রাজধানীর রায়েরবাজার বধ্যভূমির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হাইক্কার খালে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের জন্য ইজারা বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। মাত্র তিন লাখ টাকা মূল্যে তিন বছরের এই ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে গত ৯ এপ্রিল। অথচ এই খাল ঢাকার অন্যতম জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল।
হাইক্কার খালে রয়েছে ৩৪ প্রজাতির পাখি, সাত প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১২ প্রজাতির মাছ, ১১ প্রজাতির প্রজাপতি, পাঁচটি পরাগায়নকারী প্রজাতি এবং অল্প কিছু সরীসৃপ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ শুরু হলে এই খালের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়বে এবং বিপন্ন হবে সেখানকার জীববৈচিত্র্য।
শহরের মাঝে বনের মতো এক খাল
ঢাকার পশ্চিম প্রান্তে মোহাম্মদপুর এলাকার বুক চিরে বয়ে গেছে হাইক্কার খাল। কয়েক দশকের দখল আর দূষণে টিকে থাকার লড়াই করতে করতেও খালটি ধরে রেখেছে তার আধা-প্রাকৃতিক রূপ। ঘন ঝোপঝাড়, স্থির জল আর পাখির কলকাকলিতে এটি আজও যেন আলাদা এক জগৎ।
২০২৫ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ডিএনসিসির সহযোগিতায় রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার এই খাল নিয়ে একটি জীববৈচিত্র্য সমীক্ষা পরিচালনা করে। এতে উঠে আসে চমকপ্রদ তথ্য। মাছরাঙা, বক থেকে শুরু করে বিরল লক্ষ্মীপেঁচা পর্যন্ত ৩৪ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে এখানে।
শহরের মাঝে মেছো বিড়াল বা শিয়ালের অস্তিত্ব এখন প্রায় কল্পনার মতো হলেও এই খালে তাদের অবাধ বিচরণ। বড় বাদুড় বা ফ্লাইং ফক্সও রয়েছে। রুই, কাতলা, শোল ও পুঁটির মতো দেশি মাছের পাশাপাশি পাওয়া গেছে নানা প্রজাতির মাছ। ১১ প্রজাতির প্রজাপতি আর মৌমাছির গুঞ্জনে মুখর থাকে এর পাড়। এমনকি তিলা কচ্ছপ ও ঢোঁড়া সাপেরও সন্ধান মিলেছে এখানে।

সমীক্ষা প্রতিবেদনে হাইক্কার খালকে ধানমন্ডি লেক বা হাতিরঝিলের চেয়েও বেশি প্রাকৃতিক ও বৈচিত্র্যময় হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ওই সমীক্ষার ভিত্তিতেই ডিএনসিসির তৎকালীন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ হাইক্কার খালকে দিয়াবাড়ি, নিকুঞ্জ লেক ও বনানী ফ্লাইওভারের নিচের জলাশয়ের সঙ্গে একত্রে ‘বায়োডাইভারসিটি হটস্পট’ ও ‘নগর জীববৈচিত্র্য বিদ্যালয়’ ঘোষণা করেন এবং জনসাধারণের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত ঘোষণা করেন।
হাইক্কার খালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর চরম নৃশংসতার সাক্ষী রায়েরবাজার বধ্যভূমির ভেতর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে খালটি। প্রাণিবৈচিত্র্যের পাশাপাশি এটি মোহাম্মদপুর এলাকার জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষাও বটে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমায়, নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। খালের প্রজাপতি ও মৌমাছিরা পরাগায়নের মাধ্যমে শহরের সবুজ রক্ষায় অবদান রাখছে।
সম্পত্তি বিভাগের উদাসীনতা
বায়োডাইভারসিটি হটস্পট ঘোষণার পরও কেন বাণিজ্যিক মাছ চাষের ইজারা? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনে। ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার আগে ডিএনসিসির অঞ্চল-৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ছাদেকুর রহমানের কাছে মতামত চাওয়া হয়েছিল। তিনি খালে বাণিজ্যিক মাছ চাষের বিপক্ষে মত দেন। কিন্তু প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান সেই মতামত আমলে না নিয়ে ইজারা বিজ্ঞপ্তি জারি করেন।
মো. ছাদেকুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘খালটিতে বাণিজ্যিক মাছ চাষের ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার আগে সম্পত্তি বিভাগের পক্ষ থেকে মতামত চাওয়া হয়। বাস্তবতার নিরিখে আমার কাছে যেটি ভালো মনে হয়েছে, সেটি আমি মতামত দিয়েছি।’
এ বিষয়ে জানতে প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমানের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

খালে ভেঙে পড়বে খাদ্যশৃঙ্খল
বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ শুরু হলে কী হবে হাইক্কার খালের, এমন প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পরিণতি হবে মারাত্মক। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘করপোরেশন খালটিকে বায়োডাইভারসিটি ঘোষণা করে উল্টো আবার বাণিজ্যিক মাছ চাষের জন্য ইজারা দেওয়া বৈপরীত্য। খালে বাণিজ্যিক মাছ চাষ হলে সেখানে মানুষের যাতায়াত বাড়বে। মাছের জন্য খাবার ও কীটনাশক দিলে অন্যান্য প্রাণী, কীটপতঙ্গ এসব খেয়ে মারা যাবে। নিরাপদ আবাসের সন্ধানে খাল থেকে বিতাড়িত হবে প্রাণী।’
এই বিপদের কথা আগেই উঠে আসে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষা প্রতিবেদনে। সেখানে বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে দখল বন্ধ করে খালের সীমানা নির্ধারণ, পাখি ও কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষিত ঘোষণা এবং দেশি ফলের গাছ ও ঝোঁপঝাড় রোপণ করে প্রাকৃতিক সংযোগ বজায় রাখার সুপারিশ করেছিলেন।
সমীক্ষা পরিচালনাকারী রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের প্রধান গবেষক মোহাম্মদ শুভ রায়হান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ও পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করে যেভাবে এই জলাভূমিগুলো ভরাট হচ্ছে, তাতে হাইক্কার খালের অস্তিত্ব রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। ঢাকার ফুসফুস যদি বাঁচাতে হয়, তবে হাইক্কার খালের মতো প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থলগুলোকে আগলে রাখতে হবে। আজ যে শালিক বা মাছরাঙা ডানা ঝাপটাচ্ছে হাইক্কারের জলে, আগামীর শিশুদের কাছে তা যেন কেবল বইয়ের পাতা বা ছবির ফ্রেমে বন্দি না হয়ে যায়, এ জন্য করপোরেশনকে উদ্যোগ নিতে হবে। তবে করপোরেশন যদি সেখানে এসব উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য ইজারা দেয়, তবে এ খালের সঙ্গে প্রাণীরাও হারিয়ে যাবে।’
অবশেষে ইজারা বাতিলের আশ্বাস
সমালোচনার মুখে অবশ্য পিছু হটতে শুরু করেছে ডিএনসিসি। করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, ‘এই ইজারা ও খাল সম্পর্কে জানা ছিল না। ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সেখানে কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম হবে না। ইজারা বিজ্ঞপ্তি বাতিল করা হবে।’
শুধু ইজারা বাতিলই যথেষ্ট কি না, উঠছে সেই প্রশ্নও। সমীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, খালের দুই পাড় দখল করে এখনও বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণ ও গাছ কাটার কারণে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। সাপ বা ব্যাঙের মতো নিরীহ প্রাণী মেরে ফেলা হচ্ছে না বুঝেই। সিঙ্গাপুরি ডেইজির মতো বিদেশি আগাছা গ্রাস করে নিচ্ছে দেশি লতাগুল্ম। এর মধ্যেই এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করে বাণিজ্যিক ইজারার বিজ্ঞপ্তি।




