ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জমিতে পাঁচ বছর ধরে ৮৩টি মোবাইল টাওয়ার বসিয়ে ব্যবসা করছে অবকাঠামো সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ই ডটকো বাংলাদেশ। অথচ এই পাঁচ বছরে এক টাকাও ভাড়া বা কর আদায় করেনি ডিএনসিসি। বিদ্যমান বাজারদর অনুযায়ী, এই সময়ে করপোরেশনের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা।
২০২১ সালের ৭ জুন তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলামের আমলে ই ডটকো বাংলাদেশের সঙ্গে ডিএনসিসির একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। এতে বলা হয়, ই ডটকো ডিএনসিসি এলাকার ২৪৯টি স্থানে মোবাইল টাওয়ারের সঙ্গে স্মার্ট স্ট্রিট ফার্নিচার স্থাপন করবে। এর মধ্যে থাকবে এয়ার কোয়ালিটি সেন্সর, স্মার্ট বিন, সিসি ক্যামেরা, এলইডি লাইট এবং ওয়াইফাই সুবিধা।
চুক্তিটি করা হয় ডিএনসিসির রাজস্ব বিভাগকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে। অথচ সিটি করপোরেশনের জমিতে যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি ও ভাড়া নির্ধারণের দায়িত্ব রাজস্ব বিভাগের। ই ডটকোর সঙ্গে ডিএনসিসির চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মাকসুদ হাশেম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি তার এখতিয়ারের বাইরে ছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি ছিল একটি সাজানো প্রক্রিয়া। রাজস্ব বিভাগকে জানালে তারা অবশ্যই ভাড়া ও করের বিষয়টি তুলত। স্বচ্ছতা এড়াতেই নগর পরিকল্পনা বিভাগকে দিয়ে এটি করানো হয়েছে।’
তবে বর্তমানে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরে কর্মরত মাকসুদ হাশেমের দাবি, যথাযথ অনুমোদন নিয়েই তিনি স্বাক্ষর করেছিলেন।
ডিএনসিসির নথিপত্র এবং গত ৮ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসি ও এডোটকোর মধ্যে অনুষ্ঠিত সভার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি মোবাইল টাওয়ার ডিএনসিসির প্রায় ৯ বর্গফুট জমি দখল করে আছে। ৮৩টি টাওয়ার এভাবে পাঁচ বছর ধরে বিনামূল্যে সরকারি জমি ব্যবহার করে আসছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, প্রতিটি টাওয়ার থেকে বছরে গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ভাড়া পাওয়ার কথা। সেই হিসাবে ৮৩টি টাওয়ার থেকে বছরে আয় হওয়ার কথা ১ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পাঁচ বছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাত কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
ডিএনসিসির বর্তমান প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এস এম শফিকুর রহমান সভায় জানান, ই ডটকো পাবলিক স্পেসে মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করে অর্থ উপার্জন করছে, কিন্তু পাবলিক স্পেস ব্যবহারের জন্য ডিএনসিসিকে কোনো কর বা ভাড়া পরিশোধ করছে না। তৎকালীন চুক্তিতে কোনো ভাড়া ধার্য ছিল না।
ডিএনসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের একজন প্রকৌশলী জানান, শুরুতে ই ডটকো তাদের কাছে প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তাদের প্রস্তাবিত ডাস্টবিন ও লাইট সিটি করপোরেশনের জন্য জরুরি ছিল না বিধায় তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে তারা সরাসরি মেয়রের কার্যালয় থেকে অনুমোদন বাগিয়ে নেয়।
ই ডটকোর দাবি, তারা এখন পর্যন্ত ৮৩টি স্থানে স্মার্ট স্ট্রিট ফার্নিচার স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করেছে। কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন। সরেজমিনে বিজয় সরণি ও নতুনবাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিজয় সরণিতে ফ্রি ওয়াইফাই সংযোগ থাকলেও তা অকেজো। নতুনবাজারে স্মার্ট ডাস্টবিনের কোনো অস্তিত্ব নেই। কোথাও কোথাও কেবল ভাঙা ডাস্টবিন পড়ে আছে। কিছু লোকেশনে সিসি ক্যামেরা এবং অন্যান্য ডিভাইসও পাওয়া যায়নি।
ই ডটকোর প্রতিনিধিদের দাবি, চুরি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া কারিগরি জটিলতার কারণে ডিএনসিসির ওয়েবসাইটের ড্যাশবোর্ডের সঙ্গে ডিভাইসগুলোর ইন্টিগ্রেশন প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়েছে।
এ নিয়ে ই ডটকো বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স প্রধান আমিনা মুন্নি বলেন, তারা বিটিআরসির নীতিমালার মধ্যেই কাজ করছেন। বর্তমানে ডিএনসিসি চুক্তিটি পর্যালোচনা করছে এবং তারা একটি বাণিজ্যিক কাঠামোর আওতায় আসতে ডিএনসিসির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
স্মার্ট ফার্নিচার প্রসঙ্গে অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা হাজির করেছেন আমিনা মুন্নি। তার দাবি, ‘সে সময় টাওয়ারের সঙ্গে স্মার্ট স্ট্রিট ফার্নিচার (এয়ার কোয়ালিটি সেন্সর, স্মার্ট বিন, সিসি ক্যামেরা, এলইডি লাইট, ওয়াইফাই) সংযুক্ত করার চুক্তি ছিল না। শুধু টাওয়ারে এসব সুবিধার জন্য জায়গা রাখার চুক্তি ছিল, সুবিধাগুলো সিটি করপোরেশনের দেওয়ার কথা ছিল।’
অস্পষ্টতা কাটাতে ডিএনসিসি এখন ২০১৬ সালের কর বিধিমালার ২৯৮(ঘ) ধারা অনুযায়ী ফি আদায়ের কথা ভাবছে। ধারাটি মূলত বিলবোর্ডের জন্য প্রযোজ্য হলেও এক্ষেত্রে তা প্রয়োগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, ‘করপোরেশনে অতীতে যে ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছি। ই ডটকোর সঙ্গে এই অসম চুক্তির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে এবং বকেয়া রাজস্ব আদায়ের পথ খোঁজা হবে।’




