ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

শর্ত ভেঙে পছন্দের ঠিকাদারদের ৪৩ কোটির কাজ দেন প্রকৌশলী

লতিফুল ইসলাম

  ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:১০
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিক্স

দরপত্রের শর্ত ভেঙে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি টাকার কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অভিযোগের তীর ডিএনসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে সড়কবাতির খুঁটি স্থাপন থেকে শুরু করে ওয়াকিটকি ক্রয় পর্যন্ত একাধিক দরপত্রে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের দেওয়া কাজের মোট মূল্য ৪৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

অসম্পন্ন কাজের সনদে ১৪ কোটির চুক্তি
গত ২৫ আগস্ট মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত সড়কবাতির খুঁটি সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করেন সাইফুল ইসলাম। দরপত্রের শর্তে বলা ছিল, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবা সরবরাহে ন্যূনতম পাঁচ বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পাশাপাশি গত ১০ বছরে অন্তত ১০ কোটি ৮ লাখ টাকার একক কাজ সফলভাবে সম্পন্নের অভিজ্ঞতা এবং প্রতি বছর ২৩৫টি ডেকোরেটিভ পোল এবং ৩৯৫টি স্মার্ট এলইডি স্ট্রিট লাইট সরবরাহ বা উৎপাদন সক্ষমতা থাকতে হবে।

দরপত্রে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান প্রোটোস্টার লিমিটেড রাজশাহী সিটি করপোরেশনের একটি অভিজ্ঞতা সনদ দাখিল করে। এতে ২০২২ সালের ৩১ মে থেকে নগরীর তালাইমারী মোড় থেকে কাটাখালী বাজার এবং ভদ্রা রেলক্রসিং থেকে নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল মোড় পর্যন্ত সড়কে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও বাতি সরবরাহ এবং স্থাপনের ১৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকার কাজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে ওই সনদে কাজটি সম্পন্নের সময়সীমা উল্লেখ রয়েছে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। অর্থাৎ কাজটি তখনো চলমান। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী ‘সফলভাবে সম্পন্ন’ কাজের অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানটির ছিল না।

শর্ত লঙ্ঘনের এই অভিযোগ উঠলে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) পিপিআর ২০২৫-এর বিধি ১১৮(৪) অনুযায়ী মূল্যায়ন কমিটিকে দরপত্রে উল্লেখিত শর্তের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার নির্দেশ দেয়। দরপত্রের নির্দেশনার ১৫.১(বি) ধারায় স্পষ্ট বলা ছিল, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের ডেকোরেটিভ পোল ও স্মার্ট এলইডি স্ট্রিট লাইটসংক্রান্ত সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু বিপিপিএর নির্দেশনার পরও এই শর্ত পাশ কাটিয়ে প্রোটোস্টার লিমিটেড সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতার বদলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাধারণ সড়কবাতি প্রকল্পের ১৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার অভিজ্ঞতা সনদ দাখিল করে। সাইফুল ইসলামের যোগসাজশে মূল্যায়ন কমিটি এই সনদ গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটিকে যোগ্য ঘোষণা করে। এটি পিপিআর আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।

এই দরপত্রে প্রোটোস্টার লিমিটেড, এস এস রহমান ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও সালেক পাওয়ার লিমিটেড অংশ নেয়। মূল্যায়ন কমিটি প্রোটোস্টার ও এস এস রহমান ইন্টারন্যাশনালকে কারিগরিভাবে যোগ্য বলে গণ্য করে। শেষ পর্যন্ত গত ১৯ নভেম্বর প্রোটোস্টার লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। পরে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রোটোস্টার লিমিটেড নামের এই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান।

আরও ২১ কোটির কাজ পেয়েছে প্রোটোস্টার
একই দিনে বিদ্যুৎ বিভাগের অঞ্চল-৫-এর নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম মিয়া জাহাঙ্গীর গেট থেকে ফার্মগেট, বিজয় সরণি (পূর্ব ও পশ্চিম), খেজুর বাগান, বিমানবন্দর থেকে খামারবাড়ি এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত ডেকোরেটিভ স্ট্রিট লাইট পোল সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য আরেকটি দরপত্র আহ্বান করেন। এর আওতায় স্মার্ট এলইডি লাইট, সিএলএমএস, ক্যাবল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ক্রয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই দরপত্রে কেবল প্রোটোস্টার লিমিটেড অংশ নেয়।

দরপত্রের শর্তে বলা হয়, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবা সরবরাহে ন্যূনতম পাঁচ বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। গত ১০ বছরে অন্তত ১৫ কোটি ৫ লাখ টাকার একটি একক কাজ সম্পন্নের অভিজ্ঞতাও বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি প্রতি বছরে ডেকোরেটিভ পোল ৩৭৫টি এবং স্মার্ট এলইডি স্ট্রিট লাইট ৬১৫টি সরবরাহ বা উৎপাদন সক্ষমতার শর্ত নির্ধারণ করা হয়।

এই দরপত্রেও প্রোটোস্টার লিমিটেড একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। প্রথমে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের অসম্পন্ন কাজের অভিজ্ঞতা সনদ এবং পরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সড়কবাতি প্রকল্পের ১৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সাধারণ কাজের অভিজ্ঞতা সনদ দাখিল করে। কিন্তু এই দরপত্রে চাহিদা ছিল ১৫ কোটি ৫ লাখ টাকার অভিজ্ঞতার। অর্থাৎ দাখিলকৃত সনদের মূল্য সেই চাহিদার চেয়ে ৭০ লাখ টাকা কম। তারপরেও ডিএনসিসির দরপত্র যাচাই কমিটি গত ১৯ নভেম্বর প্রোটোস্টার লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেয়। গত ৪ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ২১ কোটি ১৯ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

৪৭ হাজারের ওয়াকিটকি কেনা হয়েছে ২ লাখ ৯৪ হাজারে
সড়ক বাতির কাজে শর্ত লঙ্ঘনের পাশাপাশি বাজারদর কয়েকগুণ বাড়িয়ে অযোগ্য ঠিকাদারের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে ওয়াকিটকি কেনারও অভিযোগ উঠেছে ডিএনসিসির বিরুদ্ধে। নথি অনুযায়ী, ডিএনসিসি মোট ৩৮০টি ওয়াকিটকি আনুষঙ্গিক সরঞ্জামসহ প্রায় ৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় কিনেছে। হাইতেরা পিডিসি৬৮০ মডেলের ১০০টি ওয়াকিটকির প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং হাইতেরা এইচপি৭৮৮ ইউভি মডেলের ২৮০টির প্রতিটির দাম ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। অথচ ২০২৩ সালে বাংলাদেশ পুলিশ একই ধরনের ২ হাজার ৪০০টি ওয়াকিটকি কিনেছে প্রতিটি মাত্র ৪৭ হাজার ৫২০ টাকায়। ২০১৯ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৪০০টি ওয়াকিটকি কিনেছিল প্রতিটি ৫১ হাজার ৯৩৫ টাকায়।

বাজারমূল্য নির্ধারণে গঠিত কমিটি তিনটি প্রতিষ্ঠান রুশদিয়া এন্টারপ্রাইজ, এসএম করপোরেশন ও মেসার্স দ্য স্টেট আইটি লিমিটেড থেকে দর সংগ্রহ করে। তবে রুশদিয়া ও এসএম করপোরেশনের এ খাতে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তাদের ট্রেড লাইসেন্স অনুযায়ী ব্যবসার ধরনও টেলিকমিউনিকেশন সরঞ্জামের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বিপরীতে আগে ডিএনসিসিকে ওয়াকিটকি সরবরাহ করা নিয়মিত প্রতিষ্ঠান সিস্টেম কমিউনিকেশন লিমিটেডের কাছ থেকে কোনো দর সংগ্রহ করা হয়নি।

তিনটি প্রতিষ্ঠানের জমা দেওয়া দরপত্রের ভাষা, শর্ত ও বিন্যাস প্রায় হুবহু, যা সম্ভাব্য যোগসাজশের ইঙ্গিত বলে প্রতীয়মান হয়। এদের মধ্যে স্টেট আইটি সর্বনিম্ন দর প্রস্তাব করে, রুশদিয়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং এসএম কর্পোরেশন সর্বোচ্চ দর দেয়। স্টেট আইটির প্রস্তাবকে সর্বনিম্ন হিসেবে গ্রহণ করার পরে দাপ্তরিকভাবে যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়, সেটি হুবহু এক। অর্থাৎ ঠিকাদারের দরের সঙ্গে লাভ, ট্যাক্স ও ভ্যাট যোগ করে যে দাপ্তরিক মূল্য হওয়ার কথা, সেই দামেই আগেভাগে দরপত্র জমা দেয় স্টেট আইটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসিসির প্রকৌশলীরা এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারদর বেশি দেখিয়ে দাপ্তরিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে ঠিকাদারকে বেশি দামে কাজ দেওয়া যায় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন।

দরপত্রে উল্লিখিত যোগ্যতার শর্তও লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে আহ্বান করা দরপত্রে বলা হয়েছিল, দরদাতাদের গত তিন বছরে অন্তত চার কোটি টাকার সমজাতীয় কাজ সম্পন্নের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু কাজ পেয়েছে মেসার্স দ্য স্টেট আইটি লিমিটেড, যারা এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি।

প্রতিষ্ঠানটি দুটি অভিজ্ঞতার সনদ জমা দেয়। একটি ছিল ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সম্পন্ন কাজের, যেখানে স্টেট আইটি প্রধান অংশীদার ছিল না। ফলে সেটি বাতিল হয়। অন্য সনদটি ছিল পুলিশ টেলিকম অর্গানাইজেশনের, চুক্তিমূল্য প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা। তবে এই সনদটি মূলত চীনা প্রতিষ্ঠান হাইতেরা কমিউনিকেশনস করপোরেশন লিমিটেডের অনুকূলে ইস্যু করা হয়েছিল।

পুলিশ টেলিকম অর্গানাইজেশনের তৎকালীন পুলিশ সুপার (লজিস্টিকস) এম আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘সনদটি হাইতেরার জন্য দেওয়া হয়েছিল, স্টেট আইটির জন্য নয়। স্টেট আইটি সেখানে কেবল স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে।’ তারপরেও সেই সনদ ব্যবহার করেই স্টেট আইটিকে যোগ্য বিবেচনা করে কাজ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি ক্রয়বিধির পরিপন্থি।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেওয়া এই কার্যাদেশের ক্রয়কারী কর্মকর্তা ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম। ক্রয়প্রক্রিয়া কমিটিতে আরও ছিলেন ডিএনসিসির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মঈন উদ্দিন এবং সহকারী প্রকৌশলী আমিনুর রহমান।

দফায় দফায় দরপত্র
গত বছরের ১ জুন রামপুরা সেতু থেকে কুড়িল মোড় পর্যন্ত সড়কে খুঁটি, স্মার্ট এলইডি বাতি ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ঢাকা ওয়াসার অর্থায়নে বাস্তবায়নযোগ্য এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ কোটি টাকার বেশি। জমাদানের শেষ তারিখ ছিল ২৯ জুন। কিন্তু তার মাত্র তিন দিন আগে, ২৬ জুন হঠাৎ দরপত্রের শর্তে বড় পরিবর্তন আনা হয় এবং জমাদানের সময় বাড়িয়ে ১০ জুলাই করা হয়। দরপত্র প্রস্তুতকারী কারিগরি কমিটির কোনো অনুমোদন না নিয়েই এই পরিবর্তন করা হয়, যা সরকারি ক্রয়বিধির পরিপন্থি।

শর্ত পরিবর্তনের বিষয়টি বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুরুতে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পণ্যের গুণগত সনদের বিষয়টি বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু সংশোধিত শর্তে আন্তর্জাতিক মান বাদ দিয়ে কেবল প্রতিষ্ঠিত সংস্থা বলা হয়। বাতি, ড্রাইভার, ডিসিইউ ও সিএমএস একই ব্র্যান্ডের হওয়ার শর্ত পরিবর্তন করে শুধু ডিসিইউ ও সিএমএস একই প্রতিষ্ঠানের হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। নতুন করে সিএমএসের সোর্স কোড সরবরাহের শর্ত যোগ করা হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে অস্বাভাবিক। কোনো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি সাধারণত তাদের সফটওয়্যারের সোর্স কোড সরবরাহ করে না।

ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, এই শর্তটি নির্দিষ্ট একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে যুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এনার্জি প্লাস আগেভাগেই ঠিকাদার জেএপি ট্রেডিংকে সোর্স কোড দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছিল।

কারিগরি স্পেসিফিকেশনেও পরিবর্তন আনা হয়। প্রথমে ফিলিপস জাইটানিয়াম ড্রাইভার ব্যবহারের কথা সুনির্দিষ্টভাবে বলা হলেও পরে সমমান বা সমতুল্য যুক্ত করা হয়। ইউরোপের নির্দিষ্ট বন্দর থেকে পণ্য আমদানির শর্ত শিথিল করে দরদাতার উল্লিখিত যে কোনো বন্দর গ্রহণযোগ্য করা হয়।

দরপত্রে দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। মেসার্স জেএপি ট্রেডিং ও এসএস রহমান ইন্টারন্যাশনাল। জেএপি ট্রেডিং ৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকার প্রস্তাব দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। এসএস রহমান ইন্টারন্যাশনাল দেয় ৮ কোটি ৭ লাখ টাকার প্রস্তাব। অভিযোগ রয়েছে, সাইফুল ইসলামের সঙ্গে জেএপি ট্রেডিংয়ের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এবং তার প্রভাবেই শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে।

নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান জেএপি ট্রেডিংয়ের প্রস্তাবেও একাধিক ঘাটতি পাওয়া গেছে। এলইডি বাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলভিডি ও আরওএইচএস সনদ জমা দেওয়া হয়নি। ডিসিইউ ও সিএমএসের ক্ষেত্রেও প্রস্তুতকারকের স্বীকৃত কোনো সনদ না দিয়ে স্থানীয় সরবরাহকারীর একটি ঘোষণাপত্র দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাতির ক্ষেত্রে শর্ত অনুযায়ী ডাবল আইসোলেশন (ক্লাস-২) হওয়ার কথা থাকলেও জেএপি দিচ্ছে সিঙ্গেল আইসোলেশন (ক্লাস-১) মানের পণ্য। ভোল্টেজ, পাওয়ার ফ্যাক্টর ও লুমেন টলারেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডও পূরণ হয়নি।

মূল্য বিশ্লেষণেও বড় অসংগতি পাওয়া গেছে। জেএপি যে বাতি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে, তার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ৬০ থেকে ৭০ মার্কিন ডলার। দেশে সব খরচসহ যা ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে পড়ে। অথচ প্রকল্পে প্রতিটি বাতির প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা।
এত ঘাটতির পরেও গত বছরে জেএপি ট্রেডিংকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। পরে বিপিপিএর নির্দেশে দরপত্রটি বাতিল হয়। তারপরেও একই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার লক্ষ্যে গত রোববার (১৯ এপ্রিল) তৃতীয়বারের মতো দরপত্র বাতিল করে পুনর্দরপত্রের সুপারিশ করা হয়েছে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
নিজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সড়কবাতি ও খুঁটির দরপত্রে শর্ত লঙ্ঘন হয়নি। ওয়াকিটকি কেনার ক্ষেত্রেও নিয়ম ভাঙা হয়নি। ঢাকা ওয়াসার অর্থায়নে দরপত্রটিতেও পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে চাইলে তিনবার দরপত্র আহ্বান করতে হতো না।’
অঞ্চল-৫-এর দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সবগুলো অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অন্ধকার নামলেই বদলে যায় সীমান্তের সব হিসাব
শেরপুর সীমান্তজুড়ে চোরাচালানের অদৃশ্য করিডোর যেন দিন দিন আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকেই সীমান্ত এলাকায় নেমে আসে এক ভিন্ন বাস্তবতা; যেখানে মাদক, বিদেশি কসমেটিক্স, নিষিদ্ধ পণ্য থেকে শুরু করে বিলাসদ্রব্য পর্যন্ত অবাধে প্রবেশ করছে দেশের অভ্যন্তরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল আর অভিযানের মধ্যেই কীভাবে সক্রিয় এই সিন্ডিকেট? কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এই অন্ধকার বাণিজ্য, আর কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে মূলহোতারা? তা জানতে অনুসন্ধান শুরু করে এশিয়া পোস্ট। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চল হওয়ায় এই চোরাচালানের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্তের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পাহাড়ি ঝিরিপথ, ঘন জঙ্গল এবং দূরবর্তী অবস্থান, চোরাকারবারিদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে। অনুসন্ধানে এশিয়া পোস্ট নিশ্চিত হয়েছে ভারতের তুরা, ঢালু ও আসাম অঞ্চলের বিভিন্ন পাহাড়ি ঝিরিপথ ব্যবহার করে কাঁটাতারের নজরদারি এড়িয়ে অবৈধ পণ্য দেশে ঢুকছে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকার ও ভোরের কুয়াশা চোরাকারবারিদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ সময় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এরমধ্যে শেরপুর সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত এসব অবৈধ পণ্য প্রবেশ করছে। শেরপুরের সীমান্তবর্তী বিলপাড়, নকশি, রাংটিয়া, লোহার ব্রিজ, গোমড়া, সন্ধ্যাকুড়া, হালচাটি, তাওয়াকুচা, বালিজুড়ি, কর্ণজোড়া, রাবার বাগান, বারোমারি, খলচান্দা, নাকুগাঁও, পানিহাটা, শালবাগান অন্যতম। চোরাচালান কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র। অনুসন্ধানে দেখা যায়, সীমান্তের কসমেটিক্স চোরাচালানে নেতৃত্ব দিচ্ছে নাজিমুদ্দিন, সামী, আতিক ও মামুন। অন্যদিকে, মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জুয়েল, রাসেল, লিটন কোচসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাদের অধীনে কাজ করে আরও ছোট ছোট একাধিক গ্রুপ, যারা নির্দিষ্ট দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এদের প্রত্যেকের নামে রয়েছে একাধিক মামলা। এদের চোরাচালানের প্রক্রিয়াও বেশ সুসংগঠিত। প্রথমে পণ্যগুলো ভারতের মেঘালয় সীমান্তসংলগ্ন ঢালুর দোবাচিপাড়া ও বারাঙ্গাপাড়া এলাকায় আনা হয়। এরপর সেখানে অস্থায়ী একটি গুদামে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে বস্তায় ভরে সেগুলো শেরপুর সীমান্তের বিভিন্ন নির্দিষ্ট পয়েন্টে পাঠানো হয়। সেখান থেকে পণ্যগুলো গহীন জঙ্গলে সরিয়ে ফেলা হয় এবং পরবর্তীতে ইজিবাইক, মোটরসাইকেলের সিটের নিচে লুকিয়ে কিংবা স্কুলব্যাগের মতো সাধারণ উপায়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি রাজধানীতেও পৌঁছে দেওয়া হয়। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ময়মনসিংহ সেক্টরে পরিচালিত অভিযানে প্রায় ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য ও মাদক জব্দ করা হয়েছে এবং ১১৪ জনকে আটক করে বিজিবি। তবে এসব অভিযানে নিম্নস্তরের কারবারিরা ধরা পড়লেও মূলহোতারা এখনও আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চোরাচালান চক্রের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলাও ঝুঁকিপূর্ণ। পরিচয় প্রকাশ পেলে হামলার আশঙ্কা থাকে বলে অনেকেই মুখ খুলতে চান না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঝিনাইগাতী উপজেলার এক যুবক বলেন, সন্ধ্যার পর এই এলাকায় একেবারে অন্য রকম পরিবেশ হয়ে যায়। দিনের বেলায় যেটা স্বাভাবিক গ্রাম মনে হয়, রাত নামলেই সেটা যেন বদলে যায়। মাঝেমধ্যে দূর থেকে মানুষের চলাফেরা, ফিসফাস শব্দ, মোটরসাইকেলের আওয়াজ শোনা যায়। কারা আসে, কী নিয়ে আসে সব কিছুই অনেক সময় চোখে পড়ে, কিন্তু মুখ খুলে কিছু বলার সাহস নাই। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে চুপ থাকতেই হয়। আরেক বাসিন্দা বলেন, মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হয়, তখন কিছুদিন একটু কমে যায়। কিন্তু পরে আবার আগের মতোই শুরু হয়। সাধারণত ছোটখাটো লোকজনই ধরা পড়ে, যারা বহন করে বা নিচু পর্যায়ে কাজ করে। কিন্তু যারা আসল নিয়ন্ত্রণ করে, বড় সিন্ডিকেট চালায় তাদের কিছুই হয় না। নালিতাবাড়ী পানিহাটা এলাকার বাসিন্দারা জানান, এই এলাকায় কাজের সুযোগ খুব বেশি নেই, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। অনেকেই বেকার থাকে, তাই কিছু ছেলে সহজেই এসব কাজে জড়িয়ে পড়ে, কারণ এতে দ্রুত টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু তারা আসলে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না, শুধু নির্দেশ পালন করে। যারা মূলত এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে, তারা অনেক দূরে থাকে, সামনে আসে না, তাই তাদের ধরা কঠিন হয়ে যায়। আমরা সাধারণ মানুষ চাই এসব বন্ধ হোক, এলাকায় শান্তি ফিরুক, কিন্তু ভয় আর অনিশ্চয়তার কারণে কেউ খোলাখুলি কিছু বলতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমান্তে নজরদারির ঘাটতির সুযোগ নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে এই চক্র সক্রিয় রয়েছে। শক্তিশালী নেটওয়ার্ক থাকায় মূলহোতারা বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।  শেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. সিরাজুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদকের ব্যবসা করে আসছে। মাদকচক্রের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদেরকে নিশ্চিত করতে হলে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর তৎপরতা বাড়াতে হবে এবং আন্ত:দেশীয় সমন্বয় সাধন করতে হবে। তাহলেই এই মাদকদ্রব্য, চোরাকারবারি চিরতরে বন্ধ না হলেও সহনীয় অবস্থায় রাখা সম্ভব। চোরাকারবারি বন্ধ হলে আমাদের যুব সমাজ যারা বিপথে যাচ্ছে, তারা সুপথে ফিরে আসবে বলে আমি মনে করি। পুলিশ জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিজিবি জানায়, চোরাচালানকারীদের ধরতে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলো বনজঞ্জল ও পাহাড়ি এলাকা। এসব এলাকার কোন কোন জায়গায় কাঁটাতারের বেড়াও নেই। ফলে এই এলাকাগুলো মাদক ও চোরাকারবারিদের রুট। আমার বিভিন্ন সময় বড় বড় অভিযানে উদ্ধার মাধ্যমে প্রমাণ পেয়েছি।  তিনি আরও বলেন, শেরপুর জেলা পুলিশ ও তার গোয়েন্দা টিম এবং উপজেলার যে তিনটি থানা রয়েছে, সেই থানার সকল গোয়েন্দা টিম সব সময় মাদক ও চোরাকারবারিদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন সময় স্পেশাল অভিযানের মাধ্যমেও চোরাকারবারিদের ধরতে কাজ করছি। শুধু তাই নয়, এ সীমান্ত অঞ্চল থেকেও বড় বড় মাদকসহ অন্যান্য চালান কিন্তু পুলিশ জব্দ করার পাশপাশি কারবারিদের আটক করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ ৩৯ বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, সীমান্ত অঞ্চলে নিয়মিত টহল ও অভিযান চলছে। দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে জাল নোট পাচাররোধে সীমান্তে গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।  তিনি আরও বলেন, সীমান্তে চোরাচালান, মাদক, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে বিজিবি কাজ করছে। এসব ক্ষেত্রে ড্রোন, নাইট ভিশন ও ডিজিটাল সার্ভিলেন্সের মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করেছে। এসব কার্যক্রম সফল করতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাংবাদিক ও সাধারণ জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন রয়েছে।
অন্ধকার নামলেই বদলে যায় সীমান্তের সব হিসাব
মন্ত্রিসভার পরিধি বাড়ছে, আলোচনায় বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মন্ত্রিসভার আকার যেকোনো সময় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রদবদল হতে পারে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে। সরকার ও বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্রের সঙ্গে আলাপ করে এমন ইঙ্গিত মিলেছে। সরকারের জনবান্ধব বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনের কাজের গতি বাড়াতে ঈদুল আজহার পর বাজেট অধিবেশন শেষে এই সম্প্রসারণ হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য হচ্ছে যেসব মন্ত্রণালয়ে কাজের চাপ বেশি, সেখানে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসা এবং একজন মন্ত্রীর দায়িত্ব একটি মাত্র দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় কয়েকজনকে উপমন্ত্রী হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এছাড়া সংরক্ষিত নারী আসন থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যকে মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে। আলোচনায় যাদের নাম নতুন মন্ত্রিসভায় কয়েকজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, পোড় খাওয়া রাজনীতিক এবং দুই-একজন তরুণ মুখ দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় আসছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং কাজের ধীরগতির বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। অবিলম্বে এটি কাটিয়ে উঠতে চায় সরকার। বর্তমান মন্ত্রিসভার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের আভাস মিলেছে। তিনজন মন্ত্রীর দায়িত্ব কমানোর পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তন হতে পারে। ইতোমধ্যে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন মন্ত্রী এবং দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আরেক মন্ত্রীর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে তাদের দায়িত্ব কমিয়ে দেওয়ার আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে বর্ধিত মন্ত্রিসভায় দেখা যাবে। এক্ষেত্রে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে। বর্তমান মন্ত্রিসভায় নোয়াখালী অঞ্চলের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুকের নামও আলোচনায় রয়েছে। নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে তিনি ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের নামও আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে পারেন ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ও দোহার-নবাবগঞ্জের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক, কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় আছেন খুলনার আজিজুল বারী হেলাল, ফরিদপুরের শহিদুল ইসলাম বাবুল ও সিরাজগঞ্জের আমিরুল ইসলাম খান আলিমের মতো নেতারা। মন্ত্রিসভার বাইরে সংসদ উপনেতা হিসেবে দলের স্থায়ী কমিটির প্রবীণ দুই সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আব্দুল মঈন খানের নাম আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদে দুজন সদস্য বাড়তে পারে। টেকনোক্র্যাট কোটা টেকনোক্র্যাট কোটায় আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের মতো ত্যাগী নেতারা। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। বর্ধিত মন্ত্রিসভায় তাকেও দেখা যেতে পারে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেলের নাম আলোচনায় রয়েছে। বগুড়ার এই নেতা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কবে নাগাদ নতুন মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নাম ঘোষণা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত নির্দেশনা আসেনি। তবে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘এ বিষয়ে দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা হয়নি। এটি দলের চেয়ারম্যান ও সরকারপ্রধান তারেক রহমান ভালো বলতে পারবেন। তিনি কখন কাকে নেবেন, কোথায় দায়িত্ব দেবেন; সেটি সম্পূর্ণ তার এখতিয়ার।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, ‘এটি একান্তই প্রধানমন্ত্রীর বিষয়। তিনি যদি মনে করেন বর্তমান সদস্যদের নিয়ে সরকার পরিচালনা করবেন, তাহলে সেটিই করবেন। আবার কাজের সুবিধার্থে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করলে সেটিও করতে পারেন।’ বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। তবে কোনো উপমন্ত্রী নেই।
মন্ত্রিসভার পরিধি বাড়ছে, আলোচনায় বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা
নতুন কমিটি গঠনে কৃষক দলে হিসাব-নিকাশ, আলোচনায় কয়েক নেতা
সরকার পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে দৃশ্যত সক্রিয় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও কৃষক দলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে আসতে আগ্রহী নেতাদের তৎপরতা কয়েক গুণ বেড়েছে।  শনিবার  (৯ মে) ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তারেক রহমান। এরপর কৃষক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে তার।  সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বৈঠকগুলো সংগঠন পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘দলীয় অঙ্গসংগঠনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং নতুন নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দ্রুতই এ বিষয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে।’ দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানের নির্দেশনায় মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কৃষক দলেও নতুন নেতৃত্ব আসছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনকে সভাপতি এবং সাবেক ছাত্রনেতা শহিদুল ইসলাম বাবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুকে সিনিয়র সহসভাপতি, অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবর্তীকে সহসভাপতি, প্রকৌশলী টিএস আইয়ুবকে সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক, মোশারফ হোসেনকে যুগ্ম সম্পাদক এবং মো. শফিকুল ইসলামকে দপ্তর সম্পাদক করা হয়। পরে একই বছরের ৭ ডিসেম্বর ২৩১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। বর্তমান সভাপতি হাসান জাফির তুহিন সচিব পদমর্যাদায় বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় সংগঠনে আগের মতো সময় দিতে পারছেন না। একইভাবে সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুলও সংসদ সদস্য হিসেবে ব্যস্ত থাকায় সাংগঠনিক কাজে সময় সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে সংগঠনকে গতিশীল রাখতে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে। জাতীয়তাবাদী কৃষক দল বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। অতীতে এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়া ও বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়াও আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর মতো শীর্ষ নেতারা। নতুন নেতৃত্বে যারা আলোচনায় কৃষকদলের নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন—বর্তমান কৃষক দলের সিনিয়র সহসভাপতি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, বিএনপির গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক কৃষিবিদ শামিমুর রহমান শামীম এবং বর্তমান কমিটির সহসভাপতি খলিলুর রহমান (ভিপি ইব্রাহিম)। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন—বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ এবং এ্যাবের সাধারণ সম্পাদক এবং কৃষকদলের যুগ্ম সম্পাদক শাহাদত হোসেন বিপ্লব। তবে সাধারণ সম্পাদক পদে কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশের নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ বাঞ্ছারামপুর আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। পরে সেখান থেকে শেষ পর্যন্ত বিএনপি জোটের প্রার্থী জোনায়েদ সাকিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এ ছাড়া ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের মধ্য থেকেও কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। নতুন কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার কাছে অফিসিয়ালি এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। তবে সংগঠনের গতিশীলতার স্বার্থে পরিবর্তন আসতেই পারে—এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি এখন সরকার পরিচালনা করছে, তাই জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা বেড়েছে। যেসব কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পুনর্গঠন করা হবে এবং সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারাই স্থান পাবেন।’ সব মিলিয়ে বিএনপির অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনের এই উদ্যোগকে ঘিরে দলীয় রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের আভাস মিলছে। বিশেষ করে কৃষক দলের নতুন কমিটি যে কোনো সময় ঘোষণা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
নতুন কমিটি গঠনে কৃষক দলে হিসাব-নিকাশ, আলোচনায় কয়েক নেতা
দাবি সাবেক বিশেষ সহকারী সায়েদুরের / হাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেনি কেউ
দেশে হামে তিন শতাধিক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় এই রোগের টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গাফিলতিকে দুষছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তবে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। তার দাবি, হাম নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সতর্ক করেনি। যদিও ইউনিসেফের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা তৎকালীন সরকারকে সতর্ক করেছিলেন। বর্তমানে দেশের ৬১টি জেলায় হামে ভুগছে শিশুরা। সরকারি হিসাবে শুধু গত ৫০ দিনেই সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগী ৪৭ হাজার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩১১ শিশুর। সর্বশেষ সোমবার (৪ মে) হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এক দিনে রেকর্ড ১৭ জনের মৃত্যু খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এমন পরিস্থিতির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে দুষছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তারা বলছেন, ওই সময়ে হামের টিকাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।  অভিযোগের মুখে ডা. সায়েদুর রহমানের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারকে কেউ এ নিয়ে সতর্ক করেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কিংবা সংক্রামক রোগ নিয়ে কাজ করা কোনো বেসরকারি সংস্থা কেউ সাবধান করেনি। দেশের প্রখ্যাত রোগতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদরাও কোনো সতর্কবার্তা দেননি।  এশিয়া পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিকা কেনার জটিলতা, বিশেষ ক্যাম্পেইন না হওয়ার কারণ, অপারেশন প্ল্যান (ওপি) থেকে সরে আসা এবং হামে রেকর্ড মৃত্যুসহ সামগ্রিক বিষয়ে কথা বলেছেন সায়েদুর রহমান। ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে হামের টিকা ক্যাম্পেইন আয়োজন সম্ভব না হওয়ার বিষয়ে তার কাছে জানতে চান এ প্রতিবেদক। উত্তরে তিনি বলেন, আগের দুটি বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল ২০১৪ ও ২০২০ সালে, অর্থাৎ মাঝে ছয় বছরের ব্যবধান ছিল।  পরবর্তী বিশেষ কর্মসূচি ২০২৪ সালে হওয়ার কথা ছিল। এটি স্বীকার করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ছয় মাস স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অত্যন্ত জটিল, জরুরি ও সংবেদনশীল অনেক বিষয় মোকাবিলা করতে হয়েছিল। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের তথ্য যাচাই এবং আহতদের দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনার সমন্বয় করতে হয়েছে।  পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ২০২৫ সালের মার্চে বিশেষ হাম কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় এমআর ভ্যাকসিন বরাদ্দ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তপত্র স্বাক্ষর করে ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার বৈশ্বিক জোট গ্যাভি। তখন ভ্যাকসিনের চালান দুই ধাপে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর এবং ২০২৬ সালের মার্চে দেশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়। এই পরিকল্পনার বিষয়ে সায়েদুর রহমান বলেন, সে সময় কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিশেষ হাম কর্মসূচি জরুরিভিত্তিতে অবিলম্বে শুরু করার মতো কোনো সতর্কতা, বার্তা, লাল সংকেত বা পরামর্শ ছিল না। তিনি বলেন, আজকে পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, যদি সে সময় কোনো দেশি-বিদেশি সংস্থা, কর্তৃপক্ষ বা বিশেষজ্ঞের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সতর্কতা পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো আমরা চালান পৌঁছানোর দিনক্ষণ পুনর্নির্ধারণ করে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারতাম। ডা. সায়েদুর রহমানের এমন দাবির সঙ্গে অবশ্য একমত নন ইউনিসেফের কর্মকর্তারা। মঙ্গলবার (৫ মে) সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে কথা বলেছেন জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া। তিনি বলেন, ইউনিসেফ একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রতিটি বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, জটিলতা বৃদ্ধি এবং মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে।  হামে তিন শতাধিক শিশুর মৃত্যুর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বর্তায় কি না—এমন প্রশ্নে সায়েদুর রহমান বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং আমাদের দেশের সবাই প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুর মৃত্যুতে গভীরভাবে মর্মাহত। শুধু স্বাস্থ্য খাতের অংশীজন নয়, সারা দেশের মানুষের আবেগের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। দায় বিষয়ে আলোচনাটা খুব সংবেদনশীল এবং এখন এটি নির্ধারণ করাও জটিল। তবে সেই নির্ধারণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে দায় চাপিয়ে দেওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক ও প্রশাসনিক ঘটনাবলির বিশ্লেষণ এবং তার ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ। তবে আমি আগেও উল্লেখ করেছি যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় টিকা কিনতে প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও নীতিগত সহায়তা স্বল্পতম সময়ে প্রদান করেছে।  অন্তবর্তী সরকারের সময় হামের টিকার তুলনামূলকভাবে কম কাভারেজ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা তথ্যের বিষয়ে সায়েদুর রহমান জানান, ২০২৪ সালে হামের টিকার প্রথম ডোজের কাভারেজ ছিল ৯৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ৯৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালের কাভারেজ নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারীরা দেশব্যাপী প্রায় তিন মাস টিকাদানের তথ্য নিয়মিত আপলোড করেননি। ফলে ড্যাশবোর্ডে কাভারেজ ৫৯ শতাংশ দেখাচ্ছিল, যা পরে অপসারণ করা হয়। নির্ভরযোগ্য উৎস অনুযায়ী, গত বছর হামের প্রথম ডোজের প্রকৃত কাভারেজ ছিল ৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কাভারেজ কিছুটা কম থাকার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেটুকু কম টিকাদান দৃশ্যমান হচ্ছে, তার প্রধান কারণ স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলন-কর্মবিরতি-অসহযোগিতা। এর পাশাপাশি অনেক পদ শূন্য থাকায় কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ, কোভিড-পরবর্তী টিকাভীতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকাবিরোধী প্রচারণাকেও কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। ইউনিসেফের সঙ্গে টিকা সরবরাহে জটিলতার অভিযোগ প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান বলেন, ইউনিসেফের সঙ্গে টিকা সরবরাহ সংক্রান্ত জটিলতা হয়েছে বলাটা ঠিক হবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইউনিসেফ জরুরি প্রয়োজনে একাধিকবার অর্থ পরিশোধের আগেই টিকা সরবরাহ করেছে।   ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) টিকা কেনার প্রস্তাব উপদেষ্টা পরিষদের অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত কমিটিতে উত্থাপন করা হলে কমিটি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ অনুসরণের কথা জানায়। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে কমিটি ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি টিকা কেনার অনুমোদন দেয়।  ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৮৪২ কোটি টাকার টিকা ডিপিএম পদ্ধতিতে কেনার অনুমতি চাওয়া হলে কমিটি ৫০ শতাংশের অনুমোদন দেয়। বাকি অংশের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম) অনুসরণের নির্দেশ দেয়। সেই অনুযায়ী নভেম্বরে ৪১৯ কোটি টাকার টিকা ডিপিএম পদ্ধতিতে ইউনিসেফের কাছ থেকে কেনার অনুমোদন পাওয়া যায়।  চলতি বছরের জানুয়ারিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ থেকে আরও ৬০৯ কোটি টাকার টিকা ডিপিএম পদ্ধতিতে কেনার প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এক হাজার ২৮ কোটি টাকার টিকা কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে ইউনিসেফের সঙ্গে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অর্থ সমন্বয় করতে দেরি হওয়ায় বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড় করাতেও সময় লাগে।  বাকি ৫০ শতাংশ টিকা কেনার বিষয়ে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ইউনিসেফ লিখিতভাবে ডিপিএম পদ্ধতি অনুসরণের অনুরোধ করে। ৩০ ডিসেম্বর ডিপিএম সুবিধা ব্যাখ্যা করে ইমেইল পাঠায়। পরের বছর ১১ ফেব্রুয়ারি ডিপিএম ও ওটিএম পদ্ধতিতে সময়ের পার্থক্য তুলে ধরে আবারও যোগাযোগ করে সংস্থাটি। এ প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান বলেন, ইউনিসেফের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাওয়ার পর নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততার ফলে সিদ্ধান্তগ্রহণের বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের বিবেচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়।  ইউনিসেফের পরামর্শ উপেক্ষা করে ওটিএম পদ্ধতিতে কোনো টিকা কেনা হয়নি জানিয়ে সায়েদুর রহমান বলেন, আমি যেহেতু নিশ্চিত নই, তাই ইউনিসেফের সঙ্গে কোনো জটিলতা হয়েছে, এমনটা বলছি না। তবুও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ বা বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা যেতে পারে, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে নিয়মিত ক্রয়ের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে বিধিমালা অনুসরণের সিদ্ধান্তের কারণে সম্ভবত ইউনিসেফের দিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকতে পারে।  বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই ওপি থেকে সরে আসার অভিযোগ প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান জানান, ১৯৯৮ সাল থেকে সরকার স্বাস্থ্য খাতে দাতানির্ভর সেক্টর ওয়াইড প্ল্যান (খাতভিত্তিক পরিকল্পনা) অনুসরণ করে আসছিল। তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শেষে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) অনুমোদনের সময় ২০১৭ সালে পরিকল্পনা কমিশন এক্সিট প্ল্যান তৈরির তাগিদ দেয়। কিন্তু তখনকার সরকার কোনো এক্সিট প্ল্যান ছাড়াই চতুর্থ এইচপিএনএসপি শেষ করে এবং দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চালায়। এমনকি পরবর্তী পঞ্চম এইচপিএনএসপিও (২০২৪-২০২৯) একই প্রক্রিয়ায় প্রণয়ন করা হয়।  অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পঞ্চম এইচপিএনএসপি পরিকল্পনা কমিশনে উত্থাপন করা হলে এক্সিট প্ল্যানসহ পুনরায় উপস্থাপনের নির্দেশনা দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দাতানির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ নির্ধারণে মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়।  সায়েদুর রহমান বলেন, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া ওপি থেকে সরে আসা হয়েছে বলে যে কথাটি বলা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। ট্রানজিশনাল ডিপিপি অথবা ব্রিডিং ডিপিপি—যে নামেই বলি না কেন, এগুলোই ছিল বিকল্প ব্যবস্থা। তবে দীর্ঘদিন ওপিনির্ভর ব্যবস্থায় অভ্যস্ত থাকায় অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় ও দাতা সংস্থাগুলো বিকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় নেয়। পরে মন্ত্রিপরিষদ ও একনেকের অনুমোদন পেতেও দেরি হয়।  উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কি না। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কেনা হলে আনুমানিক কত অর্থ সাশ্রয় সম্ভব ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে সায়েদুর রহমান বলেন, উন্মুক্ত দরপত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিয়মিত প্রক্রিয়া। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়েও এই পদ্ধতি নিয়মিত অনুশীলন করা হয়। ফলে সিদ্ধান্তটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়নি। আর এখন পর্যন্ত ইপিআইর (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) টিকা কেনায় কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজার যাচাই করা হয়নি। তাই কত অর্থের সাশ্রয় সম্ভব ছিল সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না।  আপনি টিকা কেনায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের কথা বলেছেন। এখানে স্বচ্ছতা বলতে ঠিক কী বোঝাচ্ছেন? অতীতে কী ধরনের অস্বচ্ছতা বা অনিয়মের অভিযোগ ছিল? এমন প্রশ্নে ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়াকে সাধারণ দৃষ্টিতে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বলে মনে করা হয়। আমি শুধু সেটুকুই বুঝিয়েছি। অতীতে টিকা কেনায় অনিয়মের কথা বলিনি। শুধু অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি সংশ্লিষ্ট বিধি উল্লেখ করে যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন, সেটার কথা বলেছি। যে কোনো নিয়মিত ক্রয় এবং যে ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ছে, সেক্ষেত্রে যারাই সরকারের দায়িত্বে থাকবেন, নিশ্চয়ই তারা রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইবেন। সেক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনের ধারা বছরের পর বছর ধরে প্রয়োগ করবেন বলে আমার মনে হয় না।
হাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেনি কেউ
বিএনপি-জামায়াত ‘লড়াই’ এবার গরুর হাটের ইজারা নিয়ে
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশের খালি জায়গায় কোরবানির অস্থায়ী পশুর হাটের চলতি বছর সরকারি ইজারা মূল্য ধরা হয় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আগের বছর এই হাটের মূল্য ছিল ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। ফলে এবার প্রায় এক কোটি টাকা কমে দর নির্ধারণ করা হয়েছে। খাতা-কলমে এ হাটের সীমানা দনিয়া কলেজের পূর্ব পাশ থেকে শুরু করে সনটেক মহিলা মাদ্রাসার পূর্ব-পশ্চিমের খালি জায়গা পর্যন্ত ছিল। কিন্তু এবার এটি মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশের খালি জায়গা নিয়ে নির্ধারণ করে গত ৩০ এপ্রিল হাটের ইজারার দর উন্মুক্ত করা হয়। তবে সরকারি মূল্য কমলেও হাটটির প্রতিযোগিতা হয়েছে সর্বোচ্চ। চারটি দরপত্রের মধ্যে তিনটিতে চার কোটি টাকার বেশি দর এসেছে, আরেকটির দর না এলেও সর্বোচ্চ পে-অর্ডার জমা দিয়েছেন। শুধু এ হাটেরই এমন চিত্র নয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১১টি অস্থায়ী পশুর হাটের একই চিত্র দেখা গেছে। বিগত ১৭ বছর রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নেতাকর্মীদের হাতে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরের বছর ডিএসসিসির অস্থায়ী পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ মূলত বিএনপি নেতাদের হাতে থাকলেও এবার দৃশ্যপট বদলেছে।  হাটের নাম পরিবর্তন করে খাতা-কলমে জায়গা কমিয়ে সরকারি মূল্য কমালেও এ বছর বিএনপি নেতাদের সঙ্গে জামায়াত নেতারা অংশ নেওয়ায় হাটের দরে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এসব হাটের মধ্যে শুধু দুটি হাটে সিন্ডিকেটের কারণে কোনো দরই পড়েনি, আরেকটি হাটে গত বছরের ধারাবাহিকতায় সরকারি মূল্যের চেয়েও কম দর পড়েছে। ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর দনিয়া কলেজের পূর্ব পাশে ও সনটেক মহিলা মাদ্রাসার পূর্ব-পশ্চিমের খালি জায়গা নামে হাটটি স্থানীয় বিএনপির নেতা তারিকুল ইসলাম তারেক ইজারা নেন। তবে এ কার্যক্রমের পেছনে ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক নেতা নবীউল্লাহ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক কাউন্সিলর জুম্মন। এ বছরও তারেক দরপত্রের জন্য ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা দিলেও কোনো দর উল্লেখ করেননি। অন্যদিকে এবার স্থানীয় জামায়াত নেতা শামীম খানের প্রতিষ্ঠান কে বি ট্রেড সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা দর দিয়েছে। সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ দর উন্মুক্ত করার সময় এ হাটটি চূড়ান্ত না করে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে সম্পত্তি বিভাগ সর্বোচ্চ পে-অর্ডার দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে দর জানাতে চিঠি দেবে বলে জানা গেছে। এর আগে গত ২৭ এপ্রিল দুপুর ১টার দিকে ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগে যাত্রাবাড়ীর কাজলা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট এবং শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ড-সংলগ্ন জায়গা নামে হাটের দরপত্র সংগ্রহ করতে আসেন শ্যামপুর থানা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মহিউদ্দিনসহ দলের নেতাকর্মীরা। এ সময় শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিমেল, যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির নেতা শ্যামলের সঙ্গে তাদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে ডিএসসিসির সব আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দরপত্র বিক্রি নিশ্চিত করে সংস্থাটি। এ সময় ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশও মোতায়েন করা হয়। ডিএসসিসির হাটের ইজারায় অংশগ্রহণ নিয়ে জামায়াত নেতা শামীম খানকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা ভালো বলতে পারবেন। কেন্দ্রের নির্দেশনায় এ বছর হাটের ইজারায় অংশ নিয়েছি।’ জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের একাধিক নেতা এশিয়া পোস্টকে জানান, এ বছর ঢাকার দুটি নির্বাচনি এলাকার পশুর হাটসহ বিভিন্ন পশুর হাটে নেতাকর্মীরা ইজারায় অংশ নেন। আওয়ামী লীগের সময় তারা কোনো ধরনের সরকারি দরপত্রের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরের বছর তারা অংশ না নিলেও এ বছর ডিএসসিসির হাটে অংশ নিয়েছেন। ডিএসসিসি সূত্র আরও জানায়, পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের নদীর পাড়ের খালি জায়গার পশুর হাটটির এ বছর সরকারি মূল্য ছিল ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। কাজী মাহবুব মওলা হিমেল হাটটি ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন। স্থানীয় জামায়াত নেতাদের সমর্থনে মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন হাটটিতে ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা দর দেন। রাজধানীর হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজের পূর্ব পাশের খালি জায়গায় অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি মূল্য ছিল ৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এ বছর এটির জায়গা কলেজের সামনে থেকে শিকদার মেডিকেল কলেজসংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের খালি জায়গায় স্থানান্তর করা হয়েছে। এতেই হাটটির ৭৪ লাখ টাকা কমিয়ে সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। গণঅভ্যুত্থানের আগের বছর হাটটি হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবুল হাসনাত ৬ কোটি ৬ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন। গত বছর মেসার্স সাব্বির এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী নাফিজ কবির ৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় হাটটির ইজারা নেন। এ বছরও তিনি সরকারি মূল্যের চেয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে ইজারা নিয়েছেন। গত বছর উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গার পশুর হাটের সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৮২ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪ টাকা। চলতি বছর সরকারি মূল্য কমিয়ে ১ কোটি ৭৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৩৪ টাকা করা হয়। গত বছর সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা সিকদার কনস্ট্রাকশনের আনিসুর রহমান টিপু ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা দিয়ে ইজারা নিলেও একই হাট এবার তিনি ৩ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ে ইজারা নেন। আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গার সরকারি মূল্য ছিল ৫৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। এ বছর তা কমিয়ে ৫৩ লাখ টাকা করা হয়। গত বছর হাটটি ডেমরা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদিন রতন ৫৫ লাখ টাকায় নেন। এ বছর হাটটি তিনি ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন। এই হাটের দরপত্রেও জামায়াতের নেতারা প্রতিযোগিতা করেছেন। গত বছর আফতাবনগর (ইস্টার্ন হাউজিং) হাটের ইজারা বিজ্ঞপ্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত আদালতে নির্দেশে তা স্থগিত করা হয়। এ বছর হাটটির ইজারা বিজ্ঞপ্তি না দিলেও খালের দক্ষিণ পাড়ের মোয়াজ্জেম মোড়সংলগ্ন গ্রিন বনশ্রী হাউজিংয়ের খালি জায়গায় ৭০ লাখ টাকার সরকারি মূল্যে ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। তিনজন দরদাতার মধ্যে মোহাম্মদ গোলাম হোসেন ২০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে হাটের ইজারা নিয়েছেন। বাকি দুজনের দরের ব্যবধান ছিল ৫ ও ১০ হাজার টাকা। গত বছর কমলাপুরে সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারের পূর্ব পাশের খালি জায়গার সরকারি মূল্য ছিল ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। প্রতিবছর এই হাট ব্রাদার্স ক্লাব থেকে সাদেক হোসেন কমিউনিটি সেন্টার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এবার হাটটির ইজারা বিজ্ঞপ্তিতে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গার নাম উল্লেখ করা হয়।  শুধু আয়তন কম দেখিয়ে এবার মাত্র ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়, যা আড়াই গুণ কম। তবে হাটটিতে শেষ পর্যন্ত পাঁচটি দরপত্র জমা পড়েছে। এ বছর মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন নামে স্থানীয় এক নেতা ৩ কোটি ১ লাখ টাকা সর্বোচ্চ মূল্যে হাটের ইজারা পেয়েছেন। আরও দুজনের দর ২ কোটি টাকার বেশি ছিল। গোলাপবাগ মাঠসংলগ্ন খালি জায়গায় এ বছর নতুন করে দেয়া হাটের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। হাটটিতে ছয়টি দরপত্রের মধ্যে ২ কোটি ৫ লাখ টাকায় আহসানউল্লাহ নামে স্থানীয় বিএনপি নেতা হাটটির ইজারা নিয়েছেন। এই হাটে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা পৃথক ইজারা দর দিয়েছিলেন। সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গা ও ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালের আশপাশের খালি জায়গাসংলগ্ন হাটটির গত বছরের সরকারি মূল্য ছিল ৪ কোটি ৬৪ লাখ ১৫ হাজার ২৮০ টাকা। এ বছর ইজারা বিজ্ঞপ্তিতে শুধু মাঠের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গা উল্লেখ করে সরকারি মূল্য করা হয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। গত বছর হাটটির প্রথম পর্যায়ে ২ কোটি  টাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা তুষার আহমেদ ইমরান ইজারা দর দেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় পর্যায়ে এনসিপির এক নেতা সরকারি মূল্যের চেয়েও বেশি মূল্য দিলেও শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেটের কারণে হাটের ইজারা নিতে পারেননি। স্থানীয় বিএনপি নেতারা ধোলাইখাল ট্রাক স্ট্যান্ডের সড়কে হাট না বসানোর জন্য প্রশাসককে একাধিক চিঠি দেন সে সময়। পরে সরকারি মূল্যের চেয়ে অনেক কমে হাটটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়া হয়। এ বছরও স্থানীয় বিএনপি নেতা তুষার আহমেদ ইমরান একমাত্র দরদাতা হিসাবে মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা দর দিয়েছেন। এই হাটটির সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি এবং ওয়ারী থানা বিএনপির নেতারা জড়িত আছেন। তুষার আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘হাটের সঙ্গে সবাই জড়িত আছে। একা তো হাটের ইজারা নেওয়া যায় না।’ শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ডসংলগ্ন খালি জায়গার এ বছর সরকারি মূল্য ছিল ৬৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা। এ বছর হাটটির সরকারি মূল্য দাঁড়ায় ৬৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। তবে এখন পর্যন্ত হাটটির কোনো দরপত্র জমা হয়নি। লালবাগের রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি জায়গার পশুর হাটের গত বছর সরকারি মূল্য ছিল ৬৭ লাখ ৩১ হাজার ৬৬৭। সে সময় চকবাজার বিএনপি নেতা টিপু সুলতান ৭৪ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা নিয়েছেন। এ বছর হাটটির সরকারি মূল্য কমে ৬২ লাখ ৬৭ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। তবে এখন পর্যন্ত হাটটির কোনো দরপত্র জমা হয়নি। জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সংস্থাটির দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছিল হাটের দর কমানোর। তাই হাটের জায়গার নাম বদলে আয়তন কমিয়ে সরকারি মূল্য কমানো হয়েছিল। দরপত্র বিক্রি ও জমাদানেও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ হাটে দরদাতারা একাধিক রাজনৈতিক দলের হওয়ায় দরপত্রে প্রতিযোগিতা হয়েছে। ডিএসসিসিরি পশুর হাটে দুই দশক পর এ রকম প্রতিযোগিতা দেখা গেছে।’
বিএনপি-জামায়াত ‘লড়াই’ এবার গরুর হাটের ইজারা নিয়ে
অন্ধকার নামলেই বদলে যায় সীমান্তের সব হিসাব
অন্ধকার নামলেই বদলে যায় সীমান্তের সব হিসাব
শেরপুর সীমান্তজুড়ে চোরাচালানের অদৃশ্য করিডোর যেন দিন দিন আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকেই সীমান্ত এলাকায় নেমে আসে এক ভিন্ন বাস্তবতা; যেখানে মাদক, বিদেশি কসমেটিক্স, নিষিদ্ধ পণ্য থেকে শুরু করে বিলাসদ্রব্য পর্যন্ত অবাধে প্রবেশ করছে দেশের অভ্যন্তরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল আর অভিযানের মধ্যেই কীভাবে সক্রিয় এই সিন্ডিকেট? কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এই অন্ধকার বাণিজ্য, আর কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে মূলহোতারা? তা জানতে অনুসন্ধান শুরু করে এশিয়া পোস্ট। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চল হওয়ায় এই চোরাচালানের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্তের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পাহাড়ি ঝিরিপথ, ঘন জঙ্গল এবং দূরবর্তী অবস্থান, চোরাকারবারিদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে। অনুসন্ধানে এশিয়া পোস্ট নিশ্চিত হয়েছে ভারতের তুরা, ঢালু ও আসাম অঞ্চলের বিভিন্ন পাহাড়ি ঝিরিপথ ব্যবহার করে কাঁটাতারের নজরদারি এড়িয়ে অবৈধ পণ্য দেশে ঢুকছে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকার ও ভোরের কুয়াশা চোরাকারবারিদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ সময় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এরমধ্যে শেরপুর সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত এসব অবৈধ পণ্য প্রবেশ করছে। শেরপুরের সীমান্তবর্তী বিলপাড়, নকশি, রাংটিয়া, লোহার ব্রিজ, গোমড়া, সন্ধ্যাকুড়া, হালচাটি, তাওয়াকুচা, বালিজুড়ি, কর্ণজোড়া, রাবার বাগান, বারোমারি, খলচান্দা, নাকুগাঁও, পানিহাটা, শালবাগান অন্যতম। চোরাচালান কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র। অনুসন্ধানে দেখা যায়, সীমান্তের কসমেটিক্স চোরাচালানে নেতৃত্ব দিচ্ছে নাজিমুদ্দিন, সামী, আতিক ও মামুন। অন্যদিকে, মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জুয়েল, রাসেল, লিটন কোচসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাদের অধীনে কাজ করে আরও ছোট ছোট একাধিক গ্রুপ, যারা নির্দিষ্ট দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এদের প্রত্যেকের নামে রয়েছে একাধিক মামলা। এদের চোরাচালানের প্রক্রিয়াও বেশ সুসংগঠিত। প্রথমে পণ্যগুলো ভারতের মেঘালয় সীমান্তসংলগ্ন ঢালুর দোবাচিপাড়া ও বারাঙ্গাপাড়া এলাকায় আনা হয়। এরপর সেখানে অস্থায়ী একটি গুদামে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে বস্তায় ভরে সেগুলো শেরপুর সীমান্তের বিভিন্ন নির্দিষ্ট পয়েন্টে পাঠানো হয়। সেখান থেকে পণ্যগুলো গহীন জঙ্গলে সরিয়ে ফেলা হয় এবং পরবর্তীতে ইজিবাইক, মোটরসাইকেলের সিটের নিচে লুকিয়ে কিংবা স্কুলব্যাগের মতো সাধারণ উপায়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি রাজধানীতেও পৌঁছে দেওয়া হয়। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ময়মনসিংহ সেক্টরে পরিচালিত অভিযানে প্রায় ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য ও মাদক জব্দ করা হয়েছে এবং ১১৪ জনকে আটক করে বিজিবি। তবে এসব অভিযানে নিম্নস্তরের কারবারিরা ধরা পড়লেও মূলহোতারা এখনও আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চোরাচালান চক্রের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলাও ঝুঁকিপূর্ণ। পরিচয় প্রকাশ পেলে হামলার আশঙ্কা থাকে বলে অনেকেই মুখ খুলতে চান না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঝিনাইগাতী উপজেলার এক যুবক বলেন, সন্ধ্যার পর এই এলাকায় একেবারে অন্য রকম পরিবেশ হয়ে যায়। দিনের বেলায় যেটা স্বাভাবিক গ্রাম মনে হয়, রাত নামলেই সেটা যেন বদলে যায়। মাঝেমধ্যে দূর থেকে মানুষের চলাফেরা, ফিসফাস শব্দ, মোটরসাইকেলের আওয়াজ শোনা যায়। কারা আসে, কী নিয়ে আসে সব কিছুই অনেক সময় চোখে পড়ে, কিন্তু মুখ খুলে কিছু বলার সাহস নাই। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে চুপ থাকতেই হয়। আরেক বাসিন্দা বলেন, মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হয়, তখন কিছুদিন একটু কমে যায়। কিন্তু পরে আবার আগের মতোই শুরু হয়। সাধারণত ছোটখাটো লোকজনই ধরা পড়ে, যারা বহন করে বা নিচু পর্যায়ে কাজ করে। কিন্তু যারা আসল নিয়ন্ত্রণ করে, বড় সিন্ডিকেট চালায় তাদের কিছুই হয় না। নালিতাবাড়ী পানিহাটা এলাকার বাসিন্দারা জানান, এই এলাকায় কাজের সুযোগ খুব বেশি নেই, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। অনেকেই বেকার থাকে, তাই কিছু ছেলে সহজেই এসব কাজে জড়িয়ে পড়ে, কারণ এতে দ্রুত টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু তারা আসলে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না, শুধু নির্দেশ পালন করে। যারা মূলত এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে, তারা অনেক দূরে থাকে, সামনে আসে না, তাই তাদের ধরা কঠিন হয়ে যায়। আমরা সাধারণ মানুষ চাই এসব বন্ধ হোক, এলাকায় শান্তি ফিরুক, কিন্তু ভয় আর অনিশ্চয়তার কারণে কেউ খোলাখুলি কিছু বলতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমান্তে নজরদারির ঘাটতির সুযোগ নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে এই চক্র সক্রিয় রয়েছে। শক্তিশালী নেটওয়ার্ক থাকায় মূলহোতারা বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।  শেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. সিরাজুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদকের ব্যবসা করে আসছে। মাদকচক্রের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদেরকে নিশ্চিত করতে হলে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর তৎপরতা বাড়াতে হবে এবং আন্ত:দেশীয় সমন্বয় সাধন করতে হবে। তাহলেই এই মাদকদ্রব্য, চোরাকারবারি চিরতরে বন্ধ না হলেও সহনীয় অবস্থায় রাখা সম্ভব। চোরাকারবারি বন্ধ হলে আমাদের যুব সমাজ যারা বিপথে যাচ্ছে, তারা সুপথে ফিরে আসবে বলে আমি মনে করি। পুলিশ জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিজিবি জানায়, চোরাচালানকারীদের ধরতে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলো বনজঞ্জল ও পাহাড়ি এলাকা। এসব এলাকার কোন কোন জায়গায় কাঁটাতারের বেড়াও নেই। ফলে এই এলাকাগুলো মাদক ও চোরাকারবারিদের রুট। আমার বিভিন্ন সময় বড় বড় অভিযানে উদ্ধার মাধ্যমে প্রমাণ পেয়েছি।  তিনি আরও বলেন, শেরপুর জেলা পুলিশ ও তার গোয়েন্দা টিম এবং উপজেলার যে তিনটি থানা রয়েছে, সেই থানার সকল গোয়েন্দা টিম সব সময় মাদক ও চোরাকারবারিদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন সময় স্পেশাল অভিযানের মাধ্যমেও চোরাকারবারিদের ধরতে কাজ করছি। শুধু তাই নয়, এ সীমান্ত অঞ্চল থেকেও বড় বড় মাদকসহ অন্যান্য চালান কিন্তু পুলিশ জব্দ করার পাশপাশি কারবারিদের আটক করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ ৩৯ বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, সীমান্ত অঞ্চলে নিয়মিত টহল ও অভিযান চলছে। দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে জাল নোট পাচাররোধে সীমান্তে গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।  তিনি আরও বলেন, সীমান্তে চোরাচালান, মাদক, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে বিজিবি কাজ করছে। এসব ক্ষেত্রে ড্রোন, নাইট ভিশন ও ডিজিটাল সার্ভিলেন্সের মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করেছে। এসব কার্যক্রম সফল করতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাংবাদিক ও সাধারণ জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন রয়েছে।
মন্ত্রিসভার পরিধি বাড়ছে, আলোচনায় বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা
মন্ত্রিসভার পরিধি বাড়ছে, আলোচনায় বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মন্ত্রিসভার আকার যেকোনো সময় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রদবদল হতে পারে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে। সরকার ও বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্রের সঙ্গে আলাপ করে এমন ইঙ্গিত মিলেছে। সরকারের জনবান্ধব বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনের কাজের গতি বাড়াতে ঈদুল আজহার পর বাজেট অধিবেশন শেষে এই সম্প্রসারণ হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য হচ্ছে যেসব মন্ত্রণালয়ে কাজের চাপ বেশি, সেখানে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসা এবং একজন মন্ত্রীর দায়িত্ব একটি মাত্র দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় কয়েকজনকে উপমন্ত্রী হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এছাড়া সংরক্ষিত নারী আসন থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যকে মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে। আলোচনায় যাদের নাম নতুন মন্ত্রিসভায় কয়েকজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, পোড় খাওয়া রাজনীতিক এবং দুই-একজন তরুণ মুখ দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় আসছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং কাজের ধীরগতির বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। অবিলম্বে এটি কাটিয়ে উঠতে চায় সরকার। বর্তমান মন্ত্রিসভার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের আভাস মিলেছে। তিনজন মন্ত্রীর দায়িত্ব কমানোর পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তন হতে পারে। ইতোমধ্যে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন মন্ত্রী এবং দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আরেক মন্ত্রীর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে তাদের দায়িত্ব কমিয়ে দেওয়ার আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে বর্ধিত মন্ত্রিসভায় দেখা যাবে। এক্ষেত্রে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে। বর্তমান মন্ত্রিসভায় নোয়াখালী অঞ্চলের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুকের নামও আলোচনায় রয়েছে। নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে তিনি ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের নামও আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে পারেন ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ও দোহার-নবাবগঞ্জের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক, কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় আছেন খুলনার আজিজুল বারী হেলাল, ফরিদপুরের শহিদুল ইসলাম বাবুল ও সিরাজগঞ্জের আমিরুল ইসলাম খান আলিমের মতো নেতারা। মন্ত্রিসভার বাইরে সংসদ উপনেতা হিসেবে দলের স্থায়ী কমিটির প্রবীণ দুই সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আব্দুল মঈন খানের নাম আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদে দুজন সদস্য বাড়তে পারে। টেকনোক্র্যাট কোটা টেকনোক্র্যাট কোটায় আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের মতো ত্যাগী নেতারা। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। বর্ধিত মন্ত্রিসভায় তাকেও দেখা যেতে পারে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেলের নাম আলোচনায় রয়েছে। বগুড়ার এই নেতা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কবে নাগাদ নতুন মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নাম ঘোষণা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত নির্দেশনা আসেনি। তবে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘এ বিষয়ে দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা হয়নি। এটি দলের চেয়ারম্যান ও সরকারপ্রধান তারেক রহমান ভালো বলতে পারবেন। তিনি কখন কাকে নেবেন, কোথায় দায়িত্ব দেবেন; সেটি সম্পূর্ণ তার এখতিয়ার।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, ‘এটি একান্তই প্রধানমন্ত্রীর বিষয়। তিনি যদি মনে করেন বর্তমান সদস্যদের নিয়ে সরকার পরিচালনা করবেন, তাহলে সেটিই করবেন। আবার কাজের সুবিধার্থে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করলে সেটিও করতে পারেন।’ বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। তবে কোনো উপমন্ত্রী নেই।
নতুন কমিটি গঠনে কৃষক দলে হিসাব-নিকাশ, আলোচনায় কয়েক নেতা
নতুন কমিটি গঠনে কৃষক দলে হিসাব-নিকাশ, আলোচনায় কয়েক নেতা
সরকার পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে দৃশ্যত সক্রিয় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও কৃষক দলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে আসতে আগ্রহী নেতাদের তৎপরতা কয়েক গুণ বেড়েছে।  শনিবার  (৯ মে) ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তারেক রহমান। এরপর কৃষক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে তার।  সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বৈঠকগুলো সংগঠন পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘দলীয় অঙ্গসংগঠনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং নতুন নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দ্রুতই এ বিষয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে।’ দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানের নির্দেশনায় মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কৃষক দলেও নতুন নেতৃত্ব আসছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনকে সভাপতি এবং সাবেক ছাত্রনেতা শহিদুল ইসলাম বাবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুকে সিনিয়র সহসভাপতি, অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবর্তীকে সহসভাপতি, প্রকৌশলী টিএস আইয়ুবকে সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক, মোশারফ হোসেনকে যুগ্ম সম্পাদক এবং মো. শফিকুল ইসলামকে দপ্তর সম্পাদক করা হয়। পরে একই বছরের ৭ ডিসেম্বর ২৩১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। বর্তমান সভাপতি হাসান জাফির তুহিন সচিব পদমর্যাদায় বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় সংগঠনে আগের মতো সময় দিতে পারছেন না। একইভাবে সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুলও সংসদ সদস্য হিসেবে ব্যস্ত থাকায় সাংগঠনিক কাজে সময় সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে সংগঠনকে গতিশীল রাখতে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে। জাতীয়তাবাদী কৃষক দল বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। অতীতে এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়া ও বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়াও আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর মতো শীর্ষ নেতারা। নতুন নেতৃত্বে যারা আলোচনায় কৃষকদলের নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন—বর্তমান কৃষক দলের সিনিয়র সহসভাপতি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, বিএনপির গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক কৃষিবিদ শামিমুর রহমান শামীম এবং বর্তমান কমিটির সহসভাপতি খলিলুর রহমান (ভিপি ইব্রাহিম)। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন—বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ এবং এ্যাবের সাধারণ সম্পাদক এবং কৃষকদলের যুগ্ম সম্পাদক শাহাদত হোসেন বিপ্লব। তবে সাধারণ সম্পাদক পদে কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশের নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ বাঞ্ছারামপুর আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। পরে সেখান থেকে শেষ পর্যন্ত বিএনপি জোটের প্রার্থী জোনায়েদ সাকিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এ ছাড়া ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের মধ্য থেকেও কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। নতুন কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার কাছে অফিসিয়ালি এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। তবে সংগঠনের গতিশীলতার স্বার্থে পরিবর্তন আসতেই পারে—এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি এখন সরকার পরিচালনা করছে, তাই জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা বেড়েছে। যেসব কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পুনর্গঠন করা হবে এবং সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারাই স্থান পাবেন।’ সব মিলিয়ে বিএনপির অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনের এই উদ্যোগকে ঘিরে দলীয় রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের আভাস মিলছে। বিশেষ করে কৃষক দলের নতুন কমিটি যে কোনো সময় ঘোষণা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
হাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেনি কেউ
দাবি সাবেক বিশেষ সহকারী সায়েদুরের / হাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেনি কেউ
দেশে হামে তিন শতাধিক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় এই রোগের টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গাফিলতিকে দুষছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তবে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। তার দাবি, হাম নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সতর্ক করেনি। যদিও ইউনিসেফের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা তৎকালীন সরকারকে সতর্ক করেছিলেন। বর্তমানে দেশের ৬১টি জেলায় হামে ভুগছে শিশুরা। সরকারি হিসাবে শুধু গত ৫০ দিনেই সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগী ৪৭ হাজার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩১১ শিশুর। সর্বশেষ সোমবার (৪ মে) হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এক দিনে রেকর্ড ১৭ জনের মৃত্যু খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এমন পরিস্থিতির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে দুষছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তারা বলছেন, ওই সময়ে হামের টিকাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।  অভিযোগের মুখে ডা. সায়েদুর রহমানের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারকে কেউ এ নিয়ে সতর্ক করেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কিংবা সংক্রামক রোগ নিয়ে কাজ করা কোনো বেসরকারি সংস্থা কেউ সাবধান করেনি। দেশের প্রখ্যাত রোগতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদরাও কোনো সতর্কবার্তা দেননি।  এশিয়া পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিকা কেনার জটিলতা, বিশেষ ক্যাম্পেইন না হওয়ার কারণ, অপারেশন প্ল্যান (ওপি) থেকে সরে আসা এবং হামে রেকর্ড মৃত্যুসহ সামগ্রিক বিষয়ে কথা বলেছেন সায়েদুর রহমান। ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে হামের টিকা ক্যাম্পেইন আয়োজন সম্ভব না হওয়ার বিষয়ে তার কাছে জানতে চান এ প্রতিবেদক। উত্তরে তিনি বলেন, আগের দুটি বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল ২০১৪ ও ২০২০ সালে, অর্থাৎ মাঝে ছয় বছরের ব্যবধান ছিল।  পরবর্তী বিশেষ কর্মসূচি ২০২৪ সালে হওয়ার কথা ছিল। এটি স্বীকার করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ছয় মাস স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অত্যন্ত জটিল, জরুরি ও সংবেদনশীল অনেক বিষয় মোকাবিলা করতে হয়েছিল। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের তথ্য যাচাই এবং আহতদের দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনার সমন্বয় করতে হয়েছে।  পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ২০২৫ সালের মার্চে বিশেষ হাম কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় এমআর ভ্যাকসিন বরাদ্দ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তপত্র স্বাক্ষর করে ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার বৈশ্বিক জোট গ্যাভি। তখন ভ্যাকসিনের চালান দুই ধাপে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর এবং ২০২৬ সালের মার্চে দেশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়। এই পরিকল্পনার বিষয়ে সায়েদুর রহমান বলেন, সে সময় কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিশেষ হাম কর্মসূচি জরুরিভিত্তিতে অবিলম্বে শুরু করার মতো কোনো সতর্কতা, বার্তা, লাল সংকেত বা পরামর্শ ছিল না। তিনি বলেন, আজকে পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, যদি সে সময় কোনো দেশি-বিদেশি সংস্থা, কর্তৃপক্ষ বা বিশেষজ্ঞের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সতর্কতা পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো আমরা চালান পৌঁছানোর দিনক্ষণ পুনর্নির্ধারণ করে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারতাম। ডা. সায়েদুর রহমানের এমন দাবির সঙ্গে অবশ্য একমত নন ইউনিসেফের কর্মকর্তারা। মঙ্গলবার (৫ মে) সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে কথা বলেছেন জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া। তিনি বলেন, ইউনিসেফ একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রতিটি বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, জটিলতা বৃদ্ধি এবং মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে।  হামে তিন শতাধিক শিশুর মৃত্যুর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বর্তায় কি না—এমন প্রশ্নে সায়েদুর রহমান বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং আমাদের দেশের সবাই প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুর মৃত্যুতে গভীরভাবে মর্মাহত। শুধু স্বাস্থ্য খাতের অংশীজন নয়, সারা দেশের মানুষের আবেগের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। দায় বিষয়ে আলোচনাটা খুব সংবেদনশীল এবং এখন এটি নির্ধারণ করাও জটিল। তবে সেই নির্ধারণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে দায় চাপিয়ে দেওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক ও প্রশাসনিক ঘটনাবলির বিশ্লেষণ এবং তার ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ। তবে আমি আগেও উল্লেখ করেছি যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় টিকা কিনতে প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও নীতিগত সহায়তা স্বল্পতম সময়ে প্রদান করেছে।  অন্তবর্তী সরকারের সময় হামের টিকার তুলনামূলকভাবে কম কাভারেজ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা তথ্যের বিষয়ে সায়েদুর রহমান জানান, ২০২৪ সালে হামের টিকার প্রথম ডোজের কাভারেজ ছিল ৯৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ৯৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালের কাভারেজ নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারীরা দেশব্যাপী প্রায় তিন মাস টিকাদানের তথ্য নিয়মিত আপলোড করেননি। ফলে ড্যাশবোর্ডে কাভারেজ ৫৯ শতাংশ দেখাচ্ছিল, যা পরে অপসারণ করা হয়। নির্ভরযোগ্য উৎস অনুযায়ী, গত বছর হামের প্রথম ডোজের প্রকৃত কাভারেজ ছিল ৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কাভারেজ কিছুটা কম থাকার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেটুকু কম টিকাদান দৃশ্যমান হচ্ছে, তার প্রধান কারণ স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলন-কর্মবিরতি-অসহযোগিতা। এর পাশাপাশি অনেক পদ শূন্য থাকায় কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ, কোভিড-পরবর্তী টিকাভীতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকাবিরোধী প্রচারণাকেও কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। ইউনিসেফের সঙ্গে টিকা সরবরাহে জটিলতার অভিযোগ প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান বলেন, ইউনিসেফের সঙ্গে টিকা সরবরাহ সংক্রান্ত জটিলতা হয়েছে বলাটা ঠিক হবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইউনিসেফ জরুরি প্রয়োজনে একাধিকবার অর্থ পরিশোধের আগেই টিকা সরবরাহ করেছে।   ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) টিকা কেনার প্রস্তাব উপদেষ্টা পরিষদের অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত কমিটিতে উত্থাপন করা হলে কমিটি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ অনুসরণের কথা জানায়। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে কমিটি ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি টিকা কেনার অনুমোদন দেয়।  ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৮৪২ কোটি টাকার টিকা ডিপিএম পদ্ধতিতে কেনার অনুমতি চাওয়া হলে কমিটি ৫০ শতাংশের অনুমোদন দেয়। বাকি অংশের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম) অনুসরণের নির্দেশ দেয়। সেই অনুযায়ী নভেম্বরে ৪১৯ কোটি টাকার টিকা ডিপিএম পদ্ধতিতে ইউনিসেফের কাছ থেকে কেনার অনুমোদন পাওয়া যায়।  চলতি বছরের জানুয়ারিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ থেকে আরও ৬০৯ কোটি টাকার টিকা ডিপিএম পদ্ধতিতে কেনার প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এক হাজার ২৮ কোটি টাকার টিকা কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে ইউনিসেফের সঙ্গে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অর্থ সমন্বয় করতে দেরি হওয়ায় বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড় করাতেও সময় লাগে।  বাকি ৫০ শতাংশ টিকা কেনার বিষয়ে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ইউনিসেফ লিখিতভাবে ডিপিএম পদ্ধতি অনুসরণের অনুরোধ করে। ৩০ ডিসেম্বর ডিপিএম সুবিধা ব্যাখ্যা করে ইমেইল পাঠায়। পরের বছর ১১ ফেব্রুয়ারি ডিপিএম ও ওটিএম পদ্ধতিতে সময়ের পার্থক্য তুলে ধরে আবারও যোগাযোগ করে সংস্থাটি। এ প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান বলেন, ইউনিসেফের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাওয়ার পর নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততার ফলে সিদ্ধান্তগ্রহণের বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের বিবেচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়।  ইউনিসেফের পরামর্শ উপেক্ষা করে ওটিএম পদ্ধতিতে কোনো টিকা কেনা হয়নি জানিয়ে সায়েদুর রহমান বলেন, আমি যেহেতু নিশ্চিত নই, তাই ইউনিসেফের সঙ্গে কোনো জটিলতা হয়েছে, এমনটা বলছি না। তবুও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ বা বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা যেতে পারে, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে নিয়মিত ক্রয়ের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে বিধিমালা অনুসরণের সিদ্ধান্তের কারণে সম্ভবত ইউনিসেফের দিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকতে পারে।  বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই ওপি থেকে সরে আসার অভিযোগ প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান জানান, ১৯৯৮ সাল থেকে সরকার স্বাস্থ্য খাতে দাতানির্ভর সেক্টর ওয়াইড প্ল্যান (খাতভিত্তিক পরিকল্পনা) অনুসরণ করে আসছিল। তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শেষে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) অনুমোদনের সময় ২০১৭ সালে পরিকল্পনা কমিশন এক্সিট প্ল্যান তৈরির তাগিদ দেয়। কিন্তু তখনকার সরকার কোনো এক্সিট প্ল্যান ছাড়াই চতুর্থ এইচপিএনএসপি শেষ করে এবং দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চালায়। এমনকি পরবর্তী পঞ্চম এইচপিএনএসপিও (২০২৪-২০২৯) একই প্রক্রিয়ায় প্রণয়ন করা হয়।  অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পঞ্চম এইচপিএনএসপি পরিকল্পনা কমিশনে উত্থাপন করা হলে এক্সিট প্ল্যানসহ পুনরায় উপস্থাপনের নির্দেশনা দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দাতানির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ নির্ধারণে মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়।  সায়েদুর রহমান বলেন, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া ওপি থেকে সরে আসা হয়েছে বলে যে কথাটি বলা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। ট্রানজিশনাল ডিপিপি অথবা ব্রিডিং ডিপিপি—যে নামেই বলি না কেন, এগুলোই ছিল বিকল্প ব্যবস্থা। তবে দীর্ঘদিন ওপিনির্ভর ব্যবস্থায় অভ্যস্ত থাকায় অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় ও দাতা সংস্থাগুলো বিকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় নেয়। পরে মন্ত্রিপরিষদ ও একনেকের অনুমোদন পেতেও দেরি হয়।  উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কি না। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কেনা হলে আনুমানিক কত অর্থ সাশ্রয় সম্ভব ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে সায়েদুর রহমান বলেন, উন্মুক্ত দরপত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিয়মিত প্রক্রিয়া। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়েও এই পদ্ধতি নিয়মিত অনুশীলন করা হয়। ফলে সিদ্ধান্তটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়নি। আর এখন পর্যন্ত ইপিআইর (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) টিকা কেনায় কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজার যাচাই করা হয়নি। তাই কত অর্থের সাশ্রয় সম্ভব ছিল সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না।  আপনি টিকা কেনায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের কথা বলেছেন। এখানে স্বচ্ছতা বলতে ঠিক কী বোঝাচ্ছেন? অতীতে কী ধরনের অস্বচ্ছতা বা অনিয়মের অভিযোগ ছিল? এমন প্রশ্নে ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়াকে সাধারণ দৃষ্টিতে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বলে মনে করা হয়। আমি শুধু সেটুকুই বুঝিয়েছি। অতীতে টিকা কেনায় অনিয়মের কথা বলিনি। শুধু অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি সংশ্লিষ্ট বিধি উল্লেখ করে যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন, সেটার কথা বলেছি। যে কোনো নিয়মিত ক্রয় এবং যে ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ছে, সেক্ষেত্রে যারাই সরকারের দায়িত্বে থাকবেন, নিশ্চয়ই তারা রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইবেন। সেক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনের ধারা বছরের পর বছর ধরে প্রয়োগ করবেন বলে আমার মনে হয় না।