ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শহীদ জিয়াউর রহমান হলে নতুনভাবে ৮৫ জন শিক্ষার্থীকে সিট বরাদ্দ দেওয়া হলেও তাদের মধ্যে অনেকেই নির্ধারিত কক্ষে গিয়ে সিট পাচ্ছেন না। একদিকে সিট ফাঁকা থাকলেও অ্যালটমেন্ট নেই, অন্যদিকে সিট না থাকলেও অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে, এমন পরস্পরবিরোধী অনিয়মে হলজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) হলের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর হল কর্তৃপক্ষ আবাসিকতার জন্য নোটিশ জারি করে। আবেদন ও সাক্ষাৎকারের পর মেধাক্রম ও সর্বশেষ একাডেমিক ফলাফলের ভিত্তিতে ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত মোট ৮৫ জন শিক্ষার্থীকে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ২৬ এপ্রিল হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আব্দুল গফুর গাজীর স্বাক্ষরিত চূড়ান্ত কক্ষ নির্ধারণের তালিকা প্রকাশিত হয়।
নোটিশে উল্লেখ ছিল, ১৪ এপ্রিল বিভিন্ন কক্ষ যাচাই-বাছাই করে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং উল্লিখিত কক্ষে কেউ অবৈধভাবে অবস্থান করলে তার সিট বৈধ বলে গণ্য হবে না।
তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরেজমিনে দেখা গেছে, হলের একতলার ১০৭ নম্বর কক্ষে দুটি সিট ফাঁকা থাকলেও ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তুহিন ও রায়হান অবৈধভাবে সিটে অবস্থান করছেন। ১১৩ নম্বর কক্ষে আগে থেকে বসবাসরত একজনের পাশে নতুন আরেকজনকে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ১১৫ নম্বর কক্ষে সঠিক কোনো তথ্য যাচাই ছাড়াই তিনজনকে নতুন অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ১১৬ নম্বর কক্ষে কোনো নোটিশ বা অ্যালটমেন্ট ছাড়াই টাকা জমা দিয়ে একজন অবস্থান করছেন। ১১৯ নম্বর কক্ষে একটি সিট ফাঁকা থাকলেও দুজনকে নতুন অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ১২৩ নম্বর কক্ষে তিনজন বসবাসরত থাকা সত্ত্বেও নতুন একজনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং রিনিউয়ের পর তালিকা থেকে একজনের নাম উধাও হয়ে গেছে। ১৩২ নম্বর কক্ষে তিনটি সিট ফাঁকা থাকলেও মাত্র দুটি নতুন অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় তলায় ২০২ নম্বর কক্ষে একটি সিট ফাঁকা থাকলেও তিনজনকে নতুন অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ২০৮ নম্বর কক্ষে কোনো সিট ফাঁকা না থাকলেও একজনকে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ২১৫ নম্বর কক্ষে দুটি সিট ফাঁকা থাকলেও তিনজনকে নতুন অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ২১৭ নম্বর কক্ষে আরবি বিভাগের ২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আলিনূর কোনো অ্যালটমেন্ট ছাড়াই অবৈধভাবে বসবাস করছেন। এ ছাড়া ২২৩, ২২৫, ২২৭, ২২৮, ২৩১ ও ২৩৪ নম্বর কক্ষে সিট ফাঁকা থাকলেও কোনো অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়নি।
তৃতীয় তলায় ৩০৬ ও ৩১৫ নম্বর কক্ষে কোনো সিট ফাঁকা না থাকলেও যথাক্রমে একজন ও দুজনকে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ৩১৩ নম্বর কক্ষে একটি সিট ফাঁকা থাকলেও তিনজনকে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ৩১৮ নম্বর কক্ষে দুটি সিট ফাঁকা থাকলেও মাত্র একজনকে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ৩২৫ নম্বর কক্ষে দুটি সিট ফাঁকা থাকলেও তিনজনকে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ৩২৬ নম্বর কক্ষে একটি সিট ফাঁকা থাকলেও দুজনকে এবং ৩২৭ নম্বর কক্ষে সিট ফাঁকা না থাকলেও একজনকে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ৩৩৫ নম্বর কক্ষে একটি সিট ফাঁকা থাকলেও দুজনকে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ তলায় ৪১১ ও ৪১৫ নম্বর কক্ষে কোনো সিট ফাঁকা না থাকলেও যথাক্রমে একজন ও দুজনকে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। ৪১৬ নম্বর কক্ষে দুটি সিট ফাঁকা থাকলেও কোনো অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়নি। ৪১৯ নম্বর কক্ষে একটি সিট ফাঁকা থাকলেও তিনজনকে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী একাধিক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হলের ফি দিয়ে রশিদ জমা করেছি, তালিকায় নাম আছে, কক্ষও নির্ধারিত, তবুও সিটে উঠতে পারছি না। এই অব্যবস্থাপনার দায় কে নেবে?
রায়হান উদ্দিন সজীব নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রভোস্ট স্যার নিজে আমাকে সিটে ওঠানোর পর আবেদন করে ভাইভা দিয়েছি। কিন্তু এখন আমাকে সিট না দিয়ে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থীকে আমার থাকা সিটে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’
হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাহসিফ আজম বলেন, ‘আমি হল ফি জমা দেওয়ার পর ১১৩ নং রুমে সিট এসেছে। কিন্তু ১১৩ নং রুমে গিয়ে কোনো ফাঁকা সিট পাইনি। মেস ছেড়ে দিয়েছি, এখন আমার থাকার জায়গা নেই।’
এ বিষয়ে হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আব্দুল গফুর গাজী বলেন, আমরা সিনিয়রিটি ও পরীক্ষার ফলাফল যাচাই-বাছাই করে হলে সিট বরাদ্দ দিয়েছি। তবে ৫ আগস্টের পর যারা হলে বৈধতা ছাড়া অবস্থান করছে, তাদের নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করছি।
অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তিনি বলেন, ‘কর্মকর্তাদের কাজ করার সময় কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে পারে। পরবর্তীতে আমরা নোটিশের মাধ্যমে সেটা সংশোধন করব। তবে অনেক শিক্ষার্থীরাও নিয়ম ভঙ্গ করছে, তাদেরও উচিত নিয়ম মেনে হলে অবস্থান করা।’




