
বিধানসভা নির্বাচনে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুতে কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তাই পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এই অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার যাওয়ার একমাত্র উপায় হিসেবে জোট গঠনের সম্ভাবনাকে খতিয়ে দেখছে রাজনৈতিক দলগুলো।
তামিলনাড়ু রাজ্যে সরকার গঠন করতে চায় জনপ্রিয় অভিনেতা থালাপতি বিজয়য়ের দল তামিলাগা ভেট্টি কাজগম (টিভিকে)। দুই দফায় রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকারের সঙ্গে দেখা করে সরকার গঠনের ইচ্ছার কথা জানান বিজয়। তবে তিনি সরকার গঠন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
কারণ, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ম্যাজিক ফিগার’ তার কাছে নেই। যদিও কংগ্রেস প্রকাশ্যেই বিজয়ের দলকে সমর্থন জানিয়েছে। তারপরও সরকার গড়তে গেলে যে আসন সংখ্যার প্রয়োজন, তার থেকে কয়েকটা কম রয়েছে। সূত্র মতে, টিভিকের কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহপ্রকাশ করেছেন রাজ্যপাল রাজেন্দ্র।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, রাজ্যপাল আরলেকারের কাছে কংগ্রেসসহ ১১২ জন সমর্থক বিধায়কের তালিকা জমা দেওয়া সত্ত্বেও তিনি এখনও বিজয়কে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানাননি। রাজ্যপালের সঙ্গে দুবার দেখা করা সত্ত্বেও বিজয়কে তামিলনাড়ু সরকার গঠনের আমন্ত্রণ না জানানোয় টিভিকে কর্মীরা লোকভবনের বাইরে বিক্ষোভ করেছেন।
ডিএমকে, ভিসিকে, সিপিআই ও সিপিআই(এম) নেতারা রাজ্যপালকে একক বৃহত্তম দলনেতা হিসেবে বিজয়কে আমন্ত্রণ জানাতে এবং আস্থা ভোটের অনুমতি দিতে বলেছেন। অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এআইএডিএমকের সমর্থন নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।
২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় টিভিকে ১০৮টি আসন জিতেছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে তাদের আরও ১০টি আসন প্রয়োজন। বিধানসভা নির্বাচনে জেতা দুটি আসনের মধ্যে একটি থেকে বিজয় সরে দাঁড়ানোয় বিধানসভায় টিভিকের কার্যকর আসন সংখ্যা হবে ১০৭। কংগ্রেসের সমর্থন পেয়ে বিজয়ের পক্ষে থাকছেন ১১৩ সাংসদ।
কিন্তু সরকার গঠনের জন্য দরকার আরও পাঁচ সাংসদের সমর্থন। এ অবস্থায় জোটসঙ্গীর খোঁজে সিপিআই, সিপিএম ও ভিসিকের মতো দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বিজয়। এই দলগুলোর সমর্থন পেয়ে গেলে টিভিকে সরকার গঠনের জন্য মোট ১১৯ বিধায়কের সমর্থন পেয়ে যাবে।
এ ছাড়া বিরোধী ডিএমকে ও এআইএডিএমকে জোট করতে হলেও সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় আসন তাদের হাতে নেই। নির্বাচনে ডিএমকে ৫৯টি আসন এবং এআইএডিএমকে পেয়েছে ৪৭টি। তামিলনাড়ু বিধানসভায় ১১৮ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে এই দুই দলকে একসঙ্গেও ছোট দলগুলোর সমর্থনের প্রয়োজন হবে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের কাছে আসা তথ্যের বরাতে জানিয়েছে, বিজয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য দুই মাস সময় চেয়েছেন। বিজয় বৃহস্পতিবার (৭ মে) ভোরে দ্বিতীয় বারের মতো লোকভবনে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করেন।
এদিন তামিলনাড়ু কংগ্রেস কমিটি রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আরলেকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেছে যে, সরকার লোকভবনের লনে নয়, বরং বিধানসভায় নির্ধারিত হয়।
একটি খোলা চিঠিতে দলের বিধায়ক রাজেশকুমার, টিভিকেকে সমর্থন করার কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে লিখেছেন, ‘তামিলনাড়ুর জনগণের কল্যাণ ও রাজ্যের শান্তির কথা বিবেচনা করে, সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা অপরিহার্য। এই ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মাথায় রেখেই সমর্থনের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
আরলেকারের জেদের কারণে বৃহস্পতিবার বা শুক্রবারের মধ্যে দ্রুত শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের টিভিকের পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। এই অনুষ্ঠানে বিজয় ও তার তিন-চারজন প্রবীণ সহকর্মী শপথ নেওয়ার পর বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য দুই সপ্তাহ সময় চাইতেন।
বুধবার কংগ্রেস রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের জন্য টিভিকেকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে এবং তামিলনাড়ুতে ডিএমকের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের জোট ভেঙে দিয়েছে। তবে, সরকার গঠনের জন্য এটি যথেষ্ট নয়, কারণ কংগ্রেসের মাত্র পাঁচজন বিধায়ক রয়েছেন।
এদিকে প্রয়োজনীয় সংখ্যা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা জোরদার করতে টিভিকে তাদের বিধায়কদের মামাল্লাপুরমের একটি ব্যক্তিগত বিলাসবহুল রিসোর্টে সরিয়ে নিয়েছে। ৫০ জনেরও বেশি বিধায়ক বর্তমানে পুঞ্জেরির একটি হোটেলে অবস্থান করছেন এবং আরও অনেকের আসার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
টিএনসিসি প্রধান কে সেলভাপেরুনথাগাইসহ কংগ্রেস নেতারাও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে প্রবীণ নেতা কেসি ভেনুগোপাল নিশ্চিত করেছেন যে, বিজয় সমর্থনের জন্য যোগাযোগ করেছেন, যা রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে।
বিজয়ের টিভিকের সঙ্গে জোট করার কংগ্রেসের অবস্থানকে সমর্থন করে সাংসদ ক্রিস্টোফার তিলক বলেছেন, যেহেতু বিজয় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে সম্পূর্ণ বিশ্বাসী, তাই তার দল টিভিকেকে সরকার গঠনে সমর্থন করেছে। সাম্প্রতিক রাজ্যসভা নির্বাচনে ডিএমকের সমর্থনে তিলক সাংসদ হয়েছেন। তিলক বলেন, এখন টিভিকের ঘোষণা করার সময় এসেছে যে তারা ‘হিন্দুত্ববাদী শক্তির’ সঙ্গে জোট করবে না।
সংবাদমাধ্যম এএনআই সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, বিজয় বিজেপির সমর্থন চাইতে আগ্রহী ছিলেন না এবং রাজ্যপালের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি নীলাঙ্কারাইয়ে তার বাসভবনে দলের সিনিয়র নেতা ও আইনি উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শ করেন।
সূত্রটি আরও জানায়, দলের শীর্ষ নেতারা সরকার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য টিভিকেকে পরামর্শ দিয়েছেন। টিভিকের কিছু নেতা পুননির্বাচনে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন।
এদিকে ভিসিকে নেতা থোল থিরুমাভালাভান বলেছেন যে, তার দল টিভিকের কাছ থেকে সমর্থনের জন্য একটি অনুরোধ পেয়েছে। বিজয়ের নেতৃত্বাধীন দলকে সরকার গঠনে সমর্থন করা হবে কি না, সে বিষয়ে তার দলের উচ্চ স্তরের কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে।



