ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

শহীদ জিয়ার আদর্শ ও গণঅভ্যুত্থানের পুনর্জাগরণ

ড. একেএম শামছুল ইসলাম

  ২২ মে ২০২৫, ০০:০০

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু ব্যক্তিত্ব সময়ের সীমানা অতিক্রম করে চিরভাস্বর হয়ে উঠেছেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেমনই একজন নেতা, যিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা নন, বরং একটি আদর্শিক আন্দোলনের পথিকৃৎ—যার নাম বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এ জাতীয়তাবাদ এমন এক চেতনার প্রতীক, যা আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সার্বভৌমত্বকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যখন জাতি বিভ্রান্তি ও দিকহীনতার মধ্য দিয়ে পথ খুঁজছিল, ঠিক তখনই জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দর্শন একটি শক্তিশালী দিকনির্দেশনা দেয়। এটি একদিকে যেমন বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়কে পরিপূর্ণতা দেয়, অন্যদিকে তেমনি বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি হলো আঞ্চলিক ঐতিহ্য, ভাষা, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর ভিত্তি করে স্বকীয় জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলা। এ আদর্শ বলিষ্ঠভাবে বলে, আমরা শুধু বাঙালি নই, আমরা বাংলাদেশি—একটি ভূখণ্ডভিত্তিক, বহুমাত্রিক জাতিসত্তা। এই স্বাতন্ত্র্যবোধ জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রতিফলিত হয়—যেখানে বিদেশনীতি হোক বা শিক্ষানীতি, অর্থনীতি হোক বা প্রতিরক্ষা কৌশল—সবক্ষেত্রেই ছিল স্বকীয়তা, নিরপেক্ষতা ও দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা। উদাহরণস্বরূপ, তার সময়েই ‘লুক ইস্ট পলিসি’ অনুসরণ করে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি রচনা করে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে জাতীয়তাবাদবিরোধী শক্তি এ আদর্শকে নানাভাবে আঘাত করেছে। কখনো তা হয়েছে রাজনৈতিক বিভাজনের মাধ্যমে, আবার কখনো হয়েছে মতাদর্শগত বিকৃতির ছায়ায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জাতির শিকড় থেকে বিচ্যুত এক ‘নিরপেক্ষতার’ নামে জিয়াউর রহমানের আদর্শিক ভিত্তিকে কলুষিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়। এমনকি কিছু রাজনৈতিক শক্তি তার অবদানকে অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে উপস্থাপন করেছে, যা জাতির আত্মপরিচয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।

একইভাবে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন, যেখানে সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়, তা জাতীয়তাবাদী চেতনার পরিপন্থি ছিল। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন এ আদর্শের মূল ভিত্তি হলেও, সে সময় গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, জাতীয়তাবাদবিরোধী অপশক্তির কারণে রাষ্ট্রীয় অগ্রগতি ও জনগণের অধিকার মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গত ১৭ বছর ধরে আপসহীনভাবে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন চালিয়ে গেছে। নির্যাতন, মামলা, গুম, কারাবরণ—সবকিছুকে উপেক্ষা করে নেতাকর্মীরা শহীদ জিয়ার আদর্শে অবিচল থেকেছে। এ সংগ্রাম শুধু একটি দলের নয়, এটি একটি আদর্শিক যুদ্ধ—একটি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে রক্ষা করার লড়াই।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে যে অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, তা ছিল এই দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল। শত বাধা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তরুণ-যুবকরা ‘স্বাধীনতা মানে ভোটের অধিকার’ ও ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ মানে গণমানুষের রাষ্ট্র’—এ স্লোগান নিয়ে রাজপথে নামে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে এ প্রতিরোধ ইতিহাসের আরেকটি মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ, শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি—এসবের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। বিএনপি এ সময়ে কেবল একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিতে পরিণত হয়। এ গণঅভ্যুত্থান শুধু সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ছিল না, বরং এটি ছিল জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আরও গভীরভাবে প্রোথিত করার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করেছিলেন, তা আজ একটি মহিরুহে পরিণত হয়েছে। এই আদর্শ আমাদের জাতীয় জীবনে নৈতিকতা, আত্মমর্যাদা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক। যদিও সময় সময় বিরুদ্ধ শক্তি এ আদর্শকে ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছে, তবুও জনগণ ও তরুণ প্রজন্মের প্রত্যয়ে তা বারবার পুনর্জাগরিত হয়েছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই পুনর্জাগরণের সর্বশেষ সাক্ষ্য—যেখানে ছাত্র-জনতা বুক চিতিয়ে বলেছে, ‘আমরা বাংলাদেশি এবং এ পরিচয়ে আমরা গর্বিত।’ এখন সময় এসেছে, জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আলোকে একটি ন্যায্য, মানবিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। কারণ, এ আদর্শ কেবল ইতিহাসের নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতেরও দিশারি। আর এ আদর্শের ধারক ও বাহক তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা অর্জন করতে পারি আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ।

লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.)

নিজের চামড়া ফেলে দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও
নিজের চামড়া ফেলা দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও—এ বাক্যটি এখন আর শুধু একটি ব্যঙ্গ নয়, বরং চামড়া খাত নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার নগ্ন প্রতিফলন। একদিকে ঈদুল আজহার মতো উৎসবে লাখ লাখ পশু কোরবানির মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগৃহীত হয়, অন্যদিকে প্রতি বছর আমদানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার প্রক্রিয়াজাত চামড়া বিদেশ থেকে আনতে হয়। এ চিত্র শুধু বাণিজ্য ঘাটতির নয়, এটি রাজনৈতিক ও নীতিগত ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ প্রতি বছর ঈদের সময় কমবেশি এক কোটি কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ (বিশেষত ছাগলের চামড়া) সংরক্ষণের অভাবে পচে যায়। এ চামড়া ফেলে দেওয়া বা মাটিচাপা দেওয়ার কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। মূলত চামড়া সংরক্ষণে ত্রুটি, হিমায়িত পরিবহনের অভাব, অদক্ষ বাজার ব্যবস্থা ও অগ্রিম অর্থায়ন না থাকায় এমন অপচয় হয়। ফলে একদিকে কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে অস্থিরতা ও অনাস্থা জন্ম নেয়। অপচয়ের এ বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ১১ হাজার ৭১৮ টন চামড়া আমদানি করেছে। এজন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। এ আমদানিকৃত চামড়া দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন রপ্তানিযোগ্য পণ্য—জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ইত্যাদি। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ পরিমাণ চামড়া যদি দেশেই উৎপন্ন হতো, তাহলে এত বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যেত না। বাংলাদেশে উৎপাদিত চামড়ার একটি বড় অংশই আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো যেমন নাইকি, অ্যাডিডাস তাদের চামড়া সংগ্রহ করে শুধু এলডব্লিউজি (লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ) সার্টিফায়েড ট্যানারি থেকে। অথচ বিশ্বের প্রায় ১ হাজার ২৮৫টি ট্যানারি এ সার্টিফিকেশন অর্জন করলেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি ট্যানারি এ মান অর্জন করতে পেরেছে। এ ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হচ্ছে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থাপিত সিইটিপি (সেন্ট্রাল এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) সম্পূর্ণরূপে কার্যকর নয়। নির্ধারিত পরিশোধন ক্ষমতা থাকলেও কোরবানির মৌসুমে চাহিদা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বর্জ্য যথাযথভাবে শোধন করা সম্ভব হয় না। ফলে পরিবেশ দূষণের কারণে এলডব্লিউজি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের ট্যানারি পরিদর্শনই বন্ধ করে দিয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশি ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না। তারা বাধ্য হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কমমূল্যে চামড়া বিক্রি করতে। অন্যদিকে বিদেশি ফিনিশড চামড়া আমদানি করে নিজেদের রপ্তানির চেইন বজায় রাখে। ২০০৩ সালে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী গঠনের ঘোষণা দিয়ে হেমায়েতপুরে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো ট্যানারিগুলোকে ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন শিল্প এলাকা গড়ে তোলা। কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি আজও অসম্পূর্ণ। ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে ১৪২টি চালু থাকলেও সিইটিপি এখনো আংশিক কাজ করে, ফলে নির্গত বর্জ্য ঠিকমতো পরিশোধিত হয় না। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডাম্পিং ইয়ার্ডের দুর্বলতার কারণে ধলেশ্বরী নদী ভয়াবহ দূষণের শিকার, যা দেশের চামড়াশিল্পকে পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে পরিণত করেছে। ঈদুল আজহার সময় উৎপাদিত চামড়ার প্রায় ৯০ শতাংশ স্থানীয় হাটে বিক্রি হয়। কিন্তু এ বাজারে নেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী, নেই মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা, নেই অগ্রিম অর্থায়নের নিশ্চয়তা। ৮৫ শতাংশ বিক্রেতা অপ্রশিক্ষিত এবং প্রান্তিক পর্যায়ে চাঁদাবাজি, পরিবহন দুর্নীতি ও হাটব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা চামড়ার দামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্যবসায়ীদের ৬৫ শতাংশের বেশি মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চামড়া কিনে থাকে, যেটি মূলত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ। ফলে সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন হয় না, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চামড়াশিল্পে যুক্ত রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, বিসিক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মতো একাধিক সংস্থা, কিন্তু তাদের মধ্যে নেই কার্যকর সমন্বয়। ২০১৭ সালে সিইটিপি অপূর্ণ থাকা অবস্থায় ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত এক বড় ধরনের অব্যবস্থাপনার জন্ম দেয়। আমদানি ও রপ্তানি নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, শুল্ক সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আমলাতান্ত্রিক হয়রানি উদ্যোক্তাদের জন্য আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা দুরূহ হয়ে পড়ে। চামড়ার মৌসুমে লবণের সংকট, বাড়তি দাম ও হিমায়িত পরিবহনের অভাবে অনেক সময় কাঁচা চামড়া দ্রুত পচে যায়। দেশে এখনো কেন্দ্রীয় কোনো লবণ ডিপো গড়ে ওঠেনি, যা মৌসুমি চাহিদা মেটাতে পারত। ট্যানারিদের ৭৮ শতাংশই মনে করেন, কেন্দ্রীয় লবণ ডিপো স্থাপন এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প রাজনৈতিকভাবে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত, যা সরকারের নির্বিচার সহায়তা, অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও বৈদেশিক নীতির সুবিধা ভোগ করে আজ বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিপরীতে চামড়াশিল্প রাজনৈতিক সদিচ্ছা থেকে বঞ্চিত। এটি একটি ভোট-অপ্রাসঙ্গিক খাত হওয়ায় এর উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকে মুখবন্ধে, বাস্তবায়নে নয়। ফলে কর্মসংস্থানের দিক থেকেও পিছিয়ে। পোশাকশিল্প যেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে কাজ দিয়েছে, সেখানে চামড়াশিল্প এখনো আড়াই লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। চামড়াশিল্পকে দাঁড় করাতে হলে প্রয়োজন নির্দিষ্ট ও কার্যকর উদ্যোগ। সিইটিপি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করে পরিবেশদূষণ বন্ধ করতে হবে। অন্তত ২০টি ট্যানারিকে এলডব্লিউজি সার্টিফায়েড করতে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দিতে হবে। কাঁচা চামড়ার সুষ্ঠু সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় লবণ ডিপো স্থাপন এবং পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা, অগ্রিম অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বাজার ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতে হবে। সর্বোপরি, ২০১৯ সালে গৃহীত ‘চামড়া শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা’ বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি প্রয়োজন। বাংলাদেশের চামড়াশিল্প সম্ভাবনাময় এক খাত, যা নিজস্ব কাঁচামাল, দক্ষ জনবল এবং ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে। এ খাতের সংকট কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যার নয়, এটি মূলত নৈতিক, নীতিগত এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যেদিন এ শিল্পকে শুধু একটি খাত নয়, বরং একটি দায়িত্ব ও সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হবে, সেদিন চামড়াশিল্পও পোশাকশিল্পের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠবে। l আগামীকাল পড়ুন: চামড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ গন্তব্য লেখক: সাংবাদিক
নিজের চামড়া ফেলে দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও
চারদিক / তারুণ্যের দৃষ্টি বিদেশে রাষ্ট্রেরটা কোথায়
বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী তরুণ—সে সংখ্যাটি শুধুই দেশের বোঝা নয়, বরং সম্ভাবনারও প্রতীক। অথচ আজ তাদের একটি বড় অংশ উন্নত জীবন, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশের পথে পা বাড়াচ্ছে। ২০২৩ সালে ৫২ হাজার ৭৯৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিদেশে গেছেন—২০২২ সালের তুলনায় যা ২৮ শতাংশ বেশি। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই গত এক দশকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে তিনগুণ। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সাম্প্রতিক জরিপে ৫৫ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, তারা স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকতে চান। এ প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্নের প্রতিফলন নয়—বরং দেশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সুশাসন ও নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবতায় এর প্রতিফলন নেই। ২০২৫ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে মোট জিডিপির মাত্র ১.৬৯ শতাংশ, যা বিশ্বের ১০৪টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। জাতিসংঘের সুপারিশ অনুসারে এই হার হওয়া উচিত ৪ থেকে ৬ শতাংশ। বাজেট স্বল্পতায় গবেষণাগার, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম ও মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগে ঘাটতি প্রকট। ফলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই মেধাবীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন দেশের উচ্চশিক্ষা থেকে—নতুন স্বপ্নের ঠিকানা খুঁজছেন বিদেশের মাটিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৩ লাখ বেকারের মধ্যে ৮৭ শতাংশ শিক্ষিত। তরুণদের মধ্যে বিশেষত ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ২১ শতাংশ তরুণ কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত নন। শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে যে ব্যবধান, তার প্রমাণ মিলেছে আইএলওর এক জরিপে, যেখানে ৫৬ শতাংশ নিয়োগকর্তা জানিয়েছেন, তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, প্রতি বছর বিশালসংখ্যক তরুণ অপ্রাসঙ্গিক ডিগ্রি নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ু ও পানিদূষণ, যানজট এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি—এ সংকট ঢাকাসহ বড় শহরগুলোকে বাসের অনুপযুক্ত করে তুলেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের শহরগুলো বিশ্বের দূষিত শহরের শীর্ষ তালিকায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মতপ্রকাশে বাধা, কর্মক্ষেত্রে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের জরিপে ৪২ শতাংশ তরুণ বলেছেন, বেকারত্ব তাদের বিদেশমুখিতার প্রধান কারণ। সরকার ‘জাতীয় যুব উদ্যোক্তা নীতি ২০২৫’, ‘উদ্যোক্তা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প’সহ বিভিন্ন কর্মসূচির কথা বলছে। এতে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান এবং ২.৮ লাখ তরুণের দক্ষতা উন্নয়নের দাবি করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে ঠিকই, তবে ১৮ কোটির দেশে এ উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। শিক্ষা ও সুশাসনে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে এসব উদ্যোগের প্রভাব স্থায়ী হবে না। মেধা পাচার রোধে করণীয়— শিক্ষায় কাঠামোগত রূপান্তর: শিক্ষা খাতে বাজেট জিডিপির ৪-৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হবে। কারিগরি ও ডিজিটাল শিক্ষা বিস্তারে জোর দিতে হবে। চাকরির বাজারে স্বচ্ছতা: নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি দূর করতে হবে। ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোগ্রামের পরিধি বাড়াতে হবে। নাগরিক জীবনের গুণগত উন্নয়ন: পরিবেশ রক্ষা, গণপরিবহন উন্নয়ন এবং শহরে নিরাপদ ও স্বস্তিকর জীবনযাত্রার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মেধা সঞ্চালনের নীতিমালা: বিদেশে অবস্থানরত মেধাবীদের অর্জিত জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ দেশের কাজে লাগাতে ট্যাক্স ছাড়, বিনিয়োগ সুযোগ ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তরুণরা দেশের প্রাণশক্তি। তাদের বিদেশমুখিতা শুধুই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় সংকেত; যা চোখে আঙুল দিয়ে বলে দিচ্ছে কোথায় কোথায় সংস্কার জরুরি। এ সংকট মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। শিক্ষায় বিপ্লব, কর্মসংস্থানে সুশাসন এবং নাগরিক জীবনে ভরসা ফিরিয়ে আনলেই তরুণরা দেশেই দেখতে পাবেন ভবিষ্যৎ। আর যারা বিদেশে গেছেন, তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে যুক্ত করে ‘মেধা পাচার’কে ‘মেধা সঞ্চালন’-এ রূপান্তর করা সম্ভব। মো. শাকিল, শিক্ষার্থী মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ
তারুণ্যের দৃষ্টি বিদেশে রাষ্ট্রেরটা কোথায়
রাজনীতির হটস্পটে রাজরোগ
ইনিয়ে-বিনিয়ে নয়, ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউডে যে যা পারছেন বলছেন। কেউ কাউকে আর ছেড়ে কথা বলছেন না। মন যা চায়, মুখে যা আসে, তা-ই বলে দিচ্ছেন। যেন আজন্মের শত্রু। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ফ্রন্টলাইনার শিক্ষার্থীদের গড়া এনসিপি আগামী ২১ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ না হলে দুর্বার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে নেমে পড়েছে তারা। বিএনপি সরাসরি টার্গেটে তাদের। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে এনসিপি নেতারা বলেছেন, বিএনপি স্থানীয় নির্বাচন ভয় পায়। তাই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। আরেকটি এক-এগারো ঘটাতে মব সৃষ্টি করে মেয়র হতে চাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। বিএনপি নেতাদের কথাবার্তাও সাফ কথার মতো ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউড। ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা না করলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। বর্তমান সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করা উপদেষ্টাদের অব্যাহতির দাবিও জোরালো। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের পদত্যাগও চান। বৃহস্পতিবার বিএনপি-এনসিপি নেতাদের এমন মাতবোলের এক দিন আগে বুধবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্যও ছিল স্বচ্ছ-পরিষ্কার। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন তিনি। বক্তব্যটা দিয়েছেন ঢাকা সেনানিবাসের সেনা প্রাঙ্গণে অফিসার্স অ্যাড্রেসে। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তার অবস্থান আগের মতোই। দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের অধিকার একটি নির্বাচিত সরকারেরই রয়েছে। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে আরও বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। বাদ পড়েনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর-সংক্রান্ত বিষয়ও। বলেন, রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত একটি নির্বাচিত সরকার থেকেই আসতে হবে। তা করতে হবে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। দেখতে হবে জাতীয় স্বার্থ। পলিটিক্যাল কনসেনসাসের মাধ্যমে সেটা হতে হবে। ‘মব ভায়োলেন্স’র বিরুদ্ধেও কঠোর বার্তা দিয়েছেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সেনাবাহিনী এখন আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। সংঘবদ্ধ জনতার নামে বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা আর সহ্য করা হবে না। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে স্থানীয় মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের মতামত প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করে যাওয়ার কথাও বলেন সেনাপ্রধান। এর পরদিনই রাতেই আকস্মিক আরেক ঘটনা। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সেনানিবাসের ৬২৪ জনকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তা জানানো হয় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। বলা হয়, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিগত সরকারের পতনের পর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতির মাঝে সরকারি দপ্তর, থানাগুলোয় হামলা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর আক্রমণ এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, মব জাস্টিস, চুরি, ডাকাতিসহ বিবিধ বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব সেনানিবাসে প্রাণ রক্ষার্থে রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক আশ্রয় চান। উদ্ভূত আকস্মিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আশ্রয় প্রার্থীদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের চেয়ে তখন তাদের জীবন বাঁচানো প্রাধান্য পায়। তাই ২৪ জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ৫ জন বিচারক, ১৯ জন অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা, ৫১৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাসহ বিবিধ ১২ জন ও ৫১ জন পরিবার-পরিজনসহ সর্বমোট ৬২৬ জনকে বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় দেয় সেনাবাহিনী। শুধু মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে আশ্রয় প্রার্থীদের জীবন রক্ষা করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। পরিস্থিতি উন্নয়নের পর আশ্রয় গ্রহণকারীদের বেশিরভাগই এক-দুই দিনের মধ্যেই সেনানিবাস ত্যাগ করেন। পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়িয়ে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে, সবাইকে এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে আইএসপিআর। এদিকে কিছু ঘটনা ও জনাকয়েকের কারণে নানা মহলের চোখরাঙানি হজম করতে হচ্ছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। আক্রমণাত্মক ভাষায় শুনতে হচ্ছে নানা তিতা কথাও। এর মাঝেই তার উপস্থাপিত ও পরিচয় করে দেওয়া মাস্টারমাইন্ডখ্যাত তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ফেসবুক স্ট্যাটাস। দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে আগের বিভাজনমূলক বক্তব্য ও শব্দচয়নের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ব্যক্তির আদর্শ, সম্মান ও আবেগের চেয়ে দেশ বড়। সরকারে আর একদিনও থাকলে অভ্যুত্থানের সব শক্তির প্রতি সম্মান ও সংবেদনশীলতা রেখে কাজ করতে চান। পুরাতন বন্দোবস্তের বিভেদকামী স্লোগান ও তকমাবাজি, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে হত্যাযোগ্য করে তোলে, সেগুলো পরিহার করলেই ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে বলে এই উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের শত্রুরা ‘ঐক্যবদ্ধ ও আগ্রাসী’ উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে। দেশপ্রেমিক জনগণ যারা জুলাই অভ্যুত্থানে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, তাদের সামনে দীর্ঘ পরীক্ষা। এ পরীক্ষা ঐক্যের ও ধৈর্যের। এ পরীক্ষা উতরে যেতেই হবে বলে মনে করেন মাহফুজ আলম। রাজনীতিতে ভুল করার অর্থই হলো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। এজন্যই রাজনীতিবিদরা সমস্যার সম্মুখীন হলে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়ে থাকেন। যুগ যুগ ধরেই এ প্রথা চলে আসছে। কিন্তু ৫ আগস্টের বিপ্লবীরা সেই পথ মাড়াচ্ছেন না। তারপরও মাহফুজ আলম ভুল স্বীকারের একটি নজির দেখিয়েছেন। কীসের মধ্যে কী-এর মতো সেদিনই প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার পদ ছেড়ে এনসিপির শীর্ষনেতা আলোচিত সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। এর আগে খবর রটে প্রফেসর ইউনূস অভ্যুত্থানের নায়কদের কারও কারও কাজে ভীষণ বিরক্ত। তিনি তাদের ডেকে বলেছেন, তোমরা সংযত হও, নইলে আমি পদত্যাগ করব। এ বক্তব্য সামনে এনে আরেকটি ক্যাচাল বাধানোর আয়োজনের নমুনাও রয়েছে। কবে, কখন, কোথায় প্রফেসর ইউনূস ‘অভ্যুত্থানের নায়ক’দের ডেকেছেন এবং এ কথা বলেছেন—তার কোনো তথ্য বা ইঙ্গিত কিন্তু নেই। যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত নির্বাচন, সেখানে টেনে আনা হচ্ছে সাইডলাইনের নানা বিষয়। সেনাপ্রধানের বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে নানা রং মাখিয়ে। সেখানে তিনি একটা নির্বাচিত সরকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা-সার্বভৌমত্বের জন্য চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন আর গত ৯ মাস সেনাবাহিনীকে অবজ্ঞা করার অভিযোগ এনেছেন। মব সন্ত্রাস বন্ধ করার কথা বলার পরদিন যদিও দেশের তিনটি আদালতে সেই ঘটনা আবার ঘটেছে। গত জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভূমিকা রাখার জন্য যে সেনাবাহিনীকে অভিনন্দিত করেছে, সেই বাহিনী কেন আজ অবজ্ঞার অভিযোগ তুলছে? সরকার থেকে সেনাবাহিনীকে দূরে সরিয়ে দেওয়া—একজন বিদেশি নাগরিককে এনে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বানানোর পেছনে কাদের ইন্ধন রয়েছে, তা অবশ্যই খোঁজা দরকার। সেনাবাহিনীর প্রধানের বক্তব্যের পর থেকে দেশে আবার ঐক্যের ডাকাডাকি চলছে। সমন্বয়করা ডাকছেন, জামায়াত ডাকছে-এনসিপি ডাকছে। গত ৯ মাসে কারা ঐক্য বরবাদ করেছে, কারা আন্দোলনের শক্তিকে কোণঠাসা করেছে, নানা ট্যাগ দিয়ে কলহ তৈরি করেছে। এমনকি ১৫ বছর বহু নির্যাতন ভোগ করা এবং সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখা বিএনপিকে টেম্পোস্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে? এসবের বিশ্লেষণও আছে। ঘাঁটাঘাঁটি করলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। মূত্রত্যাগের কথা তো উচ্চারণই হয়ে গেছে। বিএনপির প্রতি এনসিপিসহ কারও কারও অবজ্ঞা, দলটির ১৫ বছরের ত্যাগকে অস্বীকার করার প্রবণতায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই দলের নেতা শামসুজ্জামান দুদু বলে ফেলেছেন কথাটি। এ নিয়ে সমানে ট্রল চলছে। কত স্পিডে কত পরিমাণ মূত্রত্যাগ করলে সেই স্রোতে কেউ বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়বে— এমন টিপ্পনীও কাটা হচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে বিএনপি। দলের নেতাকর্মীরা একাধিকবার নির্যাতন, গ্রেপ্তার ও টার্গেট কিলিংয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এটাও সত্য, বিএনপির কিছু নেতা দিনে বিএনপি আর রাতে আওয়ামী লীগ করে আত্মরক্ষা খুঁজেছেন। জুলাই বিপ্লবের পর যথারীতি তারা ‘অতি বিপ্লবী’ সেজেছেন। সেখানে বহুমূত্র প্রসঙ্গ বেমানান। আবার ট্রলের যুগে এসে রাজনীতিতে এখন রম্য-বিনোদনও খাটে না। প্রতিপক্ষকে ভাসিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল ও পরিভাষা এখন রীতিমতো ভাইরাল। তবে নেতাদের মুখে পেশাবের উচ্চারণ কিন্তু আজই প্রথম নয়। শামসুজ্জামান দুদুর আদর্শিক নেতা শতাব্দীর মহিরুহ মওলানা ভাসানী এ ক্ষেত্রে অনন্য। ওই সময়ের আর্কাইভে দেখা যায় মওলানা ভাসানীর বক্তব্যে ‘মুত’ শব্দটির দেখা মেলে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর শাসক দল আওয়ামী লীগের তরুণ নেতারাও বয়োবৃদ্ধ জননেতা মওলানা ভাসানীর যাচ্ছেতাই সমালোচনা শুরু করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। মওলানার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে, তার মানসিক চিকিৎসা দরকার, অশীতিপর বুড়োর এখন রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া উচিত—এমন নানা মন্তব্য করে চটানোর চেষ্টা চলত। শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে পল্টনের এক জনসভায় মওলানা বলে বসেন, ‘মনি-রাজ্জাক-তোফায়েল জীবনে যত পেশাব করেছি তত পানিও তোরা খাস নাই।’ এ বক্তব্যের পর মওলানার ওই পেশাবের এমনই তেজ ও ট্রল ছড়ায়, যা কিছুদিন বাজারে চলেছে সমানে। মওলানা ভাসানীর মুখে তা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তরুণ তুর্কি নেতারা জনমের ধাক্কা খেয়ে লা-জওয়াব হয়ে যান। মওলানার বিরুদ্ধ-সমালোচনায় তালা পড়েছিল তাদের সবার মুখেই। মওলানার যুগ আর নেই। আর সবাই ভাসানীও নন। লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
রাজনীতির হটস্পটে রাজরোগ
সেই দিনটি / মওদুদ আহমদ
মওদুদ আহমদ বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, দক্ষ সাংসদ ও লেখক। তিনি ১৯৪০ সালের ২৪ মে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির নোয়াখালী জেলায় সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে সম্মান পাস শেষে ব্রিটেনের লন্ডনে অবস্থিত লিংকস ইন থেকে ‘বার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। রাজনীতি, আইন পেশা, লেখালেখি এবং বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেও রাজনীতিবিদের পরিচয়েই তাকে আলোচিত করেছে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মওদুদ আহমদ প্রবাসী সরকারের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৫-পরবর্তী উত্তর বাংলাদেশে মওদুদ আহমদ বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারে নিজেকে যুক্ত করে নানা সময়ে শিল্প, পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। মওদুদ আহমদ বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতি ও উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া দায়িত্ব পালন করেন যোগাযোগমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী হিসেবে। নোয়াখালী-৫ ও নোয়াখালী-১ আসনের তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, উন্নয়ন এবং গণতন্ত্র নিয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি পল্লীকবি জসীমউদদীনের কন্যা হাসনা জসীমউদদীনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মওদুদ আহমদ ২০২১ সালের ১৬ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।
মওদুদ আহমদ
সেই দিনটি / হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কবি, অনুবাদক ও আইনজীবী। তার জন্ম ১৮৩৮ সালের ১৭ এপ্রিল ভারতের হুগলিতে। তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ব্যাচের গ্র্যাজুয়েটদের অন্যতম। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার আগে মিলিটারি অডিটর-জেনারেল অফিসে কেরানি পদে চাকরির মধ্য দিয়ে হেমচন্দ্রের কর্মজীবন শুরু হয়। কর্মজীবনে আইনজীবী হিসেবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। হেমচন্দ্রের প্রধান পরিচয় একজন দেশপ্রেমিক কবি হিসেবে। ১৮৭২ সালের জুলাই মাসে এডুকেশন গেজেটে তার ‘ভারতসঙ্গীত’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে ব্রিটিশ সরকার তার প্রতি রুষ্ট হয়, এমনকি পত্রিকার সম্পাদক ভূদেব মুখোপাধ্যায়কেও এজন্য জবাবদিহি করতে হয়। কবিতাটি দীর্ঘকাল বঙ্গের জাতীয় সংগীতের মর্যাদায় আসীন ছিল। ‘ভারতবিলাপ’, ‘কালচক্র’, ‘রিপন উৎসব’, ‘ভারতের নিদ্রাভঙ্গ’ প্রভৃতি রচনায়ও স্বদেশপ্রেমের কথা ব্যক্ত হয়েছে। হেমচন্দ্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থ চিন্তাতরঙ্গিণী ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয়। তার শ্রেষ্ঠ রচনা হচ্ছে বৃত্র-সংহার মহাকাব্য। মহাভারতের কাহিনি অবলম্বনে রচিত এ কাব্যে মূলত সমসাময়িক সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় ঘোষিত হয়েছে। হেমচন্দ্রের অপর বিশিষ্ট কাব্য বীরবাহু কাব্য দেশপ্রেম ও গোত্রপ্রীতির পরিচয় সংবলিত একখানা আখ্যানধর্মী রচনা। তিনি বেশ কিছু ইংরেজি গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ করেন। সেসবের মধ্যে শেকসপিয়রের টেম্পেস্ট ও রোমিও-জুলিয়েট উল্লেখযোগ্য। ১৯০৩ সালের ২৪ মে হেমচন্দ্র মারা যান।
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
নিজের চামড়া ফেলে দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও
নিজের চামড়া ফেলে দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও
নিজের চামড়া ফেলা দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও—এ বাক্যটি এখন আর শুধু একটি ব্যঙ্গ নয়, বরং চামড়া খাত নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার নগ্ন প্রতিফলন। একদিকে ঈদুল আজহার মতো উৎসবে লাখ লাখ পশু কোরবানির মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগৃহীত হয়, অন্যদিকে প্রতি বছর আমদানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার প্রক্রিয়াজাত চামড়া বিদেশ থেকে আনতে হয়। এ চিত্র শুধু বাণিজ্য ঘাটতির নয়, এটি রাজনৈতিক ও নীতিগত ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ প্রতি বছর ঈদের সময় কমবেশি এক কোটি কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ (বিশেষত ছাগলের চামড়া) সংরক্ষণের অভাবে পচে যায়। এ চামড়া ফেলে দেওয়া বা মাটিচাপা দেওয়ার কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। মূলত চামড়া সংরক্ষণে ত্রুটি, হিমায়িত পরিবহনের অভাব, অদক্ষ বাজার ব্যবস্থা ও অগ্রিম অর্থায়ন না থাকায় এমন অপচয় হয়। ফলে একদিকে কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে অস্থিরতা ও অনাস্থা জন্ম নেয়। অপচয়ের এ বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ১১ হাজার ৭১৮ টন চামড়া আমদানি করেছে। এজন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। এ আমদানিকৃত চামড়া দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন রপ্তানিযোগ্য পণ্য—জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ইত্যাদি। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ পরিমাণ চামড়া যদি দেশেই উৎপন্ন হতো, তাহলে এত বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যেত না। বাংলাদেশে উৎপাদিত চামড়ার একটি বড় অংশই আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো যেমন নাইকি, অ্যাডিডাস তাদের চামড়া সংগ্রহ করে শুধু এলডব্লিউজি (লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ) সার্টিফায়েড ট্যানারি থেকে। অথচ বিশ্বের প্রায় ১ হাজার ২৮৫টি ট্যানারি এ সার্টিফিকেশন অর্জন করলেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি ট্যানারি এ মান অর্জন করতে পেরেছে। এ ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হচ্ছে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থাপিত সিইটিপি (সেন্ট্রাল এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) সম্পূর্ণরূপে কার্যকর নয়। নির্ধারিত পরিশোধন ক্ষমতা থাকলেও কোরবানির মৌসুমে চাহিদা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বর্জ্য যথাযথভাবে শোধন করা সম্ভব হয় না। ফলে পরিবেশ দূষণের কারণে এলডব্লিউজি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের ট্যানারি পরিদর্শনই বন্ধ করে দিয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশি ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না। তারা বাধ্য হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কমমূল্যে চামড়া বিক্রি করতে। অন্যদিকে বিদেশি ফিনিশড চামড়া আমদানি করে নিজেদের রপ্তানির চেইন বজায় রাখে। ২০০৩ সালে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী গঠনের ঘোষণা দিয়ে হেমায়েতপুরে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো ট্যানারিগুলোকে ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন শিল্প এলাকা গড়ে তোলা। কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি আজও অসম্পূর্ণ। ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে ১৪২টি চালু থাকলেও সিইটিপি এখনো আংশিক কাজ করে, ফলে নির্গত বর্জ্য ঠিকমতো পরিশোধিত হয় না। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডাম্পিং ইয়ার্ডের দুর্বলতার কারণে ধলেশ্বরী নদী ভয়াবহ দূষণের শিকার, যা দেশের চামড়াশিল্পকে পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে পরিণত করেছে। ঈদুল আজহার সময় উৎপাদিত চামড়ার প্রায় ৯০ শতাংশ স্থানীয় হাটে বিক্রি হয়। কিন্তু এ বাজারে নেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী, নেই মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা, নেই অগ্রিম অর্থায়নের নিশ্চয়তা। ৮৫ শতাংশ বিক্রেতা অপ্রশিক্ষিত এবং প্রান্তিক পর্যায়ে চাঁদাবাজি, পরিবহন দুর্নীতি ও হাটব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা চামড়ার দামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্যবসায়ীদের ৬৫ শতাংশের বেশি মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চামড়া কিনে থাকে, যেটি মূলত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ। ফলে সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন হয় না, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চামড়াশিল্পে যুক্ত রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, বিসিক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মতো একাধিক সংস্থা, কিন্তু তাদের মধ্যে নেই কার্যকর সমন্বয়। ২০১৭ সালে সিইটিপি অপূর্ণ থাকা অবস্থায় ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত এক বড় ধরনের অব্যবস্থাপনার জন্ম দেয়। আমদানি ও রপ্তানি নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, শুল্ক সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আমলাতান্ত্রিক হয়রানি উদ্যোক্তাদের জন্য আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা দুরূহ হয়ে পড়ে। চামড়ার মৌসুমে লবণের সংকট, বাড়তি দাম ও হিমায়িত পরিবহনের অভাবে অনেক সময় কাঁচা চামড়া দ্রুত পচে যায়। দেশে এখনো কেন্দ্রীয় কোনো লবণ ডিপো গড়ে ওঠেনি, যা মৌসুমি চাহিদা মেটাতে পারত। ট্যানারিদের ৭৮ শতাংশই মনে করেন, কেন্দ্রীয় লবণ ডিপো স্থাপন এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প রাজনৈতিকভাবে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত, যা সরকারের নির্বিচার সহায়তা, অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও বৈদেশিক নীতির সুবিধা ভোগ করে আজ বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিপরীতে চামড়াশিল্প রাজনৈতিক সদিচ্ছা থেকে বঞ্চিত। এটি একটি ভোট-অপ্রাসঙ্গিক খাত হওয়ায় এর উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকে মুখবন্ধে, বাস্তবায়নে নয়। ফলে কর্মসংস্থানের দিক থেকেও পিছিয়ে। পোশাকশিল্প যেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে কাজ দিয়েছে, সেখানে চামড়াশিল্প এখনো আড়াই লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। চামড়াশিল্পকে দাঁড় করাতে হলে প্রয়োজন নির্দিষ্ট ও কার্যকর উদ্যোগ। সিইটিপি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করে পরিবেশদূষণ বন্ধ করতে হবে। অন্তত ২০টি ট্যানারিকে এলডব্লিউজি সার্টিফায়েড করতে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দিতে হবে। কাঁচা চামড়ার সুষ্ঠু সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় লবণ ডিপো স্থাপন এবং পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা, অগ্রিম অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বাজার ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতে হবে। সর্বোপরি, ২০১৯ সালে গৃহীত ‘চামড়া শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা’ বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি প্রয়োজন। বাংলাদেশের চামড়াশিল্প সম্ভাবনাময় এক খাত, যা নিজস্ব কাঁচামাল, দক্ষ জনবল এবং ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে। এ খাতের সংকট কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যার নয়, এটি মূলত নৈতিক, নীতিগত এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যেদিন এ শিল্পকে শুধু একটি খাত নয়, বরং একটি দায়িত্ব ও সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হবে, সেদিন চামড়াশিল্পও পোশাকশিল্পের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠবে। l আগামীকাল পড়ুন: চামড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ গন্তব্য লেখক: সাংবাদিক
তারুণ্যের দৃষ্টি বিদেশে রাষ্ট্রেরটা কোথায়
চারদিক / তারুণ্যের দৃষ্টি বিদেশে রাষ্ট্রেরটা কোথায়
বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী তরুণ—সে সংখ্যাটি শুধুই দেশের বোঝা নয়, বরং সম্ভাবনারও প্রতীক। অথচ আজ তাদের একটি বড় অংশ উন্নত জীবন, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশের পথে পা বাড়াচ্ছে। ২০২৩ সালে ৫২ হাজার ৭৯৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিদেশে গেছেন—২০২২ সালের তুলনায় যা ২৮ শতাংশ বেশি। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই গত এক দশকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে তিনগুণ। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সাম্প্রতিক জরিপে ৫৫ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, তারা স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকতে চান। এ প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্নের প্রতিফলন নয়—বরং দেশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সুশাসন ও নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবতায় এর প্রতিফলন নেই। ২০২৫ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে মোট জিডিপির মাত্র ১.৬৯ শতাংশ, যা বিশ্বের ১০৪টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। জাতিসংঘের সুপারিশ অনুসারে এই হার হওয়া উচিত ৪ থেকে ৬ শতাংশ। বাজেট স্বল্পতায় গবেষণাগার, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম ও মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগে ঘাটতি প্রকট। ফলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই মেধাবীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন দেশের উচ্চশিক্ষা থেকে—নতুন স্বপ্নের ঠিকানা খুঁজছেন বিদেশের মাটিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৩ লাখ বেকারের মধ্যে ৮৭ শতাংশ শিক্ষিত। তরুণদের মধ্যে বিশেষত ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ২১ শতাংশ তরুণ কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত নন। শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে যে ব্যবধান, তার প্রমাণ মিলেছে আইএলওর এক জরিপে, যেখানে ৫৬ শতাংশ নিয়োগকর্তা জানিয়েছেন, তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, প্রতি বছর বিশালসংখ্যক তরুণ অপ্রাসঙ্গিক ডিগ্রি নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ু ও পানিদূষণ, যানজট এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি—এ সংকট ঢাকাসহ বড় শহরগুলোকে বাসের অনুপযুক্ত করে তুলেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের শহরগুলো বিশ্বের দূষিত শহরের শীর্ষ তালিকায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মতপ্রকাশে বাধা, কর্মক্ষেত্রে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের জরিপে ৪২ শতাংশ তরুণ বলেছেন, বেকারত্ব তাদের বিদেশমুখিতার প্রধান কারণ। সরকার ‘জাতীয় যুব উদ্যোক্তা নীতি ২০২৫’, ‘উদ্যোক্তা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প’সহ বিভিন্ন কর্মসূচির কথা বলছে। এতে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান এবং ২.৮ লাখ তরুণের দক্ষতা উন্নয়নের দাবি করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে ঠিকই, তবে ১৮ কোটির দেশে এ উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। শিক্ষা ও সুশাসনে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে এসব উদ্যোগের প্রভাব স্থায়ী হবে না। মেধা পাচার রোধে করণীয়— শিক্ষায় কাঠামোগত রূপান্তর: শিক্ষা খাতে বাজেট জিডিপির ৪-৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হবে। কারিগরি ও ডিজিটাল শিক্ষা বিস্তারে জোর দিতে হবে। চাকরির বাজারে স্বচ্ছতা: নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি দূর করতে হবে। ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোগ্রামের পরিধি বাড়াতে হবে। নাগরিক জীবনের গুণগত উন্নয়ন: পরিবেশ রক্ষা, গণপরিবহন উন্নয়ন এবং শহরে নিরাপদ ও স্বস্তিকর জীবনযাত্রার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মেধা সঞ্চালনের নীতিমালা: বিদেশে অবস্থানরত মেধাবীদের অর্জিত জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ দেশের কাজে লাগাতে ট্যাক্স ছাড়, বিনিয়োগ সুযোগ ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তরুণরা দেশের প্রাণশক্তি। তাদের বিদেশমুখিতা শুধুই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় সংকেত; যা চোখে আঙুল দিয়ে বলে দিচ্ছে কোথায় কোথায় সংস্কার জরুরি। এ সংকট মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। শিক্ষায় বিপ্লব, কর্মসংস্থানে সুশাসন এবং নাগরিক জীবনে ভরসা ফিরিয়ে আনলেই তরুণরা দেশেই দেখতে পাবেন ভবিষ্যৎ। আর যারা বিদেশে গেছেন, তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে যুক্ত করে ‘মেধা পাচার’কে ‘মেধা সঞ্চালন’-এ রূপান্তর করা সম্ভব। মো. শাকিল, শিক্ষার্থী মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ
রাজনীতির হটস্পটে রাজরোগ
রাজনীতির হটস্পটে রাজরোগ
ইনিয়ে-বিনিয়ে নয়, ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউডে যে যা পারছেন বলছেন। কেউ কাউকে আর ছেড়ে কথা বলছেন না। মন যা চায়, মুখে যা আসে, তা-ই বলে দিচ্ছেন। যেন আজন্মের শত্রু। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ফ্রন্টলাইনার শিক্ষার্থীদের গড়া এনসিপি আগামী ২১ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ না হলে দুর্বার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে নেমে পড়েছে তারা। বিএনপি সরাসরি টার্গেটে তাদের। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে এনসিপি নেতারা বলেছেন, বিএনপি স্থানীয় নির্বাচন ভয় পায়। তাই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। আরেকটি এক-এগারো ঘটাতে মব সৃষ্টি করে মেয়র হতে চাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। বিএনপি নেতাদের কথাবার্তাও সাফ কথার মতো ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউড। ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা না করলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। বর্তমান সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করা উপদেষ্টাদের অব্যাহতির দাবিও জোরালো। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের পদত্যাগও চান। বৃহস্পতিবার বিএনপি-এনসিপি নেতাদের এমন মাতবোলের এক দিন আগে বুধবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্যও ছিল স্বচ্ছ-পরিষ্কার। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন তিনি। বক্তব্যটা দিয়েছেন ঢাকা সেনানিবাসের সেনা প্রাঙ্গণে অফিসার্স অ্যাড্রেসে। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তার অবস্থান আগের মতোই। দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের অধিকার একটি নির্বাচিত সরকারেরই রয়েছে। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে আরও বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। বাদ পড়েনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর-সংক্রান্ত বিষয়ও। বলেন, রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত একটি নির্বাচিত সরকার থেকেই আসতে হবে। তা করতে হবে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। দেখতে হবে জাতীয় স্বার্থ। পলিটিক্যাল কনসেনসাসের মাধ্যমে সেটা হতে হবে। ‘মব ভায়োলেন্স’র বিরুদ্ধেও কঠোর বার্তা দিয়েছেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সেনাবাহিনী এখন আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। সংঘবদ্ধ জনতার নামে বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা আর সহ্য করা হবে না। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে স্থানীয় মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের মতামত প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করে যাওয়ার কথাও বলেন সেনাপ্রধান। এর পরদিনই রাতেই আকস্মিক আরেক ঘটনা। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সেনানিবাসের ৬২৪ জনকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তা জানানো হয় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। বলা হয়, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিগত সরকারের পতনের পর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতির মাঝে সরকারি দপ্তর, থানাগুলোয় হামলা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর আক্রমণ এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, মব জাস্টিস, চুরি, ডাকাতিসহ বিবিধ বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব সেনানিবাসে প্রাণ রক্ষার্থে রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক আশ্রয় চান। উদ্ভূত আকস্মিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আশ্রয় প্রার্থীদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের চেয়ে তখন তাদের জীবন বাঁচানো প্রাধান্য পায়। তাই ২৪ জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ৫ জন বিচারক, ১৯ জন অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা, ৫১৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাসহ বিবিধ ১২ জন ও ৫১ জন পরিবার-পরিজনসহ সর্বমোট ৬২৬ জনকে বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় দেয় সেনাবাহিনী। শুধু মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে আশ্রয় প্রার্থীদের জীবন রক্ষা করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। পরিস্থিতি উন্নয়নের পর আশ্রয় গ্রহণকারীদের বেশিরভাগই এক-দুই দিনের মধ্যেই সেনানিবাস ত্যাগ করেন। পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়িয়ে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে, সবাইকে এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে আইএসপিআর। এদিকে কিছু ঘটনা ও জনাকয়েকের কারণে নানা মহলের চোখরাঙানি হজম করতে হচ্ছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। আক্রমণাত্মক ভাষায় শুনতে হচ্ছে নানা তিতা কথাও। এর মাঝেই তার উপস্থাপিত ও পরিচয় করে দেওয়া মাস্টারমাইন্ডখ্যাত তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ফেসবুক স্ট্যাটাস। দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে আগের বিভাজনমূলক বক্তব্য ও শব্দচয়নের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ব্যক্তির আদর্শ, সম্মান ও আবেগের চেয়ে দেশ বড়। সরকারে আর একদিনও থাকলে অভ্যুত্থানের সব শক্তির প্রতি সম্মান ও সংবেদনশীলতা রেখে কাজ করতে চান। পুরাতন বন্দোবস্তের বিভেদকামী স্লোগান ও তকমাবাজি, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে হত্যাযোগ্য করে তোলে, সেগুলো পরিহার করলেই ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে বলে এই উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের শত্রুরা ‘ঐক্যবদ্ধ ও আগ্রাসী’ উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে। দেশপ্রেমিক জনগণ যারা জুলাই অভ্যুত্থানে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, তাদের সামনে দীর্ঘ পরীক্ষা। এ পরীক্ষা ঐক্যের ও ধৈর্যের। এ পরীক্ষা উতরে যেতেই হবে বলে মনে করেন মাহফুজ আলম। রাজনীতিতে ভুল করার অর্থই হলো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। এজন্যই রাজনীতিবিদরা সমস্যার সম্মুখীন হলে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়ে থাকেন। যুগ যুগ ধরেই এ প্রথা চলে আসছে। কিন্তু ৫ আগস্টের বিপ্লবীরা সেই পথ মাড়াচ্ছেন না। তারপরও মাহফুজ আলম ভুল স্বীকারের একটি নজির দেখিয়েছেন। কীসের মধ্যে কী-এর মতো সেদিনই প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার পদ ছেড়ে এনসিপির শীর্ষনেতা আলোচিত সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। এর আগে খবর রটে প্রফেসর ইউনূস অভ্যুত্থানের নায়কদের কারও কারও কাজে ভীষণ বিরক্ত। তিনি তাদের ডেকে বলেছেন, তোমরা সংযত হও, নইলে আমি পদত্যাগ করব। এ বক্তব্য সামনে এনে আরেকটি ক্যাচাল বাধানোর আয়োজনের নমুনাও রয়েছে। কবে, কখন, কোথায় প্রফেসর ইউনূস ‘অভ্যুত্থানের নায়ক’দের ডেকেছেন এবং এ কথা বলেছেন—তার কোনো তথ্য বা ইঙ্গিত কিন্তু নেই। যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত নির্বাচন, সেখানে টেনে আনা হচ্ছে সাইডলাইনের নানা বিষয়। সেনাপ্রধানের বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে নানা রং মাখিয়ে। সেখানে তিনি একটা নির্বাচিত সরকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা-সার্বভৌমত্বের জন্য চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন আর গত ৯ মাস সেনাবাহিনীকে অবজ্ঞা করার অভিযোগ এনেছেন। মব সন্ত্রাস বন্ধ করার কথা বলার পরদিন যদিও দেশের তিনটি আদালতে সেই ঘটনা আবার ঘটেছে। গত জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভূমিকা রাখার জন্য যে সেনাবাহিনীকে অভিনন্দিত করেছে, সেই বাহিনী কেন আজ অবজ্ঞার অভিযোগ তুলছে? সরকার থেকে সেনাবাহিনীকে দূরে সরিয়ে দেওয়া—একজন বিদেশি নাগরিককে এনে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বানানোর পেছনে কাদের ইন্ধন রয়েছে, তা অবশ্যই খোঁজা দরকার। সেনাবাহিনীর প্রধানের বক্তব্যের পর থেকে দেশে আবার ঐক্যের ডাকাডাকি চলছে। সমন্বয়করা ডাকছেন, জামায়াত ডাকছে-এনসিপি ডাকছে। গত ৯ মাসে কারা ঐক্য বরবাদ করেছে, কারা আন্দোলনের শক্তিকে কোণঠাসা করেছে, নানা ট্যাগ দিয়ে কলহ তৈরি করেছে। এমনকি ১৫ বছর বহু নির্যাতন ভোগ করা এবং সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখা বিএনপিকে টেম্পোস্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে? এসবের বিশ্লেষণও আছে। ঘাঁটাঘাঁটি করলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। মূত্রত্যাগের কথা তো উচ্চারণই হয়ে গেছে। বিএনপির প্রতি এনসিপিসহ কারও কারও অবজ্ঞা, দলটির ১৫ বছরের ত্যাগকে অস্বীকার করার প্রবণতায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই দলের নেতা শামসুজ্জামান দুদু বলে ফেলেছেন কথাটি। এ নিয়ে সমানে ট্রল চলছে। কত স্পিডে কত পরিমাণ মূত্রত্যাগ করলে সেই স্রোতে কেউ বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়বে— এমন টিপ্পনীও কাটা হচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে বিএনপি। দলের নেতাকর্মীরা একাধিকবার নির্যাতন, গ্রেপ্তার ও টার্গেট কিলিংয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এটাও সত্য, বিএনপির কিছু নেতা দিনে বিএনপি আর রাতে আওয়ামী লীগ করে আত্মরক্ষা খুঁজেছেন। জুলাই বিপ্লবের পর যথারীতি তারা ‘অতি বিপ্লবী’ সেজেছেন। সেখানে বহুমূত্র প্রসঙ্গ বেমানান। আবার ট্রলের যুগে এসে রাজনীতিতে এখন রম্য-বিনোদনও খাটে না। প্রতিপক্ষকে ভাসিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল ও পরিভাষা এখন রীতিমতো ভাইরাল। তবে নেতাদের মুখে পেশাবের উচ্চারণ কিন্তু আজই প্রথম নয়। শামসুজ্জামান দুদুর আদর্শিক নেতা শতাব্দীর মহিরুহ মওলানা ভাসানী এ ক্ষেত্রে অনন্য। ওই সময়ের আর্কাইভে দেখা যায় মওলানা ভাসানীর বক্তব্যে ‘মুত’ শব্দটির দেখা মেলে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর শাসক দল আওয়ামী লীগের তরুণ নেতারাও বয়োবৃদ্ধ জননেতা মওলানা ভাসানীর যাচ্ছেতাই সমালোচনা শুরু করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। মওলানার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে, তার মানসিক চিকিৎসা দরকার, অশীতিপর বুড়োর এখন রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া উচিত—এমন নানা মন্তব্য করে চটানোর চেষ্টা চলত। শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে পল্টনের এক জনসভায় মওলানা বলে বসেন, ‘মনি-রাজ্জাক-তোফায়েল জীবনে যত পেশাব করেছি তত পানিও তোরা খাস নাই।’ এ বক্তব্যের পর মওলানার ওই পেশাবের এমনই তেজ ও ট্রল ছড়ায়, যা কিছুদিন বাজারে চলেছে সমানে। মওলানা ভাসানীর মুখে তা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তরুণ তুর্কি নেতারা জনমের ধাক্কা খেয়ে লা-জওয়াব হয়ে যান। মওলানার বিরুদ্ধ-সমালোচনায় তালা পড়েছিল তাদের সবার মুখেই। মওলানার যুগ আর নেই। আর সবাই ভাসানীও নন। লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
মওদুদ আহমদ
সেই দিনটি / মওদুদ আহমদ
মওদুদ আহমদ বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, দক্ষ সাংসদ ও লেখক। তিনি ১৯৪০ সালের ২৪ মে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির নোয়াখালী জেলায় সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে সম্মান পাস শেষে ব্রিটেনের লন্ডনে অবস্থিত লিংকস ইন থেকে ‘বার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। রাজনীতি, আইন পেশা, লেখালেখি এবং বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেও রাজনীতিবিদের পরিচয়েই তাকে আলোচিত করেছে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মওদুদ আহমদ প্রবাসী সরকারের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৫-পরবর্তী উত্তর বাংলাদেশে মওদুদ আহমদ বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারে নিজেকে যুক্ত করে নানা সময়ে শিল্প, পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। মওদুদ আহমদ বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতি ও উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া দায়িত্ব পালন করেন যোগাযোগমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী হিসেবে। নোয়াখালী-৫ ও নোয়াখালী-১ আসনের তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, উন্নয়ন এবং গণতন্ত্র নিয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি পল্লীকবি জসীমউদদীনের কন্যা হাসনা জসীমউদদীনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মওদুদ আহমদ ২০২১ সালের ১৬ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।