দীর্ঘ ৫৩ বছর পর চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরেছেন চার নভোচারী। পূর্বাঞ্চলীয় সময় ১০ এপ্রিল (বাংলাদেশ সময় ১১ এপ্রিল ভোরে) তাদের বহনকারী নাসার ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো মিশনের পর এই প্রথম কোনো মানববাহী মহাকাশযান চাঁদের এত কাছাকাছি পৌঁছাল। তবে এই অভিযানের রোমাঞ্চকর অনুভূতির আড়ালে লুকিয়ে আছে নভোচারীদের শরীরে মহাকাশের বিরূপ প্রভাবের জটিল সমীকরণ। সুদূর মহাকাশে এবং সেখান থেকে ফেরার পর নভোচারীরা ঠিক কী ধরনের শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকির মুখে পড়েন এবং তা মোকাবিলায় আধুনিক বিজ্ঞান কতটা প্রস্তুত, বর্তমান প্রতিবেদনে তাই আলোচনা করা হবে।
তেজস্ক্রিয় বিকিরণ
পৃথিবী থেকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের যে দূরত্ব, আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীরা তার তুলনায় ১ হাজার গুণেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেছেন। পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র আমাদের মহাকাশের ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে রক্ষা করলেও চাঁদের কক্ষপথে সেই সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই। ফলে নভোচারীদের শরীর উচ্চমাত্রার মহাজাগতিক রশ্মি (গ্যালাকটিক কসমিক রেডিয়েশন) এবং সৌর কণার সংস্পর্শে আসে। নাসার বিজ্ঞানী স্টিভেন প্ল্যাটস জানান, এই বিকিরণ কেবল ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে মস্তিষ্কে প্রদাহ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি পারকিনসন বা আলঝেইমারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়াও হৃদরোগ ও চোখের ক্যাটারাক্ট বা ছানি পড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
অবশ্য এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নভোযান ওরিয়ন ক্যাপসুলের ভেতর বিকিরণ পরিমাপ করার বিশেষ সেন্সর এবং হিউম্যান ফ্যান্টম বা মানবদেহের কৃত্রিম মডেল ব্যবহার করা হয়েছে যা প্রতিটি অঙ্গের ওপর বিকিরণের প্রভাব পরিমাপ করে। এসব তথ্য থেকে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ এবং দূর মহাকাশে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের পার্থক্যের ধরন ও মাত্রা বুঝতে পারবেন বলে আশা করছেন।
হাড় ও পেশির ক্ষয়
মহাকাশে দীর্ঘ সময় ওজনহীন অবস্থায় থাকার ফলে পৃথিবীতে ফিরে আসার পর মানুষের শরীর সহজে মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত হতে পারে না। মহাকাশে ওজনহীন অবস্থায় থাকার ফলে মানুষের পেশি ও হাড়ের ঘনত্ব নাটকীয়ভাবে কমতে থাকে। এর ফলে পৃথিবীতে ফেরার পর নভোচারীরা ভারসাম্যহীনতা, মাথা ঘোরা এবং হাড় ভাঙার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। এমনকি মহাকাশে থাকা অবস্থায় হাড় থেকে ক্যালসিয়াম ক্ষয়ে যাওয়ার ফলে পরে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়।
এই ঝুঁকি এড়াতে নভোচারীদের পৃথিবীতে ফেরার পর নিয়মিত ফিজিওথেরাপি এবং বিশেষ ব্যায়ামের রুটিন দেওয়া হয়। আর্টেমিস মিশনে হাড়ের মজ্জার কর্মক্ষমতা বুঝতে বিশেষ ‘অর্গান-অন-চিপ’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। যা রক্তকণিকা তৈরির হার পর্যবেক্ষণ করবে বলে জানিয়েছে নাসা।
দৃষ্টিশক্তির ওপর প্রভাব
মহাকাশ ভ্রমণের সময় শূন্য মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে শরীরের তরল পদার্থ নিচের দিকে প্রবাহিত না হয়ে মাথার দিকে জমা হয়। এর ফলে চোখের স্নায়ুর ওপর চাপ বেড়ে যায় এবং অনেকের দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যায়। একে বলা হয় স্পেস অ্যাসোসিয়েটেড নিউরো অকুলার সিনড্রম বা স্যানস। এ পরিস্থিতি বিভিন্ন জটিল স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
তবে আর্টেমিস-২ অভিযানের নভোচারীদের জন্য বিশেষ ‘লোয়ার বডি নেগেটিভ প্রেশার’ স্যুট এবং লিকুইড কুলিং গার্মেন্টসের ব্যবস্থা ছিল। এ ধরনের পোশাক শরীরের অভ্যন্তরীণ তরল চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।
এ ছাড়াও আর্টেমিসের নভোচারীদের স্বাস্থ্যের ওপর নজর রাখতে একাধিক আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছে নাসা। যেমন, স্মার্টওয়াচ ও সেন্সরের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক হৃদস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস ও ঘুমের মান ট্র্যাক করা, মহাকাশে যাত্রা শুরুর আগে, ভ্রমণকালীন এবং পৃথিবীতে ফেরার পর রক্ত ও লালার নমুনা পরীক্ষা করে ইমিউন সিস্টেমের অবস্থা বিশ্লেষণ করা ইত্যাদি। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে নভোচারীদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে।
মানসিক চ্যালেঞ্জ
নভোচারীদের ক্ষেত্রে প্রায়ই শারীরিক ঝুঁকির চেয়ে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে যদি বড় একটি বাড়ির সঙ্গে তুলনা করা হয়, আর্টেমিস মিশনের ওরিয়ন ক্যাপসুলকে তুলনা করা যায় একটি ছোট ক্যাম্পার ভ্যান বা ভ্রাম্যমাণ গাড়ির সঙ্গে। পৃথিবী থেকে দূরে শূন্য মাধ্যাকর্ষণ পরিস্থিতিতে গাদাগাদি করে থাকার ফলে ডিপ্রেশন, ঘুমের ব্যাঘাতসহ আচরণগত একাধিক সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অবশ্য আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীদের জন্য নির্দিষ্ট বিশ্রামের সময় রাখা হয় এবং ভূপৃষ্ঠের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল থেকে নিয়মিত কাউন্সেলিং সাপোর্ট দেওয়া হয়।
৫০ বছর আগের অ্যাপোলো মিশনের তুলনায় বর্তমান প্রযুক্তি অনেক বেশি উন্নত। প্রথম চন্দ্রাভিযান অ্যাপোলোতে সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল ন্যূনতম, কিন্তু আর্টেমিসে প্রতিটি পদক্ষেপ তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর। আর্টেমিস-২ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি এবং মঙ্গল গ্রহে দীর্ঘমেয়াদী মিশনের জন্য মানুষের নিরাপদ যাত্রার পথ প্রশস্ত করবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।




