ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE
অনলাইন ডেস্ক
  ২৩ মে ২০২৫, ০০:০০

রক্তদান একটি মহৎ ও মানবিক কাজ। এটি যেমন অন্যের জীবন বাঁচায়, তেমনি দাতার শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও বেশ উপকারী। তবে নিয়মিত রক্তদানকারীদের জন্য কিছু যত্ন নেওয়া ও সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। যাতে রক্তদাতারা সুস্থ থাকেন এবং নিরাপদভাবে রক্তদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারেন।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

পানি পান ও পরিমাণ: রক্তদানের আগে ও পরে পর্যাপ্ত পানি পান খুব গুরুত্বপূর্ণ। রক্তদানের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে থেকে পানি পানের পরিমাণ বাড়ানো উচিত। পুরুষের ক্ষেত্রে দিনে অন্তত আড়াই থেকে তিন লিটার পানি এবং নারীর ক্ষেত্রে দুই থেকে আড়াই লিটার পানি যথেষ্ট। রক্তদানের পর অন্তত চার থেকে ছয় গ্লাস অতিরিক্ত পানি পান করলে শরীরে রক্ত ভলিউম দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়।

খাদ্যাভ্যাস: রক্তদাতার আয়রনসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খাওয়া উচিত। যেমন: লাল মাংস, কলিজা, ডিমের কুসুম, সবুজ শাকসবজি, বিশেষ করে পালংশাক, মুলাশাক)। এ ছাড়া ডাল, ছোলা, কলা, খেজুর, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল যেমন- কমলা, মাল্টা, যা আয়রন শোষণে সহায়ক। রক্তদানের পরে দুধ, ফল ও হালকা খাবার গ্রহণে শরীর দ্রুত চাঙ্গা হয়।

কারা রক্তদান করতে পারবেন: ১৮ থেকে ৬০ বছরের যে কোনো শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও সক্ষম ব্যক্তি, যার শরীরের ওজন ৪৫ কেজির উপরে, তারা নিয়মিত রক্তদান করতে পারেন। তবে রক্ত দিতে হলে কিছু রোগ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ অনুযায়ী, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের জন্য রক্তদাতার শরীরে কমপক্ষে পাঁচটি রক্তবাহিত রোগের অনুপস্থিতি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। এ রোগগুলো হলো- হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, এইচআইভি বা এইডসের ভাইরাস, ম্যালেরিয়া ও সিফিলিস।

রক্তদানের সীমা: পুরুষরা বছরে সর্বোচ্চ তিনবার রক্ত দিতে পারেন অর্থাৎ প্রতি চার মাসে একবার। নারীরা যেহেতু নিয়মিত মাসিক ও গর্ভকালীন শারীরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যান, তাই বছরে সর্বোচ্চ দুবার অর্থাৎ প্রতি ছয় মাসে একবার রক্তদান করতে পারেন।

অ্যাফেরেসিস প্লাটিলেট দাতাদের জন্য নির্দেশনা: অ্যাফেরেসিসে শুধু প্লাটিলেট সংগ্রহ করা হয়, তাই শরীরে রক্তের প্রধান উপাদানগুলো থেকে যায়। এ প্রক্রিয়া অপেক্ষাকৃত সহজ হলেও শারীরিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্লাটিলেট দানের ২৪ ঘণ্টা আগে থেকে পানিশূণ্যতা যেন না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার (দুধ, দই, চিজ) খাওয়া উচিত, কারণ প্লাটিলেট সংগ্রহে ব্যবহৃত সাইট্রেট রক্তের ক্যালসিয়াম কমাতে পারে। প্লাটিলেট দানের পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও হালকা খাবার গ্রহণ জরুরি।

নিয়মিত রক্তদান একটি সামাজিক, মানবিক ও স্বাস্থ্যকর চর্চা। তবে রক্তদাতার শরীরের যত্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সঠিক খাদ্য, পানির পরিমাণ ও সময়জ্ঞান থাকলে একজন দাতা দীর্ঘদিন নিরাপদে রক্তদান করতে পারেন।

ডা. আশরাফুল হক

সহকারী অধ্যাপক

ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ

স্বাস্থ্য পরামর্শ / টিনিটাস: কানে অস্বাভাবিক শব্দ
বাহ্যিক কোনো উৎস ছাড়াই অনেকে কানে অস্বাভাবিক শব্দ শুনতে পান। এ রকম কিছু সমস্যা নিয়ে প্রায়ই রোগীরা চিকিৎসকের কাছে যান। এটিকে চিকিৎসা পরিভাষায় বলা হয় ‘টিনিটাস’। এটি আসলে কোনো রোগ নয়; বরং বিভিন্ন রোগের উপসর্গ। ধরন: কানে অস্বাভাবিক শব্দগুলো বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন- শোঁ শোঁ, গুনগুন, হিস হিস, টিক টিক বা বাঁশি, ঘণ্টা, বাতাসের প্রবাহ, ঝিঁঝি পোকা, মৌমাছি এমনকি ঢেউয়ের গর্জনের মতো শব্দ। এসব শব্দের তীব্রতা হয় মৃদু থেকে তীক্ষ্ণ। সাধারণত এক কানে অনুভূত হয় আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে উভয় কানেও অনুভূত হতে পারে। কানে অস্বাভাবিক এসব শব্দ মূলত দুই ধরনের হয়। সাবজেকটিভ ও অবজেকটিভ। সাবজেকটিভ: রোগী যখন কোনো অর্থহীন শব্দ শুনতে পান, কারণভেদে এর তীব্রতা ও স্থায়িত্ব ভিন্ন হয়, কেউ নির্দিষ্ট সময় পরপর শোনেন আবার কেউ একটানা শুনতে পান। এতে রোগীর ঘুমের সমস্যা হয়, কাজে মনোযোগিতা হ্রাস পায়, পরে তারা বিষাদগ্রস্ততায় ভোগেন। অবজেকটিভ: এ ক্ষেত্রে শব্দের উৎপত্তি রোগীর শরীরে বলে মনে হয়। যেমন-বায়ুপ্রবাহের শব্দ, ঘূর্ণায়মান রক্তের প্রবাহ, কান ও মাথার ভেতরের মাংসপেশির সংকোচন ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে স্টেথিস্কোপের সাহায্যে শব্দ শোনা যায়। অডিটরি হ্যালুসিনেশন: টিনিটাসের সঙ্গে এর মূল পার্থক্য হলো বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির যেমন-সিজোফ্রেনিয়া, খিঁচুনি, মস্তিষ্কে টিউমার ইত্যাদি ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে। কারণ: শ্রবণশক্তি হ্রাস, বয়সজনিত, কোলাহলপূর্ণ স্থানে বসবাস, ময়লা জমা, পর্দা ফেটে যাওয়া বা ইনফেকশন হওয়া, আঘাত পাওয়া, পানি প্রবেশ। এ ছাড়া অ্যাকুয়াস্টিক নিউরোমা, ল্যাবিরিন্থাইটিস, মেনিয়ার্স ডিজিজ, অটোস্কেলোরোসিস ইত্যাদি। কানবহির্ভূত কিছু সমস্যা যেমন বংশগত, ওষুধের প্রভাব (অ্যাসপিরিন ও অ্যান্টিবায়োটিক), অতিরিক্ত কফি পান, মারাত্মক অপুষ্টি, হঠাৎ ওজন হ্রাস, রক্তশূন্যতা, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েডজনিত অসুখ ইত্যাদি। উপসর্গ: অবশ অবশ লাগা, কানে শুনতে অসুবিধা বা না শোনা, মাথা ঘোরা, এক সপ্তাহের বেশি সময় টিনিটাস থাকা, ঘন ঘন টিনিটাস, শরীরের ভারসাম্য বজায় না থাকা বমি হওয়া ইত্যাদি। এ রকম উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পরিত্রাণের উপায়: উচ্চ শব্দযুক্ত পরিবেশে কাজ বা বসবাস না করা। কাত হয়ে কানের নিচে হাত রেখে না ঘুমানো। হেডফোনে বেশি উচ্চ স্বরে না শোনা। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা। কটন বাড জাতীয় কিছু দিয়ে কান না চুলকানো। এতে কানের পর্দা ফেটে গিয়ে শোঁ শোঁ শব্দ হতে পারে। কানে ময়লা জমলে তা বের করতে কাঠি ব্যবহার না করে অলিভ অয়েল ব্যবহার করা। এতে কানের ময়লাও বের হবে, পর্দাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ডা. মনিলাল আইচ লিটু অধ্যাপক ইএনটি অ্যান্ড হেড-নেক সার্জারি
টিনিটাস: কানে অস্বাভাবিক শব্দ
স্বাস্থ্য পরামর্শ / স্থূলতা নিয়ে উদ্বেগ নয়, প্রয়োজন প্রতিরোধ
শরীর নিয়ে আমাদের সমস্যার শেষ নেই। বর্তমান নাগরিক জীবনে শরীরের অন্যতম সমস্যা স্থূলতা। চিকিৎসার পরিভাষায় যাকে বলে ওবেসিটি। ওবেসিটি বা স্থূলতা অর্থ অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাওয়া। আমরা অনেক পরিবারের সদস্যকেই এখন দেখি স্থূল বা অতিরিক্ত মোটা। সারা বিশ্বে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ স্থূলতায় ভুগছে। বাংলাদেশেও এই সংখ্যা কম নয়। স্থূলতা কী: শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় পদার্থ জমলে সেই অবস্থাকে স্থূলতা বা ওবেসিটি বলে। আমরা নিত্য যা খাই, তা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং শক্তির প্রয়োজনীয় ক্যালরি দেয়। কিন্তু অতিরিক্ত ক্যালরি যা আমাদের শরীর পোড়াতে পারে না, তা চর্বিতে পরিণত হয় এবং শরীরে জমা হয়। এ থেকেই ক্রমাগত ওজন বাড়তে থাকে। এই বাড়তি ওজন থেকেই স্থূলতা দেখা দেয়। এই স্থূলতা পরিমাপের প্রধান উপায় হলো বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) পদ্ধতি। বৈশ্বিক বিবেচনায় বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ৩০-এর বেশি হলে তিনি স্থূল বলে বিবেচিত হন। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় বিএমআই ২৫-এর বেশি হলে স্থূল বলে গণ্য হয়। স্থূলতার কারণ: স্থূলতার অনেক কারণ বা অনুষঙ্গ রয়েছে। মানসিক চাপ, জিন, লিঙ্গ, বয়স, অতিরিক্ত ওষুধ সেবন, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস—এগুলো স্থূলতার কারণ হিসেবে বিবেচিত। স্থূলতার ঝুঁকি: স্থূলতার ঝুঁকি বা জটিলতা অনেক। স্থূলতা অনেক ধরনের রোগ বিস্তারের সহায়ক। ফলে শারীরিক ঝুঁকি অতিমাত্রায় দৃশ্যমান হয়। এই রোগের কারণে বহুবিধ রোগের আবির্ভাব ঘটে মানব শরীরে। যেমন স্লিপ অ্যাপনিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ফ্যাটি লিভার, জয়েন্ট পেইন, ডায়াবেটিসসহ অনেক দীর্ঘমেয়াদি রোগ। প্রতিরোধ: এ ধরনের রোগে আক্রান্তদের সবার আগে নজর দিতে হবে একটি স্বাস্থ্যকর ওজনের দিকে। একই সঙ্গে নিজের স্থূলতা কমিয়ে আনতে একটা পরিকল্পনা করতে হবে। পরিকল্পনামতো এগোতে পারলেই স্থূলতার মতো একটি রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন হবে না। স্থূল হলে করণীয়: আপনি যদি স্থূলতা বা ওবেসিটির ঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে প্রথমেই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পরামর্শ মতো খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি ব্যায়াম ও অন্য বিষয়গুলো ঠিক করতে হবে। স্থূলদের জন্য দেশে অনেক কোম্পানি ওষুধ তৈরি করে। বিশ্ববাজারে সেমাগ্লুটাইড ও টিরজেপাটাইড এই রোগের চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। দুটি ওষুধই কার্যকর। শরীরের স্বাস্থ্যকর ওজনের সঙ্গে মিলবে স্বস্তি ও শান্তি। তাই স্থূলতা নিয়ে উদ্বেগ নয়, প্রয়োজন প্রতিরোধ করা। ডা. এম সাইফুদ্দিন সহযোগী অধ্যাপক এন্ডোক্রাইন বিভাগ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
স্থূলতা নিয়ে উদ্বেগ নয়, প্রয়োজন প্রতিরোধ
স্বাস্থ্য পরামর্শ / সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য পর্যাপ্ত ঘুম
আমাদের জৈবিক ঘড়ি বা বায়োলজিক্যাল ক্লক আমাদের শরীরের ঘুম, তাপমাত্রা, হরমোন নিঃসরণ, স্মৃতিশক্তি, ভালো লাগা, মন্দ লাগা সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই জৈবিক ঘড়ির নিয়মমাফিক আবর্তনের ফলেই আমাদের ঘুম সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়; কিন্তু সঠিক ঘুমের অভাবে আমাদের অনেক বিপত্তি ঘটে। যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, মানসিক রোগ, হার্টের নানারকম রোগ এগুলো মোটাদাগে ঘুমের সমস্যা ও নাক ডাকার ফসল। এমনকি সঠিক ঘুমের অভাবে সড়ক দুর্ঘটনা, অনেক সময় বিবাহবিচ্ছেদেরও কারণ হতে পারে। কাজেই আমাদের পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন। বয়স অনুযায়ী ঘুমের প্রয়োজনীয় সময়: যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের পরামর্শ অনুযায়ী ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের রাতে অন্তত ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। ৬৫ বছরের চেয়ে বেশি বয়সীদের জন্য ঘুমানো প্রয়োজন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। অনেকে এর চেয়ে কম ঘুমিয়েও সুস্থ থাকতে পারেন। তবে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সাইকোলজি ও নিউরো সায়েন্সের অধ্যাপক ম্যাথিউ ওয়াকার ‘হোয়াই উই স্লিপ’ বইয়ে লিখেছেন, ঘুম কম হলে দেখা দিতে পারে নানা জটিলতা। কম ঘুমে কী সমস্যা: ম্যাথিউ ওয়াকারের মতে, ঘুম কম হলে নতুন স্মৃতি তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ঘুম কম হলে মস্তিষ্কে ‘বিটা অ্যামিলয়েড’ নামের ক্ষতিকর প্রোটিন তৈরি হয়। অ্যালঝেইমার রোগের সঙ্গে এই প্রোটিনটির সম্পর্ক রয়েছে। আমরা যখন ঘুমাই, তখন আমাদের শরীর মস্তিষ্ক থেকে বিটা অ্যামিলয়েড ও এরকম অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ অপসারণ করে। কাজেই ঘুম কম হলে অ্যালঝেইমার রোগ সৃষ্টিকারী এই প্রোটিন ও এরকম ক্ষতিকর পদার্থগুলো মস্তিষ্কে জমবে। যত দিন যাবে, ডিমেনশিয়া তৈরি হবে। এ ছাড়া ঘুম কম হওয়ায় প্রজননতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। যেসব পুরুষ রাতে মাত্র পাঁচ বা ছয় ঘণ্টা ঘুমান, তাদের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে যায়, এটা তাদের শারীরিক বয়সকে প্রকৃত বয়সের চেয়ে ১০ বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। কম ঘুমের প্রভাব শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও পড়ে। মাত্র এক রাত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমালে শরীরের ক্যান্সার প্রতিরোধী কোষগুলোর ৭০ শতাংশ মরে যায়। কম ঘুম অন্ত্রের ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার ও স্তন ক্যান্সারের মতো রোগের আশঙ্কা তৈরি করে। ঘুমের স্বল্পতা প্রাণঘাতী স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা ২০০ গুণ বাড়িয়ে দেয়। ঘুম হলো দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ঘুমের সময় সচেতন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া স্তিমিত থাকে। ঘুম শরীরকে চাঙা করে পরবর্তী দিনের কাজের জন্য আমাদের তৈরি করে। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিকঠাক রাখতে পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই। ডা. মনিলাল আইচ লিটু অধ্যাপক, ইএনটি অ্যান্ড হেড-নেক সার্জারি সাধারণ সম্পাদক, অ্যাসোসিয়েশন অব সার্জনস ফর স্লিপ অ্যাপোনিয়া বাংলাদেশ
সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য পর্যাপ্ত ঘুম
টিনিটাস: কানে অস্বাভাবিক শব্দ
স্বাস্থ্য পরামর্শ / টিনিটাস: কানে অস্বাভাবিক শব্দ
বাহ্যিক কোনো উৎস ছাড়াই অনেকে কানে অস্বাভাবিক শব্দ শুনতে পান। এ রকম কিছু সমস্যা নিয়ে প্রায়ই রোগীরা চিকিৎসকের কাছে যান। এটিকে চিকিৎসা পরিভাষায় বলা হয় ‘টিনিটাস’। এটি আসলে কোনো রোগ নয়; বরং বিভিন্ন রোগের উপসর্গ। ধরন: কানে অস্বাভাবিক শব্দগুলো বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন- শোঁ শোঁ, গুনগুন, হিস হিস, টিক টিক বা বাঁশি, ঘণ্টা, বাতাসের প্রবাহ, ঝিঁঝি পোকা, মৌমাছি এমনকি ঢেউয়ের গর্জনের মতো শব্দ। এসব শব্দের তীব্রতা হয় মৃদু থেকে তীক্ষ্ণ। সাধারণত এক কানে অনুভূত হয় আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে উভয় কানেও অনুভূত হতে পারে। কানে অস্বাভাবিক এসব শব্দ মূলত দুই ধরনের হয়। সাবজেকটিভ ও অবজেকটিভ। সাবজেকটিভ: রোগী যখন কোনো অর্থহীন শব্দ শুনতে পান, কারণভেদে এর তীব্রতা ও স্থায়িত্ব ভিন্ন হয়, কেউ নির্দিষ্ট সময় পরপর শোনেন আবার কেউ একটানা শুনতে পান। এতে রোগীর ঘুমের সমস্যা হয়, কাজে মনোযোগিতা হ্রাস পায়, পরে তারা বিষাদগ্রস্ততায় ভোগেন। অবজেকটিভ: এ ক্ষেত্রে শব্দের উৎপত্তি রোগীর শরীরে বলে মনে হয়। যেমন-বায়ুপ্রবাহের শব্দ, ঘূর্ণায়মান রক্তের প্রবাহ, কান ও মাথার ভেতরের মাংসপেশির সংকোচন ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে স্টেথিস্কোপের সাহায্যে শব্দ শোনা যায়। অডিটরি হ্যালুসিনেশন: টিনিটাসের সঙ্গে এর মূল পার্থক্য হলো বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির যেমন-সিজোফ্রেনিয়া, খিঁচুনি, মস্তিষ্কে টিউমার ইত্যাদি ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে। কারণ: শ্রবণশক্তি হ্রাস, বয়সজনিত, কোলাহলপূর্ণ স্থানে বসবাস, ময়লা জমা, পর্দা ফেটে যাওয়া বা ইনফেকশন হওয়া, আঘাত পাওয়া, পানি প্রবেশ। এ ছাড়া অ্যাকুয়াস্টিক নিউরোমা, ল্যাবিরিন্থাইটিস, মেনিয়ার্স ডিজিজ, অটোস্কেলোরোসিস ইত্যাদি। কানবহির্ভূত কিছু সমস্যা যেমন বংশগত, ওষুধের প্রভাব (অ্যাসপিরিন ও অ্যান্টিবায়োটিক), অতিরিক্ত কফি পান, মারাত্মক অপুষ্টি, হঠাৎ ওজন হ্রাস, রক্তশূন্যতা, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েডজনিত অসুখ ইত্যাদি। উপসর্গ: অবশ অবশ লাগা, কানে শুনতে অসুবিধা বা না শোনা, মাথা ঘোরা, এক সপ্তাহের বেশি সময় টিনিটাস থাকা, ঘন ঘন টিনিটাস, শরীরের ভারসাম্য বজায় না থাকা বমি হওয়া ইত্যাদি। এ রকম উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পরিত্রাণের উপায়: উচ্চ শব্দযুক্ত পরিবেশে কাজ বা বসবাস না করা। কাত হয়ে কানের নিচে হাত রেখে না ঘুমানো। হেডফোনে বেশি উচ্চ স্বরে না শোনা। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা। কটন বাড জাতীয় কিছু দিয়ে কান না চুলকানো। এতে কানের পর্দা ফেটে গিয়ে শোঁ শোঁ শব্দ হতে পারে। কানে ময়লা জমলে তা বের করতে কাঠি ব্যবহার না করে অলিভ অয়েল ব্যবহার করা। এতে কানের ময়লাও বের হবে, পর্দাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ডা. মনিলাল আইচ লিটু অধ্যাপক ইএনটি অ্যান্ড হেড-নেক সার্জারি
স্থূলতা নিয়ে উদ্বেগ নয়, প্রয়োজন প্রতিরোধ
স্বাস্থ্য পরামর্শ / স্থূলতা নিয়ে উদ্বেগ নয়, প্রয়োজন প্রতিরোধ
শরীর নিয়ে আমাদের সমস্যার শেষ নেই। বর্তমান নাগরিক জীবনে শরীরের অন্যতম সমস্যা স্থূলতা। চিকিৎসার পরিভাষায় যাকে বলে ওবেসিটি। ওবেসিটি বা স্থূলতা অর্থ অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাওয়া। আমরা অনেক পরিবারের সদস্যকেই এখন দেখি স্থূল বা অতিরিক্ত মোটা। সারা বিশ্বে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ স্থূলতায় ভুগছে। বাংলাদেশেও এই সংখ্যা কম নয়। স্থূলতা কী: শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় পদার্থ জমলে সেই অবস্থাকে স্থূলতা বা ওবেসিটি বলে। আমরা নিত্য যা খাই, তা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং শক্তির প্রয়োজনীয় ক্যালরি দেয়। কিন্তু অতিরিক্ত ক্যালরি যা আমাদের শরীর পোড়াতে পারে না, তা চর্বিতে পরিণত হয় এবং শরীরে জমা হয়। এ থেকেই ক্রমাগত ওজন বাড়তে থাকে। এই বাড়তি ওজন থেকেই স্থূলতা দেখা দেয়। এই স্থূলতা পরিমাপের প্রধান উপায় হলো বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) পদ্ধতি। বৈশ্বিক বিবেচনায় বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ৩০-এর বেশি হলে তিনি স্থূল বলে বিবেচিত হন। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় বিএমআই ২৫-এর বেশি হলে স্থূল বলে গণ্য হয়। স্থূলতার কারণ: স্থূলতার অনেক কারণ বা অনুষঙ্গ রয়েছে। মানসিক চাপ, জিন, লিঙ্গ, বয়স, অতিরিক্ত ওষুধ সেবন, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস—এগুলো স্থূলতার কারণ হিসেবে বিবেচিত। স্থূলতার ঝুঁকি: স্থূলতার ঝুঁকি বা জটিলতা অনেক। স্থূলতা অনেক ধরনের রোগ বিস্তারের সহায়ক। ফলে শারীরিক ঝুঁকি অতিমাত্রায় দৃশ্যমান হয়। এই রোগের কারণে বহুবিধ রোগের আবির্ভাব ঘটে মানব শরীরে। যেমন স্লিপ অ্যাপনিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ফ্যাটি লিভার, জয়েন্ট পেইন, ডায়াবেটিসসহ অনেক দীর্ঘমেয়াদি রোগ। প্রতিরোধ: এ ধরনের রোগে আক্রান্তদের সবার আগে নজর দিতে হবে একটি স্বাস্থ্যকর ওজনের দিকে। একই সঙ্গে নিজের স্থূলতা কমিয়ে আনতে একটা পরিকল্পনা করতে হবে। পরিকল্পনামতো এগোতে পারলেই স্থূলতার মতো একটি রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন হবে না। স্থূল হলে করণীয়: আপনি যদি স্থূলতা বা ওবেসিটির ঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে প্রথমেই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পরামর্শ মতো খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি ব্যায়াম ও অন্য বিষয়গুলো ঠিক করতে হবে। স্থূলদের জন্য দেশে অনেক কোম্পানি ওষুধ তৈরি করে। বিশ্ববাজারে সেমাগ্লুটাইড ও টিরজেপাটাইড এই রোগের চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। দুটি ওষুধই কার্যকর। শরীরের স্বাস্থ্যকর ওজনের সঙ্গে মিলবে স্বস্তি ও শান্তি। তাই স্থূলতা নিয়ে উদ্বেগ নয়, প্রয়োজন প্রতিরোধ করা। ডা. এম সাইফুদ্দিন সহযোগী অধ্যাপক এন্ডোক্রাইন বিভাগ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য পর্যাপ্ত ঘুম
স্বাস্থ্য পরামর্শ / সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য পর্যাপ্ত ঘুম
আমাদের জৈবিক ঘড়ি বা বায়োলজিক্যাল ক্লক আমাদের শরীরের ঘুম, তাপমাত্রা, হরমোন নিঃসরণ, স্মৃতিশক্তি, ভালো লাগা, মন্দ লাগা সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই জৈবিক ঘড়ির নিয়মমাফিক আবর্তনের ফলেই আমাদের ঘুম সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়; কিন্তু সঠিক ঘুমের অভাবে আমাদের অনেক বিপত্তি ঘটে। যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, মানসিক রোগ, হার্টের নানারকম রোগ এগুলো মোটাদাগে ঘুমের সমস্যা ও নাক ডাকার ফসল। এমনকি সঠিক ঘুমের অভাবে সড়ক দুর্ঘটনা, অনেক সময় বিবাহবিচ্ছেদেরও কারণ হতে পারে। কাজেই আমাদের পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন। বয়স অনুযায়ী ঘুমের প্রয়োজনীয় সময়: যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের পরামর্শ অনুযায়ী ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের রাতে অন্তত ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। ৬৫ বছরের চেয়ে বেশি বয়সীদের জন্য ঘুমানো প্রয়োজন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। অনেকে এর চেয়ে কম ঘুমিয়েও সুস্থ থাকতে পারেন। তবে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সাইকোলজি ও নিউরো সায়েন্সের অধ্যাপক ম্যাথিউ ওয়াকার ‘হোয়াই উই স্লিপ’ বইয়ে লিখেছেন, ঘুম কম হলে দেখা দিতে পারে নানা জটিলতা। কম ঘুমে কী সমস্যা: ম্যাথিউ ওয়াকারের মতে, ঘুম কম হলে নতুন স্মৃতি তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ঘুম কম হলে মস্তিষ্কে ‘বিটা অ্যামিলয়েড’ নামের ক্ষতিকর প্রোটিন তৈরি হয়। অ্যালঝেইমার রোগের সঙ্গে এই প্রোটিনটির সম্পর্ক রয়েছে। আমরা যখন ঘুমাই, তখন আমাদের শরীর মস্তিষ্ক থেকে বিটা অ্যামিলয়েড ও এরকম অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ অপসারণ করে। কাজেই ঘুম কম হলে অ্যালঝেইমার রোগ সৃষ্টিকারী এই প্রোটিন ও এরকম ক্ষতিকর পদার্থগুলো মস্তিষ্কে জমবে। যত দিন যাবে, ডিমেনশিয়া তৈরি হবে। এ ছাড়া ঘুম কম হওয়ায় প্রজননতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। যেসব পুরুষ রাতে মাত্র পাঁচ বা ছয় ঘণ্টা ঘুমান, তাদের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে যায়, এটা তাদের শারীরিক বয়সকে প্রকৃত বয়সের চেয়ে ১০ বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। কম ঘুমের প্রভাব শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও পড়ে। মাত্র এক রাত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমালে শরীরের ক্যান্সার প্রতিরোধী কোষগুলোর ৭০ শতাংশ মরে যায়। কম ঘুম অন্ত্রের ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার ও স্তন ক্যান্সারের মতো রোগের আশঙ্কা তৈরি করে। ঘুমের স্বল্পতা প্রাণঘাতী স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা ২০০ গুণ বাড়িয়ে দেয়। ঘুম হলো দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ঘুমের সময় সচেতন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া স্তিমিত থাকে। ঘুম শরীরকে চাঙা করে পরবর্তী দিনের কাজের জন্য আমাদের তৈরি করে। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিকঠাক রাখতে পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই। ডা. মনিলাল আইচ লিটু অধ্যাপক, ইএনটি অ্যান্ড হেড-নেক সার্জারি সাধারণ সম্পাদক, অ্যাসোসিয়েশন অব সার্জনস ফর স্লিপ অ্যাপোনিয়া বাংলাদেশ