আপনার কি একটি ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার আছে?
উত্তরটা ‘হ্যাঁ’ হতেই পারে। তবে বেশি না, ৫০ বছর আগেও উত্তরটি ‘হ্যাঁ’ হওয়া যে কোনো সাধারণ মানুষের জন্য ছিল প্রায় অকল্পনীয় ব্যাপার। কারণ, একেকটি কম্পিউটার তখন বিশাল পরিমাণে যন্ত্রপাতি আর ডেটা সেন্টারে বোঝাই করে চালাতে হতো। আর সে জন্য রীতিমতো বড় প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ লোকজন দিয়ে চালানো ছাড়া উপায় ছিল না। এ কারণেই সে আমলে কারও কাছে কম্পিউটার থাকা আর ব্যক্তিগত এরোপ্লেন থাকা বলতে গেলে একই রকম ছিল। তারপর এলো ‘অ্যাপল’। নামটা নিশ্চয়ই শুনেছেন।
স্টিভ জবস আর স্টিভ ওজনিয়াক। ’কলেজ ড্রপআউট’ দুই ’স্টিভ’ মিলে শুরু করলেন ‘অ্যাপল’। সময়টা, ১৯৭৬ সালের পয়লা এপ্রিল। তারা দেখলেন, বিশাল বিশাল যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে গড়া কম্পিউটার মানুষজন আলাদা আলাদা যন্ত্রাংশ কিনে জোড়াতালি দেওয়ার ‘ঝামেলা’ পোহাতে চান না। তারা চান পুরোপুরি ফিটফাট করা একটা মেশিন, যেটা নিজের কাজে নিজেই ব্যবহার করা যায়। সেই ভাবনা থেকেই কাজ শুরু, অ্যাপলেরও শুরু সেখান থেকেই।
ভাবছেন, তারা কি কম্পিউটার তৈরি করেছেন? না, তবে তাদের কাজটাও জরুরি, তর্কসাপেক্ষে কম্পিউটার আবিষ্কারের চেয়েও জরুরি বলা যায়। সেটা হলো, এই বিশাল যন্ত্রাংশে বোঝাই কম্পিউটার মেশিনকে তারা ব্যক্তিগত ব্যবহারের মাপে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন। কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক টেকনোলজি হয়ে থাকা এক যন্ত্রকে তারা রূপান্তর করলেন ‘পারসোনাল টেকনোলজি’ হিসেবে। সময়ে সময়ে একের পর এক নতুন প্রযুক্তি পণ্য এনেছে অ্যাপল। শুরু থেকে এখনও এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি পণ্যই তাক লাগানো ফিচার আর ভিন্ন উপস্থাপনা নিয়ে হাজির হয়েছে ব্যবহারকারীদের কাছে।
নর্দামব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর নিক ডাল্টন অ্যাপলের পণ্য প্রথম থেকে ব্যবহার করেছেন, তিনি নিজেও একজন অ্যাপ ডেভেলপার। অ্যাপলের ৫০ বছর পূর্তির সময়ে দ্য কনভারসেশন ব্লগে তিনি অ্যাপলের বেশ কিছু পণ্য বা প্রযুক্তি নিয়ে লিখেছেন, যেগুলোকে তিনি ‘দুনিয়া বদলে দেওয়া’ প্রযুক্তির পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রঙচঙে ‘অ্যাপল ২’
১৯৭৭ সালের জুন মাস অ্যাপল ২ বাজারে আসে। এ সময় দরকারি ব্যবহারের ‘কম্পিউটার’ বস্তুটি নিয়েই মানুষের আগ্রহ ছিল বেশি। সে সময় আকর্ষণীয় প্যাকেজিংয়ে বাজারে হাজির ‘অ্যাপল ২’ তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। সঙ্গে কালার গ্রাফিকসের ব্যবহার, সহজে কাজের উপযোগী কিবোর্ড। ডিজাইনে যুগান্তকারী চমক দেওয়ার পেছনের মানুষটির নাম জেরি ম্যানোক, যিনি ছিলেন অ্যাপলের প্রথম ইন হাউজ ডিজাইনার। ওজনদার লোহালক্কড়ের স্মৃতি বিদায় করে দিয়ে ঢালাই প্লাস্টিকের কেস দিয়ে মোড়ানো হয় এই কম্পিউটার।
মাউস- যেনতেন ইঁদুর নয়!
অ্যাপল নিয়ে যাত্রা শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই স্টিভ জবস ধরতে পেয়েছিলেন, তাদের সামনে রয়েছে তুখোড় এক প্রতিদ্বন্দ্বী—আইবিএম। এমনই সময়ে ফটোকপি কোম্পানি জেরক্স অ্যাপলের প্রি-আইপিও শেয়ারের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং তাদেরকে রিসার্চ ল্যাব পরিদর্শনের প্রস্তাব দেয়। জবস বুঝতে পারেন, জেরক্সের গবেষকরা আগামী দিনের কম্পিউটারের চেহারা বদলে দেওয়া ইন্টারফেস তৈরির কাজ করে চলেছেন। এর মধ্যে একজন ছিলেন জেরক্সের পালো অ্যাল্টো রিসার্চ সেন্টারের গবেষক অ্যালান কে। তার গুরু ছিলেন ডগলাস এংগেলবার্ট, যিনি ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তৈরি করেছিলেন ‘দ্য মাউস’। সেই প্রোটোটাইপকে আধুনিক ‘পার্সোনাল কম্পিউটার’ এর সঙ্গে মাপমতো হাজির করার জন্য তখন কাজ চলছিল। ১৯৮৪ সালে বাজারে আসা ‘অ্যাপল ম্যাকিনটশ’ হাজির করে আধুনিক ‘মাউস’—যার মাধ্যমে স্ক্রলবার, বাটন, মেন্যু এবং উইন্ডোজ ইন্টার্যাকশনের সরাসরি সুবিধা পান ব্যবহারকারীরা।
বাজারে এলো ‘ম্যাক’
জবসের চাওয়া ছিল, যে কেউ যেন কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে। দলবল আর বিশাল যন্ত্রপাতির প্রয়োজনীয়তা একেবারেই বাতিল করে দেওয়ার জন্যই বোধ হয় ১৯৮৪ সালের অ্যাপল ম্যাকিনটশ বা প্রথম অ্যাপল ম্যাক এলো বাজারে! জটিল সব কম্পিউটার কমান্ড এবং ম্যানুয়াল কাজের আর কোনো রকম দরকারই থাকল না। তবে ম্যাকের এই আগমন শুধু যে নতুন এক প্রোডাক্ট বাজারে নিয়ে এলো, তা না। এই পণ্যের সঙ্গে জবস নিয়ে এলেন ‘প্রোডাক্ট লঞ্চ’ করার আইডিয়া। দেড় হাজার মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এক থিয়েটারে জবস মঞ্চে হাজির করলেন অ্যাপলের ম্যাকিনটশ, আর নিজেই করলেন দারুণ এক উপস্থাপনা।
আইম্যাক—জবস এলেন ফিরে
অ্যাপল থেকে বিভিন্ন কারণে সরে যেতেও হয়েছিল স্টিভ জবসকে। তবে ১৯৯৭ সালে তিনি আবারও ফিরে আসেন, আর সঙ্গে সঙ্গেই অসফল কিছু পণ্য বাতিল করতে থাকেন। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে ব্রিটিশ ডিজাইনার জন আইভের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘আইম্যাক মেশিন’ নিয়ে আসেন। ১৯৯৮ সালে আইম্যাক বাজারে আসে।
আইপড—পকেটে হাজারো গান
শুরুর থেকে অনেকটা সময়ে শুধু কম্পিউটার নিয়েই মগ্ন ছিল অ্যাপল। তবে ২০০১ সালে সাউন্ড এবং ভিডিও নিয়েও কাজ শুরু করে তারা। এর ফলে সে বছরের নভেম্বর মাসে বাজারে আসে ‘আইপড’। ছোট্ট একটি ডিভাইসে ধারণ করা যেত এক হাজারের মতো গান। এই মিউজিক ব্যবস্থাপনার জন্য তারা নিয়ে আসে ‘আইটিউনস’। তখন সনি ওয়াকম্যানের রমরমা যুগ। আর সে সময়েই আইপডের এক হাজার গানের ধারণক্ষমতা তাদেরকে নিয়ে যায় অন্য এক উচ্চতায়। একটি অডিও ক্যাসেটে যেখানে ২০-৩০টি গান রাখা যায়, সেখানে ছোট্ট এক ডিভাইসে হাজারো গানের ব্যবস্থা! সংগীতপ্রেমীদের আকাঙ্ক্ষিত এবং পছন্দের ডিভাইস হয়ে উঠতে তাই একেবারেই সময় লাগেনি আইপডের। সঙ্গে পোর্টেবল মিউজিকের চিরাচরিত ধারণাও বদলে দেয় এই ডিভাইস।
তুরুপের তাস—আইফোন
আইপডের জনপ্রিয়তার কারণে সমসাময়িক অনেক মোবাইল কোম্পানি আইপডকে তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করার প্রস্তাবনা দেয়। তবে ২০০৭ সালের ৯ জানুয়ারি অ্যাপল নিজেই নিয়ে আসে এমন এক ফোন, যার মধ্যে মোবাইল ফোনের সব সুবিধা, মিউজিক প্লেয়ার আর ম্যাক কম্পিউটারের ব্যবস্থা থাকবে। সেই পণ্যটির কথা সবাই জানেন—আইফোন। তখন অন্য সব হেভিওয়েট ফোনের বিপরীতে আইফোনের চমক ছিল, এতে কোনো ধরনের ফিজিক্যাল কিবোর্ড ছিল না, সঙ্গে ছিল বড় একটি স্ক্রিন। শুরুর দিকে অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, এ ফোন বাজারে চলবে না। সে মতামত যে টেকেনি, তা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা নেই!




