
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি। বাংলাদেশ সময় সোমবার (৪ মে) দুপুর ১২টা পর্যন্ত গণনা করা ভোটের হিসাবে, ১৯৫টি আসনে এগিয়ে আছে বিজেপি। আর দীর্ঘদিন রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে আছে ৯৫টি আসনে। বিজেপির ব্যাপক সাফল্য শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণই বদলে দেবে না। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে বিজেপির প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাংলাদেশ থেকে কথিত অনুপ্রবেশ। দলটির দাবি, বেশিরভাগ অনুপ্রবেশকারী মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ ও দিনাজপুরের মতো জেলাগুলো দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। সীমান্ত পার হয়ে তারা গুরুগ্রাম, দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরুর মতো বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।
২০১৮ সালে বিজেপির তৎকালীন সভাপতি অমিত শাহ রাজস্থানের এক জনসভায় কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ‘উইপোকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার দাবি, ভারতের ভোটার তালিকায় বাংলাদেশিরা ঢুকে পড়ছেন। তাই খুঁজে খুঁজে ভোটার তালিকা উইপোকামুক্ত করা হবে। আসামে ইতিমধ্যেই এমন ৪০ লাখ ‘উইপোকা’ চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিজেপি নেতাদের এমন বাগাড়ম্বর নতুন মাত্রা পায় গত বছর মুম্বাইয়ে বলিউড অভিনেতা সাইফ আলি খান ছুরিকাহত হওয়ার ঘটনায়। ওই ঘটনায় হামলাকারী শরিফুল ইসলাম শেহজাদ (৩০) অনুপ্রবেশকারী হওয়ায় বিষয়টিকে লুফে নেয় ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদীরা। এটিকে হাতিয়ার করে আরও জোরদার করা হয় বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা।
জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বিষয়টিও দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তির জন্ম দেয়। বাংলাদেশে ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেয় ভারত। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়। এমনকি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক ভারতীয়দের রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে পুশইনের মতো ঘটনা ঘটে। এসব ধকল কাটিয়ে না উঠতেই নতুন করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের পূর্বাভাস দিল্লিকে আরও বেপরোয়া করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের আরেক রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, তিনি সবসময়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন যাতে ভারত আর বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নতি না হয়। তার ভাষায়, ‘আমি সকালে সবসময় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, যে পরিস্থিতি ইউনুসের সময়ে ছিল, সেটাই যেন থাকে, সম্পর্কের উন্নতি যেন না হয়।’
ভারতের গণমাধ্যম এবিপিকে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ভারত থেকে রাতের অন্ধকারে কীভাবে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, বিএসএফ কি করে, কখনো ২০-৩০ বা ৪০ দিন, কখনো ১০ দিন নিজেদের কাছে রেখে দেয় (যাদের পুশইন করা হবে)। যখন বিডিআর (বিজিবি) থাকে না, সেখান দিয়ে ধাক্কা মেরে পাঠিয়ে দেয়।’
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনি প্রচারে বিজেপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও এই কথিত অনুপ্রবেশকে হাতিয়ার করেন। বিজেপি জিতলে ‘একটি পাখিও সীমান্ত পার হতে পারবে না’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তিনি। যদিও এখানে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সমন্বয়ই মূল বিষয়। কিন্তু সেটিকে এড়িয়ে গিয়ে বারবার বাংলাদেশবিরোধী বাগাড়ম্বরকে সামনে আনছেন বিজেপি নেতারা।
পশ্চিমবঙ্গে আজকের ভোট গণনার ফলাফল তাই শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই ফলাফল নির্ধারণ করবে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত নীতি কোন পথে অগ্রসর হবে? সেক্ষেত্রে বাংলাদশে কিভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।



