জ্বালানি তেলের সংকটে দেশে জনভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে কৃচ্ছ্রতা সাধনের নানা উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এমন সময়েও সরকারি গাড়িতে তেল অপচয়ের নজিরবিহীন বিলাসিতা চালিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। সংকটের মধ্যেই সরকারি বরাদ্দের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি তেল ব্যবহার করছেন নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে।
অবৈধভাবে অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করা ওই কর্মকর্তার নাম মো. নাজমুল হোসেন। তিনি কৃষি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন মহাবিভাগের মহাব্যবস্থাপক। পদদাধিকারবলে কৃষি ব্যাংক থেকে পাওয়া মিতসুবিশি ব্র্যান্ডের একটি পাজেরো গাড়ি ব্যবহার করেন নাজমুল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কৃষি ব্যাংকের জিএমের গাড়ির জন্য জ্বালানি হিসেবে সরকার নির্ধারিত মাসিক বরাদ্দ ১৮০ লিটার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নাজমুল হোসেন প্রতি মাসে ৩০০-৪০০ লিটার তেল নিচ্ছেন। অর্থাৎ বরাদ্দের চেয়ে দ্বিগুণ তেল ব্যবহার করছেন তিনি। কোনো কোনো মাসে দ্বিগুণেরও বেশি তেল নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও কানাঘুষা রয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে অবহিত করার পরও নাজমুল অনিয়ম করেই চলেছেন। এ ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি জ্বালানি সংকটের মধ্যে নাজমুলের ‘তেল-বিলাসিতার’ বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের তেল ব্যবহারের কয়েক মাসের নথিপত্র এসেছে এশিয়া পোস্টের হাতে। সেসব বিশ্লেষণ করে নাজমুল হকের বিরুদ্ধে বরাদ্দের চেয়ে বেশি তেল ব্যবহারের প্রমাণও মিলেছে। নিয়ম অনুযায়ী, অতিরিক্ত তেল উত্তোলন করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু নাজমুল কোনো অনুমোদনের ধার ধারেন না। নথিতে দেখা যাচ্ছে, গেল ডিসেম্বরে নাজমুল তাদের পাজেরো গাড়ির জন্য তেল নিয়েছেন ৩৯২ লিটার, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩৮৭ লিটার এবং ফেব্রুয়ারিতে ৩২৭ লিটার তেল নিয়েছেন তিনি। অথচ তার সরকারি খরচে তেল নেওয়ার কথা সর্বোচ্চ ১৮০ লিটার। এরচেয়ে বেশি তেল প্রয়োজন হলে তার নিজস্ব খরচে তা ব্যবস্থা করার কথা। কিন্তু নাজমুল তা করেননি।
এমনকী গত মার্চ মাসের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জ্বালানী তেলের সংকট প্রকট হওয়ার পরও সরকারি তেল নিয়ে নাজমুলের তেলেসমাতি থেমে নেই। মার্চ মাসেও তিনি নিজের প্রাপ্যতার চেয়েও অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করেছেন। এছাড়া পবিত্র ঈদুল ফিতরসহ বিভিন্ন সরকারি ছুটি মিলিয়ে অফিস চালু ছিল অর্ধেক মাস। ওই মাসেও প্রায় ২৪৭ লিটার তেল ব্যবহার করেছেন নাজমুল হোসেন। অর্থাৎ ছুটিছাটায় অর্ধেক মাস অফিস বন্ধ থাকলেও বরাদ্দের চেয়ে প্রায় ৭০ লিটার বেশি তেল ব্যবহার করেছেন তিনি।
কৃষি ব্যাংক সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নাজমুল যে অতিরিক্ত তেল নেন তার বড় অংশই ব্যয় করেন ব্যক্তিগত কাজে। সরকারি গাড়ি শুধু দাপ্তরিক কাজে ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে ওই কর্মকর্তা তা বেশিরভাগ সময় পারিবারিক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করেন। অফিসের পর বাসায় যাতায়াত, পরিবারের জন্য ভ্রমণ, এমনকি ছুটির দিনেও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন কৃষি ব্যাংকের এই মহাব্যবস্থাপক। এতে সরকারি বরাদ্দের জ্বালানি অপচয়ের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহারও হচ্ছে।
শুধু অতিরিক্ত তেল ব্যবহারের মধ্যেই নাজমুল হোসেনের অনিয়ম থেমে নেই। গাড়িচালকদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ কারণে কৃষি ব্যাংকের কোনো চালক বেশিদিন তার গাড়ি চালানোর দায়িত্বে থাকতে পারেন না। নাজমুলের চালক হিসেবে কাজ করেছেন এমন কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে বলেন, তিনি (নাজমুল হোসেন) কোনো কিছুরই পরোয়া করেন না। তার অফিসের গাড়ি বেশিরভাগ সময় পরিবারের কাজে ব্যবহার করেন। এজন্য তেল বেশি লাগে। কোনো কোনো মাসে ৪০০ লিটার পর্যন্ত তেলও তিনি নিয়েছেন।
অতিরিক্ত তেল নেওয়ার বিষয়ে জানতে কৃষি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন মহাবিভাগের মহাব্যবস্থাপক নাজমুল হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট। প্রশ্ন শোনার পর তিনি পরিবহন বিভাগের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে লাইন কেটে দেন।
নাজমুল হোসেনের পরামর্শ অনুযায়ী যোগাযোগ করা হয় কৃষি ব্যাংকের কর্মী কল্যাণ ও পরিবহন বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক সতী প্রসন্ন দত্তের সঙ্গে। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘কৃষি ব্যাংকের একজন মহাব্যবস্থাপক পদাধিকারবলে গাড়ির জন্য ১৮০ লিটার জ্বালানি তেল বরাদ্দ পান।’ তাহলে নাজমুল হোসেন কীভাবে বেশি তেল তুলছেন জানতে চাইলে সতী প্রসন্ন দাবি করেন, ‘এমন কিছু তো হয় না।’
পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে কথা হয় কৃষি ব্যাংকের ট্রান্সপোর্ট অফিসার ইউসুফের সঙ্গে। তিনি জানান, একজন মহাব্যবস্থাপকের জন্য মাসে ২০০ লিটার তেল বরাদ্দ থাকে। এর থেকে ১০ শতাংশ বাদ দিয়ে মোট তেল পান ১৮০ লিটার। নাজমুল হোসেন কীভাবে বেশি তেল পাচ্ছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে এশিয়া পোস্টকে ইউসুফ বলেন, ‘সরকারি বিভিন্ন সুবিধা থাকে। সেখান থেকে হয়তো তিনি অতিরিক্ত তেল নিয়ে থাকতে পারেন।’
কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলীর সঙ্গে এশিয়া পোস্ট ফোন আলাপের এক পর্যায়ে প্রশ্ন করে—একজন জিএমের গাড়ির জন্য মাসে কত লিটার তেল বরাদ্দ থাকে। তিনি বলেন, আমাদের অফিসে লিখিতভাবে দেন তাহলে সেটা জানতে পারবেন। ফোনে কথা না বলে অফিসে যাওয়া কথা বলেন।




