ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

সাক্ষাৎকারে আরিফুল ইসলাম আদিব

ক্ষমতা ও টাকার দাপট থেকে ঢাকার নাগরিকদের রক্ষা করতে হবে

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার

  ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ২২:০৪
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব। কেন্দ্রীয় দায়িত্বের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ইতোপূর্বে তিনি দলটির রাজনৈতিক লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের মনোনীত মেয়র প্রার্থী তিনি। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি শাপলা কলি প্রতীকে ঢাকা-১৮ আসনে লড়েছিলেন।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

রাজনীতির বাইরেও আরিফুল ইসলাম আদিবের একটি পেশাগত পরিচয় আছে। তিনি যুক্ত ছিলেন সাংবাদিকতায়। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ফ্রিল্যান্স রাইটার হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২০ সালের পর থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট এবং মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেন আরিফুল ইসলাম আদিব। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাকারিয়া নূরী—

এশিয়া পোস্ট: আদিব বরিশালের সন্তান আপনি। বরিশাল থেকে জাতীয় রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হলেন কীভাবে?

আরিফুল ইসলাম আদিব: মূলত ২০০৯ সাল থেকে রাজনীতির প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়। সাধারণত ক্লাস এইট-নাইন থেকে স্কুলে ‘এইম ইন লাইফ’ পড়ানো হয়। ওই সময়টাতে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনার জন্য আমি আমার বেড়ে ওঠা বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় দাদাবাড়ি থেকে বরিশালে শিফট হই। তখন থেকে মূলত এই রাজনীতির বিষয়ে আমার আগ্রহ তৈরি হয়। তবে, পেশাগত জায়গায় সফল হয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করার একটা ইচ্ছা আমার ছিল।

সে জায়গা থেকে একসময় ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছা ছিল, ক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছা ছিল। ক্রিকেটার হওয়ার জন্য আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলাম। প্র্যাকটিস করেছিলাম বরিশাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। ইন্টারমিডিয়েটে আমি তেমন পড়াশোনা করিনি, শুধু টেস্ট পরীক্ষা দিয়েছিলাম। এইচএসসির পর মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। অল্প কিছু নম্বরের জন্য মেডিকেলে চান্স হয়নি। এরপরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যায় ভর্তি হই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরে এক শিক্ষক তিনি বললেন, মেডিকেলে পড়াশোনার চেয়ে ভার্সিটি আরও অনেক বেশি জানাশোনার জায়গা। এরপরে ভার্সিটিতে কন্টিনিউ করি।

প্রথমে ডিপার্টমেন্টে ভালো রেজাল্ট করার ইচ্ছা ছিল। প্রথম বর্ষে সেরকম পড়াশোনাও করেছিলাম কিন্তু ছোটবেলা থেকে আমার হাতের লেখা খুব বেশি স্ট্যান্ডার্ড ছিল না। ফলে আমি যে মার্ক এক্সপেক্ট করেছিলাম ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্টে তা হয়নি। এরপর চিন্তা করলাম যে না, এখানে খুব বেশি এফোর্ট দেব না। দুই বছর পর মানে থার্ড ইয়ারে আমি সাংবাদিকতায় মনোযোগ দিই। ২০১৬ সালে আমি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হই। তখন আমি মূলত জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে ফিচার লেখা শুরু করি। আমার মনে আছে যতগুলো নামকরা পত্রিকা ছিল, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম সবগুলোতে আমি বিভিন্ন ক্যাম্পাসের ইতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ে সাংবাদিকতা শুরু।

এরপর ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন আসলো তখন আমি সাংবাদিকতা করি এবং আমার তখন আমার অনার্স ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা চলছিল। ওই সময় আমার মূলত দায়িত্ব ছিল কমিউনিকেশনে, যোগাযোগে। আমার মনে আছে—১১ এপ্রিল যেদিন শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিল যে—কোটা কোথায় রাখবে আর রাখবে না, মানে সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীরা যে রাস্তা অবরোধ করেছিল, তো ওই মোমেন্টে আমাদের আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন শাকিল ভাই, তিনি বলেছিলেন, তুমি অন্যদের সঙ্গে একটু যোগাযোগ করো। তখন আমি মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসান আল মামুন ভাইসহ অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ মেইনটেইন করতাম। এভাবে মূলত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হই। এরপর আন্দোলন তো সর্বশেষ সফল হলো।

ডাকসু নির্বাচনে নুর ভাই ভিপি নির্বাচিত হলেন। তখন মনে হয়েছে যে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে একটা ডিফরেন্ট পলিটিক্স আসলে বাংলাদেশে করা সম্ভব। তখন আমার কাছে মনে হয়েছে যে, পেশাগত জায়গার বাইরেও সরাসরি পলিটিক্সটাও করা যেতে পারে। তখন আমি মূলত সিদ্ধান্ত নেই যে, আমি সরাসরি পলিটিক্সে আসব। তার আগে প্ল্যানটা ছিল যে—আগে পেশাগত জায়গায় সর্বোচ্চ সফল হয়ে তারপর পলিটিক্স। ওই ডাকসু নির্বাচন আমার রাজনীতির জানালাটা খুলে দেয়। তখন আমি সরাসরি ছাত্র অধিকার পরিষদের সঙ্গে একেবারে ফুললি এনগেজ হই।

আমাদের দেশে সাধারণত যারা পলিটিক্স করতে চায় তারা হয় পলিটিক্যাল ফ্যামিলি থেকে আসতে হয় অথবা আওয়ামী লীগ-বিএনপি করলে নিজের ব্যক্তিত্ব অনেক সময় বিসর্জন দিয়ে রাজনীতি করতে হয়। যেমন—ছাত্রদলের এখনও যারা সেন্ট্রাল নেতৃত্বে আছে তাদের বয়স প্রায় ৪০ এর কাছাকাছি, এটলিস্ট ৩৫। একটা মানুষের ছাত্র রাজনীতি শেষ করতে যদি ৪০ বছর চলে যায়, তাহলে সে জাতীয় রাজনীতিতে কখন প্রবেশ করবে?
২০১৯ সালে ছাত্র অধিকার পরিষদে এনগেজড হওয়ার পর থেকে আমাদের জাহাঙ্গীরনগর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের একটা আলোচনা হয়েছিল, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ঘোষণাও হয়েছিল। আমরা কিছু কাজ করেছিলাম, আন্দোলন করেছিলাম দুর্নীতিবিরোধী জাহাঙ্গীরনগর আন্দোলন। অনেকের সঙ্গে আমিও সংগঠিত করার দায়িত্বে ছিলাম। বেশ কয়েকটা আন্দোলন করেছিলাম। ২০২১ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে সরাসরি আমি ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই।

সেখানে দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর গণ-অধিকার মূল দলের বিভিন্ন দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছিল। কিন্তু, ২০২৪ এর নির্বাচনের পূর্বে আমাদের একটা প্রত্যাশা ছিল যে এই নির্বাচনে এটলিস্ট বিএনপি-জামায়াতসহ ৬৪ দলের যে যুগপৎ আন্দোলন ছিল সেটি সফল হবে। কিন্তু যতটা দেখলাম, খুব বেশি তা রাজনৈতিকভাবে হয়নি। তখন আমি মূলত আমার অফিশিয়ালি দায়িত্ব পালন শেষে আর গণ-অধিকারের মূল দলে দায়িত্ব নিইনি। আমি আবার পেশাগত লাইফে কিছুটা ফিরে গিয়েছিলাম।

এরপর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যখন শুরু হয় তখন যেহেতু মূল নেতৃত্বের সঙ্গে আমার খুব আগে থেকেই ভালো যোগাযোগ ছিল, এ আন্দোলনে বলা চলে—মিডিয়া কানেক্টিভিটি এবং স্ট্র্যাটেজির জায়গায় মূলত পেছনের কারিগর হিসেবে ভূমিকা রাখি।

এশিয়া পোস্ট: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে নিজেকে আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িয়েছেন। সেসব দিনগুলো কেমন ছিল?

আরিফুল ইসলাম আদিব: ছাত্ররাজনীতি যারা করে, বর্তমানে বাংলাদেশে দুটো ঘটনা ঘটে। সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের সব ছাত্ররাজনীতির সব ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রবিন্দু অনেকটা রাজু ভাস্কর্য কিংবা টিএসসির মধুর ক্যান্টিন বরাবর। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অন্যান্য যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আছে যেমন—জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম কিংবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ছাত্র সংগঠনের মূল নেতৃত্বে উঠে আসা অনেক বেশি কষ্টকর এবং অনেক সময় একটা অমানবিক পরিশ্রম কিংবা মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। কারণটা হচ্ছে, ছাত্রদলের কমিটিতে দেখবেন প্রথম ১০০ জনের মোটামুটি ৯০ জনই বলা চলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া থাকে। ছাত্রলীগের কমিটির ইতিহাসে সম্ভবত শুধু একটা কমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের সভাপতি-সেক্রেটারি হয়েছিলেন। ডাকসুর তখন ভিপি ছিলেন এনামুল হক শামীম আর ঢাকা কলেজের একজন ছিলেন। এই দুজন শুধু ছাত্রলীগের পুরো কমিটির দায়িত্ব একবার পেয়েছিলেন।

ফলে যেটা হতো, জাহাঙ্গীরনগরে যখন আমি থাকতাম, সেখানে সাংগঠনিক কাজও আমাকে করতে হতো, আবার একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় যোগাযোগ রক্ষার জন্য ক্লাস শেষ করে দুপুরের পরে কিংবা অনেক সময় দুপুরে প্রোগ্রাম থাকলে ক্লাস মিস দিয়ে ঢাকা আসতে হতো। ঢাকায় এসে রাত ১০টা-১১টায় সবকিছু শেষ করে আবার টিএসসি থেকে বাসে করে ক্যাম্পাসের হলে যেতাম। অনেক সময় রাত ১২টা-সাড়ে ১২টা বেজে যেত। ওই সময়ে এই পরিশ্রমটা আমার জন্য বেশ প্রেশার ছিল। এরপর ছাত্র সংগঠনে আমাদের কাউন্সিল হয়েছিল। আমাদের ছাত্র অধিকার পরিষদে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি হয়েছিল। আমি সাধারণ সম্পাদকে কম্পিটিশন করেছিলাম এবং মোটামুটি ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলাম।

রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে ওটা একটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। আমার সময়ে মনে আছে যে আমি সর্বোচ্চ সংখ্যক কমিটি দিয়েছিলাম। বিভিন্ন পর্যায়ের ইউনিটে ১৩০টি কমিটি দিয়েছি। আমার কমিটিরই সম্ভবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রথম সভাপতি হয়েছিলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আর সেক্রেটারি হয়েছিলেন আনফ খান সাইদ। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দ্বিমত থেকে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তারপর তারা আলাদা গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি সংগঠন আনেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে আমাকে খুব বেশি বাধায় পড়তে হয়নি। যেহেতু আমি ক্যাম্পাসে আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি সাংবাদিকতা করতাম, সেহেতু কেউ বাধা দেওয়ার খুব বেশি চেষ্টা করত না। ক্যাম্পাসে যারা সাংবাদিকতা করতো স্বাভাবিকভাবে ছাত্রলীগ তাদের একটু ভয় পেত। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওরা ওদের মতো ব্যবহার করত। আর যারা ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতা করে, ডিবেট করে কিংবা সাংস্কৃতিক জোট করে সাধারণত ছাত্রলীগ তাদের একটু কম বাধা দেওয়ার চেষ্টা করত। মানে তাদের ক্ষেত্রে চুপ থাকত।

এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলনে র‌্যাব আপনাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়েছিল সে ঘটনাটি কী ছিল?

আরিফুল ইসলাম আদিব: জুলাই আন্দোলনের সময় আমি গণমাধ্যমে কাজ করছিলাম। সেসময় সমন্বয়কদের বার্তা আমি আন্তর্জাতিক মাধ্যমে পৌঁছাতাম। ছাত্র অধিকার পরিষদের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরপরই আমি গণমাধ্যমে যোগদান করি। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই যখন পুরো ইন্টারনেট একেবারে বন্ধ করে দেয়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। তখন আন্দোলনের মূল নেতৃত্বের অনেকেই নানা জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, বিশেষ করে নাহিদ ইসলাম যিনি বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়ক, তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। ১৯ জুলাই কীভাবে আন্দোলন কন্টিনিউ করা যায় সে বিষয়ে অফলাইনে ৪০ মিনিট কথা হয়। এদিকে গণমাধ্যম প্রচার করছিল—আন্দোলন স্থগিত হয়ে গেছে।

সেনাবাহিনী যখন মোতায়েন হয়, তখন মূলত নাহিদের সঙ্গে আমার রাত সোয়া ১টায় প্রায় ৯ মিনিট কথা হয়। সেনাবাহিনী মোতায়েন করছে, তাহলে আমাদের ভূমিকাটা আসলে কী হতে পারে এ বিষয়ে কথা হয়। তখন আমরা বলেছি, সেনাবাহিনীকে আমরা আহ্বান জানাতে পারি। তারা মূলত গণতন্ত্রের পক্ষে, আন্দোলনের পক্ষে, জনগণের বিপক্ষে যেন না যায়।

কিন্তু এর ঠিক আধঘণ্টা পরেই (১৯ জুলাই) নাহিদ ইসলামকে ডিবি প্রথম তুলে নিয়ে যায়। কারণ, তারা দেখছিল— আন্দোলনটা আসলে স্থগিত হচ্ছে না, বরং কন্টিনিউয়াসলি আন্দোলন চলছে। বিশেষ করে উত্তরায় সেদিন সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড হয়, যাত্রাবাড়ীতে শহীদ হয়। অনেকেই গুলিতে শহীদ হন। মানে এই দুই জায়গায় তুমুল আন্দোলন চলছিল। এ ছাড়াও মিরপুর সব জায়গাতে তখন আন্দোলন চলে। পরে যখন দেখছে আন্দোলন স্থগিত হচ্ছে না তখন তারা নাহিদ ইসলামকে তুলে নিয়ে যায়। নাহিদ ইসলামকে তুলে নিয়ে গেলে মূলত তার সঙ্গে যোগাযোগে ফোনের সর্বশেষ কল লিস্টে আমার নাম পায়। নাম পেলে তখন তাকে জিজ্ঞেস করে যে—সে (আমি) কে, কোথায় কী করে। নাহিদ ইসলাম স্বাভাবিকভাবে বলেছিলেন, সাংবাদিকতা করেন। তখন থেকে আমাকে ট্র্যাক করা শুরু হয়।

এরপর নাহিদ ইসলামকে দুদিন পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। নাহিদ আসিফসহ অন্যদের ছেড়ে দিলে তারা গণস্বাস্থ্যে চিকিৎসা নেন। ওই সময়ে আমি আবার তাদের দুজনের দুটি ভিডিও সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। ওইদিন তারা আমাকে বলছিল, ভাই আপনাকে কিন্তু তুলে নিয়ে যাবে। তারা আমাকে বেশ কয়েকবার এই সংকেত দিয়েছিল।
নাহিদ ইসলাম নিজেই বলছেন, ভাই আপনি একটু সাবধানে চলাফেরা করেন। আপনাকে কিন্তু তুলে নিয়ে যেতে পারে। আর ১৮ জুলাইয়ের পরে ওই মোমেন্টে আসলে কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে যে যোগাযোগ রক্ষা করবে এটাও একটা কঠিন বিষয় ছিল। কারণ, অনেকে তথ্য ফাঁস করতে পারে, লোকেশন আইডেন্টিফাই করে আটক করতে পারে। ফলশ্রুতিতে যেহেতু পূর্বে একসঙ্গে আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করেছিলাম, পূর্বপরিচিত সে কারণেই ভিজ্যুয়াল সাক্ষাৎকারটা সেসময় আমাকে দিয়েছিল।

যেহেতু সেসময় দেশের গণমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের কোনো বার্তা গেলে প্রচার করত না, ফলে সরাসরি আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে যারা ছিল যেমন—নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বার্তাটা আমি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পৌঁছাতাম। সবগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যারা দায়িত্ব পালন করছিলেন তাদের সঙ্গে সরাসরি আমার যোগাযোগ হতো। বিশেষ করে বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স এবং নেত্র নিউজ।

২২ জুলাই গুলশানে মেটা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ওই ভিডিও বার্তাটি পৌঁছানোর পরে আমাকে মূলত আটক করার চেষ্টা করে সাদা পোশাকধারী পুলিশ। ওরা যেহেতু মোটরসাইকেলে ছিল, আমি তখন রাস্তা পার হয়ে হেঁটে অপজিটে চলে যাই। তাদের মোটরসাইকেল ইউটার্ন নিতে একটু দূর দিয়ে ঘুরে আসতে হয়। প্রথমে আমি একটা রিকশা নিলাম। পরে দ্রুত একটা মোটরসাইকেল পেয়ে যাই। ওই মোটরসাইকেলওয়ালা সেসময় আমাকে খুব হেল্প করছিলেন। তিনি খুব রিস্ক নিয়ে আমাকে পৌঁছে দেন। যেহেতু আটককারীরা মোটরসাইকেলে ছিল, সেহেতু তারা গুলশান থেকে বের হয়ে নতুনবাজার প্রায় যমুনা টিভির কাছাকাছি পর্যন্ত এক ধরনের সিনেমাটোগ্রাফির মতো আমাকে ধাওয়া করেছিল। তখন আমার কর্মস্থল যমুনা ফিউচার পার্কের পাশে প্রতিদিনের বাংলাদেশে আমি পৌঁছাই। সেখানে গিয়ে আমি আমার কাজ করি। পরে আমি আবার বাসায় ফিরি।

এদিকে আমি ফেরার আগেই আমার মিরপুরের বাসায় সাদা পোশাকে পুলিশ পৌঁছায়। আমি বাসার কাছাকাছি গেলেই আমাদের বাসার কেয়ারটেকার জানায়, ‘ভাইয়া আপনি আজকে বাসায় ঢুইকেন না। আপনার ছবি দেখিয়ে আমাদের জিজ্ঞেস করছে যে—আপনি এখানে থাকেন কি না।’ ওই রাতে আমি আর বাসায় থাকিনি। ২২ জুলাইয়ের পর থেকে বাসায় আর থাকতে পারিনি এবং সেদিন থেকে টানা প্রতিদিনই প্রায় ৩০ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ আমাদের এলাকায় ছিল। সর্বশেষ ২৬ জুলাই পাঁচ সমন্বয়ক নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, নুসরাত এবং আবু বাকের মজুমদারকে ডিবি অফিসে তুলে নিয়ে যায়। ওইদিনও সর্বশেষ তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল।
তবে যেখানে থাকতাম ফোন অফ করে রাখতাম। আর অফিসে গেলে মূলত ফোনটা অন করতাম। যখন তারা দেখছে যে আমি বাসায় থাকি না আর ওই অফিসে যেহেতু সর্বশেষ আমার ফোন অন ছিল, সেহেতু তারা আমাকে লোকেট করার চেষ্টা করে। শুক্রবার (২৫ জুলাই) রাত ৪টায় আমাকে তুলে নেওয়ার জন্য ৪০ জনের ওপরে র‍্যাবের একটি টিম প্রতিদিনের বাংলাদেশের অফিসে যায়। কিন্তু তারা জানত না যে ওটা আসলে গণমাধ্যমের অফিস। তারা দেখছে যে ভবনটাতে কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। তারা ভাবছে এটা পুরোটা মনে হয় আস্তানা। ওটা ভেবে তারা একেবারে পুরো অস্ত্রশস্ত্রসহ প্রস্তুতি নিয়ে গিয়ে সেখানে গেছে। ভবনের নিচে দারোয়ানদের অস্ত্র তাক করে ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছে—‘একে চেন কি না’। ওরা বলছে, চেনে না। পরে ওদের গায়ে হাত তুলেছে। এরপর লিফট দিয়ে ওপরে ওঠার পর দেখে যে এটা তো গণমাধ্যমের অফিস। গণমাধ্যমের অফিস জানার পরেও তারা পুরো অফিস তল্লাশি করে। আমরা যে ডেস্কে বসতাম সেসব ডেস্কে থাকা পিসির হার্ডডিস্ক ও সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক নষ্ট করে ফেলে দিয়ে যায়।

আমার বিষয়ে তারা আমার সম্পাদককে বলেছিল, ‘সে সমন্বয়কের সমন্বয়ক। একইসঙ্গে আন্দোলনকারী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ করতেছে। গণঅধিকারসহ তারেক রহমানের সঙ্গে সে যোগাযোগ রাখছে। অতএব তাকে আমাদের মাস্ট লাগবে।’

কিন্তু তখন আমার ফোন বন্ধ ছিল এবং অফিসের লোকজনও আমাকে খুঁজে পাচ্ছিল না। পরদিন জুমার নামাজ পড়ে আমি অফিসে যাই। অফিসে যাওয়ার পর সবাই অবাক হয়ে যায় এবং আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি কেন এখনও বাইরে আছি। তারা আমাকে জানায় যে আগের রাতে অফিসে রেইড দেওয়া হয়েছিল। এরপর সম্পাদকসহ সবাই আমাকে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবতে বলেন।

ওই সময় আমার এক সহকর্মী রবিউল করিমের কথা আমি বিশেষভাবে বলতে চাই। তার একটি মোটরসাইকেল ছিল এবং অফিস থেকে বের হওয়া তখন আমার জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আমি অফিসে ঢুকে যখন ফোন অন করি, তখন তিনি আমাকে বাইকে করে ঢাকার কাছাকাছি একটি নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন।

২৬ জুলাইয়ের পর থেকে ছয়জন সমন্বয়ক ডিবি হেফাজতে ছিলেন এবং বাইরে থাকা রিফাত রশিদ, মাহিন সরকার ও হান্নান মাসউদসহ অন্যরা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ওই সময়ে আমাকে মোট তিনবার গুম করার চেষ্টা করা হয়। আমি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ এবং কয়েকটি দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলাম, কারণ, গুম হওয়ার আশঙ্কা ছিল। আমাকে মোট তিনবার গুম করার চেষ্টা করা হয়।
৩০ জুলাইয়ের পর সরকারের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং ১ আগস্ট থেকে র‍্যাব ও পুলিশের সমন্বয় কিছুটা শিথিল হয়ে যায়। ২৯ বা ৩০ জুলাই যখন সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তখন ২ আগস্ট নাহিদ ও আসিফের সঙ্গে আমার কথা হয়। আমরা একটি বিপ্লবী সরকার গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করি। আমি তখন প্রস্তাব দিয়েছিলাম নাম রাখা হোক ‘বিপ্লবী জাতীয় সরকার’। আমার ফোনে এখনও অনেকের নম্বর ‘RNG’ (Revolutionary National Government) নামে সেভ করা আছে।

৩ আগস্ট এক দফা ঘোষণা করা হয় এবং ৪ আগস্ট রাতে জানানো হয় যে ৬ আগস্টের বদলে ৫ আগস্টেই ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ হবে। ৫ আগস্ট সকালবেলা পরিস্থিতি খুবই থমথমে ছিল এবং পুরো ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সেনাবাহিনী মোতায়েন করে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। তবে দুপুর ১২টার পর উত্তরা, জাহাঙ্গীরনগর এবং নারায়ণগঞ্জ-চট্টগ্রাম রোড থেকে আসা বিশাল মিছিলের মাধ্যমে পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তখন মূলত পুরো ঢাকা এক ধরনের ঘেরাও হয়ে যায়। তখন মূলত হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপির পক্ষে শাপলা কলি প্রতীকে ঢাকা-১৮ আসনে লড়েছিলেন। সেই নির্বাচন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

আরিফুল ইসলাম আদিব: আমাদের যে মূল্যায়নটি হয়েছে তা হলো—সাধারণ মানুষ বিশেষ করে ১১ দলীয় জোটের পক্ষে প্রচণ্ড সাড়া দিয়েছিলেন। খুব আগে থেকে কিন্তু আমার ঢাকা-১৮ আসনে কাজ করা হয়নি। দলের সিদ্ধান্তে ও ১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তেই মূলত আমার ঢাকা-১৮’তে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আমি সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। অল্প সময়ের ভেতরে অর্থাৎ এক মাসের ভেতরে প্রায় সোয়া লাখের মতো মানুষ কিন্তু আমাকে ভোট দিয়েছেন। অনেকেই চিনে দিয়েছেন, অনেকে না চিনেও আমার প্রতি, দল কিংবা নতুন কিছুর জন্য, নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা, গণ-অভ্যুত্থানের ফলে পুরোনো শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে মানুষ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ফিরে পেতে তাদের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।

এবার নির্বাচন চলার সময় সারাদিন ভোটগ্রহণে কেন্দ্রগুলো অনেকটা বিএনপির প্রভাবে ছিল। বিশেষ করে আমার প্রতিপক্ষ যিনি ছিলেন জাহাঙ্গীর ভাই, তার যারা এজেন্ট ছিলেন তারা সরাসরি বিএনপির প্রতীকসহ এজেন্টের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অথচ নির্বাচনের নিয়ম ছিল—দলীয় প্রতীকের আইডি কার্ড পরে কেউ এজেন্টের দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। ভোটকেন্দ্রের বাইরে তারা এত বেশি লোক জড়ো করেছিল যে, ভোটারদের তা এক ধরনের প্রভাবিত করে। আরেকটি বিষয় যেটি ঘটছিল সেটি হচ্ছে, রাত ২টা পর্যন্ত যমুনা টেলিভিশনে ভোটের সংখ্যা নিয়ে লাইভ চলছিল। সেখানে আমার ১ লাখ ৪৪ হাজার, আর জাহাঙ্গীর ভাইয়ের ১ লাখ ৫১ হাজার—এভাবে লাইভ চলছিল। এরপর দুই ঘণ্টা পর রাত ৪টায় রেজাল্ট দিল যে তিনি ১ লাখ ৪৪, আমি ১ লাখ ১২ হাজার ভোট পেয়েছি। ফলে এগুলো বেশকিছু সন্দেহ তৈরি করে।

একটা কেন্দ্রে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের ভোট সংখ্যা ছিল প্রথম ২৪২। পরবর্তীতে সেটা কাটাকাটি করে হয় ৫৪২। এটি সেদিন ভাইরালও হয়েছিল। এরকম কিছু কিছু ইনসিডেন্ট ছিল। খিলক্ষেতের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে যেমন—৪৩নং, ৪৮নং ওয়ার্ডে আমাদের যারা এজেন্ট ছিল তাদের প্রবেশ করতে দেয়নি, লাইনে বাধা দিয়েছে। এ রকম বেশকিছু ঘটনা ছিল। আমাদের ধারণা, এটলিস্ট ২০ হাজার ভোট গণনার মধ্যে কারচুপি হয়েছে। এটা করে মূলত তারা কিছুটা রেজাল্ট প্রভাবিত করেছে।

এশিয়া পোস্ট: গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে এনসিপির ভাবনা কী? জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এনসিপির পরিকল্পনা কী?

আরিফুল ইসলাম আদিব: গণ-অভ্যুত্থানের পরে আমরা একটা আমূল পরিবর্তন চেয়েছিলাম। আমরা বলেছিলাম, আমাদের দুটি জায়গায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। একটি—আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, আরেকটি—আমাদের ৫৪ বছর ধরে যে শাসনতান্ত্রিক কাঠামো চলছিল সেটি। সেই কাঠামো পরিবর্তনের জায়গায় আমরা বলেছিলাম—গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান। আর রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে পরিবর্তন এটি আসলে চর্চার মাধ্যমে হবে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি সবাইকে নিয়েই মূলত এই রাজনৈতিক চর্চাটা করতে হবে। এটি সময়সাপেক্ষ।

তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের সামনে যে সুযোগটা এসেছিল তা হলো—মৌলিক সংস্কারের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা। সেখানে বিএনপিসহ অনেক দল অনেক গড়িমসি করেছে। সর্বশেষ মৌলিক সংস্কারের ভিত্তিতে জুলাই সনদ সবাই স্বাক্ষর করল এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ দেওয়া হলো। সেই আদেশের ভিত্তিতেই একটি জাতীয় নির্বাচন এবং একইসঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই গণভোটে বাংলাদেশের প্রায় ৬৯ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। নির্বাচন শেষে এখন বিএনপি সেই জায়গায় জাতির সঙ্গে প্রতারণামূলক অবস্থান নিয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনের আগে তাদের দলের বর্তমান সংসদের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে। তাহলে একইসঙ্গে নির্বাচনের আগে তিনি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে, আবার নির্বাচনের পর গণভোটের রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এবং পুরোপুরি রায়টাকে অমান্য করছেন। আমরা দেখলাম বর্তমান সংসদের স্পিকার বলেছেন, আমরা যদি জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটে রাজি না হতাম তাহলে জাতীয় নির্বাচন হতো না। তিনি যে বক্তব্যটা দিয়েছেন এটি আসলে রাজনীতিবিদের জায়গা থেকে খুবই প্রতারণামূলক বক্তব্য। অর্থাৎ বিএনপি যদি জাতীয় নির্বাচনের আগেই ‘না’ -এর পক্ষে অবস্থান নিত, তাহলে বিএনপি কিন্তু সরকার গঠন করতে পারত না। কারণ, ৭০ শতাংশ মানুষ কিন্তু গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে, পরিবর্তনের পক্ষে, সংস্কারের পক্ষে ছিল—নতুন বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। ফলে যে সুযোগটা জাতীয়ভাবে এসেছিল এটি বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনে বিএনপি বড় আকারে বাধা হলো এবং তারা সেই পরিবর্তনটি করল না।

এখন আমাদের সামনে যেটি হবে তা হলো—গণভোটের পক্ষে যে রায় সেটির জন্য এই সংসদে আমাদের (এনসিপির) ছয়জন সংসদ সদস্য আছে এবং বিরোধী দলের পুরো জোটের জায়গা থেকে প্রায় ৭৭ জন আছেন, তারা সংসদে এটি নিয়ে বিতর্ক করছেন, পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করছেন। যদিও তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, তাই সরকারি দল এটি অগ্রাহ্য করে যাচ্ছেন।

ফলে আমরা বলছি এটা দুইভাবে হবে—সংসদে এবং রাজপথে। রাজপথে আমাদের রাজনৈতিক লড়াইটা চলবে। সামনে অতি দ্রুত ১১ দলের মিটিং আছে। সেই মিটিংয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেবে এ বিষয়ে তারা রাজনৈতিকভাবে কী কর্মসূচি ঘোষণা করবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে ১১ দল ও বিরোধী দল আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মসূচির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

এশিয়া পোস্ট: বিএনপি বলছে—সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। সেক্ষেত্রে অসুবিধা কোথায়?

আরিফুল ইসলাম আদিব: এখানে অবশ্যই অসুবিধা আছে। বর্তমানে এই সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচারে যেটি আছে, তা জুলাই সনদের প্রায় ১৯টি মৌলিক সংস্কারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অর্থাৎ আমি সাধারণ মানুষের বোঝার জন্য যদি বলি—ধরেন একটি টেবিল গোলাকার, কিন্তু আমার প্রয়োজন বর্গাকার টেবিল। এখন আমি এটি বর্গাকার করতে পারব না। কারণ, এর স্ট্রাকচার তা সাপোর্ট করবে না। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি দলের প্রধান থাকতে পারবেন না; প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য; সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বডির মাধ্যমে নিয়োগ করা। যেমন—দুদক, ইসি থেকে শুরু করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ।

এই বেসিক পরিবর্তনগুলা করতে হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমেই মূলত সেটিকে বৈধ করতে হবে। আর যদি সেটি না করে জাস্ট সংশোধনী করেন, তাহলে ক্ষমতায় এসে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১-এর ভেতর জিয়াউর রহমান অনেকগুলো সংশোধন করছিলেন, আবার যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে তাদের মতো করে তারা সংবিধান সংশোধন করছে, এরশাদ তার মতো করে সংবিধান সংশোধন করছে।

অর্থাৎ যখন যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় পুরো সংবিধানটাকে সংবিধানের মূলনীতি থেকে শুরু করে দলীয় যে মূলনীতি সেটি জাতির সামনে সাংবিধানিকভাবে চাপিয়ে দেয়। যেমন, বিএনপি বলে—স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান। সাংবিধানিকভাবে কিন্তু তারা সেটি বলতে পারেন না।

ধরেন আপনি প্রথমে সংবিধান থেকে এই জিনিসটা বাদ দিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো সংবিধানেই ছিল। বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে একটি বিষয় খুবই দুঃখজনক যে, একই জিনিস সরকারে থাকলে বিরোধিতা করে, বিরোধী দলে গেলে তার পক্ষ নেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য বিএনপি-জামায়াত থেকে শুরু করে সবাই আন্দোলন করল। অথচ ১৯৯১ সালে বিএনপি যখন আবার সরকারে গেছে তখন তারা সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার মানতে চায়নি। আওয়ামী লীগ সেটি আন্দোলন করে আনছে। সেই আওয়ামী লীগই আবার ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করছে। বাতিল করে এরপরে বক্তব্য দিয়েছে যে, সংবিধানের বাইরে যাব না। সংবিধান তো বাইবেল না বা কোরআন না।

এশিয়া পোস্ট: এনসিপিকে উদ্দেশ করে পার্থ বলেছেন, ‘আপনারা জেন-জি (Gen-Z)-কে রিপ্রেজেন্ট করেন, জামায়াত জেনারেশন হয়েন না’। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

আরিফুল ইসলাম আদিব: আন্দালিব রহমান পার্থ ভাই যে বক্তব্যটা দিয়েছেন সেটি আমাদের কাছে খুব বেশি গ্রহণযোগ্য না। কারণ, পার্থ ভাইয়ের রাজনৈতিক চরিত্রটা যদি বিশ্লেষণ করি—পার্থ ভাইয়ের একটি রাজনৈতিক দল আছে। তিনি নিজের দলের যে মূলনীতি, দলকে প্রতিষ্ঠিত করা, সারা দেশে সংগঠিত করা, শিক্ষার্থীদের মাঝে দলের প্রসার করা—সেই জিনিসটা কিন্তু তিনি করেননি। বরং জাস্ট একটা দল খুলছেন একজন অপরচুনিস্ট হিসেবে। এখন বিএনপির সঙ্গে আছেন। যদি জামায়াতের সঙ্গে ভালো বোঝাপড়া হতো তাহলে হয়তো তিনি জামায়াত থেকেও নির্বাচন করতেন। তার নিজের দলের আদর্শটাই তো অনেকটা বিলীন করে দিয়েছেন। দলকে প্রতিষ্ঠিত করেননি। তার দলের সেকেন্ড ম্যান কে, আন্তর্জাতিক সম্পাদক কে কেউ বলতে পারবে না। বরং তার চেয়ে এনসিপি অলরেডি এস্টাবলিশড। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অলরেডি একটা বিকল্প সংস্কৃতি এস্টাবলিশড করছে এনসিপি। এনসিপিতে কেউ একক নেতৃত্বের কথা বলতে পারবেন না। ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ বলতে এনসিপিতে কেউ নেই। এখানে অনেকগুলো লিডারশিপ সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।

যারা একক নেতৃত্ব, ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ দল হয়ে আরেকটা প্রতিষ্ঠিত দলকে যখন পরামর্শ দেন, তখন তার নিজের আগে সেই রাজনৈতিক চর্চা করা উচিত। রাজনৈতিক বিরোধিতার জায়গা থেকে তিনি মূলত এ ধরনের কথা বলেন। একই জামায়াতের সঙ্গে তারা দীর্ঘ ২২ বছর একই জোটে ছিলেন। মানে তাদেরটা তো ঘোষিত জোট ছিল। একেবারে বিএনপি-জামায়াতসহ তারা ২০ দলীয় একটা জোট ছিল। সেই জায়গা থেকে এখন কেন এমনটা বলছেন? শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিরোধিতার জায়গা থেকে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপিকে মিলিয়ে হচ্ছে একটা ট্যাগ করা।

এশিয়া পোস্ট: নানা চাপে এনসিপি কি তাহলে জামায়াতে ইসলামীর জোট থেকে বেরিয়ে আসবে? নাকি জোট রক্ষা করবে?

আরিফুল ইসলাম আদিব: কোনো চাপের কারণে এ জোট হয়নি। এনসিপি জাতীয় নির্বাচনের আগে খুব স্পষ্ট করে বলেছিল, চারটি পয়েন্টে মূলত এই জোট হয়েছিল। চলমান বিচার, সংস্কার, আধিপত্যবাদ বিরোধী অবস্থান এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের জায়গা থেকে মূলত ১১ দলের মিলে নির্বাচনের পূর্বে জোট করেছিল। অর্থাৎ আমরা যে উদ্দেশ্যে জোট করেছি সেটি নির্বাচনের বিষয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে। কারণ, নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য যে কাজে রাজি হয়েছিল, নির্বাচনের পরে আমরা দেখলাম ঠিক ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে তারা গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

ফলশ্রুতিতে আমাদের এই জোটটা কোনো রাজনৈতিক চাপে না, জাতির প্রয়োজনে, সংস্কারের প্রয়োজনে, গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার জন্য। দেড় হাজারের অধিক যে মানুষগুলো শহীদ হলো তারা নতুন বাংলাদেশ চেয়েছে যেখানে সুশাসন থাকবে, মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, একটি সাম্য মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে—সেই জায়গা থেকেই মূলত এই ১১ দলীয় জোট করা হয়েছিল।

এশিয়া পোস্ট: ধরুন আওয়ামী লীগ দেশের রাজনৈতিক কার্যক্রমের অনুমতি পেল। তখন আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টির সঙ্গে এনসিপির কোনো প্রকার জোট গঠনের পরিকল্পনা বা সম্ভাবনা আছে?

আরিফুল ইসলাম আদিব: আওয়ামী লীগের তো এই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক এবং নৈতিক অস্তিত্ব নেই। ফলশ্রুতিতে একটা নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে জোট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আওয়ামী লীগ নিয়ে অনেকে ভুল ন্যারেটিভ দেন। আমাদেরকে খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে যে, আওয়ামী লীগের স্বাধীনতার পরবর্তী সময়—স্বাধীনতার আগের চ্যাপ্টারটা ভিন্ন রকম ছিল। তারা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে যতবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে, ততবার তারা গণহত্যা করেছে।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালে ৩০ হাজারেরও অধিক জাসদসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে। ১৯৭২ সালে একতরফা নির্বাচন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচনে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করেছে। এগুলো আওয়ামী লীগের চরিত্র। তারা আবার যখন ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় আসলেন, তখন তারা আবার এক ধরনের বিরোধী দল দমন-পীড়ন করেছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে, স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে, দেশবিরোধী হিসেবে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের তাবেদার হিসেবে এবং একই সঙ্গে গণহত্যাকারী দল হিসেবে বাংলাদেশে তাদের রাজনীতি করার রাজনৈতিক ও নৈতিক অধিকার নেই।

এশিয়া পোস্ট: আপনি এনসিপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। জুলাই আন্দোলন পরবর্তী গড়ে ওঠা এ সংগঠনটি নিয়ে আপনার বা এনসিপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

আরিফুল ইসলাম আদিব: আমাদের পরিকল্পনা আমরা বলেছি, বাংলাদেশের একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন করা। আমাদের দলের নাম—জাতীয় নাগরিক পার্টি। আমরা দেখি বাংলাদেশের জনগণের অধিকার। কিন্তু সে যে নাগরিক, তার নেই অধিকারটা কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ নাগরিক এবং জনগণ এই দুইটার ভেতরে কিন্তু একটা পার্থক্য আছে। ‘জনগণ’ বলে অনেক অধিকারকে স্কিপ করে যায় কিংবা তাকে গুরুত্ব না দিয়ে পারেন। নাগরিক হিসেবে একজন মানুষের যে অধিকারগুলো আছে, সে অধিকারগুলো কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রতিটি মানুষের অধিকার সমান। সেই অধিকারে রাজনৈতিক দল, ধর্ম-বর্ণ, আর্থিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। যেমন— পুলিশ স্টেশনে একজন একজন সচিব গেলে রাষ্ট্র তাকে যতটুকু সেবা দিতে বাধ্য, একজন রিকশাচালক গেলেও একই সেবা দিতে বাধ্য। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল সমানভাবে বাধ্য। ফলে এই রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের এনসিপির মূল লক্ষ্য।

এশিয়া পোস্ট: আপনি কেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে লড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন? আপনার রাজনৈতিক দল এনসিপির মূল আদর্শ এখানে কীভাবে প্রতিফলিত হবে?

আরিফুল ইসলাম আদিব: এটা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বলছেন। প্রথমত—আমি প্রায় আমাদের নাগরিক কমিটি থেকে শুরু করে ঢাকা মহানগরের দায়িত্ব পালন করে আসছি। ঢাকা মহানগরের সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত করা এবং প্রতিটি ওয়ার্ড পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছিলাম। একইসঙ্গে জাতীয় নির্বাচনে আমি ঢাকা-১৮ থেকে নির্বাচন করেছি। সেসময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রায় ৪০ শতাংশ এরিয়া কিন্তু অলমোস্ট কভার করেছি। ফলে আমার অলরেডি ৪০ শতাংশ এরিয়াতে কাজ করেছি। একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে সাংগঠনিকভাবেও দলের প্রয়োজনে কিন্তু পুরো ঢাকা উত্তর সিটিতে সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিস্তৃত করার একটা সুযোগ আছে।

দ্বিতীয়ত— আমরা এই নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারব। আমাদের দল গণতান্ত্রিক চর্চায় বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যে বাংলাদেশ হবে আত্মমর্যাদার। কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র না শুধু, কোনো পরাশক্তির কাছে নিজেদের আত্মমর্যাদা বিলীন করবে না। আমরা দেখেছিলাম ফ্যাসিবাদীদের সময় আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা বলতেন, ‘আমরা ভারতবর্ষের সরকারের কাছে অনুরোধ করেছি’। অর্থাৎ তাদের কাছে এক ধরনের নতজানু পররাষ্ট্র নীতি ছিল। সেই জায়গায় বিশ্ব দরবারে আত্মমর্যাদার জাতি হিসেবে আমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা। ফলে রাজধানীটা অর্থাৎ ঢাকা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখান থেকেই উদাহরণ কিন্তু তৃণমূল দেখে। ফলে এই ঢাকা সিটির নাগরিকদের অধিকার এবং নাগরিক সেবাটা যদি আমরা সমানভাবে নিশ্চিত করতে পারি, জুলুমের জায়গা থেকে মানুষ যদি কিছুটা আসান পায়। ঢাকার একটি কথা আছে— ঢাকায় টাকা ওড়ে। ঢাকায় যাদের টাকা আছে তারাই ভালো আছে, বাকিরা কিন্তু খুব বেশি ভালো নেই। ফলে ক্ষমতা ও টাকার দাপট থেকে ঢাকার নাগরিকদের রক্ষা করতে হবে। সেই জায়গাটায় আমরা দীর্ঘমেয়াদি কাজ করতে চাই। আশা করি সামনে ইনশাআল্লাহ জনগণ আমাদের ডাকে আরও বেশি সাড়া দেবে।

এশিয়া পোস্ট: জাতীয় নির্বাচনে এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি জোট করেছিল। সিটি নির্বাচনগুলোতে কি এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনি জোট করবে?

আরিফুল ইসলাম আদিব: জাতীয় নির্বাচনের আমাদের জোট ছিল। জামায়াতে ইসলামীও কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে ৩০০ আসনেই তাদের প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছিল। ফলে ১১ দলীয় জোটের প্রতিটি দলই তাদের স্থানীয় নির্বাচনে নিজস্বভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাতীয় স্বার্থে কিংবা রাজনৈতিক পরবর্তী বাস্তবতায় যদি মনে হয় যে এই স্থানীয় নির্বাচনে একসঙ্গে করবে সেটি তখনকার প্রেক্ষাপটে হয়ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ হতে পারে। কিন্তু তার পূর্বে এককভাবেই এনসিপি স্থানীয় প্রতিটি জায়গায় ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩০০-এর অধিক পৌর মেয়র এবং ৫০০-এর অধিক অলমোস্ট ৪৯৭টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনগুলোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এশিয়া পোস্ট: একজন তরুণ প্রার্থী হিসেবে ঢাকার সাধারণ মানুষের জন্য আপনার ‘সিগনেচার’ প্রতিশ্রুতি কী?

আরিফুল ইসলাম আদিব: আমি আমাদের মতটা বলছি, ‘পরিকল্পিত, নিরাপদ এবং ইনসাফের নগরী’। নাগরিকদের নিরাপত্তাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে— ঢাকায় অনেকগুলো কর্তৃপক্ষ। অর্থাৎ, সিটি করপোরেশন একটি কর্তৃপক্ষ, এর প্যারালালি ঢাকা উত্তর সিটিতে ৮টি সংসদীয় আসন। এই সংসদীয় আসনে যারা এমপি আছেন, তারাও কিন্তু এক ধরনের কর্তৃপক্ষ হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। এখানকার নাগরিক সেবার সঙ্গে অনেকগুলো কর্তৃপক্ষ যেমন—ওয়াসা, রাজউকসহ অনেকগুলো মন্ত্রণালয় জড়িত। ফলে আমাদেরকে প্রথমে যেটা করতে হবে— সর্বপ্রথম পলিসি এবং পরিকল্পনাটা সুন্দরভাবে নিতে হবে এবং এখানে একটি ইন্টিগ্রেটেড গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা নিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ একটি বডি থাকবে যেখানে ইজিলি সবকিছু খুঁজে পাবেন। কোথাও আপনার আর অসুবিধার জায়গাটা থাকবে না।

ফলে ঢাকাকে একটি মানবিক এবং ইনসাফের নগরী করে তুলতে হলে একজন নাগরিক সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে তার রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত নিরাপদ করতে হবে। দিনে এবং রাতে, ঘুমন্ত এবং জাগ্রত অবস্থায় মানুষের জীবনের নিরাপত্তাটা আমাদেরকে আগে নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি নাগরিকের জীবন-জীবিকা এবং নিরাপত্তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: বর্ষা মৌসুমে উত্তর ঢাকার জলাবদ্ধতা একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। ড্রেনেজ সিস্টেম আধুনিকায়নে আপনার পরিকল্পনা কী?

আরিফুল ইসলাম আদিব: ঢাকার যে খাল এবং নদীগুলো আছে, সেই নদীগুলো কিন্তু দখল এবং দূষণে জর্জরিত। এই দখল এবং দূষণ যারা করেন তারা কিন্তু কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং রাজনৈতিক বলয়ের আশেপাশে থাকেন। পুরো ঢাকা উত্তর সিটিতে যতগুলো খাল আছে, আমরা বিগত সময় দেখেছিলাম বেশ কিছু খাল উদ্ধারের অভিযান কার্যক্রম হয়েছে, খালগুলো পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ঢাকার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানটা হচ্ছে এসব দখলকৃত খালগুলো পুনরুদ্ধার এবং এটাকে দূষণমুক্ত করা। অর্থাৎ দখল ও দূষণমুক্ত করতে পারলে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে। ফলে পরিবেশগত জায়গা থেকে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সর্বপ্রথম নদী এবং খালের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: উত্তরার যানজট থেকে শুরু করে বাড্ডা-প্রগতি সরণির বিশৃঙ্খলা নিরসনে আপনি কি কোনো বিশেষ ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট মডেলের কথা ভাবছেন?

আরিফুল ইসলাম আদিব: আমি ইতোপূর্বে বলেছিলাম যে, ইন্টিগ্রেটেড গভর্ন্যান্স লাগবে। অর্থাৎ পুরো ঢাকা উত্তরের ট্রাফিক চাইলে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। একইসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ট্রাফিক যদি নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তবে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, বিআরটিএ, পরিবহন মালিক সমিতি— প্রত্যেকের সঙ্গে একটি সমন্বয় লাগবে। কারণ উত্তরা দিয়ে দূরপাল্লার যে বাসগুলো যায়, বিশেষ করে গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে শুরু করে আব্দুল্লাহপুর, উত্তরা, এয়ারপোর্ট, বাড্ডা পর্যন্ত একটা যানজট লেগে থাকে। ফলে এখানে সমন্বিত একটি উদ্যোগ নিতে হবে। যে বাস যেখানে স্টপেজ দেওয়া দরকার, দেখা গেছে সেই স্টপেজগুলোতে বাস থামে না, থামে আরেক জায়গায় গিয়ে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— সড়কের পাশে অনেক সময় হকার থাকে, মানে ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলা থাকে। তাদের জন্য একটি স্মার্ট হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আসতে হবে। হকারদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে বসার ব্যবস্থা করে দিলে ফুটপাতগুলো মুক্ত হবে। ফুটপাথ মুক্ত হলে যানজট নিরসনে সহায়ক হবে।

এশিয়া পোস্ট: মশা নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে আপনি কি কোনো বৈজ্ঞানিক বা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছেন?

আরিফুল ইসলাম আদিব: নাগরিক জীবনে মশার উপদ্রব খুব বেশি। ডেঙ্গু প্রায়ই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে। মশার নিয়ন্ত্রণ করতে যারা বিশেষজ্ঞ, এক্সপার্ট ও এন্টোমোলজিস্ট আছেন তাদের সঙ্গে আলোচনা করে এর একটি স্মার্ট ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিতে হবে।

প্রথমত— মশা যেখানে লার্ভা সৃষ্টি করে, যেখানে ডিম পাড়ে, পানির জায়গা, ড্রেনেজ সিস্টেমগুলো টার্গেট করে আগে স্প্রে করতে হবে। মশার নির্দিষ্ট একটি প্রজনন সময় থাকে। যে সময় তারা সবচেয়ে বেশি প্রজনন করে, বৃদ্ধি পায়। ওই সময়টাতেই ড্রেনগুলো, অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন জায়গাগুলোতে সঠিক সময়ে স্প্রে করতে হবে। দ্বিতীয়ত— মশাটা যখন বড় হয়ে যায় অর্থাৎ অ্যাডাল্ট হয়ে যায় তখন তাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেটির জন্য কিন্তু আবার আলাদা পদ্ধতি নিতে হবে। এর সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে— সব নাগরিকদের এ প্রক্রিয়ায় জড়িত করা। ফলে মশার ক্ষেত্রে প্রতিটি স্টেজে আলাদাভাবে আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা দেখেছি, বর্তমান প্রশাসক রাতের বেলা মশার ওষুধ দিচ্ছিলেন। রাতে মশার ওষুধ দেওয়াটা আসলে খুব বেশি কার্যকর নয় কিংবা এটি ভূমিকা রাখে না। বরঞ্চ এটি জাস্ট লোক দেখানো এক ধরনের কর্মসূচি।

এশিয়া পোস্ট: ঢাকা শহরের সবুজায়ন এবং বায়ু মান উন্নয়নে আপনার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কী হবে?

আরিফুল ইসলাম আদিব: ঢাকা শহরে যতটুকু সবুজায়ন থাকা উচিত কিংবা যতটুকু স্পেস থাকা উচিত, সেটি টোটালি নেই। এজন্য যেটি করতে হবে— পাবলিক যে স্পেসগুলো আছে অতি দ্রুত সেই স্পেসগুলো উদ্ধার করতে হবে। উদ্ধার করে সেখানে সবুজায়ন করতে হবে। যে জায়গাগুলোতে ধুলা উড়ে বেশি সেই জায়গাগুলোতে প্রপার ব্যবস্থা নিতে হবে। রাস্তার উন্নতি করতে হবে। ধুলা কমানোর জন্য স্প্রে থেকে শুরু করে পানি দিয়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যেসব পরিবহন আছে, যেগুলো প্রচুর কালো ধোঁয়া ছাড়ে, সেগুলোর বিষয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। বায়ুমান উন্নয়ন করতে হলে একইসঙ্গে পরিবেশগতভাবে কাজ করতে হবে। ট্রাফিকিং উন্নতি করতে হবে এবং একইসঙ্গে মানুষকেও সচেতন করতে হবে। অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আমাদেরকে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: ‘স্মার্ট ঢাকা’ গড়ার ক্ষেত্রে নাগরিক সেবাগুলোকে (যেমন: ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম নিবন্ধন) শতভাগ ডিজিটালাইজড করতে আপনার রোডম্যাপ কী?

আরিফুল ইসলাম আদিব: অলরেডি বেশ কিছু সেবা ডিজিটালাইজড আছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেই সুবিধা পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে একটি লাইসেন্স করতে গেলে আপনাকে যে পরিমাণ বেগ পেতে হয়, স্তরে স্তরে ঘুষ বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, কিন্তু যার রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে তার কিন্তু এসব পোহাতে হয় না। ফলে আমরা বলেছি, নাগরিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা কোনো ধরনের পরিচয় যেন প্রভাবিত করতে না পারে, সেই জায়গাটা নিশ্চিত করতে হবে।

সাক্ষাৎকারে মাওলানা মাহফুজুল হক / অকৃতকার্য ছাত্রকে মাওলানা উপাধি দেওয়া সমর্থন করে না বেফাক
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের কওমি শিক্ষাব্যবস্থা দেখভালের সঙ্গে যুক্ত মাওলানা মুহাম্মাদ মাহফুজুল হক। বর্তমানে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড হিসেবে পরিচিত বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়ার স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং মোহাম্মদপুরের ঐতিহ্যবাহী জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার মহাপরিচালক। দেশের কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক চিত্র, বেফাকের ভূমিকা ও পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ এশিয়া পোস্ট: ২০০৫ সাল থেকে বেফাকের দায়িত্বশীল পদে আছেন। ২০২০ সাল থেকে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। এই দীর্ঘ সময়ে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কী পদক্ষেপ নিয়েছেন? মাহফুজুল হক: ২০০৫ সালে শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহ.) বেফাকের সভাপতি হন, ওই বছরই আমি সহকারী মহাসচিব মনোনীত হই। ২০২০ পর্যন্ত সহকারী মহাসচিব ছিলাম। ওই বছরের অক্টোবরে মহাসচিবের দায়িত্ব পাই। ২০০১ সালে চার দলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। তখন আলেমরা কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির আওতায় আনতে চেয়েছিলেন। এর আগেও চেষ্টা হয়েছে। ২০০৫-২০০৬ সালের দিকে স্বীকৃতি দিতে সরকার কমিটি গঠন করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তখন এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত গেজেট হয়নি। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দিয়ে প্রথম নীতিগত সিদ্ধান্ত গেজেট আকারে প্রকাশ পায়। ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগের আমলে দাওরায়ে হাদিসের সনদ গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন করে স্বীকৃতি লাভ করে। ২০১৮ সালে সংসদে বিল পাসের মধ্য দিয়ে এটি আইনে পরিণত হয়। বেফাকের নামে স্বীকৃতি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু আঞ্চলিক অন্যান্য বোর্ডের কারণে হয়নি। ২০১৭ সালে ছয় বোর্ডের সমন্বয়ে আল-হাইয়াতুল উলয়া গঠন হয়। এটি এই সময়ের বড় অর্জন। এখন বলতে পারি, কওমি মাদ্রাসাগুলো আল-হাইয়াতুল উলয়ার অধীনে এক্যবদ্ধ। এশিয়া পোস্ট: সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় পাবলিক পরীক্ষার ফল ঘোষণার পর দেশব্যাপী উচ্ছ্বাস দেখা যায়। গণমাধ্যমেও আলোচনা হয়। কিন্তু বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফল নিয়ে এমন উচ্ছ্বাস বা আলোচনা দেখা যায় না। এর কারণ কী? মাহফুজুল হক: স্কুল-কলেজের শিক্ষার সঙ্গে বিপুলসংখ্যাক মানুষের সম্পৃক্ততা আছে। সেই তুলনায় কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কম। তবে এবার ফল ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যে ২০ লাখ মানুষ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেছে। অনলাইনেও বেশ আলোচনা হয়েছে। তবে ঈদের আগমুহূর্তে ফল ঘোষণা এবং সময় নির্ধারণে জটিলতার কারণে মিডিয়াকে সেভাবে জানানো যায়নি। ভবিষ্যতে মিডিয়াকে ডাকার চিন্তাভাবনা রয়েছে আমাদের। এশিয়া পোস্ট: অভিযোগ আছে, অকৃতকার্য হওয়ার পরও শিক্ষার্থীরা পরবর্তী ক্লাসে ভর্তি হতে পারেন। এ বিষয়ে বেফাকের সিদ্ধান্ত কী? মাহফুজুল হক: মিশকাতে পরীক্ষা দিতে হলে শরহে বেকায়ার পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে হয়। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ক্লাসেও এমন নিয়ম করা হবে। অকৃতকার্য ছাত্ররা পরবর্তী ক্লাসে ভর্তি হতে পারবে; এমন দৃষ্টিভঙ্গি বেফাক লালন করে না। এ জন্য পর্যায়ক্রমে পরবর্তী ধাপের পরীক্ষার জন্য আগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বাধ্যবাধকতা চালু করছি। মাদ্রাসাগুলোকে প্রস্তুত করছি। তাদের উদ্বুদ্ধ করছি। এশিয়া পোস্ট: কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীরা চাইলে যে কোনো ক্লাসে ভর্তি হতে পারে। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সনদ লাগে না। এর ফলে কি শিক্ষার মান কমছে? মাহফুজুল হক: হাইয়াতুল উলয়ায় সম্মিলিত ছয়টি বোর্ড কাজ করছে। সেখানে এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে কাজ করছি। যোগ্যতা ছাড়া যেন ভর্তি হতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি রাখছি। যে কোনো ক্লাসে ভর্তির বিষয়টি এখন কমে আসছে। একসময় মাদ্রাসাগুলো ইচ্ছামতো পরিচালিত হয়েছে। বোর্ড ছিল না। পরে বোর্ড হলো। বোর্ডের তত্ত্বাবধানে এ দুর্বলতাগুলো ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা হয়েছে। স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে আরেকটু এগিয়েছে। আশা করি, দ্রুত এ ধরনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠব। তবে আগের ক্লাসে উত্তীর্ণ না হওয়া কাউকে পরের ক্লাসে ভর্তি নিলে শিক্ষার মান ক্ষুণ্ন হয়। এশিয়া পোস্ট: বেফাক প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫০ বছর হলো। একটি শিক্ষাবোর্ডে শিক্ষাবান্ধব নিয়ম করতে এত বছর লাগছে কেন? মাহফুজুল হক: স্বীকৃতির আগ পর্যন্ত বেফাক ওইসব মাদ্রাসার সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাদের ওপর আইন চাপানোর মতো শক্তি বেফাকের ছিল না। স্বীকৃতি তো কার্যকর হলো ২০১৭-১৮ সালে। সময় অনেক গেছে, সময়ের মধ্য দিয়ে পরিবেশ ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে আসছে। এশিয়া পোস্ট: আল-হাইয়াতুল উলয়ার পরীক্ষায় ফেল করার পরও অনেক পরীক্ষার্থীকে পাগড়ি দেওয়ার খবর এসেছে। ফেল করা শিক্ষার্থীদেরও মাওলানা উপাধি দেওয়া হচ্ছে। তাহলে পড়াশোনা করে পাস করার প্রয়োজন কী? মাহফুজুল হক: আল-হাইয়াতুল উলয়ার পক্ষ থেকে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে সনদ দেওয়া হয় না। কোনো বিষয়ে ফেল করলে পরের বছর পরীক্ষা দিতে হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে দুর্বলতা আছে। দাওরায়ে হাদিসে ফেল শিক্ষার্থীও যেন সমাজে দায়িত্ব পালন করতে পারে, ওই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্ভবত তারা পাগড়ি দিচ্ছে। খুব দ্রুতই পরিবেশ ঠিক করার চেষ্টা করছি। এখন সার্টিফিকেট দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম বেফাক ও হাইয়াতুল উলয়া। একসময় প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকের গুরুত্ব থাকবে না। তখন ফেল করা শিক্ষার্থীকে সার্টিফিকেট দেওয়া সম্ভব হবে না। এশিয়া পোস্ট: দাওরায়ে হাদিসে ফেল শিক্ষার্থীকে মাওলানা উপাধি বা পাগড়ি দেওয়া ঠিক মনে করেন? মাহফুজুল হক: না। বেফাক তাকে সার্টিফিকেট দেয় না। ভালো প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা শেষে ফলাফল ঘোষণার পর পাগড়ি দেওয়া হয়। সাধারণ প্রতিষ্ঠান বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেকে বার্ষিক পরীক্ষার আগেই পাগড়ি দিয়ে দেন। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন নয়। ফেল ছাত্রকে মাওলানা উপাধি বা পাগড়ি দেওয়া বেফাক সমর্থন করে না। এশিয়া পোস্ট: কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই যত্রতত্র মাদ্রাসা খোলা হচ্ছে। এ বিষয়ে বেফাকের চিন্তাভাবনা কী? মাহফুজুল হক: একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও বেফাকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য কী কী মানদণ্ড থাকা দরকার, এ বিষয়ে কাজ করছি। কিন্ডারগার্টেনও যত্রতত্র হচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন কম হয়। কিন্তু কওমি মাদ্রাসা নিয়ে প্রশ্ন বেশি হয়। তবে যোগ্যতা ছাড়া যত্রতত্র মাদ্রাসা করা ঠিক নয়। এগুলোকে নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসতে সচেষ্ট আছি। এশিয়াপ পোস্ট: সিলেবাস আধুনিকীকরণে বেফাক কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? মাহফুজুল হক: বেফাক প্রতিষ্ঠার পর থেকে সিলেবাস প্রণয়নের কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। কোরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞানার্জনের যে শিক্ষা কার্যক্রম, সেখানে খুব বেশি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। একসময় কওমিতে বাংলা, গণিত, ইংরেজি, ভূগোল ও ইতিহাস ছিল না। বেফাকই প্রথম পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এগুলো পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। পরে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে বাংলা, গণিত ও ইংরেজি যোগ হয়েছে। এখন নবম-দশমেও বাংলা-ইংরেজি যুক্ত হচ্ছে। মিশকাতে ইসলামি অর্থনীতি পড়ানো হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানও সিলেবাসভুক্ত করার চিন্তা আছে। মূল উদ্দেশ্য ঠিক রেখে আমরা সিলেবাস আধুনিকীকরণের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি। এশিয়া পোস্ট: শাপলা চত্বর ও জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির দাবি উঠছে। এ নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী? মাহফুজুল হক: বেফাকে আমাদের স্থায়ী সম্পাদনা পরিষদ আছে। সেখানে শাপলা ও জুলাইয়ে আলেমদের অবদান ও ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রমে জুলাইকে সরকার কীভাবে ধারণ করছে, সেদিকেও নজর রাখছি। সে আলোকে আমাদের শিক্ষা সিলেবাসে এ জাতীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা আছে। এশিয়া পোস্ট: ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রয়োজনে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যবহার করছে। বিষয়টি কীভাবে দেখেন? মাহফুজুল হক: ছাত্ররাও ইসলামি রাজনীতি শিখবে, তবে সেটা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। তার মূল কাজ পড়াশোনা। ধর্মীয় ব্যাপক প্রয়োজন ছাড়া তাদের মাঠে-ময়দানে কাজে লাগানো ঠিক নয়। এতে ছাত্রদের মূল উদ্দেশ্য পড়াশোনা ব্যাহত হবে।   এশিয়া পোস্ট: চাকরির বাজারে মাদ্রাসা শিক্ষা সনদের গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। এ নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষোভ-আক্ষেপ রয়েছে, কিন্তু বিষয়টি সুরাহার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। এখানে বেফাকের কোনো ব্যর্থতা আছে বলে মনে করেন? মাহফুজুল হক: এটার জন্য উদ্যোগ নেই; এ কথার সঙ্গে একমত নই। স্বীকৃতি তো এমনি অর্জন হয়নি। এর পেছনে মুরুব্বিদের যথেষ্ট সংগ্রাম আছে। স্বীকৃতি কার্যকরের চেষ্টা পুরোপুরি অব্যাহত আছে। স্বীকৃতি আদায়ের সময়ও আমাদের প্রথম টার্গেট ছিল নিজস্ব স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট হওয়ার শঙ্কা যেন তৈরি না হয়। আমাদের এসএসসি, এইচএসসি ও অনার্সের সমমান নিতে বলা হচ্ছে। এই স্তরগুলোতে সমমান নেওয়া হলে কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্বলতা দেখা দেবে। যেমন আলিয়া মাদ্রাসায় হচ্ছে। সেখানে দাখিলে ১০০ শিক্ষার্থী থাকলে আলিমে থাকে ৫০ জন। বাকিরা কলেজে চলে যায়। আলিমে ৫০ জন থাকলে পরের ধাপে থাকে ২০ জন। মেধাবীরা কেউ থাকে না। একটা শিক্ষাব্যবস্থায় মেধাবীরাই যদি না থাকে, তাহলে সেটা টিকে থাকে না। আমরা মনে করছি, অল্প দিনের মধ্যে আলিয়া মাদ্রাসা ভ্যানিশ বা নাই হয়ে যাবে। এসএসসি বা এইচএসসির সমমান নিচ্ছি না আমরা। না নেওয়ার কারণে সনদের কার্যকারিতার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা। এটা না নিয়ে কীভাবে সনদ কার্যকর করা যায়, সে চেষ্টা করছি। এশিয়া পোস্ট: সমমান না নিলে চাকরির সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে? মাহফুজুল হক: ২০০৬ সালে যখন দাওরায়ে হাদিসের সনদের নীতিগত গেজেট হয়, সেখানে বলা আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষক পদে আবেদন করা যাবে। এখন কাজি পদে আবেদন করা যাচ্ছে। এই সনদে আমাদের ছাত্রদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ ধর্মীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সুযোগ দেওয়া হলে চাকরির অনেক ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তবে চাকরির বাজার তৈরি করতে গিয়ে মূল জায়গা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। এশিয়া পোস্ট: শিক্ষার্থীরা তো একাডেমিক সমমান নিয়ে চাকরির বিশাল বাজারে প্রবেশ করতে চান। মাহফুজুল হক: আমি মনে করি, ছাত্ররা বুঝতে পারছে না। যদি চাকরিই একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে কওমি মাদ্রাসায় আসার প্রয়োজন কী? সে আলিয়া মাদ্রাসায় পড়ুক। কওমি মাদ্রাসায় যেহেতু এসেছে, তাকে কোরআন-হাদিসের বিজ্ঞ আলেম হতে হবে। কওমি মাদ্রাসায় পড়ার পাশাপাশি স্কুলে সে পরীক্ষা দিক। তবে আগে ভালো আলেম হোক। এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। মাহফুজুল হক: এশিয়া পোস্টের জন্য শুভকামনা। আপনাকেও ধন্যবাদ।
অকৃতকার্য ছাত্রকে মাওলানা উপাধি দেওয়া সমর্থন করে না বেফাক
‘ভারত থেকে পরিচালনার চেষ্টা হলে বাংলাদেশে আ.লীগের ভবিষ্যৎ নেই’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিতে সাংবাদিকতা করার পর আকবর হোসেন যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত ১১ এপ্রিল সেই পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক আয়োজন আলাপন অনুষ্ঠানে তার সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, প্রেস মিনিস্টারের দায়িত্ব, পদত্যাগ এবং বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেছেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর। এশিয়া পোস্ট: বিশ্বের অন্যতম সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। দেশের খবর বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন। আপনার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর গল্পটা দিয়ে আমরা আলোচনা শুরু করতে চাই। আকবর হোসেন: আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন থেকেই মূলত আমার সাংবাদিকতা শুরু। এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় একটি ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে। ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার পর আমি সেখানে ট্রেনি রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিই এবং মোটামুটি দুই বছর তিন মাস কাজ করি। ২০০৫ সালে বিবিসি যখন ঢাকায় লোক নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়, তখন আমি আবেদন করি এবং নির্বাচিত হই। ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর আমি বিবিসিতে যোগ দিয়েছিলাম। এরপর দীর্ঘ সময় সেখানে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এশিয়া পোস্ট: বিবিসিতে কাজ করার সুবাদে ওখানকার কাজের পরিবেশ খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেখানকার সাংবাদিকরা কি আসলেও রাজনীতি ও মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থাকেন, নাকি ব্যক্তিভেদে তাদেরও পক্ষপাত থাকে? আকবর হোসেন: বিবিসি একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজম বা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন করাকে কখনোই উৎসাহিত করে না। সেখানে কাজ করা অবস্থায় আপনি কোনো দলের সমর্থক হতে পারবেন না কিংবা তাদের সরাসরি সমালোচকও হতে পারবেন না। এই নিরপেক্ষতাটুকু বিবিসি খুব কঠোরভাবে বজায় রাখে। বিবিসির একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়া পলিসি আছে। সেখানে কাজ করলে আপনি চাইলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় যা খুশি লিখতে পারবেন না। আপনি এমন কিছু লিখতে পারবেন না যাতে মনে হয় যে আপনি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা কোনো ঘটনায় একটি পক্ষ নিয়েছেন। মানুষ হিসেবে আমাদের অবচেতনে অনেক সময় রাজনৈতিক মতামত চলে আসে, কিন্তু কেউ যদি এই নিয়মগুলো লঙ্ঘন করে, তবে তাকে সতর্ক করা হয়। এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। কারণ একজন রিপোর্টার হিসেবে লোকে যদি মনে করে আপনি পক্ষপাতদুষ্ট, তবে তারা আপনার বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ের ওপর আস্থা হারাবে। এতে প্রতিষ্ঠানের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। এশিয়া পোস্ট: ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে আপনার কী মনে হয়—একই সঙ্গে রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং সাংবাদিকতা করা কি সত্যিই সম্ভব? আকবর হোসেন: এটা আসলে নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর। আপনার প্রফেশনাল ইনটেগ্রিটি বা পেশাদার সততা যদি অনেক শক্তিশালী হয়, তবে আপনি পারবেন। আমি মনে করি, আমরা কেউই রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে নই। কিন্তু প্রশ্ন হলো আপনি ফেয়ার কি না, আপনি অবজেক্টিভ কি না। আপনার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতা করার সময় আপনি ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ বলতে পারছেন কি না, সেটিই বড় বিষয়। আপনি কি উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে ভিকটিম করছেন? যদি আপনি তা না করেন এবং কভারেজের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ থাকেন, তবে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে আমার ব্যক্তিগত মত হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকলে নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশ না করাই শ্রেয়। আপনি যদি স্বতন্ত্র সাংবাদিক হন, তবে ভিন্ন কথা। এশিয়া পোস্ট: বিবিসিতে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আপনার করা এমন কোনো বিশেষ সংবাদের কথা মনে পড়ে যা আপনাকে আজও গর্বিত করে? আকবর হোসেন: নির্দিষ্ট করে একটি ঘটনার কথা বলা কঠিন, কারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমি সাংবাদিকতা করেছি। যেমন বাংলাদেশে যখন ২০০৭ সালে ‘ওয়ান ইলেভেন’ বা জরুরি অবস্থা জারি হলো, সেই সময়টা ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। এরপর সিডর ঘূর্ণিঝড়ের কাভারেজ ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং চ্যালেঞ্জিং। এ ছাড়া ২০০৮ সালের নির্বাচনসহ পরবর্তী বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনা আমি কাভার করেছি। সাংবাদিক হিসেবে প্রতিটি ঘটনাই আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এশিয়া পোস্ট: সাংবাদিকতা ছেড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার হয়েছিলেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে সেই কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? আকবর হোসেন: সত্যি বলতে, আমার সেই অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো ছিল না। আমি ওখানে গিয়ে দেখলাম যে, এই পদের জন্য আসলে সেরকম কোনো কাজ সেখানে নেই। একপর্যায়ে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এই ধরনের পদ বা পজিশন আসলে বন্ধ করে দিলেও কোনো সমস্যা নেই। আমি মনে করি, কাজের মাধ্যমেই আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করি এবং সার্থকতা খুঁজে পাই। কাজ করলে ভুল হবে বা শুদ্ধ হবে, কিন্তু কাজই যদি না থাকে তবে শুধু চাকরি করা আর বেতন নেওয়াটা সুখকর কিছু নয়। সরকারি সিস্টেমটা হয়তো এ রকমই, কিন্তু এটি এমন হওয়া উচিত ছিল না। তবে এই এক বছরে আমি দেখার সুযোগ পেয়েছি যে সরকারি ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে। এশিয়া পোস্ট: এই প্রেস মিনিস্টার পদে সাধারণত সাংবাদিকদেরই কেন নিয়োগ দেওয়া হয়? এর পেছনে কারণ কী বলে আপনি মনে করেন? আকবর হোসেন: যে কোনো কিছু যখন শুরু হয়, তার পেছনে একটি ভালো উদ্দেশ্য থাকে। সরকার সম্ভবত মনে করেছিল যে বাইরে থেকে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা সিস্টেমে আনা দরকার। সাংবাদিকরা যেহেতু গণমাধ্যম সামলাতে অভ্যস্ত, তাই তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে এটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা রাজনীতিতে জড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে এগুলো এক ধরনের পুরস্কার দেওয়ার বিষয়ে পরিণত হয়। আমার মতে, যারা মাঠপর্যায়ে ভালো সাংবাদিকতা করতে চান, তাদের এ ধরনের পদে না যাওয়াই ভালো। আমি নিজে না গেলে হয়তো এই বাস্তবতা বুঝতাম না। এশিয়া পোস্ট: সরকারের পদ পাওয়ার পর আপনি সাংবাদিকতা পেশা ছেড়েছিলেন। এটি কি আপনার দীর্ঘ পেশাজীবনকে কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে? আকবর হোসেন: অবশ্যই করেছে এবং আমি তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করি। আমি যদি আমার পেশাদার জীবনে কয়েকটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি, তবে এটি ছিল অন্যতম। এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি আপনি পদত্যাগ করেছেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার কারণে কি কোনো সংশয় থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? আকবর হোসেন: না, সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। এমনকি আমার সঙ্গে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তারা অনেকেই এখনও কাজ করছেন। আমি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক কারণে পদত্যাগ করেছি। আমি নিজে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি এবং তিনি তাতে সম্মতি দিয়েছেন। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এশিয়া পোস্ট: সমসাময়িক রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ বা অনুপ্রবেশকারী ইস্যু নিয়ে আপনি কথা বলেছেন। এটি আপনার কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো? আকবর হোসেন: আমি দেখলাম যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এটি নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, তাই আমি আমার একটি বিশ্লেষণ দিয়েছি। অতীতে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের পর থেকে যে কোনো সমালোচনাকেই ‘জামায়াত-শিবির’ বলে ট্যাগ দিত। একপর্যায়ে তারা নিজেদের দলের লোককেও সন্দেহ করতে শুরু করল। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিককে ছাত্রলীগের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল এবং তাকেও জামায়াত তকমা দেওয়া হয়েছিল। এই বিষয়টি আওয়ামী লীগকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল। এখন বিএনপি বা অন্য কেউ যদি একই ন্যারেটিভ দাঁড় করায় যে, যারাই সমালোচনা করছে তারাই ‘গুপ্ত’ বা অন্য দলের লোক, তবে এটি তাদের দলের জন্যই ক্ষতির কারণ হবে। বিএনপির তৃণমূল পর্যায়েও এখন অনেকে সমালোচনা করতে ভয় পাচ্ছে যে, তাকে আবার কোনো ট্যাগ দেওয়া হয় কি না। ক্ষমতায় আসার শুরুতেই এ ধরনের বিভেদ তৈরি করা দলের জন্য ভালো নয়। এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে, বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আকবর হোসেন: সমালোচনা হবে সীমাহীন। আপনি তথ্যযুক্তি দিয়ে আমার যত ইচ্ছা সমালোচনা করুন। কিন্তু আমাকে গালি দেওয়ার অধিকার আপনার নেই। সমালোচনা এবং অশ্লীলতাকে এক করে দেখা ঠিক নয়। আপনি যদি কাউকে নোংরা ভাষায় আক্রমণ করেন, তবে তার আইনি প্রতিকার চাওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে। শুধু সমালোচনার কারণে গ্রেপ্তার হওয়া আমি সমর্থন করি না। এশিয়া পোস্ট: রাজশাহীতে একজন শিক্ষিকা লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় একজন বিএনপি নেতার নাম জড়িয়েছে। ক্ষমতাসীনদের বেলায় এমনটা কেন দেখা যায়? আকবর হোসেন: রাজশাহীর ঘটনায় আমি বলেছি যে, একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার এবং দোষীদের শাস্তি হওয়া উচিত। আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন যে, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, স্থানীয় পর্যায়ের কিছু টাউটপ্রকৃতির মানুষ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তারা মনে করে সব অধিকার তাদের। এমনকি আপনি যদি নিজে ক্ষমতা চর্চা নাও করেন, আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার কারণে লোকে আপনাকে অনেক ক্ষমতাবান মনে করবে এবং আপনাকে নানা বিষয়ে জড়ানোর চেষ্টা করবে। এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকেই মূলত এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকারের কার্যক্রমকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? আকবর হোসেন: নির্বাচনের সময় আমি দেশে ছিলাম না, তবে আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যা বলছে, তাতে এই নির্বাচন নিয়ে জনমনে বড় কোনো প্রশ্ন নেই। এটি গ্রহণযোগ্য ছিল। আর সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করার জন্য দুই মাস খুব কম সময়। যে কোনো সরকারকে মূল্যায়ন করতে হলে অন্তত ছয় মাস সময় দেওয়া উচিত। এশিয়া পোস্ট: ‘জুলাই সনদ’ এবং গণভোট নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার পরিণতি কী হতে পারে? আকবর হোসেন: গণভোটে প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ সমর্থন দিয়েছে। আমি মনে করি, জনগণের রায়ের ওপর আর কোনো কথা থাকতে পারে না। বিএনপি যদি জনগণের এই রায়কে অবজ্ঞা করে, তবে তা হবে একটি রাজনৈতিক আত্মহত্যা। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকতে পারে, কিন্তু গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা তাদের জন্য ঠিক হবে না। বিএনপি একটি পরিপক্ব রাজনৈতিক দল এবং আমার ধারণা তারা এমন ভুল পথে হাঁটবে না। এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের আগামী দিনের রাজনীতি সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? আকবর হোসেন: আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা যতদিন ভারত থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, ততদিন বাংলাদেশে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি প্রবল ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ যদি ভারত থেকে না হয়ে অন্য কোনো দেশ থেকে কামব্যাক করার চেষ্টা করত, তবে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু ভারত থেকে কিছু করার চেষ্টা করলে মানুষ মনে করবে এটা ভারত করাচ্ছে। এশিয়া পোস্ট: জুলাই অভ্যুত্থানের সেই আবেগ কি এখনও মানুষের মধ্যে আছে? আকবর হোসেন: অভ্যুত্থানের আবেগ প্রতিদিন রাস্তায় দেখা যাবে না। এ ধরনের ঘটনা যুগে একবার ঘটে। এর মানে এই নয় যে মানুষ ভুলে গেছে। মানুষ যখন দেখবে তাদের অধিকার ঠিকমতো রক্ষিত হচ্ছে না, তখন তারা আবারও প্রতিক্রিয়া দেখাবে। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন সবার মধ্যে আসেনি। একটা গোষ্ঠী সবসময় ব্যবসার ধান্ধায় থাকে, আদর্শ তাদের কাছে বড় বিষয় নয়। তবে দেশের একটি বড় অংশ অবশ্যই পরিবর্তন চায়। এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কতটুকু ছিল এবং কতটুকু পূরণ হয়েছে? আকবর হোসেন: আমি এই সরকারের কোনো নীতিনির্ধারক ছিলাম না, আমি ছিলাম একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তা। তবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এই সরকার অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। পুলিশ বাহিনীকে সচল করার চেষ্টা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং একটি নির্বাচন আয়োজন করা তাদের কাজ ছিল। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে সফলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করাটাই তাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমি খুব বেশি প্রত্যাশা রাখি না, কারণ পরিবর্তন শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে না, জনগণের সচেতনতাও প্রয়োজন। শুধু চাই সরকার যেন সাধারণ মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়। এশিয়া পোস্ট: সংবাদমাধ্যমে ভুল তথ্য বা ডিস-ইনফরমেশন রোধে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি? আকবর হোসেন: যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুল তথ্য ছড়ায়, তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। তবে তাদের জেলে না পাঠিয়ে জরিমানা করা যেতে পারে। জরিমানার ব্যবস্থা থাকলে মানুষ সতর্ক হবে এবং এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবেও দেখা হবে না। বর্তমান সময়ে মূলধারার গণমাধ্যম এই ভুল তথ্যের কারণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাংবাদিকদের মনে রাখতে হবে, ‘প্রথম হওয়ার’ প্রতিযোগিতার চেয়ে ‘শুদ্ধ হওয়া’ বেশি জরুরি। তথ্য যেন নির্ভুল হয়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। এশিয়া পোস্ট: আগামী পাঁচ বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান? আকবর হোসেন: আমি সাংবাদিকতাই করব, এটাই আমার মূল পেশা। আমি নিজের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা করছি যেখানে আমি মূলধারার সাংবাদিকতা বজায় রাখব। আমি আমার সাংবাদিক পরিচয় নিয়ে মানুষের আস্থায় ফিরতে চাই। এশিয়া পোস্ট: চাপের মুখে সাংবাদিকতা করার বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী? আকবর হোসেন: এটি আপনার পেশাদার সততার ওপর নির্ভর করে। আপনার যদি অন্য কোনো স্বার্থের জায়গা থাকে, তবে আপনি চাপ মোকাবিলা করতে পারবেন না। নিজেকে শক্তিশালী এবং সৎ রাখতে পারলে যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। আমি আশা করি, বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন থেকে একটি মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারবে। তবে মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা কেউ উপহার হিসেবে দিয়ে যায় না, এটি কাজের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
‘ভারত থেকে পরিচালনার চেষ্টা হলে বাংলাদেশে আ.লীগের ভবিষ্যৎ নেই’
হেফাজতের শহীদদের ইতিহাস থেকে মোছার ষড়যন্ত্র হয়েছে, কওমি স্বীকৃতি ছিল ধোঁকাবাজি
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে রাতের অন্ধকারে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অংশ নেওয়া মুসল্লিদের ওপর হামলে পড়ে যৌথ বাহিনী। এতে ব্যাপক হতাহতের অভিযোগ ওঠে। সংগঠনটির তৎকালীন আমির শাহ আহমদ শফী দাবি করেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বাতি নিভিয়ে স্মরণকালের নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সাদাপোশাকের অস্ত্রধারীরা। ২০১৩ সালের ৫ মের বিভীষিকাময় সেই ঘটনা, হেফাজতের রাজনীতি, শাপলা চত্বরের শহীদদের তালিকা প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা এবং কওমি সনদের স্বীকৃতিসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ। এশিয়া পোস্ট : হেফাজতে ইসলাম দাবি করে তারা অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু এর দায়িত্বশীল অনেকেই কোনো না-কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সংগঠনের কর্মসূচি নেওয়া কি সম্ভব হয়? আজিজুল হক : আল্লামা শাহ আহমদ শফি ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের নেতৃত্বে একটি বৃহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি অরাজনৈতিক ছিল, আছে, থাকবে। রাজনৈতিক নেতারা এখানে আলেম হিসেবে যুক্ত আছেন। একজন নাগরিক যেমন মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি দলীয় দায়িত্ব পালন করেন, হেফাজতের নেতাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমন। ইসলামের মৌলিক বিষয়ে ইসলামবিদ্বেষী শক্তি চক্রান্ত করলে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সব আলেমের দায়িত্ব এর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা। এই জায়গা থেকে হেফাজতের সঙ্গে যেসব রাজনৈতিক নেতা আছেন, তারা রাজনৈতিক পরিচয়ে হেফাজতে আসেন না, আলেম হিসেবে আসেন। রাজনৈতিক প্রভাবে হেফাজত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে না।  এশিয়া পোস্ট : আল্লামা শাহ আহমদ শফি ও জুনায়েদ বাবুনগরী আমির থাকাকালে হেফাজতের যে প্রভাব ছিল, এখন তা নেই কেন? আজিজুল হক : তারা দুজনই বিখ্যাত আলেম। আল্লামা আহমদ শফি (রহ.) দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রামের মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা ও পরে মাদ্রাসা পরিচালনা করেছেন তিনি। তার লাখো ছাত্র ও অনুসারী আছে। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীও বিখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস ছিলেন। তার বাবাও বড় আলেম ছিলেন। সারা দেশে বাবা-ছেলের লাখো ছাত্র ও অনুসারী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এ দুজনের নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে আলেম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মানুষ পঙ্গপালের মতো হেফাজতের ব্যানারে ছুটে এসেছে। ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীও বিখ্যাত আলেম। দেশে হাদিস ও আধ্যাত্মিক চর্চায় তার পরিবারের অনেক অবদান রয়েছে। তবে আহমদ শফি ও জুনায়েদ বাবুনগরীর যে পরিচিতি, সেটা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেই। কিন্তু আলেম সমাজের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর তার নেতৃত্বে ৬৪ জেলায় হেফাজতকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেছি।  আল্লামা আহমদ শফি ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর সময় হেফাজত যেমন শক্ত অবস্থানে ছিল, এখনও সেই অবস্থান রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩ মে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করে এর প্রমাণ আমরা দিয়েছি।  এশিয়া পোস্ট : শাপলা চত্বরে হেফাজতের ৯৩ কর্মী শহীদ হয়েছেন বলে গত বছরের ৪ মে আপনারা তালিকা প্রকাশ করেছেন। এই তালিকা প্রকাশে ১২ বছর লাগল কেন? আজিজুল হক : শাপলা চত্বরের ঘটনার পর আওয়ামী ফ্যাসিবাদী জালিম গোষ্ঠী আলেমদের ওপর যে পরিমাণ নির্যাতন করেছে, তা বর্ণনাতীত। পুলিশ, র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়ে শহীদ পরিবারের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। শহীদদের অনেকের জানাজা পড়তে দেয়নি। এক মাদ্রাসা শিক্ষকের নিজ মাদ্রাসায়ও তার জানাজা পড়তে বাধা দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত এলাকাবাসী দা-বঁটি নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে ধানক্ষেতে তার জানাজা পড়েন। মরদেহ বাড়ি যাওয়ার আগে র‌্যাব-পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করে রাখে। জানাজা শেষে পরিবারের মাত্র চারজন সদস্য তাকে দাফনের সুযোগ পান।   শাপলা চত্বরের শহীদদের তালিকা করতে তদন্ত কমিটি গঠন করলে আমাদের লোকজনকে তুলে নিয়ে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। শহীদদের তালিকা যেন না হয়, তাদের কথা যেন জাতি জানতে না পারে, তাদের যেন ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টা চালিয়েছে তৎকালীন আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার। এমনকি একজনও শহীদ হয়নি বলে ঘোষণা দেয় তারা। আমাদের শতভাগ চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও সরকারের চাপের কারণে তালিকা করতে পারিনি। ৫ আগস্টের পর প্রকাশ করেছি।  এশিয়া পোস্ট : হেফাজতের শহীদদের তালিকা করার কারণে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তৎকালীন সম্পাদক আদিলুর রহমান খান (পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা) ও পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলানকে কারাভোগ করতে হয়েছে। তারা তালিকা করতে পেরেছিলেন, কিন্তু এত নেতাকর্মী থাকার পরও আপনারা কেন পারেননি? আজিজুল হক : অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। তালিকা করায় আদিল ভাই ও এলান ভাইকে সরকার গ্রেপ্তার করে সাজা দিয়েছে। একটা আন্তর্জাতিক সংস্থার দায়িত্বশীলদের যদি এভাবে সাজা দিতে পারে, সেখানে হেফাজতের দায়িত্বশীলদের তো আন্তর্জাতিক লবিং নেই। আমরা নিরীহ আলেম সমাজ। ফ্যাসিবাদী শক্তিকে মোকাবিলার শক্তি ও সাহস নেই আমাদের। শহীদদের পক্ষে কথা বলায় আমাদের বিরুদ্ধে ৩৫০টির মতো মামলা হয়েছে। এসব মামলায় হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। সরকারের বহুমুখী চাপের কারণে তালিকা করতে পারেনি। এশিয়া পোস্ট : শুধু কি ৯৩ জনই শহীদ হয়েছেন? আজিজুল হক : ৯৩ জন নয়, আরও বেশি হবে। অনেক পরিবার এখনও ভয়ে শহীদদের কথা বলতে চান না। তাদের শঙ্কা, আওয়ামী লীগ আবারও ফিরতে পারলে ফের জুলুমের শিকার হতে হবে তাদের। মিডিয়ায় এসেছে, ২০১৩ সালের ৫ মে জুরাইন কবরস্থানে অনেক বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ীতে ময়লার স্তূপে মানুষের হাড় পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মিডিয়া, মানবধিকার সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, এগুলো হেফাজতের সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের লাশ। বিশেষ করে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম ওই মাসে প্রায় ৫০০ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। এগুলো তো দাফন হয়ে গেছে। পরিবারও জানে না এগুলো কার লাশ। আমরা চেষ্টা করছি তালিকা আরও সমৃদ্ধ করতে।  এশিয়া পোস্ট : কত জন শহীদ হয়েছেন বলে মনে করেন? আজিজুল হক : শহীদদের তালিকা দীর্ঘ হবে। এর সঠিক হিসাব নির্ণয় না করে বলা সম্ভব নয়। এশিয়া পোস্ট : অভিযোগ আছে, শাপলা চত্বরে শহীদদের জন্য বিগত ১২ বছর বিচার চায়নি হেফাজতে ইসলাম। শহীদদের পরিবারের পাশেও দাঁড়ায়নি। এর কারণ কী? আজিজুল হক : কেউ যদি বলে হেফাজত শহীদদের পাশে দাঁড়ায়নি, সেটা ভুল হবে। হেফাজত তার শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী ২০১৩ সালেই শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বিভিন্ন জেলায় টিম গিয়ে সহযোগিতা করেছে। প্রত্যেক পরিবার কম-বেশি হেফাজতের সহযোগিতা পেয়েছে। কোনো পরিবারকে একাধিকবার সহযোগিতা করা হয়েছে। কাউকে ঘর দেওয়া হয়েছে। কারও মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একজন শহীদের নামে মাদ্রাসা করা হয়েছে। তাদের সহযোগিতা করেনি, এটা মিথ্যা প্রচারণা। এশিয়া পোস্ট : ১২ বছর বিচার চেয়েছিলেন? আজিজুল হক : আমরা শতবার সংবাদ সম্মেলন ও মিছিল করে বিচার চেয়েছি। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার; যারা হত্যা করেছে, তারা কি বিচার করবে? জালিমরা তো করবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরপরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হেফাজতের পক্ষে আমি বাদী হয়ে অভিযোগ করেছি। এই মামলায় তৎকালীন সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, মন্ত্রী-এমপিরা জেলে আছেন। বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাক্ষী সংগ্রহ করা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জালিমদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারব। এশিয়া পোস্ট : যে আওয়ামী লীগ সরকার হেফাজত কর্মীদের শহীদ করল, সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে আপনারা শোকরানা মাহফিল করে সম্মান দিলেন। অথচ তখনও হেফাজতের শহীদদের তালিকা করা যায়নি, বিচারও হয়নি। এটা কি হেফাজতের শহীদদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা নয়? আজিজুল হক : এ বিষয়ে জাতির কাছে একটা ভুল বার্তা আছে। হেফাজত একটা আলাদা সংগঠন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড আলাদা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ থাকাটা স্বাভাবিক। শাপলা চত্বরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক থাকতে পারে না। আল্লামা আহমদ শফি তখন হেফাজতের আমির, তখন আবার তিনি কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড আল-হাইয়াতুল উলয়ারও চেয়ারম্যান। শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসকে মুছে দেওয়া ও আলেমদের নিয়ন্ত্রণের কুমতলবে সরকার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই দাবি হেফাজতের ছিল না, এটা কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের দাবি ছিল। সরকার স্বীকৃতি দিয়ে একটা রাজনৈতিক ডিগবাজি খেলেছে। এই স্বীকৃতি একটা কলাপাতা, কোনো মূল্য নেই। স্বীকৃতি দিয়ে ছাত্ররা কিছু করতে পারে না, এটা ধোঁকাবাজি। শোকরানা মাহফিলের আয়োজক ছিল সরকার। সে মাহফিলে খুনি হাসিনার সামরিক সচিব মিয়া মো. জয়নাল আবেদিন দাঁড়িয়ে শাপলা চত্বরের গণহত্যাকে অস্বীকার করলেন। হেফাজতের পক্ষ থেকে তৎকালীন মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী শোকরানা মাহফিলে অংশ নেননি। সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আমিও অংশ নিইনি। বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক আলেম সেখানে ছিলেন না। আমরা জোরালো প্রতিবাদ করে হাসিনার সামরিক সচিবের ওই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। শোকরানা মাহফিলে হেফাজতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আহমদ শফি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন, হেফাজতের আমির হিসেবে নন।  এশিয়া পোস্ট : আপনি বললেন, সনদ দিয়ে ডিগবাজি খেলা হয়েছে এবং শহীদদের রক্তকে মুছে দিতে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এসব জেনেও কেন স্বীকৃতি নিলেন? আজিজুল হক : এটা একান্ত আমার মতামত। সরকারের এই কূটচাল বোঝা সহজ-সরল আলেমদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা স্বীকৃতির নামে আলেম সমাজকে দমিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র করেছে। এশিয়া পোস্ট : ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আয়োজিত শোকরানা মাহফিলে শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেখানে আহমদ শফি (রহ.) থেকে শুরু করে হেফাজতের প্রায় সব বড় নেতা ছিলেন। আপনারা কি তাকে ‘কওমি জননী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন? আজিজুল হক : হেফাজতের নেতাদের ওপর যে আওয়ামী লীগ গণহত্যা চালাল, সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে হেফাজতের পক্ষ থেকে কওমি জননী উপাধি দেওয়া অবাস্তব কথা। হেফাজত তাকে এমন উপাধি দেয়নি। গওহরডাঙ্গা বোর্ডের চেয়ারম্যান মাওলানা রুহুল আমিন, তার বাড়ি গোপালগঞ্জ। তিনি শেখ হাসিনার গৃহপালিত ব্যক্তি। তিনি তার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছেন। হেফাজত বা হেফাজতের নেতারা দেননি। তার সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক নেই, তার সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক। তিনি হাসিনাকে তুষ্ট করতে এ উপাধি দিয়েছেন। এশিয়া পোস্ট : ওই মঞ্চে থাকা হেফাজত নেতারা বা বোর্ড পরে এর প্রতিবাদ করেনি। সংবাদ সম্মেলন করে কি হেফাজত বলেছিল বা কওমি মাদ্রাসার পক্ষে আপনারা বলেছিলেন কি যে আমরা তাকে কওমি জননী উপাধি দিইনি, এটা মাওলানা রুহুল আমিনের ব্যক্তিগত বিষয়? আজিজুল হক : উপস্থিত ব্যক্তিরা কেন প্রতিবাদ করেননি, সেটি তাদের ব্যাপার। জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)-এর পক্ষে আমি বিবৃতি দিয়ে সেটা প্রত্যাখ্যান করেছি। এ উপাধি হেফাজত দেয়নি, জাতিকে জানিয়েছি আমরা। এশিয়া পোস্ট : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আজিজুল হক : আপনাদেরও ধন্যবাদ।
হেফাজতের শহীদদের ইতিহাস থেকে মোছার ষড়যন্ত্র হয়েছে, কওমি স্বীকৃতি ছিল ধোঁকাবাজি
ছাত্রদের কারণেই নতুন জীবন পেয়েছি : ইসহাক সরকার
জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার। যুবদল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর সম্প্রতি এনসিপিতে যোগ দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৩৬৬টি রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছেন। তিনি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। কথা বলেছেন দলবদল, রাজনীতি ও সমসাময়িক বিভিন্ন প্রসঙ্গে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর। এশিয়া পোস্ট : গত কয়েক দিন আগেও আপনি বিএনপির ইসহাক সরকার নামে পরিচিত ছিলেন। এখন এনসিপির ইসহাক সরকার। এই দুই দলের ইসহাক সরকার—কেমন লাগছে, অনুভূতি কেমন? ইসহাক সরকার : খুব ভালো লাগছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো পথচলা এবং নতুন করে আবার শুরু করা—দুইটার মধ্যে অনেক ভিন্নতা আছে। যেহেতু দীর্ঘদিন একসঙ্গে পথ চলেছি, আবার নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। এশিয়া পোস্ট : আপনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন, যুবদলেও ছিলেন একই পদে। আপনার রাজনীতি শুরু করেছেন ছাত্রজীবনে। শুরুর গল্পটা কেমন ছিল? ইসহাক সরকার : প্রথমে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অল্প অল্প করে রাজনীতির ময়দানে আসা শুরু করি। আমার এলাকার এক বড় ভাই ছিলেন, বর্তমানে সাংবাদিক মমিন ভাই। উনার হাত ধরে তৎকালীন ৩৫নং ওয়ার্ড, তৎকালীন ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। প্রথম যখন রাজনীতিতে আসি—মিছিল, মিটিং, সভা, সমাবেশ খুব একটা ভালো লাগত না। আমরা বিএনপির পার্টি অফিসের সামনে এসে বসে পড়তাম, সেখানে নেতারা বক্তব্য রাখতেন। আমরা মাটিতে বসে বক্তব্য শুনতাম। অনেক সময় ডানে-বামে তাকিয়ে দেখতাম যে নেতা আছেন কি না। না থাকলে পেছন থেকে পালিয়ে চলে যেতাম। এভাবে অনেক দিন করার পর আস্তে আস্তে আবার কেন জানি আকর্ষিত হয়ে যাই। আকর্ষণ হওয়ার পর থেকেই পথচলা শুরু। এরপরে আপনার ’৯১-তে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল, এরপর ’৯৬ পর্যন্ত ছিল। ’৯৬ থেকে যখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে চলে গেল বিএনপি, ঠিক তখন থেকেই আমার সক্রিয় রাজনীতিতে একেবারে পথচলা শুরু। এশিয়া পোস্ট : আপনার রাজনীতিতে উত্থান নিয়ে প্রায়ই নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর নাম বলেন। ছাত্রদল বা যুবদলে পদপদবি কি তার কারণেই পেয়েছেন? ইসহাক সরকার : আমরা কঠোর পরিশ্রম করে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এসেছি। তখনও ১০৭টি মিথ্যা মামলায় আমাকে জড়ানো হলো। পুরান ঢাকা মানে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ এবং এর বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। তখন আমাদের পিন্টু ভাই, সাদেক হোসেন খোকা ভাই ছিলেন ওই এলাকার দায়িত্বে। যে কারণে আমরা ব্যাপক ও তীব্র আন্দোলন করতাম। তো আমরা আন্দোলন করেই দায়িত্বে এসেছি। আমরা কোনো ভাইয়ের কারণে আন্দোলনে বা আমাদের দায়িত্বে আসিনি, পদ-পদবিতে আসিনি। আমার বিরুদ্ধে ৯৮ থেকে মামলা শুরু হলো। ৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে ১০৭টি মিথ্যা মামলা করা হলো। আমার পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও একই পরিমাণে মামলা দেওয়া হলো। যখন গ্রেপ্তার হলাম, আমার ছোট ভাই থানাহাজতে খাবার দিতে গেল। তার বয়স ১২ কিংবা ১৩ হবে, হাফেজি পড়ে। তখন কোতোয়ালির ওসি ছিল মনোয়ার হোসেন। স্পষ্ট মনে আছে, মনোয়ার সাহেব যখন রুম থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন আমাকে খাবার দিচ্ছে। তিনি আমার ভাইকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, ‘এই, এটা কে?’ বললাম, ‘মনোয়ার ভাই, আমার ছোট ভাই, খাবার দিতে আসছে।’ মনোয়ার সাহেব বললেন, ‘এই সেন্ট্রি, ওকে অ্যারেস্ট করো। ওকেও ধরো।’ ওকে ধরে আমার সামনে মনোয়ার সাহেব বেদম প্রহার করলেন। আমি তখন লকআপ ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ‘মনোয়ার ভাই, আমার ছোট ভাই তো রাজনীতি করে না। ওকে এভাবে নির্যাতন করছেন? ও তো এগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখে না। আমাকে খাবার দিতে আসছে। ওকে মারবেন না। ওর জীবনটা নষ্ট করে দেবেন না। ও ভয় পেয়ে যাবে।’ কোনো কথাই শুনলেন না। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, সন্ধ্যার পরে ছেড়ে দেব।’ এই কথা বলার পরও তার বিরুদ্ধে প্রায় ১৪টি মামলা করল। আমার বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে ১৫২টি মিথ্যা মামলা করা হলো। তো পরিবারের ওপর টার্গেট করেই একের পর এক মামলা দেওয়া হলো। যেহেতু পুরান ঢাকা আন্দোলনের ক্ষেত্র, আন্দোলনের জায়গা, সেই হিসেবে আমাদের এই মামলাগুলো দেওয়া হতো। প্রতিদিন হরতাল হওয়ামাত্রই আমি থাকি বা না থাকি, আমার বিরুদ্ধে পাঁচটি, সাতটি, ১০টি মামলা দিত। এশিয়া পোস্ট : নিজের রাজনীতির কারণে পরিবারকে এ রকম বেগ পোহাতে হচ্ছে, তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, বিড়ম্বনায় পড়ে যাচ্ছে। নিজেকে কখনো অপরাধী মনে হয়? ইসহাক সরকার : নিজেকে কখনো অপরাধী মনে হয়নি। কারণ, আমার পরিবারের পক্ষ থেকে আমাকে সমর্থন ছিল এবং ভালোবাসাও ছিল। আমার মা-বাবা বৃদ্ধ ছিলেন। আমি যখন ’৯৮ সালে গ্রেপ্তার হলাম, দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর একটানা কারাগারে ছিলাম। কারাগারে থাকা অবস্থায় বাবার মৃত্যুসংবাদ পাই। কারাগারে থাকা অবস্থায় আমাকে যখন প্যারোলে মুক্তির ব্যবস্থা করা হলো, আদালত প্রথমে নাকচ করে দিয়েছেন। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। আমাদের পিন্টু ভাই ম্যাডামের পারমিশন নিয়ে নাসিম সাহেবের সঙ্গে কথা বলেন। তখন আমাকে দুই ঘণ্টার জন্য প্যারোলে নিয়ে আসেন। এশিয়া পোস্ট : আপনার ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং মুহূর্ত কোনটা ছিল? ইসহাক সরকার : আমার পুরো সময়টাই চ্যালেঞ্জিং ছিল। ’৯৮ সাল থেকে জেল খাটা শুরু করলাম, এক দিনের জন্য স্বস্তি পাইনি। জেলখানা থেকে বের হয়ে আসার পরও যখনই জামিনে বের হতাম, আবার আমাকে জেলগেট থেকে গ্রেপ্তার করা হতো। প্রায় আটবার গ্রেপ্তার করেছিল জেলগেট থেকে। আমি জামিনে মুক্ত, হাইকোর্ট মুক্তির অর্ডার দিয়েছেন—‘নট টু অ্যারেস্ট, নট টু হ্যারাস’। মানে তাকে অ্যারেস্টও করা যাবে না, হ্যারাসমেন্টও করা যাবে না। এরপরও আমাকে কারাফটক থেকে প্রায় যতবার জামিন নিয়ে বের হই, ততবারই গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পুরো জীবনটা এভাবেই কেটেছে। বিশেষ করে আমি সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করেছি ৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত। পুরান ঢাকার নয়াবাজার ও বংশাল এলাকায় যখন আন্দোলন করি, তখন আমার সাতজন বন্ধু পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল। আর সবচেয়ে বেশি খারাপ সময় গেছে কিছুদিন আগে, যখন ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা জুলুমের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তখন আমাদের ওপর হুলিয়া এসে পড়ল। আমার বিরুদ্ধে ৩৬৬টি মিথ্যা মামলা করা হলো। আমার পরিবারের বিরুদ্ধে শতাধিক মিথ্যা মামলা হলো। ছোট ভাই, বড় ভাই—সবাই আক্রান্ত হলো। আমি যখন কারাগারে, তখন বাসার সুয়ারেজ লাইন কেটে দিল, বাসার বিদ্যুতের লাইন কেটে দিল। মানে একটা পরিবারের ওপর যত রকম হামলা করা যায়। শেষে আমার দুইটা ছোট বাচ্চার ওপরও মামলা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হলো। আমাকে গুম করে ফেলার চেষ্টা করা হলো। আন্দোলন করতে গিয়ে আমার নিজের হাতে গড়া সাত সহযোদ্ধা—তার মধ্যে আমার আপন ভাতিজাও আছে—তাদের ২০১৩ সালে গুম করে ফেলেছিল। আজও তাদের কোনো খোঁজ পাইনি। সবচেয়ে খারাপ লাগার মুহূর্ত ছিল যখন আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। আমাকে পার্টি থেকে বলা হয়েছিল প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। এশিয়া পোস্ট : রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে খারাপ লাগা বা হতাশার কোনো ঘটনা আছে কি না? ইসহাক সরকার : এবার আমি যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি, তখন একটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। আমাদের ওই এলাকার পাঁচজন প্রার্থী একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে আমরা বিদ্রোহ করি। বিদ্রোহ করার পর আমাদের দাবি ছিল যে আমাদের মধ্য থেকে এই এলাকার স্থানীয় যারা আছেন, তাদের মধ্য থেকেই আপনি যাকেই মনে হয় তাকেই মনোনয়ন দেবেন। আমরা এখানে সবাই নির্যাতিত পরিবার। যেমন আলহাজ নাসিরুদ্দিন আহমেদ পিন্টু ভাইয়ের পরিবার, মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ ভাইয়ের পরিবার, যিনি মৃত্যুঞ্জয়ী জননেতা, মীর মোশারফ হোসেন খোকন ভাই, উনিও নির্যাতিত এবং বারবার নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, মনির চেয়ারম্যান, যিনি মৃত্যুঞ্জয়ী; যাকে আটটি গুলি করা হয়েছিল পার্টির কারণে—উনিও ছিলেন একজন প্রার্থী। আমরা পাঁচজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে পার্টিকে বললাম যে অন্তত আমাদের মধ্য থেকেই যে কাউকে নমিনেশন দেন। কিন্তু পার্টি সেটার ব্যাপারে কোনো কর্ণপাত করেনি। বহিরাগত একজনকে এনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছিল। একে একে সবাইকে পার্টি ডেকে নিয়ে আলাদাভাবে কথা বলে বসিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু একমাত্র আমি ডাক পাইনি। কেন পাইনি, আমি সেটা আজও জানি না বা আমাকে কেন ডাকা হলো না, সেটা বুঝতে পারিনি। তখন খুব খারাপ লেগেছিল। পরে তো আমাকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করে দেয়। কোনো ধরনের চিঠি বা কোনো ধরনের শোকজ বা কোনো কিছু জানানো হয়নি। আমি অনলাইন, টিভি ও সংবাদের মাধ্যমে জানতে পারি যে আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তখন জীবনের ৩০ বছরের দুঃখ-কষ্ট সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছিলাম। সেদিন ভেবেছিলাম, এই পার্টির জন্য এত কষ্ট করলাম, জীবন-যৌবন বিসর্জন দিলাম, পার্টি অন্তত একটিবারের জন্যও আমাকে ডাকতে পারত। আমাকে বললে হয়তো বসে যেতাম। আমি পার্টির আনুগত্যের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল ছিলাম। কারণ, এই পার্টিকে আমি বুকে ধারণ ও লালন করেছি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে আমি অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি। উনি আমাকে স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন এবং সন্তানের মতো আদর করতেন। সেই পার্টির বিরুদ্ধে যাব—এটা আমি কোনো দিনই কল্পনা করতে পারিনি। সেদিনই আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময় গেছে। আমাকে বহিষ্কার করার পর অঝোরে কান্না করেছিলাম। এশিয়া পোস্ট : এবার ভালোটা জানতে চাই। সবচেয়ে ভালো লাগার মুহূর্ত কোনটা ছিল? ইসহাক সরকার : ভালো লাগার মুহূর্তগুলো ছিল, যখন ম্যাডাম খুব কাছ থেকে আদর করতেন। আমি এক দিন ম্যাডামের কাছে হাজির হলাম, ম্যাডাম ট্রিটমেন্টের জন্য হাসপাতালে যাবেন। আমরা তার গুলশানের বাসায় উপস্থিত হলাম। একে একে সবাই দাঁড়িয়ে সালাম বিনিময় করছি। ঠিক ওই মুহূর্তে আমাদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. জেড এম জাহিদ খান বলছেন, ‘ম্যাডাম আসছে।’ ম্যাডাম দেখে বললেন, ‘ইসহাক না? ইসহাক সরকার? ইসহাক সরকার আসছে, ওকে আমি অনেক পছন্দ করি। ওর জীবনের সব অর্জন ও কষ্ট আমি নিজের চোখে দেখেছি। ওকে তোমরা দেখে রাখবা।’ আমার নামেই তিনি চিনতেন আমাকে। শুধু তা-ই নয়, আমি যখন ছোট ইসহাক সরকার, আমার বয়স তখন ২০ বছর—তখন প্রতিটা প্রোগ্রামে ম্যাডাম বক্তব্যের মাঝখানে আমার নাম বলে বলতেন যে ‘ইসহাক সরকার ছোট্ট একটা ছেলে, তার বিরুদ্ধে শতাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়েছে।’ প্রতিটা স্টেজ প্রোগ্রামে ম্যাডাম আমার কথা বলতেন। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এশিয়া পোস্ট : এই ৩০ বছর আপনি বিএনপিতে পার করেছেন—বিএনপির ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠন—সব মিলিয়ে কী পেলেন বিনিময়ে? ইসহাক সরকার : মানুষের ভালোবাসা। সারা দেশের তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের যে ভালোবাসা পেয়েছি, এটা কোনো পদ-পদবি বা অন্য কিছু দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। আমি ইসহাক সরকার সারা জীবন সততা নিয়ে রাজনীতি করেছি। কেউ বলতে পারবে না ইসহাক সরকারের আচরণে কষ্ট পেয়েছে। এরপরও মানুষমাত্রই ভুল হতেই পারে, কিন্তু জানামতে আমি কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলিনি বা কারও ওপরে জুলুম করিনি, অত্যাচার করিনি অথবা একজন নেতা হিসেবে কারও প্রতি অন্যায় কোনো কিছু চাপিয়ে দিয়েছি ইনশাআল্লাহ এটা কেউ বলতে পারবে না। এই যে মানুষের যে ভালোবাসা, এটা কোনো কিছুর বিনিময়ে পাওয়া সম্ভব নয়। আমি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, জনগণের ভালোবাসা পেয়েছি এবং নেতাকর্মীদের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছি—এটাই আমাকে এত দূর নিয়ে এসেছে। আজ আপনি আমাকে এখানে ডেকেছেন। আমি যদি একজন সাধারণ নেতা বা কর্মী হতাম, হয়তো ডাকতেন না। অসাধারণ কিছুটা হয়তো হয়েছি জনগণের ভালোবাসায়, যার কারণে আজ আমাকে এখানে ডেকেছেন। এশিয়া পোস্ট : বিএনপি থেকে ঠিক আছে আপনি অভিমান করেছেন বা আপনাকে রাখা হয়নি। আপনার কাছে কেন উপযুক্ত মনে হলো এনসিপিকে? ইসহাক সরকার : ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও গণবিপ্লবের মধ্য দিয়েই ৫ তারিখের ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে। আমি উপযুক্ত এই কারণে মনে করছি যে ছাত্ররাই কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং আমি সে সময় ছাত্রদের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের পতনের ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছিল যে আমরা ১৭ বছর যে কাজটি করতে পারিনি, তারা সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। আমার দলের সব নেতাকর্মী যার যার অবস্থান থেকে নেমে পড়েছিল, কিন্তু নেতৃত্বের মূল জায়গাটাই ছিল এই ছাত্ররা। ৩৬৬টি মামলার মধ্যে মাত্র পাঁচটি মামলায় আমাকে ২২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আমার উপলব্ধি হলো, এই ছাত্রদের কারণেই আমি পুনরায় নতুন জীবন ফিরে পেলাম। তাদের কারণেই আমাকে হয়তো ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হলো না। তাদের কারণেই আমরা গণতন্ত্র ফিরে পেলাম এবং আমাদের অধিকার ও মানবাধিকার ফিরে পেলাম। এখন আমার মনে হলো এই ছাত্রদের দিয়েই আমাদের দেশের আমূল পরিবর্তন সম্ভব। এই ছাত্রনেতারা যোগ্য ও মেধাবী এবং তারা যে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে, সেটা আমরা আরও অনেক চেষ্টা করলে হয়তো পেরে উঠতাম না। কারণ, আমরা সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে শত শত মিথ্যা মামলা ছিল। আমাদের সিনিয়র নেতাদের জুডিশিয়ারি কিলিং করা হচ্ছিল। কারাগারে পিন্টু ভাইকে হত্যা করা হলো এবং বেছে বেছে চৌধুরী আলমকে গুম করা হলো। এভাবে নেতাকর্মীদের যেভাবে ফ্যাসিবাদের ষড়যন্ত্রে হত্যা ও গুম-খুনের শিকার হতে হচ্ছিল, তাতে আমরা সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আজ আল্লাহর বিশেষ দয়ায় এই ছাত্রদের কারণে আবার প্রাণশক্তি ফিরে পেয়েছি। এশিয়া পোস্ট : জুলাই আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন ব্যক্তিকে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উপস্থাপন করে। আপনার দৃষ্টিতে কাকে মাস্টারমাইন্ড মনে করেন? ইসহাক সরকার : আমি মাস্টারমাইন্ড মনে করি যারা ব্যক্তিগতভাবে রাজপথে নেমে আসছিল, তারাই মাস্টারমাইন্ড। এখানে কেউ বলতে পারবে না যে এককভাবে এই কৃতিত্ব কারও ব্যক্তিগত। আপনি হাসনাত বলেন, সারজিস বলেন বা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন—যাদের কথাই বলেন, কেউ এটার একক মাস্টারমাইন্ড নয়। আমি মনে করি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। এটা কেউ যদি বলে যে, অমুক ব্যক্তি মাস্টারমাইন্ড বা অমুক বিদেশ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে—আমি এটাকে বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি যে এটা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আপনি যখন একজন সাংবাদিক এবং আপনি যখন দেখবেন যে আপনার সন্তান বাহিরে আন্দোলন করতে নেমে গেছে, আপনি বাবা হিসেবে ঘরে বসে থাকতে পারতেন? আমাদের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। আমরা যখন দেখেছি আমাদের সন্তানরা রাজপথে নেমে এসেছে এবং আমাদের কোমলমতি ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছে, তখন সবাই যার যার অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছি। এখানে কেউ আলাদা মাস্টারমাইন্ড নয়। আর যদি আমরা কোনো বিশেষ মাস্টারমাইন্ডের কথা মনে করতাম, তাহলে এই ছাত্র-জনতা ও আপামর জনগণ রাস্তায় নেমে আসত না। এশিয়া পোস্ট : আপনি বলেছেন যে পুরান ঢাকায় আপনার জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থন আছে। যদি এত জনসমর্থন থাকে, তাহলে গত নির্বাচনে আপনি প্রার্থী হয়েছেন, আপনার ভোটের পরিমাণ তুলনামূলক কম। এটা কেন হয়েছে? ইসহাক সরকার : আপনারা তো জানেন নির্বাচনটা কেমন হয়েছে। আমার কাছে তো মনে হয় ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। তিন ঘণ্টা ভোটকেন্দ্রের সামনে যেতে দেয়নি। গণনা করার সময় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমার পোলিং এজেন্ট যারা ছিল, তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে এবং সকালে যারা ঢোকার চেষ্টা করেছিল, তাদের অনেককে বের করে দিয়েছে। সেখানে আমার কাছে মনেই হলো যে ইলেকশনটা ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। কারণ কী? ওখানে ঘোষণা শুনতে পেলাম যে জামায়াতের প্রার্থী পাস করেছে, কিন্তু তিন ঘণ্টা পর ভোরে আবার শুনলাম যে না, বিএনপির প্রার্থী পাস করেছে। তো কে পাস করেছে বা কে ফেল করেছে সেটা বিষয় না। আমি দুই দিনে ৬০০০ গণস্বাক্ষর নিয়েছিলাম। আমি যেহেতু স্বতন্ত্র থেকে দাঁড়িয়েছিলাম, তাই বিধান অনুযায়ী ৬০০০ লোকের সমর্থন থাকা দরকার। আমি সেই স্বাক্ষর দিয়েছি। তো ওই ৬০০০ পরিবার গেল কোথায়? আমাকে তো এত কম ভোট পাওয়ার কথা না। কাজেই আমার কাছে মনে হয়েছে নির্বাচনটা একটু ব্যতিক্রম হয়েছে এবং রেজাল্ট শিটে অনেক পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি। এশিয়া পোস্ট : আপনি এনসিপিকে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আপনাকে দলে পেয়ে এনসিপির কী লাভ হলো? ইসহাক সরকার : এনসিপি কী পেয়েছে না পেয়েছে, সেটা তো আমি জানি না। উনারা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, এতটুকুই বুঝি। পুরান ঢাকায় আমাদের সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা আমি পালন করব। এনসিপির কী লাভ হয়েছে, তা এনসিপিই ভালো বলতে পারবে। কিন্তু আমি মনে করি আমার লাভ হয়েছে। আমি যদি দুই বছর ঘরে বসে থাকতাম, তাহলে রাজনীতির ময়দান থেকে হারিয়ে যেতাম। আর এনসিপিতে ঢুকেছি বিধায় আপনারাই আমাকে স্টুডিওতে ডেকেছেন। যদি প্রবেশ না করতাম, তাহলে হয়তো ডাকতেন না এবং আমার খোঁজও নিতেন না। এশিয়া পোস্ট : আপনার বেশ কয়েকটি বক্তব্য এখন আলোচনায়। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, সেখানে এখন পকেট কমিটি দেওয়া হয় বা সুবিধাবাদীদের পদ দেওয়া হয়। আপনার কাছে এ রকম কেন মনে হয়? ইসহাক সরকার : দেখুন, এটি তো একটা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলে। পদ-পদবি ও নেতৃত্ব তো ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয় না। বিএনপির মতো বা আওয়ামী লীগের মতো দলগুলোতে সংগঠন শক্তিশালী করার নামে একবার ছাত্রদলের নেতা নির্বাচন হয়েছিল, কিন্তু সেটাও ছিল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এবং ওগুলো ছিল একটা আইওয়াশ মাত্র। আমার কাছে মনে হয় যে এই কাজগুলো যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয়, তাহলে যোগ্য ও নির্যাতিত যারা জনগণের ভালোবাসা অর্জন করতে পারে, তারাই নেতৃত্বে আসতে পারবে। অন্যথায় এভাবে চলতে থাকলে বড় সংগঠনগুলো নেতৃত্ব-সংকটে পড়বে। এশিয়া পোস্ট : জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের অবস্থান এবং সংসদের ভেতরে ও বাইরের বিতর্ক নিয়ে কী বলবেন? ইসহাক সরকার : জুলাই সনদ নিয়ে প্রতিটা রাজনৈতিক দল ঐকমত্যে পৌঁছেছিল এবং সেই ভিত্তিতেই ১২ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সবাই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু হঠাৎ বিএনপির কী এমন হয়ে গেল যে তারা জুলাই সনদ থেকে দূরে সরে এল? কয়েক দিন আগেও প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন জুলাইয়ের প্রতিটা সনদ মানা হবে, কিন্তু আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন যে কেন আমরা মানব? তখন নির্বাচনের স্বার্থে বলেছিলাম। এই যে কনট্রাডিকশন, এটা জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার নামান্তর। যদি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়, তবে জনগণ গণভোটের দাবিতে আবার রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে। এশিয়া পোস্ট : বিএনপি থেকে এনসিপিতে আসায় পুরান ঢাকার রাজনৈতিক মেরুকরণে কি কোনো প্রভাব পড়েছে? ইসহাক সরকার : কিছুটা প্রভাব পড়েছে। সাধারণ জনগণ যারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন, তাদের সমর্থন আমি পেয়েছি। আমার মতো সবাই তো এই সময়ে ঝুঁকি নেবে না। যারা ঝুঁকি নেওয়ার তারা নিয়েছে এবং সাধারণ জনগণের একটি বৃহৎ অংশ আমাকে সমর্থন জুগিয়েছে। আমি রাস্তায় বের হলে তারা আমাকে অভিনন্দন জানায় যে আমি ভালো কাজ করেছি। তাই আমি মনে করি সাধারণ মানুষ আমার সঙ্গে আছে। এশিয়া পোস্ট : এবার যেহেতু আপনি নির্বাচন করেছেন এবং স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করেছেন, আগামী দিনে এনসিপির সঙ্গে আসন বা মনোনয়ন নিয়ে কি কোনো কথা হয়েছে? ইসহাক সরকার : এখনো ও রকম কোনো কথা হয়নি। আমি আগেও বলেছি যে এমপি বা মন্ত্রী হওয়া আমার মুখ্য বিষয় নয়, আমি জনগণের সেবা করতে চাই। ভাগ্য যখন যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই কাজ করব। আমি পাস করলে হয়তো এখন সংসদে থাকতাম। তবে প্রত্যেক রাজনৈতিক কর্মীর একটা লক্ষ্য থাকে এবং আমি আগামীতে ঢাকা-৭ আসন থেকে এনসিপির হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এশিয়া পোস্ট : আগামী পাঁচ বছরে ইসহাক সরকার নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে বা দলের কোন অবস্থানে দেখতে চান? ইসহাক সরকার : দল আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, তার মাধ্যমে আমি সংগঠনকে শক্তিশালী করব। সংগঠন দুর্বল থাকলে রাজনৈতিক দল টিকে থাকতে পারে না। তাই আমার প্রধান লক্ষ্য হলো দলকে শক্তিশালী করা। তৃণমূল পর্যায় থেকে এনসিপিকে শক্তিশালী করার জন্য আমি আমার সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাব। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ থেকে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নির্বাচন করবেন এবং সেখানে একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে আমি মনে করি। এশিয়া পোস্ট : নতুন যারা রাজনীতিতে আসতে চায়, তাদের জন্য আপনার কী মেসেজ থাকবে? তারা কী দেখে দল বেছে নেবে? ইসহাক সরকার : আমি মনে করি প্রথমে দলের আদর্শ দেখা উচিত। কোন দলটা সবচেয়ে আদর্শভিত্তিক এবং দেশ পরিচালনায় জনগণের প্রতি তাদের কতটুকু ভরসা আছে তা দেখা দরকার। ক্ষমতাসীন দল হোক বা বিরোধী দল, তারা জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে আছে কি না সেটা বিবেচনা করা উচিত। জনগণ যেটাকে ভালো মনে করবে, সেটাই পছন্দ করবে। কারণ, সবারই গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার আছে। আমি এনসিপি পছন্দ করেছি কারণ তারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে। আমি সবাইকে অনুরোধ করব আপনারা যোগ্য ও আদর্শবান নেতাদের দেখে পার্টিতে অংশগ্রহণ করবেন। এশিয়া পোস্ট : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ইসহাক সরকার : আপনাদেরও ধন্যবাদ।
ছাত্রদের কারণেই নতুন জীবন পেয়েছি : ইসহাক সরকার
‘বিএনপি-জামায়াতের দূরত্ব নতুন প্রজন্মের মনে হতাশা সৃষ্টি করছে’
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত ব্যক্তি মুজিবুর রহমান মঞ্জু। একসময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রিয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় রাজনীতে ছিলেন। পরবর্তীতে দলটিতে সংস্কারের প্রস্তাব তুলে বহিষ্কৃত হন এবং নতুন রাজনৈতিক দল আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) গঠন করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেপথ্য কারিগরদের একজন হিসেবেও তাঁর নাম আলোচনায় রয়েছে। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের আলাপন অনুষ্ঠানে এসেছিলেন অতিথি হিসেবে। দেশের সমসায়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর। এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের পর সকল রাজনৈতিক মঞ্চে ও সমীকরণে আপনার এবং আপনার দলের জোরালো উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর তেমনটি আর দেখা যাচ্ছে না। কেন? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: বিষয়টি মোটেও আড়ালে চলে যাওয়া নয়। আমাদের বুঝতে হবে যে এবি পার্টি একটি নতুন ধারার রাজনৈতিক দল। আমরা যখন এই দল গঠন করেছি, তখন আমাদের মূল ফোকাস বা লক্ষ্য ছিল আন্দোলনের দিকে, প্রথাগত নির্বাচনের দিকে নয়। আমাদের দেশে নির্বাচনের যে প্রচলিত সংস্কৃতি বা ট্র্যাডিশনাল পজিশন আছে, সেখানে অংশগ্রহণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে প্রতিটি আসনে অত্যন্ত সুপরিচিত ও শক্তিশালী প্রার্থী থাকা, মার্কার ব্যাপক পরিচিতি থাকা এবং একটি সুদৃঢ় সাংগঠনিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তির প্রয়োজন হয়। আমরা যেহেতু একটি উদীয়মান ও নতুন দল, তাই আমাদের সবটুকু শক্তি আমরা ব্যয় করেছিলাম ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণআন্দোলনে। আমাদের পুরো মনোযোগ ছিল রাজপথে। ফলে নির্বাচনমুখী সুনির্দিষ্ট ফোকাস আমাদের সেভাবে ছিল না। এছাড়া ৫ই আগস্টের পর দেশের রাজনীতিতে যে বিশাল পরিবর্তন ও ধকল গিয়েছে, সেখান থেকে নিজেদের মানসিকভাবে গুছিয়ে নেওয়া এবং আন্দোলনের ক্লান্তি বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে দাঁড়ানোর জন্য আমরা ইচ্ছা করেই কিছুটা সময় নিয়েছি। আমরা এখন দলকে তৃণমূল পর্যায়ে সুসংগঠিত করার কাজ করছি এবং সামনের দিনগুলোতে আমাদের সরব উপস্থিতি পুনরায় দেখা যাবে। এশিয়া পোস্ট: আপনি যে দল থেকে নীতিগত পার্থক্যের কারণে বহিষ্কৃত হলেন, সেই জামায়াতে ইসলামীর সাথেই আবার একটি নির্বাচনী জোটে আপনাদের যেতে দেখা গেল। এটা কি অনেকটা স্ববিরোধী নয়? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: দেখুন, আদর্শিক বা প্রিন্সিপাল জায়গা থেকে বিচার করলে এটি হওয়ার কথা ছিল না। আমি যে কারণে জামায়াত থেকে বের হয়েছিলাম, সেই পার্থক্যগুলো এখনো বিদ্যমান। তবে রাজনীতিতে অনেক সময় ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং বিশেষ কোনো মহৎ লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিতে হয়। আমরা ৫ই আগস্টের এই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বা ‘জুলাই স্বার্থকে’ সবার উপরে রেখেছি। আমরা যখন ঐক্যমত্য কমিশনে কাজ করছিলাম, তখন আমাদের লক্ষ্য ছিল বিএনপিকে সাথে নিয়ে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়া। আমরা বিএনপিকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে ১৫ বছরের অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পর দেশ পুনর্গঠনে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম বিএনপি অনেকগুলো মৌলিক সংস্কারের জায়গায় দ্বিমত পোষণ করছে বা ‘নোট অফ ডিসেন্ট’ দিচ্ছে। অন্যদিকে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে আমরা জামায়াতকে অত্যন্ত আন্তরিক পেয়েছি। আমাদের সাথে তাদের আদর্শিক বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু রাজপথের লড়াইয়ে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষায় জামায়াতের সাথে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি মিলে গেছে। আন্দোলনের সময় তো আর দল আলাদা ছিল না; বিএনপি, জামায়াত, এবি পার্টি কিংবা সাধারণ মানুষ—সবাই একাকার হয়ে লড়াই করেছি। তখন কে কাকে বহিষ্কার করেছে সেই পুরোনো হিসাব বড় ছিল না। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হওয়াটাই ছিল জরুরি। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের স্বার্থে আমরা কেবল একটি নির্বাচনী ও কৌশলগত অ্যালায়েন্স করেছি। এটি কোনোভাবেই মতাদর্শিক বা চিরস্থায়ী কোনো ঐক্য নয়। এশিয়া পোস্ট: অনেকের মনেই একটি গভীর সন্দেহ আছে যে, এবি পার্টি আসলে জামায়াতে ইসলামীরই একটি ছায়া সংগঠন। ভিন্ন নামে আপনারা আসলে জামায়াতের পুরোনো এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করছেন কি না? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: যদি এমনটিই হতো, তবে তো জামায়াত যখন ৫ই আগস্টের পর সগৌরবে রাজনীতিতে ফিরে এল, তখনই আমরা সেই দলে ফিরে যেতাম। কিন্তু আমাদের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি জামায়াত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং আমরা আমাদের স্বতন্ত্র অবস্থানে অনড় আছি। জামায়াত মূলত একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল, যাদের প্রতিটি কর্মসূচি ও নীতি আবর্তিত হয় ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে, এবি পার্টি একটি নাগরিক অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাজনৈতিক দল। আমরা ‘সলিউশন বেসড পলিটিক্স’ বা জনভোগান্তি লাঘবের সমাধানমূলক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। আমরা যদি কেবল জামায়াতের গন্ধ মুছে নতুন নাম নিয়ে পুরোনো কাজই করতে চাইতাম, তবে আমাদের আদর্শিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতো না। আমরা যখন দল গঠন করি, তখন অনেকে মনে করেছিলেন আমরা জামায়াতকে ভাঙতে চাই। আসলে আমরা জামায়াতকে ভাঙতে চাইনি, বরং আমি যখন সেখানে ছিলাম তখন ভেতরের সংস্কার চেয়েছিলাম। সেই অধ্যায় এখন শেষ। এখন আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন কালচার ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে চাই। আমরা যে প্রস্তাবনা দিয়েছি, তা আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জামায়াতের পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে মানুষের নাগরিক অধিকারই হবে রাজনীতির মূল ভিত্তি। এশিয়া পোস্ট: জামায়াতে থাকার সময় আপনি ঠিক কী ধরনের পরিবর্তনের দাবি তুলেছিলেন, যার জন্য আপনাকে বহিষ্কৃত হতে হলো? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: আমাদের প্রধান দুটি প্রস্তাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রথমত, আমরা বলেছিলাম জামায়াতকে একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক দল বা ‘ফুলফ্লেজড পলিটিক্যাল পার্টি’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। জামায়াত যেহেতু একটি ধর্মভিত্তিক দল, তাই তাদের কর্মকাণ্ডে অনেক ধরণের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। আপনি দেখবেন, বিএনপি বা আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী যখন কোনো স্লোগান দেয় বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারণা চালায়, তখন সমাজ সেটাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি হিসেবে স্বাভাবিকভাবে নেয়। কিন্তু জামায়াত যখন একই কাজ করে, তখন মানুষ প্রশ্ন তোলে যে এটি ইসলামী শরিয়তসম্মত কি না। জামায়াতকে সবসময় তার আদর্শের বিচারে যাচাই করা হয়, কিন্তু অন্যান্য দলকে দেখা হয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিচারে। আমরা বলেছিলাম এই আলোচনাটি দলের ভেতরে হওয়া দরকার। দ্বিতীয়ত, আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে জামায়াতের দুটি আলাদা শাখা থাকতে পারে—একটি অংশ থাকবে যারা শুধু ধর্মীয় ও নৈতিক প্রশিক্ষণের কাজ করবে, আর অন্য অংশটি হবে সম্পূর্ণ একটি আধুনিক রাজনৈতিক দল। বর্তমানের গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতি করতে গেলে অনেক সময় রণকৌশলগত কারণে আপোষ করতে হয়, যা কট্টর ধর্মীয় অবস্থান থেকে করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। আমি বিশ্বাস করি, জামায়াত এখন অনেক ক্ষেত্রেই ইনক্লুসিভ হওয়ার চেষ্টা করছে, নারী-পুরুষ একসাথে কর্মসূচি পালন করছে কিংবা অমুসলিমদের সমর্থন চাইছে। এগুলো আসলে আমাদের সেই প্রস্তাবিত সংস্কারেরই ফল। আজ হোক বা কাল, জামায়াতকে এই পরিবর্তনের পথেই হাঁটতে হবে, এমনকি ভবিষ্যতে হয়তো তারা দলের নামও পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। তাদের অনেক অঙ্গসংগঠনের নাম থেকে ইতিমধ্যে ‘ইসলাম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। সার্বজনীন দল হতে গেলে আপনাকে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতেই হবে। এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেপথ্য নায়ক হিসেবে আপনার ভূমিকা বেশ আলোচিত। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে সংগঠিত করার পেছনেও আপনার জোরালো তৎপরতা ছিল। আপনি মেন্টর হিসেবে ছাত্র সমন্বয়কদের অনেককে পরিচালিত করেছেন বলেও শোনা যায়।  মুজিবুর রহমান মঞ্জু: মাস্টারমাইন্ড নিয়ে এখন অনেকেই অনেক কথা বলছেন। তবে আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, কোনো একক ব্যক্তি এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড নয়। যদি নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে কাউকে মাস্টারমাইন্ড বলতে হয়, তবে তিনি হচ্ছেন শেখ হাসিনা। তাঁর একগুঁয়েমি, চরম অহংকার, ভুল পদক্ষেপ এবং একের পর এক ফ্যাসিস্ট আচরণ পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য করেছে। বিএনপি বা জামায়াতের মতো বড় দলগুলো গত ১৫ বছরে অনেক আন্দোলন করেছে, অনেক প্রাণ দিয়েছে, কিন্তু জুলাই মাসে ছাত্ররা যখন ডাক দিল, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অভূতপূর্ব গণজোয়ার তৈরি হলো, তা নজিরবিহীন। মাত্র ১৪-১৫ দিনের মধ্যে শত শত মানুষ শহীদ হয়েছেন। আবু সাঈদের শাহাদাত পুরো জাতিকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছিল। আমরা এবি পার্টি হিসেবে ছোট দল হলেও শুরু থেকেই ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। আমরা একে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছিলাম ফ্যাসিবাদের প্রধান বাধা শেখ হাসিনাকে হঠানোর জন্য। আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর আমরাই প্রথম তাকে ‘এই জামানার বীরশ্রেষ্ঠ’ বলে অভিহিত করি। আজ সফল হওয়ার পর অনেকেই কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত এবং সম্মিলিত গণবিস্ফোরণ। আমাদের দায়িত্ববোধ থেকে আমরা ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। নাহিদ ইসলাম যেদিন প্রথম গ্রেপ্তার হলেন, তার দুই দিন আগে থেকে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। আমাদের কাছে যখন ফোন আসলো যে নাহিদকে কোথাও নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা দরকার, তখন আমি আমার এক বন্ধুর ধানমন্ডির বাসায় তাঁর থাকার ব্যবস্থা করি। সেদিন ধানমন্ডিতে চরম উত্তেজনা ও সংঘাত চলছিল। পরবর্তীতে সেখান থেকেও তাঁকে সরে যেতে হয় কারণ গোয়েন্দারা তাঁর অবস্থান জেনে ফেলেছিল। এরপর নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর বাসা থেকে যখন তাঁকে ডিবি পুলিশ তুলে নিয়ে যায়, আমরাই প্রথম ডিবি অফিসের সামনে তাঁর পরিবার ও সাংবাদিকদের একত্রিত করি। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর সরকার প্রবল চাপে পড়ে যায়। দেখুন, সেই সময়ে আমরা কেউই নিজেদের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা বড় কোনো কারিগর হিসেবে ভাবিনি। আমরা সবাই চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম। আজ আন্দোলন সফল হয়েছে বলে সবাই অবদান স্বীকার করছে, কিন্তু ব্যর্থ হলে হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতো। এটি ছিল একটি যৌথ প্রচেষ্টা যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো এবং ছাত্ররা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে। এশিয়া পোস্ট: বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? ১০-এর মধ্যে আপনি তাদের কত নম্বর দিতে চান? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আমি ১০-এর মধ্যে ৬ দেব। এই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তারা একটি চরম অস্থিতিশীল মুহূর্তে দায়িত্ব নিয়ে নির্বাচনের একটি পথ তৈরি করতে পেরেছে। ড. ইউনূস এমন একজন বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব যার আহ্বানে দেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সাড়া দিচ্ছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে তাদের পরিচালনা পদ্ধতিতে দুর্বলতা ছিল। বিশেষ করে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই সরাসরি ছাত্রদের কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়াটা কিছুটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম যে ছাত্রদের সরাসরি প্রশাসনে না বসিয়ে আগে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ বা ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। এছাড়া সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও পুলিশের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখনো শতভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শুরুতে ছাত্রদের যতটা প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তীতে আবার তাদের সাথে একধরণের দূরত্ব তৈরি হওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সরকারকে আরও বেশি ইনক্লুসিভ হতে হবে এবং সব পক্ষকে সাথে নিয়ে সংকট মোকাবিলা করতে হবে। এশিয়া পোস্ট: গত আড়াই মাসে বিএনপি সরকারের ভূমিকা কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: বিএনপিকে কেবল আড়াই মাসের সরকার হিসেবে দেখলে হবে না। তারা প্রশাসনের অনেক স্তরেই একটি পরোক্ষ প্রভাবে রয়েছে। ৫ই আগস্টের পর থেকে পুলিশ ও সচিবালয়ে বিএনপির সমর্থকদের আধিপত্য বেড়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিএনপির পারফরম্যান্স আমার কাছে কিছুটা হতাশাজনক মনে হয়েছে। তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা এবং গুম কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে জুলাই সনদের মূল অঙ্গীকার থেকে কিছুটা সরে যাচ্ছে বলে মনে হয়। দলীয়করণের যে পুরোনো সংস্কৃতি আমরা দেখেছি, সেই একই পথে হাঁটার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক। তিনি মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সংযত থাকার কঠোর বার্তা দিচ্ছেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সোচ্চার আছেন। তারেক রহমানের সাথে আমার যতবার আলাপ হয়েছে, আমি দেখেছি তিনি একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে ক্ষমতাসীন দল ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু বিএনপির মধ্যম ও নিচুতলার রাজনীতি এখনো সেই পুরোনো ধারার দ্বন্দ্ব ও দখলদারিত্বের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি। এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে সংঘাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে, একে কি আপনি স্রেফ ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখেন? আপনি তো নিজেও একসময় ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বে ছিলেন, আপনার পর্যবেক্ষণ কী? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি পরিস্থিতি। জামায়াত ও বিএনপি সেই ১৯৯১ সালের পুরোনো দ্বন্দ্বে ফিরে যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়। ৯১ সালেও তারা একসাথে ক্ষমতায় আসার পর ক্যাম্পাসগুলোতে ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। বর্তমানে তারা একে অপরকে ‘গুপ্ত’ বা ‘খাম্বা’ বলে যে ভাষায় আক্রমণ করছে, তা আসলে শেখ হাসিনার তৈরি করা রাজনৈতিক ভাষ্য। যখন তারা পরস্পরকে রাজাকার বা দুর্নীতিবাজ বলে গালি দেয়, তখন তারা অবচেতনভাবে হাসিনার ফ্যাসিবাদী বয়ানকেই শক্তিশালী করে। ছাত্রশিবির কোনো গোপন বা গুপ্ত সংগঠন নয়, তবে প্রতিকূল পরিবেশে তারা আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স করেছে, যা পৃথিবীর অনেক দেশের বামপন্থী সংগঠনগুলোও করেছে। এটিকে অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল। এখন ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে তাদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, তা নতুন প্রজন্মের মনে তীব্র হতাশা সৃষ্টি করছে। তারা একসময় রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে, অথচ এখন ক্ষমতার মোহে একে অপরের রক্ত ঝরাচ্ছে। এটি দ্রুত বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা কতটুকু? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: আওয়ামী লীগ একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের দল, তাদের একটি সমর্থক গোষ্ঠী দেশে এখনো আছে। তবে তারা গত ১৫ বছরে এবং বিশেষ করে জুলাই-আগস্টে যে গণহত্যা ও ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে, সেই দায় না নিয়ে তাদের ফেরা প্রায় অসম্ভব। তাত্ত্বিকভাবে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন তখনই সম্ভব হবে, যদি বর্তমান বা ভবিষ্যৎ সরকার তাদের চেয়েও বড় কোনো ফ্যাসিজম কায়েম করে। তখন মানুষ কম্পারিজন বা তুলনার জায়গায় যাবে এবং আওয়ামী লীগকে ‘কম খারাপ’ মনে করতে শুরু করবে। এবারের আন্দোলনে কোটি কোটি মানুষ সম্পৃক্ত ছিল এবং তারা সচক্ষে এই গণহত্যা দেখেছে। তাই আওয়ামী লীগ যদি তাদের ভুলের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা না চায় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না যায়, তবে এই প্রজন্ম তাদের গ্রহণ করবে না। তবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘাত বাড়লে আওয়ামী লীগ সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করবে, এটাই রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। এশিয়া পোস্ট: আপনি দীর্ঘ সময় দিগন্ত টেলিভিশনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ৫ই আগস্টের পর এই চ্যানেলটি পুনরায় চালু হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত তা অন্ধকারেই রয়ে গেছে। এর পেছনে বাধাটা কোথায়? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: দিগন্ত টেলিভিশন চালু না হওয়াটা ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য এবং হাজার হাজার সংবাদকর্মীর জন্য অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। আমি এই প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন থেকে উপ-নির্বাহী পরিচালক ছিলাম। সরকার পরিবর্তনের পর আমার প্রস্তাব ছিল আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় এই দীর্ঘদিনের আর্থিক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ মামলা করব এবং আদালতের মাধ্যমে সম্মানজনকভাবে ফিরে আসব। কিন্তু বর্তমানে যারা এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আছেন, তারা সঠিক পথে হাঁটছেন না। তারা আইনি লড়াইয়ের চেয়ে হয়তো অন্য কোনো পন্থায় বা ব্যক্তিগত লবিংয়ের মাধ্যমে চ্যানেলটি চালুর চেষ্টা করছেন যা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। দিগন্তের শত শত সাংবাদিক ও কর্মচারী বছরের পর বছর ধরে তাদের পাওনা পাচ্ছেন না। আমি মনে করি, বর্তমান নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও অযোগ্যতার কারণেই একটি সম্ভাবনাময় গণমাধ্যম আজ ধ্বংসের মুখে। সরকারের উচিত এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষের রুটি-রুজির কথা ভেবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। এশিয়া পোস্ট: জ্বালানিসহ বৈশ্বিক এবং জাতীয় পর্যায়ে নানা সংকট বাড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? বারবার আমরা জাতীয় ঐক্যের কথা শুনি। এসব সংকট সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যের কোনো প্রয়োজনীতা দেখেন কি না? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: দেশ বর্তমানে একটি চরম অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানির বড় অংশই আমদানিনির্ভর, ফলে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা সরাসরি আমাদের ওপর প্রভাব ফেলছে। ডলারের সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এ অবস্থায় সরকারের উচিত ছিল একটি ‘জাতীয় ঐক্যের’ ডাক দেওয়া। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সাথে নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকার এককভাবে সব সামলানোর যে নীতি নিয়েছে, তাতে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। সরকার যদি প্রকৃত অবস্থা আড়াল করার চেষ্টা করে, তবে ভবিষ্যতে এটি বড় গণবিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। এখনো সময় আছে সবাইকে নিয়ে বসে একটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটনিরসন পরিকল্পনা করার। এশিয়া পোস্ট: এবি পার্টি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? আপনারা কি আগামীতে এককভাবে নির্বাচনের কথা ভাবছেন? মুজিবুর রহমান মঞ্জু: আমরা এবি পার্টিকে একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হিসেবে দাঁড় করাতে চাই। আমরা ইতিমধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে দল গোছানোর কাজ শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য হলো একটি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। যদি বড় দলগুলো দেশের মানুষের ন্যূনতম নাগরিক অধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে, তবে আমাদের আলাদা রাজনীতির হয়তো প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু বর্তমানের যে মেরুকরণ, তাতে আমাদের মতো একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা মানুষ গভীরভাবে অনুভব করছে। আমরা আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করি, গালি বা ঘৃণার রাজনীতি নয় বরং সমাধানের রাজনীতিই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা একটি মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাব।
‘বিএনপি-জামায়াতের দূরত্ব নতুন প্রজন্মের মনে হতাশা সৃষ্টি করছে’
অকৃতকার্য ছাত্রকে মাওলানা উপাধি দেওয়া সমর্থন করে না বেফাক
সাক্ষাৎকারে মাওলানা মাহফুজুল হক / অকৃতকার্য ছাত্রকে মাওলানা উপাধি দেওয়া সমর্থন করে না বেফাক
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের কওমি শিক্ষাব্যবস্থা দেখভালের সঙ্গে যুক্ত মাওলানা মুহাম্মাদ মাহফুজুল হক। বর্তমানে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড হিসেবে পরিচিত বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়ার স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং মোহাম্মদপুরের ঐতিহ্যবাহী জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার মহাপরিচালক। দেশের কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক চিত্র, বেফাকের ভূমিকা ও পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ এশিয়া পোস্ট: ২০০৫ সাল থেকে বেফাকের দায়িত্বশীল পদে আছেন। ২০২০ সাল থেকে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। এই দীর্ঘ সময়ে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কী পদক্ষেপ নিয়েছেন? মাহফুজুল হক: ২০০৫ সালে শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহ.) বেফাকের সভাপতি হন, ওই বছরই আমি সহকারী মহাসচিব মনোনীত হই। ২০২০ পর্যন্ত সহকারী মহাসচিব ছিলাম। ওই বছরের অক্টোবরে মহাসচিবের দায়িত্ব পাই। ২০০১ সালে চার দলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। তখন আলেমরা কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির আওতায় আনতে চেয়েছিলেন। এর আগেও চেষ্টা হয়েছে। ২০০৫-২০০৬ সালের দিকে স্বীকৃতি দিতে সরকার কমিটি গঠন করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তখন এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত গেজেট হয়নি। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দিয়ে প্রথম নীতিগত সিদ্ধান্ত গেজেট আকারে প্রকাশ পায়। ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগের আমলে দাওরায়ে হাদিসের সনদ গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন করে স্বীকৃতি লাভ করে। ২০১৮ সালে সংসদে বিল পাসের মধ্য দিয়ে এটি আইনে পরিণত হয়। বেফাকের নামে স্বীকৃতি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু আঞ্চলিক অন্যান্য বোর্ডের কারণে হয়নি। ২০১৭ সালে ছয় বোর্ডের সমন্বয়ে আল-হাইয়াতুল উলয়া গঠন হয়। এটি এই সময়ের বড় অর্জন। এখন বলতে পারি, কওমি মাদ্রাসাগুলো আল-হাইয়াতুল উলয়ার অধীনে এক্যবদ্ধ। এশিয়া পোস্ট: সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় পাবলিক পরীক্ষার ফল ঘোষণার পর দেশব্যাপী উচ্ছ্বাস দেখা যায়। গণমাধ্যমেও আলোচনা হয়। কিন্তু বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফল নিয়ে এমন উচ্ছ্বাস বা আলোচনা দেখা যায় না। এর কারণ কী? মাহফুজুল হক: স্কুল-কলেজের শিক্ষার সঙ্গে বিপুলসংখ্যাক মানুষের সম্পৃক্ততা আছে। সেই তুলনায় কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কম। তবে এবার ফল ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যে ২০ লাখ মানুষ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেছে। অনলাইনেও বেশ আলোচনা হয়েছে। তবে ঈদের আগমুহূর্তে ফল ঘোষণা এবং সময় নির্ধারণে জটিলতার কারণে মিডিয়াকে সেভাবে জানানো যায়নি। ভবিষ্যতে মিডিয়াকে ডাকার চিন্তাভাবনা রয়েছে আমাদের। এশিয়া পোস্ট: অভিযোগ আছে, অকৃতকার্য হওয়ার পরও শিক্ষার্থীরা পরবর্তী ক্লাসে ভর্তি হতে পারেন। এ বিষয়ে বেফাকের সিদ্ধান্ত কী? মাহফুজুল হক: মিশকাতে পরীক্ষা দিতে হলে শরহে বেকায়ার পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে হয়। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ক্লাসেও এমন নিয়ম করা হবে। অকৃতকার্য ছাত্ররা পরবর্তী ক্লাসে ভর্তি হতে পারবে; এমন দৃষ্টিভঙ্গি বেফাক লালন করে না। এ জন্য পর্যায়ক্রমে পরবর্তী ধাপের পরীক্ষার জন্য আগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বাধ্যবাধকতা চালু করছি। মাদ্রাসাগুলোকে প্রস্তুত করছি। তাদের উদ্বুদ্ধ করছি। এশিয়া পোস্ট: কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীরা চাইলে যে কোনো ক্লাসে ভর্তি হতে পারে। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সনদ লাগে না। এর ফলে কি শিক্ষার মান কমছে? মাহফুজুল হক: হাইয়াতুল উলয়ায় সম্মিলিত ছয়টি বোর্ড কাজ করছে। সেখানে এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে কাজ করছি। যোগ্যতা ছাড়া যেন ভর্তি হতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি রাখছি। যে কোনো ক্লাসে ভর্তির বিষয়টি এখন কমে আসছে। একসময় মাদ্রাসাগুলো ইচ্ছামতো পরিচালিত হয়েছে। বোর্ড ছিল না। পরে বোর্ড হলো। বোর্ডের তত্ত্বাবধানে এ দুর্বলতাগুলো ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা হয়েছে। স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে আরেকটু এগিয়েছে। আশা করি, দ্রুত এ ধরনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠব। তবে আগের ক্লাসে উত্তীর্ণ না হওয়া কাউকে পরের ক্লাসে ভর্তি নিলে শিক্ষার মান ক্ষুণ্ন হয়। এশিয়া পোস্ট: বেফাক প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫০ বছর হলো। একটি শিক্ষাবোর্ডে শিক্ষাবান্ধব নিয়ম করতে এত বছর লাগছে কেন? মাহফুজুল হক: স্বীকৃতির আগ পর্যন্ত বেফাক ওইসব মাদ্রাসার সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাদের ওপর আইন চাপানোর মতো শক্তি বেফাকের ছিল না। স্বীকৃতি তো কার্যকর হলো ২০১৭-১৮ সালে। সময় অনেক গেছে, সময়ের মধ্য দিয়ে পরিবেশ ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে আসছে। এশিয়া পোস্ট: আল-হাইয়াতুল উলয়ার পরীক্ষায় ফেল করার পরও অনেক পরীক্ষার্থীকে পাগড়ি দেওয়ার খবর এসেছে। ফেল করা শিক্ষার্থীদেরও মাওলানা উপাধি দেওয়া হচ্ছে। তাহলে পড়াশোনা করে পাস করার প্রয়োজন কী? মাহফুজুল হক: আল-হাইয়াতুল উলয়ার পক্ষ থেকে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে সনদ দেওয়া হয় না। কোনো বিষয়ে ফেল করলে পরের বছর পরীক্ষা দিতে হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে দুর্বলতা আছে। দাওরায়ে হাদিসে ফেল শিক্ষার্থীও যেন সমাজে দায়িত্ব পালন করতে পারে, ওই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্ভবত তারা পাগড়ি দিচ্ছে। খুব দ্রুতই পরিবেশ ঠিক করার চেষ্টা করছি। এখন সার্টিফিকেট দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম বেফাক ও হাইয়াতুল উলয়া। একসময় প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকের গুরুত্ব থাকবে না। তখন ফেল করা শিক্ষার্থীকে সার্টিফিকেট দেওয়া সম্ভব হবে না। এশিয়া পোস্ট: দাওরায়ে হাদিসে ফেল শিক্ষার্থীকে মাওলানা উপাধি বা পাগড়ি দেওয়া ঠিক মনে করেন? মাহফুজুল হক: না। বেফাক তাকে সার্টিফিকেট দেয় না। ভালো প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা শেষে ফলাফল ঘোষণার পর পাগড়ি দেওয়া হয়। সাধারণ প্রতিষ্ঠান বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেকে বার্ষিক পরীক্ষার আগেই পাগড়ি দিয়ে দেন। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন নয়। ফেল ছাত্রকে মাওলানা উপাধি বা পাগড়ি দেওয়া বেফাক সমর্থন করে না। এশিয়া পোস্ট: কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই যত্রতত্র মাদ্রাসা খোলা হচ্ছে। এ বিষয়ে বেফাকের চিন্তাভাবনা কী? মাহফুজুল হক: একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও বেফাকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য কী কী মানদণ্ড থাকা দরকার, এ বিষয়ে কাজ করছি। কিন্ডারগার্টেনও যত্রতত্র হচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন কম হয়। কিন্তু কওমি মাদ্রাসা নিয়ে প্রশ্ন বেশি হয়। তবে যোগ্যতা ছাড়া যত্রতত্র মাদ্রাসা করা ঠিক নয়। এগুলোকে নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসতে সচেষ্ট আছি। এশিয়াপ পোস্ট: সিলেবাস আধুনিকীকরণে বেফাক কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? মাহফুজুল হক: বেফাক প্রতিষ্ঠার পর থেকে সিলেবাস প্রণয়নের কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। কোরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞানার্জনের যে শিক্ষা কার্যক্রম, সেখানে খুব বেশি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। একসময় কওমিতে বাংলা, গণিত, ইংরেজি, ভূগোল ও ইতিহাস ছিল না। বেফাকই প্রথম পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এগুলো পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। পরে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে বাংলা, গণিত ও ইংরেজি যোগ হয়েছে। এখন নবম-দশমেও বাংলা-ইংরেজি যুক্ত হচ্ছে। মিশকাতে ইসলামি অর্থনীতি পড়ানো হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানও সিলেবাসভুক্ত করার চিন্তা আছে। মূল উদ্দেশ্য ঠিক রেখে আমরা সিলেবাস আধুনিকীকরণের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি। এশিয়া পোস্ট: শাপলা চত্বর ও জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির দাবি উঠছে। এ নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী? মাহফুজুল হক: বেফাকে আমাদের স্থায়ী সম্পাদনা পরিষদ আছে। সেখানে শাপলা ও জুলাইয়ে আলেমদের অবদান ও ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রমে জুলাইকে সরকার কীভাবে ধারণ করছে, সেদিকেও নজর রাখছি। সে আলোকে আমাদের শিক্ষা সিলেবাসে এ জাতীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা আছে। এশিয়া পোস্ট: ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রয়োজনে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যবহার করছে। বিষয়টি কীভাবে দেখেন? মাহফুজুল হক: ছাত্ররাও ইসলামি রাজনীতি শিখবে, তবে সেটা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। তার মূল কাজ পড়াশোনা। ধর্মীয় ব্যাপক প্রয়োজন ছাড়া তাদের মাঠে-ময়দানে কাজে লাগানো ঠিক নয়। এতে ছাত্রদের মূল উদ্দেশ্য পড়াশোনা ব্যাহত হবে।   এশিয়া পোস্ট: চাকরির বাজারে মাদ্রাসা শিক্ষা সনদের গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। এ নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষোভ-আক্ষেপ রয়েছে, কিন্তু বিষয়টি সুরাহার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। এখানে বেফাকের কোনো ব্যর্থতা আছে বলে মনে করেন? মাহফুজুল হক: এটার জন্য উদ্যোগ নেই; এ কথার সঙ্গে একমত নই। স্বীকৃতি তো এমনি অর্জন হয়নি। এর পেছনে মুরুব্বিদের যথেষ্ট সংগ্রাম আছে। স্বীকৃতি কার্যকরের চেষ্টা পুরোপুরি অব্যাহত আছে। স্বীকৃতি আদায়ের সময়ও আমাদের প্রথম টার্গেট ছিল নিজস্ব স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট হওয়ার শঙ্কা যেন তৈরি না হয়। আমাদের এসএসসি, এইচএসসি ও অনার্সের সমমান নিতে বলা হচ্ছে। এই স্তরগুলোতে সমমান নেওয়া হলে কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্বলতা দেখা দেবে। যেমন আলিয়া মাদ্রাসায় হচ্ছে। সেখানে দাখিলে ১০০ শিক্ষার্থী থাকলে আলিমে থাকে ৫০ জন। বাকিরা কলেজে চলে যায়। আলিমে ৫০ জন থাকলে পরের ধাপে থাকে ২০ জন। মেধাবীরা কেউ থাকে না। একটা শিক্ষাব্যবস্থায় মেধাবীরাই যদি না থাকে, তাহলে সেটা টিকে থাকে না। আমরা মনে করছি, অল্প দিনের মধ্যে আলিয়া মাদ্রাসা ভ্যানিশ বা নাই হয়ে যাবে। এসএসসি বা এইচএসসির সমমান নিচ্ছি না আমরা। না নেওয়ার কারণে সনদের কার্যকারিতার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা। এটা না নিয়ে কীভাবে সনদ কার্যকর করা যায়, সে চেষ্টা করছি। এশিয়া পোস্ট: সমমান না নিলে চাকরির সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে? মাহফুজুল হক: ২০০৬ সালে যখন দাওরায়ে হাদিসের সনদের নীতিগত গেজেট হয়, সেখানে বলা আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষক পদে আবেদন করা যাবে। এখন কাজি পদে আবেদন করা যাচ্ছে। এই সনদে আমাদের ছাত্রদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ ধর্মীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সুযোগ দেওয়া হলে চাকরির অনেক ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তবে চাকরির বাজার তৈরি করতে গিয়ে মূল জায়গা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। এশিয়া পোস্ট: শিক্ষার্থীরা তো একাডেমিক সমমান নিয়ে চাকরির বিশাল বাজারে প্রবেশ করতে চান। মাহফুজুল হক: আমি মনে করি, ছাত্ররা বুঝতে পারছে না। যদি চাকরিই একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে কওমি মাদ্রাসায় আসার প্রয়োজন কী? সে আলিয়া মাদ্রাসায় পড়ুক। কওমি মাদ্রাসায় যেহেতু এসেছে, তাকে কোরআন-হাদিসের বিজ্ঞ আলেম হতে হবে। কওমি মাদ্রাসায় পড়ার পাশাপাশি স্কুলে সে পরীক্ষা দিক। তবে আগে ভালো আলেম হোক। এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। মাহফুজুল হক: এশিয়া পোস্টের জন্য শুভকামনা। আপনাকেও ধন্যবাদ।
‘ভারত থেকে পরিচালনার চেষ্টা হলে বাংলাদেশে আ.লীগের ভবিষ্যৎ নেই’
‘ভারত থেকে পরিচালনার চেষ্টা হলে বাংলাদেশে আ.লীগের ভবিষ্যৎ নেই’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিতে সাংবাদিকতা করার পর আকবর হোসেন যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত ১১ এপ্রিল সেই পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক আয়োজন আলাপন অনুষ্ঠানে তার সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, প্রেস মিনিস্টারের দায়িত্ব, পদত্যাগ এবং বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেছেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর। এশিয়া পোস্ট: বিশ্বের অন্যতম সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। দেশের খবর বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন। আপনার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর গল্পটা দিয়ে আমরা আলোচনা শুরু করতে চাই। আকবর হোসেন: আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন থেকেই মূলত আমার সাংবাদিকতা শুরু। এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় একটি ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে। ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার পর আমি সেখানে ট্রেনি রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিই এবং মোটামুটি দুই বছর তিন মাস কাজ করি। ২০০৫ সালে বিবিসি যখন ঢাকায় লোক নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়, তখন আমি আবেদন করি এবং নির্বাচিত হই। ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর আমি বিবিসিতে যোগ দিয়েছিলাম। এরপর দীর্ঘ সময় সেখানে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এশিয়া পোস্ট: বিবিসিতে কাজ করার সুবাদে ওখানকার কাজের পরিবেশ খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেখানকার সাংবাদিকরা কি আসলেও রাজনীতি ও মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থাকেন, নাকি ব্যক্তিভেদে তাদেরও পক্ষপাত থাকে? আকবর হোসেন: বিবিসি একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজম বা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন করাকে কখনোই উৎসাহিত করে না। সেখানে কাজ করা অবস্থায় আপনি কোনো দলের সমর্থক হতে পারবেন না কিংবা তাদের সরাসরি সমালোচকও হতে পারবেন না। এই নিরপেক্ষতাটুকু বিবিসি খুব কঠোরভাবে বজায় রাখে। বিবিসির একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়া পলিসি আছে। সেখানে কাজ করলে আপনি চাইলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় যা খুশি লিখতে পারবেন না। আপনি এমন কিছু লিখতে পারবেন না যাতে মনে হয় যে আপনি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা কোনো ঘটনায় একটি পক্ষ নিয়েছেন। মানুষ হিসেবে আমাদের অবচেতনে অনেক সময় রাজনৈতিক মতামত চলে আসে, কিন্তু কেউ যদি এই নিয়মগুলো লঙ্ঘন করে, তবে তাকে সতর্ক করা হয়। এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। কারণ একজন রিপোর্টার হিসেবে লোকে যদি মনে করে আপনি পক্ষপাতদুষ্ট, তবে তারা আপনার বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ের ওপর আস্থা হারাবে। এতে প্রতিষ্ঠানের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। এশিয়া পোস্ট: ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে আপনার কী মনে হয়—একই সঙ্গে রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং সাংবাদিকতা করা কি সত্যিই সম্ভব? আকবর হোসেন: এটা আসলে নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর। আপনার প্রফেশনাল ইনটেগ্রিটি বা পেশাদার সততা যদি অনেক শক্তিশালী হয়, তবে আপনি পারবেন। আমি মনে করি, আমরা কেউই রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে নই। কিন্তু প্রশ্ন হলো আপনি ফেয়ার কি না, আপনি অবজেক্টিভ কি না। আপনার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতা করার সময় আপনি ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ বলতে পারছেন কি না, সেটিই বড় বিষয়। আপনি কি উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে ভিকটিম করছেন? যদি আপনি তা না করেন এবং কভারেজের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ থাকেন, তবে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে আমার ব্যক্তিগত মত হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকলে নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশ না করাই শ্রেয়। আপনি যদি স্বতন্ত্র সাংবাদিক হন, তবে ভিন্ন কথা। এশিয়া পোস্ট: বিবিসিতে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আপনার করা এমন কোনো বিশেষ সংবাদের কথা মনে পড়ে যা আপনাকে আজও গর্বিত করে? আকবর হোসেন: নির্দিষ্ট করে একটি ঘটনার কথা বলা কঠিন, কারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমি সাংবাদিকতা করেছি। যেমন বাংলাদেশে যখন ২০০৭ সালে ‘ওয়ান ইলেভেন’ বা জরুরি অবস্থা জারি হলো, সেই সময়টা ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। এরপর সিডর ঘূর্ণিঝড়ের কাভারেজ ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং চ্যালেঞ্জিং। এ ছাড়া ২০০৮ সালের নির্বাচনসহ পরবর্তী বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনা আমি কাভার করেছি। সাংবাদিক হিসেবে প্রতিটি ঘটনাই আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এশিয়া পোস্ট: সাংবাদিকতা ছেড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার হয়েছিলেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে সেই কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? আকবর হোসেন: সত্যি বলতে, আমার সেই অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো ছিল না। আমি ওখানে গিয়ে দেখলাম যে, এই পদের জন্য আসলে সেরকম কোনো কাজ সেখানে নেই। একপর্যায়ে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এই ধরনের পদ বা পজিশন আসলে বন্ধ করে দিলেও কোনো সমস্যা নেই। আমি মনে করি, কাজের মাধ্যমেই আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করি এবং সার্থকতা খুঁজে পাই। কাজ করলে ভুল হবে বা শুদ্ধ হবে, কিন্তু কাজই যদি না থাকে তবে শুধু চাকরি করা আর বেতন নেওয়াটা সুখকর কিছু নয়। সরকারি সিস্টেমটা হয়তো এ রকমই, কিন্তু এটি এমন হওয়া উচিত ছিল না। তবে এই এক বছরে আমি দেখার সুযোগ পেয়েছি যে সরকারি ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে। এশিয়া পোস্ট: এই প্রেস মিনিস্টার পদে সাধারণত সাংবাদিকদেরই কেন নিয়োগ দেওয়া হয়? এর পেছনে কারণ কী বলে আপনি মনে করেন? আকবর হোসেন: যে কোনো কিছু যখন শুরু হয়, তার পেছনে একটি ভালো উদ্দেশ্য থাকে। সরকার সম্ভবত মনে করেছিল যে বাইরে থেকে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা সিস্টেমে আনা দরকার। সাংবাদিকরা যেহেতু গণমাধ্যম সামলাতে অভ্যস্ত, তাই তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে এটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা রাজনীতিতে জড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে এগুলো এক ধরনের পুরস্কার দেওয়ার বিষয়ে পরিণত হয়। আমার মতে, যারা মাঠপর্যায়ে ভালো সাংবাদিকতা করতে চান, তাদের এ ধরনের পদে না যাওয়াই ভালো। আমি নিজে না গেলে হয়তো এই বাস্তবতা বুঝতাম না। এশিয়া পোস্ট: সরকারের পদ পাওয়ার পর আপনি সাংবাদিকতা পেশা ছেড়েছিলেন। এটি কি আপনার দীর্ঘ পেশাজীবনকে কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে? আকবর হোসেন: অবশ্যই করেছে এবং আমি তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করি। আমি যদি আমার পেশাদার জীবনে কয়েকটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি, তবে এটি ছিল অন্যতম। এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি আপনি পদত্যাগ করেছেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার কারণে কি কোনো সংশয় থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? আকবর হোসেন: না, সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। এমনকি আমার সঙ্গে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তারা অনেকেই এখনও কাজ করছেন। আমি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক কারণে পদত্যাগ করেছি। আমি নিজে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি এবং তিনি তাতে সম্মতি দিয়েছেন। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এশিয়া পোস্ট: সমসাময়িক রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ বা অনুপ্রবেশকারী ইস্যু নিয়ে আপনি কথা বলেছেন। এটি আপনার কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো? আকবর হোসেন: আমি দেখলাম যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এটি নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, তাই আমি আমার একটি বিশ্লেষণ দিয়েছি। অতীতে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের পর থেকে যে কোনো সমালোচনাকেই ‘জামায়াত-শিবির’ বলে ট্যাগ দিত। একপর্যায়ে তারা নিজেদের দলের লোককেও সন্দেহ করতে শুরু করল। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিককে ছাত্রলীগের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল এবং তাকেও জামায়াত তকমা দেওয়া হয়েছিল। এই বিষয়টি আওয়ামী লীগকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল। এখন বিএনপি বা অন্য কেউ যদি একই ন্যারেটিভ দাঁড় করায় যে, যারাই সমালোচনা করছে তারাই ‘গুপ্ত’ বা অন্য দলের লোক, তবে এটি তাদের দলের জন্যই ক্ষতির কারণ হবে। বিএনপির তৃণমূল পর্যায়েও এখন অনেকে সমালোচনা করতে ভয় পাচ্ছে যে, তাকে আবার কোনো ট্যাগ দেওয়া হয় কি না। ক্ষমতায় আসার শুরুতেই এ ধরনের বিভেদ তৈরি করা দলের জন্য ভালো নয়। এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে, বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আকবর হোসেন: সমালোচনা হবে সীমাহীন। আপনি তথ্যযুক্তি দিয়ে আমার যত ইচ্ছা সমালোচনা করুন। কিন্তু আমাকে গালি দেওয়ার অধিকার আপনার নেই। সমালোচনা এবং অশ্লীলতাকে এক করে দেখা ঠিক নয়। আপনি যদি কাউকে নোংরা ভাষায় আক্রমণ করেন, তবে তার আইনি প্রতিকার চাওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে। শুধু সমালোচনার কারণে গ্রেপ্তার হওয়া আমি সমর্থন করি না। এশিয়া পোস্ট: রাজশাহীতে একজন শিক্ষিকা লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় একজন বিএনপি নেতার নাম জড়িয়েছে। ক্ষমতাসীনদের বেলায় এমনটা কেন দেখা যায়? আকবর হোসেন: রাজশাহীর ঘটনায় আমি বলেছি যে, একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার এবং দোষীদের শাস্তি হওয়া উচিত। আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন যে, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, স্থানীয় পর্যায়ের কিছু টাউটপ্রকৃতির মানুষ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তারা মনে করে সব অধিকার তাদের। এমনকি আপনি যদি নিজে ক্ষমতা চর্চা নাও করেন, আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার কারণে লোকে আপনাকে অনেক ক্ষমতাবান মনে করবে এবং আপনাকে নানা বিষয়ে জড়ানোর চেষ্টা করবে। এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকেই মূলত এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকারের কার্যক্রমকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? আকবর হোসেন: নির্বাচনের সময় আমি দেশে ছিলাম না, তবে আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যা বলছে, তাতে এই নির্বাচন নিয়ে জনমনে বড় কোনো প্রশ্ন নেই। এটি গ্রহণযোগ্য ছিল। আর সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করার জন্য দুই মাস খুব কম সময়। যে কোনো সরকারকে মূল্যায়ন করতে হলে অন্তত ছয় মাস সময় দেওয়া উচিত। এশিয়া পোস্ট: ‘জুলাই সনদ’ এবং গণভোট নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার পরিণতি কী হতে পারে? আকবর হোসেন: গণভোটে প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ সমর্থন দিয়েছে। আমি মনে করি, জনগণের রায়ের ওপর আর কোনো কথা থাকতে পারে না। বিএনপি যদি জনগণের এই রায়কে অবজ্ঞা করে, তবে তা হবে একটি রাজনৈতিক আত্মহত্যা। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকতে পারে, কিন্তু গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা তাদের জন্য ঠিক হবে না। বিএনপি একটি পরিপক্ব রাজনৈতিক দল এবং আমার ধারণা তারা এমন ভুল পথে হাঁটবে না। এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের আগামী দিনের রাজনীতি সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? আকবর হোসেন: আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা যতদিন ভারত থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, ততদিন বাংলাদেশে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি প্রবল ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ যদি ভারত থেকে না হয়ে অন্য কোনো দেশ থেকে কামব্যাক করার চেষ্টা করত, তবে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু ভারত থেকে কিছু করার চেষ্টা করলে মানুষ মনে করবে এটা ভারত করাচ্ছে। এশিয়া পোস্ট: জুলাই অভ্যুত্থানের সেই আবেগ কি এখনও মানুষের মধ্যে আছে? আকবর হোসেন: অভ্যুত্থানের আবেগ প্রতিদিন রাস্তায় দেখা যাবে না। এ ধরনের ঘটনা যুগে একবার ঘটে। এর মানে এই নয় যে মানুষ ভুলে গেছে। মানুষ যখন দেখবে তাদের অধিকার ঠিকমতো রক্ষিত হচ্ছে না, তখন তারা আবারও প্রতিক্রিয়া দেখাবে। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন সবার মধ্যে আসেনি। একটা গোষ্ঠী সবসময় ব্যবসার ধান্ধায় থাকে, আদর্শ তাদের কাছে বড় বিষয় নয়। তবে দেশের একটি বড় অংশ অবশ্যই পরিবর্তন চায়। এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কতটুকু ছিল এবং কতটুকু পূরণ হয়েছে? আকবর হোসেন: আমি এই সরকারের কোনো নীতিনির্ধারক ছিলাম না, আমি ছিলাম একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তা। তবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এই সরকার অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। পুলিশ বাহিনীকে সচল করার চেষ্টা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং একটি নির্বাচন আয়োজন করা তাদের কাজ ছিল। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে সফলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করাটাই তাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমি খুব বেশি প্রত্যাশা রাখি না, কারণ পরিবর্তন শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে না, জনগণের সচেতনতাও প্রয়োজন। শুধু চাই সরকার যেন সাধারণ মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়। এশিয়া পোস্ট: সংবাদমাধ্যমে ভুল তথ্য বা ডিস-ইনফরমেশন রোধে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি? আকবর হোসেন: যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুল তথ্য ছড়ায়, তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। তবে তাদের জেলে না পাঠিয়ে জরিমানা করা যেতে পারে। জরিমানার ব্যবস্থা থাকলে মানুষ সতর্ক হবে এবং এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবেও দেখা হবে না। বর্তমান সময়ে মূলধারার গণমাধ্যম এই ভুল তথ্যের কারণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাংবাদিকদের মনে রাখতে হবে, ‘প্রথম হওয়ার’ প্রতিযোগিতার চেয়ে ‘শুদ্ধ হওয়া’ বেশি জরুরি। তথ্য যেন নির্ভুল হয়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। এশিয়া পোস্ট: আগামী পাঁচ বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান? আকবর হোসেন: আমি সাংবাদিকতাই করব, এটাই আমার মূল পেশা। আমি নিজের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা করছি যেখানে আমি মূলধারার সাংবাদিকতা বজায় রাখব। আমি আমার সাংবাদিক পরিচয় নিয়ে মানুষের আস্থায় ফিরতে চাই। এশিয়া পোস্ট: চাপের মুখে সাংবাদিকতা করার বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী? আকবর হোসেন: এটি আপনার পেশাদার সততার ওপর নির্ভর করে। আপনার যদি অন্য কোনো স্বার্থের জায়গা থাকে, তবে আপনি চাপ মোকাবিলা করতে পারবেন না। নিজেকে শক্তিশালী এবং সৎ রাখতে পারলে যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। আমি আশা করি, বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন থেকে একটি মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারবে। তবে মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা কেউ উপহার হিসেবে দিয়ে যায় না, এটি কাজের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
হেফাজতের শহীদদের ইতিহাস থেকে মোছার ষড়যন্ত্র হয়েছে, কওমি স্বীকৃতি ছিল ধোঁকাবাজি
হেফাজতের শহীদদের ইতিহাস থেকে মোছার ষড়যন্ত্র হয়েছে, কওমি স্বীকৃতি ছিল ধোঁকাবাজি
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে রাতের অন্ধকারে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অংশ নেওয়া মুসল্লিদের ওপর হামলে পড়ে যৌথ বাহিনী। এতে ব্যাপক হতাহতের অভিযোগ ওঠে। সংগঠনটির তৎকালীন আমির শাহ আহমদ শফী দাবি করেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বাতি নিভিয়ে স্মরণকালের নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সাদাপোশাকের অস্ত্রধারীরা। ২০১৩ সালের ৫ মের বিভীষিকাময় সেই ঘটনা, হেফাজতের রাজনীতি, শাপলা চত্বরের শহীদদের তালিকা প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা এবং কওমি সনদের স্বীকৃতিসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ। এশিয়া পোস্ট : হেফাজতে ইসলাম দাবি করে তারা অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু এর দায়িত্বশীল অনেকেই কোনো না-কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সংগঠনের কর্মসূচি নেওয়া কি সম্ভব হয়? আজিজুল হক : আল্লামা শাহ আহমদ শফি ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের নেতৃত্বে একটি বৃহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি অরাজনৈতিক ছিল, আছে, থাকবে। রাজনৈতিক নেতারা এখানে আলেম হিসেবে যুক্ত আছেন। একজন নাগরিক যেমন মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি দলীয় দায়িত্ব পালন করেন, হেফাজতের নেতাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমন। ইসলামের মৌলিক বিষয়ে ইসলামবিদ্বেষী শক্তি চক্রান্ত করলে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সব আলেমের দায়িত্ব এর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা। এই জায়গা থেকে হেফাজতের সঙ্গে যেসব রাজনৈতিক নেতা আছেন, তারা রাজনৈতিক পরিচয়ে হেফাজতে আসেন না, আলেম হিসেবে আসেন। রাজনৈতিক প্রভাবে হেফাজত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে না।  এশিয়া পোস্ট : আল্লামা শাহ আহমদ শফি ও জুনায়েদ বাবুনগরী আমির থাকাকালে হেফাজতের যে প্রভাব ছিল, এখন তা নেই কেন? আজিজুল হক : তারা দুজনই বিখ্যাত আলেম। আল্লামা আহমদ শফি (রহ.) দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রামের মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা ও পরে মাদ্রাসা পরিচালনা করেছেন তিনি। তার লাখো ছাত্র ও অনুসারী আছে। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীও বিখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস ছিলেন। তার বাবাও বড় আলেম ছিলেন। সারা দেশে বাবা-ছেলের লাখো ছাত্র ও অনুসারী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এ দুজনের নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে আলেম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মানুষ পঙ্গপালের মতো হেফাজতের ব্যানারে ছুটে এসেছে। ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীও বিখ্যাত আলেম। দেশে হাদিস ও আধ্যাত্মিক চর্চায় তার পরিবারের অনেক অবদান রয়েছে। তবে আহমদ শফি ও জুনায়েদ বাবুনগরীর যে পরিচিতি, সেটা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেই। কিন্তু আলেম সমাজের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর তার নেতৃত্বে ৬৪ জেলায় হেফাজতকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেছি।  আল্লামা আহমদ শফি ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর সময় হেফাজত যেমন শক্ত অবস্থানে ছিল, এখনও সেই অবস্থান রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩ মে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করে এর প্রমাণ আমরা দিয়েছি।  এশিয়া পোস্ট : শাপলা চত্বরে হেফাজতের ৯৩ কর্মী শহীদ হয়েছেন বলে গত বছরের ৪ মে আপনারা তালিকা প্রকাশ করেছেন। এই তালিকা প্রকাশে ১২ বছর লাগল কেন? আজিজুল হক : শাপলা চত্বরের ঘটনার পর আওয়ামী ফ্যাসিবাদী জালিম গোষ্ঠী আলেমদের ওপর যে পরিমাণ নির্যাতন করেছে, তা বর্ণনাতীত। পুলিশ, র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়ে শহীদ পরিবারের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। শহীদদের অনেকের জানাজা পড়তে দেয়নি। এক মাদ্রাসা শিক্ষকের নিজ মাদ্রাসায়ও তার জানাজা পড়তে বাধা দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত এলাকাবাসী দা-বঁটি নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে ধানক্ষেতে তার জানাজা পড়েন। মরদেহ বাড়ি যাওয়ার আগে র‌্যাব-পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করে রাখে। জানাজা শেষে পরিবারের মাত্র চারজন সদস্য তাকে দাফনের সুযোগ পান।   শাপলা চত্বরের শহীদদের তালিকা করতে তদন্ত কমিটি গঠন করলে আমাদের লোকজনকে তুলে নিয়ে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। শহীদদের তালিকা যেন না হয়, তাদের কথা যেন জাতি জানতে না পারে, তাদের যেন ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টা চালিয়েছে তৎকালীন আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার। এমনকি একজনও শহীদ হয়নি বলে ঘোষণা দেয় তারা। আমাদের শতভাগ চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও সরকারের চাপের কারণে তালিকা করতে পারিনি। ৫ আগস্টের পর প্রকাশ করেছি।  এশিয়া পোস্ট : হেফাজতের শহীদদের তালিকা করার কারণে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তৎকালীন সম্পাদক আদিলুর রহমান খান (পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা) ও পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলানকে কারাভোগ করতে হয়েছে। তারা তালিকা করতে পেরেছিলেন, কিন্তু এত নেতাকর্মী থাকার পরও আপনারা কেন পারেননি? আজিজুল হক : অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। তালিকা করায় আদিল ভাই ও এলান ভাইকে সরকার গ্রেপ্তার করে সাজা দিয়েছে। একটা আন্তর্জাতিক সংস্থার দায়িত্বশীলদের যদি এভাবে সাজা দিতে পারে, সেখানে হেফাজতের দায়িত্বশীলদের তো আন্তর্জাতিক লবিং নেই। আমরা নিরীহ আলেম সমাজ। ফ্যাসিবাদী শক্তিকে মোকাবিলার শক্তি ও সাহস নেই আমাদের। শহীদদের পক্ষে কথা বলায় আমাদের বিরুদ্ধে ৩৫০টির মতো মামলা হয়েছে। এসব মামলায় হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। সরকারের বহুমুখী চাপের কারণে তালিকা করতে পারেনি। এশিয়া পোস্ট : শুধু কি ৯৩ জনই শহীদ হয়েছেন? আজিজুল হক : ৯৩ জন নয়, আরও বেশি হবে। অনেক পরিবার এখনও ভয়ে শহীদদের কথা বলতে চান না। তাদের শঙ্কা, আওয়ামী লীগ আবারও ফিরতে পারলে ফের জুলুমের শিকার হতে হবে তাদের। মিডিয়ায় এসেছে, ২০১৩ সালের ৫ মে জুরাইন কবরস্থানে অনেক বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ীতে ময়লার স্তূপে মানুষের হাড় পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মিডিয়া, মানবধিকার সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, এগুলো হেফাজতের সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের লাশ। বিশেষ করে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম ওই মাসে প্রায় ৫০০ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। এগুলো তো দাফন হয়ে গেছে। পরিবারও জানে না এগুলো কার লাশ। আমরা চেষ্টা করছি তালিকা আরও সমৃদ্ধ করতে।  এশিয়া পোস্ট : কত জন শহীদ হয়েছেন বলে মনে করেন? আজিজুল হক : শহীদদের তালিকা দীর্ঘ হবে। এর সঠিক হিসাব নির্ণয় না করে বলা সম্ভব নয়। এশিয়া পোস্ট : অভিযোগ আছে, শাপলা চত্বরে শহীদদের জন্য বিগত ১২ বছর বিচার চায়নি হেফাজতে ইসলাম। শহীদদের পরিবারের পাশেও দাঁড়ায়নি। এর কারণ কী? আজিজুল হক : কেউ যদি বলে হেফাজত শহীদদের পাশে দাঁড়ায়নি, সেটা ভুল হবে। হেফাজত তার শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী ২০১৩ সালেই শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বিভিন্ন জেলায় টিম গিয়ে সহযোগিতা করেছে। প্রত্যেক পরিবার কম-বেশি হেফাজতের সহযোগিতা পেয়েছে। কোনো পরিবারকে একাধিকবার সহযোগিতা করা হয়েছে। কাউকে ঘর দেওয়া হয়েছে। কারও মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একজন শহীদের নামে মাদ্রাসা করা হয়েছে। তাদের সহযোগিতা করেনি, এটা মিথ্যা প্রচারণা। এশিয়া পোস্ট : ১২ বছর বিচার চেয়েছিলেন? আজিজুল হক : আমরা শতবার সংবাদ সম্মেলন ও মিছিল করে বিচার চেয়েছি। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার; যারা হত্যা করেছে, তারা কি বিচার করবে? জালিমরা তো করবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরপরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হেফাজতের পক্ষে আমি বাদী হয়ে অভিযোগ করেছি। এই মামলায় তৎকালীন সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, মন্ত্রী-এমপিরা জেলে আছেন। বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাক্ষী সংগ্রহ করা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জালিমদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারব। এশিয়া পোস্ট : যে আওয়ামী লীগ সরকার হেফাজত কর্মীদের শহীদ করল, সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে আপনারা শোকরানা মাহফিল করে সম্মান দিলেন। অথচ তখনও হেফাজতের শহীদদের তালিকা করা যায়নি, বিচারও হয়নি। এটা কি হেফাজতের শহীদদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা নয়? আজিজুল হক : এ বিষয়ে জাতির কাছে একটা ভুল বার্তা আছে। হেফাজত একটা আলাদা সংগঠন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড আলাদা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ থাকাটা স্বাভাবিক। শাপলা চত্বরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক থাকতে পারে না। আল্লামা আহমদ শফি তখন হেফাজতের আমির, তখন আবার তিনি কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড আল-হাইয়াতুল উলয়ারও চেয়ারম্যান। শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসকে মুছে দেওয়া ও আলেমদের নিয়ন্ত্রণের কুমতলবে সরকার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই দাবি হেফাজতের ছিল না, এটা কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের দাবি ছিল। সরকার স্বীকৃতি দিয়ে একটা রাজনৈতিক ডিগবাজি খেলেছে। এই স্বীকৃতি একটা কলাপাতা, কোনো মূল্য নেই। স্বীকৃতি দিয়ে ছাত্ররা কিছু করতে পারে না, এটা ধোঁকাবাজি। শোকরানা মাহফিলের আয়োজক ছিল সরকার। সে মাহফিলে খুনি হাসিনার সামরিক সচিব মিয়া মো. জয়নাল আবেদিন দাঁড়িয়ে শাপলা চত্বরের গণহত্যাকে অস্বীকার করলেন। হেফাজতের পক্ষ থেকে তৎকালীন মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী শোকরানা মাহফিলে অংশ নেননি। সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আমিও অংশ নিইনি। বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক আলেম সেখানে ছিলেন না। আমরা জোরালো প্রতিবাদ করে হাসিনার সামরিক সচিবের ওই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। শোকরানা মাহফিলে হেফাজতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আহমদ শফি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন, হেফাজতের আমির হিসেবে নন।  এশিয়া পোস্ট : আপনি বললেন, সনদ দিয়ে ডিগবাজি খেলা হয়েছে এবং শহীদদের রক্তকে মুছে দিতে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এসব জেনেও কেন স্বীকৃতি নিলেন? আজিজুল হক : এটা একান্ত আমার মতামত। সরকারের এই কূটচাল বোঝা সহজ-সরল আলেমদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা স্বীকৃতির নামে আলেম সমাজকে দমিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র করেছে। এশিয়া পোস্ট : ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আয়োজিত শোকরানা মাহফিলে শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেখানে আহমদ শফি (রহ.) থেকে শুরু করে হেফাজতের প্রায় সব বড় নেতা ছিলেন। আপনারা কি তাকে ‘কওমি জননী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন? আজিজুল হক : হেফাজতের নেতাদের ওপর যে আওয়ামী লীগ গণহত্যা চালাল, সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে হেফাজতের পক্ষ থেকে কওমি জননী উপাধি দেওয়া অবাস্তব কথা। হেফাজত তাকে এমন উপাধি দেয়নি। গওহরডাঙ্গা বোর্ডের চেয়ারম্যান মাওলানা রুহুল আমিন, তার বাড়ি গোপালগঞ্জ। তিনি শেখ হাসিনার গৃহপালিত ব্যক্তি। তিনি তার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছেন। হেফাজত বা হেফাজতের নেতারা দেননি। তার সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক নেই, তার সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক। তিনি হাসিনাকে তুষ্ট করতে এ উপাধি দিয়েছেন। এশিয়া পোস্ট : ওই মঞ্চে থাকা হেফাজত নেতারা বা বোর্ড পরে এর প্রতিবাদ করেনি। সংবাদ সম্মেলন করে কি হেফাজত বলেছিল বা কওমি মাদ্রাসার পক্ষে আপনারা বলেছিলেন কি যে আমরা তাকে কওমি জননী উপাধি দিইনি, এটা মাওলানা রুহুল আমিনের ব্যক্তিগত বিষয়? আজিজুল হক : উপস্থিত ব্যক্তিরা কেন প্রতিবাদ করেননি, সেটি তাদের ব্যাপার। জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)-এর পক্ষে আমি বিবৃতি দিয়ে সেটা প্রত্যাখ্যান করেছি। এ উপাধি হেফাজত দেয়নি, জাতিকে জানিয়েছি আমরা। এশিয়া পোস্ট : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আজিজুল হক : আপনাদেরও ধন্যবাদ।
ছাত্রদের কারণেই নতুন জীবন পেয়েছি : ইসহাক সরকার
ছাত্রদের কারণেই নতুন জীবন পেয়েছি : ইসহাক সরকার
জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার। যুবদল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর সম্প্রতি এনসিপিতে যোগ দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৩৬৬টি রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছেন। তিনি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। কথা বলেছেন দলবদল, রাজনীতি ও সমসাময়িক বিভিন্ন প্রসঙ্গে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর। এশিয়া পোস্ট : গত কয়েক দিন আগেও আপনি বিএনপির ইসহাক সরকার নামে পরিচিত ছিলেন। এখন এনসিপির ইসহাক সরকার। এই দুই দলের ইসহাক সরকার—কেমন লাগছে, অনুভূতি কেমন? ইসহাক সরকার : খুব ভালো লাগছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো পথচলা এবং নতুন করে আবার শুরু করা—দুইটার মধ্যে অনেক ভিন্নতা আছে। যেহেতু দীর্ঘদিন একসঙ্গে পথ চলেছি, আবার নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। এশিয়া পোস্ট : আপনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন, যুবদলেও ছিলেন একই পদে। আপনার রাজনীতি শুরু করেছেন ছাত্রজীবনে। শুরুর গল্পটা কেমন ছিল? ইসহাক সরকার : প্রথমে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অল্প অল্প করে রাজনীতির ময়দানে আসা শুরু করি। আমার এলাকার এক বড় ভাই ছিলেন, বর্তমানে সাংবাদিক মমিন ভাই। উনার হাত ধরে তৎকালীন ৩৫নং ওয়ার্ড, তৎকালীন ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। প্রথম যখন রাজনীতিতে আসি—মিছিল, মিটিং, সভা, সমাবেশ খুব একটা ভালো লাগত না। আমরা বিএনপির পার্টি অফিসের সামনে এসে বসে পড়তাম, সেখানে নেতারা বক্তব্য রাখতেন। আমরা মাটিতে বসে বক্তব্য শুনতাম। অনেক সময় ডানে-বামে তাকিয়ে দেখতাম যে নেতা আছেন কি না। না থাকলে পেছন থেকে পালিয়ে চলে যেতাম। এভাবে অনেক দিন করার পর আস্তে আস্তে আবার কেন জানি আকর্ষিত হয়ে যাই। আকর্ষণ হওয়ার পর থেকেই পথচলা শুরু। এরপরে আপনার ’৯১-তে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল, এরপর ’৯৬ পর্যন্ত ছিল। ’৯৬ থেকে যখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে চলে গেল বিএনপি, ঠিক তখন থেকেই আমার সক্রিয় রাজনীতিতে একেবারে পথচলা শুরু। এশিয়া পোস্ট : আপনার রাজনীতিতে উত্থান নিয়ে প্রায়ই নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর নাম বলেন। ছাত্রদল বা যুবদলে পদপদবি কি তার কারণেই পেয়েছেন? ইসহাক সরকার : আমরা কঠোর পরিশ্রম করে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এসেছি। তখনও ১০৭টি মিথ্যা মামলায় আমাকে জড়ানো হলো। পুরান ঢাকা মানে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ এবং এর বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। তখন আমাদের পিন্টু ভাই, সাদেক হোসেন খোকা ভাই ছিলেন ওই এলাকার দায়িত্বে। যে কারণে আমরা ব্যাপক ও তীব্র আন্দোলন করতাম। তো আমরা আন্দোলন করেই দায়িত্বে এসেছি। আমরা কোনো ভাইয়ের কারণে আন্দোলনে বা আমাদের দায়িত্বে আসিনি, পদ-পদবিতে আসিনি। আমার বিরুদ্ধে ৯৮ থেকে মামলা শুরু হলো। ৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে ১০৭টি মিথ্যা মামলা করা হলো। আমার পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও একই পরিমাণে মামলা দেওয়া হলো। যখন গ্রেপ্তার হলাম, আমার ছোট ভাই থানাহাজতে খাবার দিতে গেল। তার বয়স ১২ কিংবা ১৩ হবে, হাফেজি পড়ে। তখন কোতোয়ালির ওসি ছিল মনোয়ার হোসেন। স্পষ্ট মনে আছে, মনোয়ার সাহেব যখন রুম থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন আমাকে খাবার দিচ্ছে। তিনি আমার ভাইকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, ‘এই, এটা কে?’ বললাম, ‘মনোয়ার ভাই, আমার ছোট ভাই, খাবার দিতে আসছে।’ মনোয়ার সাহেব বললেন, ‘এই সেন্ট্রি, ওকে অ্যারেস্ট করো। ওকেও ধরো।’ ওকে ধরে আমার সামনে মনোয়ার সাহেব বেদম প্রহার করলেন। আমি তখন লকআপ ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ‘মনোয়ার ভাই, আমার ছোট ভাই তো রাজনীতি করে না। ওকে এভাবে নির্যাতন করছেন? ও তো এগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখে না। আমাকে খাবার দিতে আসছে। ওকে মারবেন না। ওর জীবনটা নষ্ট করে দেবেন না। ও ভয় পেয়ে যাবে।’ কোনো কথাই শুনলেন না। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, সন্ধ্যার পরে ছেড়ে দেব।’ এই কথা বলার পরও তার বিরুদ্ধে প্রায় ১৪টি মামলা করল। আমার বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে ১৫২টি মিথ্যা মামলা করা হলো। তো পরিবারের ওপর টার্গেট করেই একের পর এক মামলা দেওয়া হলো। যেহেতু পুরান ঢাকা আন্দোলনের ক্ষেত্র, আন্দোলনের জায়গা, সেই হিসেবে আমাদের এই মামলাগুলো দেওয়া হতো। প্রতিদিন হরতাল হওয়ামাত্রই আমি থাকি বা না থাকি, আমার বিরুদ্ধে পাঁচটি, সাতটি, ১০টি মামলা দিত। এশিয়া পোস্ট : নিজের রাজনীতির কারণে পরিবারকে এ রকম বেগ পোহাতে হচ্ছে, তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, বিড়ম্বনায় পড়ে যাচ্ছে। নিজেকে কখনো অপরাধী মনে হয়? ইসহাক সরকার : নিজেকে কখনো অপরাধী মনে হয়নি। কারণ, আমার পরিবারের পক্ষ থেকে আমাকে সমর্থন ছিল এবং ভালোবাসাও ছিল। আমার মা-বাবা বৃদ্ধ ছিলেন। আমি যখন ’৯৮ সালে গ্রেপ্তার হলাম, দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর একটানা কারাগারে ছিলাম। কারাগারে থাকা অবস্থায় বাবার মৃত্যুসংবাদ পাই। কারাগারে থাকা অবস্থায় আমাকে যখন প্যারোলে মুক্তির ব্যবস্থা করা হলো, আদালত প্রথমে নাকচ করে দিয়েছেন। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। আমাদের পিন্টু ভাই ম্যাডামের পারমিশন নিয়ে নাসিম সাহেবের সঙ্গে কথা বলেন। তখন আমাকে দুই ঘণ্টার জন্য প্যারোলে নিয়ে আসেন। এশিয়া পোস্ট : আপনার ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং মুহূর্ত কোনটা ছিল? ইসহাক সরকার : আমার পুরো সময়টাই চ্যালেঞ্জিং ছিল। ’৯৮ সাল থেকে জেল খাটা শুরু করলাম, এক দিনের জন্য স্বস্তি পাইনি। জেলখানা থেকে বের হয়ে আসার পরও যখনই জামিনে বের হতাম, আবার আমাকে জেলগেট থেকে গ্রেপ্তার করা হতো। প্রায় আটবার গ্রেপ্তার করেছিল জেলগেট থেকে। আমি জামিনে মুক্ত, হাইকোর্ট মুক্তির অর্ডার দিয়েছেন—‘নট টু অ্যারেস্ট, নট টু হ্যারাস’। মানে তাকে অ্যারেস্টও করা যাবে না, হ্যারাসমেন্টও করা যাবে না। এরপরও আমাকে কারাফটক থেকে প্রায় যতবার জামিন নিয়ে বের হই, ততবারই গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পুরো জীবনটা এভাবেই কেটেছে। বিশেষ করে আমি সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করেছি ৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত। পুরান ঢাকার নয়াবাজার ও বংশাল এলাকায় যখন আন্দোলন করি, তখন আমার সাতজন বন্ধু পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল। আর সবচেয়ে বেশি খারাপ সময় গেছে কিছুদিন আগে, যখন ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা জুলুমের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তখন আমাদের ওপর হুলিয়া এসে পড়ল। আমার বিরুদ্ধে ৩৬৬টি মিথ্যা মামলা করা হলো। আমার পরিবারের বিরুদ্ধে শতাধিক মিথ্যা মামলা হলো। ছোট ভাই, বড় ভাই—সবাই আক্রান্ত হলো। আমি যখন কারাগারে, তখন বাসার সুয়ারেজ লাইন কেটে দিল, বাসার বিদ্যুতের লাইন কেটে দিল। মানে একটা পরিবারের ওপর যত রকম হামলা করা যায়। শেষে আমার দুইটা ছোট বাচ্চার ওপরও মামলা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হলো। আমাকে গুম করে ফেলার চেষ্টা করা হলো। আন্দোলন করতে গিয়ে আমার নিজের হাতে গড়া সাত সহযোদ্ধা—তার মধ্যে আমার আপন ভাতিজাও আছে—তাদের ২০১৩ সালে গুম করে ফেলেছিল। আজও তাদের কোনো খোঁজ পাইনি। সবচেয়ে খারাপ লাগার মুহূর্ত ছিল যখন আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। আমাকে পার্টি থেকে বলা হয়েছিল প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। এশিয়া পোস্ট : রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে খারাপ লাগা বা হতাশার কোনো ঘটনা আছে কি না? ইসহাক সরকার : এবার আমি যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি, তখন একটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। আমাদের ওই এলাকার পাঁচজন প্রার্থী একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে আমরা বিদ্রোহ করি। বিদ্রোহ করার পর আমাদের দাবি ছিল যে আমাদের মধ্য থেকে এই এলাকার স্থানীয় যারা আছেন, তাদের মধ্য থেকেই আপনি যাকেই মনে হয় তাকেই মনোনয়ন দেবেন। আমরা এখানে সবাই নির্যাতিত পরিবার। যেমন আলহাজ নাসিরুদ্দিন আহমেদ পিন্টু ভাইয়ের পরিবার, মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ ভাইয়ের পরিবার, যিনি মৃত্যুঞ্জয়ী জননেতা, মীর মোশারফ হোসেন খোকন ভাই, উনিও নির্যাতিত এবং বারবার নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, মনির চেয়ারম্যান, যিনি মৃত্যুঞ্জয়ী; যাকে আটটি গুলি করা হয়েছিল পার্টির কারণে—উনিও ছিলেন একজন প্রার্থী। আমরা পাঁচজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে পার্টিকে বললাম যে অন্তত আমাদের মধ্য থেকেই যে কাউকে নমিনেশন দেন। কিন্তু পার্টি সেটার ব্যাপারে কোনো কর্ণপাত করেনি। বহিরাগত একজনকে এনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছিল। একে একে সবাইকে পার্টি ডেকে নিয়ে আলাদাভাবে কথা বলে বসিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু একমাত্র আমি ডাক পাইনি। কেন পাইনি, আমি সেটা আজও জানি না বা আমাকে কেন ডাকা হলো না, সেটা বুঝতে পারিনি। তখন খুব খারাপ লেগেছিল। পরে তো আমাকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করে দেয়। কোনো ধরনের চিঠি বা কোনো ধরনের শোকজ বা কোনো কিছু জানানো হয়নি। আমি অনলাইন, টিভি ও সংবাদের মাধ্যমে জানতে পারি যে আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তখন জীবনের ৩০ বছরের দুঃখ-কষ্ট সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছিলাম। সেদিন ভেবেছিলাম, এই পার্টির জন্য এত কষ্ট করলাম, জীবন-যৌবন বিসর্জন দিলাম, পার্টি অন্তত একটিবারের জন্যও আমাকে ডাকতে পারত। আমাকে বললে হয়তো বসে যেতাম। আমি পার্টির আনুগত্যের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল ছিলাম। কারণ, এই পার্টিকে আমি বুকে ধারণ ও লালন করেছি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে আমি অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি। উনি আমাকে স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন এবং সন্তানের মতো আদর করতেন। সেই পার্টির বিরুদ্ধে যাব—এটা আমি কোনো দিনই কল্পনা করতে পারিনি। সেদিনই আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময় গেছে। আমাকে বহিষ্কার করার পর অঝোরে কান্না করেছিলাম। এশিয়া পোস্ট : এবার ভালোটা জানতে চাই। সবচেয়ে ভালো লাগার মুহূর্ত কোনটা ছিল? ইসহাক সরকার : ভালো লাগার মুহূর্তগুলো ছিল, যখন ম্যাডাম খুব কাছ থেকে আদর করতেন। আমি এক দিন ম্যাডামের কাছে হাজির হলাম, ম্যাডাম ট্রিটমেন্টের জন্য হাসপাতালে যাবেন। আমরা তার গুলশানের বাসায় উপস্থিত হলাম। একে একে সবাই দাঁড়িয়ে সালাম বিনিময় করছি। ঠিক ওই মুহূর্তে আমাদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. জেড এম জাহিদ খান বলছেন, ‘ম্যাডাম আসছে।’ ম্যাডাম দেখে বললেন, ‘ইসহাক না? ইসহাক সরকার? ইসহাক সরকার আসছে, ওকে আমি অনেক পছন্দ করি। ওর জীবনের সব অর্জন ও কষ্ট আমি নিজের চোখে দেখেছি। ওকে তোমরা দেখে রাখবা।’ আমার নামেই তিনি চিনতেন আমাকে। শুধু তা-ই নয়, আমি যখন ছোট ইসহাক সরকার, আমার বয়স তখন ২০ বছর—তখন প্রতিটা প্রোগ্রামে ম্যাডাম বক্তব্যের মাঝখানে আমার নাম বলে বলতেন যে ‘ইসহাক সরকার ছোট্ট একটা ছেলে, তার বিরুদ্ধে শতাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়েছে।’ প্রতিটা স্টেজ প্রোগ্রামে ম্যাডাম আমার কথা বলতেন। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এশিয়া পোস্ট : এই ৩০ বছর আপনি বিএনপিতে পার করেছেন—বিএনপির ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠন—সব মিলিয়ে কী পেলেন বিনিময়ে? ইসহাক সরকার : মানুষের ভালোবাসা। সারা দেশের তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের যে ভালোবাসা পেয়েছি, এটা কোনো পদ-পদবি বা অন্য কিছু দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। আমি ইসহাক সরকার সারা জীবন সততা নিয়ে রাজনীতি করেছি। কেউ বলতে পারবে না ইসহাক সরকারের আচরণে কষ্ট পেয়েছে। এরপরও মানুষমাত্রই ভুল হতেই পারে, কিন্তু জানামতে আমি কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলিনি বা কারও ওপরে জুলুম করিনি, অত্যাচার করিনি অথবা একজন নেতা হিসেবে কারও প্রতি অন্যায় কোনো কিছু চাপিয়ে দিয়েছি ইনশাআল্লাহ এটা কেউ বলতে পারবে না। এই যে মানুষের যে ভালোবাসা, এটা কোনো কিছুর বিনিময়ে পাওয়া সম্ভব নয়। আমি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, জনগণের ভালোবাসা পেয়েছি এবং নেতাকর্মীদের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছি—এটাই আমাকে এত দূর নিয়ে এসেছে। আজ আপনি আমাকে এখানে ডেকেছেন। আমি যদি একজন সাধারণ নেতা বা কর্মী হতাম, হয়তো ডাকতেন না। অসাধারণ কিছুটা হয়তো হয়েছি জনগণের ভালোবাসায়, যার কারণে আজ আমাকে এখানে ডেকেছেন। এশিয়া পোস্ট : বিএনপি থেকে ঠিক আছে আপনি অভিমান করেছেন বা আপনাকে রাখা হয়নি। আপনার কাছে কেন উপযুক্ত মনে হলো এনসিপিকে? ইসহাক সরকার : ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও গণবিপ্লবের মধ্য দিয়েই ৫ তারিখের ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে। আমি উপযুক্ত এই কারণে মনে করছি যে ছাত্ররাই কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং আমি সে সময় ছাত্রদের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের পতনের ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছিল যে আমরা ১৭ বছর যে কাজটি করতে পারিনি, তারা সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। আমার দলের সব নেতাকর্মী যার যার অবস্থান থেকে নেমে পড়েছিল, কিন্তু নেতৃত্বের মূল জায়গাটাই ছিল এই ছাত্ররা। ৩৬৬টি মামলার মধ্যে মাত্র পাঁচটি মামলায় আমাকে ২২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আমার উপলব্ধি হলো, এই ছাত্রদের কারণেই আমি পুনরায় নতুন জীবন ফিরে পেলাম। তাদের কারণেই আমাকে হয়তো ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হলো না। তাদের কারণেই আমরা গণতন্ত্র ফিরে পেলাম এবং আমাদের অধিকার ও মানবাধিকার ফিরে পেলাম। এখন আমার মনে হলো এই ছাত্রদের দিয়েই আমাদের দেশের আমূল পরিবর্তন সম্ভব। এই ছাত্রনেতারা যোগ্য ও মেধাবী এবং তারা যে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে, সেটা আমরা আরও অনেক চেষ্টা করলে হয়তো পেরে উঠতাম না। কারণ, আমরা সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে শত শত মিথ্যা মামলা ছিল। আমাদের সিনিয়র নেতাদের জুডিশিয়ারি কিলিং করা হচ্ছিল। কারাগারে পিন্টু ভাইকে হত্যা করা হলো এবং বেছে বেছে চৌধুরী আলমকে গুম করা হলো। এভাবে নেতাকর্মীদের যেভাবে ফ্যাসিবাদের ষড়যন্ত্রে হত্যা ও গুম-খুনের শিকার হতে হচ্ছিল, তাতে আমরা সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আজ আল্লাহর বিশেষ দয়ায় এই ছাত্রদের কারণে আবার প্রাণশক্তি ফিরে পেয়েছি। এশিয়া পোস্ট : জুলাই আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন ব্যক্তিকে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উপস্থাপন করে। আপনার দৃষ্টিতে কাকে মাস্টারমাইন্ড মনে করেন? ইসহাক সরকার : আমি মাস্টারমাইন্ড মনে করি যারা ব্যক্তিগতভাবে রাজপথে নেমে আসছিল, তারাই মাস্টারমাইন্ড। এখানে কেউ বলতে পারবে না যে এককভাবে এই কৃতিত্ব কারও ব্যক্তিগত। আপনি হাসনাত বলেন, সারজিস বলেন বা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন—যাদের কথাই বলেন, কেউ এটার একক মাস্টারমাইন্ড নয়। আমি মনে করি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। এটা কেউ যদি বলে যে, অমুক ব্যক্তি মাস্টারমাইন্ড বা অমুক বিদেশ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে—আমি এটাকে বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি যে এটা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আপনি যখন একজন সাংবাদিক এবং আপনি যখন দেখবেন যে আপনার সন্তান বাহিরে আন্দোলন করতে নেমে গেছে, আপনি বাবা হিসেবে ঘরে বসে থাকতে পারতেন? আমাদের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। আমরা যখন দেখেছি আমাদের সন্তানরা রাজপথে নেমে এসেছে এবং আমাদের কোমলমতি ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছে, তখন সবাই যার যার অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছি। এখানে কেউ আলাদা মাস্টারমাইন্ড নয়। আর যদি আমরা কোনো বিশেষ মাস্টারমাইন্ডের কথা মনে করতাম, তাহলে এই ছাত্র-জনতা ও আপামর জনগণ রাস্তায় নেমে আসত না। এশিয়া পোস্ট : আপনি বলেছেন যে পুরান ঢাকায় আপনার জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থন আছে। যদি এত জনসমর্থন থাকে, তাহলে গত নির্বাচনে আপনি প্রার্থী হয়েছেন, আপনার ভোটের পরিমাণ তুলনামূলক কম। এটা কেন হয়েছে? ইসহাক সরকার : আপনারা তো জানেন নির্বাচনটা কেমন হয়েছে। আমার কাছে তো মনে হয় ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। তিন ঘণ্টা ভোটকেন্দ্রের সামনে যেতে দেয়নি। গণনা করার সময় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমার পোলিং এজেন্ট যারা ছিল, তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে এবং সকালে যারা ঢোকার চেষ্টা করেছিল, তাদের অনেককে বের করে দিয়েছে। সেখানে আমার কাছে মনেই হলো যে ইলেকশনটা ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। কারণ কী? ওখানে ঘোষণা শুনতে পেলাম যে জামায়াতের প্রার্থী পাস করেছে, কিন্তু তিন ঘণ্টা পর ভোরে আবার শুনলাম যে না, বিএনপির প্রার্থী পাস করেছে। তো কে পাস করেছে বা কে ফেল করেছে সেটা বিষয় না। আমি দুই দিনে ৬০০০ গণস্বাক্ষর নিয়েছিলাম। আমি যেহেতু স্বতন্ত্র থেকে দাঁড়িয়েছিলাম, তাই বিধান অনুযায়ী ৬০০০ লোকের সমর্থন থাকা দরকার। আমি সেই স্বাক্ষর দিয়েছি। তো ওই ৬০০০ পরিবার গেল কোথায়? আমাকে তো এত কম ভোট পাওয়ার কথা না। কাজেই আমার কাছে মনে হয়েছে নির্বাচনটা একটু ব্যতিক্রম হয়েছে এবং রেজাল্ট শিটে অনেক পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি। এশিয়া পোস্ট : আপনি এনসিপিকে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আপনাকে দলে পেয়ে এনসিপির কী লাভ হলো? ইসহাক সরকার : এনসিপি কী পেয়েছে না পেয়েছে, সেটা তো আমি জানি না। উনারা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, এতটুকুই বুঝি। পুরান ঢাকায় আমাদের সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা আমি পালন করব। এনসিপির কী লাভ হয়েছে, তা এনসিপিই ভালো বলতে পারবে। কিন্তু আমি মনে করি আমার লাভ হয়েছে। আমি যদি দুই বছর ঘরে বসে থাকতাম, তাহলে রাজনীতির ময়দান থেকে হারিয়ে যেতাম। আর এনসিপিতে ঢুকেছি বিধায় আপনারাই আমাকে স্টুডিওতে ডেকেছেন। যদি প্রবেশ না করতাম, তাহলে হয়তো ডাকতেন না এবং আমার খোঁজও নিতেন না। এশিয়া পোস্ট : আপনার বেশ কয়েকটি বক্তব্য এখন আলোচনায়। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, সেখানে এখন পকেট কমিটি দেওয়া হয় বা সুবিধাবাদীদের পদ দেওয়া হয়। আপনার কাছে এ রকম কেন মনে হয়? ইসহাক সরকার : দেখুন, এটি তো একটা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলে। পদ-পদবি ও নেতৃত্ব তো ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয় না। বিএনপির মতো বা আওয়ামী লীগের মতো দলগুলোতে সংগঠন শক্তিশালী করার নামে একবার ছাত্রদলের নেতা নির্বাচন হয়েছিল, কিন্তু সেটাও ছিল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এবং ওগুলো ছিল একটা আইওয়াশ মাত্র। আমার কাছে মনে হয় যে এই কাজগুলো যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয়, তাহলে যোগ্য ও নির্যাতিত যারা জনগণের ভালোবাসা অর্জন করতে পারে, তারাই নেতৃত্বে আসতে পারবে। অন্যথায় এভাবে চলতে থাকলে বড় সংগঠনগুলো নেতৃত্ব-সংকটে পড়বে। এশিয়া পোস্ট : জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের অবস্থান এবং সংসদের ভেতরে ও বাইরের বিতর্ক নিয়ে কী বলবেন? ইসহাক সরকার : জুলাই সনদ নিয়ে প্রতিটা রাজনৈতিক দল ঐকমত্যে পৌঁছেছিল এবং সেই ভিত্তিতেই ১২ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সবাই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু হঠাৎ বিএনপির কী এমন হয়ে গেল যে তারা জুলাই সনদ থেকে দূরে সরে এল? কয়েক দিন আগেও প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন জুলাইয়ের প্রতিটা সনদ মানা হবে, কিন্তু আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন যে কেন আমরা মানব? তখন নির্বাচনের স্বার্থে বলেছিলাম। এই যে কনট্রাডিকশন, এটা জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার নামান্তর। যদি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়, তবে জনগণ গণভোটের দাবিতে আবার রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে। এশিয়া পোস্ট : বিএনপি থেকে এনসিপিতে আসায় পুরান ঢাকার রাজনৈতিক মেরুকরণে কি কোনো প্রভাব পড়েছে? ইসহাক সরকার : কিছুটা প্রভাব পড়েছে। সাধারণ জনগণ যারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন, তাদের সমর্থন আমি পেয়েছি। আমার মতো সবাই তো এই সময়ে ঝুঁকি নেবে না। যারা ঝুঁকি নেওয়ার তারা নিয়েছে এবং সাধারণ জনগণের একটি বৃহৎ অংশ আমাকে সমর্থন জুগিয়েছে। আমি রাস্তায় বের হলে তারা আমাকে অভিনন্দন জানায় যে আমি ভালো কাজ করেছি। তাই আমি মনে করি সাধারণ মানুষ আমার সঙ্গে আছে। এশিয়া পোস্ট : এবার যেহেতু আপনি নির্বাচন করেছেন এবং স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করেছেন, আগামী দিনে এনসিপির সঙ্গে আসন বা মনোনয়ন নিয়ে কি কোনো কথা হয়েছে? ইসহাক সরকার : এখনো ও রকম কোনো কথা হয়নি। আমি আগেও বলেছি যে এমপি বা মন্ত্রী হওয়া আমার মুখ্য বিষয় নয়, আমি জনগণের সেবা করতে চাই। ভাগ্য যখন যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই কাজ করব। আমি পাস করলে হয়তো এখন সংসদে থাকতাম। তবে প্রত্যেক রাজনৈতিক কর্মীর একটা লক্ষ্য থাকে এবং আমি আগামীতে ঢাকা-৭ আসন থেকে এনসিপির হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এশিয়া পোস্ট : আগামী পাঁচ বছরে ইসহাক সরকার নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে বা দলের কোন অবস্থানে দেখতে চান? ইসহাক সরকার : দল আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, তার মাধ্যমে আমি সংগঠনকে শক্তিশালী করব। সংগঠন দুর্বল থাকলে রাজনৈতিক দল টিকে থাকতে পারে না। তাই আমার প্রধান লক্ষ্য হলো দলকে শক্তিশালী করা। তৃণমূল পর্যায় থেকে এনসিপিকে শক্তিশালী করার জন্য আমি আমার সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাব। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ থেকে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নির্বাচন করবেন এবং সেখানে একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে আমি মনে করি। এশিয়া পোস্ট : নতুন যারা রাজনীতিতে আসতে চায়, তাদের জন্য আপনার কী মেসেজ থাকবে? তারা কী দেখে দল বেছে নেবে? ইসহাক সরকার : আমি মনে করি প্রথমে দলের আদর্শ দেখা উচিত। কোন দলটা সবচেয়ে আদর্শভিত্তিক এবং দেশ পরিচালনায় জনগণের প্রতি তাদের কতটুকু ভরসা আছে তা দেখা দরকার। ক্ষমতাসীন দল হোক বা বিরোধী দল, তারা জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে আছে কি না সেটা বিবেচনা করা উচিত। জনগণ যেটাকে ভালো মনে করবে, সেটাই পছন্দ করবে। কারণ, সবারই গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার আছে। আমি এনসিপি পছন্দ করেছি কারণ তারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে। আমি সবাইকে অনুরোধ করব আপনারা যোগ্য ও আদর্শবান নেতাদের দেখে পার্টিতে অংশগ্রহণ করবেন। এশিয়া পোস্ট : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ইসহাক সরকার : আপনাদেরও ধন্যবাদ।