ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

নানা জটিল সমীকরণে অস্থির রাজনীতি

বাড়ছে অনৈক্য-বিভেদ

শফিকুল ইসলাম

  ২৩ মে ২০২৫, ০০:০০

চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার রক্তঝরা অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গণতন্ত্রকামী জনগণের প্রত্যাশা ছিল, সরকার সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে থেকে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু সরকারের মেয়াদ যখন ১০ মাসের দিকে গড়াচ্ছে, তখনই প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগের গুঞ্জন ছড়াল। নানা রকম অস্থিরতার মধ্যে পদত্যাগের গুঞ্জন শুনে মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনায় এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় দুই উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে এ আহ্বান জানানো হয়।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের এ দলটির সঙ্গে সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীরও দূরত্ব দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনে ছাত্রশিবিরের ‘দেশবিরোধী’ স্লোগান ও জাতীয় সংগীত গাইতে বাধা দেওয়ায় এনসিপি নেতাদের প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েন তারা। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেন। এ কারণে মাহফুজের পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছিল ছাত্রশিবির। এমন পরিপ্রেক্ষিতে এবং সম্প্রতি বিএনপির পক্ষ থেকে মাহফুজ আলম ও আরেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পদত্যাগ চাওয়ার বিষয়ে গতকাল ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন মাহফুজ আলম। নিজের ‘বিভাজনমূলক’ শব্দচয়নে দুঃখ প্রকাশ করে মাহফুজ লিখেছেন, ‘দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্য অনিবার্য। আগেকার যে কোনো বক্তব্য ও শব্দচয়ন, যা বিভাজনমূলক ছিল—সেগুলোর জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। সরকারে আর এক দিনও থাকলে অভ্যুত্থানের সব শক্তির প্রতি সম্মান ও সংবেদনশীলতা রেখে কাজ করতে চাই।’

এদিকে এনসিপি নতুন করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠনের দাবি জানালে আরেক জটিলতা তৈরি হয়। কারণ আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন এই ইসির অধীনেই হবে। এখন বিদ্যমান ইসির প্রতি অনাস্থা এনে এনসিপি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলে দেশ আরও গভীর সংকটে পড়বে। বুধবার ইসি পুনর্গঠন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সামনে সমাবেশ করেছে দলটি।

এর আগে মঙ্গলবার রাতে এই কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। তাই কমিশনের ওপর ভরসা রাখতে পারছি না। ফলে দ্রুত নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের পরে সবকিছুকে পরিকল্পিতভাবে জাতীয় নির্বাচনের দিকে নেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। নির্বাচন নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়া জরুরি।’ তিনি গণপরিষদ ও জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণারও দাবি জানিয়েছেন সংবাদ সম্মেলনে। অন্যদিকে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের রোডম্যাপ না দিলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা কঠিন হবে বলে জানিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে বিতর্কিত উপদেষ্টাসহ প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে অব্যাহতি দিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ ছোট করার আহ্বান দলটির।

সম্প্রতি নানা দাবিতে বিভিন্ন পক্ষের আন্দোলন, যমুনাভিমুখে লংমার্চসহ বিভিন্ন ইস্যুতে অস্থিরতা বাড়ছেই। অতি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যাকাণ্ড যেন অস্থিরতার আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। তার খুনের বিচার চেয়ে ছাত্রদলও কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানো নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়। তাকে মেয়র পদে বসানোর দাবিতে বিএনপির নেতাকর্মীরা কয়েকদিন ধরে আন্দোলন করছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ইশরাকের মেয়র ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া গেজেটের বৈধতা নিয়ে রিট খারিজের আদেশ দিলে আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের আলটিমেটাম দিয়ে আন্দোলন স্থগিত করেন ইশরাক হোসেন।

কয়েকদিনের আন্দোলনে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ এবং বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি জমার কারণে তৈরি হয়েছে ব্যাপক জনদুর্ভোগ। চলাচলে কষ্ট হওয়া সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সংসদ নির্বাচন নিয়ে জাতীয় সংলাপ শুরু করা এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে গণঅধিকার পরিষদ। অন্য দাবির মধ্যে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে দুই উপদেষ্টা এবং সরকারের সব দপ্তর থেকে ছাত্র প্রতিনিধিদের পদত্যাগ, করিডোর ও চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকা এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্র দখলের অবৈধ আইনে নিয়োগ দেওয়া প্রশাসকদের প্রত্যাহার করা।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তারেক রহমানকে নিয়ে ড. খলিলুর রহমান যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন প্রসঙ্গটি যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিমূলক। কেননা, দেশবাসীর অজানা নয় যে, তারেক রহমানকে কী কারণে কোন পরিস্থিতিতে লন্ডন যেতে হয়েছে। সেখানে থেকেই তাকে বিশ্বের নিষ্ঠুরতম একটি জগদ্দল ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিতে হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে না পরে, সংস্কার বাস্তবায়ন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, মিয়ানমারকে মানবিক করিডোর দেওয়া, চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ এ ছয়টি ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর নানামুখী তৎপরতায় দেশে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এসব ইস্যুতে দলগুলোর পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। ফলে আবারও জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। যদিও নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে চাপ তৈরি হওয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য সময়সীমা ঘোষণা করেছেন। তার মতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর অথবা ২০২৬ সালের জুনের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ডিসেম্বর-জুনের ‘বিভ্রান্তি’কে মানতে পারছে না। দলটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এবং চলতি ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচনের দাবিতে অনড়। বিএনপির এই অবস্থানের সঙ্গে কিছু সমমনা দলও রয়েছে। জামায়াতের অবস্থান এখনো খুব পরিষ্কার নয়। আর গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের দল এনসিপি দ্রুত নির্বাচনের ব্যাপারে খুব আগ্রহ নেই। তারা নির্বাচনের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে অটল এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ দেওয়া হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ক্ষুদ্র বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেবে এটিই ছিল জনগণের প্রত্যাশা। তবে নানা ঘটনায় দেশের রাজনীতি এখন অস্থির। দলগুলোর মাঝে বাড়ছে অনৈক্য ও বিভেদ। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসন জনগণকে যদি স্বস্তি দিতে পারত, পরিবর্তনের লক্ষণগুলো স্পষ্ট হতো, মানুষ যদি সুশাসনের সুফল ভোগ করত, সংস্কারের উদ্যোগে আশার সঞ্চার করা যেত, তাহলে মানুষ প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য অপেক্ষা করত; কিন্তু সরকার তা করতে না পারায় দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জোরালো হচ্ছে। অস্থিরতা নিরসনের একমাত্র পথ হলো অতিদ্রুত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করা।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ নিয়ে বলেন, ‘হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন একটা সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। সেই সম্ভাবনা হলো ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দ্বারা আধুনিক বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করা। তবে সেখানে দেখছি একটা কালো ছায়া এসে দাঁড়াচ্ছে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে জাতীয় নির্বাচনকে পিছিয়ে দেওয়া এবং জনগণকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত ও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। আবারও বিভাজনের রাজনীতি শুরু হয়েছে। এখানে গোত্রে গোত্রে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পরস্পরের মুখোমুখি করার একটা ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের ভেতরে একটি অংশ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পক্ষে, তাই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দলগুলো নয়, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল অংশী হিসেবে যাদের বিবেচনা করা হয় (সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী,

বিএনপি-জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি), বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। এই ঘোলাটে পরিস্থিতিতে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নিতে পারে। একই সঙ্গে পতিত আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনেরও আশঙ্কা থেকে যায়। এমন বাস্তবতায় সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিএনপি ও এনসিপি—কোনো একটি পক্ষের ভুল পদক্ষেপ পরিস্থিতি শোচনীয় করে তুলতে পারে। এতে চূড়ান্ত বিচারে লাভবান হবে গণঅভ্যুত্থানের পরাজিত ও পতিত শক্তি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান কালবেলাকে বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ দেওয়া হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ক্ষুদ্র বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠবে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেবে, সেটিই ছিল দেশবাসীর প্রত্যাশা। কিন্তু নানা ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুর্বলতা স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার না হওয়ায় পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে। ফলে বর্তমান উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা কাটাতে এবং সম্ভাব্য সংঘাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিএনপি-জামায়াত ও এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি—এই অংশীগুলোর মধ্যে বোঝাপড়ার কোনো বিকল্প নেই।’

জানা যায়, মূলত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নাকি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে হবে এই ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে বিরোধ তুঙ্গে। বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো চায় চলতি বছরে ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তারপর স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আর জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপি এরই মধ্যে স্পষ্ট করে বলেছে, তারা জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায়, যা নিয়ে কয়েক মাস ধরে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। তবে, অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন কালবেলাকে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে মাত্রায় জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় বসেছে, তার নজির বাংলাদেশে নেই। পতিত ও পরাজিত পক্ষ ছাড়া দেশের সব রাজনৈতিক দল এ সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ জনগণ স্বস্তিতে নেই। সম্প্রতি যেসব ঘটনা ঘটছে, তাতে মানুষের মনে নানা উদ্বেগ, অজানা আশঙ্কা ও ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনীতির দায়িত্বশীল পক্ষগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে যে সরকারের হওয়ার কথা ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী সরকার—আজ সেটি করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের কালবেলাকে বলেন, নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় বিষয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজই হচ্ছে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি কিছু সংস্কার করার প্রয়োজন আছে, যা একটি সুস্থ নির্বাচন এবং সঠিক রাজনীতি করার জন্য সহায়ক হবে।

তিনি বলেন, সরকার ডিসেম্বরে নির্বাচন করলে জামায়াতের কোনো আপত্তি নেই। দুই মাস পরে করলেও জামায়াতের আপত্তি নেই। তবে সরকারের উচিত একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেওয়া। জামায়াত দুটি রোডম্যাপ চেয়েছে—একটি নির্বাচনের, অন্যটি সংস্কারের।

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু কালবেলাকে বলেন, বিএনপি, গণঅভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক দলগুলো এবং অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে পরস্পর বিভেদ কমিয়ে সমঝোতায় না পৌঁছালে সংস্কার, ফ্যাসিবাদের বিচার ও নির্বাচন সবকিছুতেই অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হবে। কেননা, জুলাই-আগস্টে সবাই মিলে উপড়ে ফেলেছিল ফ্যাসিবাদের মূল! এখন আমরা সবাই মিলে যা করছি তা হলো অমার্জনীয় ‘ভুল’।

গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খান কালবেলাকে বলেন, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এজন্য সরকারই দায়ী। তবে সংকট নিরসনে অবিলম্বে সরকারের উচিত জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা। তার আগে ফ্যাসিবাদী আন্দোলনে গণহত্যার বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কারেরও রূপরেখা ঘোষণা দিতে হবে। সরকার শুরুতে যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়নি এখন সেটির দরকার নেই। এখন জাতীয় নির্বাচন দেওয়াটা জরুরি। এনসিপি জাতীয় নির্বাচন বাধাগ্রস্ত ও বিলম্বিত করার ষড়যন্ত্র করছে বলেও মনে করেন তিনি।

সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে বিএনপি
চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন দাবিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে বিএনপি। দলটির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, রাজপথে গত এক সপ্তাহে বিএনপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতি সরকারকে একটি বার্তা মাত্র। নির্বাচন নিয়ে কোনো টালবাহানা হলে আগামী দিনে যে কোনো সময় একই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। বিএনপি চায় না, সেই ধরনের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হোক। দলটির নেতারা বলেছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বেই আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে বলে এখনো প্রত্যাশা করেন তারা। তারা এ-ও মনে করেন, বিদ্যমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে নির্বাচন, সংস্কার এবং আওয়ামী লীগের বিচার ইস্যুতে সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাবে। তবে তারা বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ নির্বাচন না হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি সমর্থন ধরে রাখা বিএনপির জন্য কঠিন হবে। নির্বাচন নিয়ে এটিও সরকারের প্রতি বিএনপির এক ধরনের বার্তা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের যৌক্তিকতার বিষয়টি বর্তমানে যেভাবে বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরছে, আগামী আরও বেশ কিছুদিন ঠিক একইভাবে তা অব্যাহত রেখে সরকারের ওপর চাপ বজায় রাখবে। জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের যৌথ উদ্যোগে বর্তমানে বিভাগীয় শহরে তারুণ্যের সমাবেশ চলছে। আগামী ২৮ মে ঢাকায় বিভাগীয় তারুণ্যের সমাবেশ থেকে জাতীয় নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণের দাবিতে বিএনপির অবস্থান আরও স্পষ্ট করা হবে। এ ছাড়া ঈদুল আজহার পর দলটির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিও থাকবে। সেখান থেকেও নির্বাচনের জোরালো দাবি তুলে ধরা হবে। বিএনপি নেতারা বলছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। এটা ক্রমেই বাড়বে। অবশ্য দলটি মনে করছে, আগামী জুলাই নাগাদ সরকারের তরফ থেকে নির্বাচনের দিনক্ষণের বিষয়টি স্পষ্ট করা হতে পারে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান গত বুধবার ঢাকা সেনানিবাসের সেনা প্রাঙ্গণে অফিসার্স অ্যাড্রেসে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত বলে নিজের মতামত জানান। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার অবস্থান আগের মতোই। দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের অধিকার একটি নির্বাচিত সরকারেরই রয়েছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধান তার যে অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন, সেটিকে যৌক্তিক বলছে বিএনপি। সরকার এটিও আমলে নেবে বলে মনে করে দলটি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বৃহস্পতিবার এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি। এই জনআকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়াটাই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান এজেন্ডা হওয়া উচিত বলে জনগণ মনে করে। এর অন্যথা হলে জনগণের দল হিসেবে বিএনপির পক্ষে এই সরকারের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। গত সপ্তাহে অন্তত দুটি ইস্যুতে বিএনপিকে হার্ডলাইনে দেখা গেছে। ঢাকার দক্ষিণে মেয়র পদে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের শপথ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে দলটির নেতাকর্মীরা। নির্বাচন নিয়ে বিএনপির যে শঙ্কা সেটিই মূলত দলটিকে হঠাৎ করে রাজপথে এমন সিদ্ধান্ত নিতে কিংবা তাদেরকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে বলে দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপি এই অবস্থান নিয়েছিল। বিএনপি মনে করে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। এমন অবস্থায় দলটির পক্ষ থেকে বার বার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের দাবি জানানো হলেও সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। একইসঙ্গে নানান ধরনের শঙ্কা, গুজব সামনে চলে আসায় সরকারকে একটি বার্তা দেওয়ার জন্য রাজপথে তাদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন করে দলটি। নেতারা বলছেন, এই সরকার ব্যর্থ হোক, সেটা তারা চান না। তারা শুরু থেকেই সরকারকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে আসছেন। তবে তাদের নির্বাচনের দিনক্ষণের দাবি বারবার উপেক্ষিত হওয়ায় রাজপথে হঠাৎ বিশাল জমায়েতে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা সরকারকে এই বার্তা দিতে চেয়েছে যে, বিএনপি চাইলে সরকারকে যে কোনো সময়ই অসহযোগিতা করতে পারে। জানা গেছে, রাজপথে এমন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা বিএনপির সিদ্ধান্ত নয়। কারণ, তারা এই সরকারকে কোনোভাবেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে চায় না। সর্বশেষ গত সোমবার অনুষ্ঠিত দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ইস্যুতে তারা কমপক্ষে আরও দুই মাস সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সময় পরে নির্বাচন নিয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো সুস্পষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা করা না হলে কিংবা নির্বাচন প্রলম্বিত করার কোনো লক্ষণ স্পষ্ট হলে তখন রাজপথের কর্মসূচির কথা ভাববে বিএনপি। এদিকে এই সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, ঐক্যের স্বার্থে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কথা ছিল। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে, কোনো কোনো মহলের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই যেন সরকারের কর্মপরিকল্পনার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি মনে করে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার নানান বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড সরকারের নির্দলীয়-নিরপেক্ষ পরিচিতিকে যেমন ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে, তেমনি সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাই সরকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের পদত্যাগের দাবি তুলেছে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, দেশে বিদ্যমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে শিগগির সর্বদলীয় বৈঠক ডাকতে পারেন প্রধান উপদেষ্টা। এমনটা না হলে বিএনপি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারে। সেখানে এই বিষয়গুলো তারা সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে। একই সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে দলের ‘ক্লিয়ার-কাট’ অবস্থানের কথাও জানাবে। বিএনপি মনে করে, আগামী নির্বাচনের জন্য ডিসেম্বর একটি কাটঅফ টাইম। দলটি এই ব্যাপারে এখন আরও বেশি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিএনপি মনে করে, অন্তর্বর্তীকালীন অস্থায়ী সরকারের একমাত্র ম্যান্ডেট হচ্ছে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। কিন্তু সরকারকে এই দায়িত্ব থেকে অন্যদিকে ডাইভার্ট করতে সরকারের ভেতরেরই কোনো কোনো শক্তি কিংবা ভেতরের একটি মহল কাজ করছে বলে মনে করে দলটি। বিএনপি এও মনে করছে, নির্বাচন বিলম্বিত করতে অথবা দেশকে গণতন্ত্রে উত্তোরণের পথ ঠেকিয়ে রাখতে কিংবা নতুন কোনো রাজনৈতিক ‘খায়েশ’ পূরণের জন্য যদি সরকার বিকল্প চিন্তা করে থাকে, সেটা বিপদ ডেকে আনবে।
সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে বিএনপি
বড় হচ্ছে দেশীয় খেলনার বাজার
বাংলাদেশের দেশীয় খেলনা শিল্প এখন আর শুধু শিশুর বিনোদনের খাত নয়, এটি রূপ নিয়েছে একটি সম্ভাবনাময় শিল্প খাতে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে যেমন দেশীয় খেলনার চাহিদা বাড়ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশি খেলনার জন্য তৈরি হচ্ছে বিস্তৃত সুযোগ। একসময় দেশের খেলনার বাজারে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও দৃশ্যপট বদলেছে। আনুমানিক ৭ হাজার কোটি টাকার বাজারের মধ্যে দেশীয় নির্মাতাদের দখলে রয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকার বাজার। রাজধানী ঢাকার আশপাশে গড়ে ওঠা ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৪৭টি কারখানা এখন দেশের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করছে। এর মধ্যে অধিকাংশই কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, ইসলামবাগ, চকবাজার, গাজীপুর, কেরানীগঞ্জ, পুরান ঢাকা, ইপিজেড ও ইজেড এলাকায়। বর্তমানে দেশেই এক হাজারেরও বেশি ধরনের খেলনা উৎপাদন হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে— শিক্ষামূলক খেলনা, প্রাণীর রঙিন মডেল, প্যাডেল কার, ট্রাইসাইকেল, রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি, বৈদ্যুতিক পুতুল, প্লাস্টিক দোলনা ও দেয়াল। নতুন সংযোজিত খেলনার মধ্যে রয়েছে—কিবোর্ড, গিটার, ড্রামস, মিনি গাড়ি, অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রতিরূপ। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৩ সালে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ যখন খেলনা উৎপাদনে আসে, তখন এ খাতের পেশাদারিত্বে নতুন ধারা সূচিত হয়। তাদের ‘প্লেটাইম’ ব্র্যান্ডের আওতায় এখন পাওয়া যায় শতাধিক ধরনের শিক্ষামূলক খেলনা, যেমন—পাজল, বর্ণমালা বোর্ড, গাণিতিক গেমস। আর ‘জিম অ্যান্ড জলি’ ব্র্যান্ডের অধীনে তৈরি হচ্ছে বিগ টয় ক্যাটাগরির পণ্য, যেমন—বেবি ওয়াকার, রাইডিং কার, স্লাইডার ও ট্রাইসাইকেল। আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় খেলনা: বর্তমানে বাংলাদেশের খেলনা রপ্তানি হচ্ছে ভারতের সেভেন সিস্টার্স, নেপাল, ভুটান ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সিঙ্গাপুর, স্পেন, ইতালি, ফ্রান্সসহ ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত দেশে। ভবিষ্যতে লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাজারেও প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশি খেলনার মান, নিরাপত্তা ও মূল্য সংযোজনের দিকটি ক্রমেই উন্নত হওয়ায় ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে এর চাহিদা বেড়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, চাহিদা আরও বাড়ানো সম্ভব, যদি সরকার রপ্তানি প্রণোদনা, কাঁচামালে শুল্ক ছাড় ও মান নিয়ন্ত্রণে সহায়তা দেয়। চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা: যদিও খেলনা শিল্পের সম্ভাবনা বিশাল, তবুও উদ্যোক্তাদের সামনে রয়েছে কিছু প্রতিবন্ধকতা। কাঁচামাল আমদানিতে প্রায় ৩৭ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া আধুনিক ছাঁচ নির্মাণ প্রযুক্তি, নিরাপত্তা পরীক্ষার সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে খেলনা সনদায়নের সুযোগ এখনো সীমিত। শিল্প মালিকরা বলছেন, খেলনা শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস, বিশ্বমানের প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা এবং গার্মেন্টস শিল্পের মতো সুবিধা প্রদান জরুরি। উদ্যোক্তারা বলছেন, খেলনা শিল্পকে আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের উপযোগী করতে হলে সরকারকে সহজ শর্তে ঋণ, অবকাঠামোগত সহায়তা এবং কার্যকর নীতিমালার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে পেট্রোকেমিক্যাল, সাইক্লিং, অটোমোবাইল ও ইলেকট্রনিকস শিল্পে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়বে, যা এই খাতের সম্ভাবনাকে আরও প্রসারিত করবে। তবে গার্মেন্টস খাতের মতো সুবিধা এখনো প্লাস্টিক খেলনা শিল্প পাচ্ছে না। শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য সহায়ক নীতি ও সরকারি সহায়তা অপরিহার্য বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা: দেশীয় খেলনার বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তারা শুধু ঐতিহ্যবাহী খেলনা তৈরি করছেন না, বরং সেগুলোকে আধুনিক নকশা এবং ধারণার সঙ্গে মিশিয়ে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করছেন, যা শহুরে ক্রেতাদেরও আকৃষ্ট করছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দারাজ, ইভ্যালির মতো ই-কমার্স ওয়েবসাইটগুলো দেশীয় খেলনার প্রচার ও বিক্রির জন্য শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে উৎপাদকরা সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছতে পারছেন, যা তাদের পণ্য বিপণন এবং বাজার সম্প্রসারণে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। অনেক উদ্যোক্তা বিদেশি খেলনার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য তাদের পণ্যের গুণগত মান বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। রঙের স্থায়িত্ব, কারুকার্যের সূক্ষ্মতা এবং উপকরণের দৃঢ়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। সোহান টয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলী কালবেলাকে বলেন, দেশীয় খেলনার বাজার ক্রমশ বড় হচ্ছে এবং এর ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনা এই শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। স্থানীয় বাজার ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশীয় খেলনার প্রচার ও প্রসারে নজর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ এবং অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করে বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগলাইন ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে। এই শিল্পকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অন্তর্ভুক্ত করে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। সহজ শর্তে ঋণ, কর মওকুফ এবং অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এই খাতের উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা উচিত।’ ছোট খেলনার বাজারও বড় হচ্ছে: দেশের অন্যান্য খেলনার পাশাপাশি ছোট খেলনার বাজারও বড় হচ্ছে। এই ছোট খেলনার বাজারে এমন কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা বছরে অর্ধশত কোটি টাকার বেশি বিক্রি করে। এগুলো গত এক দশকে ছোট কারখানা থেকে বড় শিল্পকারখানায় রূপ নিয়েছে। দেশে এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে এ আর প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ, আলিফ এন্টারপ্রাইজ, আমরোজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আজিজ প্লাস্টিক টয় ইন্ডাস্ট্রিজ, ঢাকাইয়া টয় ইন্ডাস্ট্রিজ এবং এভারেস্ট টয় ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। দেশে উৎপাদনের ফলে খেলনার দাম অনেক কমেছে গত কয়েক বছরে। কম দামে ভালো খেলনা মিলছে। আগে যা বিদেশ থেকে আনতে হতো, তা এখন দেশেই বানানো হচ্ছে। চীন থেকে ধারণা নিয়ে দেশে এসব তৈরি হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশ টয় মার্চেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক জাহিদ কালবেলাকে বলেন, দেশের খেলনা বাজারের উদ্ভব বেশিদিন হয়নি। এই বাজার বছর দশেক আগেও চীনের দখলে ছিল। যেটা এখন আমরা দেশে তৈরি করেছি। বাজারটি ভালোভাবে ধরতে পারায় দ্রুত এ খাতের বিকাশ হয়েছে। জাহিদুল হক বলেন, ‘দেশীয় খেলনা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে মোট বাজারের ৮০ শতাংশ দখল করে নিয়েছে। বিশেষ করে প্লাস্টিকের খেলনা চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদন হয়। এ ছাড়া বাইরে বিভিন্ন মেটাল, কাপড়ের বা পুরো যন্ত্র টাইপের খেলনা আমদানি হচ্ছে।’ দেশে উৎপাদনের ফলে গত কয়েক বছরে খেলনার দাম অনেক কমেছে জানিয়ে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘কম দামে ভালো খেলনা মিলছে। আগে যা বিদেশ থেকে আনতে হতো, তা এখন আমরাই বানাচ্ছি। চীন থেকে ধারণা নিয়ে দেশে এসব তৈরি হচ্ছে। একসময় দেশে এ খেলনা আমদানির প্রয়োজন থাকবে না। উল্টো দেশের এসব কোম্পানি রপ্তানি করবে বহুগুণ। খেলনা হবে দেশের আয়ের বড় উৎস। কারণ আমাদের খেলনা অনেক দেশের তুলনায় অনন্য।’ যা বলছে বিপিজিএমইএ: রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়ে গতকাল শুক্রবার শেষ হয়েছে দুই দিনের প্লাস্টিক খেলনা প্রদর্শনী মেলা। মেলাটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজিএমইএ) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ প্রকল্প। বিপিজিএমইএর সভাপতি শামিম আহমেদ বলেন, সেভেন সিস্টার্স এলাকায় পণ্য পাঠাতে হলে ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিবহনে বেশি খরচ হয়। ফলে সেখানে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি পণ্য পাঠানো ছিল অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। কিন্তু এখন যদি ঘুরপথে পণ্য পাঠাতে হয়, তাহলে রপ্তানিতে লাভ থাকবে না। ভারতে পণ্য রপ্তানি নিয়ে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নেবে এবং সেটি তারা মেনে নেবেন। সদ্য সমাপ্ত দুই দিনের প্লাস্টিক খেলনা প্রদর্শনী মেলার গুরুত্ব তুলে ধরে শামিম আহমেদ বলেন, ‘এই মেলা পেশাদার ক্রেতা ও খেলনা শিল্পের সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সোর্সিং প্ল্যাটফর্ম। পাশাপাশি এটি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে নেটওয়ার্কিং ও প্রাসঙ্গিক তথ্য বিনিময়ের সুযোগ করে দেবে। বাংলাদেশে তৈরি খেলনার রপ্তানি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ খেলনা রপ্তানির প্রবৃদ্ধি হবে ২৪ শতাংশ। সরকারের নীতিসহায়তা ও কাঁচামাল আমদানিতে কর সুবিধা পেলে দেশের খেলনা শিল্প এগিয়ে যাবে।’
বড় হচ্ছে দেশীয় খেলনার বাজার
নাহিদ ইসলাম / আরেকটি এক-এগারোর বন্দোবস্ত করার পাঁয়তারা চলছে
দেশকে বিভাজিত করে আরেকটি এক-এগারোর বন্দোবস্ত করার পাঁয়তারা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন। নাহিদ বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিকে সব ধরনের আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত করে স্বাধীন ও সার্বভৌমভাবে পরিচালনা করাই আমাদের লক্ষ্য। বাংলাদেশকে বারবার বিভাজিত করা হয়েছে, জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করা হয়েছে বাংলাদেশকে দুর্বল করে রাখার লক্ষ্যে।’ তিনি আরও লেখেন, ‘আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পর থেকে আবারও দিল্লি থেকে ছক আঁকা হচ্ছে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করার, দেশকে বিভাজিত করার। গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করে আরেকটি এক-এগারোর বন্দোবস্ত করার পাঁয়তারা চলছে।’ এনসিপির এই নেতা ফেসবুকে লেখেন, ‘ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক, বাংলাদেশপন্থি ও ধর্মপ্রাণ ছাত্র-জনতাকে সার্বভৌমত্ব, সংস্কার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশপ্রেমিক সেনা অফিসার ও সৈনিকদের সার্বভৌমত্ব ও বাংলাদেশ রক্ষায় প্রস্তুত থাকতে হবে।’ তিনি লেখেন, ‘অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জনগণকে দেওয়া সংস্কার, বিচার ও ভোটাধিকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। উনাকে দায়িত্বে থেকেই রাজনৈতিকভাবে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। জুলাই ঘোষণাপত্র নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই দিতে হবে। ঘোষিত টাইমফ্রেমের মধ্যেই নির্বাচন হবে। নির্বাচনের আগে মৌলিক সংস্কারের জুলাই সনদ রচিত হবে। নির্বাচনের আগে জুলাই গণহত্যার বিচার দৃশ্যমান হবে এবং বিচারের রোডম্যাপ আসতে হবে। নতুন সংবিধানের জন্য গণপরিষদ ও আইনসভার নির্বাচন একই সঙ্গে দিতে হবে।’ এদিকে সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডির একটি হোটেলে এনসিপির যুব উইং জাতীয় যুবশক্তির সারা দেশের সংগঠকদের নিয়ে পরিচিতি ও সাধারণ সভায় নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা চলছে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জুলাই ঘোষণাপত্রের দাবি বাস্তবায়নে যুবসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নের পথে যত বড় শক্তিই বাধা হয়ে দাঁড়াক, আমরা তার মোকাবিলা করব। জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র শহীদ ও আহতদের উপহার হিসেবে দিতে যুবশক্তিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান নাহিদ।
আরেকটি এক-এগারোর বন্দোবস্ত করার পাঁয়তারা চলছে
ফরহাদ মজহার / পদত্যাগ করা হবে ড. ইউনূসের ব্যর্থতা, আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করে ‘ভুল করেছেন’ মন্তব্য করে কবি ও রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার বলেছেন, ‘পদত্যাগ করা হবে ড. ইউনূসের ব্যর্থতা, তার জন্য আত্মঘাতী। কোনো ব্যক্তি বা দল নয়, তার উচিত জনগণের ঐতিহাসিক অভিপ্রায়কে সম্মান করা, কোনো দল বা গোষ্ঠীর চাপে বিভ্রান্ত না হয়ে জনগণের ওপর আস্থা রাখা।’ গতকাল শুক্রবার ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এমন মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নয়, রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ড. ইউনূসকে নির্বাচিত করেছে বলে পোস্টে মন্তব্য করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘তাকে (ড. ইউনূস) অবশ্যই খুনিদের বিচার করতে হবে, নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়নের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে, খোলাবাজার ব্যবস্থার জবরদস্তি দ্বারা বৈশ্বিক করপোরেট দখলদারি কায়েমের বিপরীতে গণবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং কার্যকর করতে হবে, সর্বোপরি দিল্লি, মিয়ানমারসহ শত্রু দেশের বিরুদ্ধে লড়ে জেতার ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করতে হবে; কারণ রোহিঙ্গাদের তাদের নিজের দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং তাদের পুনর্বাসনের হিম্মত বাংলাদেশকেই অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশের সৈনিকরা এ দেশের সন্তান, বাংলাদেশের জনগণের সামষ্টিক ইচ্ছা বা অভিপ্রায়ের সঙ্গে তারা অঙ্গাঙ্গি জড়িত। জনগণের স্বার্থ তাদেরও স্বার্থ। কারণ, তারাও জনগণের অংশ—আমরা কেউই মঙ্গলগ্রহ থেকে আসিনি।’ ফরহাদ মজহার বলেন, ‘এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য জনগণ চায় প্রধান উপদেষ্টা ও বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ড. ইউনূসের ভুল বোঝাবুঝির অবসান হোক। নির্বাচন অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব হতে হবে, কিন্তু কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রে সেনাপ্রধান তার এখতিয়ারের বাইরে নির্বাচন নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণিকে আবার ক্ষমতায় বসানোর যুক্তি। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী জনগণ তা মেনে নেবে না। দেশকে বিভিন্ন শক্তির ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতার ময়দান ও গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার দায় তখন সেনাপ্রধানের ওপর বর্তাবে।’
পদত্যাগ করা হবে ড. ইউনূসের ব্যর্থতা, আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
সালাহউদ্দিন আহমেদ / আবেগের বশে পদত্যাগ করলে বিকল্প বেছে নেবে জাতি
বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পদত্যাগ চায় না বলে জানিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তবে ড. ইউনূস আবেগের বশবর্তী হয়ে পদত্যাগ করলে জাতি নতুন বিকল্প বেছে নেবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল শুক্রবার সালাহউদ্দিন কালবেলাকে এ কথা বলেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিএনপি ড. ইউনূসের পদত্যাগ চায় না। বিএনপি চায় নির্বাচনী সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে সংস্কারের কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। তবুও তিনি কোনো কারণে আবেগের বশবর্তী হয়ে পদত্যাগ করলে জাতি নতুন বিকল্প বেছে নেবে।’ সালাহউদ্দিন বলেন, ড. ইউনূসের পদত্যাগে কোনো শূন্যতা তৈরি হবে না। তবে বিএনপি চায় সম্মানের সঙ্গে ড. ইউনূস থাকুন এবং নির্বাচনী রোডম্যাপ দিয়ে জাতিকে সংকট থেকে মুক্ত করুন। নির্বাচনী রোডম্যাপই বর্তমান সংকট সমাধানের একমাত্র পথ। সংস্কার দেড়-দুই মাসের মধ্যে করা সম্ভব মন্তব্য করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন একসঙ্গে চলতে পারে। নির্বাচন আয়োজনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি, বরং উনারা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, বিএনপি গত ১৯ মে থেকে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাতের চেষ্টা করেও পায়নি। সরকারের ভেতরের আওয়ামী দোসর এবং উচ্চাভিলাষী কেউ কেউ বিএনপিকে প্রতিপক্ষ ভাবে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা সারজিস আলম বলেছেন, বিএনপির আন্দোলনের চাপে ড. ইউনূস পদত্যাগ করতে চেয়েছেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সালাহউদ্দিন বলেন, বিএনপি ড. ইউনূসের পদত্যাগের জন্য আন্দোলন করেনি। মেয়র হিসেবে রায় পাওয়ার পরও ইশরাককে কেন শপথ পড়ানো হচ্ছে না, সেই কারণে ঢাকাবাসী আন্দোলন করেছে। এ বিষয়টি অন্য দৃষ্টিতে নেওয়ার কিছু নেই। রাস্তায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির জনগণকে নামতে হলো কেন?
আবেগের বশে পদত্যাগ করলে বিকল্প বেছে নেবে জাতি
সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে বিএনপি
সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে বিএনপি
চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন দাবিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে বিএনপি। দলটির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, রাজপথে গত এক সপ্তাহে বিএনপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতি সরকারকে একটি বার্তা মাত্র। নির্বাচন নিয়ে কোনো টালবাহানা হলে আগামী দিনে যে কোনো সময় একই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। বিএনপি চায় না, সেই ধরনের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হোক। দলটির নেতারা বলেছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বেই আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে বলে এখনো প্রত্যাশা করেন তারা। তারা এ-ও মনে করেন, বিদ্যমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে নির্বাচন, সংস্কার এবং আওয়ামী লীগের বিচার ইস্যুতে সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাবে। তবে তারা বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ নির্বাচন না হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি সমর্থন ধরে রাখা বিএনপির জন্য কঠিন হবে। নির্বাচন নিয়ে এটিও সরকারের প্রতি বিএনপির এক ধরনের বার্তা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের যৌক্তিকতার বিষয়টি বর্তমানে যেভাবে বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরছে, আগামী আরও বেশ কিছুদিন ঠিক একইভাবে তা অব্যাহত রেখে সরকারের ওপর চাপ বজায় রাখবে। জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের যৌথ উদ্যোগে বর্তমানে বিভাগীয় শহরে তারুণ্যের সমাবেশ চলছে। আগামী ২৮ মে ঢাকায় বিভাগীয় তারুণ্যের সমাবেশ থেকে জাতীয় নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণের দাবিতে বিএনপির অবস্থান আরও স্পষ্ট করা হবে। এ ছাড়া ঈদুল আজহার পর দলটির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিও থাকবে। সেখান থেকেও নির্বাচনের জোরালো দাবি তুলে ধরা হবে। বিএনপি নেতারা বলছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। এটা ক্রমেই বাড়বে। অবশ্য দলটি মনে করছে, আগামী জুলাই নাগাদ সরকারের তরফ থেকে নির্বাচনের দিনক্ষণের বিষয়টি স্পষ্ট করা হতে পারে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান গত বুধবার ঢাকা সেনানিবাসের সেনা প্রাঙ্গণে অফিসার্স অ্যাড্রেসে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত বলে নিজের মতামত জানান। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার অবস্থান আগের মতোই। দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের অধিকার একটি নির্বাচিত সরকারেরই রয়েছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধান তার যে অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন, সেটিকে যৌক্তিক বলছে বিএনপি। সরকার এটিও আমলে নেবে বলে মনে করে দলটি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বৃহস্পতিবার এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি। এই জনআকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়াটাই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান এজেন্ডা হওয়া উচিত বলে জনগণ মনে করে। এর অন্যথা হলে জনগণের দল হিসেবে বিএনপির পক্ষে এই সরকারের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। গত সপ্তাহে অন্তত দুটি ইস্যুতে বিএনপিকে হার্ডলাইনে দেখা গেছে। ঢাকার দক্ষিণে মেয়র পদে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের শপথ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে দলটির নেতাকর্মীরা। নির্বাচন নিয়ে বিএনপির যে শঙ্কা সেটিই মূলত দলটিকে হঠাৎ করে রাজপথে এমন সিদ্ধান্ত নিতে কিংবা তাদেরকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে বলে দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপি এই অবস্থান নিয়েছিল। বিএনপি মনে করে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। এমন অবস্থায় দলটির পক্ষ থেকে বার বার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের দাবি জানানো হলেও সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। একইসঙ্গে নানান ধরনের শঙ্কা, গুজব সামনে চলে আসায় সরকারকে একটি বার্তা দেওয়ার জন্য রাজপথে তাদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন করে দলটি। নেতারা বলছেন, এই সরকার ব্যর্থ হোক, সেটা তারা চান না। তারা শুরু থেকেই সরকারকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে আসছেন। তবে তাদের নির্বাচনের দিনক্ষণের দাবি বারবার উপেক্ষিত হওয়ায় রাজপথে হঠাৎ বিশাল জমায়েতে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা সরকারকে এই বার্তা দিতে চেয়েছে যে, বিএনপি চাইলে সরকারকে যে কোনো সময়ই অসহযোগিতা করতে পারে। জানা গেছে, রাজপথে এমন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা বিএনপির সিদ্ধান্ত নয়। কারণ, তারা এই সরকারকে কোনোভাবেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে চায় না। সর্বশেষ গত সোমবার অনুষ্ঠিত দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ইস্যুতে তারা কমপক্ষে আরও দুই মাস সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সময় পরে নির্বাচন নিয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো সুস্পষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা করা না হলে কিংবা নির্বাচন প্রলম্বিত করার কোনো লক্ষণ স্পষ্ট হলে তখন রাজপথের কর্মসূচির কথা ভাববে বিএনপি। এদিকে এই সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, ঐক্যের স্বার্থে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কথা ছিল। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে, কোনো কোনো মহলের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই যেন সরকারের কর্মপরিকল্পনার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি মনে করে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার নানান বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড সরকারের নির্দলীয়-নিরপেক্ষ পরিচিতিকে যেমন ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে, তেমনি সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাই সরকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের পদত্যাগের দাবি তুলেছে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, দেশে বিদ্যমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে শিগগির সর্বদলীয় বৈঠক ডাকতে পারেন প্রধান উপদেষ্টা। এমনটা না হলে বিএনপি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারে। সেখানে এই বিষয়গুলো তারা সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে। একই সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে দলের ‘ক্লিয়ার-কাট’ অবস্থানের কথাও জানাবে। বিএনপি মনে করে, আগামী নির্বাচনের জন্য ডিসেম্বর একটি কাটঅফ টাইম। দলটি এই ব্যাপারে এখন আরও বেশি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিএনপি মনে করে, অন্তর্বর্তীকালীন অস্থায়ী সরকারের একমাত্র ম্যান্ডেট হচ্ছে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। কিন্তু সরকারকে এই দায়িত্ব থেকে অন্যদিকে ডাইভার্ট করতে সরকারের ভেতরেরই কোনো কোনো শক্তি কিংবা ভেতরের একটি মহল কাজ করছে বলে মনে করে দলটি। বিএনপি এও মনে করছে, নির্বাচন বিলম্বিত করতে অথবা দেশকে গণতন্ত্রে উত্তোরণের পথ ঠেকিয়ে রাখতে কিংবা নতুন কোনো রাজনৈতিক ‘খায়েশ’ পূরণের জন্য যদি সরকার বিকল্প চিন্তা করে থাকে, সেটা বিপদ ডেকে আনবে।
বড় হচ্ছে দেশীয় খেলনার বাজার
বড় হচ্ছে দেশীয় খেলনার বাজার
বাংলাদেশের দেশীয় খেলনা শিল্প এখন আর শুধু শিশুর বিনোদনের খাত নয়, এটি রূপ নিয়েছে একটি সম্ভাবনাময় শিল্প খাতে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে যেমন দেশীয় খেলনার চাহিদা বাড়ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশি খেলনার জন্য তৈরি হচ্ছে বিস্তৃত সুযোগ। একসময় দেশের খেলনার বাজারে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও দৃশ্যপট বদলেছে। আনুমানিক ৭ হাজার কোটি টাকার বাজারের মধ্যে দেশীয় নির্মাতাদের দখলে রয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকার বাজার। রাজধানী ঢাকার আশপাশে গড়ে ওঠা ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৪৭টি কারখানা এখন দেশের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করছে। এর মধ্যে অধিকাংশই কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, ইসলামবাগ, চকবাজার, গাজীপুর, কেরানীগঞ্জ, পুরান ঢাকা, ইপিজেড ও ইজেড এলাকায়। বর্তমানে দেশেই এক হাজারেরও বেশি ধরনের খেলনা উৎপাদন হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে— শিক্ষামূলক খেলনা, প্রাণীর রঙিন মডেল, প্যাডেল কার, ট্রাইসাইকেল, রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি, বৈদ্যুতিক পুতুল, প্লাস্টিক দোলনা ও দেয়াল। নতুন সংযোজিত খেলনার মধ্যে রয়েছে—কিবোর্ড, গিটার, ড্রামস, মিনি গাড়ি, অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রতিরূপ। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৩ সালে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ যখন খেলনা উৎপাদনে আসে, তখন এ খাতের পেশাদারিত্বে নতুন ধারা সূচিত হয়। তাদের ‘প্লেটাইম’ ব্র্যান্ডের আওতায় এখন পাওয়া যায় শতাধিক ধরনের শিক্ষামূলক খেলনা, যেমন—পাজল, বর্ণমালা বোর্ড, গাণিতিক গেমস। আর ‘জিম অ্যান্ড জলি’ ব্র্যান্ডের অধীনে তৈরি হচ্ছে বিগ টয় ক্যাটাগরির পণ্য, যেমন—বেবি ওয়াকার, রাইডিং কার, স্লাইডার ও ট্রাইসাইকেল। আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় খেলনা: বর্তমানে বাংলাদেশের খেলনা রপ্তানি হচ্ছে ভারতের সেভেন সিস্টার্স, নেপাল, ভুটান ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সিঙ্গাপুর, স্পেন, ইতালি, ফ্রান্সসহ ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত দেশে। ভবিষ্যতে লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাজারেও প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশি খেলনার মান, নিরাপত্তা ও মূল্য সংযোজনের দিকটি ক্রমেই উন্নত হওয়ায় ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে এর চাহিদা বেড়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, চাহিদা আরও বাড়ানো সম্ভব, যদি সরকার রপ্তানি প্রণোদনা, কাঁচামালে শুল্ক ছাড় ও মান নিয়ন্ত্রণে সহায়তা দেয়। চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা: যদিও খেলনা শিল্পের সম্ভাবনা বিশাল, তবুও উদ্যোক্তাদের সামনে রয়েছে কিছু প্রতিবন্ধকতা। কাঁচামাল আমদানিতে প্রায় ৩৭ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া আধুনিক ছাঁচ নির্মাণ প্রযুক্তি, নিরাপত্তা পরীক্ষার সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে খেলনা সনদায়নের সুযোগ এখনো সীমিত। শিল্প মালিকরা বলছেন, খেলনা শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস, বিশ্বমানের প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা এবং গার্মেন্টস শিল্পের মতো সুবিধা প্রদান জরুরি। উদ্যোক্তারা বলছেন, খেলনা শিল্পকে আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের উপযোগী করতে হলে সরকারকে সহজ শর্তে ঋণ, অবকাঠামোগত সহায়তা এবং কার্যকর নীতিমালার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে পেট্রোকেমিক্যাল, সাইক্লিং, অটোমোবাইল ও ইলেকট্রনিকস শিল্পে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়বে, যা এই খাতের সম্ভাবনাকে আরও প্রসারিত করবে। তবে গার্মেন্টস খাতের মতো সুবিধা এখনো প্লাস্টিক খেলনা শিল্প পাচ্ছে না। শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য সহায়ক নীতি ও সরকারি সহায়তা অপরিহার্য বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা: দেশীয় খেলনার বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তারা শুধু ঐতিহ্যবাহী খেলনা তৈরি করছেন না, বরং সেগুলোকে আধুনিক নকশা এবং ধারণার সঙ্গে মিশিয়ে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করছেন, যা শহুরে ক্রেতাদেরও আকৃষ্ট করছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দারাজ, ইভ্যালির মতো ই-কমার্স ওয়েবসাইটগুলো দেশীয় খেলনার প্রচার ও বিক্রির জন্য শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে উৎপাদকরা সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছতে পারছেন, যা তাদের পণ্য বিপণন এবং বাজার সম্প্রসারণে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। অনেক উদ্যোক্তা বিদেশি খেলনার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য তাদের পণ্যের গুণগত মান বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। রঙের স্থায়িত্ব, কারুকার্যের সূক্ষ্মতা এবং উপকরণের দৃঢ়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। সোহান টয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলী কালবেলাকে বলেন, দেশীয় খেলনার বাজার ক্রমশ বড় হচ্ছে এবং এর ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনা এই শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। স্থানীয় বাজার ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশীয় খেলনার প্রচার ও প্রসারে নজর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ এবং অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করে বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগলাইন ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে। এই শিল্পকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অন্তর্ভুক্ত করে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। সহজ শর্তে ঋণ, কর মওকুফ এবং অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এই খাতের উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা উচিত।’ ছোট খেলনার বাজারও বড় হচ্ছে: দেশের অন্যান্য খেলনার পাশাপাশি ছোট খেলনার বাজারও বড় হচ্ছে। এই ছোট খেলনার বাজারে এমন কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা বছরে অর্ধশত কোটি টাকার বেশি বিক্রি করে। এগুলো গত এক দশকে ছোট কারখানা থেকে বড় শিল্পকারখানায় রূপ নিয়েছে। দেশে এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে এ আর প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ, আলিফ এন্টারপ্রাইজ, আমরোজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আজিজ প্লাস্টিক টয় ইন্ডাস্ট্রিজ, ঢাকাইয়া টয় ইন্ডাস্ট্রিজ এবং এভারেস্ট টয় ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। দেশে উৎপাদনের ফলে খেলনার দাম অনেক কমেছে গত কয়েক বছরে। কম দামে ভালো খেলনা মিলছে। আগে যা বিদেশ থেকে আনতে হতো, তা এখন দেশেই বানানো হচ্ছে। চীন থেকে ধারণা নিয়ে দেশে এসব তৈরি হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশ টয় মার্চেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক জাহিদ কালবেলাকে বলেন, দেশের খেলনা বাজারের উদ্ভব বেশিদিন হয়নি। এই বাজার বছর দশেক আগেও চীনের দখলে ছিল। যেটা এখন আমরা দেশে তৈরি করেছি। বাজারটি ভালোভাবে ধরতে পারায় দ্রুত এ খাতের বিকাশ হয়েছে। জাহিদুল হক বলেন, ‘দেশীয় খেলনা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে মোট বাজারের ৮০ শতাংশ দখল করে নিয়েছে। বিশেষ করে প্লাস্টিকের খেলনা চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদন হয়। এ ছাড়া বাইরে বিভিন্ন মেটাল, কাপড়ের বা পুরো যন্ত্র টাইপের খেলনা আমদানি হচ্ছে।’ দেশে উৎপাদনের ফলে গত কয়েক বছরে খেলনার দাম অনেক কমেছে জানিয়ে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘কম দামে ভালো খেলনা মিলছে। আগে যা বিদেশ থেকে আনতে হতো, তা এখন আমরাই বানাচ্ছি। চীন থেকে ধারণা নিয়ে দেশে এসব তৈরি হচ্ছে। একসময় দেশে এ খেলনা আমদানির প্রয়োজন থাকবে না। উল্টো দেশের এসব কোম্পানি রপ্তানি করবে বহুগুণ। খেলনা হবে দেশের আয়ের বড় উৎস। কারণ আমাদের খেলনা অনেক দেশের তুলনায় অনন্য।’ যা বলছে বিপিজিএমইএ: রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়ে গতকাল শুক্রবার শেষ হয়েছে দুই দিনের প্লাস্টিক খেলনা প্রদর্শনী মেলা। মেলাটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজিএমইএ) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ প্রকল্প। বিপিজিএমইএর সভাপতি শামিম আহমেদ বলেন, সেভেন সিস্টার্স এলাকায় পণ্য পাঠাতে হলে ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিবহনে বেশি খরচ হয়। ফলে সেখানে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি পণ্য পাঠানো ছিল অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। কিন্তু এখন যদি ঘুরপথে পণ্য পাঠাতে হয়, তাহলে রপ্তানিতে লাভ থাকবে না। ভারতে পণ্য রপ্তানি নিয়ে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নেবে এবং সেটি তারা মেনে নেবেন। সদ্য সমাপ্ত দুই দিনের প্লাস্টিক খেলনা প্রদর্শনী মেলার গুরুত্ব তুলে ধরে শামিম আহমেদ বলেন, ‘এই মেলা পেশাদার ক্রেতা ও খেলনা শিল্পের সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সোর্সিং প্ল্যাটফর্ম। পাশাপাশি এটি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে নেটওয়ার্কিং ও প্রাসঙ্গিক তথ্য বিনিময়ের সুযোগ করে দেবে। বাংলাদেশে তৈরি খেলনার রপ্তানি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ খেলনা রপ্তানির প্রবৃদ্ধি হবে ২৪ শতাংশ। সরকারের নীতিসহায়তা ও কাঁচামাল আমদানিতে কর সুবিধা পেলে দেশের খেলনা শিল্প এগিয়ে যাবে।’
আরেকটি এক-এগারোর বন্দোবস্ত করার পাঁয়তারা চলছে
নাহিদ ইসলাম / আরেকটি এক-এগারোর বন্দোবস্ত করার পাঁয়তারা চলছে
দেশকে বিভাজিত করে আরেকটি এক-এগারোর বন্দোবস্ত করার পাঁয়তারা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন। নাহিদ বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিকে সব ধরনের আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত করে স্বাধীন ও সার্বভৌমভাবে পরিচালনা করাই আমাদের লক্ষ্য। বাংলাদেশকে বারবার বিভাজিত করা হয়েছে, জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করা হয়েছে বাংলাদেশকে দুর্বল করে রাখার লক্ষ্যে।’ তিনি আরও লেখেন, ‘আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পর থেকে আবারও দিল্লি থেকে ছক আঁকা হচ্ছে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করার, দেশকে বিভাজিত করার। গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করে আরেকটি এক-এগারোর বন্দোবস্ত করার পাঁয়তারা চলছে।’ এনসিপির এই নেতা ফেসবুকে লেখেন, ‘ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক, বাংলাদেশপন্থি ও ধর্মপ্রাণ ছাত্র-জনতাকে সার্বভৌমত্ব, সংস্কার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশপ্রেমিক সেনা অফিসার ও সৈনিকদের সার্বভৌমত্ব ও বাংলাদেশ রক্ষায় প্রস্তুত থাকতে হবে।’ তিনি লেখেন, ‘অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জনগণকে দেওয়া সংস্কার, বিচার ও ভোটাধিকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। উনাকে দায়িত্বে থেকেই রাজনৈতিকভাবে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। জুলাই ঘোষণাপত্র নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই দিতে হবে। ঘোষিত টাইমফ্রেমের মধ্যেই নির্বাচন হবে। নির্বাচনের আগে মৌলিক সংস্কারের জুলাই সনদ রচিত হবে। নির্বাচনের আগে জুলাই গণহত্যার বিচার দৃশ্যমান হবে এবং বিচারের রোডম্যাপ আসতে হবে। নতুন সংবিধানের জন্য গণপরিষদ ও আইনসভার নির্বাচন একই সঙ্গে দিতে হবে।’ এদিকে সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডির একটি হোটেলে এনসিপির যুব উইং জাতীয় যুবশক্তির সারা দেশের সংগঠকদের নিয়ে পরিচিতি ও সাধারণ সভায় নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা চলছে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জুলাই ঘোষণাপত্রের দাবি বাস্তবায়নে যুবসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নের পথে যত বড় শক্তিই বাধা হয়ে দাঁড়াক, আমরা তার মোকাবিলা করব। জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র শহীদ ও আহতদের উপহার হিসেবে দিতে যুবশক্তিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান নাহিদ।
পদত্যাগ করা হবে ড. ইউনূসের ব্যর্থতা, আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
ফরহাদ মজহার / পদত্যাগ করা হবে ড. ইউনূসের ব্যর্থতা, আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করে ‘ভুল করেছেন’ মন্তব্য করে কবি ও রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার বলেছেন, ‘পদত্যাগ করা হবে ড. ইউনূসের ব্যর্থতা, তার জন্য আত্মঘাতী। কোনো ব্যক্তি বা দল নয়, তার উচিত জনগণের ঐতিহাসিক অভিপ্রায়কে সম্মান করা, কোনো দল বা গোষ্ঠীর চাপে বিভ্রান্ত না হয়ে জনগণের ওপর আস্থা রাখা।’ গতকাল শুক্রবার ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এমন মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নয়, রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ড. ইউনূসকে নির্বাচিত করেছে বলে পোস্টে মন্তব্য করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘তাকে (ড. ইউনূস) অবশ্যই খুনিদের বিচার করতে হবে, নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়নের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে, খোলাবাজার ব্যবস্থার জবরদস্তি দ্বারা বৈশ্বিক করপোরেট দখলদারি কায়েমের বিপরীতে গণবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং কার্যকর করতে হবে, সর্বোপরি দিল্লি, মিয়ানমারসহ শত্রু দেশের বিরুদ্ধে লড়ে জেতার ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করতে হবে; কারণ রোহিঙ্গাদের তাদের নিজের দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং তাদের পুনর্বাসনের হিম্মত বাংলাদেশকেই অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশের সৈনিকরা এ দেশের সন্তান, বাংলাদেশের জনগণের সামষ্টিক ইচ্ছা বা অভিপ্রায়ের সঙ্গে তারা অঙ্গাঙ্গি জড়িত। জনগণের স্বার্থ তাদেরও স্বার্থ। কারণ, তারাও জনগণের অংশ—আমরা কেউই মঙ্গলগ্রহ থেকে আসিনি।’ ফরহাদ মজহার বলেন, ‘এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য জনগণ চায় প্রধান উপদেষ্টা ও বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ড. ইউনূসের ভুল বোঝাবুঝির অবসান হোক। নির্বাচন অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব হতে হবে, কিন্তু কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রে সেনাপ্রধান তার এখতিয়ারের বাইরে নির্বাচন নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণিকে আবার ক্ষমতায় বসানোর যুক্তি। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী জনগণ তা মেনে নেবে না। দেশকে বিভিন্ন শক্তির ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতার ময়দান ও গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার দায় তখন সেনাপ্রধানের ওপর বর্তাবে।’