এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় মুহূর্তের মধ্যে চলে যাওয়া টেলিপোর্টেশন; একসময় শুধুই বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বিষয় ছিল। সিনেমা, টিভি সিরিজ বা গল্পে আমরা দেখেছি, মানুষ বা বস্তু হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে অন্য জায়গায় উপস্থিত হয়ে যায়। বাস্তবে এমন কিছু সম্ভব কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কৌতূহল ছিল সবার।
বিশেষ করে জনপ্রিয় টিভি সিরিজ স্টার ট্রেক (Star Trek) এই ধারণাটিকে মানুষের কল্পনায় আরও শক্তভাবে গেঁথে দেয়। সেখানে ‘ট্রান্সপোর্টার’ নামের একটি যন্ত্র মানুষকে মুহূর্তে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠাতে পারত। যদিও এটি মূলত কল্পনা, তবে এই ধারণাই বিজ্ঞানীদের নতুনভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত করেছে।
আজ বাস্তবে মানুষকে টেলিপোর্ট করা সম্ভব না হলেও, বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম স্তরে এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যা তথ্যকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর করতে পারে। কোনো বস্তু সরানো ছাড়াই। এই প্রযুক্তির নাম কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন।
কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো কণা বা পরমাণুর অবস্থা বা তথ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো যায়, কিন্তু কণাটি নিজে সরানো হয় না।
এই ধারণা প্রথম উঠে আসে প্রায় ৩০ বছর আগে। বিজ্ঞানীরা এমন একটি পদ্ধতি খুঁজছিলেন, যার মাধ্যমে দূরবর্তী কণার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। তারা এই পদ্ধতির নাম দেন কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন।
১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে প্রথম সফল পরীক্ষা হয়। এরপর ধীরে ধীরে দীর্ঘ দূরত্বেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার সম্ভব হয়েছে। এমনকি ২০১৭ সালে চীনের বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে মহাকাশ পর্যন্ত কোয়ান্টাম তথ্য পাঠাতে সক্ষম হন।
এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা, যাকে বলা হয় কোয়ান্টাম এনট্যাংগলমেন্ট।
এতে দুটি কণা এমনভাবে যুক্ত থাকে যে, একটির ওপর কোনো পরিবর্তন হলে অন্যটিতেও সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব পড়ে—দূরত্ব যতই হোক না কেন।
সহজভাবে বলতে গেলে
এখানে কোনো বস্তু সরানো হয় না, শুধু তথ্য স্থানান্তরিত হয়।
কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার উন্নয়ন : সাধারণ কম্পিউটার যেখানে ০ এবং ১ ব্যবহার করে, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে কিউবিট, যা একসঙ্গে একাধিক অবস্থা ধারণ করতে পারে।
জটিল সমস্যা সমাধান : রসায়ন, চিকিৎসা বা নতুন উপাদান তৈরির মতো জটিল সমস্যার সমাধান দ্রুত করা সম্ভব হতে পারে।
কোয়ান্টাম ইন্টারনেট : এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে নিরাপদ এবং দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে।
এই প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাস্তবে মানুষকে টেলিপোর্ট করা প্রায় অসম্ভব।
কারণ
তাই আপাতত মানুষকে টেলিপোর্ট করার ধারণা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
টেলিপোর্টেশন এখনো মানুষের ক্ষেত্রে বাস্তব না হলেও, কোয়ান্টাম স্তরে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি। এটি ভবিষ্যতের কম্পিউটিং, যোগাযোগ এবং বিজ্ঞান গবেষণায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সহজভাবে বললে, আমরা হয়তো কোনোদিন নিজেকে মুহূর্তে অন্য গ্রহে পাঠাতে পারব না, কিন্তু তথ্যকে আলোর গতির মতো দ্রুত পাঠানোর প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই বাস্তব হয়ে উঠছে।
এই অগ্রগতি আমাদের মহাবিশ্বকে বোঝার নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে; যেখানে বাস্তবতা অনেকটাই কল্পনার মতোই বিস্ময়কর।
সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক




