জ্বালানি তেলের সংকটময় পরিস্থিতির কারণে দেশের মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়েও দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। যদিও নানামুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মশক নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সরবরাহকারীরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে মশা নিধনে ‘ম্যালাথিয়ন’ ও ‘ডেল্টামেথ্রিন’ নামক কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। ভারত ও চীন থেকে আমদানি করার পর এ কীটনাশক দেশে প্রক্রিয়াজাতের পর ব্যবহারযোগ্য করা হয়। এ কাজে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় ডিজেল। ম্যালাথিয়ন কীটনাশক হিসেবে ব্যবহারের জন্য এতে ৯০ দশমিক ৮৬ শতাংশ ডিজেল মেশানো হয়।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কীটনাশক সরবরাহকারী ঠিকাদাররা বলছেন, মজুত ডিজেল দিয়ে আরও এক মাস কাজ চালানো গেলেও দ্রুততম সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত না হলে কীটনাশক উৎপাদন আটকে যাবে। এমনটি হলে ঢাকার দুই সিটিসহ পুরো দেশেই মশক নিধন কার্যক্রম ব্যাহত হবে এবং আগামী বর্ষায় ডেঙ্গুর মতো প্রাণঘাতী রোগ মহামারি রূপ ধারণ করতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহযোগিতা চেয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছেন ঠিকাদাররা। সিটি করপোরেশনগুলোও পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে তেল কোম্পানিগুলোকে সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য চিঠি পাঠিয়েছে।
ঢাকা উত্তরে মজুত শেষ হবে এপ্রিলেই
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ঠিকাদারদের দ্রুত কীটনাশক সরবরাহের জন্য তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। কারণ বর্ষাকাল সমাগত। ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহী রোগের প্রকোপ ঠেকাতে আগেভাগেই নিধন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। আপাতত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০ লিটার ‘ম্যালাথিয়ন ৫%’ প্রয়োজন হয়। বর্তমানে এর মজুত রয়েছে ২৭ হাজার লিটার। এ পরিমাণ কীটনাশক দিয়ে আগামী ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যক্রম চালানো সম্ভব। এর আগেই আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার লিটার ‘ম্যালাথিয়ন’ সরবরাহের জন্য ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দিয়েছে ডিএনসিসি।
কিন্তু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমআর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ড. মো. মাহবুবুর রহমান গাজী মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ডিএনসিসি প্রশাসক বরাবর এক চিঠি লিখে ডিজেল সংগ্রহের জন্য সহযোগিতা চেয়েছেন। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগবাহী মশা নিয়ন্ত্রণে ৩ লাখ ৬০ হাজার লিটার ‘ম্যালাথিয়ন ৫ শতাংশ আরএফইউ’ সরবরাহের জন্য তাদের ১৬ লাখ ২৯ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। কীটনাশক সরবরাহের জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে আগামী ১১ মে পর্যন্ত।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এই কীটনাশক তৈরিতে ৯০ দশমিক ৮৬ শতাংশ ডিজেল সহযোগী উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ডিএনসিসির কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ কীটনাশক প্রস্তুতে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৯৬ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু জ্বালানি নিয়ে সংকটময় এ সময়ে জনস্বার্থে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান ঠিকাদার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার মাহবুবুর রহমান গাজী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘৩ লাখ ৬০ হাজার লিটার ম্যালাথিয়ন সরবরাহের সময়সীমা ১১ মে পর্যন্ত। কিন্তু সিটি করপোরেশন দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে বলছে। সংকটের আশঙ্কায় তারা ইতোমধ্যে ডোজ কমিয়ে দিয়েছে।’
ডিজেল নিয়ে সংকট ঢাকা দক্ষিণেও
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) মশা নিধনে ‘ডেল্টামেথ্রিন ০.০১% ডব্লিউ/ডব্লিউ’ নামক কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। চলতি মৌসুমে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৬ লাখ ২১ হাজার ৫২০ লিটার ‘ডেল্টামেথ্রিন’ সরবরাহের জন্য ‘ফরোয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে জরুরিভিত্তিতে ২ লাখ লিটার কীটনাশক সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে বিপত্তি বেঁধেছে কীটনাশক তৈরির প্রধান উপকরণ ডিজেল সংগ্রহ নিয়ে। সূত্র জানায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলেছে প্রাথমিক চাহিদা অনুযায়ী কীটনাশক প্রস্তুত করতে তাদের সমপরিমাণ অর্থাৎ ২ লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকার জ্বালানি তেলের অবারিত বিক্রয় সীমিত করায় তারা বাজার থেকে প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছে না।
এমন প্রেক্ষাপটে গত ১১ মার্চ ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের কাছে জরুরি ভিত্তিতে মশা মারার কীটনাশক ‘ডেল্টামেথ্রিন তৈরির জন্য ২ লাখ লিটার ডিজেল বরাদ্দের আবেদন করেন। বিপিসিকে দেওয়া চিঠিতে তিনি লিখেছেন, বর্তমানে মশার উপদ্রব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়মতো কীটনাশক পাওয়া না গেলে মশা নিধন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যা জনদুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। এ কারণে জনস্বার্থ বিবেচনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে দ্রুত ২ লাখ লিটার ডিজেল সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ডিএসসিসির প্রধান ভান্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা জয়নুল আবেদীন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন ৪ হাজার ৫৭০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। এখন আমাদের যে পরিমাণ ডিজেল মজুত আছে; তা দিয়ে আগামী এক মাসের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে। চলমান বৈশ্বিক সংকটের কারণে কীটনাশক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডিএসসিসি প্রশাসকের কাছে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য আবেদন করেছে। তার ভিত্তিতে বিপিসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’




