ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

দেশে এইডসে আক্রান্তদের অর্ধেকই সমকামী, বেশিরভাগ শিক্ষার্থী

আজাদুল আদনান

  ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:২৬
ছবি : সংগৃহীত

দেশে বর্তমানে এইডসের চিকিৎসা নিচ্ছেন আট হাজার ৫০০ জন। তাদের প্রায় অর্ধেকই সমকামী। আর সমকামী আক্রান্তদের ৮০ ভাগই শিক্ষার্থী। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিকেল সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন এই তালিকায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (এসটিডি) তথ্য ও মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তপন শিকদার (ছদ্মনাম)। বছর দুয়েক আগে ফেসবুকে স্ক্রল করতে গিয়ে সমকামীদের একটি গ্রুপ দেখতে পান। কৌতূহলবশত নিজেও যুক্ত হন। এক পর্যায়ে নিয়মিত হন সেই গ্রুপে। মাসখানেক যেতেই জড়িয়ে পড়েন সমকামিতায়। গত ২০ এপ্রিল তার এইচআইভি শনাক্ত হয়।

তপন বলেন, ‘সমকামিতায় কীভাবে জড়িয়ে গেছি, বলা মুশকিল। আমি যে আক্রান্ত, সেটি পরিবার ও অনেক কাছের বন্ধুরাও জানে না। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। আক্রান্ত হওয়ার খবরে ভয় পাই। ওষুধ খাওয়া শুরু করেছি। কিন্তু রোগটা এমন যে, সামাজিকভাবে বলতেও পারছি না।’

তপন একা নন। ১১ মাস আগে এইচআইভি শনাক্ত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের পলিটেকনিক শিক্ষার্থী সাদাতের (ছদ্মনাম)। ২২ বছরের এই তরুণও সমকামী। সম্প্রতি পেটে ব্যথা ও ওজন কমে যাওয়াসহ নানা জটিলতায় একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে তাকে। সর্বশেষ গত ১৯ এপ্রিল ভর্তি হন ঢাকার একটি হাসপাতালে। নিজের আক্রান্ত হওয়া নিয়ে কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

এসটিডির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে এইডসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩১৩। এর মধ্যে মারা গেছেন দুই হাজার ৬৬৬ জন। চিকিৎসাধীন আট হাজার ৫০০ জন ভর্তি রয়েছেন ১৬টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে।

অধিকাংশের বয়স ১০-২৪ বছর
এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কেন্দ্রগুলো ঘুরে জানা গেছে, সমকামী আক্রান্তদের ২১ শতাংশের বয়স ১০ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। ৩১ শতাংশের বয়স ২০ থেকে ২৪ বছর। বাকি ৪৮ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের বেশি। সমকামীদের বাইরে আক্রান্তদের মধ্যে সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষ আছেন, যাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন।

দেশে সর্বোচ্চ এইচআইভি শনাক্ত হয় রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ)। গত বছর এই কেন্দ্রে ২৯৩ জনের এইডস শনাক্ত হয়েছিল। চলতি বছর প্রতি মাসে ২০০ থেকে ২৫০টি পরীক্ষা হচ্ছে, যার মধ্যে ২৮ থেকে ৩০ জনের সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের ৭০ শতাংশই সমকামী।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শনাক্তকরণ কেন্দ্র মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি আক্রান্তদের চিকিৎসায় এখানে ২৫ শয্যার আলাদা ইউনিট রয়েছে। বর্তমানে ২২ জন চিকিৎসাধীন। প্রতিদিন ছয় থেকে ১০ জন এইডসের ক্ষত নিয়ে আসছেন। ২০২৫ সালে এই কেন্দ্রে দুই হাজার ৯২টি পরীক্ষায় এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে ২৭২ জনের। এর মধ্যে পুরুষ সমকামী ১১৭ জন, যাদের হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশই শিক্ষার্থী।

হাসপাতালের পরামর্শক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. লিটন খান বলেন, ‘একসময় যৌনকর্মী ও মাদকসেবীদের মাঝে আক্রান্তের হার বেশি থাকলেও বর্তমানে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে সমকামীদের মাঝে। তাদের বড় অংশই শিক্ষার্থী, এটি উদ্বেগজনক। অনেকে হয়তো এখনও লক্ষণ নিয়ে গোপনে রয়েছেন। পরিবেশ না পাওয়ায় অনেকে বলার সাহস পান না। এমনকি কাছের মানুষদের সঙ্গেও আলোচনা করতে ভয় পান কেউ কেউ। কারণ, এইডসে আক্রান্ত জানলেই সামাজিকভাবে এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।’

এই হাসপাতালেই গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে আক্রান্তদের পরামর্শ দেন হরিপদ দাস। তিনি নিজেও এইচআইভিতে আক্রান্ত। হরিপদ দাস বলেন, ‘এইচআইভিতে আক্রান্ত হলে অনেকে ভেঙে পড়ে, কেউ মনে করে আর বাঁচবে না। তখন মানসিকভাবে সাপোর্ট দেওয়াটাই আমার কাজ। অনেক সময় তারা কথা বলতে চায় না। আমি নিজেই আক্রান্ত বলে জানালে, তখন তারা নির্ভয়ে কথা বলে, বেঁচে থাকার সাহস পায়।’

ঢাকার বাইরেও একই চিত্র। যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল কেন্দ্রে সাড়ে তিন শতাধিক এইচআইভি রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে এক হাজার ২৪১ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছেন ১৮ জন। এর মধ্যে ১২ জনই সমকামী এবং তাদের মধ্যে আটজন শিক্ষার্থী। কেন্দ্রটির পরামর্শক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুদেব কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘সমকামী মানেই যেন শিক্ষার্থী, পরিস্থিতি এমন অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা আসছেন, কীভাবে কি হলো সব শুনে যতটা পারি প্রতিরোধের উপায়গুলো বলে দিই।’ চট্টগ্রাম, খুলনা, ঢাকা ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও শিক্ষার্থীদের আক্রান্তের হার প্রায় একই রকম।

ছবি: গুগল নোটবুকএলএম দিয়ে তৈরি

সংক্রমণের ধরন বদলেছে
জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সিনিয়র ম্যানেজার মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘সাধারণ যে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর চেয়ে সমকামীদের মাঝে এইচআইভি সংক্রমণের হার অনেক বেশি। কারণ, এক্ষেত্রে কোনো সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করা হয় না। একসময় এইচআইভি ছড়ানোর শীর্ষে ছিল নারী যৌনকর্মীরা। তবে এ নিয়ে পর্যাপ্ত কাজ হওয়ায় সেটি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিগত দশকে ছিল মাদকসেবীদের মাঝে, এটির বিস্তারও নিয়ন্ত্রণে। এখন সমকামীদের মাঝে বেশি ছড়াচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের যেসব দেশে এইচআইভির প্রকোপ রয়েছে, সব জায়গায় একই পরিস্থিতি।’

ইউএনএইডসের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এইডস আক্রান্তের সংখ্যা চার কোটি আট লাখ। এর একটি বড় অংশ সমকামী। তবে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় সেবা দেওয়ার পথটি মসৃণ নয় বলে মনে করেন মো. আখতারুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘কোনো অবৈধ যৌনাচারই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু যেহেতু এটি হচ্ছে, সেক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখা সরকারের দায়িত্ব। এ কারণে সমকামীদের নিয়েও কর্মসূচি রয়েছে। তবে যেহেতু সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে এটির অস্তিত্বই অস্বীকার করা হয়, ফলে সেবা কার্যক্রমে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একজন মাদক ও যৌনকর্মীকে যত সহজে শনাক্ত, কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার আওতায় আনা যায়, সমকামীদের ক্ষেত্রে চিত্রটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ, সমকামিতা মানুষের একটা অভ্যাসগত সমস্যা। এখানে জড়িতরা প্রায় সবাই শিক্ষিত। অনেকের সমাজে একটা অবস্থান রয়েছে। ফলে তারা গোপন রাখে।’

আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই
২০২১ সালে দেশে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭২৯। গত বছর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮৯১-তে। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে শনাক্ত হয়েছিল এক হাজার ৪৩৮ জন। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও মৃত্যু কমেছে। ২০২৪ সালে মারা গেছেন ৩২৬ জন, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ২৫৪-তে। আক্রান্ত বৃদ্ধির পেছনে পরীক্ষার হার বৃদ্ধিকেই প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. আমানতুল্লাহ বলেন, ‘আগে অনেকে আক্রান্ত হলেও আসতেন না। এখন আসছেন, ফলে রোগী বাড়ছে। ডায়াগনোসিসের হার যত বাড়বে, রোগীও তত বাড়বে।’

গত দুই বছর কিট সংকটে রোগ নির্ণয় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হওয়ার পর এ সংকট দেখা দেয়। চলতি বছর এক লাখ ১০ হাজার ডিটারমাইন কিট কেনা হলেও ইউনিগোল্ড ও ফার্স্ট রেসপন্স কিট পর্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহ করা হয়নি। প্রায় ছয় মাস এই কিটের সংকট থাকায় প্রথম পরীক্ষার পর বাকি দুটি পরীক্ষা করাতে না পেরে অনেক সন্দেহভাজন রোগী কেন্দ্রে যাওয়া বন্ধ করে দেন।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২০২৪ সালে দুই হাজার ৪৮৬টি পরীক্ষায় ১৮৪ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। কিট সংকটে ২০২৫ সালে পরীক্ষার সংখ্যা কমে দুই হাজার ৯২টিতে নেমে আসে। অথচ শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭২-এ, যা আগের বছরের চেয়ে ৮৮ জন বেশি।

বাংলাদেশে এইচআইভির ইতিহাস নতুন নয়। রোগী শনাক্তের আগেই ১৯৮৫ সালে এইডস প্রতিরোধে জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। বেসরকারি সংস্থা কাজ শুরু করে ২০১০ সালে, সরকারি কর্মসূচি শুরু হয় ২০১৬ সালে।

বেতন নেই ২২ মাস
বর্তমানে দেশের ২৩ জেলায় সরকারি এইডস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চালু রয়েছে। জেলাগুলো হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, দিনাজপুর, রংপুর, যশোর, পাবনা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, কুমিল্লা, খুলনা, সিরাজগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, গাজীপুর, বগুড়া, বরিশাল, পটুয়াখালী, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা। এ ছাড়া সেভ দ্য চিলড্রেন এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পৃথকভাবে শনাক্ত ও কাউন্সেলিং করছে। বাকি জেলাগুলোতে ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রে ডায়াগনোসিস চলে, যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই কর্মসূচিতে ডিভিশনাল কো-অর্ডিনেটর, মনিটরিং কো-অর্ডিনেটর, এইচআইভি কাউন্সেলিং কো-অর্ডিনেটর, কাউন্সেলর কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটরসহ মোট ৫৮টি পদ রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কর্মসূচি এই পদগুলো থেকেই পরিচালিত হয়। ২০২৪ সালে অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হলে এসব কর্মীর বেতন বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প হিসেবে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি হলেও এখনও অনুমোদন না পাওয়ায় ২২ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না মাঠকর্মীরা। সর্বশেষ বেতন পেয়েছিলেন ২০২৪ সালের জুনে।

বিএমইউ কেন্দ্রের পরামর্শক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাবরিনা আক্তার বলেন, ‘মাসের পর মাস বিনা বেতনে চাকরি করছি। হয়তো স্বামী চাকরি করে বলে চলতে পারছি। কিন্তু অন্যরা তো পারছে না। একদিকে বেতন নেই, অন্যদিকে চাকরি রাজস্বভুক্ত করা হবে কি না তা নিয়ে চিন্তায় আছি। এমন মানসিক অবস্থা নিয়ে সেবা দিতে হচ্ছে।’

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মো. লিটন খান বলেন, ‘প্রতিনিয়ত রোগী বাড়ছে। কিন্তু সেভাবে জনবল নেই। জনবল বাড়লে পরীক্ষার হার আরও অনেক বাড়ত। আবার যারা আছি, গত ২২ মাস ধরে বেতন পাচ্ছি না। ডিপিপি হলে রাজস্বভুক্ত করবে, এমন আশা থেকেই এখন পর্যন্ত বেতন ছাড়া চাকরি করছি।’ তিনি বলেন, ‘আমার মতো ২৩ জন কাউন্সেলর আছে। এ ছাড়াও ২৩টি সেন্টারে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রয়েছেন। আমাদের যদি চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলত, আপনারা চলে যান, তাহলে আর আজ এমন অবস্থা নিয়ে কাজ করতে হতো না। এর আগে এক সেক্টর প্রোগ্রামের লোকদের আরেক সেক্টর প্রোগ্রামে রাজস্বভুক্ত করা হতো। কিন্তু আমাদের বেলায় আটকে গেছে। আশা করি, সরকার আমাদের দক্ষতা ও ত্যাগের মূল্যায়ন করবে।’

এই মাঠকর্মীদের রাজস্বভুক্ত করার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালে টিবি-লেপ্রোসি অ্যান্ড এইডস/এসটিডি প্রোগ্রাম শীর্ষক অপারেশন প্ল্যানে কর্মরত ৩৯৬টি পদসহ জনবল রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সুপারিশ করেছিলেন তৎকালীন লাইন ডিরেক্টর। এরপর দফায় দফায় মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে চিঠি চালাচালি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আশ্বস্ত করা হয়েছিল, শিগগিরই রাজস্বভুক্ত করা হবে।

কমছে বিদেশি বরাদ্দ
চলতি অর্থবছরে এ খাতে সরকারের বরাদ্দ ছিল ১০০ কোটি টাকার বেশি। গ্লোবাল ফান্ডের বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৮ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু আগামী তিন বছরের জন্য গ্লোবাল ফান্ড ঘোষণা করেছে মাত্র ১৮ মিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়েছে, ২০৩২ সালের পর থেকে স্থায়ীভাবে বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়া হবে। নতুন শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, যাদের মাধ্যমে এইচআইভি বেশি ছড়াচ্ছে, তাদের দিকে অধিক মনোযোগ দিয়ে কর্মসূচি নিতে হবে।

এইচআইভি প্রতিরোধ কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সীর। তিনি বলেন, ‘এইচআইভি কর্মসূচিতে অর্থের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গ্লোবাল ফান্ড ক্রমেই অর্থ তুলে নিচ্ছে। ট্রাম্পের মতো আরেকজন এলে ২০৩২ সালের আগেই এটি বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে সরকারকে প্রস্তুত থাকতে হবে, গুরুত্বও দিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণদের নিয়ে নতুন কর্মসূচি চালু করতে হবে।’

যা বলছে কর্তৃপক্ষ
জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক ডা. মো. খায়রুজ্জামান বলেন, ‘সমকামীদের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। একটি হলো সমকামী বাড়ছে, আবার সমকামী আগেই ছিল, এখন ডায়াগনোসিস হওয়ার কারণে বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এটি উদ্বেগজনক যে, আক্রান্তদের বড় অংশই শিক্ষার্থী। গত দুই-তিন বছর ধরে এটি ক্রমাগত বাড়ছে।’

আক্রান্ত বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আক্রান্তদের মধ্যে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন। সমকামিতা আগেও ছিল, কিন্তু হয়তো প্রকাশ পেত না। এখন শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রকাশ পাচ্ছে। এ ছাড়া যারা বড় তাদের মধ্যেও রয়েছে, কিন্তু তারাও গোপন করছে। সমাজ আগে বাধা দিত, এখন প্রকাশ করতে পারায় ডায়াগনোসিস হচ্ছে। শনাক্ত হওয়ার ফলে আক্রান্তদের চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষিতদের মধ্যে কেন বাড়ছে, সেটি গবেষণার বিষয়।’

জনবল সংকট ও বেতন বন্ধের বিষয়ে ডা. খায়রুজ্জামান বলেন, ‘ওপি শেষ হয়েছে মানে তার চাকরি শেষ। তবে তারা যেহেতু কাজ করছে, সরকার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভূতাপেক্ষভাবে তাদের বেতনের বিষয়ে ডিপিপি অনুমোদন দিয়েছে। তারপর চাকরি থাকবে কি থাকবে না, তা নির্ভর করছে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে আমরা তাদের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রাজস্বভুক্ত করার সুপারিশ করেছি। বাকিটা মন্ত্রণালয় দেখবে।’

আন্তর্জাতিক বরাদ্দ কমে আসার প্রেক্ষাপটে প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে সরকার বিষয়টি আমলে নিয়েছে। বর্তমানে যে বরাদ্দ আছে, সেটিও কোনো অংশে কম নয়। ১০০ কোটি টাকার পাশাপাশি নিজস্ব জনবল ও ভবন সবকিছুই থাকছে। ২০৩২ সাল পর্যন্ত নিজেদের প্রস্তুত করতে কাজ চলছে।’

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মাঝে কেন বাড়ছে, বিষয়টির গবেষণা দরকার। এইচআইভি নিয়ে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বড় আকারে কর্মসূচি ঠিক করছে।’

বেতন বন্ধের কারণে ডায়াগনোসিস ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এইডস কর্মসূচিসহ ওপির অধীনে চলা অন্যান্য কার্যক্রমের জনবলকে রাজস্ব খাতে আনা হবে নাকি তাদেরকে অন্য খাতে একই ক্যাটাগরিতে দেওয়া হবে, তা নিয়ে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। তারা কাজ করছে।’

আগামী অর্থবছর থেকে ডিপিপির আওতায় সব জেলায় প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কর্মসূচি বিস্তারের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশ ব্যয় করা। তার আলোকে এ খাতে বর্তমান বরাদ্দের দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেশি অর্থ বাড়বে। ফলে এইডস নির্মূল কর্মসূচিতেও বাড়বে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে একসঙ্গে কাজ করব আমরা।’

সচেতনতা ও নজরদারির তাগিদ
অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সী বলেন, ‘সমকামিতা মূলত একটি অভ্যাসগত ও মানসিক অবস্থা থেকে হয়ে থাকে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এটি হয়ে আসছে। আগেও এই শ্রেণির মানুষ ছিল, কিন্তু সামাজিকমাধ্যমের মতো এত সহজ নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় তারা গোপনে থাকত। এখন নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছে, সামনে আসছে।’

করণীয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি থেকে বাঁচার একমাত্র পথ সচেতনতা সৃষ্টি করা। এগুলো যে নৈতিকতার বিপরীত, শারীরিকভাবেও নানা রোগের জন্ম দেয়; এই ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়গুলো কীভাবে ছড়াচ্ছে, তা নজরদারি করতে হবে। আইনের প্রয়োগ দরকার। তবে অবশ্যই এক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা জরুরি।’

সমাজের দুই মেরুর প্রতিক্রিয়া নিয়েও সতর্ক করেন অধ্যাপক মুন্সী। তিনি বলেন, ‘সমকামিতা সম্পর্কে আমাদের সমাজে নেতিবাচক ধারণা অনেক বেশি। একপক্ষ সরাসরি পক্ষে দাঁড়ায়, অন্যপক্ষ বিপক্ষে। ফলে সরকারকে সমতা রেখেই চিন্তা করতে হবে। সমকামী হলেই তাকে ফাঁসি দিয়ে দিতে হবে, আবার সমকামিতার জন্য রাস্তায় নামতে হবে— দুটোর কোনোটি হওয়া উচিত নয়। এতে করে যারা এতে জড়িত, তাদের কাজ বন্ধ না হলেও চিকিৎসা ও ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন নীরবে এইডস ছড়াবে।’

অন্ধকার নামলেই বদলে যায় সীমান্তের সব হিসাব
শেরপুর সীমান্তজুড়ে চোরাচালানের অদৃশ্য করিডোর যেন দিন দিন আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকেই সীমান্ত এলাকায় নেমে আসে এক ভিন্ন বাস্তবতা; যেখানে মাদক, বিদেশি কসমেটিক্স, নিষিদ্ধ পণ্য থেকে শুরু করে বিলাসদ্রব্য পর্যন্ত অবাধে প্রবেশ করছে দেশের অভ্যন্তরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল আর অভিযানের মধ্যেই কীভাবে সক্রিয় এই সিন্ডিকেট? কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এই অন্ধকার বাণিজ্য, আর কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে মূলহোতারা? তা জানতে অনুসন্ধান শুরু করে এশিয়া পোস্ট। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চল হওয়ায় এই চোরাচালানের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্তের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পাহাড়ি ঝিরিপথ, ঘন জঙ্গল এবং দূরবর্তী অবস্থান, চোরাকারবারিদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে। অনুসন্ধানে এশিয়া পোস্ট নিশ্চিত হয়েছে ভারতের তুরা, ঢালু ও আসাম অঞ্চলের বিভিন্ন পাহাড়ি ঝিরিপথ ব্যবহার করে কাঁটাতারের নজরদারি এড়িয়ে অবৈধ পণ্য দেশে ঢুকছে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকার ও ভোরের কুয়াশা চোরাকারবারিদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ সময় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এরমধ্যে শেরপুর সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত এসব অবৈধ পণ্য প্রবেশ করছে। শেরপুরের সীমান্তবর্তী বিলপাড়, নকশি, রাংটিয়া, লোহার ব্রিজ, গোমড়া, সন্ধ্যাকুড়া, হালচাটি, তাওয়াকুচা, বালিজুড়ি, কর্ণজোড়া, রাবার বাগান, বারোমারি, খলচান্দা, নাকুগাঁও, পানিহাটা, শালবাগান অন্যতম। চোরাচালান কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র। অনুসন্ধানে দেখা যায়, সীমান্তের কসমেটিক্স চোরাচালানে নেতৃত্ব দিচ্ছে নাজিমুদ্দিন, সামী, আতিক ও মামুন। অন্যদিকে, মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জুয়েল, রাসেল, লিটন কোচসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাদের অধীনে কাজ করে আরও ছোট ছোট একাধিক গ্রুপ, যারা নির্দিষ্ট দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এদের প্রত্যেকের নামে রয়েছে একাধিক মামলা। এদের চোরাচালানের প্রক্রিয়াও বেশ সুসংগঠিত। প্রথমে পণ্যগুলো ভারতের মেঘালয় সীমান্তসংলগ্ন ঢালুর দোবাচিপাড়া ও বারাঙ্গাপাড়া এলাকায় আনা হয়। এরপর সেখানে অস্থায়ী একটি গুদামে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে বস্তায় ভরে সেগুলো শেরপুর সীমান্তের বিভিন্ন নির্দিষ্ট পয়েন্টে পাঠানো হয়। সেখান থেকে পণ্যগুলো গহীন জঙ্গলে সরিয়ে ফেলা হয় এবং পরবর্তীতে ইজিবাইক, মোটরসাইকেলের সিটের নিচে লুকিয়ে কিংবা স্কুলব্যাগের মতো সাধারণ উপায়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি রাজধানীতেও পৌঁছে দেওয়া হয়। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ময়মনসিংহ সেক্টরে পরিচালিত অভিযানে প্রায় ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য ও মাদক জব্দ করা হয়েছে এবং ১১৪ জনকে আটক করে বিজিবি। তবে এসব অভিযানে নিম্নস্তরের কারবারিরা ধরা পড়লেও মূলহোতারা এখনও আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চোরাচালান চক্রের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলাও ঝুঁকিপূর্ণ। পরিচয় প্রকাশ পেলে হামলার আশঙ্কা থাকে বলে অনেকেই মুখ খুলতে চান না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঝিনাইগাতী উপজেলার এক যুবক বলেন, সন্ধ্যার পর এই এলাকায় একেবারে অন্য রকম পরিবেশ হয়ে যায়। দিনের বেলায় যেটা স্বাভাবিক গ্রাম মনে হয়, রাত নামলেই সেটা যেন বদলে যায়। মাঝেমধ্যে দূর থেকে মানুষের চলাফেরা, ফিসফাস শব্দ, মোটরসাইকেলের আওয়াজ শোনা যায়। কারা আসে, কী নিয়ে আসে সব কিছুই অনেক সময় চোখে পড়ে, কিন্তু মুখ খুলে কিছু বলার সাহস নাই। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে চুপ থাকতেই হয়। আরেক বাসিন্দা বলেন, মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হয়, তখন কিছুদিন একটু কমে যায়। কিন্তু পরে আবার আগের মতোই শুরু হয়। সাধারণত ছোটখাটো লোকজনই ধরা পড়ে, যারা বহন করে বা নিচু পর্যায়ে কাজ করে। কিন্তু যারা আসল নিয়ন্ত্রণ করে, বড় সিন্ডিকেট চালায় তাদের কিছুই হয় না। নালিতাবাড়ী পানিহাটা এলাকার বাসিন্দারা জানান, এই এলাকায় কাজের সুযোগ খুব বেশি নেই, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। অনেকেই বেকার থাকে, তাই কিছু ছেলে সহজেই এসব কাজে জড়িয়ে পড়ে, কারণ এতে দ্রুত টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু তারা আসলে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না, শুধু নির্দেশ পালন করে। যারা মূলত এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে, তারা অনেক দূরে থাকে, সামনে আসে না, তাই তাদের ধরা কঠিন হয়ে যায়। আমরা সাধারণ মানুষ চাই এসব বন্ধ হোক, এলাকায় শান্তি ফিরুক, কিন্তু ভয় আর অনিশ্চয়তার কারণে কেউ খোলাখুলি কিছু বলতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমান্তে নজরদারির ঘাটতির সুযোগ নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে এই চক্র সক্রিয় রয়েছে। শক্তিশালী নেটওয়ার্ক থাকায় মূলহোতারা বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।  শেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. সিরাজুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদকের ব্যবসা করে আসছে। মাদকচক্রের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদেরকে নিশ্চিত করতে হলে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর তৎপরতা বাড়াতে হবে এবং আন্ত:দেশীয় সমন্বয় সাধন করতে হবে। তাহলেই এই মাদকদ্রব্য, চোরাকারবারি চিরতরে বন্ধ না হলেও সহনীয় অবস্থায় রাখা সম্ভব। চোরাকারবারি বন্ধ হলে আমাদের যুব সমাজ যারা বিপথে যাচ্ছে, তারা সুপথে ফিরে আসবে বলে আমি মনে করি। পুলিশ জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিজিবি জানায়, চোরাচালানকারীদের ধরতে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলো বনজঞ্জল ও পাহাড়ি এলাকা। এসব এলাকার কোন কোন জায়গায় কাঁটাতারের বেড়াও নেই। ফলে এই এলাকাগুলো মাদক ও চোরাকারবারিদের রুট। আমার বিভিন্ন সময় বড় বড় অভিযানে উদ্ধার মাধ্যমে প্রমাণ পেয়েছি।  তিনি আরও বলেন, শেরপুর জেলা পুলিশ ও তার গোয়েন্দা টিম এবং উপজেলার যে তিনটি থানা রয়েছে, সেই থানার সকল গোয়েন্দা টিম সব সময় মাদক ও চোরাকারবারিদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন সময় স্পেশাল অভিযানের মাধ্যমেও চোরাকারবারিদের ধরতে কাজ করছি। শুধু তাই নয়, এ সীমান্ত অঞ্চল থেকেও বড় বড় মাদকসহ অন্যান্য চালান কিন্তু পুলিশ জব্দ করার পাশপাশি কারবারিদের আটক করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ ৩৯ বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, সীমান্ত অঞ্চলে নিয়মিত টহল ও অভিযান চলছে। দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে জাল নোট পাচাররোধে সীমান্তে গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।  তিনি আরও বলেন, সীমান্তে চোরাচালান, মাদক, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে বিজিবি কাজ করছে। এসব ক্ষেত্রে ড্রোন, নাইট ভিশন ও ডিজিটাল সার্ভিলেন্সের মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করেছে। এসব কার্যক্রম সফল করতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাংবাদিক ও সাধারণ জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন রয়েছে।
অন্ধকার নামলেই বদলে যায় সীমান্তের সব হিসাব
মন্ত্রিসভার পরিধি বাড়ছে, আলোচনায় বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মন্ত্রিসভার আকার যেকোনো সময় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রদবদল হতে পারে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে। সরকার ও বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্রের সঙ্গে আলাপ করে এমন ইঙ্গিত মিলেছে। সরকারের জনবান্ধব বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনের কাজের গতি বাড়াতে ঈদুল আজহার পর বাজেট অধিবেশন শেষে এই সম্প্রসারণ হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য হচ্ছে যেসব মন্ত্রণালয়ে কাজের চাপ বেশি, সেখানে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসা এবং একজন মন্ত্রীর দায়িত্ব একটি মাত্র দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় কয়েকজনকে উপমন্ত্রী হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এছাড়া সংরক্ষিত নারী আসন থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যকে মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে। আলোচনায় যাদের নাম নতুন মন্ত্রিসভায় কয়েকজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, পোড় খাওয়া রাজনীতিক এবং দুই-একজন তরুণ মুখ দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় আসছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং কাজের ধীরগতির বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। অবিলম্বে এটি কাটিয়ে উঠতে চায় সরকার। বর্তমান মন্ত্রিসভার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের আভাস মিলেছে। তিনজন মন্ত্রীর দায়িত্ব কমানোর পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তন হতে পারে। ইতোমধ্যে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন মন্ত্রী এবং দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আরেক মন্ত্রীর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে তাদের দায়িত্ব কমিয়ে দেওয়ার আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে বর্ধিত মন্ত্রিসভায় দেখা যাবে। এক্ষেত্রে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে। বর্তমান মন্ত্রিসভায় নোয়াখালী অঞ্চলের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুকের নামও আলোচনায় রয়েছে। নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে তিনি ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের নামও আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে পারেন ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ও দোহার-নবাবগঞ্জের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক, কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় আছেন খুলনার আজিজুল বারী হেলাল, ফরিদপুরের শহিদুল ইসলাম বাবুল ও সিরাজগঞ্জের আমিরুল ইসলাম খান আলিমের মতো নেতারা। মন্ত্রিসভার বাইরে সংসদ উপনেতা হিসেবে দলের স্থায়ী কমিটির প্রবীণ দুই সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আব্দুল মঈন খানের নাম আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদে দুজন সদস্য বাড়তে পারে। টেকনোক্র্যাট কোটা টেকনোক্র্যাট কোটায় আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের মতো ত্যাগী নেতারা। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। বর্ধিত মন্ত্রিসভায় তাকেও দেখা যেতে পারে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেলের নাম আলোচনায় রয়েছে। বগুড়ার এই নেতা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কবে নাগাদ নতুন মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নাম ঘোষণা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত নির্দেশনা আসেনি। তবে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘এ বিষয়ে দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা হয়নি। এটি দলের চেয়ারম্যান ও সরকারপ্রধান তারেক রহমান ভালো বলতে পারবেন। তিনি কখন কাকে নেবেন, কোথায় দায়িত্ব দেবেন; সেটি সম্পূর্ণ তার এখতিয়ার।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, ‘এটি একান্তই প্রধানমন্ত্রীর বিষয়। তিনি যদি মনে করেন বর্তমান সদস্যদের নিয়ে সরকার পরিচালনা করবেন, তাহলে সেটিই করবেন। আবার কাজের সুবিধার্থে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করলে সেটিও করতে পারেন।’ বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। তবে কোনো উপমন্ত্রী নেই।
মন্ত্রিসভার পরিধি বাড়ছে, আলোচনায় বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা
নতুন কমিটি গঠনে কৃষক দলে হিসাব-নিকাশ, আলোচনায় কয়েক নেতা
সরকার পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে দৃশ্যত সক্রিয় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও কৃষক দলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে আসতে আগ্রহী নেতাদের তৎপরতা কয়েক গুণ বেড়েছে।  শনিবার  (৯ মে) ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তারেক রহমান। এরপর কৃষক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে তার।  সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বৈঠকগুলো সংগঠন পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘দলীয় অঙ্গসংগঠনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং নতুন নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দ্রুতই এ বিষয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে।’ দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানের নির্দেশনায় মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কৃষক দলেও নতুন নেতৃত্ব আসছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনকে সভাপতি এবং সাবেক ছাত্রনেতা শহিদুল ইসলাম বাবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুকে সিনিয়র সহসভাপতি, অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবর্তীকে সহসভাপতি, প্রকৌশলী টিএস আইয়ুবকে সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক, মোশারফ হোসেনকে যুগ্ম সম্পাদক এবং মো. শফিকুল ইসলামকে দপ্তর সম্পাদক করা হয়। পরে একই বছরের ৭ ডিসেম্বর ২৩১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। বর্তমান সভাপতি হাসান জাফির তুহিন সচিব পদমর্যাদায় বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় সংগঠনে আগের মতো সময় দিতে পারছেন না। একইভাবে সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুলও সংসদ সদস্য হিসেবে ব্যস্ত থাকায় সাংগঠনিক কাজে সময় সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে সংগঠনকে গতিশীল রাখতে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে। জাতীয়তাবাদী কৃষক দল বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। অতীতে এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়া ও বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়াও আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর মতো শীর্ষ নেতারা। নতুন নেতৃত্বে যারা আলোচনায় কৃষকদলের নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন—বর্তমান কৃষক দলের সিনিয়র সহসভাপতি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, বিএনপির গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক কৃষিবিদ শামিমুর রহমান শামীম এবং বর্তমান কমিটির সহসভাপতি খলিলুর রহমান (ভিপি ইব্রাহিম)। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন—বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ এবং এ্যাবের সাধারণ সম্পাদক এবং কৃষকদলের যুগ্ম সম্পাদক শাহাদত হোসেন বিপ্লব। তবে সাধারণ সম্পাদক পদে কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশের নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ বাঞ্ছারামপুর আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। পরে সেখান থেকে শেষ পর্যন্ত বিএনপি জোটের প্রার্থী জোনায়েদ সাকিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এ ছাড়া ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের মধ্য থেকেও কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। নতুন কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার কাছে অফিসিয়ালি এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। তবে সংগঠনের গতিশীলতার স্বার্থে পরিবর্তন আসতেই পারে—এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি এখন সরকার পরিচালনা করছে, তাই জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা বেড়েছে। যেসব কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পুনর্গঠন করা হবে এবং সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারাই স্থান পাবেন।’ সব মিলিয়ে বিএনপির অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনের এই উদ্যোগকে ঘিরে দলীয় রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের আভাস মিলছে। বিশেষ করে কৃষক দলের নতুন কমিটি যে কোনো সময় ঘোষণা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
নতুন কমিটি গঠনে কৃষক দলে হিসাব-নিকাশ, আলোচনায় কয়েক নেতা
দাবি সাবেক বিশেষ সহকারী সায়েদুরের / হাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেনি কেউ
দেশে হামে তিন শতাধিক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় এই রোগের টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গাফিলতিকে দুষছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তবে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। তার দাবি, হাম নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সতর্ক করেনি। যদিও ইউনিসেফের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা তৎকালীন সরকারকে সতর্ক করেছিলেন। বর্তমানে দেশের ৬১টি জেলায় হামে ভুগছে শিশুরা। সরকারি হিসাবে শুধু গত ৫০ দিনেই সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগী ৪৭ হাজার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩১১ শিশুর। সর্বশেষ সোমবার (৪ মে) হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এক দিনে রেকর্ড ১৭ জনের মৃত্যু খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এমন পরিস্থিতির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে দুষছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তারা বলছেন, ওই সময়ে হামের টিকাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।  অভিযোগের মুখে ডা. সায়েদুর রহমানের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারকে কেউ এ নিয়ে সতর্ক করেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কিংবা সংক্রামক রোগ নিয়ে কাজ করা কোনো বেসরকারি সংস্থা কেউ সাবধান করেনি। দেশের প্রখ্যাত রোগতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদরাও কোনো সতর্কবার্তা দেননি।  এশিয়া পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিকা কেনার জটিলতা, বিশেষ ক্যাম্পেইন না হওয়ার কারণ, অপারেশন প্ল্যান (ওপি) থেকে সরে আসা এবং হামে রেকর্ড মৃত্যুসহ সামগ্রিক বিষয়ে কথা বলেছেন সায়েদুর রহমান। ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে হামের টিকা ক্যাম্পেইন আয়োজন সম্ভব না হওয়ার বিষয়ে তার কাছে জানতে চান এ প্রতিবেদক। উত্তরে তিনি বলেন, আগের দুটি বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল ২০১৪ ও ২০২০ সালে, অর্থাৎ মাঝে ছয় বছরের ব্যবধান ছিল।  পরবর্তী বিশেষ কর্মসূচি ২০২৪ সালে হওয়ার কথা ছিল। এটি স্বীকার করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ছয় মাস স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অত্যন্ত জটিল, জরুরি ও সংবেদনশীল অনেক বিষয় মোকাবিলা করতে হয়েছিল। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের তথ্য যাচাই এবং আহতদের দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনার সমন্বয় করতে হয়েছে।  পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ২০২৫ সালের মার্চে বিশেষ হাম কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় এমআর ভ্যাকসিন বরাদ্দ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তপত্র স্বাক্ষর করে ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার বৈশ্বিক জোট গ্যাভি। তখন ভ্যাকসিনের চালান দুই ধাপে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর এবং ২০২৬ সালের মার্চে দেশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়। এই পরিকল্পনার বিষয়ে সায়েদুর রহমান বলেন, সে সময় কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিশেষ হাম কর্মসূচি জরুরিভিত্তিতে অবিলম্বে শুরু করার মতো কোনো সতর্কতা, বার্তা, লাল সংকেত বা পরামর্শ ছিল না। তিনি বলেন, আজকে পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, যদি সে সময় কোনো দেশি-বিদেশি সংস্থা, কর্তৃপক্ষ বা বিশেষজ্ঞের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সতর্কতা পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো আমরা চালান পৌঁছানোর দিনক্ষণ পুনর্নির্ধারণ করে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারতাম। ডা. সায়েদুর রহমানের এমন দাবির সঙ্গে অবশ্য একমত নন ইউনিসেফের কর্মকর্তারা। মঙ্গলবার (৫ মে) সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে কথা বলেছেন জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া। তিনি বলেন, ইউনিসেফ একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রতিটি বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, জটিলতা বৃদ্ধি এবং মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে।  হামে তিন শতাধিক শিশুর মৃত্যুর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বর্তায় কি না—এমন প্রশ্নে সায়েদুর রহমান বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং আমাদের দেশের সবাই প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুর মৃত্যুতে গভীরভাবে মর্মাহত। শুধু স্বাস্থ্য খাতের অংশীজন নয়, সারা দেশের মানুষের আবেগের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। দায় বিষয়ে আলোচনাটা খুব সংবেদনশীল এবং এখন এটি নির্ধারণ করাও জটিল। তবে সেই নির্ধারণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে দায় চাপিয়ে দেওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক ও প্রশাসনিক ঘটনাবলির বিশ্লেষণ এবং তার ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ। তবে আমি আগেও উল্লেখ করেছি যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় টিকা কিনতে প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও নীতিগত সহায়তা স্বল্পতম সময়ে প্রদান করেছে।  অন্তবর্তী সরকারের সময় হামের টিকার তুলনামূলকভাবে কম কাভারেজ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা তথ্যের বিষয়ে সায়েদুর রহমান জানান, ২০২৪ সালে হামের টিকার প্রথম ডোজের কাভারেজ ছিল ৯৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ৯৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালের কাভারেজ নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারীরা দেশব্যাপী প্রায় তিন মাস টিকাদানের তথ্য নিয়মিত আপলোড করেননি। ফলে ড্যাশবোর্ডে কাভারেজ ৫৯ শতাংশ দেখাচ্ছিল, যা পরে অপসারণ করা হয়। নির্ভরযোগ্য উৎস অনুযায়ী, গত বছর হামের প্রথম ডোজের প্রকৃত কাভারেজ ছিল ৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কাভারেজ কিছুটা কম থাকার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেটুকু কম টিকাদান দৃশ্যমান হচ্ছে, তার প্রধান কারণ স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলন-কর্মবিরতি-অসহযোগিতা। এর পাশাপাশি অনেক পদ শূন্য থাকায় কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ, কোভিড-পরবর্তী টিকাভীতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকাবিরোধী প্রচারণাকেও কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। ইউনিসেফের সঙ্গে টিকা সরবরাহে জটিলতার অভিযোগ প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান বলেন, ইউনিসেফের সঙ্গে টিকা সরবরাহ সংক্রান্ত জটিলতা হয়েছে বলাটা ঠিক হবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইউনিসেফ জরুরি প্রয়োজনে একাধিকবার অর্থ পরিশোধের আগেই টিকা সরবরাহ করেছে।   ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) টিকা কেনার প্রস্তাব উপদেষ্টা পরিষদের অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত কমিটিতে উত্থাপন করা হলে কমিটি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ অনুসরণের কথা জানায়। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে কমিটি ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি টিকা কেনার অনুমোদন দেয়।  ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৮৪২ কোটি টাকার টিকা ডিপিএম পদ্ধতিতে কেনার অনুমতি চাওয়া হলে কমিটি ৫০ শতাংশের অনুমোদন দেয়। বাকি অংশের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম) অনুসরণের নির্দেশ দেয়। সেই অনুযায়ী নভেম্বরে ৪১৯ কোটি টাকার টিকা ডিপিএম পদ্ধতিতে ইউনিসেফের কাছ থেকে কেনার অনুমোদন পাওয়া যায়।  চলতি বছরের জানুয়ারিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ থেকে আরও ৬০৯ কোটি টাকার টিকা ডিপিএম পদ্ধতিতে কেনার প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এক হাজার ২৮ কোটি টাকার টিকা কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে ইউনিসেফের সঙ্গে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অর্থ সমন্বয় করতে দেরি হওয়ায় বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড় করাতেও সময় লাগে।  বাকি ৫০ শতাংশ টিকা কেনার বিষয়ে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ইউনিসেফ লিখিতভাবে ডিপিএম পদ্ধতি অনুসরণের অনুরোধ করে। ৩০ ডিসেম্বর ডিপিএম সুবিধা ব্যাখ্যা করে ইমেইল পাঠায়। পরের বছর ১১ ফেব্রুয়ারি ডিপিএম ও ওটিএম পদ্ধতিতে সময়ের পার্থক্য তুলে ধরে আবারও যোগাযোগ করে সংস্থাটি। এ প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান বলেন, ইউনিসেফের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাওয়ার পর নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততার ফলে সিদ্ধান্তগ্রহণের বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের বিবেচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়।  ইউনিসেফের পরামর্শ উপেক্ষা করে ওটিএম পদ্ধতিতে কোনো টিকা কেনা হয়নি জানিয়ে সায়েদুর রহমান বলেন, আমি যেহেতু নিশ্চিত নই, তাই ইউনিসেফের সঙ্গে কোনো জটিলতা হয়েছে, এমনটা বলছি না। তবুও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ বা বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা যেতে পারে, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে নিয়মিত ক্রয়ের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে বিধিমালা অনুসরণের সিদ্ধান্তের কারণে সম্ভবত ইউনিসেফের দিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকতে পারে।  বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই ওপি থেকে সরে আসার অভিযোগ প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান জানান, ১৯৯৮ সাল থেকে সরকার স্বাস্থ্য খাতে দাতানির্ভর সেক্টর ওয়াইড প্ল্যান (খাতভিত্তিক পরিকল্পনা) অনুসরণ করে আসছিল। তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শেষে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) অনুমোদনের সময় ২০১৭ সালে পরিকল্পনা কমিশন এক্সিট প্ল্যান তৈরির তাগিদ দেয়। কিন্তু তখনকার সরকার কোনো এক্সিট প্ল্যান ছাড়াই চতুর্থ এইচপিএনএসপি শেষ করে এবং দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চালায়। এমনকি পরবর্তী পঞ্চম এইচপিএনএসপিও (২০২৪-২০২৯) একই প্রক্রিয়ায় প্রণয়ন করা হয়।  অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পঞ্চম এইচপিএনএসপি পরিকল্পনা কমিশনে উত্থাপন করা হলে এক্সিট প্ল্যানসহ পুনরায় উপস্থাপনের নির্দেশনা দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দাতানির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ নির্ধারণে মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়।  সায়েদুর রহমান বলেন, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া ওপি থেকে সরে আসা হয়েছে বলে যে কথাটি বলা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। ট্রানজিশনাল ডিপিপি অথবা ব্রিডিং ডিপিপি—যে নামেই বলি না কেন, এগুলোই ছিল বিকল্প ব্যবস্থা। তবে দীর্ঘদিন ওপিনির্ভর ব্যবস্থায় অভ্যস্ত থাকায় অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় ও দাতা সংস্থাগুলো বিকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় নেয়। পরে মন্ত্রিপরিষদ ও একনেকের অনুমোদন পেতেও দেরি হয়।  উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কি না। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কেনা হলে আনুমানিক কত অর্থ সাশ্রয় সম্ভব ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে সায়েদুর রহমান বলেন, উন্মুক্ত দরপত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিয়মিত প্রক্রিয়া। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়েও এই পদ্ধতি নিয়মিত অনুশীলন করা হয়। ফলে সিদ্ধান্তটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়নি। আর এখন পর্যন্ত ইপিআইর (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) টিকা কেনায় কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজার যাচাই করা হয়নি। তাই কত অর্থের সাশ্রয় সম্ভব ছিল সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না।  আপনি টিকা কেনায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের কথা বলেছেন। এখানে স্বচ্ছতা বলতে ঠিক কী বোঝাচ্ছেন? অতীতে কী ধরনের অস্বচ্ছতা বা অনিয়মের অভিযোগ ছিল? এমন প্রশ্নে ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়াকে সাধারণ দৃষ্টিতে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বলে মনে করা হয়। আমি শুধু সেটুকুই বুঝিয়েছি। অতীতে টিকা কেনায় অনিয়মের কথা বলিনি। শুধু অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি সংশ্লিষ্ট বিধি উল্লেখ করে যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন, সেটার কথা বলেছি। যে কোনো নিয়মিত ক্রয় এবং যে ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ছে, সেক্ষেত্রে যারাই সরকারের দায়িত্বে থাকবেন, নিশ্চয়ই তারা রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইবেন। সেক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনের ধারা বছরের পর বছর ধরে প্রয়োগ করবেন বলে আমার মনে হয় না।
হাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেনি কেউ
বিএনপি-জামায়াত ‘লড়াই’ এবার গরুর হাটের ইজারা নিয়ে
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশের খালি জায়গায় কোরবানির অস্থায়ী পশুর হাটের চলতি বছর সরকারি ইজারা মূল্য ধরা হয় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আগের বছর এই হাটের মূল্য ছিল ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। ফলে এবার প্রায় এক কোটি টাকা কমে দর নির্ধারণ করা হয়েছে। খাতা-কলমে এ হাটের সীমানা দনিয়া কলেজের পূর্ব পাশ থেকে শুরু করে সনটেক মহিলা মাদ্রাসার পূর্ব-পশ্চিমের খালি জায়গা পর্যন্ত ছিল। কিন্তু এবার এটি মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশের খালি জায়গা নিয়ে নির্ধারণ করে গত ৩০ এপ্রিল হাটের ইজারার দর উন্মুক্ত করা হয়। তবে সরকারি মূল্য কমলেও হাটটির প্রতিযোগিতা হয়েছে সর্বোচ্চ। চারটি দরপত্রের মধ্যে তিনটিতে চার কোটি টাকার বেশি দর এসেছে, আরেকটির দর না এলেও সর্বোচ্চ পে-অর্ডার জমা দিয়েছেন। শুধু এ হাটেরই এমন চিত্র নয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১১টি অস্থায়ী পশুর হাটের একই চিত্র দেখা গেছে। বিগত ১৭ বছর রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নেতাকর্মীদের হাতে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরের বছর ডিএসসিসির অস্থায়ী পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ মূলত বিএনপি নেতাদের হাতে থাকলেও এবার দৃশ্যপট বদলেছে।  হাটের নাম পরিবর্তন করে খাতা-কলমে জায়গা কমিয়ে সরকারি মূল্য কমালেও এ বছর বিএনপি নেতাদের সঙ্গে জামায়াত নেতারা অংশ নেওয়ায় হাটের দরে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এসব হাটের মধ্যে শুধু দুটি হাটে সিন্ডিকেটের কারণে কোনো দরই পড়েনি, আরেকটি হাটে গত বছরের ধারাবাহিকতায় সরকারি মূল্যের চেয়েও কম দর পড়েছে। ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর দনিয়া কলেজের পূর্ব পাশে ও সনটেক মহিলা মাদ্রাসার পূর্ব-পশ্চিমের খালি জায়গা নামে হাটটি স্থানীয় বিএনপির নেতা তারিকুল ইসলাম তারেক ইজারা নেন। তবে এ কার্যক্রমের পেছনে ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক নেতা নবীউল্লাহ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক কাউন্সিলর জুম্মন। এ বছরও তারেক দরপত্রের জন্য ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা দিলেও কোনো দর উল্লেখ করেননি। অন্যদিকে এবার স্থানীয় জামায়াত নেতা শামীম খানের প্রতিষ্ঠান কে বি ট্রেড সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা দর দিয়েছে। সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ দর উন্মুক্ত করার সময় এ হাটটি চূড়ান্ত না করে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে সম্পত্তি বিভাগ সর্বোচ্চ পে-অর্ডার দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে দর জানাতে চিঠি দেবে বলে জানা গেছে। এর আগে গত ২৭ এপ্রিল দুপুর ১টার দিকে ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগে যাত্রাবাড়ীর কাজলা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট এবং শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ড-সংলগ্ন জায়গা নামে হাটের দরপত্র সংগ্রহ করতে আসেন শ্যামপুর থানা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মহিউদ্দিনসহ দলের নেতাকর্মীরা। এ সময় শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিমেল, যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির নেতা শ্যামলের সঙ্গে তাদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে ডিএসসিসির সব আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দরপত্র বিক্রি নিশ্চিত করে সংস্থাটি। এ সময় ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশও মোতায়েন করা হয়। ডিএসসিসির হাটের ইজারায় অংশগ্রহণ নিয়ে জামায়াত নেতা শামীম খানকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা ভালো বলতে পারবেন। কেন্দ্রের নির্দেশনায় এ বছর হাটের ইজারায় অংশ নিয়েছি।’ জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের একাধিক নেতা এশিয়া পোস্টকে জানান, এ বছর ঢাকার দুটি নির্বাচনি এলাকার পশুর হাটসহ বিভিন্ন পশুর হাটে নেতাকর্মীরা ইজারায় অংশ নেন। আওয়ামী লীগের সময় তারা কোনো ধরনের সরকারি দরপত্রের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরের বছর তারা অংশ না নিলেও এ বছর ডিএসসিসির হাটে অংশ নিয়েছেন। ডিএসসিসি সূত্র আরও জানায়, পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের নদীর পাড়ের খালি জায়গার পশুর হাটটির এ বছর সরকারি মূল্য ছিল ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। কাজী মাহবুব মওলা হিমেল হাটটি ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন। স্থানীয় জামায়াত নেতাদের সমর্থনে মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন হাটটিতে ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা দর দেন। রাজধানীর হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজের পূর্ব পাশের খালি জায়গায় অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি মূল্য ছিল ৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এ বছর এটির জায়গা কলেজের সামনে থেকে শিকদার মেডিকেল কলেজসংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের খালি জায়গায় স্থানান্তর করা হয়েছে। এতেই হাটটির ৭৪ লাখ টাকা কমিয়ে সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। গণঅভ্যুত্থানের আগের বছর হাটটি হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবুল হাসনাত ৬ কোটি ৬ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন। গত বছর মেসার্স সাব্বির এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী নাফিজ কবির ৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় হাটটির ইজারা নেন। এ বছরও তিনি সরকারি মূল্যের চেয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে ইজারা নিয়েছেন। গত বছর উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গার পশুর হাটের সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৮২ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪ টাকা। চলতি বছর সরকারি মূল্য কমিয়ে ১ কোটি ৭৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৩৪ টাকা করা হয়। গত বছর সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা সিকদার কনস্ট্রাকশনের আনিসুর রহমান টিপু ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা দিয়ে ইজারা নিলেও একই হাট এবার তিনি ৩ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ে ইজারা নেন। আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গার সরকারি মূল্য ছিল ৫৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। এ বছর তা কমিয়ে ৫৩ লাখ টাকা করা হয়। গত বছর হাটটি ডেমরা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদিন রতন ৫৫ লাখ টাকায় নেন। এ বছর হাটটি তিনি ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন। এই হাটের দরপত্রেও জামায়াতের নেতারা প্রতিযোগিতা করেছেন। গত বছর আফতাবনগর (ইস্টার্ন হাউজিং) হাটের ইজারা বিজ্ঞপ্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত আদালতে নির্দেশে তা স্থগিত করা হয়। এ বছর হাটটির ইজারা বিজ্ঞপ্তি না দিলেও খালের দক্ষিণ পাড়ের মোয়াজ্জেম মোড়সংলগ্ন গ্রিন বনশ্রী হাউজিংয়ের খালি জায়গায় ৭০ লাখ টাকার সরকারি মূল্যে ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। তিনজন দরদাতার মধ্যে মোহাম্মদ গোলাম হোসেন ২০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে হাটের ইজারা নিয়েছেন। বাকি দুজনের দরের ব্যবধান ছিল ৫ ও ১০ হাজার টাকা। গত বছর কমলাপুরে সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারের পূর্ব পাশের খালি জায়গার সরকারি মূল্য ছিল ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। প্রতিবছর এই হাট ব্রাদার্স ক্লাব থেকে সাদেক হোসেন কমিউনিটি সেন্টার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এবার হাটটির ইজারা বিজ্ঞপ্তিতে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গার নাম উল্লেখ করা হয়।  শুধু আয়তন কম দেখিয়ে এবার মাত্র ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়, যা আড়াই গুণ কম। তবে হাটটিতে শেষ পর্যন্ত পাঁচটি দরপত্র জমা পড়েছে। এ বছর মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন নামে স্থানীয় এক নেতা ৩ কোটি ১ লাখ টাকা সর্বোচ্চ মূল্যে হাটের ইজারা পেয়েছেন। আরও দুজনের দর ২ কোটি টাকার বেশি ছিল। গোলাপবাগ মাঠসংলগ্ন খালি জায়গায় এ বছর নতুন করে দেয়া হাটের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। হাটটিতে ছয়টি দরপত্রের মধ্যে ২ কোটি ৫ লাখ টাকায় আহসানউল্লাহ নামে স্থানীয় বিএনপি নেতা হাটটির ইজারা নিয়েছেন। এই হাটে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা পৃথক ইজারা দর দিয়েছিলেন। সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গা ও ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালের আশপাশের খালি জায়গাসংলগ্ন হাটটির গত বছরের সরকারি মূল্য ছিল ৪ কোটি ৬৪ লাখ ১৫ হাজার ২৮০ টাকা। এ বছর ইজারা বিজ্ঞপ্তিতে শুধু মাঠের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গা উল্লেখ করে সরকারি মূল্য করা হয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। গত বছর হাটটির প্রথম পর্যায়ে ২ কোটি  টাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা তুষার আহমেদ ইমরান ইজারা দর দেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় পর্যায়ে এনসিপির এক নেতা সরকারি মূল্যের চেয়েও বেশি মূল্য দিলেও শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেটের কারণে হাটের ইজারা নিতে পারেননি। স্থানীয় বিএনপি নেতারা ধোলাইখাল ট্রাক স্ট্যান্ডের সড়কে হাট না বসানোর জন্য প্রশাসককে একাধিক চিঠি দেন সে সময়। পরে সরকারি মূল্যের চেয়ে অনেক কমে হাটটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়া হয়। এ বছরও স্থানীয় বিএনপি নেতা তুষার আহমেদ ইমরান একমাত্র দরদাতা হিসাবে মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা দর দিয়েছেন। এই হাটটির সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি এবং ওয়ারী থানা বিএনপির নেতারা জড়িত আছেন। তুষার আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘হাটের সঙ্গে সবাই জড়িত আছে। একা তো হাটের ইজারা নেওয়া যায় না।’ শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ডসংলগ্ন খালি জায়গার এ বছর সরকারি মূল্য ছিল ৬৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা। এ বছর হাটটির সরকারি মূল্য দাঁড়ায় ৬৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। তবে এখন পর্যন্ত হাটটির কোনো দরপত্র জমা হয়নি। লালবাগের রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি জায়গার পশুর হাটের গত বছর সরকারি মূল্য ছিল ৬৭ লাখ ৩১ হাজার ৬৬৭। সে সময় চকবাজার বিএনপি নেতা টিপু সুলতান ৭৪ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা নিয়েছেন। এ বছর হাটটির সরকারি মূল্য কমে ৬২ লাখ ৬৭ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। তবে এখন পর্যন্ত হাটটির কোনো দরপত্র জমা হয়নি। জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সংস্থাটির দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছিল হাটের দর কমানোর। তাই হাটের জায়গার নাম বদলে আয়তন কমিয়ে সরকারি মূল্য কমানো হয়েছিল। দরপত্র বিক্রি ও জমাদানেও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ হাটে দরদাতারা একাধিক রাজনৈতিক দলের হওয়ায় দরপত্রে প্রতিযোগিতা হয়েছে। ডিএসসিসিরি পশুর হাটে দুই দশক পর এ রকম প্রতিযোগিতা দেখা গেছে।’
বিএনপি-জামায়াত ‘লড়াই’ এবার গরুর হাটের ইজারা নিয়ে
অন্ধকার নামলেই বদলে যায় সীমান্তের সব হিসাব
অন্ধকার নামলেই বদলে যায় সীমান্তের সব হিসাব
শেরপুর সীমান্তজুড়ে চোরাচালানের অদৃশ্য করিডোর যেন দিন দিন আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকেই সীমান্ত এলাকায় নেমে আসে এক ভিন্ন বাস্তবতা; যেখানে মাদক, বিদেশি কসমেটিক্স, নিষিদ্ধ পণ্য থেকে শুরু করে বিলাসদ্রব্য পর্যন্ত অবাধে প্রবেশ করছে দেশের অভ্যন্তরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল আর অভিযানের মধ্যেই কীভাবে সক্রিয় এই সিন্ডিকেট? কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এই অন্ধকার বাণিজ্য, আর কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে মূলহোতারা? তা জানতে অনুসন্ধান শুরু করে এশিয়া পোস্ট। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চল হওয়ায় এই চোরাচালানের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্তের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পাহাড়ি ঝিরিপথ, ঘন জঙ্গল এবং দূরবর্তী অবস্থান, চোরাকারবারিদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে। অনুসন্ধানে এশিয়া পোস্ট নিশ্চিত হয়েছে ভারতের তুরা, ঢালু ও আসাম অঞ্চলের বিভিন্ন পাহাড়ি ঝিরিপথ ব্যবহার করে কাঁটাতারের নজরদারি এড়িয়ে অবৈধ পণ্য দেশে ঢুকছে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকার ও ভোরের কুয়াশা চোরাকারবারিদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ সময় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এরমধ্যে শেরপুর সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত এসব অবৈধ পণ্য প্রবেশ করছে। শেরপুরের সীমান্তবর্তী বিলপাড়, নকশি, রাংটিয়া, লোহার ব্রিজ, গোমড়া, সন্ধ্যাকুড়া, হালচাটি, তাওয়াকুচা, বালিজুড়ি, কর্ণজোড়া, রাবার বাগান, বারোমারি, খলচান্দা, নাকুগাঁও, পানিহাটা, শালবাগান অন্যতম। চোরাচালান কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র। অনুসন্ধানে দেখা যায়, সীমান্তের কসমেটিক্স চোরাচালানে নেতৃত্ব দিচ্ছে নাজিমুদ্দিন, সামী, আতিক ও মামুন। অন্যদিকে, মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জুয়েল, রাসেল, লিটন কোচসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাদের অধীনে কাজ করে আরও ছোট ছোট একাধিক গ্রুপ, যারা নির্দিষ্ট দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এদের প্রত্যেকের নামে রয়েছে একাধিক মামলা। এদের চোরাচালানের প্রক্রিয়াও বেশ সুসংগঠিত। প্রথমে পণ্যগুলো ভারতের মেঘালয় সীমান্তসংলগ্ন ঢালুর দোবাচিপাড়া ও বারাঙ্গাপাড়া এলাকায় আনা হয়। এরপর সেখানে অস্থায়ী একটি গুদামে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে বস্তায় ভরে সেগুলো শেরপুর সীমান্তের বিভিন্ন নির্দিষ্ট পয়েন্টে পাঠানো হয়। সেখান থেকে পণ্যগুলো গহীন জঙ্গলে সরিয়ে ফেলা হয় এবং পরবর্তীতে ইজিবাইক, মোটরসাইকেলের সিটের নিচে লুকিয়ে কিংবা স্কুলব্যাগের মতো সাধারণ উপায়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি রাজধানীতেও পৌঁছে দেওয়া হয়। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ময়মনসিংহ সেক্টরে পরিচালিত অভিযানে প্রায় ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য ও মাদক জব্দ করা হয়েছে এবং ১১৪ জনকে আটক করে বিজিবি। তবে এসব অভিযানে নিম্নস্তরের কারবারিরা ধরা পড়লেও মূলহোতারা এখনও আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চোরাচালান চক্রের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলাও ঝুঁকিপূর্ণ। পরিচয় প্রকাশ পেলে হামলার আশঙ্কা থাকে বলে অনেকেই মুখ খুলতে চান না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঝিনাইগাতী উপজেলার এক যুবক বলেন, সন্ধ্যার পর এই এলাকায় একেবারে অন্য রকম পরিবেশ হয়ে যায়। দিনের বেলায় যেটা স্বাভাবিক গ্রাম মনে হয়, রাত নামলেই সেটা যেন বদলে যায়। মাঝেমধ্যে দূর থেকে মানুষের চলাফেরা, ফিসফাস শব্দ, মোটরসাইকেলের আওয়াজ শোনা যায়। কারা আসে, কী নিয়ে আসে সব কিছুই অনেক সময় চোখে পড়ে, কিন্তু মুখ খুলে কিছু বলার সাহস নাই। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে চুপ থাকতেই হয়। আরেক বাসিন্দা বলেন, মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হয়, তখন কিছুদিন একটু কমে যায়। কিন্তু পরে আবার আগের মতোই শুরু হয়। সাধারণত ছোটখাটো লোকজনই ধরা পড়ে, যারা বহন করে বা নিচু পর্যায়ে কাজ করে। কিন্তু যারা আসল নিয়ন্ত্রণ করে, বড় সিন্ডিকেট চালায় তাদের কিছুই হয় না। নালিতাবাড়ী পানিহাটা এলাকার বাসিন্দারা জানান, এই এলাকায় কাজের সুযোগ খুব বেশি নেই, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। অনেকেই বেকার থাকে, তাই কিছু ছেলে সহজেই এসব কাজে জড়িয়ে পড়ে, কারণ এতে দ্রুত টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু তারা আসলে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না, শুধু নির্দেশ পালন করে। যারা মূলত এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে, তারা অনেক দূরে থাকে, সামনে আসে না, তাই তাদের ধরা কঠিন হয়ে যায়। আমরা সাধারণ মানুষ চাই এসব বন্ধ হোক, এলাকায় শান্তি ফিরুক, কিন্তু ভয় আর অনিশ্চয়তার কারণে কেউ খোলাখুলি কিছু বলতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমান্তে নজরদারির ঘাটতির সুযোগ নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে এই চক্র সক্রিয় রয়েছে। শক্তিশালী নেটওয়ার্ক থাকায় মূলহোতারা বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।  শেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. সিরাজুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদকের ব্যবসা করে আসছে। মাদকচক্রের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদেরকে নিশ্চিত করতে হলে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর তৎপরতা বাড়াতে হবে এবং আন্ত:দেশীয় সমন্বয় সাধন করতে হবে। তাহলেই এই মাদকদ্রব্য, চোরাকারবারি চিরতরে বন্ধ না হলেও সহনীয় অবস্থায় রাখা সম্ভব। চোরাকারবারি বন্ধ হলে আমাদের যুব সমাজ যারা বিপথে যাচ্ছে, তারা সুপথে ফিরে আসবে বলে আমি মনে করি। পুলিশ জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিজিবি জানায়, চোরাচালানকারীদের ধরতে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলো বনজঞ্জল ও পাহাড়ি এলাকা। এসব এলাকার কোন কোন জায়গায় কাঁটাতারের বেড়াও নেই। ফলে এই এলাকাগুলো মাদক ও চোরাকারবারিদের রুট। আমার বিভিন্ন সময় বড় বড় অভিযানে উদ্ধার মাধ্যমে প্রমাণ পেয়েছি।  তিনি আরও বলেন, শেরপুর জেলা পুলিশ ও তার গোয়েন্দা টিম এবং উপজেলার যে তিনটি থানা রয়েছে, সেই থানার সকল গোয়েন্দা টিম সব সময় মাদক ও চোরাকারবারিদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন সময় স্পেশাল অভিযানের মাধ্যমেও চোরাকারবারিদের ধরতে কাজ করছি। শুধু তাই নয়, এ সীমান্ত অঞ্চল থেকেও বড় বড় মাদকসহ অন্যান্য চালান কিন্তু পুলিশ জব্দ করার পাশপাশি কারবারিদের আটক করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ ৩৯ বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, সীমান্ত অঞ্চলে নিয়মিত টহল ও অভিযান চলছে। দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে জাল নোট পাচাররোধে সীমান্তে গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।  তিনি আরও বলেন, সীমান্তে চোরাচালান, মাদক, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে বিজিবি কাজ করছে। এসব ক্ষেত্রে ড্রোন, নাইট ভিশন ও ডিজিটাল সার্ভিলেন্সের মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করেছে। এসব কার্যক্রম সফল করতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাংবাদিক ও সাধারণ জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন রয়েছে।
মন্ত্রিসভার পরিধি বাড়ছে, আলোচনায় বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা
মন্ত্রিসভার পরিধি বাড়ছে, আলোচনায় বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মন্ত্রিসভার আকার যেকোনো সময় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রদবদল হতে পারে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে। সরকার ও বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্রের সঙ্গে আলাপ করে এমন ইঙ্গিত মিলেছে। সরকারের জনবান্ধব বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনের কাজের গতি বাড়াতে ঈদুল আজহার পর বাজেট অধিবেশন শেষে এই সম্প্রসারণ হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য হচ্ছে যেসব মন্ত্রণালয়ে কাজের চাপ বেশি, সেখানে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসা এবং একজন মন্ত্রীর দায়িত্ব একটি মাত্র দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় কয়েকজনকে উপমন্ত্রী হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এছাড়া সংরক্ষিত নারী আসন থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যকে মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে। আলোচনায় যাদের নাম নতুন মন্ত্রিসভায় কয়েকজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, পোড় খাওয়া রাজনীতিক এবং দুই-একজন তরুণ মুখ দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় আসছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং কাজের ধীরগতির বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। অবিলম্বে এটি কাটিয়ে উঠতে চায় সরকার। বর্তমান মন্ত্রিসভার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের আভাস মিলেছে। তিনজন মন্ত্রীর দায়িত্ব কমানোর পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তন হতে পারে। ইতোমধ্যে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন মন্ত্রী এবং দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আরেক মন্ত্রীর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে তাদের দায়িত্ব কমিয়ে দেওয়ার আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে বর্ধিত মন্ত্রিসভায় দেখা যাবে। এক্ষেত্রে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে। বর্তমান মন্ত্রিসভায় নোয়াখালী অঞ্চলের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুকের নামও আলোচনায় রয়েছে। নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে তিনি ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের নামও আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে পারেন ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ও দোহার-নবাবগঞ্জের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক, কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় আছেন খুলনার আজিজুল বারী হেলাল, ফরিদপুরের শহিদুল ইসলাম বাবুল ও সিরাজগঞ্জের আমিরুল ইসলাম খান আলিমের মতো নেতারা। মন্ত্রিসভার বাইরে সংসদ উপনেতা হিসেবে দলের স্থায়ী কমিটির প্রবীণ দুই সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আব্দুল মঈন খানের নাম আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদে দুজন সদস্য বাড়তে পারে। টেকনোক্র্যাট কোটা টেকনোক্র্যাট কোটায় আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের মতো ত্যাগী নেতারা। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। বর্ধিত মন্ত্রিসভায় তাকেও দেখা যেতে পারে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেলের নাম আলোচনায় রয়েছে। বগুড়ার এই নেতা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কবে নাগাদ নতুন মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নাম ঘোষণা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত নির্দেশনা আসেনি। তবে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘এ বিষয়ে দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা হয়নি। এটি দলের চেয়ারম্যান ও সরকারপ্রধান তারেক রহমান ভালো বলতে পারবেন। তিনি কখন কাকে নেবেন, কোথায় দায়িত্ব দেবেন; সেটি সম্পূর্ণ তার এখতিয়ার।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, ‘এটি একান্তই প্রধানমন্ত্রীর বিষয়। তিনি যদি মনে করেন বর্তমান সদস্যদের নিয়ে সরকার পরিচালনা করবেন, তাহলে সেটিই করবেন। আবার কাজের সুবিধার্থে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করলে সেটিও করতে পারেন।’ বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। তবে কোনো উপমন্ত্রী নেই।
নতুন কমিটি গঠনে কৃষক দলে হিসাব-নিকাশ, আলোচনায় কয়েক নেতা
নতুন কমিটি গঠনে কৃষক দলে হিসাব-নিকাশ, আলোচনায় কয়েক নেতা
সরকার পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে দৃশ্যত সক্রিয় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও কৃষক দলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে আসতে আগ্রহী নেতাদের তৎপরতা কয়েক গুণ বেড়েছে।  শনিবার  (৯ মে) ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তারেক রহমান। এরপর কৃষক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে তার।  সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বৈঠকগুলো সংগঠন পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘দলীয় অঙ্গসংগঠনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং নতুন নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দ্রুতই এ বিষয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে।’ দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানের নির্দেশনায় মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কৃষক দলেও নতুন নেতৃত্ব আসছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনকে সভাপতি এবং সাবেক ছাত্রনেতা শহিদুল ইসলাম বাবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুকে সিনিয়র সহসভাপতি, অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবর্তীকে সহসভাপতি, প্রকৌশলী টিএস আইয়ুবকে সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক, মোশারফ হোসেনকে যুগ্ম সম্পাদক এবং মো. শফিকুল ইসলামকে দপ্তর সম্পাদক করা হয়। পরে একই বছরের ৭ ডিসেম্বর ২৩১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। বর্তমান সভাপতি হাসান জাফির তুহিন সচিব পদমর্যাদায় বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় সংগঠনে আগের মতো সময় দিতে পারছেন না। একইভাবে সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুলও সংসদ সদস্য হিসেবে ব্যস্ত থাকায় সাংগঠনিক কাজে সময় সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে সংগঠনকে গতিশীল রাখতে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে। জাতীয়তাবাদী কৃষক দল বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। অতীতে এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়া ও বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়াও আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর মতো শীর্ষ নেতারা। নতুন নেতৃত্বে যারা আলোচনায় কৃষকদলের নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন—বর্তমান কৃষক দলের সিনিয়র সহসভাপতি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, বিএনপির গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক কৃষিবিদ শামিমুর রহমান শামীম এবং বর্তমান কমিটির সহসভাপতি খলিলুর রহমান (ভিপি ইব্রাহিম)। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন—বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ এবং এ্যাবের সাধারণ সম্পাদক এবং কৃষকদলের যুগ্ম সম্পাদক শাহাদত হোসেন বিপ্লব। তবে সাধারণ সম্পাদক পদে কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশের নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ বাঞ্ছারামপুর আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। পরে সেখান থেকে শেষ পর্যন্ত বিএনপি জোটের প্রার্থী জোনায়েদ সাকিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এ ছাড়া ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের মধ্য থেকেও কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। নতুন কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার কাছে অফিসিয়ালি এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। তবে সংগঠনের গতিশীলতার স্বার্থে পরিবর্তন আসতেই পারে—এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি এখন সরকার পরিচালনা করছে, তাই জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা বেড়েছে। যেসব কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পুনর্গঠন করা হবে এবং সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারাই স্থান পাবেন।’ সব মিলিয়ে বিএনপির অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনের এই উদ্যোগকে ঘিরে দলীয় রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের আভাস মিলছে। বিশেষ করে কৃষক দলের নতুন কমিটি যে কোনো সময় ঘোষণা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
হাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেনি কেউ
দাবি সাবেক বিশেষ সহকারী সায়েদুরের / হাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেনি কেউ
দেশে হামে তিন শতাধিক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় এই রোগের টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গাফিলতিকে দুষছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তবে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। তার দাবি, হাম নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সতর্ক করেনি। যদিও ইউনিসেফের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা তৎকালীন সরকারকে সতর্ক করেছিলেন। বর্তমানে দেশের ৬১টি জেলায় হামে ভুগছে শিশুরা। সরকারি হিসাবে শুধু গত ৫০ দিনেই সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগী ৪৭ হাজার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩১১ শিশুর। সর্বশেষ সোমবার (৪ মে) হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এক দিনে রেকর্ড ১৭ জনের মৃত্যু খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এমন পরিস্থিতির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে দুষছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তারা বলছেন, ওই সময়ে হামের টিকাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।  অভিযোগের মুখে ডা. সায়েদুর রহমানের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারকে কেউ এ নিয়ে সতর্ক করেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কিংবা সংক্রামক রোগ নিয়ে কাজ করা কোনো বেসরকারি সংস্থা কেউ সাবধান করেনি। দেশের প্রখ্যাত রোগতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদরাও কোনো সতর্কবার্তা দেননি।  এশিয়া পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিকা কেনার জটিলতা, বিশেষ ক্যাম্পেইন না হওয়ার কারণ, অপারেশন প্ল্যান (ওপি) থেকে সরে আসা এবং হামে রেকর্ড মৃত্যুসহ সামগ্রিক বিষয়ে কথা বলেছেন সায়েদুর রহমান। ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে হামের টিকা ক্যাম্পেইন আয়োজন সম্ভব না হওয়ার বিষয়ে তার কাছে জানতে চান এ প্রতিবেদক। উত্তরে তিনি বলেন, আগের দুটি বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল ২০১৪ ও ২০২০ সালে, অর্থাৎ মাঝে ছয় বছরের ব্যবধান ছিল।  পরবর্তী বিশেষ কর্মসূচি ২০২৪ সালে হওয়ার কথা ছিল। এটি স্বীকার করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ছয় মাস স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অত্যন্ত জটিল, জরুরি ও সংবেদনশীল অনেক বিষয় মোকাবিলা করতে হয়েছিল। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের তথ্য যাচাই এবং আহতদের দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনার সমন্বয় করতে হয়েছে।  পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ২০২৫ সালের মার্চে বিশেষ হাম কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় এমআর ভ্যাকসিন বরাদ্দ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তপত্র স্বাক্ষর করে ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার বৈশ্বিক জোট গ্যাভি। তখন ভ্যাকসিনের চালান দুই ধাপে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর এবং ২০২৬ সালের মার্চে দেশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়। এই পরিকল্পনার বিষয়ে সায়েদুর রহমান বলেন, সে সময় কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিশেষ হাম কর্মসূচি জরুরিভিত্তিতে অবিলম্বে শুরু করার মতো কোনো সতর্কতা, বার্তা, লাল সংকেত বা পরামর্শ ছিল না। তিনি বলেন, আজকে পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, যদি সে সময় কোনো দেশি-বিদেশি সংস্থা, কর্তৃপক্ষ বা বিশেষজ্ঞের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সতর্কতা পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো আমরা চালান পৌঁছানোর দিনক্ষণ পুনর্নির্ধারণ করে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারতাম। ডা. সায়েদুর রহমানের এমন দাবির সঙ্গে অবশ্য একমত নন ইউনিসেফের কর্মকর্তারা। মঙ্গলবার (৫ মে) সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে কথা বলেছেন জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া। তিনি বলেন, ইউনিসেফ একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রতিটি বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, জটিলতা বৃদ্ধি এবং মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে।  হামে তিন শতাধিক শিশুর মৃত্যুর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বর্তায় কি না—এমন প্রশ্নে সায়েদুর রহমান বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং আমাদের দেশের সবাই প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুর মৃত্যুতে গভীরভাবে মর্মাহত। শুধু স্বাস্থ্য খাতের অংশীজন নয়, সারা দেশের মানুষের আবেগের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। দায় বিষয়ে আলোচনাটা খুব সংবেদনশীল এবং এখন এটি নির্ধারণ করাও জটিল। তবে সেই নির্ধারণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে দায় চাপিয়ে দেওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক ও প্রশাসনিক ঘটনাবলির বিশ্লেষণ এবং তার ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ। তবে আমি আগেও উল্লেখ করেছি যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় টিকা কিনতে প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও নীতিগত সহায়তা স্বল্পতম সময়ে প্রদান করেছে।  অন্তবর্তী সরকারের সময় হামের টিকার তুলনামূলকভাবে কম কাভারেজ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা তথ্যের বিষয়ে সায়েদুর রহমান জানান, ২০২৪ সালে হামের টিকার প্রথম ডোজের কাভারেজ ছিল ৯৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ৯৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালের কাভারেজ নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারীরা দেশব্যাপী প্রায় তিন মাস টিকাদানের তথ্য নিয়মিত আপলোড করেননি। ফলে ড্যাশবোর্ডে কাভারেজ ৫৯ শতাংশ দেখাচ্ছিল, যা পরে অপসারণ করা হয়। নির্ভরযোগ্য উৎস অনুযায়ী, গত বছর হামের প্রথম ডোজের প্রকৃত কাভারেজ ছিল ৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কাভারেজ কিছুটা কম থাকার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেটুকু কম টিকাদান দৃশ্যমান হচ্ছে, তার প্রধান কারণ স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলন-কর্মবিরতি-অসহযোগিতা। এর পাশাপাশি অনেক পদ শূন্য থাকায় কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ, কোভিড-পরবর্তী টিকাভীতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকাবিরোধী প্রচারণাকেও কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। ইউনিসেফের সঙ্গে টিকা সরবরাহে জটিলতার অভিযোগ প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান বলেন, ইউনিসেফের সঙ্গে টিকা সরবরাহ সংক্রান্ত জটিলতা হয়েছে বলাটা ঠিক হবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইউনিসেফ জরুরি প্রয়োজনে একাধিকবার অর্থ পরিশোধের আগেই টিকা সরবরাহ করেছে।   ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) টিকা কেনার প্রস্তাব উপদেষ্টা পরিষদের অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত কমিটিতে উত্থাপন করা হলে কমিটি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ অনুসরণের কথা জানায়। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে কমিটি ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি টিকা কেনার অনুমোদন দেয়।  ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৮৪২ কোটি টাকার টিকা ডিপিএম পদ্ধতিতে কেনার অনুমতি চাওয়া হলে কমিটি ৫০ শতাংশের অনুমোদন দেয়। বাকি অংশের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম) অনুসরণের নির্দেশ দেয়। সেই অনুযায়ী নভেম্বরে ৪১৯ কোটি টাকার টিকা ডিপিএম পদ্ধতিতে ইউনিসেফের কাছ থেকে কেনার অনুমোদন পাওয়া যায়।  চলতি বছরের জানুয়ারিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ থেকে আরও ৬০৯ কোটি টাকার টিকা ডিপিএম পদ্ধতিতে কেনার প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এক হাজার ২৮ কোটি টাকার টিকা কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে ইউনিসেফের সঙ্গে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অর্থ সমন্বয় করতে দেরি হওয়ায় বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড় করাতেও সময় লাগে।  বাকি ৫০ শতাংশ টিকা কেনার বিষয়ে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ইউনিসেফ লিখিতভাবে ডিপিএম পদ্ধতি অনুসরণের অনুরোধ করে। ৩০ ডিসেম্বর ডিপিএম সুবিধা ব্যাখ্যা করে ইমেইল পাঠায়। পরের বছর ১১ ফেব্রুয়ারি ডিপিএম ও ওটিএম পদ্ধতিতে সময়ের পার্থক্য তুলে ধরে আবারও যোগাযোগ করে সংস্থাটি। এ প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান বলেন, ইউনিসেফের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাওয়ার পর নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততার ফলে সিদ্ধান্তগ্রহণের বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের বিবেচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়।  ইউনিসেফের পরামর্শ উপেক্ষা করে ওটিএম পদ্ধতিতে কোনো টিকা কেনা হয়নি জানিয়ে সায়েদুর রহমান বলেন, আমি যেহেতু নিশ্চিত নই, তাই ইউনিসেফের সঙ্গে কোনো জটিলতা হয়েছে, এমনটা বলছি না। তবুও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ বা বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা যেতে পারে, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে নিয়মিত ক্রয়ের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে বিধিমালা অনুসরণের সিদ্ধান্তের কারণে সম্ভবত ইউনিসেফের দিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকতে পারে।  বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই ওপি থেকে সরে আসার অভিযোগ প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান জানান, ১৯৯৮ সাল থেকে সরকার স্বাস্থ্য খাতে দাতানির্ভর সেক্টর ওয়াইড প্ল্যান (খাতভিত্তিক পরিকল্পনা) অনুসরণ করে আসছিল। তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শেষে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) অনুমোদনের সময় ২০১৭ সালে পরিকল্পনা কমিশন এক্সিট প্ল্যান তৈরির তাগিদ দেয়। কিন্তু তখনকার সরকার কোনো এক্সিট প্ল্যান ছাড়াই চতুর্থ এইচপিএনএসপি শেষ করে এবং দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চালায়। এমনকি পরবর্তী পঞ্চম এইচপিএনএসপিও (২০২৪-২০২৯) একই প্রক্রিয়ায় প্রণয়ন করা হয়।  অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পঞ্চম এইচপিএনএসপি পরিকল্পনা কমিশনে উত্থাপন করা হলে এক্সিট প্ল্যানসহ পুনরায় উপস্থাপনের নির্দেশনা দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দাতানির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ নির্ধারণে মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়।  সায়েদুর রহমান বলেন, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া ওপি থেকে সরে আসা হয়েছে বলে যে কথাটি বলা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। ট্রানজিশনাল ডিপিপি অথবা ব্রিডিং ডিপিপি—যে নামেই বলি না কেন, এগুলোই ছিল বিকল্প ব্যবস্থা। তবে দীর্ঘদিন ওপিনির্ভর ব্যবস্থায় অভ্যস্ত থাকায় অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় ও দাতা সংস্থাগুলো বিকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় নেয়। পরে মন্ত্রিপরিষদ ও একনেকের অনুমোদন পেতেও দেরি হয়।  উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কি না। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কেনা হলে আনুমানিক কত অর্থ সাশ্রয় সম্ভব ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে সায়েদুর রহমান বলেন, উন্মুক্ত দরপত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিয়মিত প্রক্রিয়া। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়েও এই পদ্ধতি নিয়মিত অনুশীলন করা হয়। ফলে সিদ্ধান্তটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়নি। আর এখন পর্যন্ত ইপিআইর (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) টিকা কেনায় কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজার যাচাই করা হয়নি। তাই কত অর্থের সাশ্রয় সম্ভব ছিল সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না।  আপনি টিকা কেনায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের কথা বলেছেন। এখানে স্বচ্ছতা বলতে ঠিক কী বোঝাচ্ছেন? অতীতে কী ধরনের অস্বচ্ছতা বা অনিয়মের অভিযোগ ছিল? এমন প্রশ্নে ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়াকে সাধারণ দৃষ্টিতে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বলে মনে করা হয়। আমি শুধু সেটুকুই বুঝিয়েছি। অতীতে টিকা কেনায় অনিয়মের কথা বলিনি। শুধু অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি সংশ্লিষ্ট বিধি উল্লেখ করে যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন, সেটার কথা বলেছি। যে কোনো নিয়মিত ক্রয় এবং যে ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ছে, সেক্ষেত্রে যারাই সরকারের দায়িত্বে থাকবেন, নিশ্চয়ই তারা রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইবেন। সেক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনের ধারা বছরের পর বছর ধরে প্রয়োগ করবেন বলে আমার মনে হয় না।