আমাদের সবারই কখনও না কখনও এমন হয়েছে যে, একটা গান মাথায় ঘুরতেই থাকে, থামতেই চায় না। কখনও প্রিয় গান, আবার কখনও এমন গানও আটকে যায় যা আমরা একদমই পছন্দ করি না। মাথায় গান ঘুরতে থাকার এই বিরক্তিকর অভিজ্ঞতাকেই বলা হয় ইয়ারওয়ার্ম।
কিন্তু আসলে ইয়ারওয়ার্ম কী? কেন এমন হয়? আর কীভাবে এ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? চলুন সহজভাবে বিষয়টি বুঝে নিই।
ইয়ারওয়ার্ম বলতে এমন একটি অবস্থা বোঝায়, যখন কোনো গান বা সুর আমাদের মাথায় বারবার বাজতে থাকে, যদিও আমরা সেটি বাস্তবে শুনছি না।
বিজ্ঞানীরা একে বলেন ইনভলান্টারি মিউজিক্যাল ইমেজারি, অর্থাৎ মস্তিষ্ক নিজে থেকেই গান বাজাতে শুরু করে। এটি মূলত আমাদের মস্তিষ্কের সেই অংশের কাজ, যা শব্দ ও সংগীত প্রক্রিয়াজাত করে।
এই শব্দটির উৎপত্তি জার্মান শব্দ অয়ারভুর্ম বা ওহ-ভুর্ম (öhrwurm) থেকে, যার অর্থই হলো কানের পোকা; যেন গানটি মাথার ভেতরে ঢুকে বসে আছে।
ইয়ারওয়ার্ম হওয়ার পেছনে কয়েকটি বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে-
অসম্পূর্ণ গান শোনা : কোনো গান শুনে হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে মস্তিষ্ক বাকি অংশ নিজেই পূরণ করতে চায়
ক্যাচি বা সহজ সুর : সহজ সুর ও ছন্দযুক্ত গান সহজেই মনে থেকে যায়
গানের হুক অংশ : গানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি বারবার রিপিট হয়
চাপ বা একঘেয়েমি মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা বা বোরডম থাকলে মস্তিষ্ক পরিচিত গান বাজাতে শুরু করে
গবেষণায় দেখা গেছে:
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। অধিকাংশ মানুষই সপ্তাহে অন্তত একবার ইয়ারওয়ার্মের অভিজ্ঞতা পান।
সব গান সমানভাবে ইয়ারওয়ার্ম হয় না। সাধারণত:
এই ধরনের গান বেশি মাথায় আটকে যায়। বিশেষ করে এখন TikTok বা Reels-এর কারণে একই গান বারবার শোনার ফলে এই প্রবণতা বেড়েছে।
অবাক করার মতো হলেও, এর কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে।
কোনো ঘটনার সঙ্গে একটি গান জড়িত থাকলে, পরে সেই গান মনে পড়লে ওই ঘটনার স্মৃতিও আরও পরিষ্কারভাবে মনে পড়তে পারে। অর্থাৎ, এটি স্মৃতিশক্তি বাড়াতে কিছুটা সাহায্য করতে পারে।
ইয়ারওয়ার্ম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কিছু কার্যকর উপায় রয়েছে:
পুরো গানটি শুনে নিন : গানটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুনলে মস্তিষ্ক একটি ‘ক্লোজার’ পায়, ফলে বারবার বাজা বন্ধ হতে পারে।
অন্য গান শুনুন : একটি নতুন গান শুনে পুরোনো গানটিকে প্রতিস্থাপন করা যায়।
মনোযোগ অন্যদিকে নিন : কথা বলা, পড়াশোনা করা বা পাজল সমাধান করার মতো কাজে মন দিলে গানটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে পারে।
চুইংগাম চিবান : গবেষণায় দেখা গেছে, চুইংগাম চিবালে মস্তিষ্কের অডিটরি প্রসেসে বাধা সৃষ্টি হয়, ফলে গানটি কম বাজে।
মেনে নিন : অনেক সময় জোর করে গান সরাতে গেলে তা আরও বেশি মনে থাকে। তাই কিছু ক্ষেত্রে এটিকে মেনে নেওয়াই ভালো। সময়ের সঙ্গে এটি নিজে থেকেই চলে যাবে।
ইয়ারওয়ার্ম হলো একটি সাধারণ মানসিক অভিজ্ঞতা, যেখানে কোনো গান মাথায় বারবার বাজতে থাকে। এটি মূলত মস্তিষ্কের স্বাভাবিক একটি প্রতিক্রিয়া এবং সাধারণত ক্ষতিকর নয়।
মাথায় গান আটকে যাওয়া বিরক্তিকর হলেও এটি কোনো রোগ নয়। বরং এটি আমাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ।
যদি এমন হয়, তাহলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বরং সহজ কিছু কৌশল ব্যবহার করে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর অনেক সময় কিছু না করলেও, গানটি নিজে থেকেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
সূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট




