জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব। কেন্দ্রীয় দায়িত্বের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ইতোপূর্বে তিনি দলটির রাজনৈতিক লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের মনোনীত মেয়র প্রার্থী তিনি। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি শাপলা কলি প্রতীকে ঢাকা-১৮ আসনে লড়েছিলেন।
রাজনীতির বাইরেও আরিফুল ইসলাম আদিবের একটি পেশাগত পরিচয় আছে। তিনি যুক্ত ছিলেন সাংবাদিকতায়। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ফ্রিল্যান্স রাইটার হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২০ সালের পর থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট এবং মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেন আরিফুল ইসলাম আদিব। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাকারিয়া নূরী—
এশিয়া পোস্ট: আদিব বরিশালের সন্তান আপনি। বরিশাল থেকে জাতীয় রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হলেন কীভাবে?
আরিফুল ইসলাম আদিব: মূলত ২০০৯ সাল থেকে রাজনীতির প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়। সাধারণত ক্লাস এইট-নাইন থেকে স্কুলে ‘এইম ইন লাইফ’ পড়ানো হয়। ওই সময়টাতে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনার জন্য আমি আমার বেড়ে ওঠা বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় দাদাবাড়ি থেকে বরিশালে শিফট হই। তখন থেকে মূলত এই রাজনীতির বিষয়ে আমার আগ্রহ তৈরি হয়। তবে, পেশাগত জায়গায় সফল হয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করার একটা ইচ্ছা আমার ছিল।
সে জায়গা থেকে একসময় ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছা ছিল, ক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছা ছিল। ক্রিকেটার হওয়ার জন্য আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলাম। প্র্যাকটিস করেছিলাম বরিশাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। ইন্টারমিডিয়েটে আমি তেমন পড়াশোনা করিনি, শুধু টেস্ট পরীক্ষা দিয়েছিলাম। এইচএসসির পর মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। অল্প কিছু নম্বরের জন্য মেডিকেলে চান্স হয়নি। এরপরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যায় ভর্তি হই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরে এক শিক্ষক তিনি বললেন, মেডিকেলে পড়াশোনার চেয়ে ভার্সিটি আরও অনেক বেশি জানাশোনার জায়গা। এরপরে ভার্সিটিতে কন্টিনিউ করি।
প্রথমে ডিপার্টমেন্টে ভালো রেজাল্ট করার ইচ্ছা ছিল। প্রথম বর্ষে সেরকম পড়াশোনাও করেছিলাম কিন্তু ছোটবেলা থেকে আমার হাতের লেখা খুব বেশি স্ট্যান্ডার্ড ছিল না। ফলে আমি যে মার্ক এক্সপেক্ট করেছিলাম ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্টে তা হয়নি। এরপর চিন্তা করলাম যে না, এখানে খুব বেশি এফোর্ট দেব না। দুই বছর পর মানে থার্ড ইয়ারে আমি সাংবাদিকতায় মনোযোগ দিই। ২০১৬ সালে আমি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হই। তখন আমি মূলত জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে ফিচার লেখা শুরু করি। আমার মনে আছে যতগুলো নামকরা পত্রিকা ছিল, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম সবগুলোতে আমি বিভিন্ন ক্যাম্পাসের ইতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ে সাংবাদিকতা শুরু।
এরপর ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন আসলো তখন আমি সাংবাদিকতা করি এবং আমার তখন আমার অনার্স ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা চলছিল। ওই সময় আমার মূলত দায়িত্ব ছিল কমিউনিকেশনে, যোগাযোগে। আমার মনে আছে—১১ এপ্রিল যেদিন শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিল যে—কোটা কোথায় রাখবে আর রাখবে না, মানে সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীরা যে রাস্তা অবরোধ করেছিল, তো ওই মোমেন্টে আমাদের আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন শাকিল ভাই, তিনি বলেছিলেন, তুমি অন্যদের সঙ্গে একটু যোগাযোগ করো। তখন আমি মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসান আল মামুন ভাইসহ অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ মেইনটেইন করতাম। এভাবে মূলত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হই। এরপর আন্দোলন তো সর্বশেষ সফল হলো।
ডাকসু নির্বাচনে নুর ভাই ভিপি নির্বাচিত হলেন। তখন মনে হয়েছে যে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে একটা ডিফরেন্ট পলিটিক্স আসলে বাংলাদেশে করা সম্ভব। তখন আমার কাছে মনে হয়েছে যে, পেশাগত জায়গার বাইরেও সরাসরি পলিটিক্সটাও করা যেতে পারে। তখন আমি মূলত সিদ্ধান্ত নেই যে, আমি সরাসরি পলিটিক্সে আসব। তার আগে প্ল্যানটা ছিল যে—আগে পেশাগত জায়গায় সর্বোচ্চ সফল হয়ে তারপর পলিটিক্স। ওই ডাকসু নির্বাচন আমার রাজনীতির জানালাটা খুলে দেয়। তখন আমি সরাসরি ছাত্র অধিকার পরিষদের সঙ্গে একেবারে ফুললি এনগেজ হই।
আমাদের দেশে সাধারণত যারা পলিটিক্স করতে চায় তারা হয় পলিটিক্যাল ফ্যামিলি থেকে আসতে হয় অথবা আওয়ামী লীগ-বিএনপি করলে নিজের ব্যক্তিত্ব অনেক সময় বিসর্জন দিয়ে রাজনীতি করতে হয়। যেমন—ছাত্রদলের এখনও যারা সেন্ট্রাল নেতৃত্বে আছে তাদের বয়স প্রায় ৪০ এর কাছাকাছি, এটলিস্ট ৩৫। একটা মানুষের ছাত্র রাজনীতি শেষ করতে যদি ৪০ বছর চলে যায়, তাহলে সে জাতীয় রাজনীতিতে কখন প্রবেশ করবে?
২০১৯ সালে ছাত্র অধিকার পরিষদে এনগেজড হওয়ার পর থেকে আমাদের জাহাঙ্গীরনগর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের একটা আলোচনা হয়েছিল, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ঘোষণাও হয়েছিল। আমরা কিছু কাজ করেছিলাম, আন্দোলন করেছিলাম দুর্নীতিবিরোধী জাহাঙ্গীরনগর আন্দোলন। অনেকের সঙ্গে আমিও সংগঠিত করার দায়িত্বে ছিলাম। বেশ কয়েকটা আন্দোলন করেছিলাম। ২০২১ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে সরাসরি আমি ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই।
সেখানে দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর গণ-অধিকার মূল দলের বিভিন্ন দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছিল। কিন্তু, ২০২৪ এর নির্বাচনের পূর্বে আমাদের একটা প্রত্যাশা ছিল যে এই নির্বাচনে এটলিস্ট বিএনপি-জামায়াতসহ ৬৪ দলের যে যুগপৎ আন্দোলন ছিল সেটি সফল হবে। কিন্তু যতটা দেখলাম, খুব বেশি তা রাজনৈতিকভাবে হয়নি। তখন আমি মূলত আমার অফিশিয়ালি দায়িত্ব পালন শেষে আর গণ-অধিকারের মূল দলে দায়িত্ব নিইনি। আমি আবার পেশাগত লাইফে কিছুটা ফিরে গিয়েছিলাম।
এরপর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যখন শুরু হয় তখন যেহেতু মূল নেতৃত্বের সঙ্গে আমার খুব আগে থেকেই ভালো যোগাযোগ ছিল, এ আন্দোলনে বলা চলে—মিডিয়া কানেক্টিভিটি এবং স্ট্র্যাটেজির জায়গায় মূলত পেছনের কারিগর হিসেবে ভূমিকা রাখি।
এশিয়া পোস্ট: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে নিজেকে আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িয়েছেন। সেসব দিনগুলো কেমন ছিল?
আরিফুল ইসলাম আদিব: ছাত্ররাজনীতি যারা করে, বর্তমানে বাংলাদেশে দুটো ঘটনা ঘটে। সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের সব ছাত্ররাজনীতির সব ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রবিন্দু অনেকটা রাজু ভাস্কর্য কিংবা টিএসসির মধুর ক্যান্টিন বরাবর। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অন্যান্য যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আছে যেমন—জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম কিংবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ছাত্র সংগঠনের মূল নেতৃত্বে উঠে আসা অনেক বেশি কষ্টকর এবং অনেক সময় একটা অমানবিক পরিশ্রম কিংবা মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। কারণটা হচ্ছে, ছাত্রদলের কমিটিতে দেখবেন প্রথম ১০০ জনের মোটামুটি ৯০ জনই বলা চলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া থাকে। ছাত্রলীগের কমিটির ইতিহাসে সম্ভবত শুধু একটা কমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের সভাপতি-সেক্রেটারি হয়েছিলেন। ডাকসুর তখন ভিপি ছিলেন এনামুল হক শামীম আর ঢাকা কলেজের একজন ছিলেন। এই দুজন শুধু ছাত্রলীগের পুরো কমিটির দায়িত্ব একবার পেয়েছিলেন।
ফলে যেটা হতো, জাহাঙ্গীরনগরে যখন আমি থাকতাম, সেখানে সাংগঠনিক কাজও আমাকে করতে হতো, আবার একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় যোগাযোগ রক্ষার জন্য ক্লাস শেষ করে দুপুরের পরে কিংবা অনেক সময় দুপুরে প্রোগ্রাম থাকলে ক্লাস মিস দিয়ে ঢাকা আসতে হতো। ঢাকায় এসে রাত ১০টা-১১টায় সবকিছু শেষ করে আবার টিএসসি থেকে বাসে করে ক্যাম্পাসের হলে যেতাম। অনেক সময় রাত ১২টা-সাড়ে ১২টা বেজে যেত। ওই সময়ে এই পরিশ্রমটা আমার জন্য বেশ প্রেশার ছিল। এরপর ছাত্র সংগঠনে আমাদের কাউন্সিল হয়েছিল। আমাদের ছাত্র অধিকার পরিষদে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি হয়েছিল। আমি সাধারণ সম্পাদকে কম্পিটিশন করেছিলাম এবং মোটামুটি ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলাম।
রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে ওটা একটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। আমার সময়ে মনে আছে যে আমি সর্বোচ্চ সংখ্যক কমিটি দিয়েছিলাম। বিভিন্ন পর্যায়ের ইউনিটে ১৩০টি কমিটি দিয়েছি। আমার কমিটিরই সম্ভবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রথম সভাপতি হয়েছিলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আর সেক্রেটারি হয়েছিলেন আনফ খান সাইদ। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দ্বিমত থেকে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তারপর তারা আলাদা গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি সংগঠন আনেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে আমাকে খুব বেশি বাধায় পড়তে হয়নি। যেহেতু আমি ক্যাম্পাসে আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি সাংবাদিকতা করতাম, সেহেতু কেউ বাধা দেওয়ার খুব বেশি চেষ্টা করত না। ক্যাম্পাসে যারা সাংবাদিকতা করতো স্বাভাবিকভাবে ছাত্রলীগ তাদের একটু ভয় পেত। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওরা ওদের মতো ব্যবহার করত। আর যারা ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতা করে, ডিবেট করে কিংবা সাংস্কৃতিক জোট করে সাধারণত ছাত্রলীগ তাদের একটু কম বাধা দেওয়ার চেষ্টা করত। মানে তাদের ক্ষেত্রে চুপ থাকত।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলনে র্যাব আপনাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়েছিল সে ঘটনাটি কী ছিল?
আরিফুল ইসলাম আদিব: জুলাই আন্দোলনের সময় আমি গণমাধ্যমে কাজ করছিলাম। সেসময় সমন্বয়কদের বার্তা আমি আন্তর্জাতিক মাধ্যমে পৌঁছাতাম। ছাত্র অধিকার পরিষদের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরপরই আমি গণমাধ্যমে যোগদান করি। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই যখন পুরো ইন্টারনেট একেবারে বন্ধ করে দেয়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। তখন আন্দোলনের মূল নেতৃত্বের অনেকেই নানা জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, বিশেষ করে নাহিদ ইসলাম যিনি বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়ক, তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। ১৯ জুলাই কীভাবে আন্দোলন কন্টিনিউ করা যায় সে বিষয়ে অফলাইনে ৪০ মিনিট কথা হয়। এদিকে গণমাধ্যম প্রচার করছিল—আন্দোলন স্থগিত হয়ে গেছে।
সেনাবাহিনী যখন মোতায়েন হয়, তখন মূলত নাহিদের সঙ্গে আমার রাত সোয়া ১টায় প্রায় ৯ মিনিট কথা হয়। সেনাবাহিনী মোতায়েন করছে, তাহলে আমাদের ভূমিকাটা আসলে কী হতে পারে এ বিষয়ে কথা হয়। তখন আমরা বলেছি, সেনাবাহিনীকে আমরা আহ্বান জানাতে পারি। তারা মূলত গণতন্ত্রের পক্ষে, আন্দোলনের পক্ষে, জনগণের বিপক্ষে যেন না যায়।
কিন্তু এর ঠিক আধঘণ্টা পরেই (১৯ জুলাই) নাহিদ ইসলামকে ডিবি প্রথম তুলে নিয়ে যায়। কারণ, তারা দেখছিল— আন্দোলনটা আসলে স্থগিত হচ্ছে না, বরং কন্টিনিউয়াসলি আন্দোলন চলছে। বিশেষ করে উত্তরায় সেদিন সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড হয়, যাত্রাবাড়ীতে শহীদ হয়। অনেকেই গুলিতে শহীদ হন। মানে এই দুই জায়গায় তুমুল আন্দোলন চলছিল। এ ছাড়াও মিরপুর সব জায়গাতে তখন আন্দোলন চলে। পরে যখন দেখছে আন্দোলন স্থগিত হচ্ছে না তখন তারা নাহিদ ইসলামকে তুলে নিয়ে যায়। নাহিদ ইসলামকে তুলে নিয়ে গেলে মূলত তার সঙ্গে যোগাযোগে ফোনের সর্বশেষ কল লিস্টে আমার নাম পায়। নাম পেলে তখন তাকে জিজ্ঞেস করে যে—সে (আমি) কে, কোথায় কী করে। নাহিদ ইসলাম স্বাভাবিকভাবে বলেছিলেন, সাংবাদিকতা করেন। তখন থেকে আমাকে ট্র্যাক করা শুরু হয়।
এরপর নাহিদ ইসলামকে দুদিন পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। নাহিদ আসিফসহ অন্যদের ছেড়ে দিলে তারা গণস্বাস্থ্যে চিকিৎসা নেন। ওই সময়ে আমি আবার তাদের দুজনের দুটি ভিডিও সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। ওইদিন তারা আমাকে বলছিল, ভাই আপনাকে কিন্তু তুলে নিয়ে যাবে। তারা আমাকে বেশ কয়েকবার এই সংকেত দিয়েছিল।
নাহিদ ইসলাম নিজেই বলছেন, ভাই আপনি একটু সাবধানে চলাফেরা করেন। আপনাকে কিন্তু তুলে নিয়ে যেতে পারে। আর ১৮ জুলাইয়ের পরে ওই মোমেন্টে আসলে কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে যে যোগাযোগ রক্ষা করবে এটাও একটা কঠিন বিষয় ছিল। কারণ, অনেকে তথ্য ফাঁস করতে পারে, লোকেশন আইডেন্টিফাই করে আটক করতে পারে। ফলশ্রুতিতে যেহেতু পূর্বে একসঙ্গে আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করেছিলাম, পূর্বপরিচিত সে কারণেই ভিজ্যুয়াল সাক্ষাৎকারটা সেসময় আমাকে দিয়েছিল।
যেহেতু সেসময় দেশের গণমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের কোনো বার্তা গেলে প্রচার করত না, ফলে সরাসরি আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে যারা ছিল যেমন—নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বার্তাটা আমি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পৌঁছাতাম। সবগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যারা দায়িত্ব পালন করছিলেন তাদের সঙ্গে সরাসরি আমার যোগাযোগ হতো। বিশেষ করে বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স এবং নেত্র নিউজ।
২২ জুলাই গুলশানে মেটা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ওই ভিডিও বার্তাটি পৌঁছানোর পরে আমাকে মূলত আটক করার চেষ্টা করে সাদা পোশাকধারী পুলিশ। ওরা যেহেতু মোটরসাইকেলে ছিল, আমি তখন রাস্তা পার হয়ে হেঁটে অপজিটে চলে যাই। তাদের মোটরসাইকেল ইউটার্ন নিতে একটু দূর দিয়ে ঘুরে আসতে হয়। প্রথমে আমি একটা রিকশা নিলাম। পরে দ্রুত একটা মোটরসাইকেল পেয়ে যাই। ওই মোটরসাইকেলওয়ালা সেসময় আমাকে খুব হেল্প করছিলেন। তিনি খুব রিস্ক নিয়ে আমাকে পৌঁছে দেন। যেহেতু আটককারীরা মোটরসাইকেলে ছিল, সেহেতু তারা গুলশান থেকে বের হয়ে নতুনবাজার প্রায় যমুনা টিভির কাছাকাছি পর্যন্ত এক ধরনের সিনেমাটোগ্রাফির মতো আমাকে ধাওয়া করেছিল। তখন আমার কর্মস্থল যমুনা ফিউচার পার্কের পাশে প্রতিদিনের বাংলাদেশে আমি পৌঁছাই। সেখানে গিয়ে আমি আমার কাজ করি। পরে আমি আবার বাসায় ফিরি।
এদিকে আমি ফেরার আগেই আমার মিরপুরের বাসায় সাদা পোশাকে পুলিশ পৌঁছায়। আমি বাসার কাছাকাছি গেলেই আমাদের বাসার কেয়ারটেকার জানায়, ‘ভাইয়া আপনি আজকে বাসায় ঢুইকেন না। আপনার ছবি দেখিয়ে আমাদের জিজ্ঞেস করছে যে—আপনি এখানে থাকেন কি না।’ ওই রাতে আমি আর বাসায় থাকিনি। ২২ জুলাইয়ের পর থেকে বাসায় আর থাকতে পারিনি এবং সেদিন থেকে টানা প্রতিদিনই প্রায় ৩০ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ আমাদের এলাকায় ছিল। সর্বশেষ ২৬ জুলাই পাঁচ সমন্বয়ক নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, নুসরাত এবং আবু বাকের মজুমদারকে ডিবি অফিসে তুলে নিয়ে যায়। ওইদিনও সর্বশেষ তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল।
তবে যেখানে থাকতাম ফোন অফ করে রাখতাম। আর অফিসে গেলে মূলত ফোনটা অন করতাম। যখন তারা দেখছে যে আমি বাসায় থাকি না আর ওই অফিসে যেহেতু সর্বশেষ আমার ফোন অন ছিল, সেহেতু তারা আমাকে লোকেট করার চেষ্টা করে। শুক্রবার (২৫ জুলাই) রাত ৪টায় আমাকে তুলে নেওয়ার জন্য ৪০ জনের ওপরে র্যাবের একটি টিম প্রতিদিনের বাংলাদেশের অফিসে যায়। কিন্তু তারা জানত না যে ওটা আসলে গণমাধ্যমের অফিস। তারা দেখছে যে ভবনটাতে কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। তারা ভাবছে এটা পুরোটা মনে হয় আস্তানা। ওটা ভেবে তারা একেবারে পুরো অস্ত্রশস্ত্রসহ প্রস্তুতি নিয়ে গিয়ে সেখানে গেছে। ভবনের নিচে দারোয়ানদের অস্ত্র তাক করে ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছে—‘একে চেন কি না’। ওরা বলছে, চেনে না। পরে ওদের গায়ে হাত তুলেছে। এরপর লিফট দিয়ে ওপরে ওঠার পর দেখে যে এটা তো গণমাধ্যমের অফিস। গণমাধ্যমের অফিস জানার পরেও তারা পুরো অফিস তল্লাশি করে। আমরা যে ডেস্কে বসতাম সেসব ডেস্কে থাকা পিসির হার্ডডিস্ক ও সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক নষ্ট করে ফেলে দিয়ে যায়।
আমার বিষয়ে তারা আমার সম্পাদককে বলেছিল, ‘সে সমন্বয়কের সমন্বয়ক। একইসঙ্গে আন্দোলনকারী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ করতেছে। গণঅধিকারসহ তারেক রহমানের সঙ্গে সে যোগাযোগ রাখছে। অতএব তাকে আমাদের মাস্ট লাগবে।’
কিন্তু তখন আমার ফোন বন্ধ ছিল এবং অফিসের লোকজনও আমাকে খুঁজে পাচ্ছিল না। পরদিন জুমার নামাজ পড়ে আমি অফিসে যাই। অফিসে যাওয়ার পর সবাই অবাক হয়ে যায় এবং আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি কেন এখনও বাইরে আছি। তারা আমাকে জানায় যে আগের রাতে অফিসে রেইড দেওয়া হয়েছিল। এরপর সম্পাদকসহ সবাই আমাকে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবতে বলেন।
ওই সময় আমার এক সহকর্মী রবিউল করিমের কথা আমি বিশেষভাবে বলতে চাই। তার একটি মোটরসাইকেল ছিল এবং অফিস থেকে বের হওয়া তখন আমার জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আমি অফিসে ঢুকে যখন ফোন অন করি, তখন তিনি আমাকে বাইকে করে ঢাকার কাছাকাছি একটি নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন।
২৬ জুলাইয়ের পর থেকে ছয়জন সমন্বয়ক ডিবি হেফাজতে ছিলেন এবং বাইরে থাকা রিফাত রশিদ, মাহিন সরকার ও হান্নান মাসউদসহ অন্যরা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ওই সময়ে আমাকে মোট তিনবার গুম করার চেষ্টা করা হয়। আমি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ এবং কয়েকটি দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলাম, কারণ, গুম হওয়ার আশঙ্কা ছিল। আমাকে মোট তিনবার গুম করার চেষ্টা করা হয়।
৩০ জুলাইয়ের পর সরকারের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং ১ আগস্ট থেকে র্যাব ও পুলিশের সমন্বয় কিছুটা শিথিল হয়ে যায়। ২৯ বা ৩০ জুলাই যখন সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তখন ২ আগস্ট নাহিদ ও আসিফের সঙ্গে আমার কথা হয়। আমরা একটি বিপ্লবী সরকার গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করি। আমি তখন প্রস্তাব দিয়েছিলাম নাম রাখা হোক ‘বিপ্লবী জাতীয় সরকার’। আমার ফোনে এখনও অনেকের নম্বর ‘RNG’ (Revolutionary National Government) নামে সেভ করা আছে।
৩ আগস্ট এক দফা ঘোষণা করা হয় এবং ৪ আগস্ট রাতে জানানো হয় যে ৬ আগস্টের বদলে ৫ আগস্টেই ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ হবে। ৫ আগস্ট সকালবেলা পরিস্থিতি খুবই থমথমে ছিল এবং পুরো ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সেনাবাহিনী মোতায়েন করে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। তবে দুপুর ১২টার পর উত্তরা, জাহাঙ্গীরনগর এবং নারায়ণগঞ্জ-চট্টগ্রাম রোড থেকে আসা বিশাল মিছিলের মাধ্যমে পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তখন মূলত পুরো ঢাকা এক ধরনের ঘেরাও হয়ে যায়। তখন মূলত হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপির পক্ষে শাপলা কলি প্রতীকে ঢাকা-১৮ আসনে লড়েছিলেন। সেই নির্বাচন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
আরিফুল ইসলাম আদিব: আমাদের যে মূল্যায়নটি হয়েছে তা হলো—সাধারণ মানুষ বিশেষ করে ১১ দলীয় জোটের পক্ষে প্রচণ্ড সাড়া দিয়েছিলেন। খুব আগে থেকে কিন্তু আমার ঢাকা-১৮ আসনে কাজ করা হয়নি। দলের সিদ্ধান্তে ও ১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তেই মূলত আমার ঢাকা-১৮’তে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আমি সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। অল্প সময়ের ভেতরে অর্থাৎ এক মাসের ভেতরে প্রায় সোয়া লাখের মতো মানুষ কিন্তু আমাকে ভোট দিয়েছেন। অনেকেই চিনে দিয়েছেন, অনেকে না চিনেও আমার প্রতি, দল কিংবা নতুন কিছুর জন্য, নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা, গণ-অভ্যুত্থানের ফলে পুরোনো শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে মানুষ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ফিরে পেতে তাদের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।
এবার নির্বাচন চলার সময় সারাদিন ভোটগ্রহণে কেন্দ্রগুলো অনেকটা বিএনপির প্রভাবে ছিল। বিশেষ করে আমার প্রতিপক্ষ যিনি ছিলেন জাহাঙ্গীর ভাই, তার যারা এজেন্ট ছিলেন তারা সরাসরি বিএনপির প্রতীকসহ এজেন্টের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অথচ নির্বাচনের নিয়ম ছিল—দলীয় প্রতীকের আইডি কার্ড পরে কেউ এজেন্টের দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। ভোটকেন্দ্রের বাইরে তারা এত বেশি লোক জড়ো করেছিল যে, ভোটারদের তা এক ধরনের প্রভাবিত করে। আরেকটি বিষয় যেটি ঘটছিল সেটি হচ্ছে, রাত ২টা পর্যন্ত যমুনা টেলিভিশনে ভোটের সংখ্যা নিয়ে লাইভ চলছিল। সেখানে আমার ১ লাখ ৪৪ হাজার, আর জাহাঙ্গীর ভাইয়ের ১ লাখ ৫১ হাজার—এভাবে লাইভ চলছিল। এরপর দুই ঘণ্টা পর রাত ৪টায় রেজাল্ট দিল যে তিনি ১ লাখ ৪৪, আমি ১ লাখ ১২ হাজার ভোট পেয়েছি। ফলে এগুলো বেশকিছু সন্দেহ তৈরি করে।
একটা কেন্দ্রে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের ভোট সংখ্যা ছিল প্রথম ২৪২। পরবর্তীতে সেটা কাটাকাটি করে হয় ৫৪২। এটি সেদিন ভাইরালও হয়েছিল। এরকম কিছু কিছু ইনসিডেন্ট ছিল। খিলক্ষেতের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে যেমন—৪৩নং, ৪৮নং ওয়ার্ডে আমাদের যারা এজেন্ট ছিল তাদের প্রবেশ করতে দেয়নি, লাইনে বাধা দিয়েছে। এ রকম বেশকিছু ঘটনা ছিল। আমাদের ধারণা, এটলিস্ট ২০ হাজার ভোট গণনার মধ্যে কারচুপি হয়েছে। এটা করে মূলত তারা কিছুটা রেজাল্ট প্রভাবিত করেছে।
এশিয়া পোস্ট: গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে এনসিপির ভাবনা কী? জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এনসিপির পরিকল্পনা কী?
আরিফুল ইসলাম আদিব: গণ-অভ্যুত্থানের পরে আমরা একটা আমূল পরিবর্তন চেয়েছিলাম। আমরা বলেছিলাম, আমাদের দুটি জায়গায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। একটি—আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, আরেকটি—আমাদের ৫৪ বছর ধরে যে শাসনতান্ত্রিক কাঠামো চলছিল সেটি। সেই কাঠামো পরিবর্তনের জায়গায় আমরা বলেছিলাম—গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান। আর রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে পরিবর্তন এটি আসলে চর্চার মাধ্যমে হবে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি সবাইকে নিয়েই মূলত এই রাজনৈতিক চর্চাটা করতে হবে। এটি সময়সাপেক্ষ।
তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের সামনে যে সুযোগটা এসেছিল তা হলো—মৌলিক সংস্কারের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা। সেখানে বিএনপিসহ অনেক দল অনেক গড়িমসি করেছে। সর্বশেষ মৌলিক সংস্কারের ভিত্তিতে জুলাই সনদ সবাই স্বাক্ষর করল এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ দেওয়া হলো। সেই আদেশের ভিত্তিতেই একটি জাতীয় নির্বাচন এবং একইসঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই গণভোটে বাংলাদেশের প্রায় ৬৯ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। নির্বাচন শেষে এখন বিএনপি সেই জায়গায় জাতির সঙ্গে প্রতারণামূলক অবস্থান নিয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে তাদের দলের বর্তমান সংসদের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে। তাহলে একইসঙ্গে নির্বাচনের আগে তিনি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে, আবার নির্বাচনের পর গণভোটের রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এবং পুরোপুরি রায়টাকে অমান্য করছেন। আমরা দেখলাম বর্তমান সংসদের স্পিকার বলেছেন, আমরা যদি জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটে রাজি না হতাম তাহলে জাতীয় নির্বাচন হতো না। তিনি যে বক্তব্যটা দিয়েছেন এটি আসলে রাজনীতিবিদের জায়গা থেকে খুবই প্রতারণামূলক বক্তব্য। অর্থাৎ বিএনপি যদি জাতীয় নির্বাচনের আগেই ‘না’ -এর পক্ষে অবস্থান নিত, তাহলে বিএনপি কিন্তু সরকার গঠন করতে পারত না। কারণ, ৭০ শতাংশ মানুষ কিন্তু গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে, পরিবর্তনের পক্ষে, সংস্কারের পক্ষে ছিল—নতুন বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। ফলে যে সুযোগটা জাতীয়ভাবে এসেছিল এটি বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনে বিএনপি বড় আকারে বাধা হলো এবং তারা সেই পরিবর্তনটি করল না।
এখন আমাদের সামনে যেটি হবে তা হলো—গণভোটের পক্ষে যে রায় সেটির জন্য এই সংসদে আমাদের (এনসিপির) ছয়জন সংসদ সদস্য আছে এবং বিরোধী দলের পুরো জোটের জায়গা থেকে প্রায় ৭৭ জন আছেন, তারা সংসদে এটি নিয়ে বিতর্ক করছেন, পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করছেন। যদিও তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, তাই সরকারি দল এটি অগ্রাহ্য করে যাচ্ছেন।
ফলে আমরা বলছি এটা দুইভাবে হবে—সংসদে এবং রাজপথে। রাজপথে আমাদের রাজনৈতিক লড়াইটা চলবে। সামনে অতি দ্রুত ১১ দলের মিটিং আছে। সেই মিটিংয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেবে এ বিষয়ে তারা রাজনৈতিকভাবে কী কর্মসূচি ঘোষণা করবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে ১১ দল ও বিরোধী দল আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মসূচির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপি বলছে—সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। সেক্ষেত্রে অসুবিধা কোথায়?
আরিফুল ইসলাম আদিব: এখানে অবশ্যই অসুবিধা আছে। বর্তমানে এই সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচারে যেটি আছে, তা জুলাই সনদের প্রায় ১৯টি মৌলিক সংস্কারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অর্থাৎ আমি সাধারণ মানুষের বোঝার জন্য যদি বলি—ধরেন একটি টেবিল গোলাকার, কিন্তু আমার প্রয়োজন বর্গাকার টেবিল। এখন আমি এটি বর্গাকার করতে পারব না। কারণ, এর স্ট্রাকচার তা সাপোর্ট করবে না। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি দলের প্রধান থাকতে পারবেন না; প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য; সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বডির মাধ্যমে নিয়োগ করা। যেমন—দুদক, ইসি থেকে শুরু করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ।
এই বেসিক পরিবর্তনগুলা করতে হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমেই মূলত সেটিকে বৈধ করতে হবে। আর যদি সেটি না করে জাস্ট সংশোধনী করেন, তাহলে ক্ষমতায় এসে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১-এর ভেতর জিয়াউর রহমান অনেকগুলো সংশোধন করছিলেন, আবার যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে তাদের মতো করে তারা সংবিধান সংশোধন করছে, এরশাদ তার মতো করে সংবিধান সংশোধন করছে।
অর্থাৎ যখন যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় পুরো সংবিধানটাকে সংবিধানের মূলনীতি থেকে শুরু করে দলীয় যে মূলনীতি সেটি জাতির সামনে সাংবিধানিকভাবে চাপিয়ে দেয়। যেমন, বিএনপি বলে—স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান। সাংবিধানিকভাবে কিন্তু তারা সেটি বলতে পারেন না।
ধরেন আপনি প্রথমে সংবিধান থেকে এই জিনিসটা বাদ দিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো সংবিধানেই ছিল। বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে একটি বিষয় খুবই দুঃখজনক যে, একই জিনিস সরকারে থাকলে বিরোধিতা করে, বিরোধী দলে গেলে তার পক্ষ নেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য বিএনপি-জামায়াত থেকে শুরু করে সবাই আন্দোলন করল। অথচ ১৯৯১ সালে বিএনপি যখন আবার সরকারে গেছে তখন তারা সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার মানতে চায়নি। আওয়ামী লীগ সেটি আন্দোলন করে আনছে। সেই আওয়ামী লীগই আবার ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করছে। বাতিল করে এরপরে বক্তব্য দিয়েছে যে, সংবিধানের বাইরে যাব না। সংবিধান তো বাইবেল না বা কোরআন না।
এশিয়া পোস্ট: এনসিপিকে উদ্দেশ করে পার্থ বলেছেন, ‘আপনারা জেন-জি (Gen-Z)-কে রিপ্রেজেন্ট করেন, জামায়াত জেনারেশন হয়েন না’। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
আরিফুল ইসলাম আদিব: আন্দালিব রহমান পার্থ ভাই যে বক্তব্যটা দিয়েছেন সেটি আমাদের কাছে খুব বেশি গ্রহণযোগ্য না। কারণ, পার্থ ভাইয়ের রাজনৈতিক চরিত্রটা যদি বিশ্লেষণ করি—পার্থ ভাইয়ের একটি রাজনৈতিক দল আছে। তিনি নিজের দলের যে মূলনীতি, দলকে প্রতিষ্ঠিত করা, সারা দেশে সংগঠিত করা, শিক্ষার্থীদের মাঝে দলের প্রসার করা—সেই জিনিসটা কিন্তু তিনি করেননি। বরং জাস্ট একটা দল খুলছেন একজন অপরচুনিস্ট হিসেবে। এখন বিএনপির সঙ্গে আছেন। যদি জামায়াতের সঙ্গে ভালো বোঝাপড়া হতো তাহলে হয়তো তিনি জামায়াত থেকেও নির্বাচন করতেন। তার নিজের দলের আদর্শটাই তো অনেকটা বিলীন করে দিয়েছেন। দলকে প্রতিষ্ঠিত করেননি। তার দলের সেকেন্ড ম্যান কে, আন্তর্জাতিক সম্পাদক কে কেউ বলতে পারবে না। বরং তার চেয়ে এনসিপি অলরেডি এস্টাবলিশড। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অলরেডি একটা বিকল্প সংস্কৃতি এস্টাবলিশড করছে এনসিপি। এনসিপিতে কেউ একক নেতৃত্বের কথা বলতে পারবেন না। ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ বলতে এনসিপিতে কেউ নেই। এখানে অনেকগুলো লিডারশিপ সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।
যারা একক নেতৃত্ব, ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ দল হয়ে আরেকটা প্রতিষ্ঠিত দলকে যখন পরামর্শ দেন, তখন তার নিজের আগে সেই রাজনৈতিক চর্চা করা উচিত। রাজনৈতিক বিরোধিতার জায়গা থেকে তিনি মূলত এ ধরনের কথা বলেন। একই জামায়াতের সঙ্গে তারা দীর্ঘ ২২ বছর একই জোটে ছিলেন। মানে তাদেরটা তো ঘোষিত জোট ছিল। একেবারে বিএনপি-জামায়াতসহ তারা ২০ দলীয় একটা জোট ছিল। সেই জায়গা থেকে এখন কেন এমনটা বলছেন? শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিরোধিতার জায়গা থেকে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপিকে মিলিয়ে হচ্ছে একটা ট্যাগ করা।
এশিয়া পোস্ট: নানা চাপে এনসিপি কি তাহলে জামায়াতে ইসলামীর জোট থেকে বেরিয়ে আসবে? নাকি জোট রক্ষা করবে?
আরিফুল ইসলাম আদিব: কোনো চাপের কারণে এ জোট হয়নি। এনসিপি জাতীয় নির্বাচনের আগে খুব স্পষ্ট করে বলেছিল, চারটি পয়েন্টে মূলত এই জোট হয়েছিল। চলমান বিচার, সংস্কার, আধিপত্যবাদ বিরোধী অবস্থান এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের জায়গা থেকে মূলত ১১ দলের মিলে নির্বাচনের পূর্বে জোট করেছিল। অর্থাৎ আমরা যে উদ্দেশ্যে জোট করেছি সেটি নির্বাচনের বিষয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে। কারণ, নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য যে কাজে রাজি হয়েছিল, নির্বাচনের পরে আমরা দেখলাম ঠিক ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে তারা গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ফলশ্রুতিতে আমাদের এই জোটটা কোনো রাজনৈতিক চাপে না, জাতির প্রয়োজনে, সংস্কারের প্রয়োজনে, গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার জন্য। দেড় হাজারের অধিক যে মানুষগুলো শহীদ হলো তারা নতুন বাংলাদেশ চেয়েছে যেখানে সুশাসন থাকবে, মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, একটি সাম্য মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে—সেই জায়গা থেকেই মূলত এই ১১ দলীয় জোট করা হয়েছিল।
এশিয়া পোস্ট: ধরুন আওয়ামী লীগ দেশের রাজনৈতিক কার্যক্রমের অনুমতি পেল। তখন আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টির সঙ্গে এনসিপির কোনো প্রকার জোট গঠনের পরিকল্পনা বা সম্ভাবনা আছে?
আরিফুল ইসলাম আদিব: আওয়ামী লীগের তো এই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক এবং নৈতিক অস্তিত্ব নেই। ফলশ্রুতিতে একটা নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে জোট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আওয়ামী লীগ নিয়ে অনেকে ভুল ন্যারেটিভ দেন। আমাদেরকে খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে যে, আওয়ামী লীগের স্বাধীনতার পরবর্তী সময়—স্বাধীনতার আগের চ্যাপ্টারটা ভিন্ন রকম ছিল। তারা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে যতবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে, ততবার তারা গণহত্যা করেছে।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালে ৩০ হাজারেরও অধিক জাসদসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে। ১৯৭২ সালে একতরফা নির্বাচন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচনে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করেছে। এগুলো আওয়ামী লীগের চরিত্র। তারা আবার যখন ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় আসলেন, তখন তারা আবার এক ধরনের বিরোধী দল দমন-পীড়ন করেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে, স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে, দেশবিরোধী হিসেবে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের তাবেদার হিসেবে এবং একই সঙ্গে গণহত্যাকারী দল হিসেবে বাংলাদেশে তাদের রাজনীতি করার রাজনৈতিক ও নৈতিক অধিকার নেই।
এশিয়া পোস্ট: আপনি এনসিপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। জুলাই আন্দোলন পরবর্তী গড়ে ওঠা এ সংগঠনটি নিয়ে আপনার বা এনসিপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আরিফুল ইসলাম আদিব: আমাদের পরিকল্পনা আমরা বলেছি, বাংলাদেশের একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন করা। আমাদের দলের নাম—জাতীয় নাগরিক পার্টি। আমরা দেখি বাংলাদেশের জনগণের অধিকার। কিন্তু সে যে নাগরিক, তার নেই অধিকারটা কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ নাগরিক এবং জনগণ এই দুইটার ভেতরে কিন্তু একটা পার্থক্য আছে। ‘জনগণ’ বলে অনেক অধিকারকে স্কিপ করে যায় কিংবা তাকে গুরুত্ব না দিয়ে পারেন। নাগরিক হিসেবে একজন মানুষের যে অধিকারগুলো আছে, সে অধিকারগুলো কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রতিটি মানুষের অধিকার সমান। সেই অধিকারে রাজনৈতিক দল, ধর্ম-বর্ণ, আর্থিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। যেমন— পুলিশ স্টেশনে একজন একজন সচিব গেলে রাষ্ট্র তাকে যতটুকু সেবা দিতে বাধ্য, একজন রিকশাচালক গেলেও একই সেবা দিতে বাধ্য। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল সমানভাবে বাধ্য। ফলে এই রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের এনসিপির মূল লক্ষ্য।
এশিয়া পোস্ট: আপনি কেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে লড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন? আপনার রাজনৈতিক দল এনসিপির মূল আদর্শ এখানে কীভাবে প্রতিফলিত হবে?
আরিফুল ইসলাম আদিব: এটা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বলছেন। প্রথমত—আমি প্রায় আমাদের নাগরিক কমিটি থেকে শুরু করে ঢাকা মহানগরের দায়িত্ব পালন করে আসছি। ঢাকা মহানগরের সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত করা এবং প্রতিটি ওয়ার্ড পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছিলাম। একইসঙ্গে জাতীয় নির্বাচনে আমি ঢাকা-১৮ থেকে নির্বাচন করেছি। সেসময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রায় ৪০ শতাংশ এরিয়া কিন্তু অলমোস্ট কভার করেছি। ফলে আমার অলরেডি ৪০ শতাংশ এরিয়াতে কাজ করেছি। একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে সাংগঠনিকভাবেও দলের প্রয়োজনে কিন্তু পুরো ঢাকা উত্তর সিটিতে সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিস্তৃত করার একটা সুযোগ আছে।
দ্বিতীয়ত— আমরা এই নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারব। আমাদের দল গণতান্ত্রিক চর্চায় বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যে বাংলাদেশ হবে আত্মমর্যাদার। কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র না শুধু, কোনো পরাশক্তির কাছে নিজেদের আত্মমর্যাদা বিলীন করবে না। আমরা দেখেছিলাম ফ্যাসিবাদীদের সময় আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা বলতেন, ‘আমরা ভারতবর্ষের সরকারের কাছে অনুরোধ করেছি’। অর্থাৎ তাদের কাছে এক ধরনের নতজানু পররাষ্ট্র নীতি ছিল। সেই জায়গায় বিশ্ব দরবারে আত্মমর্যাদার জাতি হিসেবে আমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা। ফলে রাজধানীটা অর্থাৎ ঢাকা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখান থেকেই উদাহরণ কিন্তু তৃণমূল দেখে। ফলে এই ঢাকা সিটির নাগরিকদের অধিকার এবং নাগরিক সেবাটা যদি আমরা সমানভাবে নিশ্চিত করতে পারি, জুলুমের জায়গা থেকে মানুষ যদি কিছুটা আসান পায়। ঢাকার একটি কথা আছে— ঢাকায় টাকা ওড়ে। ঢাকায় যাদের টাকা আছে তারাই ভালো আছে, বাকিরা কিন্তু খুব বেশি ভালো নেই। ফলে ক্ষমতা ও টাকার দাপট থেকে ঢাকার নাগরিকদের রক্ষা করতে হবে। সেই জায়গাটায় আমরা দীর্ঘমেয়াদি কাজ করতে চাই। আশা করি সামনে ইনশাআল্লাহ জনগণ আমাদের ডাকে আরও বেশি সাড়া দেবে।
এশিয়া পোস্ট: জাতীয় নির্বাচনে এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি জোট করেছিল। সিটি নির্বাচনগুলোতে কি এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনি জোট করবে?
আরিফুল ইসলাম আদিব: জাতীয় নির্বাচনের আমাদের জোট ছিল। জামায়াতে ইসলামীও কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে ৩০০ আসনেই তাদের প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছিল। ফলে ১১ দলীয় জোটের প্রতিটি দলই তাদের স্থানীয় নির্বাচনে নিজস্বভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাতীয় স্বার্থে কিংবা রাজনৈতিক পরবর্তী বাস্তবতায় যদি মনে হয় যে এই স্থানীয় নির্বাচনে একসঙ্গে করবে সেটি তখনকার প্রেক্ষাপটে হয়ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ হতে পারে। কিন্তু তার পূর্বে এককভাবেই এনসিপি স্থানীয় প্রতিটি জায়গায় ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩০০-এর অধিক পৌর মেয়র এবং ৫০০-এর অধিক অলমোস্ট ৪৯৭টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনগুলোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এশিয়া পোস্ট: একজন তরুণ প্রার্থী হিসেবে ঢাকার সাধারণ মানুষের জন্য আপনার ‘সিগনেচার’ প্রতিশ্রুতি কী?
আরিফুল ইসলাম আদিব: আমি আমাদের মতটা বলছি, ‘পরিকল্পিত, নিরাপদ এবং ইনসাফের নগরী’। নাগরিকদের নিরাপত্তাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে— ঢাকায় অনেকগুলো কর্তৃপক্ষ। অর্থাৎ, সিটি করপোরেশন একটি কর্তৃপক্ষ, এর প্যারালালি ঢাকা উত্তর সিটিতে ৮টি সংসদীয় আসন। এই সংসদীয় আসনে যারা এমপি আছেন, তারাও কিন্তু এক ধরনের কর্তৃপক্ষ হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। এখানকার নাগরিক সেবার সঙ্গে অনেকগুলো কর্তৃপক্ষ যেমন—ওয়াসা, রাজউকসহ অনেকগুলো মন্ত্রণালয় জড়িত। ফলে আমাদেরকে প্রথমে যেটা করতে হবে— সর্বপ্রথম পলিসি এবং পরিকল্পনাটা সুন্দরভাবে নিতে হবে এবং এখানে একটি ইন্টিগ্রেটেড গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা নিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ একটি বডি থাকবে যেখানে ইজিলি সবকিছু খুঁজে পাবেন। কোথাও আপনার আর অসুবিধার জায়গাটা থাকবে না।
ফলে ঢাকাকে একটি মানবিক এবং ইনসাফের নগরী করে তুলতে হলে একজন নাগরিক সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে তার রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত নিরাপদ করতে হবে। দিনে এবং রাতে, ঘুমন্ত এবং জাগ্রত অবস্থায় মানুষের জীবনের নিরাপত্তাটা আমাদেরকে আগে নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি নাগরিকের জীবন-জীবিকা এবং নিরাপত্তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: বর্ষা মৌসুমে উত্তর ঢাকার জলাবদ্ধতা একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। ড্রেনেজ সিস্টেম আধুনিকায়নে আপনার পরিকল্পনা কী?
আরিফুল ইসলাম আদিব: ঢাকার যে খাল এবং নদীগুলো আছে, সেই নদীগুলো কিন্তু দখল এবং দূষণে জর্জরিত। এই দখল এবং দূষণ যারা করেন তারা কিন্তু কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং রাজনৈতিক বলয়ের আশেপাশে থাকেন। পুরো ঢাকা উত্তর সিটিতে যতগুলো খাল আছে, আমরা বিগত সময় দেখেছিলাম বেশ কিছু খাল উদ্ধারের অভিযান কার্যক্রম হয়েছে, খালগুলো পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ঢাকার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানটা হচ্ছে এসব দখলকৃত খালগুলো পুনরুদ্ধার এবং এটাকে দূষণমুক্ত করা। অর্থাৎ দখল ও দূষণমুক্ত করতে পারলে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে। ফলে পরিবেশগত জায়গা থেকে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সর্বপ্রথম নদী এবং খালের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: উত্তরার যানজট থেকে শুরু করে বাড্ডা-প্রগতি সরণির বিশৃঙ্খলা নিরসনে আপনি কি কোনো বিশেষ ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট মডেলের কথা ভাবছেন?
আরিফুল ইসলাম আদিব: আমি ইতোপূর্বে বলেছিলাম যে, ইন্টিগ্রেটেড গভর্ন্যান্স লাগবে। অর্থাৎ পুরো ঢাকা উত্তরের ট্রাফিক চাইলে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। একইসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ট্রাফিক যদি নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তবে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, বিআরটিএ, পরিবহন মালিক সমিতি— প্রত্যেকের সঙ্গে একটি সমন্বয় লাগবে। কারণ উত্তরা দিয়ে দূরপাল্লার যে বাসগুলো যায়, বিশেষ করে গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে শুরু করে আব্দুল্লাহপুর, উত্তরা, এয়ারপোর্ট, বাড্ডা পর্যন্ত একটা যানজট লেগে থাকে। ফলে এখানে সমন্বিত একটি উদ্যোগ নিতে হবে। যে বাস যেখানে স্টপেজ দেওয়া দরকার, দেখা গেছে সেই স্টপেজগুলোতে বাস থামে না, থামে আরেক জায়গায় গিয়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— সড়কের পাশে অনেক সময় হকার থাকে, মানে ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলা থাকে। তাদের জন্য একটি স্মার্ট হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আসতে হবে। হকারদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে বসার ব্যবস্থা করে দিলে ফুটপাতগুলো মুক্ত হবে। ফুটপাথ মুক্ত হলে যানজট নিরসনে সহায়ক হবে।
এশিয়া পোস্ট: মশা নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে আপনি কি কোনো বৈজ্ঞানিক বা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছেন?
আরিফুল ইসলাম আদিব: নাগরিক জীবনে মশার উপদ্রব খুব বেশি। ডেঙ্গু প্রায়ই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে। মশার নিয়ন্ত্রণ করতে যারা বিশেষজ্ঞ, এক্সপার্ট ও এন্টোমোলজিস্ট আছেন তাদের সঙ্গে আলোচনা করে এর একটি স্মার্ট ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিতে হবে।
প্রথমত— মশা যেখানে লার্ভা সৃষ্টি করে, যেখানে ডিম পাড়ে, পানির জায়গা, ড্রেনেজ সিস্টেমগুলো টার্গেট করে আগে স্প্রে করতে হবে। মশার নির্দিষ্ট একটি প্রজনন সময় থাকে। যে সময় তারা সবচেয়ে বেশি প্রজনন করে, বৃদ্ধি পায়। ওই সময়টাতেই ড্রেনগুলো, অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন জায়গাগুলোতে সঠিক সময়ে স্প্রে করতে হবে। দ্বিতীয়ত— মশাটা যখন বড় হয়ে যায় অর্থাৎ অ্যাডাল্ট হয়ে যায় তখন তাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেটির জন্য কিন্তু আবার আলাদা পদ্ধতি নিতে হবে। এর সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে— সব নাগরিকদের এ প্রক্রিয়ায় জড়িত করা। ফলে মশার ক্ষেত্রে প্রতিটি স্টেজে আলাদাভাবে আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা দেখেছি, বর্তমান প্রশাসক রাতের বেলা মশার ওষুধ দিচ্ছিলেন। রাতে মশার ওষুধ দেওয়াটা আসলে খুব বেশি কার্যকর নয় কিংবা এটি ভূমিকা রাখে না। বরঞ্চ এটি জাস্ট লোক দেখানো এক ধরনের কর্মসূচি।
এশিয়া পোস্ট: ঢাকা শহরের সবুজায়ন এবং বায়ু মান উন্নয়নে আপনার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কী হবে?
আরিফুল ইসলাম আদিব: ঢাকা শহরে যতটুকু সবুজায়ন থাকা উচিত কিংবা যতটুকু স্পেস থাকা উচিত, সেটি টোটালি নেই। এজন্য যেটি করতে হবে— পাবলিক যে স্পেসগুলো আছে অতি দ্রুত সেই স্পেসগুলো উদ্ধার করতে হবে। উদ্ধার করে সেখানে সবুজায়ন করতে হবে। যে জায়গাগুলোতে ধুলা উড়ে বেশি সেই জায়গাগুলোতে প্রপার ব্যবস্থা নিতে হবে। রাস্তার উন্নতি করতে হবে। ধুলা কমানোর জন্য স্প্রে থেকে শুরু করে পানি দিয়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যেসব পরিবহন আছে, যেগুলো প্রচুর কালো ধোঁয়া ছাড়ে, সেগুলোর বিষয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। বায়ুমান উন্নয়ন করতে হলে একইসঙ্গে পরিবেশগতভাবে কাজ করতে হবে। ট্রাফিকিং উন্নতি করতে হবে এবং একইসঙ্গে মানুষকেও সচেতন করতে হবে। অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আমাদেরকে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: ‘স্মার্ট ঢাকা’ গড়ার ক্ষেত্রে নাগরিক সেবাগুলোকে (যেমন: ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম নিবন্ধন) শতভাগ ডিজিটালাইজড করতে আপনার রোডম্যাপ কী?
আরিফুল ইসলাম আদিব: অলরেডি বেশ কিছু সেবা ডিজিটালাইজড আছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেই সুবিধা পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে একটি লাইসেন্স করতে গেলে আপনাকে যে পরিমাণ বেগ পেতে হয়, স্তরে স্তরে ঘুষ বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, কিন্তু যার রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে তার কিন্তু এসব পোহাতে হয় না। ফলে আমরা বলেছি, নাগরিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা কোনো ধরনের পরিচয় যেন প্রভাবিত করতে না পারে, সেই জায়গাটা নিশ্চিত করতে হবে।



