মিয়ানমারে জাতিগত নিধনযজ্ঞের বাস্তবতায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও কক্সবাজারের স্থানীয়দের জীবনমান উন্নয়নে বরাদ্দকৃত তহবিলের অর্থে চলছে বিদেশ ভ্রমণ। সম্প্রতি এই তহবিলের টাকায় ইউরোপের তিন দেশ ভ্রমণ করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের একান্ত সচিব (পিএস) ও সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস)। দেশ তিনটি হলো ফ্রান্স, ইতালি ও তুরস্ক।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে সরকার। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নপুষ্ট ইমার্জেন্সি মাল্টি-সেক্টর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস রেসপন্স প্রজেক্ট (ইএমসিআরপি) নামের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে এলজিইডি মন্ত্রণালয়। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যেখানে সাশ্রয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে সেখানে প্রতিমন্ত্রীর পিএস ও এপিএসের এভাবে বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পিএসের ফ্রান্স ও ইতালি সফর
সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব মো. তাসনিমুজ্জামান ফ্রান্স ও ইতালি সফরে পাঠানো হয়েছে। গত ১ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি করা এক আদেশে বলা হয়, তিনি ৭ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত এই দুই দেশে একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সম্পৃক্ততা, সরকারি সংস্থা পরিদর্শন, সহযোগিতামূলক নেটওয়ার্কিং এবং জ্ঞান বিনিময়ের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এই প্রশিক্ষণের খরচ বহন করা হবে রোহিঙ্গা প্রকল্পের বৈদেশিক প্রশিক্ষণ তহবিল থেকে।
তাসনিমুজ্জামানের সঙ্গে এই সফরে আরও সাতজন কর্মকর্তা অংশ নেন। তাঁরা হলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মনিরুল ইসলাম, সহকারী সচিব মো. কামাল হোসাইন, এলজিইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ বি এম নাজমুল করিম, ইএমসিআরপি প্রকল্পের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আল আমিন ফয়সাল, চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসান আলী, কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইদুজ্জামান সাদেক এবং এলজিইডি ঢাকার হেল্প প্রকল্পের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল হক।
এপিএসের তুরস্ক সফর
একই সময়ে প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব মো. তৌহিদুল ইসলাম তুরস্ক সফর করেন। গত ২৯ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব জেসমিন প্রধানের স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, তৌহিদুল ইসলাম ২৯ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত তুরস্কে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। এই সফরের খরচ মেটানো হবে ইএমসিআরপি প্রকল্পের তহবিল থেকে।
তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে তুরস্কে গেছেন আরও সাতজন। তাঁরা হলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. আবু আউয়াল, উপসচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, এলজিইডি ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদ আল ফারুক, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার প্রকৌশলী তাসলিমা জাহান, কক্সবাজারের রামু উপজেলার প্রকৌশলী মোহাম্মদ কফিল উদ্দিন কবির, মীরসরাইয়ের উপজেলা প্রকৌশলী মো. দিদারুল আলম এবং এলজিইডি ঢাকার ইএমসিআরপি প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
তুরস্ক সফরের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর এপিএস তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘তুরস্কে আমরা মূলত রিফিউজি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। তুরস্কে যেহেতু অনেক সিরীয় শরণার্থী আছে ফলে তারা কিভাবে বিষয়গুলো ভালোভাবে ব্যবস্থাপনা করে, আমাদের দেশেও সেই মডেল অনুসরণ করা যায় কি না, কীভাবে সরকার তাদেরকে সুযোগ দিচ্ছে বা কি ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার কি চিন্তা করছে; মূলত এগুলোর ওপর প্রশিক্ষণ ছিল। এটা রোহিঙ্গা প্রকল্পের একটা অংশ।’
এই প্রকল্পের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্পের সঙ্গে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট। এখানে মন্ত্রণালয় থেকে এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ; দুই জায়গা থেকেই লোক ছিল। লোকজন মন্ত্রণালয় সিলেক্ট করছে। মন্ত্রণালয় থেকে তিনজন ছিল আর প্রকল্প থেকে পাঁচজন, মোট আটজন।’
প্রতিমন্ত্রীর পিএস মো. তাসনিমুজ্জামানকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।
কর্তৃপক্ষের নীরবতা
এ বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানকে কয়েক দফায় ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি। আদেশে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী সচিব জেসমিন প্রধান বলেন, ‘আমাদের কাছে নির্দেশনা এলে আমরা জিও (সরকারি আদেশ) দেই। কী বিষয়ে প্রশিক্ষণ, সেটা সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলতে পারবে।’
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি। তবে সহকারী প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মাদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এই প্রকল্পটি এখন প্রায় শেষের দিকে। এটি এখন আল আমিন ফয়সাল দেখছেন।’




