেটাও ছিল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এবং ওগুলো ছিল একটা আইওয়াশ মাত্র। আমার কাছে মনে হয় যে এই কাজগুলো যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয়, তাহলে যোগ্য ও নির্যাতিত যারা জনগণের ভালোবাসা অর্জন করতে পারে, তারাই নেতৃত্বে আসতে পারবে। অন্যথায় এভাবে চলতে থাকলে বড় সংগঠনগুলো নেতৃত্ব-সংকটে পড়বে। এশিয়া পোস্ট : জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের অবস্থান এবং সংসদের ভেতরে ও বাইরের বিতর্ক নিয়ে কী বলবেন? ইসহাক সরকার : জুলাই সনদ নিয়ে প্রতিটা রাজনৈতিক দল ঐকমত্যে পৌঁছেছিল এবং সেই ভিত্তিতেই ১২ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সবাই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু হঠাৎ বিএনপির কী এমন হয়ে গেল যে তারা জুলাই সনদ থেকে দূরে সরে এল? কয়েক দিন আগেও প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন জুলাইয়ের প্রতিটা সনদ মানা হবে, কিন্তু আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন যে কেন আমরা মানব? তখন নির্বাচনের স্বার্থে বলেছিলাম। এই যে কনট্রাডিকশন, এটা জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার নামান্তর। যদি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়, তবে জনগণ গণভোটের দাবিতে আবার রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে। এশিয়া পোস্ট : বিএনপি থেকে এনসিপিতে আসায় পুরান ঢাকার রাজনৈতিক মেরুকরণে কি কোনো প্রভাব পড়েছে? ইসহাক সরকার : কিছুটা প্রভাব পড়েছে। সাধারণ জনগণ যারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন, তাদের সমর্থন আমি পেয়েছি। আমার মতো সবাই তো এই সময়ে ঝুঁকি নেবে না। যারা ঝুঁকি নেওয়ার তারা নিয়েছে এবং সাধারণ জনগণের একটি বৃহৎ অংশ আমাকে সমর্থন জুগিয়েছে। আমি রাস্তায় বের হলে তারা আমাকে অভিনন্দন জানায় যে আমি ভালো কাজ করেছি। তাই আমি মনে করি সাধারণ মানুষ আমার সঙ্গে আছে। এশিয়া পোস্ট : এবার যেহেতু আপনি নির্বাচন করেছেন এবং স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করেছেন, আগামী দিনে এনসিপির সঙ্গে আসন বা মনোনয়ন নিয়ে কি কোনো কথা হয়েছে? ইসহাক সরকার : এখনো ও রকম কোনো কথা হয়নি। আমি আগেও বলেছি যে এমপি বা মন্ত্রী হওয়া আমার মুখ্য বিষয় নয়, আমি জনগণের সেবা করতে চাই। ভাগ্য যখন যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই কাজ করব। আমি পাস করলে হয়তো এখন সংসদে থাকতাম। তবে প্রত্যেক রাজনৈতিক কর্মীর একটা লক্ষ্য থাকে এবং আমি আগামীতে ঢাকা-৭ আসন থেকে এনসিপির হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এশিয়া পোস্ট : আগামী পাঁচ বছরে ইসহাক সরকার নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে বা দলের কোন অবস্থানে দেখতে চান? ইসহাক সরকার : দল আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, তার মাধ্যমে আমি সংগঠনকে শক্তিশালী করব। সংগঠন দুর্বল থাকলে রাজনৈতিক দল টিকে থাকতে পারে না। তাই আমার প্রধান লক্ষ্য হলো দলকে শক্তিশালী করা। তৃণমূল পর্যায় থেকে এনসিপিকে শক্তিশালী করার জন্য আমি আমার সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাব। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ থেকে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নির্বাচন করবেন এবং সেখানে একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে আমি মনে করি। এশিয়া পোস্ট : নতুন যারা রাজনীতিতে আসতে চায়, তাদের জন্য আপনার কী মেসেজ থাকবে? তারা কী দেখে দল বেছে নেবে? ইসহাক সরকার : আমি মনে করি প্রথমে দলের আদর্শ দেখা উচিত। কোন দলটা সবচেয়ে আদর্শভিত্তিক এবং দেশ পরিচালনায় জনগণের প্রতি তাদের কতটুকু ভরসা আছে তা দেখা দরকার। ক্ষমতাসীন দল হোক বা বিরোধী দল, তারা জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে আছে কি না সেটা বিবেচনা করা উচিত। জনগণ যেটাকে ভালো মনে করবে, সেটাই পছন্দ করবে। কারণ, সবারই গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার আছে। আমি এনসিপি পছন্দ করেছি কারণ তারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে। আমি সবাইকে অনুরোধ করব আপনারা যোগ্য ও আদর্শবান নেতাদের দেখে পার্টিতে অংশগ্রহণ করবেন। এশিয়া পোস্ট : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ইসহাক সরকার : আপনাদেরও ধন্যবাদ।
ছাত্রদের কারণেই নতুন জীবন পেয়েছি : ইসহাক সরকার
‘বিএনপি-জামায়াতের দূরত্ব নতুন প্রজন্মের মনে হতাশা সৃষ্টি করছে’
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত ব্যক্তি মুজিবুর রহমান মঞ্জু। একসময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রিয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় রাজনীতে ছিলেন। পরবর্তীতে দলটিতে সংস্কারের প্রস্তাব তুলে বহিষ্কৃত হন এবং নতুন রাজনৈতিক দল আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) গঠন করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেপথ্য কারিগরদের একজন হিসেবেও তাঁর নাম আলোচনায় রয়েছে। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের আলাপন অনুষ্ঠানে এসেছিলেন অতিথি হিসেবে। দেশের সমসায়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর। এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের পর সকল রাজনৈতিক মঞ্চে ও সমীকরণে আপনার এবং আপনার দলের জোরালো উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর তেমনটি আর দেখা যাচ্ছে না। কেন? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: বিষয়টি মোটেও আড়ালে চলে যাওয়া নয়। আমাদের বুঝতে হবে যে এবি পার্টি একটি নতুন ধারার রাজনৈতিক দল। আমরা যখন এই দল গঠন করেছি, তখন আমাদের মূল ফোকাস বা লক্ষ্য ছিল আন্দোলনের দিকে, প্রথাগত নির্বাচনের দিকে নয়। আমাদের দেশে নির্বাচনের যে প্রচলিত সংস্কৃতি বা ট্র্যাডিশনাল পজিশন আছে, সেখানে অংশগ্রহণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে প্রতিটি আসনে অত্যন্ত সুপরিচিত ও শক্তিশালী প্রার্থী থাকা, মার্কার ব্যাপক পরিচিতি থাকা এবং একটি সুদৃঢ় সাংগঠনিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তির প্রয়োজন হয়। আমরা যেহেতু একটি উদীয়মান ও নতুন দল, তাই আমাদের সবটুকু শক্তি আমরা ব্যয় করেছিলাম ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণআন্দোলনে। আমাদের পুরো মনোযোগ ছিল রাজপথে। ফলে নির্বাচনমুখী সুনির্দিষ্ট ফোকাস আমাদের সেভাবে ছিল না। এছাড়া ৫ই আগস্টের পর দেশের রাজনীতিতে যে বিশাল পরিবর্তন ও ধকল গিয়েছে, সেখান থেকে নিজেদের মানসিকভাবে গুছিয়ে নেওয়া এবং আন্দোলনের ক্লান্তি বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে দাঁড়ানোর জন্য আমরা ইচ্ছা করেই কিছুটা সময় নিয়েছি। আমরা এখন দলকে তৃণমূল পর্যায়ে সুসংগঠিত করার কাজ করছি এবং সামনের দিনগুলোতে আমাদের সরব উপস্থিতি পুনরায় দেখা যাবে। এশিয়া পোস্ট: আপনি যে দল থেকে নীতিগত পার্থক্যের কারণে বহিষ্কৃত হলেন, সেই জামায়াতে ইসলামীর সাথেই আবার একটি নির্বাচনী জোটে আপনাদের যেতে দেখা গেল। এটা কি অনেকটা স্ববিরোধী নয়? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: দেখুন, আদর্শিক বা প্রিন্সিপাল জায়গা থেকে বিচার করলে এটি হওয়ার কথা ছিল না। আমি যে কারণে জামায়াত থেকে বের হয়েছিলাম, সেই পার্থক্যগুলো এখনো বিদ্যমান। তবে রাজনীতিতে অনেক সময় ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং বিশেষ কোনো মহৎ লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিতে হয়। আমরা ৫ই আগস্টের এই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বা ‘জুলাই স্বার্থকে’ সবার উপরে রেখেছি। আমরা যখন ঐক্যমত্য কমিশনে কাজ করছিলাম, তখন আমাদের লক্ষ্য ছিল বিএনপিকে সাথে নিয়ে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়া। আমরা বিএনপিকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে ১৫ বছরের অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পর দেশ পুনর্গঠনে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম বিএনপি অনেকগুলো মৌলিক সংস্কারের জায়গায় দ্বিমত পোষণ করছে বা ‘নোট অফ ডিসেন্ট’ দিচ্ছে। অন্যদিকে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে আমরা জামায়াতকে অত্যন্ত আন্তরিক পেয়েছি। আমাদের সাথে তাদের আদর্শিক বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু রাজপথের লড়াইয়ে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষায় জামায়াতের সাথে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি মিলে গেছে। আন্দোলনের সময় তো আর দল আলাদা ছিল না; বিএনপি, জামায়াত, এবি পার্টি কিংবা সাধারণ মানুষ—সবাই একাকার হয়ে লড়াই করেছি। তখন কে কাকে বহিষ্কার করেছে সেই পুরোনো হিসাব বড় ছিল না। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হওয়াটাই ছিল জরুরি। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের স্বার্থে আমরা কেবল একটি নির্বাচনী ও কৌশলগত অ্যালায়েন্স করেছি। এটি কোনোভাবেই মতাদর্শিক বা চিরস্থায়ী কোনো ঐক্য নয়। এশিয়া পোস্ট: অনেকের মনেই একটি গভীর সন্দেহ আছে যে, এবি পার্টি আসলে জামায়াতে ইসলামীরই একটি ছায়া সংগঠন। ভিন্ন নামে আপনারা আসলে জামায়াতের পুরোনো এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করছেন কি না? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: যদি এমনটিই হতো, তবে তো জামায়াত যখন ৫ই আগস্টের পর সগৌরবে রাজনীতিতে ফিরে এল, তখনই আমরা সেই দলে ফিরে যেতাম। কিন্তু আমাদের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি জামায়াত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং আমরা আমাদের স্বতন্ত্র অবস্থানে অনড় আছি। জামায়াত মূলত একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল, যাদের প্রতিটি কর্মসূচি ও নীতি আবর্তিত হয় ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে, এবি পার্টি একটি নাগরিক অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাজনৈতিক দল। আমরা ‘সলিউশন বেসড পলিটিক্স’ বা জনভোগান্তি লাঘবের সমাধানমূলক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। আমরা যদি কেবল জামায়াতের গন্ধ মুছে নতুন নাম নিয়ে পুরোনো কাজই করতে চাইতাম, তবে আমাদের আদর্শিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতো না। আমরা যখন দল গঠন করি, তখন অনেকে মনে করেছিলেন আমরা জামায়াতকে ভাঙতে চাই। আসলে আমরা জামায়াতকে ভাঙতে চাইনি, বরং আমি যখন সেখানে ছিলাম তখন ভেতরের সংস্কার চেয়েছিলাম। সেই অধ্যায় এখন শেষ। এখন আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন কালচার ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে চাই। আমরা যে প্রস্তাবনা দিয়েছি, তা আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জামায়াতের পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে মানুষের নাগরিক অধিকারই হবে রাজনীতির মূল ভিত্তি। এশিয়া পোস্ট: জামায়াতে থাকার সময় আপনি ঠিক কী ধরনের পরিবর্তনের দাবি তুলেছিলেন, যার জন্য আপনাকে বহিষ্কৃত হতে হলো? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: আমাদের প্রধান দুটি প্রস্তাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রথমত, আমরা বলেছিলাম জামায়াতকে একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক দল বা ‘ফুলফ্লেজড পলিটিক্যাল পার্টি’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। জামায়াত যেহেতু একটি ধর্মভিত্তিক দল, তাই তাদের কর্মকাণ্ডে অনেক ধরণের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। আপনি দেখবেন, বিএনপি বা আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী যখন কোনো স্লোগান দেয় বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারণা চালায়, তখন সমাজ সেটাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি হিসেবে স্বাভাবিকভাবে নেয়। কিন্তু জামায়াত যখন একই কাজ করে, তখন মানুষ প্রশ্ন তোলে যে এটি ইসলামী শরিয়তসম্মত কি না। জামায়াতকে সবসময় তার আদর্শের বিচারে যাচাই করা হয়, কিন্তু অন্যান্য দলকে দেখা হয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিচারে। আমরা বলেছিলাম এই আলোচনাটি দলের ভেতরে হওয়া দরকার। দ্বিতীয়ত, আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে জামায়াতের দুটি আলাদা শাখা থাকতে পারে—একটি অংশ থাকবে যারা শুধু ধর্মীয় ও নৈতিক প্রশিক্ষণের কাজ করবে, আর অন্য অংশটি হবে সম্পূর্ণ একটি আধুনিক রাজনৈতিক দল। বর্তমানের গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতি করতে গেলে অনেক সময় রণকৌশলগত কারণে আপোষ করতে হয়, যা কট্টর ধর্মীয় অবস্থান থেকে করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। আমি বিশ্বাস করি, জামায়াত এখন অনেক ক্ষেত্রেই ইনক্লুসিভ হওয়ার চেষ্টা করছে, নারী-পুরুষ একসাথে কর্মসূচি পালন করছে কিংবা অমুসলিমদের সমর্থন চাইছে। এগুলো আসলে আমাদের সেই প্রস্তাবিত সংস্কারেরই ফল। আজ হোক বা কাল, জামায়াতকে এই পরিবর্তনের পথেই হাঁটতে হবে, এমনকি ভবিষ্যতে হয়তো তারা দলের নামও পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। তাদের অনেক অঙ্গসংগঠনের নাম থেকে ইতিমধ্যে ‘ইসলাম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। সার্বজনীন দল হতে গেলে আপনাকে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতেই হবে। এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেপথ্য নায়ক হিসেবে আপনার ভূমিকা বেশ আলোচিত। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে সংগঠিত করার পেছনেও আপনার জোরালো তৎপরতা ছিল। আপনি মেন্টর হিসেবে ছাত্র সমন্বয়কদের অনেককে পরিচালিত করেছেন বলেও শোনা যায়।  মুজিবুর রহমান মঞ্জু: মাস্টারমাইন্ড নিয়ে এখন অনেকেই অনেক কথা বলছেন। তবে আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, কোনো একক ব্যক্তি এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড নয়। যদি নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে কাউকে মাস্টারমাইন্ড বলতে হয়, তবে তিনি হচ্ছেন শেখ হাসিনা। তাঁর একগুঁয়েমি, চরম অহংকার, ভুল পদক্ষেপ এবং একের পর এক ফ্যাসিস্ট আচরণ পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য করেছে। বিএনপি বা জামায়াতের মতো বড় দলগুলো গত ১৫ বছরে অনেক আন্দোলন করেছে, অনেক প্রাণ দিয়েছে, কিন্তু জুলাই মাসে ছাত্ররা যখন ডাক দিল, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অভূতপূর্ব গণজোয়ার তৈরি হলো, তা নজিরবিহীন। মাত্র ১৪-১৫ দিনের মধ্যে শত শত মানুষ শহীদ হয়েছেন। আবু সাঈদের শাহাদাত পুরো জাতিকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছিল। আমরা এবি পার্টি হিসেবে ছোট দল হলেও শুরু থেকেই ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। আমরা একে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছিলাম ফ্যাসিবাদের প্রধান বাধা শেখ হাসিনাকে হঠানোর জন্য। আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর আমরাই প্রথম তাকে ‘এই জামানার বীরশ্রেষ্ঠ’ বলে অভিহিত করি। আজ সফল হওয়ার পর অনেকেই কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত এবং সম্মিলিত গণবিস্ফোরণ। আমাদের দায়িত্ববোধ থেকে আমরা ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। নাহিদ ইসলাম যেদিন প্রথম গ্রেপ্তার হলেন, তার দুই দিন আগে থেকে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। আমাদের কাছে যখন ফোন আসলো যে নাহিদকে কোথাও নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা দরকার, তখন আমি আমার এক বন্ধুর ধানমন্ডির বাসায় তাঁর থাকার ব্যবস্থা করি। সেদিন ধানমন্ডিতে চরম উত্তেজনা ও সংঘাত চলছিল। পরবর্তীতে সেখান থেকেও তাঁকে সরে যেতে হয় কারণ গোয়েন্দারা তাঁর অবস্থান জেনে ফেলেছিল। এরপর নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর বাসা থেকে যখন তাঁকে ডিবি পুলিশ তুলে নিয়ে যায়, আমরাই প্রথম ডিবি অফিসের সামনে তাঁর পরিবার ও সাংবাদিকদের একত্রিত করি। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর সরকার প্রবল চাপে পড়ে যায়। দেখুন, সেই সময়ে আমরা কেউই নিজেদের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা বড় কোনো কারিগর হিসেবে ভাবিনি। আমরা সবাই চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম। আজ আন্দোলন সফল হয়েছে বলে সবাই অবদান স্বীকার করছে, কিন্তু ব্যর্থ হলে হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতো। এটি ছিল একটি যৌথ প্রচেষ্টা যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো এবং ছাত্ররা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে। এশিয়া পোস্ট: বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? ১০-এর মধ্যে আপনি তাদের কত নম্বর দিতে চান? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আমি ১০-এর মধ্যে ৬ দেব। এই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তারা একটি চরম অস্থিতিশীল মুহূর্তে দায়িত্ব নিয়ে নির্বাচনের একটি পথ তৈরি করতে পেরেছে। ড. ইউনূস এমন একজন বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব যার আহ্বানে দেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সাড়া দিচ্ছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে তাদের পরিচালনা পদ্ধতিতে দুর্বলতা ছিল। বিশেষ করে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই সরাসরি ছাত্রদের কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়াটা কিছুটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম যে ছাত্রদের সরাসরি প্রশাসনে না বসিয়ে আগে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ বা ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। এছাড়া সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও পুলিশের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখনো শতভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শুরুতে ছাত্রদের যতটা প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তীতে আবার তাদের সাথে একধরণের দূরত্ব তৈরি হওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সরকারকে আরও বেশি ইনক্লুসিভ হতে হবে এবং সব পক্ষকে সাথে নিয়ে সংকট মোকাবিলা করতে হবে। এশিয়া পোস্ট: গত আড়াই মাসে বিএনপি সরকারের ভূমিকা কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: বিএনপিকে কেবল আড়াই মাসের সরকার হিসেবে দেখলে হবে না। তারা প্রশাসনের অনেক স্তরেই একটি পরোক্ষ প্রভাবে রয়েছে। ৫ই আগস্টের পর থেকে পুলিশ ও সচিবালয়ে বিএনপির সমর্থকদের আধিপত্য বেড়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিএনপির পারফরম্যান্স আমার কাছে কিছুটা হতাশাজনক মনে হয়েছে। তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা এবং গুম কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে জুলাই সনদের মূল অঙ্গীকার থেকে কিছুটা সরে যাচ্ছে বলে মনে হয়। দলীয়করণের যে পুরোনো সংস্কৃতি আমরা দেখেছি, সেই একই পথে হাঁটার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক। তিনি মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সংযত থাকার কঠোর বার্তা দিচ্ছেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সোচ্চার আছেন। তারেক রহমানের সাথে আমার যতবার আলাপ হয়েছে, আমি দেখেছি তিনি একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে ক্ষমতাসীন দল ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু বিএনপির মধ্যম ও নিচুতলার রাজনীতি এখনো সেই পুরোনো ধারার দ্বন্দ্ব ও দখলদারিত্বের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি। এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে সংঘাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে, একে কি আপনি স্রেফ ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখেন? আপনি তো নিজেও একসময় ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বে ছিলেন, আপনার পর্যবেক্ষণ কী? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি পরিস্থিতি। জামায়াত ও বিএনপি সেই ১৯৯১ সালের পুরোনো দ্বন্দ্বে ফিরে যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়। ৯১ সালেও তারা একসাথে ক্ষমতায় আসার পর ক্যাম্পাসগুলোতে ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। বর্তমানে তারা একে অপরকে ‘গুপ্ত’ বা ‘খাম্বা’ বলে যে ভাষায় আক্রমণ করছে, তা আসলে শেখ হাসিনার তৈরি করা রাজনৈতিক ভাষ্য। যখন তারা পরস্পরকে রাজাকার বা দুর্নীতিবাজ বলে গালি দেয়, তখন তারা অবচেতনভাবে হাসিনার ফ্যাসিবাদী বয়ানকেই শক্তিশালী করে। ছাত্রশিবির কোনো গোপন বা গুপ্ত সংগঠন নয়, তবে প্রতিকূল পরিবেশে তারা আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স করেছে, যা পৃথিবীর অনেক দেশের বামপন্থী সংগঠনগুলোও করেছে। এটিকে অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল। এখন ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে তাদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, তা নতুন প্রজন্মের মনে তীব্র হতাশা সৃষ্টি করছে। তারা একসময় রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে, অথচ এখন ক্ষমতার মোহে একে অপরের রক্ত ঝরাচ্ছে। এটি দ্রুত বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা কতটুকু? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: আওয়ামী লীগ একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের দল, তাদের একটি সমর্থক গোষ্ঠী দেশে এখনো আছে। তবে তারা গত ১৫ বছরে এবং বিশেষ করে জুলাই-আগস্টে যে গণহত্যা ও ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে, সেই দায় না নিয়ে তাদের ফেরা প্রায় অসম্ভব। তাত্ত্বিকভাবে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন তখনই সম্ভব হবে, যদি বর্তমান বা ভবিষ্যৎ সরকার তাদের চেয়েও বড় কোনো ফ্যাসিজম কায়েম করে। তখন মানুষ কম্পারিজন বা তুলনার জায়গায় যাবে এবং আওয়ামী লীগকে ‘কম খারাপ’ মনে করতে শুরু করবে। এবারের আন্দোলনে কোটি কোটি মানুষ সম্পৃক্ত ছিল এবং তারা সচক্ষে এই গণহত্যা দেখেছে। তাই আওয়ামী লীগ যদি তাদের ভুলের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা না চায় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না যায়, তবে এই প্রজন্ম তাদের গ্রহণ করবে না। তবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘাত বাড়লে আওয়ামী লীগ সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করবে, এটাই রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। এশিয়া পোস্ট: আপনি দীর্ঘ সময় দিগন্ত টেলিভিশনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ৫ই আগস্টের পর এই চ্যানেলটি পুনরায় চালু হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত তা অন্ধকারেই রয়ে গেছে। এর পেছনে বাধাটা কোথায়? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: দিগন্ত টেলিভিশন চালু না হওয়াটা ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য এবং হাজার হাজার সংবাদকর্মীর জন্য অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। আমি এই প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন থেকে উপ-নির্বাহী পরিচালক ছিলাম। সরকার পরিবর্তনের পর আমার প্রস্তাব ছিল আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় এই দীর্ঘদিনের আর্থিক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ মামলা করব এবং আদালতের মাধ্যমে সম্মানজনকভাবে ফিরে আসব। কিন্তু বর্তমানে যারা এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আছেন, তারা সঠিক পথে হাঁটছেন না। তারা আইনি লড়াইয়ের চেয়ে হয়তো অন্য কোনো পন্থায় বা ব্যক্তিগত লবিংয়ের মাধ্যমে চ্যানেলটি চালুর চেষ্টা করছেন যা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। দিগন্তের শত শত সাংবাদিক ও কর্মচারী বছরের পর বছর ধরে তাদের পাওনা পাচ্ছেন না। আমি মনে করি, বর্তমান নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও অযোগ্যতার কারণেই একটি সম্ভাবনাময় গণমাধ্যম আজ ধ্বংসের মুখে। সরকারের উচিত এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষের রুটি-রুজির কথা ভেবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। এশিয়া পোস্ট: জ্বালানিসহ বৈশ্বিক এবং জাতীয় পর্যায়ে নানা সংকট বাড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? বারবার আমরা জাতীয় ঐক্যের কথা শুনি। এসব সংকট সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যের কোনো প্রয়োজনীতা দেখেন কি না? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: দেশ বর্তমানে একটি চরম অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানির বড় অংশই আমদানিনির্ভর, ফলে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা সরাসরি আমাদের ওপর প্রভাব ফেলছে। ডলারের সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এ অবস্থায় সরকারের উচিত ছিল একটি ‘জাতীয় ঐক্যের’ ডাক দেওয়া। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সাথে নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকার এককভাবে সব সামলানোর যে নীতি নিয়েছে, তাতে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। সরকার যদি প্রকৃত অবস্থা আড়াল করার চেষ্টা করে, তবে ভবিষ্যতে এটি বড় গণবিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। এখনো সময় আছে সবাইকে নিয়ে বসে একটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটনিরসন পরিকল্পনা করার। এশিয়া পোস্ট: এবি পার্টি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? আপনারা কি আগামীতে এককভাবে নির্বাচনের কথা ভাবছেন? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: আমরা এবি পার্টিকে একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হিসেবে দাঁড় করাতে চাই। আমরা ইতিমধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে দল গোছানোর কাজ শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য হলো একটি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। যদি বড় দলগুলো দেশের মানুষের ন্যূনতম নাগরিক অধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে, তবে আমাদের আলাদা রাজনীতির হয়তো প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু বর্তমানের যে মেরুকরণ, তাতে আমাদের মতো একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা মানুষ গভীরভাবে অনুভব করছে। আমরা আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করি, গালি বা ঘৃণার রাজনীতি নয় বরং সমাধানের রাজনীতিই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা একটি মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাব।
‘বিএনপি-জামায়াতের দূরত্ব নতুন প্রজন্মের মনে হতাশা সৃষ্টি করছে’
অকৃতকার্য ছাত্রকে মাওলানা উপাধি দেওয়া সমর্থন করে না বেফাক
সাক্ষাৎকারে মাওলানা মাহফুজুল হক / অকৃতকার্য ছাত্রকে মাওলানা উপাধি দেওয়া সমর্থন করে না বেফাক
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের কওমি শিক্ষাব্যবস্থা দেখভালের সঙ্গে যুক্ত মাওলানা মুহাম্মাদ মাহফুজুল হক। বর্তমানে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড হিসেবে পরিচিত বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়ার স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং মোহাম্মদপুরের ঐতিহ্যবাহী জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার মহাপরিচালক। দেশের কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক চিত্র, বেফাকের ভূমিকা ও পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ এশিয়া পোস্ট: ২০০৫ সাল থেকে বেফাকের দায়িত্বশীল পদে আছেন। ২০২০ সাল থেকে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। এই দীর্ঘ সময়ে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কী পদক্ষেপ নিয়েছেন? মাহফুজুল হক: ২০০৫ সালে শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহ.) বেফাকের সভাপতি হন, ওই বছরই আমি সহকারী মহাসচিব মনোনীত হই। ২০২০ পর্যন্ত সহকারী মহাসচিব ছিলাম। ওই বছরের অক্টোবরে মহাসচিবের দায়িত্ব পাই। ২০০১ সালে চার দলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। তখন আলেমরা কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির আওতায় আনতে চেয়েছিলেন। এর আগেও চেষ্টা হয়েছে। ২০০৫-২০০৬ সালের দিকে স্বীকৃতি দিতে সরকার কমিটি গঠন করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তখন এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত গেজেট হয়নি। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দিয়ে প্রথম নীতিগত সিদ্ধান্ত গেজেট আকারে প্রকাশ পায়। ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগের আমলে দাওরায়ে হাদিসের সনদ গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন করে স্বীকৃতি লাভ করে। ২০১৮ সালে সংসদে বিল পাসের মধ্য দিয়ে এটি আইনে পরিণত হয়। বেফাকের নামে স্বীকৃতি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু আঞ্চলিক অন্যান্য বোর্ডের কারণে হয়নি। ২০১৭ সালে ছয় বোর্ডের সমন্বয়ে আল-হাইয়াতুল উলয়া গঠন হয়। এটি এই সময়ের বড় অর্জন। এখন বলতে পারি, কওমি মাদ্রাসাগুলো আল-হাইয়াতুল উলয়ার অধীনে এক্যবদ্ধ। এশিয়া পোস্ট: সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় পাবলিক পরীক্ষার ফল ঘোষণার পর দেশব্যাপী উচ্ছ্বাস দেখা যায়। গণমাধ্যমেও আলোচনা হয়। কিন্তু বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফল নিয়ে এমন উচ্ছ্বাস বা আলোচনা দেখা যায় না। এর কারণ কী? মাহফুজুল হক: স্কুল-কলেজের শিক্ষার সঙ্গে বিপুলসংখ্যাক মানুষের সম্পৃক্ততা আছে। সেই তুলনায় কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কম। তবে এবার ফল ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যে ২০ লাখ মানুষ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেছে। অনলাইনেও বেশ আলোচনা হয়েছে। তবে ঈদের আগমুহূর্তে ফল ঘোষণা এবং সময় নির্ধারণে জটিলতার কারণে মিডিয়াকে সেভাবে জানানো যায়নি। ভবিষ্যতে মিডিয়াকে ডাকার চিন্তাভাবনা রয়েছে আমাদের। এশিয়া পোস্ট: অভিযোগ আছে, অকৃতকার্য হওয়ার পরও শিক্ষার্থীরা পরবর্তী ক্লাসে ভর্তি হতে পারেন। এ বিষয়ে বেফাকের সিদ্ধান্ত কী? মাহফুজুল হক: মিশকাতে পরীক্ষা দিতে হলে শরহে বেকায়ার পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে হয়। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ক্লাসেও এমন নিয়ম করা হবে। অকৃতকার্য ছাত্ররা পরবর্তী ক্লাসে ভর্তি হতে পারবে; এমন দৃষ্টিভঙ্গি বেফাক লালন করে না। এ জন্য পর্যায়ক্রমে পরবর্তী ধাপের পরীক্ষার জন্য আগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বাধ্যবাধকতা চালু করছি। মাদ্রাসাগুলোকে প্রস্তুত করছি। তাদের উদ্বুদ্ধ করছি। এশিয়া পোস্ট: কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীরা চাইলে যে কোনো ক্লাসে ভর্তি হতে পারে। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সনদ লাগে না। এর ফলে কি শিক্ষার মান কমছে? মাহফুজুল হক: হাইয়াতুল উলয়ায় সম্মিলিত ছয়টি বোর্ড কাজ করছে। সেখানে এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে কাজ করছি। যোগ্যতা ছাড়া যেন ভর্তি হতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি রাখছি। যে কোনো ক্লাসে ভর্তির বিষয়টি এখন কমে আসছে। একসময় মাদ্রাসাগুলো ইচ্ছামতো পরিচালিত হয়েছে। বোর্ড ছিল না। পরে বোর্ড হলো। বোর্ডের তত্ত্বাবধানে এ দুর্বলতাগুলো ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা হয়েছে। স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে আরেকটু এগিয়েছে। আশা করি, দ্রুত এ ধরনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠব। তবে আগের ক্লাসে উত্তীর্ণ না হওয়া কাউকে পরের ক্লাসে ভর্তি নিলে শিক্ষার মান ক্ষুণ্ন হয়। এশিয়া পোস্ট: বেফাক প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫০ বছর হলো। একটি শিক্ষাবোর্ডে শিক্ষাবান্ধব নিয়ম করতে এত বছর লাগছে কেন? মাহফুজুল হক: স্বীকৃতির আগ পর্যন্ত বেফাক ওইসব মাদ্রাসার সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাদের ওপর আইন চাপানোর মতো শক্তি বেফাকের ছিল না। স্বীকৃতি তো কার্যকর হলো ২০১৭-১৮ সালে। সময় অনেক গেছে, সময়ের মধ্য দিয়ে পরিবেশ ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে আসছে। এশিয়া পোস্ট: আল-হাইয়াতুল উলয়ার পরীক্ষায় ফেল করার পরও অনেক পরীক্ষার্থীকে পাগড়ি দেওয়ার খবর এসেছে। ফেল করা শিক্ষার্থীদেরও মাওলানা উপাধি দেওয়া হচ্ছে। তাহলে পড়াশোনা করে পাস করার প্রয়োজন কী? মাহফুজুল হক: আল-হাইয়াতুল উলয়ার পক্ষ থেকে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে সনদ দেওয়া হয় না। কোনো বিষয়ে ফেল করলে পরের বছর পরীক্ষা দিতে হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে দুর্বলতা আছে। দাওরায়ে হাদিসে ফেল শিক্ষার্থীও যেন সমাজে দায়িত্ব পালন করতে পারে, ওই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্ভবত তারা পাগড়ি দিচ্ছে। খুব দ্রুতই পরিবেশ ঠিক করার চেষ্টা করছি। এখন সার্টিফিকেট দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম বেফাক ও হাইয়াতুল উলয়া। একসময় প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকের গুরুত্ব থাকবে না। তখন ফেল করা শিক্ষার্থীকে সার্টিফিকেট দেওয়া সম্ভব হবে না। এশিয়া পোস্ট: দাওরায়ে হাদিসে ফেল শিক্ষার্থীকে মাওলানা উপাধি বা পাগড়ি দেওয়া ঠিক মনে করেন? মাহফুজুল হক: না। বেফাক তাকে সার্টিফিকেট দেয় না। ভালো প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা শেষে ফলাফল ঘোষণার পর পাগড়ি দেওয়া হয়। সাধারণ প্রতিষ্ঠান বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেকে বার্ষিক পরীক্ষার আগেই পাগড়ি দিয়ে দেন। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন নয়। ফেল ছাত্রকে মাওলানা উপাধি বা পাগড়ি দেওয়া বেফাক সমর্থন করে না। এশিয়া পোস্ট: কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই যত্রতত্র মাদ্রাসা খোলা হচ্ছে। এ বিষয়ে বেফাকের চিন্তাভাবনা কী? মাহফুজুল হক: একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও বেফাকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য কী কী মানদণ্ড থাকা দরকার, এ বিষয়ে কাজ করছি। কিন্ডারগার্টেনও যত্রতত্র হচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন কম হয়। কিন্তু কওমি মাদ্রাসা নিয়ে প্রশ্ন বেশি হয়। তবে যোগ্যতা ছাড়া যত্রতত্র মাদ্রাসা করা ঠিক নয়। এগুলোকে নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসতে সচেষ্ট আছি। এশিয়াপ পোস্ট: সিলেবাস আধুনিকীকরণে বেফাক কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? মাহফুজুল হক: বেফাক প্রতিষ্ঠার পর থেকে সিলেবাস প্রণয়নের কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। কোরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞানার্জনের যে শিক্ষা কার্যক্রম, সেখানে খুব বেশি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। একসময় কওমিতে বাংলা, গণিত, ইংরেজি, ভূগোল ও ইতিহাস ছিল না। বেফাকই প্রথম পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এগুলো পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। পরে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে বাংলা, গণিত ও ইংরেজি যোগ হয়েছে। এখন নবম-দশমেও বাংলা-ইংরেজি যুক্ত হচ্ছে। মিশকাতে ইসলামি অর্থনীতি পড়ানো হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানও সিলেবাসভুক্ত করার চিন্তা আছে। মূল উদ্দেশ্য ঠিক রেখে আমরা সিলেবাস আধুনিকীকরণের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি। এশিয়া পোস্ট: শাপলা চত্বর ও জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির দাবি উঠছে। এ নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী? মাহফুজুল হক: বেফাকে আমাদের স্থায়ী সম্পাদনা পরিষদ আছে। সেখানে শাপলা ও জুলাইয়ে আলেমদের অবদান ও ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রমে জুলাইকে সরকার কীভাবে ধারণ করছে, সেদিকেও নজর রাখছি। সে আলোকে আমাদের শিক্ষা সিলেবাসে এ জাতীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা আছে। এশিয়া পোস্ট: ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রয়োজনে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যবহার করছে। বিষয়টি কীভাবে দেখেন? মাহফুজুল হক: ছাত্ররাও ইসলামি রাজনীতি শিখবে, তবে সেটা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। তার মূল কাজ পড়াশোনা। ধর্মীয় ব্যাপক প্রয়োজন ছাড়া তাদের মাঠে-ময়দানে কাজে লাগানো ঠিক নয়। এতে ছাত্রদের মূল উদ্দেশ্য পড়াশোনা ব্যাহত হবে।   এশিয়া পোস্ট: চাকরির বাজারে মাদ্রাসা শিক্ষা সনদের গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। এ নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষোভ-আক্ষেপ রয়েছে, কিন্তু বিষয়টি সুরাহার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। এখানে বেফাকের কোনো ব্যর্থতা আছে বলে মনে করেন? মাহফুজুল হক: এটার জন্য উদ্যোগ নেই; এ কথার সঙ্গে একমত নই। স্বীকৃতি তো এমনি অর্জন হয়নি। এর পেছনে মুরুব্বিদের যথেষ্ট সংগ্রাম আছে। স্বীকৃতি কার্যকরের চেষ্টা পুরোপুরি অব্যাহত আছে। স্বীকৃতি আদায়ের সময়ও আমাদের প্রথম টার্গেট ছিল নিজস্ব স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট হওয়ার শঙ্কা যেন তৈরি না হয়। আমাদের এসএসসি, এইচএসসি ও অনার্সের সমমান নিতে বলা হচ্ছে। এই স্তরগুলোতে সমমান নেওয়া হলে কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্বলতা দেখা দেবে। যেমন আলিয়া মাদ্রাসায় হচ্ছে। সেখানে দাখিলে ১০০ শিক্ষার্থী থাকলে আলিমে থাকে ৫০ জন। বাকিরা কলেজে চলে যায়। আলিমে ৫০ জন থাকলে পরের ধাপে থাকে ২০ জন। মেধাবীরা কেউ থাকে না। একটা শিক্ষাব্যবস্থায় মেধাবীরাই যদি না থাকে, তাহলে সেটা টিকে থাকে না। আমরা মনে করছি, অল্প দিনের মধ্যে আলিয়া মাদ্রাসা ভ্যানিশ বা নাই হয়ে যাবে। এসএসসি বা এইচএসসির সমমান নিচ্ছি না আমরা। না নেওয়ার কারণে সনদের কার্যকারিতার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা। এটা না নিয়ে কীভাবে সনদ কার্যকর করা যায়, সে চেষ্টা করছি। এশিয়া পোস্ট: সমমান না নিলে চাকরির সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে? মাহফুজুল হক: ২০০৬ সালে যখন দাওরায়ে হাদিসের সনদের নীতিগত গেজেট হয়, সেখানে বলা আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষক পদে আবেদন করা যাবে। এখন কাজি পদে আবেদন করা যাচ্ছে। এই সনদে আমাদের ছাত্রদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ ধর্মীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সুযোগ দেওয়া হলে চাকরির অনেক ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তবে চাকরির বাজার তৈরি করতে গিয়ে মূল জায়গা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। এশিয়া পোস্ট: শিক্ষার্থীরা তো একাডেমিক সমমান নিয়ে চাকরির বিশাল বাজারে প্রবেশ করতে চান। মাহফুজুল হক: আমি মনে করি, ছাত্ররা বুঝতে পারছে না। যদি চাকরিই একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে কওমি মাদ্রাসায় আসার প্রয়োজন কী? সে আলিয়া মাদ্রাসায় পড়ুক। কওমি মাদ্রাসায় যেহেতু এসেছে, তাকে কোরআন-হাদিসের বিজ্ঞ আলেম হতে হবে। কওমি মাদ্রাসায় পড়ার পাশাপাশি স্কুলে সে পরীক্ষা দিক। তবে আগে ভালো আলেম হোক। এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। মাহফুজুল হক: এশিয়া পোস্টের জন্য শুভকামনা। আপনাকেও ধন্যবাদ।
‘ভারত থেকে পরিচালনার চেষ্টা হলে বাংলাদেশে আ.লীগের ভবিষ্যৎ নেই’
‘ভারত থেকে পরিচালনার চেষ্টা হলে বাংলাদেশে আ.লীগের ভবিষ্যৎ নেই’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিতে সাংবাদিকতা করার পর আকবর হোসেন যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত ১১ এপ্রিল সেই পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক আয়োজন আলাপন অনুষ্ঠানে তার সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, প্রেস মিনিস্টারের দায়িত্ব, পদত্যাগ এবং বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেছেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর। এশিয়া পোস্ট: বিশ্বের অন্যতম সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। দেশের খবর বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন। আপনার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর গল্পটা দিয়ে আমরা আলোচনা শুরু করতে চাই। আকবর হোসেন: আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন থেকেই মূলত আমার সাংবাদিকতা শুরু। এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় একটি ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে। ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার পর আমি সেখানে ট্রেনি রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিই এবং মোটামুটি দুই বছর তিন মাস কাজ করি। ২০০৫ সালে বিবিসি যখন ঢাকায় লোক নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়, তখন আমি আবেদন করি এবং নির্বাচিত হই। ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর আমি বিবিসিতে যোগ দিয়েছিলাম। এরপর দীর্ঘ সময় সেখানে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এশিয়া পোস্ট: বিবিসিতে কাজ করার সুবাদে ওখানকার কাজের পরিবেশ খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেখানকার সাংবাদিকরা কি আসলেও রাজনীতি ও মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থাকেন, নাকি ব্যক্তিভেদে তাদেরও পক্ষপাত থাকে? আকবর হোসেন: বিবিসি একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজম বা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন করাকে কখনোই উৎসাহিত করে না। সেখানে কাজ করা অবস্থায় আপনি কোনো দলের সমর্থক হতে পারবেন না কিংবা তাদের সরাসরি সমালোচকও হতে পারবেন না। এই নিরপেক্ষতাটুকু বিবিসি খুব কঠোরভাবে বজায় রাখে। বিবিসির একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়া পলিসি আছে। সেখানে কাজ করলে আপনি চাইলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় যা খুশি লিখতে পারবেন না। আপনি এমন কিছু লিখতে পারবেন না যাতে মনে হয় যে আপনি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা কোনো ঘটনায় একটি পক্ষ নিয়েছেন। মানুষ হিসেবে আমাদের অবচেতনে অনেক সময় রাজনৈতিক মতামত চলে আসে, কিন্তু কেউ যদি এই নিয়মগুলো লঙ্ঘন করে, তবে তাকে সতর্ক করা হয়। এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। কারণ একজন রিপোর্টার হিসেবে লোকে যদি মনে করে আপনি পক্ষপাতদুষ্ট, তবে তারা আপনার বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ের ওপর আস্থা হারাবে। এতে প্রতিষ্ঠানের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। এশিয়া পোস্ট: ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে আপনার কী মনে হয়—একই সঙ্গে রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং সাংবাদিকতা করা কি সত্যিই সম্ভব? আকবর হোসেন: এটা আসলে নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর। আপনার প্রফেশনাল ইনটেগ্রিটি বা পেশাদার সততা যদি অনেক শক্তিশালী হয়, তবে আপনি পারবেন। আমি মনে করি, আমরা কেউই রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে নই। কিন্তু প্রশ্ন হলো আপনি ফেয়ার কি না, আপনি অবজেক্টিভ কি না। আপনার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতা করার সময় আপনি ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ বলতে পারছেন কি না, সেটিই বড় বিষয়। আপনি কি উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে ভিকটিম করছেন? যদি আপনি তা না করেন এবং কভারেজের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ থাকেন, তবে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে আমার ব্যক্তিগত মত হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকলে নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশ না করাই শ্রেয়। আপনি যদি স্বতন্ত্র সাংবাদিক হন, তবে ভিন্ন কথা। এশিয়া পোস্ট: বিবিসিতে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আপনার করা এমন কোনো বিশেষ সংবাদের কথা মনে পড়ে যা আপনাকে আজও গর্বিত করে? আকবর হোসেন: নির্দিষ্ট করে একটি ঘটনার কথা বলা কঠিন, কারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমি সাংবাদিকতা করেছি। যেমন বাংলাদেশে যখন ২০০৭ সালে ‘ওয়ান ইলেভেন’ বা জরুরি অবস্থা জারি হলো, সেই সময়টা ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। এরপর সিডর ঘূর্ণিঝড়ের কাভারেজ ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং চ্যালেঞ্জিং। এ ছাড়া ২০০৮ সালের নির্বাচনসহ পরবর্তী বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনা আমি কাভার করেছি। সাংবাদিক হিসেবে প্রতিটি ঘটনাই আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এশিয়া পোস্ট: সাংবাদিকতা ছেড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার হয়েছিলেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে সেই কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? আকবর হোসেন: সত্যি বলতে, আমার সেই অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো ছিল না। আমি ওখানে গিয়ে দেখলাম যে, এই পদের জন্য আসলে সেরকম কোনো কাজ সেখানে নেই। একপর্যায়ে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এই ধরনের পদ বা পজিশন আসলে বন্ধ করে দিলেও কোনো সমস্যা নেই। আমি মনে করি, কাজের মাধ্যমেই আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করি এবং সার্থকতা খুঁজে পাই। কাজ করলে ভুল হবে বা শুদ্ধ হবে, কিন্তু কাজই যদি না থাকে তবে শুধু চাকরি করা আর বেতন নেওয়াটা সুখকর কিছু নয়। সরকারি সিস্টেমটা হয়তো এ রকমই, কিন্তু এটি এমন হওয়া উচিত ছিল না। তবে এই এক বছরে আমি দেখার সুযোগ পেয়েছি যে সরকারি ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে। এশিয়া পোস্ট: এই প্রেস মিনিস্টার পদে সাধারণত সাংবাদিকদেরই কেন নিয়োগ দেওয়া হয়? এর পেছনে কারণ কী বলে আপনি মনে করেন? আকবর হোসেন: যে কোনো কিছু যখন শুরু হয়, তার পেছনে একটি ভালো উদ্দেশ্য থাকে। সরকার সম্ভবত মনে করেছিল যে বাইরে থেকে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা সিস্টেমে আনা দরকার। সাংবাদিকরা যেহেতু গণমাধ্যম সামলাতে অভ্যস্ত, তাই তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে এটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা রাজনীতিতে জড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে এগুলো এক ধরনের পুরস্কার দেওয়ার বিষয়ে পরিণত হয়। আমার মতে, যারা মাঠপর্যায়ে ভালো সাংবাদিকতা করতে চান, তাদের এ ধরনের পদে না যাওয়াই ভালো। আমি নিজে না গেলে হয়তো এই বাস্তবতা বুঝতাম না। এশিয়া পোস্ট: সরকারের পদ পাওয়ার পর আপনি সাংবাদিকতা পেশা ছেড়েছিলেন। এটি কি আপনার দীর্ঘ পেশাজীবনকে কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে? আকবর হোসেন: অবশ্যই করেছে এবং আমি তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করি। আমি যদি আমার পেশাদার জীবনে কয়েকটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি, তবে এটি ছিল অন্যতম। এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি আপনি পদত্যাগ করেছেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার কারণে কি কোনো সংশয় থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? আকবর হোসেন: না, সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। এমনকি আমার সঙ্গে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তারা অনেকেই এখনও কাজ করছেন। আমি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক কারণে পদত্যাগ করেছি। আমি নিজে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি এবং তিনি তাতে সম্মতি দিয়েছেন। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এশিয়া পোস্ট: সমসাময়িক রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ বা অনুপ্রবেশকারী ইস্যু নিয়ে আপনি কথা বলেছেন। এটি আপনার কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো? আকবর হোসেন: আমি দেখলাম যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এটি নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, তাই আমি আমার একটি বিশ্লেষণ দিয়েছি। অতীতে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের পর থেকে যে কোনো সমালোচনাকেই ‘জামায়াত-শিবির’ বলে ট্যাগ দিত। একপর্যায়ে তারা নিজেদের দলের লোককেও সন্দেহ করতে শুরু করল। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিককে ছাত্রলীগের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল এবং তাকেও জামায়াত তকমা দেওয়া হয়েছিল। এই বিষয়টি আওয়ামী লীগকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল। এখন বিএনপি বা অন্য কেউ যদি একই ন্যারেটিভ দাঁড় করায় যে, যারাই সমালোচনা করছে তারাই ‘গুপ্ত’ বা অন্য দলের লোক, তবে এটি তাদের দলের জন্যই ক্ষতির কারণ হবে। বিএনপির তৃণমূল পর্যায়েও এখন অনেকে সমালোচনা করতে ভয় পাচ্ছে যে, তাকে আবার কোনো ট্যাগ দেওয়া হয় কি না। ক্ষমতায় আসার শুরুতেই এ ধরনের বিভেদ তৈরি করা দলের জন্য ভালো নয়। এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে, বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আকবর হোসেন: সমালোচনা হবে সীমাহীন। আপনি তথ্যযুক্তি দিয়ে আমার যত ইচ্ছা সমালোচনা করুন। কিন্তু আমাকে গালি দেওয়ার অধিকার আপনার নেই। সমালোচনা এবং অশ্লীলতাকে এক করে দেখা ঠিক নয়। আপনি যদি কাউকে নোংরা ভাষায় আক্রমণ করেন, তবে তার আইনি প্রতিকার চাওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে। শুধু সমালোচনার কারণে গ্রেপ্তার হওয়া আমি সমর্থন করি না। এশিয়া পোস্ট: রাজশাহীতে একজন শিক্ষিকা লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় একজন বিএনপি নেতার নাম জড়িয়েছে। ক্ষমতাসীনদের বেলায় এমনটা কেন দেখা যায়? আকবর হোসেন: রাজশাহীর ঘটনায় আমি বলেছি যে, একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার এবং দোষীদের শাস্তি হওয়া উচিত। আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন যে, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, স্থানীয় পর্যায়ের কিছু টাউটপ্রকৃতির মানুষ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তারা মনে করে সব অধিকার তাদের। এমনকি আপনি যদি নিজে ক্ষমতা চর্চা নাও করেন, আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার কারণে লোকে আপনাকে অনেক ক্ষমতাবান মনে করবে এবং আপনাকে নানা বিষয়ে জড়ানোর চেষ্টা করবে। এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকেই মূলত এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকারের কার্যক্রমকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? আকবর হোসেন: নির্বাচনের সময় আমি দেশে ছিলাম না, তবে আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যা বলছে, তাতে এই নির্বাচন নিয়ে জনমনে বড় কোনো প্রশ্ন নেই। এটি গ্রহণযোগ্য ছিল। আর সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করার জন্য দুই মাস খুব কম সময়। যে কোনো সরকারকে মূল্যায়ন করতে হলে অন্তত ছয় মাস সময় দেওয়া উচিত। এশিয়া পোস্ট: ‘জুলাই সনদ’ এবং গণভোট নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার পরিণতি কী হতে পারে? আকবর হোসেন: গণভোটে প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ সমর্থন দিয়েছে। আমি মনে করি, জনগণের রায়ের ওপর আর কোনো কথা থাকতে পারে না। বিএনপি যদি জনগণের এই রায়কে অবজ্ঞা করে, তবে তা হবে একটি রাজনৈতিক আত্মহত্যা। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকতে পারে, কিন্তু গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা তাদের জন্য ঠিক হবে না। বিএনপি একটি পরিপক্ব রাজনৈতিক দল এবং আমার ধারণা তারা এমন ভুল পথে হাঁটবে না। এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের আগামী দিনের রাজনীতি সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? আকবর হোসেন: আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা যতদিন ভারত থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, ততদিন বাংলাদেশে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি প্রবল ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ যদি ভারত থেকে না হয়ে অন্য কোনো দেশ থেকে কামব্যাক করার চেষ্টা করত, তবে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু ভারত থেকে কিছু করার চেষ্টা করলে মানুষ মনে করবে এটা ভারত করাচ্ছে। এশিয়া পোস্ট: জুলাই অভ্যুত্থানের সেই আবেগ কি এখনও মানুষের মধ্যে আছে? আকবর হোসেন: অভ্যুত্থানের আবেগ প্রতিদিন রাস্তায় দেখা যাবে না। এ ধরনের ঘটনা যুগে একবার ঘটে। এর মানে এই নয় যে মানুষ ভুলে গেছে। মানুষ যখন দেখবে তাদের অধিকার ঠিকমতো রক্ষিত হচ্ছে না, তখন তারা আবারও প্রতিক্রিয়া দেখাবে। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন সবার মধ্যে আসেনি। একটা গোষ্ঠী সবসময় ব্যবসার ধান্ধায় থাকে, আদর্শ তাদের কাছে বড় বিষয় নয়। তবে দেশের একটি বড় অংশ অবশ্যই পরিবর্তন চায়। এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কতটুকু ছিল এবং কতটুকু পূরণ হয়েছে? আকবর হোসেন: আমি এই সরকারের কোনো নীতিনির্ধারক ছিলাম না, আমি ছিলাম একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তা। তবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এই সরকার অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। পুলিশ বাহিনীকে সচল করার চেষ্টা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং একটি নির্বাচন আয়োজন করা তাদের কাজ ছিল। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে সফলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করাটাই তাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমি খুব বেশি প্রত্যাশা রাখি না, কারণ পরিবর্তন শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে না, জনগণের সচেতনতাও প্রয়োজন। শুধু চাই সরকার যেন সাধারণ মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়। এশিয়া পোস্ট: সংবাদমাধ্যমে ভুল তথ্য বা ডিস-ইনফরমেশন রোধে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি? আকবর হোসেন: যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুল তথ্য ছড়ায়, তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। তবে তাদের জেলে না পাঠিয়ে জরিমানা করা যেতে পারে। জরিমানার ব্যবস্থা থাকলে মানুষ সতর্ক হবে এবং এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবেও দেখা হবে না। বর্তমান সময়ে মূলধারার গণমাধ্যম এই ভুল তথ্যের কারণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাংবাদিকদের মনে রাখতে হবে, ‘প্রথম হওয়ার’ প্রতিযোগিতার চেয়ে ‘শুদ্ধ হওয়া’ বেশি জরুরি। তথ্য যেন নির্ভুল হয়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। এশিয়া পোস্ট: আগামী পাঁচ বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান? আকবর হোসেন: আমি সাংবাদিকতাই করব, এটাই আমার মূল পেশা। আমি নিজের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা করছি যেখানে আমি মূলধারার সাংবাদিকতা বজায় রাখব। আমি আমার সাংবাদিক পরিচয় নিয়ে মানুষের আস্থায় ফিরতে চাই। এশিয়া পোস্ট: চাপের মুখে সাংবাদিকতা করার বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী? আকবর হোসেন: এটি আপনার পেশাদার সততার ওপর নির্ভর করে। আপনার যদি অন্য কোনো স্বার্থের জায়গা থাকে, তবে আপনি চাপ মোকাবিলা করতে পারবেন না। নিজেকে শক্তিশালী এবং সৎ রাখতে পারলে যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। আমি আশা করি, বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন থেকে একটি মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারবে। তবে মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা কেউ উপহার হিসেবে দিয়ে যায় না, এটি কাজের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
হেফাজতের শহীদদের ইতিহাস থেকে মোছার ষড়যন্ত্র হয়েছে, কওমি স্বীকৃতি ছিল ধোঁকাবাজি
হেফাজতের শহীদদের ইতিহাস থেকে মোছার ষড়যন্ত্র হয়েছে, কওমি স্বীকৃতি ছিল ধোঁকাবাজি
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে রাতের অন্ধকারে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অংশ নেওয়া মুসল্লিদের ওপর হামলে পড়ে যৌথ বাহিনী। এতে ব্যাপক হতাহতের অভিযোগ ওঠে। সংগঠনটির তৎকালীন আমির শাহ আহমদ শফী দাবি করেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বাতি নিভিয়ে স্মরণকালের নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সাদাপোশাকের অস্ত্রধারীরা। ২০১৩ সালের ৫ মের বিভীষিকাময় সেই ঘটনা, হেফাজতের রাজনীতি, শাপলা চত্বরের শহীদদের তালিকা প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা এবং কওমি সনদের স্বীকৃতিসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ। এশিয়া পোস্ট : হেফাজতে ইসলাম দাবি করে তারা অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু এর দায়িত্বশীল অনেকেই কোনো না-কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সংগঠনের কর্মসূচি নেওয়া কি সম্ভব হয়? আজিজুল হক : আল্লামা শাহ আহমদ শফি ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের নেতৃত্বে একটি বৃহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি অরাজনৈতিক ছিল, আছে, থাকবে। রাজনৈতিক নেতারা এখানে আলেম হিসেবে যুক্ত আছেন। একজন নাগরিক যেমন মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি দলীয় দায়িত্ব পালন করেন, হেফাজতের নেতাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমন। ইসলামের মৌলিক বিষয়ে ইসলামবিদ্বেষী শক্তি চক্রান্ত করলে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সব আলেমের দায়িত্ব এর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা। এই জায়গা থেকে হেফাজতের সঙ্গে যেসব রাজনৈতিক নেতা আছেন, তারা রাজনৈতিক পরিচয়ে হেফাজতে আসেন না, আলেম হিসেবে আসেন। রাজনৈতিক প্রভাবে হেফাজত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে না।  এশিয়া পোস্ট : আল্লামা শাহ আহমদ শফি ও জুনায়েদ বাবুনগরী আমির থাকাকালে হেফাজতের যে প্রভাব ছিল, এখন তা নেই কেন? আজিজুল হক : তারা দুজনই বিখ্যাত আলেম। আল্লামা আহমদ শফি (রহ.) দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রামের মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা ও পরে মাদ্রাসা পরিচালনা করেছেন তিনি। তার লাখো ছাত্র ও অনুসারী আছে। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীও বিখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস ছিলেন। তার বাবাও বড় আলেম ছিলেন। সারা দেশে বাবা-ছেলের লাখো ছাত্র ও অনুসারী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এ দুজনের নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে আলেম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মানুষ পঙ্গপালের মতো হেফাজতের ব্যানারে ছুটে এসেছে। ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীও বিখ্যাত আলেম। দেশে হাদিস ও আধ্যাত্মিক চর্চায় তার পরিবারের অনেক অবদান রয়েছে। তবে আহমদ শফি ও জুনায়েদ বাবুনগরীর যে পরিচিতি, সেটা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেই। কিন্তু আলেম সমাজের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর তার নেতৃত্বে ৬৪ জেলায় হেফাজতকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেছি।  আল্লামা আহমদ শফি ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর সময় হেফাজত যেমন শক্ত অবস্থানে ছিল, এখনও সেই অবস্থান রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩ মে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করে এর প্রমাণ আমরা দিয়েছি।  এশিয়া পোস্ট : শাপলা চত্বরে হেফাজতের ৯৩ কর্মী শহীদ হয়েছেন বলে গত বছরের ৪ মে আপনারা তালিকা প্রকাশ করেছেন। এই তালিকা প্রকাশে ১২ বছর লাগল কেন? আজিজুল হক : শাপলা চত্বরের ঘটনার পর আওয়ামী ফ্যাসিবাদী জালিম গোষ্ঠী আলেমদের ওপর যে পরিমাণ নির্যাতন করেছে, তা বর্ণনাতীত। পুলিশ, র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়ে শহীদ পরিবারের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। শহীদদের অনেকের জানাজা পড়তে দেয়নি। এক মাদ্রাসা শিক্ষকের নিজ মাদ্রাসায়ও তার জানাজা পড়তে বাধা দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত এলাকাবাসী দা-বঁটি নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে ধানক্ষেতে তার জানাজা পড়েন। মরদেহ বাড়ি যাওয়ার আগে র‌্যাব-পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করে রাখে। জানাজা শেষে পরিবারের মাত্র চারজন সদস্য তাকে দাফনের সুযোগ পান।   শাপলা চত্বরের শহীদদের তালিকা করতে তদন্ত কমিটি গঠন করলে আমাদের লোকজনকে তুলে নিয়ে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। শহীদদের তালিকা যেন না হয়, তাদের কথা যেন জাতি জানতে না পারে, তাদের যেন ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টা চালিয়েছে তৎকালীন আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার। এমনকি একজনও শহীদ হয়নি বলে ঘোষণা দেয় তারা। আমাদের শতভাগ চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও সরকারের চাপের কারণে তালিকা করতে পারিনি। ৫ আগস্টের পর প্রকাশ করেছি।  এশিয়া পোস্ট : হেফাজতের শহীদদের তালিকা করার কারণে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তৎকালীন সম্পাদক আদিলুর রহমান খান (পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা) ও পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলানকে কারাভোগ করতে হয়েছে। তারা তালিকা করতে পেরেছিলেন, কিন্তু এত নেতাকর্মী থাকার পরও আপনারা কেন পারেননি? আজিজুল হক : অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। তালিকা করায় আদিল ভাই ও এলান ভাইকে সরকার গ্রেপ্তার করে সাজা দিয়েছে। একটা আন্তর্জাতিক সংস্থার দায়িত্বশীলদের যদি এভাবে সাজা দিতে পারে, সেখানে হেফাজতের দায়িত্বশীলদের তো আন্তর্জাতিক লবিং নেই। আমরা নিরীহ আলেম সমাজ। ফ্যাসিবাদী শক্তিকে মোকাবিলার শক্তি ও সাহস নেই আমাদের। শহীদদের পক্ষে কথা বলায় আমাদের বিরুদ্ধে ৩৫০টির মতো মামলা হয়েছে। এসব মামলায় হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। সরকারের বহুমুখী চাপের কারণে তালিকা করতে পারেনি। এশিয়া পোস্ট : শুধু কি ৯৩ জনই শহীদ হয়েছেন? আজিজুল হক : ৯৩ জন নয়, আরও বেশি হবে। অনেক পরিবার এখনও ভয়ে শহীদদের কথা বলতে চান না। তাদের শঙ্কা, আওয়ামী লীগ আবারও ফিরতে পারলে ফের জুলুমের শিকার হতে হবে তাদের। মিডিয়ায় এসেছে, ২০১৩ সালের ৫ মে জুরাইন কবরস্থানে অনেক বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ীতে ময়লার স্তূপে মানুষের হাড় পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মিডিয়া, মানবধিকার সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, এগুলো হেফাজতের সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের লাশ। বিশেষ করে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম ওই মাসে প্রায় ৫০০ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। এগুলো তো দাফন হয়ে গেছে। পরিবারও জানে না এগুলো কার লাশ। আমরা চেষ্টা করছি তালিকা আরও সমৃদ্ধ করতে।  এশিয়া পোস্ট : কত জন শহীদ হয়েছেন বলে মনে করেন? আজিজুল হক : শহীদদের তালিকা দীর্ঘ হবে। এর সঠিক হিসাব নির্ণয় না করে বলা সম্ভব নয়। এশিয়া পোস্ট : অভিযোগ আছে, শাপলা চত্বরে শহীদদের জন্য বিগত ১২ বছর বিচার চায়নি হেফাজতে ইসলাম। শহীদদের পরিবারের পাশেও দাঁড়ায়নি। এর কারণ কী? আজিজুল হক : কেউ যদি বলে হেফাজত শহীদদের পাশে দাঁড়ায়নি, সেটা ভুল হবে। হেফাজত তার শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী ২০১৩ সালেই শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বিভিন্ন জেলায় টিম গিয়ে সহযোগিতা করেছে। প্রত্যেক পরিবার কম-বেশি হেফাজতের সহযোগিতা পেয়েছে। কোনো পরিবারকে একাধিকবার সহযোগিতা করা হয়েছে। কাউকে ঘর দেওয়া হয়েছে। কারও মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একজন শহীদের নামে মাদ্রাসা করা হয়েছে। তাদের সহযোগিতা করেনি, এটা মিথ্যা প্রচারণা। এশিয়া পোস্ট : ১২ বছর বিচার চেয়েছিলেন? আজিজুল হক : আমরা শতবার সংবাদ সম্মেলন ও মিছিল করে বিচার চেয়েছি। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার; যারা হত্যা করেছে, তারা কি বিচার করবে? জালিমরা তো করবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরপরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হেফাজতের পক্ষে আমি বাদী হয়ে অভিযোগ করেছি। এই মামলায় তৎকালীন সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, মন্ত্রী-এমপিরা জেলে আছেন। বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাক্ষী সংগ্রহ করা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জালিমদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারব। এশিয়া পোস্ট : যে আওয়ামী লীগ সরকার হেফাজত কর্মীদের শহীদ করল, সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে আপনারা শোকরানা মাহফিল করে সম্মান দিলেন। অথচ তখনও হেফাজতের শহীদদের তালিকা করা যায়নি, বিচারও হয়নি। এটা কি হেফাজতের শহীদদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা নয়? আজিজুল হক : এ বিষয়ে জাতির কাছে একটা ভুল বার্তা আছে। হেফাজত একটা আলাদা সংগঠন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড আলাদা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ থাকাটা স্বাভাবিক। শাপলা চত্বরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক থাকতে পারে না। আল্লামা আহমদ শফি তখন হেফাজতের আমির, তখন আবার তিনি কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড আল-হাইয়াতুল উলয়ারও চেয়ারম্যান। শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসকে মুছে দেওয়া ও আলেমদের নিয়ন্ত্রণের কুমতলবে সরকার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই দাবি হেফাজতের ছিল না, এটা কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের দাবি ছিল। সরকার স্বীকৃতি দিয়ে একটা রাজনৈতিক ডিগবাজি খেলেছে। এই স্বীকৃতি একটা কলাপাতা, কোনো মূল্য নেই। স্বীকৃতি দিয়ে ছাত্ররা কিছু করতে পারে না, এটা ধোঁকাবাজি। শোকরানা মাহফিলের আয়োজক ছিল সরকার। সে মাহফিলে খুনি হাসিনার সামরিক সচিব মিয়া মো. জয়নাল আবেদিন দাঁড়িয়ে শাপলা চত্বরের গণহত্যাকে অস্বীকার করলেন। হেফাজতের পক্ষ থেকে তৎকালীন মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী শোকরানা মাহফিলে অংশ নেননি। সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আমিও অংশ নিইনি। বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক আলেম সেখানে ছিলেন না। আমরা জোরালো প্রতিবাদ করে হাসিনার সামরিক সচিবের ওই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। শোকরানা মাহফিলে হেফাজতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আহমদ শফি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন, হেফাজতের আমির হিসেবে নন।  এশিয়া পোস্ট : আপনি বললেন, সনদ দিয়ে ডিগবাজি খেলা হয়েছে এবং শহীদদের রক্তকে মুছে দিতে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এসব জেনেও কেন স্বীকৃতি নিলেন? আজিজুল হক : এটা একান্ত আমার মতামত। সরকারের এই কূটচাল বোঝা সহজ-সরল আলেমদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা স্বীকৃতির নামে আলেম সমাজকে দমিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র করেছে। এশিয়া পোস্ট : ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আয়োজিত শোকরানা মাহফিলে শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেখানে আহমদ শফি (রহ.) থেকে শুরু করে হেফাজতের প্রায় সব বড় নেতা ছিলেন। আপনারা কি তাকে ‘কওমি জননী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন? আজিজুল হক : হেফাজতের নেতাদের ওপর যে আওয়ামী লীগ গণহত্যা চালাল, সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে হেফাজতের পক্ষ থেকে কওমি জননী উপাধি দেওয়া অবাস্তব কথা। হেফাজত তাকে এমন উপাধি দেয়নি। গওহরডাঙ্গা বোর্ডের চেয়ারম্যান মাওলানা রুহুল আমিন, তার বাড়ি গোপালগঞ্জ। তিনি শেখ হাসিনার গৃহপালিত ব্যক্তি। তিনি তার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছেন। হেফাজত বা হেফাজতের নেতারা দেননি। তার সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক নেই, তার সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক। তিনি হাসিনাকে তুষ্ট করতে এ উপাধি দিয়েছেন। এশিয়া পোস্ট : ওই মঞ্চে থাকা হেফাজত নেতারা বা বোর্ড পরে এর প্রতিবাদ করেনি। সংবাদ সম্মেলন করে কি হেফাজত বলেছিল বা কওমি মাদ্রাসার পক্ষে আপনারা বলেছিলেন কি যে আমরা তাকে কওমি জননী উপাধি দিইনি, এটা মাওলানা রুহুল আমিনের ব্যক্তিগত বিষয়? আজিজুল হক : উপস্থিত ব্যক্তিরা কেন প্রতিবাদ করেননি, সেটি তাদের ব্যাপার। জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)-এর পক্ষে আমি বিবৃতি দিয়ে সেটা প্রত্যাখ্যান করেছি। এ উপাধি হেফাজত দেয়নি, জাতিকে জানিয়েছি আমরা। এশিয়া পোস্ট : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আজিজুল হক : আপনাদেরও ধন্যবাদ।
ছাত্রদের কারণেই নতুন জীবন পেয়েছি : ইসহাক সরকার
ছাত্রদের কারণেই নতুন জীবন পেয়েছি : ইসহাক সরকার
জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার। যুবদল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর সম্প্রতি এনসিপিতে যোগ দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৩৬৬টি রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছেন। তিনি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। কথা বলেছেন দলবদল, রাজনীতি ও সমসাময়িক বিভিন্ন প্রসঙ্গে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর। এশিয়া পোস্ট : গত কয়েক দিন আগেও আপনি বিএনপির ইসহাক সরকার নামে পরিচিত ছিলেন। এখন এনসিপির ইসহাক সরকার। এই দুই দলের ইসহাক সরকার—কেমন লাগছে, অনুভূতি কেমন? ইসহাক সরকার : খুব ভালো লাগছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো পথচলা এবং নতুন করে আবার শুরু করা—দুইটার মধ্যে অনেক ভিন্নতা আছে। যেহেতু দীর্ঘদিন একসঙ্গে পথ চলেছি, আবার নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। এশিয়া পোস্ট : আপনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন, যুবদলেও ছিলেন একই পদে। আপনার রাজনীতি শুরু করেছেন ছাত্রজীবনে। শুরুর গল্পটা কেমন ছিল? ইসহাক সরকার : প্রথমে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অল্প অল্প করে রাজনীতির ময়দানে আসা শুরু করি। আমার এলাকার এক বড় ভাই ছিলেন, বর্তমানে সাংবাদিক মমিন ভাই। উনার হাত ধরে তৎকালীন ৩৫নং ওয়ার্ড, তৎকালীন ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। প্রথম যখন রাজনীতিতে আসি—মিছিল, মিটিং, সভা, সমাবেশ খুব একটা ভালো লাগত না। আমরা বিএনপির পার্টি অফিসের সামনে এসে বসে পড়তাম, সেখানে নেতারা বক্তব্য রাখতেন। আমরা মাটিতে বসে বক্তব্য শুনতাম। অনেক সময় ডানে-বামে তাকিয়ে দেখতাম যে নেতা আছেন কি না। না থাকলে পেছন থেকে পালিয়ে চলে যেতাম। এভাবে অনেক দিন করার পর আস্তে আস্তে আবার কেন জানি আকর্ষিত হয়ে যাই। আকর্ষণ হওয়ার পর থেকেই পথচলা শুরু। এরপরে আপনার ’৯১-তে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল, এরপর ’৯৬ পর্যন্ত ছিল। ’৯৬ থেকে যখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে চলে গেল বিএনপি, ঠিক তখন থেকেই আমার সক্রিয় রাজনীতিতে একেবারে পথচলা শুরু। এশিয়া পোস্ট : আপনার রাজনীতিতে উত্থান নিয়ে প্রায়ই নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর নাম বলেন। ছাত্রদল বা যুবদলে পদপদবি কি তার কারণেই পেয়েছেন? ইসহাক সরকার : আমরা কঠোর পরিশ্রম করে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এসেছি। তখনও ১০৭টি মিথ্যা মামলায় আমাকে জড়ানো হলো। পুরান ঢাকা মানে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ এবং এর বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। তখন আমাদের পিন্টু ভাই, সাদেক হোসেন খোকা ভাই ছিলেন ওই এলাকার দায়িত্বে। যে কারণে আমরা ব্যাপক ও তীব্র আন্দোলন করতাম। তো আমরা আন্দোলন করেই দায়িত্বে এসেছি। আমরা কোনো ভাইয়ের কারণে আন্দোলনে বা আমাদের দায়িত্বে আসিনি, পদ-পদবিতে আসিনি। আমার বিরুদ্ধে ৯৮ থেকে মামলা শুরু হলো। ৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে ১০৭টি মিথ্যা মামলা করা হলো। আমার পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও একই পরিমাণে মামলা দেওয়া হলো। যখন গ্রেপ্তার হলাম, আমার ছোট ভাই থানাহাজতে খাবার দিতে গেল। তার বয়স ১২ কিংবা ১৩ হবে, হাফেজি পড়ে। তখন কোতোয়ালির ওসি ছিল মনোয়ার হোসেন। স্পষ্ট মনে আছে, মনোয়ার সাহেব যখন রুম থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন আমাকে খাবার দিচ্ছে। তিনি আমার ভাইকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, ‘এই, এটা কে?’ বললাম, ‘মনোয়ার ভাই, আমার ছোট ভাই, খাবার দিতে আসছে।’ মনোয়ার সাহেব বললেন, ‘এই সেন্ট্রি, ওকে অ্যারেস্ট করো। ওকেও ধরো।’ ওকে ধরে আমার সামনে মনোয়ার সাহেব বেদম প্রহার করলেন। আমি তখন লকআপ ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ‘মনোয়ার ভাই, আমার ছোট ভাই তো রাজনীতি করে না। ওকে এভাবে নির্যাতন করছেন? ও তো এগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখে না। আমাকে খাবার দিতে আসছে। ওকে মারবেন না। ওর জীবনটা নষ্ট করে দেবেন না। ও ভয় পেয়ে যাবে।’ কোনো কথাই শুনলেন না। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, সন্ধ্যার পরে ছেড়ে দেব।’ এই কথা বলার পরও তার বিরুদ্ধে প্রায় ১৪টি মামলা করল। আমার বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে ১৫২টি মিথ্যা মামলা করা হলো। তো পরিবারের ওপর টার্গেট করেই একের পর এক মামলা দেওয়া হলো। যেহেতু পুরান ঢাকা আন্দোলনের ক্ষেত্র, আন্দোলনের জায়গা, সেই হিসেবে আমাদের এই মামলাগুলো দেওয়া হতো। প্রতিদিন হরতাল হওয়ামাত্রই আমি থাকি বা না থাকি, আমার বিরুদ্ধে পাঁচটি, সাতটি, ১০টি মামলা দিত। এশিয়া পোস্ট : নিজের রাজনীতির কারণে পরিবারকে এ রকম বেগ পোহাতে হচ্ছে, তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, বিড়ম্বনায় পড়ে যাচ্ছে। নিজেকে কখনো অপরাধী মনে হয়? ইসহাক সরকার : নিজেকে কখনো অপরাধী মনে হয়নি। কারণ, আমার পরিবারের পক্ষ থেকে আমাকে সমর্থন ছিল এবং ভালোবাসাও ছিল। আমার মা-বাবা বৃদ্ধ ছিলেন। আমি যখন ’৯৮ সালে গ্রেপ্তার হলাম, দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর একটানা কারাগারে ছিলাম। কারাগারে থাকা অবস্থায় বাবার মৃত্যুসংবাদ পাই। কারাগারে থাকা অবস্থায় আমাকে যখন প্যারোলে মুক্তির ব্যবস্থা করা হলো, আদালত প্রথমে নাকচ করে দিয়েছেন। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। আমাদের পিন্টু ভাই ম্যাডামের পারমিশন নিয়ে নাসিম সাহেবের সঙ্গে কথা বলেন। তখন আমাকে দুই ঘণ্টার জন্য প্যারোলে নিয়ে আসেন। এশিয়া পোস্ট : আপনার ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং মুহূর্ত কোনটা ছিল? ইসহাক সরকার : আমার পুরো সময়টাই চ্যালেঞ্জিং ছিল। ’৯৮ সাল থেকে জেল খাটা শুরু করলাম, এক দিনের জন্য স্বস্তি পাইনি। জেলখানা থেকে বের হয়ে আসার পরও যখনই জামিনে বের হতাম, আবার আমাকে জেলগেট থেকে গ্রেপ্তার করা হতো। প্রায় আটবার গ্রেপ্তার করেছিল জেলগেট থেকে। আমি জামিনে মুক্ত, হাইকোর্ট মুক্তির অর্ডার দিয়েছেন—‘নট টু অ্যারেস্ট, নট টু হ্যারাস’। মানে তাকে অ্যারেস্টও করা যাবে না, হ্যারাসমেন্টও করা যাবে না। এরপরও আমাকে কারাফটক থেকে প্রায় যতবার জামিন নিয়ে বের হই, ততবারই গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পুরো জীবনটা এভাবেই কেটেছে। বিশেষ করে আমি সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করেছি ৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত। পুরান ঢাকার নয়াবাজার ও বংশাল এলাকায় যখন আন্দোলন করি, তখন আমার সাতজন বন্ধু পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল। আর সবচেয়ে বেশি খারাপ সময় গেছে কিছুদিন আগে, যখন ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা জুলুমের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তখন আমাদের ওপর হুলিয়া এসে পড়ল। আমার বিরুদ্ধে ৩৬৬টি মিথ্যা মামলা করা হলো। আমার পরিবারের বিরুদ্ধে শতাধিক মিথ্যা মামলা হলো। ছোট ভাই, বড় ভাই—সবাই আক্রান্ত হলো। আমি যখন কারাগারে, তখন বাসার সুয়ারেজ লাইন কেটে দিল, বাসার বিদ্যুতের লাইন কেটে দিল। মানে একটা পরিবারের ওপর যত রকম হামলা করা যায়। শেষে আমার দুইটা ছোট বাচ্চার ওপরও মামলা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হলো। আমাকে গুম করে ফেলার চেষ্টা করা হলো। আন্দোলন করতে গিয়ে আমার নিজের হাতে গড়া সাত সহযোদ্ধা—তার মধ্যে আমার আপন ভাতিজাও আছে—তাদের ২০১৩ সালে গুম করে ফেলেছিল। আজও তাদের কোনো খোঁজ পাইনি। সবচেয়ে খারাপ লাগার মুহূর্ত ছিল যখন আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। আমাকে পার্টি থেকে বলা হয়েছিল প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। এশিয়া পোস্ট : রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে খারাপ লাগা বা হতাশার কোনো ঘটনা আছে কি না? ইসহাক সরকার : এবার আমি যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি, তখন একটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। আমাদের ওই এলাকার পাঁচজন প্রার্থী একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে আমরা বিদ্রোহ করি। বিদ্রোহ করার পর আমাদের দাবি ছিল যে আমাদের মধ্য থেকে এই এলাকার স্থানীয় যারা আছেন, তাদের মধ্য থেকেই আপনি যাকেই মনে হয় তাকেই মনোনয়ন দেবেন। আমরা এখানে সবাই নির্যাতিত পরিবার। যেমন আলহাজ নাসিরুদ্দিন আহমেদ পিন্টু ভাইয়ের পরিবার, মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ ভাইয়ের পরিবার, যিনি মৃত্যুঞ্জয়ী জননেতা, মীর মোশারফ হোসেন খোকন ভাই, উনিও নির্যাতিত এবং বারবার নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, মনির চেয়ারম্যান, যিনি মৃত্যুঞ্জয়ী; যাকে আটটি গুলি করা হয়েছিল পার্টির কারণে—উনিও ছিলেন একজন প্রার্থী। আমরা পাঁচজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে পার্টিকে বললাম যে অন্তত আমাদের মধ্য থেকেই যে কাউকে নমিনেশন দেন। কিন্তু পার্টি সেটার ব্যাপারে কোনো কর্ণপাত করেনি। বহিরাগত একজনকে এনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছিল। একে একে সবাইকে পার্টি ডেকে নিয়ে আলাদাভাবে কথা বলে বসিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু একমাত্র আমি ডাক পাইনি। কেন পাইনি, আমি সেটা আজও জানি না বা আমাকে কেন ডাকা হলো না, সেটা বুঝতে পারিনি। তখন খুব খারাপ লেগেছিল। পরে তো আমাকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করে দেয়। কোনো ধরনের চিঠি বা কোনো ধরনের শোকজ বা কোনো কিছু জানানো হয়নি। আমি অনলাইন, টিভি ও সংবাদের মাধ্যমে জানতে পারি যে আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তখন জীবনের ৩০ বছরের দুঃখ-কষ্ট সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছিলাম। সেদিন ভেবেছিলাম, এই পার্টির জন্য এত কষ্ট করলাম, জীবন-যৌবন বিসর্জন দিলাম, পার্টি অন্তত একটিবারের জন্যও আমাকে ডাকতে পারত। আমাকে বললে হয়তো বসে যেতাম। আমি পার্টির আনুগত্যের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল ছিলাম। কারণ, এই পার্টিকে আমি বুকে ধারণ ও লালন করেছি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে আমি অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি। উনি আমাকে স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন এবং সন্তানের মতো আদর করতেন। সেই পার্টির বিরুদ্ধে যাব—এটা আমি কোনো দিনই কল্পনা করতে পারিনি। সেদিনই আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময় গেছে। আমাকে বহিষ্কার করার পর অঝোরে কান্না করেছিলাম। এশিয়া পোস্ট : এবার ভালোটা জানতে চাই। সবচেয়ে ভালো লাগার মুহূর্ত কোনটা ছিল? ইসহাক সরকার : ভালো লাগার মুহূর্তগুলো ছিল, যখন ম্যাডাম খুব কাছ থেকে আদর করতেন। আমি এক দিন ম্যাডামের কাছে হাজির হলাম, ম্যাডাম ট্রিটমেন্টের জন্য হাসপাতালে যাবেন। আমরা তার গুলশানের বাসায় উপস্থিত হলাম। একে একে সবাই দাঁড়িয়ে সালাম বিনিময় করছি। ঠিক ওই মুহূর্তে আমাদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. জেড এম জাহিদ খান বলছেন, ‘ম্যাডাম আসছে।’ ম্যাডাম দেখে বললেন, ‘ইসহাক না? ইসহাক সরকার? ইসহাক সরকার আসছে, ওকে আমি অনেক পছন্দ করি। ওর জীবনের সব অর্জন ও কষ্ট আমি নিজের চোখে দেখেছি। ওকে তোমরা দেখে রাখবা।’ আমার নামেই তিনি চিনতেন আমাকে। শুধু তা-ই নয়, আমি যখন ছোট ইসহাক সরকার, আমার বয়স তখন ২০ বছর—তখন প্রতিটা প্রোগ্রামে ম্যাডাম বক্তব্যের মাঝখানে আমার নাম বলে বলতেন যে ‘ইসহাক সরকার ছোট্ট একটা ছেলে, তার বিরুদ্ধে শতাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়েছে।’ প্রতিটা স্টেজ প্রোগ্রামে ম্যাডাম আমার কথা বলতেন। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এশিয়া পোস্ট : এই ৩০ বছর আপনি বিএনপিতে পার করেছেন—বিএনপির ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠন—সব মিলিয়ে কী পেলেন বিনিময়ে? ইসহাক সরকার : মানুষের ভালোবাসা। সারা দেশের তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের যে ভালোবাসা পেয়েছি, এটা কোনো পদ-পদবি বা অন্য কিছু দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। আমি ইসহাক সরকার সারা জীবন সততা নিয়ে রাজনীতি করেছি। কেউ বলতে পারবে না ইসহাক সরকারের আচরণে কষ্ট পেয়েছে। এরপরও মানুষমাত্রই ভুল হতেই পারে, কিন্তু জানামতে আমি কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলিনি বা কারও ওপরে জুলুম করিনি, অত্যাচার করিনি অথবা একজন নেতা হিসেবে কারও প্রতি অন্যায় কোনো কিছু চাপিয়ে দিয়েছি ইনশাআল্লাহ এটা কেউ বলতে পারবে না। এই যে মানুষের যে ভালোবাসা, এটা কোনো কিছুর বিনিময়ে পাওয়া সম্ভব নয়। আমি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, জনগণের ভালোবাসা পেয়েছি এবং নেতাকর্মীদের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছি—এটাই আমাকে এত দূর নিয়ে এসেছে। আজ আপনি আমাকে এখানে ডেকেছেন। আমি যদি একজন সাধারণ নেতা বা কর্মী হতাম, হয়তো ডাকতেন না। অসাধারণ কিছুটা হয়তো হয়েছি জনগণের ভালোবাসায়, যার কারণে আজ আমাকে এখানে ডেকেছেন। এশিয়া পোস্ট : বিএনপি থেকে ঠিক আছে আপনি অভিমান করেছেন বা আপনাকে রাখা হয়নি। আপনার কাছে কেন উপযুক্ত মনে হলো এনসিপিকে? ইসহাক সরকার : ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও গণবিপ্লবের মধ্য দিয়েই ৫ তারিখের ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে। আমি উপযুক্ত এই কারণে মনে করছি যে ছাত্ররাই কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং আমি সে সময় ছাত্রদের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের পতনের ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছিল যে আমরা ১৭ বছর যে কাজটি করতে পারিনি, তারা সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। আমার দলের সব নেতাকর্মী যার যার অবস্থান থেকে নেমে পড়েছিল, কিন্তু নেতৃত্বের মূল জায়গাটাই ছিল এই ছাত্ররা। ৩৬৬টি মামলার মধ্যে মাত্র পাঁচটি মামলায় আমাকে ২২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আমার উপলব্ধি হলো, এই ছাত্রদের কারণেই আমি পুনরায় নতুন জীবন ফিরে পেলাম। তাদের কারণেই আমাকে হয়তো ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হলো না। তাদের কারণেই আমরা গণতন্ত্র ফিরে পেলাম এবং আমাদের অধিকার ও মানবাধিকার ফিরে পেলাম। এখন আমার মনে হলো এই ছাত্রদের দিয়েই আমাদের দেশের আমূল পরিবর্তন সম্ভব। এই ছাত্রনেতারা যোগ্য ও মেধাবী এবং তারা যে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে, সেটা আমরা আরও অনেক চেষ্টা করলে হয়তো পেরে উঠতাম না। কারণ, আমরা সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে শত শত মিথ্যা মামলা ছিল। আমাদের সিনিয়র নেতাদের জুডিশিয়ারি কিলিং করা হচ্ছিল। কারাগারে পিন্টু ভাইকে হত্যা করা হলো এবং বেছে বেছে চৌধুরী আলমকে গুম করা হলো। এভাবে নেতাকর্মীদের যেভাবে ফ্যাসিবাদের ষড়যন্ত্রে হত্যা ও গুম-খুনের শিকার হতে হচ্ছিল, তাতে আমরা সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আজ আল্লাহর বিশেষ দয়ায় এই ছাত্রদের কারণে আবার প্রাণশক্তি ফিরে পেয়েছি। এশিয়া পোস্ট : জুলাই আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন ব্যক্তিকে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উপস্থাপন করে। আপনার দৃষ্টিতে কাকে মাস্টারমাইন্ড মনে করেন? ইসহাক সরকার : আমি মাস্টারমাইন্ড মনে করি যারা ব্যক্তিগতভাবে রাজপথে নেমে আসছিল, তারাই মাস্টারমাইন্ড। এখানে কেউ বলতে পারবে না যে এককভাবে এই কৃতিত্ব কারও ব্যক্তিগত। আপনি হাসনাত বলেন, সারজিস বলেন বা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন—যাদের কথাই বলেন, কেউ এটার একক মাস্টারমাইন্ড নয়। আমি মনে করি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। এটা কেউ যদি বলে যে, অমুক ব্যক্তি মাস্টারমাইন্ড বা অমুক বিদেশ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে—আমি এটাকে বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি যে এটা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আপনি যখন একজন সাংবাদিক এবং আপনি যখন দেখবেন যে আপনার সন্তান বাহিরে আন্দোলন করতে নেমে গেছে, আপনি বাবা হিসেবে ঘরে বসে থাকতে পারতেন? আমাদের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। আমরা যখন দেখেছি আমাদের সন্তানরা রাজপথে নেমে এসেছে এবং আমাদের কোমলমতি ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছে, তখন সবাই যার যার অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছি। এখানে কেউ আলাদা মাস্টারমাইন্ড নয়। আর যদি আমরা কোনো বিশেষ মাস্টারমাইন্ডের কথা মনে করতাম, তাহলে এই ছাত্র-জনতা ও আপামর জনগণ রাস্তায় নেমে আসত না। এশিয়া পোস্ট : আপনি বলেছেন যে পুরান ঢাকায় আপনার জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থন আছে। যদি এত জনসমর্থন থাকে, তাহলে গত নির্বাচনে আপনি প্রার্থী হয়েছেন, আপনার ভোটের পরিমাণ তুলনামূলক কম। এটা কেন হয়েছে? ইসহাক সরকার : আপনারা তো জানেন নির্বাচনটা কেমন হয়েছে। আমার কাছে তো মনে হয় ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। তিন ঘণ্টা ভোটকেন্দ্রের সামনে যেতে দেয়নি। গণনা করার সময় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমার পোলিং এজেন্ট যারা ছিল, তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে এবং সকালে যারা ঢোকার চেষ্টা করেছিল, তাদের অনেককে বের করে দিয়েছে। সেখানে আমার কাছে মনেই হলো যে ইলেকশনটা ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। কারণ কী? ওখানে ঘোষণা শুনতে পেলাম যে জামায়াতের প্রার্থী পাস করেছে, কিন্তু তিন ঘণ্টা পর ভোরে আবার শুনলাম যে না, বিএনপির প্রার্থী পাস করেছে। তো কে পাস করেছে বা কে ফেল করেছে সেটা বিষয় না। আমি দুই দিনে ৬০০০ গণস্বাক্ষর নিয়েছিলাম। আমি যেহেতু স্বতন্ত্র থেকে দাঁড়িয়েছিলাম, তাই বিধান অনুযায়ী ৬০০০ লোকের সমর্থন থাকা দরকার। আমি সেই স্বাক্ষর দিয়েছি। তো ওই ৬০০০ পরিবার গেল কোথায়? আমাকে তো এত কম ভোট পাওয়ার কথা না। কাজেই আমার কাছে মনে হয়েছে নির্বাচনটা একটু ব্যতিক্রম হয়েছে এবং রেজাল্ট শিটে অনেক পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি। এশিয়া পোস্ট : আপনি এনসিপিকে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আপনাকে দলে পেয়ে এনসিপির কী লাভ হলো? ইসহাক সরকার : এনসিপি কী পেয়েছে না পেয়েছে, সেটা তো আমি জানি না। উনারা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, এতটুকুই বুঝি। পুরান ঢাকায় আমাদের সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা আমি পালন করব। এনসিপির কী লাভ হয়েছে, তা এনসিপিই ভালো বলতে পারবে। কিন্তু আমি মনে করি আমার লাভ হয়েছে। আমি যদি দুই বছর ঘরে বসে থাকতাম, তাহলে রাজনীতির ময়দান থেকে হারিয়ে যেতাম। আর এনসিপিতে ঢুকেছি বিধায় আপনারাই আমাকে স্টুডিওতে ডেকেছেন। যদি প্রবেশ না করতাম, তাহলে হয়তো ডাকতেন না এবং আমার খোঁজও নিতেন না। এশিয়া পোস্ট : আপনার বেশ কয়েকটি বক্তব্য এখন আলোচনায়। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, সেখানে এখন পকেট কমিটি দেওয়া হয় বা সুবিধাবাদীদের পদ দেওয়া হয়। আপনার কাছে এ রকম কেন মনে হয়? ইসহাক সরকার : দেখুন, এটি তো একটা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলে। পদ-পদবি ও নেতৃত্ব তো ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয় না। বিএনপির মতো বা আওয়ামী লীগের মতো দলগুলোতে সংগঠন শক্তিশালী করার নামে একবার ছাত্রদলের নেতা নির্বাচন হয়েছিল, কিন্তু সেটাও ছিল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এবং ওগুলো ছিল একটা আইওয়াশ মাত্র। আমার কাছে মনে হয় যে এই কাজগুলো যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয়, তাহলে যোগ্য ও নির্যাতিত যারা জনগণের ভালোবাসা অর্জন করতে পারে, তারাই নেতৃত্বে আসতে পারবে। অন্যথায় এভাবে চলতে থাকলে বড় সংগঠনগুলো নেতৃত্ব-সংকটে পড়বে। এশিয়া পোস্ট : জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের অবস্থান এবং সংসদের ভেতরে ও বাইরের বিতর্ক নিয়ে কী বলবেন? ইসহাক সরকার : জুলাই সনদ নিয়ে প্রতিটা রাজনৈতিক দল ঐকমত্যে পৌঁছেছিল এবং সেই ভিত্তিতেই ১২ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সবাই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু হঠাৎ বিএনপির কী এমন হয়ে গেল যে তারা জুলাই সনদ থেকে দূরে সরে এল? কয়েক দিন আগেও প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন জুলাইয়ের প্রতিটা সনদ মানা হবে, কিন্তু আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন যে কেন আমরা মানব? তখন নির্বাচনের স্বার্থে বলেছিলাম। এই যে কনট্রাডিকশন, এটা জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার নামান্তর। যদি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়, তবে জনগণ গণভোটের দাবিতে আবার রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে। এশিয়া পোস্ট : বিএনপি থেকে এনসিপিতে আসায় পুরান ঢাকার রাজনৈতিক মেরুকরণে কি কোনো প্রভাব পড়েছে? ইসহাক সরকার : কিছুটা প্রভাব পড়েছে। সাধারণ জনগণ যারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন, তাদের সমর্থন আমি পেয়েছি। আমার মতো সবাই তো এই সময়ে ঝুঁকি নেবে না। যারা ঝুঁকি নেওয়ার তারা নিয়েছে এবং সাধারণ জনগণের একটি বৃহৎ অংশ আমাকে সমর্থন জুগিয়েছে। আমি রাস্তায় বের হলে তারা আমাকে অভিনন্দন জানায় যে আমি ভালো কাজ করেছি। তাই আমি মনে করি সাধারণ মানুষ আমার সঙ্গে আছে। এশিয়া পোস্ট : এবার যেহেতু আপনি নির্বাচন করেছেন এবং স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করেছেন, আগামী দিনে এনসিপির সঙ্গে আসন বা মনোনয়ন নিয়ে কি কোনো কথা হয়েছে? ইসহাক সরকার : এখনো ও রকম কোনো কথা হয়নি। আমি আগেও বলেছি যে এমপি বা মন্ত্রী হওয়া আমার মুখ্য বিষয় নয়, আমি জনগণের সেবা করতে চাই। ভাগ্য যখন যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই কাজ করব। আমি পাস করলে হয়তো এখন সংসদে থাকতাম। তবে প্রত্যেক রাজনৈতিক কর্মীর একটা লক্ষ্য থাকে এবং আমি আগামীতে ঢাকা-৭ আসন থেকে এনসিপির হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এশিয়া পোস্ট : আগামী পাঁচ বছরে ইসহাক সরকার নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে বা দলের কোন অবস্থানে দেখতে চান? ইসহাক সরকার : দল আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, তার মাধ্যমে আমি সংগঠনকে শক্তিশালী করব। সংগঠন দুর্বল থাকলে রাজনৈতিক দল টিকে থাকতে পারে না। তাই আমার প্রধান লক্ষ্য হলো দলকে শক্তিশালী করা। তৃণমূল পর্যায় থেকে এনসিপিকে শক্তিশালী করার জন্য আমি আমার সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাব। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ থেকে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নির্বাচন করবেন এবং সেখানে একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে আমি মনে করি। এশিয়া পোস্ট : নতুন যারা রাজনীতিতে আসতে চায়, তাদের জন্য আপনার কী মেসেজ থাকবে? তারা কী দেখে দল বেছে নেবে? ইসহাক সরকার : আমি মনে করি প্রথমে দলের আদর্শ দেখা উচিত। কোন দলটা সবচেয়ে আদর্শভিত্তিক এবং দেশ পরিচালনায় জনগণের প্রতি তাদের কতটুকু ভরসা আছে তা দেখা দরকার। ক্ষমতাসীন দল হোক বা বিরোধী দল, তারা জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে আছে কি না সেটা বিবেচনা করা উচিত। জনগণ যেটাকে ভালো মনে করবে, সেটাই পছন্দ করবে। কারণ, সবারই গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার আছে। আমি এনসিপি পছন্দ করেছি কারণ তারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে। আমি সবাইকে অনুরোধ করব আপনারা যোগ্য ও আদর্শবান নেতাদের দেখে পার্টিতে অংশগ্রহণ করবেন। এশিয়া পোস্ট : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ইসহাক সরকার : আপনাদেরও ধন্যবাদ।