ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

বজ্রাঘাতে মৃত্যু রোধে করণীয়

অনলাইন ডেস্ক
  ২১ মে ২০২৫, ০০:০০

বজ্রপাতে জীবনঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রাকৃতিক কারণেই বজ্রমেঘের সৃষ্টি এবং বজ্রমেঘ থেকেই হয় বজ্রপাত। ‘কিউমুলোনিম্বাস’ মেঘ থেকে সাধারণত বজ্রপাতের সৃষ্টি। বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বজ্রমেঘের পরিমাণও বেড়েছে কয়েক বছর ধরে। শীতের পর দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে শুকনো গরম বাতাস আসতে শুরু করে। অন্যদিকে হিমালয় থেকে আসে ঠান্ডা বাতাস। এ দুই ধরনের বাতাসের সংমিশ্রণে একরকম অস্থিতিশীল বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি তৈরি। মেঘ চলাচলের সময় বাতাস এক মেঘের সঙ্গে অন্য মেঘের ঘর্ষণের সৃষ্টি করে, যার ফলে বজ্রের সৃষ্টি হয়। বজ্র যখন মাটি অবধি চলে আসে তখনই তাকে বজ্রপাত বলে অভিহিত করা হয়। বাংলাদেশে বজ্রমেঘ বৃদ্ধির সময়টা এপ্রিল ও মে মাস। গবেষণা বলছে, ভৌগোলিক ও আবহাওয়াজনিত কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে বজ্রপাত বেশি হচ্ছে। তবে মৌসুমগত আবহাওয়ার পরিবর্তনই বজ্রপাতের মূল কারণ। আবহাওয়াবিদদের মতে, সত্যিকারে বজ্রপাত হয় অনেক বেশি, তবে সব বজ্র মাটি পর্যন্ত স্পর্শ করে না বলে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। দেশে গাছপালা কমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ১ থেকে এক দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়ে চলেছে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও। আবহাওয়ার উত্তাপ বাড়াকে বজ্রপাতের অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়। আবার সেলফোনের অসংখ্য টাওয়ার নির্মাণও বজ্রপাতের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করেন অনেকে। আবহাওয়াবিদের মতে, ঊর্ধ্বাকাশে প্রচুর জলীয় বাষ্প থাকার সময়ে উত্তর থেকে ঠান্ডা বাতাস প্রবাহের কারণে একদিক থেকে গরম ও আর্দ্র বাতাস আর অন্যদিক থেকে শীতল বাতাস প্রবাহে বজ্রপাত হয়।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ১১ মে দেশের চার জেলায় বজ্রপাতে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ২৮ এপ্রিল ১১ জেলায় এক দিনে বজ্রপাতে ১৮ জনের মৃত্যুর খবর জানা গেছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর দেশে গড়ে ৮৪ লাখ বজ্রপাত হয়, যার ৭০ শতাংশই এপ্রিল থেকে জুন মাসে আর বিশ্বে বজ্রপাতে যত মৃত্যু হয় তার এক-চতুর্থাংশই বাংলাদেশে। এককালে বর্ষা এলে আকাশ কখনো ঘনকালো মেঘে ছেয়ে যেত। চমকাত বিদ্যুৎ, শোনা যেত বজ্রপাতের বিকট শব্দ। বেশিরভাগ বজ্র তখন আকাশেই মিলিয়ে যেত। কদাচিৎ দুয়েকটা মাটিতে এসে পড়তেই দেখা যেত উঁচু তাল কিংবা সুপারি গাছের মাথায় এসে ঠেকে গেছে। কিন্তু আজকাল বজ্র যেন যমদূতের রূপ ধারণ করে সব মাটিতে এসে ঠেকছে, মেরে ফেলছে মানুষ। আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্তমান সময়ে বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে বায়ুদূষণ। এ ছাড়া নদী ও জলাভূমি শুকিয়ে যাওয়া, গাছপালা ধ্বংস হওয়ার কারণে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত ঘটায়। যারা ঘরের বাইরে কাজ করেন, যেমন কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির মানুষই বেশি বজ্রপাতের শিকার হন।

গবেষণা বলছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে ২৬৫ জনের বেশি মৃত্যু হয় যাদের ৭০ শতাংশ মাঠে কর্মরত কৃষক। দেশে প্রতি বছর গড়ে ৮৪ লাখ বজ্রপাত হয়, যার ৭০ শতাংশই এপ্রিল থেকে জুন মাসে হয়ে থাকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে ৩ হাজার ৭০০ জন মানুষ প্রাণ হারায়। ২০২১ সালে সারা দেশে বজ্রপাতে মারা গেছে ৩৮১ জন মানুষ। ২০১৬ সালে বজ্রপাতের ঘটনা অনেক বেশি ঘটেছে। ওই বছরের মে মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় একই দিনে ৫৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। আর ৬ জুন এক দিনেই দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণ হারিয়েছে ২৫ জন। এরপরই ২০১৬ সালের ১৭ মে বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বজ্রপাত সাধারণত চার রকমের হয়ে থাকে। প্রথমত, বজ্রপাত সরাসরি আকাশ থেকে মাটিতে চলে আসে। এ ধরনের বজ্রপাতই বেশি প্রাণহানি ঘটায়। অন্য তিনটি হলো—আকাশ থেকে আকাশে, এক মেঘ থেকে অন্য মেঘে এবং অন্যটি মেঘের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। উঁচু স্থানে বজ্রপাত বেশি হয়। আগে গ্রামগঞ্জে বট, তাল ও নারিকেল গাছের মতো উঁচু গাছপালায় পরিপূর্ণ ছিল। তালগাছের মতো উঁচু গাছ বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে কাছে টেনে নিয়ে ঠেকিয়ে দিত। ফলে বজ্র মাটির কাছে খুব একটা পৌঁছাত না। তাই বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুও কম ঘটত। বজ্রপাত ঠেকাতে খোলা মাঠের তালগাছই বেশি কার্যকর বলে মনে করেন অভিজ্ঞজন। গ্রামগঞ্জে রাস্তার দুপাশে তালগাছের যে দীর্ঘ সারি এখন আর দেখা যাচ্ছে না। উঁচু গাছের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় বজ্র সরাসরি মাটিতে লোকালয়ে এসে পড়ে এবং মানুষের মৃত্যু ঘটায়। বজ্রপাতে সাধারণত দুটি উপায়ে মানুষের মৃত্যু হয়। একটি কারণ প্রত্যক্ষ বা সরাসরি আঘাত, যা মানুষের শরীরের ওপর সরাসরি পড়ে। এ ধরনের ঘটনা কম ঘটে এবং প্রত্যক্ষ কারণে মানুষের মৃত্যুও কম। পরোক্ষ বজ্রাঘাতেই অধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এ ক্ষেত্রে যেখানে বজ্রপাত আঘাত হানে সেখানকার পুরো জায়গাটি বিদ্যুতায়িত হয়ে যায়। ভূমির এ ধরনের বিদ্যুতায়নে বেশিরভাগ মানুষ মারা যায়।

বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণার পর ২০১৭ সালে বজ্রপাতে প্রাণহানি হ্রাসে সরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী ৬০ লাখ তালগাছ লাগানো হয়। উপযুক্ত পরিচর্যার অভাবে গাছগুলো বেড়ে উঠতে পারেনি। এ ছাড়া বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র লাইটনিং ডিটেক্টর এবং লাইটনিং অ্যারেস্টার সেন্সর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০২১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের আটটি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হয় বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার এ অত্যাধুনিক যন্ত্র। এ যন্ত্রের সেন্সরগুলোতে ধারণ করা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে বিদ্যুৎ চমকানো এবং বজ্রপাতের মাত্রা জানা সম্ভব হতে পারত বলে ধারণা করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতের মেঘের প্রকাশ বেশ জটিল। মাত্র আধা বা এক ঘণ্টা আগে এর সম্পর্কে বলা যায়। বজ্রঝড় সাধারণত ৩০ থেকে ৪৫ সেকেন্ড স্থায়ী হয়। এ সময়ে বাড়ির বাইরে বের না হওয়া শ্রেয়। ঘরে থেকে দরজা, জানালা বন্ধ রেখে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে সরে থাকতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে রাবারের জুতা পরে নিতে হবে। বজ্রপাতের সময় ঘরের বাইরে অবস্থান করলে খোলা মাঠে বা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না। একান্তই যদি থাকা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে, তবে পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে কানে আঙুল দিয়ে চেপে ধরে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে। আর যত দ্রুত সম্ভব কোনো ভবন বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ। বজ্রপাতের সম্ভাবনা দেখা দিলে উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা তার, সেলফোন টাওয়ার থেকে দূরে চলে যেতে হবে। এমনকি আকাশে ঘন মেঘে বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখলে নদী, পুকুর বা ডোবা এবং যে কোনো জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে। এসব স্থান বজ্রকে বেশি আকর্ষণ করে। বজ্রপাতের সময় গাড়ি বা বাসের ভেতর থাকলে কোনো ধাতব অংশকে শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত রাখা যাবে না। বজ্রপাতের সময় লোহা বা অন্য ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহারও নিরাপদ নয়। একইভাবে বজ্রপাতের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির ধাতব রেলিং, পাইপ স্পর্শ করা যাবে না। বজ্রপাতের সময় সেলফোন ও কম্পিউটার ব্যবহার এবং টেলিভিশন দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে প্রতিটি ভবনে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড রাখা বাধ্যতামূলক করা দরকার। বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে হাওর অঞ্চলে টাওয়ার নির্মাণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুহার নামিয়ে আনতে দেশের সর্বত্র বেশি করে উঁচু গাছ যেমন তাল, নারিকেল, সুপারি, খেজুরগাছ লাগাতে হবে। উন্মুক্ত স্থানে বসাতে হবে লাইটনিং টাওয়ার বা উঁচু ধাতব পোস্ট। খোলা স্থানে উঁচু টাওয়ারে আরথিং করে নিলে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। বজ্রপাত সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করে তুলতে পারলে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও প্রকৌশলী

( প্রকাশিত নিবন্ধের বক্তব্য ও দায়িত্ব লেখকদের নিজস্ব )

নিজের চামড়া ফেলে দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও
নিজের চামড়া ফেলা দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও—এ বাক্যটি এখন আর শুধু একটি ব্যঙ্গ নয়, বরং চামড়া খাত নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার নগ্ন প্রতিফলন। একদিকে ঈদুল আজহার মতো উৎসবে লাখ লাখ পশু কোরবানির মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগৃহীত হয়, অন্যদিকে প্রতি বছর আমদানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার প্রক্রিয়াজাত চামড়া বিদেশ থেকে আনতে হয়। এ চিত্র শুধু বাণিজ্য ঘাটতির নয়, এটি রাজনৈতিক ও নীতিগত ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ প্রতি বছর ঈদের সময় কমবেশি এক কোটি কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ (বিশেষত ছাগলের চামড়া) সংরক্ষণের অভাবে পচে যায়। এ চামড়া ফেলে দেওয়া বা মাটিচাপা দেওয়ার কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। মূলত চামড়া সংরক্ষণে ত্রুটি, হিমায়িত পরিবহনের অভাব, অদক্ষ বাজার ব্যবস্থা ও অগ্রিম অর্থায়ন না থাকায় এমন অপচয় হয়। ফলে একদিকে কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে অস্থিরতা ও অনাস্থা জন্ম নেয়। অপচয়ের এ বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ১১ হাজার ৭১৮ টন চামড়া আমদানি করেছে। এজন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। এ আমদানিকৃত চামড়া দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন রপ্তানিযোগ্য পণ্য—জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ইত্যাদি। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ পরিমাণ চামড়া যদি দেশেই উৎপন্ন হতো, তাহলে এত বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যেত না। বাংলাদেশে উৎপাদিত চামড়ার একটি বড় অংশই আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো যেমন নাইকি, অ্যাডিডাস তাদের চামড়া সংগ্রহ করে শুধু এলডব্লিউজি (লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ) সার্টিফায়েড ট্যানারি থেকে। অথচ বিশ্বের প্রায় ১ হাজার ২৮৫টি ট্যানারি এ সার্টিফিকেশন অর্জন করলেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি ট্যানারি এ মান অর্জন করতে পেরেছে। এ ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হচ্ছে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থাপিত সিইটিপি (সেন্ট্রাল এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) সম্পূর্ণরূপে কার্যকর নয়। নির্ধারিত পরিশোধন ক্ষমতা থাকলেও কোরবানির মৌসুমে চাহিদা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বর্জ্য যথাযথভাবে শোধন করা সম্ভব হয় না। ফলে পরিবেশ দূষণের কারণে এলডব্লিউজি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের ট্যানারি পরিদর্শনই বন্ধ করে দিয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশি ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না। তারা বাধ্য হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কমমূল্যে চামড়া বিক্রি করতে। অন্যদিকে বিদেশি ফিনিশড চামড়া আমদানি করে নিজেদের রপ্তানির চেইন বজায় রাখে। ২০০৩ সালে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী গঠনের ঘোষণা দিয়ে হেমায়েতপুরে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো ট্যানারিগুলোকে ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন শিল্প এলাকা গড়ে তোলা। কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি আজও অসম্পূর্ণ। ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে ১৪২টি চালু থাকলেও সিইটিপি এখনো আংশিক কাজ করে, ফলে নির্গত বর্জ্য ঠিকমতো পরিশোধিত হয় না। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডাম্পিং ইয়ার্ডের দুর্বলতার কারণে ধলেশ্বরী নদী ভয়াবহ দূষণের শিকার, যা দেশের চামড়াশিল্পকে পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে পরিণত করেছে। ঈদুল আজহার সময় উৎপাদিত চামড়ার প্রায় ৯০ শতাংশ স্থানীয় হাটে বিক্রি হয়। কিন্তু এ বাজারে নেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী, নেই মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা, নেই অগ্রিম অর্থায়নের নিশ্চয়তা। ৮৫ শতাংশ বিক্রেতা অপ্রশিক্ষিত এবং প্রান্তিক পর্যায়ে চাঁদাবাজি, পরিবহন দুর্নীতি ও হাটব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা চামড়ার দামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্যবসায়ীদের ৬৫ শতাংশের বেশি মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চামড়া কিনে থাকে, যেটি মূলত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ। ফলে সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন হয় না, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চামড়াশিল্পে যুক্ত রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, বিসিক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মতো একাধিক সংস্থা, কিন্তু তাদের মধ্যে নেই কার্যকর সমন্বয়। ২০১৭ সালে সিইটিপি অপূর্ণ থাকা অবস্থায় ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত এক বড় ধরনের অব্যবস্থাপনার জন্ম দেয়। আমদানি ও রপ্তানি নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, শুল্ক সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আমলাতান্ত্রিক হয়রানি উদ্যোক্তাদের জন্য আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা দুরূহ হয়ে পড়ে। চামড়ার মৌসুমে লবণের সংকট, বাড়তি দাম ও হিমায়িত পরিবহনের অভাবে অনেক সময় কাঁচা চামড়া দ্রুত পচে যায়। দেশে এখনো কেন্দ্রীয় কোনো লবণ ডিপো গড়ে ওঠেনি, যা মৌসুমি চাহিদা মেটাতে পারত। ট্যানারিদের ৭৮ শতাংশই মনে করেন, কেন্দ্রীয় লবণ ডিপো স্থাপন এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প রাজনৈতিকভাবে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত, যা সরকারের নির্বিচার সহায়তা, অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও বৈদেশিক নীতির সুবিধা ভোগ করে আজ বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিপরীতে চামড়াশিল্প রাজনৈতিক সদিচ্ছা থেকে বঞ্চিত। এটি একটি ভোট-অপ্রাসঙ্গিক খাত হওয়ায় এর উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকে মুখবন্ধে, বাস্তবায়নে নয়। ফলে কর্মসংস্থানের দিক থেকেও পিছিয়ে। পোশাকশিল্প যেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে কাজ দিয়েছে, সেখানে চামড়াশিল্প এখনো আড়াই লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। চামড়াশিল্পকে দাঁড় করাতে হলে প্রয়োজন নির্দিষ্ট ও কার্যকর উদ্যোগ। সিইটিপি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করে পরিবেশদূষণ বন্ধ করতে হবে। অন্তত ২০টি ট্যানারিকে এলডব্লিউজি সার্টিফায়েড করতে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দিতে হবে। কাঁচা চামড়ার সুষ্ঠু সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় লবণ ডিপো স্থাপন এবং পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা, অগ্রিম অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বাজার ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতে হবে। সর্বোপরি, ২০১৯ সালে গৃহীত ‘চামড়া শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা’ বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি প্রয়োজন। বাংলাদেশের চামড়াশিল্প সম্ভাবনাময় এক খাত, যা নিজস্ব কাঁচামাল, দক্ষ জনবল এবং ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে। এ খাতের সংকট কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যার নয়, এটি মূলত নৈতিক, নীতিগত এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যেদিন এ শিল্পকে শুধু একটি খাত নয়, বরং একটি দায়িত্ব ও সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হবে, সেদিন চামড়াশিল্পও পোশাকশিল্পের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠবে। l আগামীকাল পড়ুন: চামড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ গন্তব্য লেখক: সাংবাদিক
নিজের চামড়া ফেলে দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও
চারদিক / তারুণ্যের দৃষ্টি বিদেশে রাষ্ট্রেরটা কোথায়
বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী তরুণ—সে সংখ্যাটি শুধুই দেশের বোঝা নয়, বরং সম্ভাবনারও প্রতীক। অথচ আজ তাদের একটি বড় অংশ উন্নত জীবন, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশের পথে পা বাড়াচ্ছে। ২০২৩ সালে ৫২ হাজার ৭৯৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিদেশে গেছেন—২০২২ সালের তুলনায় যা ২৮ শতাংশ বেশি। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই গত এক দশকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে তিনগুণ। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সাম্প্রতিক জরিপে ৫৫ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, তারা স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকতে চান। এ প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্নের প্রতিফলন নয়—বরং দেশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সুশাসন ও নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবতায় এর প্রতিফলন নেই। ২০২৫ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে মোট জিডিপির মাত্র ১.৬৯ শতাংশ, যা বিশ্বের ১০৪টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। জাতিসংঘের সুপারিশ অনুসারে এই হার হওয়া উচিত ৪ থেকে ৬ শতাংশ। বাজেট স্বল্পতায় গবেষণাগার, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম ও মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগে ঘাটতি প্রকট। ফলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই মেধাবীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন দেশের উচ্চশিক্ষা থেকে—নতুন স্বপ্নের ঠিকানা খুঁজছেন বিদেশের মাটিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৩ লাখ বেকারের মধ্যে ৮৭ শতাংশ শিক্ষিত। তরুণদের মধ্যে বিশেষত ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ২১ শতাংশ তরুণ কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত নন। শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে যে ব্যবধান, তার প্রমাণ মিলেছে আইএলওর এক জরিপে, যেখানে ৫৬ শতাংশ নিয়োগকর্তা জানিয়েছেন, তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, প্রতি বছর বিশালসংখ্যক তরুণ অপ্রাসঙ্গিক ডিগ্রি নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ু ও পানিদূষণ, যানজট এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি—এ সংকট ঢাকাসহ বড় শহরগুলোকে বাসের অনুপযুক্ত করে তুলেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের শহরগুলো বিশ্বের দূষিত শহরের শীর্ষ তালিকায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মতপ্রকাশে বাধা, কর্মক্ষেত্রে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের জরিপে ৪২ শতাংশ তরুণ বলেছেন, বেকারত্ব তাদের বিদেশমুখিতার প্রধান কারণ। সরকার ‘জাতীয় যুব উদ্যোক্তা নীতি ২০২৫’, ‘উদ্যোক্তা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প’সহ বিভিন্ন কর্মসূচির কথা বলছে। এতে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান এবং ২.৮ লাখ তরুণের দক্ষতা উন্নয়নের দাবি করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে ঠিকই, তবে ১৮ কোটির দেশে এ উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। শিক্ষা ও সুশাসনে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে এসব উদ্যোগের প্রভাব স্থায়ী হবে না। মেধা পাচার রোধে করণীয়— শিক্ষায় কাঠামোগত রূপান্তর: শিক্ষা খাতে বাজেট জিডিপির ৪-৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হবে। কারিগরি ও ডিজিটাল শিক্ষা বিস্তারে জোর দিতে হবে। চাকরির বাজারে স্বচ্ছতা: নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি দূর করতে হবে। ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোগ্রামের পরিধি বাড়াতে হবে। নাগরিক জীবনের গুণগত উন্নয়ন: পরিবেশ রক্ষা, গণপরিবহন উন্নয়ন এবং শহরে নিরাপদ ও স্বস্তিকর জীবনযাত্রার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মেধা সঞ্চালনের নীতিমালা: বিদেশে অবস্থানরত মেধাবীদের অর্জিত জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ দেশের কাজে লাগাতে ট্যাক্স ছাড়, বিনিয়োগ সুযোগ ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তরুণরা দেশের প্রাণশক্তি। তাদের বিদেশমুখিতা শুধুই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় সংকেত; যা চোখে আঙুল দিয়ে বলে দিচ্ছে কোথায় কোথায় সংস্কার জরুরি। এ সংকট মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। শিক্ষায় বিপ্লব, কর্মসংস্থানে সুশাসন এবং নাগরিক জীবনে ভরসা ফিরিয়ে আনলেই তরুণরা দেশেই দেখতে পাবেন ভবিষ্যৎ। আর যারা বিদেশে গেছেন, তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে যুক্ত করে ‘মেধা পাচার’কে ‘মেধা সঞ্চালন’-এ রূপান্তর করা সম্ভব। মো. শাকিল, শিক্ষার্থী মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ
তারুণ্যের দৃষ্টি বিদেশে রাষ্ট্রেরটা কোথায়
রাজনীতির হটস্পটে রাজরোগ
ইনিয়ে-বিনিয়ে নয়, ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউডে যে যা পারছেন বলছেন। কেউ কাউকে আর ছেড়ে কথা বলছেন না। মন যা চায়, মুখে যা আসে, তা-ই বলে দিচ্ছেন। যেন আজন্মের শত্রু। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ফ্রন্টলাইনার শিক্ষার্থীদের গড়া এনসিপি আগামী ২১ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ না হলে দুর্বার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে নেমে পড়েছে তারা। বিএনপি সরাসরি টার্গেটে তাদের। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে এনসিপি নেতারা বলেছেন, বিএনপি স্থানীয় নির্বাচন ভয় পায়। তাই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। আরেকটি এক-এগারো ঘটাতে মব সৃষ্টি করে মেয়র হতে চাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। বিএনপি নেতাদের কথাবার্তাও সাফ কথার মতো ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউড। ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা না করলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। বর্তমান সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করা উপদেষ্টাদের অব্যাহতির দাবিও জোরালো। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের পদত্যাগও চান। বৃহস্পতিবার বিএনপি-এনসিপি নেতাদের এমন মাতবোলের এক দিন আগে বুধবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্যও ছিল স্বচ্ছ-পরিষ্কার। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন তিনি। বক্তব্যটা দিয়েছেন ঢাকা সেনানিবাসের সেনা প্রাঙ্গণে অফিসার্স অ্যাড্রেসে। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তার অবস্থান আগের মতোই। দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের অধিকার একটি নির্বাচিত সরকারেরই রয়েছে। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে আরও বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। বাদ পড়েনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর-সংক্রান্ত বিষয়ও। বলেন, রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত একটি নির্বাচিত সরকার থেকেই আসতে হবে। তা করতে হবে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। দেখতে হবে জাতীয় স্বার্থ। পলিটিক্যাল কনসেনসাসের মাধ্যমে সেটা হতে হবে। ‘মব ভায়োলেন্স’র বিরুদ্ধেও কঠোর বার্তা দিয়েছেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সেনাবাহিনী এখন আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। সংঘবদ্ধ জনতার নামে বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা আর সহ্য করা হবে না। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে স্থানীয় মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের মতামত প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করে যাওয়ার কথাও বলেন সেনাপ্রধান। এর পরদিনই রাতেই আকস্মিক আরেক ঘটনা। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সেনানিবাসের ৬২৪ জনকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তা জানানো হয় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। বলা হয়, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিগত সরকারের পতনের পর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতির মাঝে সরকারি দপ্তর, থানাগুলোয় হামলা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর আক্রমণ এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, মব জাস্টিস, চুরি, ডাকাতিসহ বিবিধ বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব সেনানিবাসে প্রাণ রক্ষার্থে রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক আশ্রয় চান। উদ্ভূত আকস্মিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আশ্রয় প্রার্থীদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের চেয়ে তখন তাদের জীবন বাঁচানো প্রাধান্য পায়। তাই ২৪ জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ৫ জন বিচারক, ১৯ জন অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা, ৫১৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাসহ বিবিধ ১২ জন ও ৫১ জন পরিবার-পরিজনসহ সর্বমোট ৬২৬ জনকে বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় দেয় সেনাবাহিনী। শুধু মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে আশ্রয় প্রার্থীদের জীবন রক্ষা করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। পরিস্থিতি উন্নয়নের পর আশ্রয় গ্রহণকারীদের বেশিরভাগই এক-দুই দিনের মধ্যেই সেনানিবাস ত্যাগ করেন। পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়িয়ে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে, সবাইকে এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে আইএসপিআর। এদিকে কিছু ঘটনা ও জনাকয়েকের কারণে নানা মহলের চোখরাঙানি হজম করতে হচ্ছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। আক্রমণাত্মক ভাষায় শুনতে হচ্ছে নানা তিতা কথাও। এর মাঝেই তার উপস্থাপিত ও পরিচয় করে দেওয়া মাস্টারমাইন্ডখ্যাত তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ফেসবুক স্ট্যাটাস। দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে আগের বিভাজনমূলক বক্তব্য ও শব্দচয়নের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ব্যক্তির আদর্শ, সম্মান ও আবেগের চেয়ে দেশ বড়। সরকারে আর একদিনও থাকলে অভ্যুত্থানের সব শক্তির প্রতি সম্মান ও সংবেদনশীলতা রেখে কাজ করতে চান। পুরাতন বন্দোবস্তের বিভেদকামী স্লোগান ও তকমাবাজি, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে হত্যাযোগ্য করে তোলে, সেগুলো পরিহার করলেই ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে বলে এই উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের শত্রুরা ‘ঐক্যবদ্ধ ও আগ্রাসী’ উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে। দেশপ্রেমিক জনগণ যারা জুলাই অভ্যুত্থানে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, তাদের সামনে দীর্ঘ পরীক্ষা। এ পরীক্ষা ঐক্যের ও ধৈর্যের। এ পরীক্ষা উতরে যেতেই হবে বলে মনে করেন মাহফুজ আলম। রাজনীতিতে ভুল করার অর্থই হলো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। এজন্যই রাজনীতিবিদরা সমস্যার সম্মুখীন হলে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়ে থাকেন। যুগ যুগ ধরেই এ প্রথা চলে আসছে। কিন্তু ৫ আগস্টের বিপ্লবীরা সেই পথ মাড়াচ্ছেন না। তারপরও মাহফুজ আলম ভুল স্বীকারের একটি নজির দেখিয়েছেন। কীসের মধ্যে কী-এর মতো সেদিনই প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার পদ ছেড়ে এনসিপির শীর্ষনেতা আলোচিত সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। এর আগে খবর রটে প্রফেসর ইউনূস অভ্যুত্থানের নায়কদের কারও কারও কাজে ভীষণ বিরক্ত। তিনি তাদের ডেকে বলেছেন, তোমরা সংযত হও, নইলে আমি পদত্যাগ করব। এ বক্তব্য সামনে এনে আরেকটি ক্যাচাল বাধানোর আয়োজনের নমুনাও রয়েছে। কবে, কখন, কোথায় প্রফেসর ইউনূস ‘অভ্যুত্থানের নায়ক’দের ডেকেছেন এবং এ কথা বলেছেন—তার কোনো তথ্য বা ইঙ্গিত কিন্তু নেই। যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত নির্বাচন, সেখানে টেনে আনা হচ্ছে সাইডলাইনের নানা বিষয়। সেনাপ্রধানের বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে নানা রং মাখিয়ে। সেখানে তিনি একটা নির্বাচিত সরকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা-সার্বভৌমত্বের জন্য চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন আর গত ৯ মাস সেনাবাহিনীকে অবজ্ঞা করার অভিযোগ এনেছেন। মব সন্ত্রাস বন্ধ করার কথা বলার পরদিন যদিও দেশের তিনটি আদালতে সেই ঘটনা আবার ঘটেছে। গত জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভূমিকা রাখার জন্য যে সেনাবাহিনীকে অভিনন্দিত করেছে, সেই বাহিনী কেন আজ অবজ্ঞার অভিযোগ তুলছে? সরকার থেকে সেনাবাহিনীকে দূরে সরিয়ে দেওয়া—একজন বিদেশি নাগরিককে এনে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বানানোর পেছনে কাদের ইন্ধন রয়েছে, তা অবশ্যই খোঁজা দরকার। সেনাবাহিনীর প্রধানের বক্তব্যের পর থেকে দেশে আবার ঐক্যের ডাকাডাকি চলছে। সমন্বয়করা ডাকছেন, জামায়াত ডাকছে-এনসিপি ডাকছে। গত ৯ মাসে কারা ঐক্য বরবাদ করেছে, কারা আন্দোলনের শক্তিকে কোণঠাসা করেছে, নানা ট্যাগ দিয়ে কলহ তৈরি করেছে। এমনকি ১৫ বছর বহু নির্যাতন ভোগ করা এবং সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখা বিএনপিকে টেম্পোস্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে? এসবের বিশ্লেষণও আছে। ঘাঁটাঘাঁটি করলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। মূত্রত্যাগের কথা তো উচ্চারণই হয়ে গেছে। বিএনপির প্রতি এনসিপিসহ কারও কারও অবজ্ঞা, দলটির ১৫ বছরের ত্যাগকে অস্বীকার করার প্রবণতায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই দলের নেতা শামসুজ্জামান দুদু বলে ফেলেছেন কথাটি। এ নিয়ে সমানে ট্রল চলছে। কত স্পিডে কত পরিমাণ মূত্রত্যাগ করলে সেই স্রোতে কেউ বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়বে— এমন টিপ্পনীও কাটা হচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে বিএনপি। দলের নেতাকর্মীরা একাধিকবার নির্যাতন, গ্রেপ্তার ও টার্গেট কিলিংয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এটাও সত্য, বিএনপির কিছু নেতা দিনে বিএনপি আর রাতে আওয়ামী লীগ করে আত্মরক্ষা খুঁজেছেন। জুলাই বিপ্লবের পর যথারীতি তারা ‘অতি বিপ্লবী’ সেজেছেন। সেখানে বহুমূত্র প্রসঙ্গ বেমানান। আবার ট্রলের যুগে এসে রাজনীতিতে এখন রম্য-বিনোদনও খাটে না। প্রতিপক্ষকে ভাসিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল ও পরিভাষা এখন রীতিমতো ভাইরাল। তবে নেতাদের মুখে পেশাবের উচ্চারণ কিন্তু আজই প্রথম নয়। শামসুজ্জামান দুদুর আদর্শিক নেতা শতাব্দীর মহিরুহ মওলানা ভাসানী এ ক্ষেত্রে অনন্য। ওই সময়ের আর্কাইভে দেখা যায় মওলানা ভাসানীর বক্তব্যে ‘মুত’ শব্দটির দেখা মেলে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর শাসক দল আওয়ামী লীগের তরুণ নেতারাও বয়োবৃদ্ধ জননেতা মওলানা ভাসানীর যাচ্ছেতাই সমালোচনা শুরু করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। মওলানার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে, তার মানসিক চিকিৎসা দরকার, অশীতিপর বুড়োর এখন রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া উচিত—এমন নানা মন্তব্য করে চটানোর চেষ্টা চলত। শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে পল্টনের এক জনসভায় মওলানা বলে বসেন, ‘মনি-রাজ্জাক-তোফায়েল জীবনে যত পেশাব করেছি তত পানিও তোরা খাস নাই।’ এ বক্তব্যের পর মওলানার ওই পেশাবের এমনই তেজ ও ট্রল ছড়ায়, যা কিছুদিন বাজারে চলেছে সমানে। মওলানা ভাসানীর মুখে তা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তরুণ তুর্কি নেতারা জনমের ধাক্কা খেয়ে লা-জওয়াব হয়ে যান। মওলানার বিরুদ্ধ-সমালোচনায় তালা পড়েছিল তাদের সবার মুখেই। মওলানার যুগ আর নেই। আর সবাই ভাসানীও নন। লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
রাজনীতির হটস্পটে রাজরোগ
সেই দিনটি / মওদুদ আহমদ
মওদুদ আহমদ বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, দক্ষ সাংসদ ও লেখক। তিনি ১৯৪০ সালের ২৪ মে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির নোয়াখালী জেলায় সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে সম্মান পাস শেষে ব্রিটেনের লন্ডনে অবস্থিত লিংকস ইন থেকে ‘বার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। রাজনীতি, আইন পেশা, লেখালেখি এবং বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেও রাজনীতিবিদের পরিচয়েই তাকে আলোচিত করেছে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মওদুদ আহমদ প্রবাসী সরকারের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৫-পরবর্তী উত্তর বাংলাদেশে মওদুদ আহমদ বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারে নিজেকে যুক্ত করে নানা সময়ে শিল্প, পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। মওদুদ আহমদ বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতি ও উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া দায়িত্ব পালন করেন যোগাযোগমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী হিসেবে। নোয়াখালী-৫ ও নোয়াখালী-১ আসনের তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, উন্নয়ন এবং গণতন্ত্র নিয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি পল্লীকবি জসীমউদদীনের কন্যা হাসনা জসীমউদদীনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মওদুদ আহমদ ২০২১ সালের ১৬ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।
মওদুদ আহমদ
সেই দিনটি / হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কবি, অনুবাদক ও আইনজীবী। তার জন্ম ১৮৩৮ সালের ১৭ এপ্রিল ভারতের হুগলিতে। তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ব্যাচের গ্র্যাজুয়েটদের অন্যতম। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার আগে মিলিটারি অডিটর-জেনারেল অফিসে কেরানি পদে চাকরির মধ্য দিয়ে হেমচন্দ্রের কর্মজীবন শুরু হয়। কর্মজীবনে আইনজীবী হিসেবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। হেমচন্দ্রের প্রধান পরিচয় একজন দেশপ্রেমিক কবি হিসেবে। ১৮৭২ সালের জুলাই মাসে এডুকেশন গেজেটে তার ‘ভারতসঙ্গীত’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে ব্রিটিশ সরকার তার প্রতি রুষ্ট হয়, এমনকি পত্রিকার সম্পাদক ভূদেব মুখোপাধ্যায়কেও এজন্য জবাবদিহি করতে হয়। কবিতাটি দীর্ঘকাল বঙ্গের জাতীয় সংগীতের মর্যাদায় আসীন ছিল। ‘ভারতবিলাপ’, ‘কালচক্র’, ‘রিপন উৎসব’, ‘ভারতের নিদ্রাভঙ্গ’ প্রভৃতি রচনায়ও স্বদেশপ্রেমের কথা ব্যক্ত হয়েছে। হেমচন্দ্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থ চিন্তাতরঙ্গিণী ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয়। তার শ্রেষ্ঠ রচনা হচ্ছে বৃত্র-সংহার মহাকাব্য। মহাভারতের কাহিনি অবলম্বনে রচিত এ কাব্যে মূলত সমসাময়িক সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় ঘোষিত হয়েছে। হেমচন্দ্রের অপর বিশিষ্ট কাব্য বীরবাহু কাব্য দেশপ্রেম ও গোত্রপ্রীতির পরিচয় সংবলিত একখানা আখ্যানধর্মী রচনা। তিনি বেশ কিছু ইংরেজি গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ করেন। সেসবের মধ্যে শেকসপিয়রের টেম্পেস্ট ও রোমিও-জুলিয়েট উল্লেখযোগ্য। ১৯০৩ সালের ২৪ মে হেমচন্দ্র মারা যান।
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
নিজের চামড়া ফেলে দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও
নিজের চামড়া ফেলে দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও
নিজের চামড়া ফেলা দাও, বিদেশেরটা গায়ে চড়াও—এ বাক্যটি এখন আর শুধু একটি ব্যঙ্গ নয়, বরং চামড়া খাত নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার নগ্ন প্রতিফলন। একদিকে ঈদুল আজহার মতো উৎসবে লাখ লাখ পশু কোরবানির মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগৃহীত হয়, অন্যদিকে প্রতি বছর আমদানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার প্রক্রিয়াজাত চামড়া বিদেশ থেকে আনতে হয়। এ চিত্র শুধু বাণিজ্য ঘাটতির নয়, এটি রাজনৈতিক ও নীতিগত ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ প্রতি বছর ঈদের সময় কমবেশি এক কোটি কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ (বিশেষত ছাগলের চামড়া) সংরক্ষণের অভাবে পচে যায়। এ চামড়া ফেলে দেওয়া বা মাটিচাপা দেওয়ার কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। মূলত চামড়া সংরক্ষণে ত্রুটি, হিমায়িত পরিবহনের অভাব, অদক্ষ বাজার ব্যবস্থা ও অগ্রিম অর্থায়ন না থাকায় এমন অপচয় হয়। ফলে একদিকে কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে অস্থিরতা ও অনাস্থা জন্ম নেয়। অপচয়ের এ বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ১১ হাজার ৭১৮ টন চামড়া আমদানি করেছে। এজন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। এ আমদানিকৃত চামড়া দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন রপ্তানিযোগ্য পণ্য—জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ইত্যাদি। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ পরিমাণ চামড়া যদি দেশেই উৎপন্ন হতো, তাহলে এত বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যেত না। বাংলাদেশে উৎপাদিত চামড়ার একটি বড় অংশই আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো যেমন নাইকি, অ্যাডিডাস তাদের চামড়া সংগ্রহ করে শুধু এলডব্লিউজি (লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ) সার্টিফায়েড ট্যানারি থেকে। অথচ বিশ্বের প্রায় ১ হাজার ২৮৫টি ট্যানারি এ সার্টিফিকেশন অর্জন করলেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি ট্যানারি এ মান অর্জন করতে পেরেছে। এ ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হচ্ছে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থাপিত সিইটিপি (সেন্ট্রাল এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) সম্পূর্ণরূপে কার্যকর নয়। নির্ধারিত পরিশোধন ক্ষমতা থাকলেও কোরবানির মৌসুমে চাহিদা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বর্জ্য যথাযথভাবে শোধন করা সম্ভব হয় না। ফলে পরিবেশ দূষণের কারণে এলডব্লিউজি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের ট্যানারি পরিদর্শনই বন্ধ করে দিয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশি ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না। তারা বাধ্য হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কমমূল্যে চামড়া বিক্রি করতে। অন্যদিকে বিদেশি ফিনিশড চামড়া আমদানি করে নিজেদের রপ্তানির চেইন বজায় রাখে। ২০০৩ সালে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী গঠনের ঘোষণা দিয়ে হেমায়েতপুরে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো ট্যানারিগুলোকে ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন শিল্প এলাকা গড়ে তোলা। কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি আজও অসম্পূর্ণ। ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে ১৪২টি চালু থাকলেও সিইটিপি এখনো আংশিক কাজ করে, ফলে নির্গত বর্জ্য ঠিকমতো পরিশোধিত হয় না। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডাম্পিং ইয়ার্ডের দুর্বলতার কারণে ধলেশ্বরী নদী ভয়াবহ দূষণের শিকার, যা দেশের চামড়াশিল্পকে পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে পরিণত করেছে। ঈদুল আজহার সময় উৎপাদিত চামড়ার প্রায় ৯০ শতাংশ স্থানীয় হাটে বিক্রি হয়। কিন্তু এ বাজারে নেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী, নেই মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা, নেই অগ্রিম অর্থায়নের নিশ্চয়তা। ৮৫ শতাংশ বিক্রেতা অপ্রশিক্ষিত এবং প্রান্তিক পর্যায়ে চাঁদাবাজি, পরিবহন দুর্নীতি ও হাটব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা চামড়ার দামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্যবসায়ীদের ৬৫ শতাংশের বেশি মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চামড়া কিনে থাকে, যেটি মূলত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ। ফলে সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন হয় না, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চামড়াশিল্পে যুক্ত রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, বিসিক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মতো একাধিক সংস্থা, কিন্তু তাদের মধ্যে নেই কার্যকর সমন্বয়। ২০১৭ সালে সিইটিপি অপূর্ণ থাকা অবস্থায় ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত এক বড় ধরনের অব্যবস্থাপনার জন্ম দেয়। আমদানি ও রপ্তানি নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, শুল্ক সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আমলাতান্ত্রিক হয়রানি উদ্যোক্তাদের জন্য আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা দুরূহ হয়ে পড়ে। চামড়ার মৌসুমে লবণের সংকট, বাড়তি দাম ও হিমায়িত পরিবহনের অভাবে অনেক সময় কাঁচা চামড়া দ্রুত পচে যায়। দেশে এখনো কেন্দ্রীয় কোনো লবণ ডিপো গড়ে ওঠেনি, যা মৌসুমি চাহিদা মেটাতে পারত। ট্যানারিদের ৭৮ শতাংশই মনে করেন, কেন্দ্রীয় লবণ ডিপো স্থাপন এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প রাজনৈতিকভাবে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত, যা সরকারের নির্বিচার সহায়তা, অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও বৈদেশিক নীতির সুবিধা ভোগ করে আজ বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিপরীতে চামড়াশিল্প রাজনৈতিক সদিচ্ছা থেকে বঞ্চিত। এটি একটি ভোট-অপ্রাসঙ্গিক খাত হওয়ায় এর উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকে মুখবন্ধে, বাস্তবায়নে নয়। ফলে কর্মসংস্থানের দিক থেকেও পিছিয়ে। পোশাকশিল্প যেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে কাজ দিয়েছে, সেখানে চামড়াশিল্প এখনো আড়াই লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। চামড়াশিল্পকে দাঁড় করাতে হলে প্রয়োজন নির্দিষ্ট ও কার্যকর উদ্যোগ। সিইটিপি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করে পরিবেশদূষণ বন্ধ করতে হবে। অন্তত ২০টি ট্যানারিকে এলডব্লিউজি সার্টিফায়েড করতে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দিতে হবে। কাঁচা চামড়ার সুষ্ঠু সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় লবণ ডিপো স্থাপন এবং পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা, অগ্রিম অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বাজার ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতে হবে। সর্বোপরি, ২০১৯ সালে গৃহীত ‘চামড়া শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা’ বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি প্রয়োজন। বাংলাদেশের চামড়াশিল্প সম্ভাবনাময় এক খাত, যা নিজস্ব কাঁচামাল, দক্ষ জনবল এবং ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে। এ খাতের সংকট কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যার নয়, এটি মূলত নৈতিক, নীতিগত এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যেদিন এ শিল্পকে শুধু একটি খাত নয়, বরং একটি দায়িত্ব ও সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হবে, সেদিন চামড়াশিল্পও পোশাকশিল্পের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠবে। l আগামীকাল পড়ুন: চামড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ গন্তব্য লেখক: সাংবাদিক
তারুণ্যের দৃষ্টি বিদেশে রাষ্ট্রেরটা কোথায়
চারদিক / তারুণ্যের দৃষ্টি বিদেশে রাষ্ট্রেরটা কোথায়
বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী তরুণ—সে সংখ্যাটি শুধুই দেশের বোঝা নয়, বরং সম্ভাবনারও প্রতীক। অথচ আজ তাদের একটি বড় অংশ উন্নত জীবন, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশের পথে পা বাড়াচ্ছে। ২০২৩ সালে ৫২ হাজার ৭৯৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিদেশে গেছেন—২০২২ সালের তুলনায় যা ২৮ শতাংশ বেশি। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই গত এক দশকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে তিনগুণ। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সাম্প্রতিক জরিপে ৫৫ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, তারা স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকতে চান। এ প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্নের প্রতিফলন নয়—বরং দেশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সুশাসন ও নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবতায় এর প্রতিফলন নেই। ২০২৫ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে মোট জিডিপির মাত্র ১.৬৯ শতাংশ, যা বিশ্বের ১০৪টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। জাতিসংঘের সুপারিশ অনুসারে এই হার হওয়া উচিত ৪ থেকে ৬ শতাংশ। বাজেট স্বল্পতায় গবেষণাগার, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম ও মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগে ঘাটতি প্রকট। ফলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই মেধাবীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন দেশের উচ্চশিক্ষা থেকে—নতুন স্বপ্নের ঠিকানা খুঁজছেন বিদেশের মাটিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৩ লাখ বেকারের মধ্যে ৮৭ শতাংশ শিক্ষিত। তরুণদের মধ্যে বিশেষত ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ২১ শতাংশ তরুণ কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত নন। শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে যে ব্যবধান, তার প্রমাণ মিলেছে আইএলওর এক জরিপে, যেখানে ৫৬ শতাংশ নিয়োগকর্তা জানিয়েছেন, তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, প্রতি বছর বিশালসংখ্যক তরুণ অপ্রাসঙ্গিক ডিগ্রি নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ু ও পানিদূষণ, যানজট এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি—এ সংকট ঢাকাসহ বড় শহরগুলোকে বাসের অনুপযুক্ত করে তুলেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের শহরগুলো বিশ্বের দূষিত শহরের শীর্ষ তালিকায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মতপ্রকাশে বাধা, কর্মক্ষেত্রে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের জরিপে ৪২ শতাংশ তরুণ বলেছেন, বেকারত্ব তাদের বিদেশমুখিতার প্রধান কারণ। সরকার ‘জাতীয় যুব উদ্যোক্তা নীতি ২০২৫’, ‘উদ্যোক্তা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প’সহ বিভিন্ন কর্মসূচির কথা বলছে। এতে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান এবং ২.৮ লাখ তরুণের দক্ষতা উন্নয়নের দাবি করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে ঠিকই, তবে ১৮ কোটির দেশে এ উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। শিক্ষা ও সুশাসনে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে এসব উদ্যোগের প্রভাব স্থায়ী হবে না। মেধা পাচার রোধে করণীয়— শিক্ষায় কাঠামোগত রূপান্তর: শিক্ষা খাতে বাজেট জিডিপির ৪-৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হবে। কারিগরি ও ডিজিটাল শিক্ষা বিস্তারে জোর দিতে হবে। চাকরির বাজারে স্বচ্ছতা: নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি দূর করতে হবে। ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোগ্রামের পরিধি বাড়াতে হবে। নাগরিক জীবনের গুণগত উন্নয়ন: পরিবেশ রক্ষা, গণপরিবহন উন্নয়ন এবং শহরে নিরাপদ ও স্বস্তিকর জীবনযাত্রার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মেধা সঞ্চালনের নীতিমালা: বিদেশে অবস্থানরত মেধাবীদের অর্জিত জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ দেশের কাজে লাগাতে ট্যাক্স ছাড়, বিনিয়োগ সুযোগ ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তরুণরা দেশের প্রাণশক্তি। তাদের বিদেশমুখিতা শুধুই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় সংকেত; যা চোখে আঙুল দিয়ে বলে দিচ্ছে কোথায় কোথায় সংস্কার জরুরি। এ সংকট মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। শিক্ষায় বিপ্লব, কর্মসংস্থানে সুশাসন এবং নাগরিক জীবনে ভরসা ফিরিয়ে আনলেই তরুণরা দেশেই দেখতে পাবেন ভবিষ্যৎ। আর যারা বিদেশে গেছেন, তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে যুক্ত করে ‘মেধা পাচার’কে ‘মেধা সঞ্চালন’-এ রূপান্তর করা সম্ভব। মো. শাকিল, শিক্ষার্থী মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ
রাজনীতির হটস্পটে রাজরোগ
রাজনীতির হটস্পটে রাজরোগ
ইনিয়ে-বিনিয়ে নয়, ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউডে যে যা পারছেন বলছেন। কেউ কাউকে আর ছেড়ে কথা বলছেন না। মন যা চায়, মুখে যা আসে, তা-ই বলে দিচ্ছেন। যেন আজন্মের শত্রু। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ফ্রন্টলাইনার শিক্ষার্থীদের গড়া এনসিপি আগামী ২১ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ না হলে দুর্বার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে নেমে পড়েছে তারা। বিএনপি সরাসরি টার্গেটে তাদের। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে এনসিপি নেতারা বলেছেন, বিএনপি স্থানীয় নির্বাচন ভয় পায়। তাই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। আরেকটি এক-এগারো ঘটাতে মব সৃষ্টি করে মেয়র হতে চাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। বিএনপি নেতাদের কথাবার্তাও সাফ কথার মতো ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউড। ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা না করলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। বর্তমান সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করা উপদেষ্টাদের অব্যাহতির দাবিও জোরালো। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের পদত্যাগও চান। বৃহস্পতিবার বিএনপি-এনসিপি নেতাদের এমন মাতবোলের এক দিন আগে বুধবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্যও ছিল স্বচ্ছ-পরিষ্কার। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন তিনি। বক্তব্যটা দিয়েছেন ঢাকা সেনানিবাসের সেনা প্রাঙ্গণে অফিসার্স অ্যাড্রেসে। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তার অবস্থান আগের মতোই। দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের অধিকার একটি নির্বাচিত সরকারেরই রয়েছে। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে আরও বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। বাদ পড়েনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর-সংক্রান্ত বিষয়ও। বলেন, রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত একটি নির্বাচিত সরকার থেকেই আসতে হবে। তা করতে হবে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। দেখতে হবে জাতীয় স্বার্থ। পলিটিক্যাল কনসেনসাসের মাধ্যমে সেটা হতে হবে। ‘মব ভায়োলেন্স’র বিরুদ্ধেও কঠোর বার্তা দিয়েছেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সেনাবাহিনী এখন আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। সংঘবদ্ধ জনতার নামে বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা আর সহ্য করা হবে না। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে স্থানীয় মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের মতামত প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করে যাওয়ার কথাও বলেন সেনাপ্রধান। এর পরদিনই রাতেই আকস্মিক আরেক ঘটনা। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সেনানিবাসের ৬২৪ জনকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তা জানানো হয় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। বলা হয়, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিগত সরকারের পতনের পর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতির মাঝে সরকারি দপ্তর, থানাগুলোয় হামলা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর আক্রমণ এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, মব জাস্টিস, চুরি, ডাকাতিসহ বিবিধ বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব সেনানিবাসে প্রাণ রক্ষার্থে রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক আশ্রয় চান। উদ্ভূত আকস্মিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আশ্রয় প্রার্থীদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের চেয়ে তখন তাদের জীবন বাঁচানো প্রাধান্য পায়। তাই ২৪ জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ৫ জন বিচারক, ১৯ জন অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা, ৫১৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাসহ বিবিধ ১২ জন ও ৫১ জন পরিবার-পরিজনসহ সর্বমোট ৬২৬ জনকে বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় দেয় সেনাবাহিনী। শুধু মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে আশ্রয় প্রার্থীদের জীবন রক্ষা করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। পরিস্থিতি উন্নয়নের পর আশ্রয় গ্রহণকারীদের বেশিরভাগই এক-দুই দিনের মধ্যেই সেনানিবাস ত্যাগ করেন। পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়িয়ে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে, সবাইকে এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে আইএসপিআর। এদিকে কিছু ঘটনা ও জনাকয়েকের কারণে নানা মহলের চোখরাঙানি হজম করতে হচ্ছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। আক্রমণাত্মক ভাষায় শুনতে হচ্ছে নানা তিতা কথাও। এর মাঝেই তার উপস্থাপিত ও পরিচয় করে দেওয়া মাস্টারমাইন্ডখ্যাত তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ফেসবুক স্ট্যাটাস। দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে আগের বিভাজনমূলক বক্তব্য ও শব্দচয়নের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ব্যক্তির আদর্শ, সম্মান ও আবেগের চেয়ে দেশ বড়। সরকারে আর একদিনও থাকলে অভ্যুত্থানের সব শক্তির প্রতি সম্মান ও সংবেদনশীলতা রেখে কাজ করতে চান। পুরাতন বন্দোবস্তের বিভেদকামী স্লোগান ও তকমাবাজি, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে হত্যাযোগ্য করে তোলে, সেগুলো পরিহার করলেই ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে বলে এই উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের শত্রুরা ‘ঐক্যবদ্ধ ও আগ্রাসী’ উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে। দেশপ্রেমিক জনগণ যারা জুলাই অভ্যুত্থানে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, তাদের সামনে দীর্ঘ পরীক্ষা। এ পরীক্ষা ঐক্যের ও ধৈর্যের। এ পরীক্ষা উতরে যেতেই হবে বলে মনে করেন মাহফুজ আলম। রাজনীতিতে ভুল করার অর্থই হলো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। এজন্যই রাজনীতিবিদরা সমস্যার সম্মুখীন হলে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়ে থাকেন। যুগ যুগ ধরেই এ প্রথা চলে আসছে। কিন্তু ৫ আগস্টের বিপ্লবীরা সেই পথ মাড়াচ্ছেন না। তারপরও মাহফুজ আলম ভুল স্বীকারের একটি নজির দেখিয়েছেন। কীসের মধ্যে কী-এর মতো সেদিনই প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার পদ ছেড়ে এনসিপির শীর্ষনেতা আলোচিত সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। এর আগে খবর রটে প্রফেসর ইউনূস অভ্যুত্থানের নায়কদের কারও কারও কাজে ভীষণ বিরক্ত। তিনি তাদের ডেকে বলেছেন, তোমরা সংযত হও, নইলে আমি পদত্যাগ করব। এ বক্তব্য সামনে এনে আরেকটি ক্যাচাল বাধানোর আয়োজনের নমুনাও রয়েছে। কবে, কখন, কোথায় প্রফেসর ইউনূস ‘অভ্যুত্থানের নায়ক’দের ডেকেছেন এবং এ কথা বলেছেন—তার কোনো তথ্য বা ইঙ্গিত কিন্তু নেই। যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত নির্বাচন, সেখানে টেনে আনা হচ্ছে সাইডলাইনের নানা বিষয়। সেনাপ্রধানের বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে নানা রং মাখিয়ে। সেখানে তিনি একটা নির্বাচিত সরকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা-সার্বভৌমত্বের জন্য চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন আর গত ৯ মাস সেনাবাহিনীকে অবজ্ঞা করার অভিযোগ এনেছেন। মব সন্ত্রাস বন্ধ করার কথা বলার পরদিন যদিও দেশের তিনটি আদালতে সেই ঘটনা আবার ঘটেছে। গত জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভূমিকা রাখার জন্য যে সেনাবাহিনীকে অভিনন্দিত করেছে, সেই বাহিনী কেন আজ অবজ্ঞার অভিযোগ তুলছে? সরকার থেকে সেনাবাহিনীকে দূরে সরিয়ে দেওয়া—একজন বিদেশি নাগরিককে এনে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বানানোর পেছনে কাদের ইন্ধন রয়েছে, তা অবশ্যই খোঁজা দরকার। সেনাবাহিনীর প্রধানের বক্তব্যের পর থেকে দেশে আবার ঐক্যের ডাকাডাকি চলছে। সমন্বয়করা ডাকছেন, জামায়াত ডাকছে-এনসিপি ডাকছে। গত ৯ মাসে কারা ঐক্য বরবাদ করেছে, কারা আন্দোলনের শক্তিকে কোণঠাসা করেছে, নানা ট্যাগ দিয়ে কলহ তৈরি করেছে। এমনকি ১৫ বছর বহু নির্যাতন ভোগ করা এবং সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখা বিএনপিকে টেম্পোস্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে? এসবের বিশ্লেষণও আছে। ঘাঁটাঘাঁটি করলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। মূত্রত্যাগের কথা তো উচ্চারণই হয়ে গেছে। বিএনপির প্রতি এনসিপিসহ কারও কারও অবজ্ঞা, দলটির ১৫ বছরের ত্যাগকে অস্বীকার করার প্রবণতায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই দলের নেতা শামসুজ্জামান দুদু বলে ফেলেছেন কথাটি। এ নিয়ে সমানে ট্রল চলছে। কত স্পিডে কত পরিমাণ মূত্রত্যাগ করলে সেই স্রোতে কেউ বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়বে— এমন টিপ্পনীও কাটা হচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে বিএনপি। দলের নেতাকর্মীরা একাধিকবার নির্যাতন, গ্রেপ্তার ও টার্গেট কিলিংয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এটাও সত্য, বিএনপির কিছু নেতা দিনে বিএনপি আর রাতে আওয়ামী লীগ করে আত্মরক্ষা খুঁজেছেন। জুলাই বিপ্লবের পর যথারীতি তারা ‘অতি বিপ্লবী’ সেজেছেন। সেখানে বহুমূত্র প্রসঙ্গ বেমানান। আবার ট্রলের যুগে এসে রাজনীতিতে এখন রম্য-বিনোদনও খাটে না। প্রতিপক্ষকে ভাসিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল ও পরিভাষা এখন রীতিমতো ভাইরাল। তবে নেতাদের মুখে পেশাবের উচ্চারণ কিন্তু আজই প্রথম নয়। শামসুজ্জামান দুদুর আদর্শিক নেতা শতাব্দীর মহিরুহ মওলানা ভাসানী এ ক্ষেত্রে অনন্য। ওই সময়ের আর্কাইভে দেখা যায় মওলানা ভাসানীর বক্তব্যে ‘মুত’ শব্দটির দেখা মেলে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর শাসক দল আওয়ামী লীগের তরুণ নেতারাও বয়োবৃদ্ধ জননেতা মওলানা ভাসানীর যাচ্ছেতাই সমালোচনা শুরু করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। মওলানার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে, তার মানসিক চিকিৎসা দরকার, অশীতিপর বুড়োর এখন রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া উচিত—এমন নানা মন্তব্য করে চটানোর চেষ্টা চলত। শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে পল্টনের এক জনসভায় মওলানা বলে বসেন, ‘মনি-রাজ্জাক-তোফায়েল জীবনে যত পেশাব করেছি তত পানিও তোরা খাস নাই।’ এ বক্তব্যের পর মওলানার ওই পেশাবের এমনই তেজ ও ট্রল ছড়ায়, যা কিছুদিন বাজারে চলেছে সমানে। মওলানা ভাসানীর মুখে তা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তরুণ তুর্কি নেতারা জনমের ধাক্কা খেয়ে লা-জওয়াব হয়ে যান। মওলানার বিরুদ্ধ-সমালোচনায় তালা পড়েছিল তাদের সবার মুখেই। মওলানার যুগ আর নেই। আর সবাই ভাসানীও নন। লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
মওদুদ আহমদ
সেই দিনটি / মওদুদ আহমদ
মওদুদ আহমদ বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, দক্ষ সাংসদ ও লেখক। তিনি ১৯৪০ সালের ২৪ মে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির নোয়াখালী জেলায় সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে সম্মান পাস শেষে ব্রিটেনের লন্ডনে অবস্থিত লিংকস ইন থেকে ‘বার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। রাজনীতি, আইন পেশা, লেখালেখি এবং বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেও রাজনীতিবিদের পরিচয়েই তাকে আলোচিত করেছে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মওদুদ আহমদ প্রবাসী সরকারের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৫-পরবর্তী উত্তর বাংলাদেশে মওদুদ আহমদ বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারে নিজেকে যুক্ত করে নানা সময়ে শিল্প, পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। মওদুদ আহমদ বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতি ও উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া দায়িত্ব পালন করেন যোগাযোগমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী হিসেবে। নোয়াখালী-৫ ও নোয়াখালী-১ আসনের তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, উন্নয়ন এবং গণতন্ত্র নিয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি পল্লীকবি জসীমউদদীনের কন্যা হাসনা জসীমউদদীনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মওদুদ আহমদ ২০২১ সালের ১৬ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।