চার সাবেক পরিচালকের কাছে এক হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা আটকে আছে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের। বারবার নোটিশ পাঠানো হয়েছে, রয়েছে হাইকোর্টের নির্দেশনা। তবে উদ্ধার হয়নি কোনো অর্থ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত হিসাবে সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমানের ৭১৮ কোটি, আরেফিন শামসুল আলামিনের ৬২৪ কোটি, খবির উদ্দিন মিয়ার ৪০৪ কোটি এবং বিশ্বজিৎ কুমার রায়ের ৩৮ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। চারজনই ছিলেন পিপলস লিজিংয়ের সাবেক স্পনসর পরিচালক।
পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাগির হোসাইন খান বলেন, ‘সাবেক চার পরিচালকের কাছে বিপুল বকেয়া আছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা টাকা ফেরত পাচ্ছি না। হাইকোর্টের কাছে আবেদন করেছি, তাদের যেন কোর্টে ডেকে আনা হয়। না হলে ফোর্সফুলি যত ধরনের প্রচেষ্টা আছে, সেগুলোর মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে যেন টাকা আদায় করা হয়। এরপরও আমরা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আরও আইনি পদক্ষেপ নেব, আদালতে যাব।’
অভিযোগের কেন্দ্রে শামসুল আলামিন গ্রুপ
অভিযোগ রয়েছে, পিপলস লিজিং থেকে অর্থ আত্মসাতের কেন্দ্রে ছিল শামসুল আলামিন গ্রুপ। আরেফিন শামসুল আলামিনের নেতৃত্বে একটি চক্র প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট দুই হাজার ৩৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এর মধ্যে শামসুল আলামিন গ্রুপ ১৯৩ কোটি টাকা সরাসরি ঋণ হিসেবে এবং শেয়ার পোর্টফোলিওর বিপরীতে আরও ২৪ কোটি টাকা নেয়। সুদ-আসল মিলিয়ে এখন এই বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬২৪ কোটি টাকা।
বাকি এক হাজার ৮৪০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে পিপলস লিজিংয়ের তৎকালীন পরিচালক মতিউর রহমান ও ক্যাপ্টেন (অব.) মোয়াজ্জেম হোসেনকে সামনে রেখে। যেসব কোম্পানিকে এই অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, তার প্রতিটিই ছিল এই দুজনের পরিবার-সংশ্লিষ্ট।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত
পিপলস লিজিংয়ের অনিয়ম তদন্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি বিশেষ পরিদর্শন টিম গঠন করে। তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। পিপলস লিজিংয়ের সাত পরিচালক ছিলেন নার্গিস আলামিন, হুমায়ারা আলামিন, আরেফিন শামসুল আলামিন, মতিউর রহমান, ইউসুফ ইসমাইল, বিশ্বজিৎ কুমার রায় ও খবির উদ্দিন মিয়া। তাদের বেশির ভাগই শামসুল আলামিনের আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ।
২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নিয়ম ভেঙে ১৯৩ কোটি টাকা ঋণ এবং শেয়ার পোর্টফোলিওর বিপরীতে ২৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় শামসুল আলামিন গ্রুপ। মতিউর রহমান ছিলেন সার ও পণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এমকে গ্রুপের চেয়ারম্যান। আর খবির উদ্দিন যুক্ত ছিলেন জুয়েলারি ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়।
বকেয়া আদায়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অভিযুক্তদের বর্তমান পরিস্থিতি। সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান ও সাবেক পরিচালক খবির উদ্দিন মারা গেছেন। বিশ্বজিৎ কুমার রায় পলাতক। কেবল আরেফিন শামসুল আলামিন এখনও ব্যবসায় সক্রিয়। তিনি শামসুল আলামিন রিয়েল এস্টেটের পরিচালক এবং এসএ স্পিনিং মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ফরেনসিক অডিট ও আদালতের নির্দেশ
২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এমএবিএস অ্যান্ড জে পার্টনার্স একটি বিশেষ ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করে। এতে দেখা যায়, বড় খেলাপিদের মোট ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বকেয়ার মধ্যে শুধু এই চার স্পনসর-পরিচালকের কাছেই রয়েছে ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা।
অডিট অনুযায়ী, ২০২২ সাল পর্যন্ত মতিউরের বকেয়া ছিল ৫৬৫ দশমিক ৪৭ কোটি, আরেফিনের ৪১৫ দশমিক ৬৬ কোটি, খবিরের ৪০৪ দশমিক ৩৮ কোটি এবং বিশ্বজিতের ২৮ দশমিক ৪৭ কোটি টাকা। সেই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত চারজনের মোট বকেয়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।
অডিটে ঋণের ধরনও উঠে এসেছে। আরাফিন ও বিশ্বজিৎ সরাসরি ঋণ নিয়েছিলেন। মতিউর নিয়েছিলেন ঋণ ও শেয়ার ব্যবসার জন্য মার্জিন ঋণ। আর খবির উদ্দিন নিয়েছিলেন শুধু শেয়ার ব্যবসার জন্য ঋণ।
এই অডিটের ভিত্তিতে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্টের কোম্পানি বেঞ্চ খেলাপিদের ছয় মাসের মধ্যে বকেয়া পরিশোধের নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশও উপেক্ষিত হয়েছে।
পিপলস লিজিংয়ের সংকট
অবলোপনযোগ্য ঋণ, নেতিবাচক সুদ মার্জিন, পরিচালন ক্ষতি এবং আমানতকারীদের প্রতি ক্রমবর্ধমান দায়ের চাপে বহু বছর ধরেই সংকটে পিপলস লিজিং। ২০১৫ সাল থেকে টানা লোকসানের কারণে প্রতিষ্ঠানটি কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠানটিকে অবসায়নে পাঠায়। পরে ২০২১ সালের জুলাইয়ে সেই আদেশ প্রত্যাহার করে আদালত নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে, যা পরবর্তীতে পুনর্গঠিত হয়।
২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ফরেনসিক অডিটের বরাত দিয়ে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, কাঠামোগত শাসনের ব্যর্থতা ও চরম দুর্ব্যবস্থাপনা ছিল। এর মধ্যে রয়েছে অনিয়মিত ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ, সুদের ভুল হিসাব, অনুমোদনবিহীন মওকুফ, সন্দেহজনক ঋণ সমন্বয়, নিয়ন্ত্রক বিধি লঙ্ঘন ও অবিশ্বস্ত আর্থিক প্রতিবেদন। সাবেক পরিচালকদের সম্পৃক্ততা, বোর্ড পর্যায়ের তদারকির ব্যর্থতা এবং কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে বারবার বাইরের অডিটরদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়েছে।
পুনরুদ্ধারের চেষ্টা
পিপলস লিজিং কর্তৃপক্ষ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে জানিয়েছে, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ প্রতিষ্ঠানটিকে স্থিতিশীল করতে কাজ করছে। ২০২১ সালের জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে এবং আমানতকারীদের ধাপে ধাপে ৮৫ থেকে ৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তৃতীয় ধাপের পরিশোধও শুরু হয়েছে।
কোম্পানিটি জানায়, সংকটের মূল কারণ ছিল ২০১৯ সালের আগে বিতরণ করা অনিয়মিত ঋণ, দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও খেলাপি ঋণ। পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকার সরকারি সহায়তা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সম্পূর্ণ জামানতনির্ভর ভিত্তিতে সীমিত আকারে ঋণ বিতরণও শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ কোটি টাকা নতুন ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।




