দেশে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন। বছরে দুইবার করে এই ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও গত দুই বছর মিলে হয়েছে দুইবার। সর্বশেষ ক্যাম্পেইন হয় ২০২৫ সালের মার্চে। এর আগেরটি ছিল ২০২৪ সালের মে মাসে। অথচ শিশুদের অন্ধত্ব প্রতিরোধ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনে ভিটামিন এ অপরিহার্য।
২০০৩ থেকে চলা জাতীয় কৃমিনাশক সপ্তাহও গত দুই বছর নিয়মিত পালিত হয়নি। ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন থেকে শুরু করে টিকা, কৃমিনাশক কার্যক্রম সর্বত্র অব্যবস্থাপনার ছাপ স্পষ্ট। ২০২৪ সালের জুনে স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অর্থায়ন কাঠামো অপারেশন প্ল্যান (ওপি) আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প হিসেবে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও এখনও তা পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন পায়নি। এই শূন্যতায় যেন থমকে গেছে পুরো স্বাস্থ্য খাত। এতে বিশেষ করে ঝুঁকি বাড়ছে শিশুদের।
শিশুদের অন্ধত্ব প্রতিরোধ ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন। জাতীয় পুষ্টিসেবার (এনএসএস) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ছয় মাস পরপর দেশের প্রায় সোয়া দুই কোটি শিশুকে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। ৬ থেকে ১১ মাস বয়সিদের নীল ক্যাপসুল এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সিদের লাল ক্যাপসুল।
ক্যাপসুল সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিতরণ, মাঠকর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রচার; সবকিছুই চলত ওপির অর্থে। ২০২৪ সালের জুনের পর থেকে সেই অর্থায়ন বন্ধ। ২০২৫ সালে যে একবার হয়েছে, সেটিও আগে কেনা ক্যাপসুল দিয়ে। একই কার্যক্রমের আওতায় ২০০৩ সাল থেকে চলে আসছে জাতীয় কৃমিনাশক সপ্তাহ। গত দুই বছর সেটিও নিয়মিত পালন করা হয়নি।
সংকটের সূত্রপাত যেভাবে
১৯৯৮ সাল থেকে দাতা সংস্থার সহায়তায় চলে আসছিল স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি)। স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে এটি পরিচিত সেক্টর প্রোগ্রাম নামে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন হতো ওপির মাধ্যমে। খাদ্য-পুষ্টি, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, সংক্রামক-অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান, ওষুধ সরবরাহসহ মোট ৩২টি কর্মসূচি চলত এর আওতায়। পাঁচ বছরের বরাদ্দ ছিল প্রায় ২২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ এ বছরই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছে। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২০২২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ওপি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। বিকল্প ব্যবস্থার সময় নিতে মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুনে চূড়ান্তভাবে ওপি বন্ধ করা হয়। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছরের মার্চে ওপির বদলে ডিপিপি গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু দফায় দফায় সংশোধনের পরও পুরো ডিপিপি এখনও অনুমোদন করাতে পারেনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এই বিলম্বের মাশুল দিচ্ছে দেশের পুরো শিশুস্বাস্থ্য খাত।
টিকাদানে নজিরবিহীন সংকট
ডিপিপি বাস্তবায়নে কালক্ষেপণে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১২টি রোগপ্রতিরোধে ৯টি টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি, ডিপথেরিয়া প্রতিরোধে পেন্টা, পোলিও প্রতিরোধে ওপিভি ও আইপিভি, নিউমোনিয়া প্রতিরোধে পিসিভি, হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে এমআর এবং টাইফয়েড প্রতিরোধে টিসিভি টিকা। ইপিআই সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের শেষদিকে কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি; এই ছয়টি টিকার মজুত কমে প্রায় শূন্যের ঘরে পৌঁছায়। আইপিভি ও টিসিভি চলবে জুন পর্যন্ত। এইচপিভির মজুত আছে ডিসেম্বর পর্যন্ত।
আগে দুই আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় ওপির মাধ্যমে টিকা কিনত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ডিপিপিতে যাওয়ার পর নতুন প্রকল্প দলিল তৈরি, অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থ ছাড়; সবকিছুতেই দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দেয়। এতে টিকা কেনার প্রক্রিয়া আটকে যায়।
সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দেয় হামের টিকায়। ভ্যাকসিন সংগ্রহ হলেও সিরিঞ্জসহ অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে বারবার পিছিয়ে যায় গণটিকা কর্মসূচি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৩ হাজার ৩৫১ জন। মারা গেছে ২১৩টি শিশু।
বন্ধ অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের বিকাশ কেন্দ্র
ডিপিপির জটিলতার ছায়া পড়েছে আরও কিছু কার্যক্রমে। জনবলের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের বিকাশ কেন্দ্র। অর্থাভাবে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের ওয়েবসাইট হালনাগাদ করতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তেল ও গাড়ির অভাবে বন্ধ রয়েছে অবৈধ হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযান। উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারাও গাড়ি ব্যবহার করতে পারছেন না।
জবাবদিহির দাবি
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর মনে করেন, এই অচলাবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) ডা. সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এখনও প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মারা যাচ্ছে। এর সম্পূর্ণ দায়ভার ডা. সায়েদুর রহমানের। একজন চিকিৎসক হয়েও কেন তিনি এমন জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে দিলেন? এখন টিকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যেসব শিশু মারা গেছে, তারা কি ফিরে আসবে? তাই, বিশেষ সহকারীসহ অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেককে জবাবদিহির মধ্যে আনা উচিত।’
ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর বলেন, ‘অভ্যুত্থানের আগে আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চম সেক্টর প্রোগ্রাম প্রণয়ন করে গিয়েছিল। সেটি পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। আমি নিজেই তার একজন সদস্য ছিলাম। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কমিশন মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাইলে তারা ২০২৫ সালের মার্চে এসে জানায়, ওপি থেকে বেরিয়ে আসবে। তাহলে এতদিন কী করেছে? আর বেরই যদি হয়, তাহলে সবকিছু যাতে স্বাভাবিকভাবে চলে সেই ব্যাকআপ রাখা হলো না কেন? কাজেই যেসব শিশু মারা গেছে, তার দায়ভার ওই সমস্ত ব্যক্তিকে নিতে হবে।’
সংকট যে হামেই সীমাবদ্ধ নেই, সেই সতর্কবার্তাও দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। তার ভাষায়, ‘সংকট যেখানে গিয়ে ঠেকেছে, তাতে হামের মতো যক্ষ্মা, এইডসসহ অন্যান্য রোগের ব্যাপক বিস্তার ঘটতে পারে। এ ছাড়া অর্থাভাবে উপজেলার গাড়িগুলো ব্যবহার করতে পারছেন না কর্মকর্তারা। তারা ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না। বাইকে করে যাওয়ায় পটুয়াখালীতে এক চিকিৎসক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।’
সংকট সহজে কাটবে বলেও মনে করেন না ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর। তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছরে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটি বর্তমান সরকারের পক্ষেও সহজে সমাধান করা সম্ভব নয়। সরকার এখনও নিশ্চিত না ডিপিপি চালু করবে, নাকি ওপিতেই ফিরে যাবে। আবার যেগুলো পাস হয়েছে, সেগুলোও বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে যাই করুক, প্রাণ বাঁচাতে ও মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
সংকট উত্তরণের উদ্যোগ
হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মুখে গত ৫ এপ্রিল উচ্চ সংক্রমণের শিকার ৩০ উপজেলায় টিকাদান শুরু হয়। ২০ এপ্রিল সারা দেশে এই কর্মসূচি শুরুর কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে সারা দেশের এক কোটি ৯৮ লাখেরও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে চায় সরকার।
টিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ লাঘবে গত শুক্রবার এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি বলেন, ‘টিকার যে সংকট ছিল, সেটি আর নেই। বর্তমানে ৯টি টিকার সবগুলোই পর্যাপ্ত রয়েছে। এর মধ্যে হামের আছে দুই কোটি। সবসময় যাতে অন্তত ছয় মাসের টিকা মজুত থাকে, সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী জুন পর্যন্ত কোনো টিকার ঘাটতি পড়বে না।’
সামগ্রিক বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘পুরো স্বাস্থ্য খাতেই একধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছিল। তবে সেটি থেকে ক্রমেই বেরিয়ে আসছে সরকার। ইতোমধ্যে ডিপিপির কয়েকটিতে অনুমোদন হয়েছে। বাকিগুলোও দ্রুত হয়ে যাবে। বর্তমানে টিকার সংকুলান হয়েছে। জনবল নিয়োগেও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। সারা দেশে এক ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।’




