মস্তিস্ক সুস্থ রাখতে যে খাবার উপকারী
সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য শুধু ধাঁধা সমাধান বা পর্যাপ্ত ঘুমই যথেষ্ট নয়, প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে এবং বয়সজনিত স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
পূর্ণ শস্য, ফল, ডাল, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবারে থাকা ফাইবার শুধু হজমশক্তিই ভালো রাখে না, এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও সক্রিয় রাখে। আর এই অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যকার সম্পর্কই এখন গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
ফাইবার কীভাবে কাজ করে
ফাইবার এক ধরনের কার্বোহাইড্রেট, যা শরীর সহজে হজম করতে পারে না। ফলে এটি অন্ত্রে দীর্ঘ সময় থাকে এবং হজম প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
ফাইবারযুক্ত খাবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি পরিমাণ পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার খান, তাদের ওজন ও পেটের চর্বি তুলনামূলক কম থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন পর্যাপ্ত ফাইবার খেলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও কোলন ক্যানসারের ঝুঁকিও কমে।
অন্ত্র ও মস্তিষ্কের গভীর সম্পর্ক
গবেষকরা বলছেন, ফাইবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি ঘটে অন্ত্রে। আমাদের অন্ত্রে থাকা ভালো ব্যাকটেরিয়া ফাইবার ভেঙে কিছু উপকারী উপাদান তৈরি করে, যেগুলোকে শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড বলা হয়।
এর মধ্যে অন্যতম হলো বিউটিরেট। এই উপাদান অন্ত্রের আবরণ সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং ক্ষতিকর উপাদানকে রক্তে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। ফলে মস্তিষ্কও সুরক্ষিত থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফাইবার যত বেশি খাওয়া হবে, অন্ত্রে তত বেশি বিউটিরেট তৈরি হবে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাও তত ভালো থাকতে পারে।
ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে
২০২২ সালের এক গবেষণায় ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি প্রাপ্তবয়স্কের ওপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যারা বেশি ফাইবার খেতেন তাদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কম ছিল। অন্যদিকে যারা কম ফাইবার খেতেন, তাদের ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে।
আরেকটি গবেষণায় ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে দেখা যায়, যাদের খাদ্যতালিকায় ফাইবার বেশি ছিল, তাদের স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি তুলনামূলক ভালো ছিল।
সম্প্রতি যমজদের ওপর করা একটি গবেষণায়ও দেখা গেছে, প্রতিদিন প্রিবায়োটিক ফাইবার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণকারীদের স্মৃতিশক্তি ও মানসিক কার্যক্ষমতায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
আলঝেইমারের সঙ্গেও রয়েছে সম্পর্ক
গবেষকদের একটি দল সম্প্রতি দেখতে পেয়েছেন, আলঝেইমার রোগীদের অন্ত্রে বিউটিরেট উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কম থাকে। একই সঙ্গে তাদের শরীরে প্রদাহজনিত উপাদানের মাত্রা বেশি দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
কীভাবে বাড়াবেন ফাইবার গ্রহণ
ফাইবার বাড়ানোর জন্য খাদ্যাভ্যাসে কিছু সহজ পরিবর্তন আনা যেতে পারে। যেমন:
সাদা চাল বা পাউরুটির বদলে লাল চাল ও আটার রুটি খাওয়া
বেশি বেশি ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি ও শিমজাতীয় খাবার খাওয়া
প্রতিদিন ফল ও সবজি রাখা
বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার নাস্তা হিসেবে খাওয়া
পূর্ণ শস্যের সিরিয়াল বা ওটস দিয়ে দিনের শুরু করা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন ধরনের ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খেলে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বাড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে।
প্রতিদিন কতটুকু ফাইবার প্রয়োজন
গবেষকদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম ফাইবার গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু বিশ্বের অনেক মানুষই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম ফাইবার খাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন এনে ফাইবারের পরিমাণ বাড়ানো গেলে তা শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কের সুস্থতাও দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
সূত্র: বিবিসি