
ভারতের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থানে তারা ছিলেন অটল, অদম্য আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। বছরের পর বছর ধরে নিজেদের রাজনৈতিক দুর্গকে আগলে রেখেছিলেন নিপুণ দক্ষতায়। কিন্তু সোমবারের (৪ মে) ভাগ্যলিপি ছিল ভিন্ন। ভাগ্যের লড়াইয়ে পরাজিত হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এমকে স্ট্যালিন। নিজেদের চেনা আঙিনাতেই তারা আজ পর্যুদস্ত; রাজনৈতিক দুর্গগুলোও যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যে দলগুলো একসময় দাপটের সঙ্গে রাজ্য শাসন করত, আজ তারা পরিণত হয়েছে প্রান্তিক শক্তিতে।
বিরোধী শিবিরের এই দুই নেতার ভবিষ্যৎ তাহলে কী হতে যাচ্ছে? ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয়যাত্রার পথে যে আঞ্চলিক বাধাগুলো সব থেকে শক্তিশালী ছিল, তাদের গর্জন কি তাহলে চিরতরে শেষ হতে চলেছে? উত্তরটি বোধহয় এত সহজ নয়। কারণ হারের ক্ষত নিয়েও দুজনে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা সহজে ময়দান ছাড়ছেন না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির এই জয়কে সরাসরি ‘অনৈতিক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন; করেছেন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। অন্যদিকে, এমকে স্ট্যালিন হারের গ্লানি মেনে নিয়েও জেদ ধরে রেখেছেন। তার মতে, ডিএমকে-এর এখানে শেষ নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়ের সূচনামাত্র।
তবে বাস্তবতা বড় কঠিন। ৭১ বছর বয়সি মমতা আর ৭৩ বছর বয়সি স্ট্যালিনের জন্য এই পরাজয় কেবল একটি ধাক্কা নয়; বরং সময়ের এক নিষ্ঠুর সংকেত। বার্ধক্যের ছায়ায় ‘অস্তগামী সূর্যের পেছনে ছোটার’ এই লড়াই তাদের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মমতার লড়াই কি ফুরিয়ে এলো?
গত ১৫ বছর ধরে বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির সর্বাত্মক শক্তি এবং তাদের কথিত সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদকে রুখে দিয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজেপির সেই নিরলস এবং আক্রমণাত্মক প্রচারণার কাছে শেষমেশ নতিস্বীকার করতে হলো ঘাসফুল মার্কার তৃণমূল কংগ্রেসকে।
লড়াইটা মমতা দিদির জন্য কখনোই সহজ ছিল না। ২০১৪, ২০১৯ ও ২০২৪-এর লোকসভা এবং ২০১৬ ও ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তিনি প্রতিবারই জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই ব্যবধান কমে আসছিল। যে বিজেপি ২০১৬ সালে মাত্র ৩টি আসন পেয়েছিল, ২০১৯-এ তা ৭৭-এ পৌঁছায়। ২০২৬ সালে এসে তারা ২০৬টি আসন নিয়ে বাংলার মসনদে ক্ষমতায়।
ফলাফল আসার পরই মমতা তার চিরাচরিত লড়াকু মেজাজে ফেটে পড়েছেন। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি অভিযোগ করেছেন, বিজেপি ১০০ এর বেশি আসন লুট করেছে। তার দাবি, নির্বাচন কমিশন এখন বিজেপির কমিশনে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, আগামী দিনে মমতার রাজনৈতিক কৌশল কী হবে? পরাজয়ের এই গ্লানিকে তিনি এখন বৈধতার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করছেন। ভোটার তালিকা সংশোধন এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের বদলিকে তিনি গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, তিনি আবারও তার পুরোনো ‘বাংলা বনাম বহিরাগত’ খেলাটি খেলবেন। এই খেলায় তিনি নিজেকে বাংলার একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরবেন।
তবে পর্দার আড়ালে এখন অনেক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে তৃণমূলকে। প্রার্থী বাছাইয়ের ভুল থেকে শুরু করে প্রচারের ত্রুটি কিংবা সুশাসনের অভাব—সবকিছুই এখন দেখভাল করা হবে। মমতার সামনে এখন সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের ঘর সামলানো; অর্থাৎ দলের ভেতরে যাতে কোনো ভাঙন বা পদত্যাগের হিড়িক না পড়ে, সেদিকে কড়া নজর রাখা।
সব ছাপিয়ে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে তা হলো—সরকারি ক্ষমতা এবং মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার ছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক কতটা কার্যকর হতে পারবেন? তিনি নিঃসন্দেহে দেশের অন্যতম সেরা রাজপথের যোদ্ধা, কিন্তু ক্ষমতা ছাড়া কি তিনি আগের মতোই শক্তিশালী থাকবেন? এই হাজারো কঠিন প্রশ্নের উত্তর এখন মমতাকে খুঁজে বের করতে হবে।
স্ট্যালিনের দুর্গে বিজয়ের হানা, ফিরতে কি পারবেন?
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এমকে স্ট্যালিন মানে ছিল এক অপরাজেয় শক্তি। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বঞ্চনার অভিযোগে তিনি ছিলেন সদা সরব। গত সাত বছরে তিনটি বড় নির্বাচনে (২০১৯ ও ২০২৪ লোকসভা এবং ২০২১ বিধানসভা) স্ট্যালিনের ডিএমকে যে আধিপত্য দেখিয়েছিল, তা ছিল এককথায় অভাবনীয়। জোটের রাজনীতি বজায় রাখলেও তামিলদের ওপর ডিএমকের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রশ্নাতীত। ১৬১টি আসন কিংবা লোকসভার ৩৯টির মধ্যে ৩৯টিই জিতে নেওয়া—এমন রেকর্ডের পর গত সোমবারের পরাজয় যেন এক বিশাল ‘বিনা মেঘে বজ্রপাতের’ মতো।
সবথেকে বড় আশ্চর্যের বিষয় হলো, মমতার জনপ্রিয়তায় যেমন ধাপে ধাপে ভাটা পড়ার লক্ষণ ছিল, স্ট্যালিনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো পূর্বাভাসই ছিল না। এটি ছিল এক সরাসরি এবং অতর্কিত পরাজয়। অভিনেতা বিজয়ের দল তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) ১০৮টি আসন জিতে যে অভিষেক ঘটাল, তার পেছনে ছিল বিজয়ের সুপারস্টার ইমেজ এবং একটি তরুণ প্রশাসনের স্বপ্ন।
সিনেমার প্রতি তামিলদের যে আবেগ, তাকে ঢাল বানিয়ে বিজয়ের তৈরি করা নতুন এক অবস্থান ডিএমকের দীর্ঘদিনের সাজানো সমীকরণকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে।
তবে স্ট্যালিন কি এখানেই শেষ? ভারতের রাজনীতিতে তাকে ‘ম্যান অব স্টিল’ বলা হয়, তা এমনি এমনি নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তিনিও এখন সম্ভবত এক নতুন কৌশলে অবতীর্ণ হবেন। নিজেকে এবং নিজের দল ডিএমকে-কে তিনি তুলে ধরবেন নতুন রূপে। তামিলদের অস্তিত্বের মূলে থাকা এই ‘দ্রাবিড় আবেগ’ যুগে যুগে দিল্লি বা এর বাইরের সব শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।
বিজয় নির্বাচনে জিতলেও তিনি দ্রাবিড় আদর্শকে ছুড়ে ফেলেননি। বরং সিএন আন্নাদুরাই, এমজি রামচন্দ্রন কিংবা ইভি পেরিয়ার রামাস্বামীর আদর্শকে পুনরুদ্ধারের ডাক দিয়েই তিনি মানুষের মন জয় করেছেন। অর্থাৎ, তামিলনাড়ুর রাজনীতির ডিএমকে-এআইএডিএমকে মেরুকরণ ভাঙলেও ‘দ্রাবিড় মেরুদণ্ড’ কিন্তু ঠিকই রয়ে গেছে।
মমতা ও স্ট্যালিনের লড়াইয়ের ধরনে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। মমতার প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু অধিকারী এক পরিচিত মুখ, কিন্তু স্ট্যালিনকে লড়তে হচ্ছে এমন এক শক্তির বিরুদ্ধে যারা আগে কখনও ক্ষমতা ভোগ করেনি এবং এমন এক নেতার বিরুদ্ধে যিনি আগে কখনও জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। বিজয় এবং তার দল যে দীর্ঘস্থায়ী ইনিংস খেলতে এসেছেন, তা মেনে নিয়ে স্ট্যালিনকে এখন নতুন করে ছক সাজাতে হবে।
মমতা-স্ট্যালিনের একই হার
ভবানীপুরে মমতা আর কোলথুরে সট্যালিনের সবথেকে বড় ক্ষতটি সম্ভবত ব্যক্তিগত পরাজয়ের। মমতা যেমন ভবানীপুরে তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরেছেন, স্ট্যালিনও তেমনি তার নিজস্ব দুর্গ কোলথুরে পরাজিত হয়েছেন ভিএস বাবুর কাছে। এই ভিএস বাবুই ২০১১ সালে স্ট্যালিনের জয়ের মূল কারিগর ছিলেন, যাকে পরে দল থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। সেই পুরোনো ছায়ার কাছেই আজ স্ট্যালিন ধরাশায়ী।
একই সঙ্গে জাতীয় প্রেক্ষাপটে বিজেপির অবস্থানও বদলে গেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতনের ফলে পূর্ব ভারতে বিজেপির রাজত্ব এখন প্রায় নিষ্কণ্টক, একমাত্র ঝাড়খণ্ড বাদে। তবে দক্ষিণ ভারত এখনও বিজেপির কাছে এক অমীমাংসিত রহস্য। কেরালা ও তামিলনাড়ুতে তারা পর্যুদস্ত হলেও কেরালায় ৩টি আসন এবং তামিলনাড়ুতে মিত্রদল এআইএডিএমকে-এর ভালো ফলকে তারা প্রাপ্তি হিসেবে দেখছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-এর নির্বাচনী চক্রের প্রথম ভাগটি বিজেপির মতো একটি সুসংগঠিত নির্বাচনি মেশিনের জন্য অভাবনীয় সাফল্য বয়ে আনলেও, স্ট্যালিনের মতো ঝানু খেলোয়াড়ের জন্য এটি বড় এক অগ্নিপরীক্ষা। সট্যালিন কি পারবেন এই ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠতে? উত্তরটি এখন সময়ের হাতে।
লেখক: এনডিটিভির সিনিয়র এডিটর
এনডিটিভির মতামত বিভাগ থেকে অনূদিত



