দেশের ক্রান্তিকালে ২০১৮ সালের আলোচিত কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে প্রথম আলোচনায় আসেন তরুণ রাজনীতিক ফারুক হাসান। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমানে তিনি সিনিয়র সহসভাপতি পদমর্যাদায় গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র। ফ্যাসিবাদের উত্তাল সময়ে রাজপথ থেকে উঠে আসা এই নেতা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। চলমান রাজনীতি, সরকার, নির্বাচন, সংবিধান ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আবিদ আজম
এশিয়া পোস্ট: ২০১৮ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন কেন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল? তখন আন্দোলনের নেতৃত্ব কিভাবে নির্ধারণ করা হয়?
ফারুক হাসান: দীর্ঘ প্রায় এক দশকে আমাদের দীর্ঘ একটি লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এ পর্যন্ত আসা। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে আমরা যারা লিডিং ফেস ছিলাম, তারা সবাই ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সে সময় প্রয়াত ডক্টর আকবর আলী খান প্রথম আলোতে একটি কলাম লেখেন। সে কলামে আমরা দেখলাম, প্রায় ২৫০ পদের কোটা বাংলাদেশে বিদ্যমান। মানে এই কলাম পড়ে আমরা সবাই ভীষণ চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলাম।
আমরা যারা এত কষ্ট করে গ্রাম থেকে উঠে এসেছি, কৃষক পরিবারের সন্তান। অনেকেই দিনমজুর পরিবারের সন্তান, নিম্নবিত্ত ঘরের সন্তান। এই যে আমরা মানে না খেয়ে হয়তোবা দুবেলা খেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় পড়াশোনা করি। সবারই একটা স্বপ্ন, আমরা এখান থেকে ভালো একটা চাকরি পাব, দেশের সেবা করব, জনগণের সেবা করব। তো এত রকমের কোটা থাকলে যারা এই যে গরিব ঘরের সন্তান, নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান, এরা আসলে কীভাবে চাকরি পাবে? যেখানে একটা দেশের ৫৬ শতাংশ কোটা, আর ৪৪ শতাংশ মেধা। ফলে আমরা অনেকেই ক্ষুব্ধ, এটা হতে পারে না, চলতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে আমরা তখন নিয়মিতই পড়াশোনা করতাম। সেখান থেকেই আমাদের চিন্তাটা এলো, না এটার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করতে হবে, আন্দোলন করতে হবে।
খুব সম্ভবত ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ সালে আমরা শাহবাগে একটা বিক্ষোভের ডাক দিলাম। পরে রাজু ভাস্কর্যে সেই বিক্ষোভের আমরা সমাপ্তি টানলাম। এরপর আন্দোলনটিকে সাংগঠনিক কাঠামো দেওয়ার চিন্তা আসে। কারা নেতৃত্ব দেবে, কারা দায়িত্ব পালন করবে।
আলোচনা করা হয়, কাদের হাতে নেতৃত্ব দিলে এই আন্দোলনটিকে টেনে নিতে পারবে। কে সাহসী, কে আসলে ছাত্রলীগ। তখন ছাত্রলীগের একক আধিপত্যের ভেতর সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা সো টাফ। তারপর আমরা পরামর্শ করলাম যে, ছাত্রলীগের পদ আছে বাট আসলে ছাত্রলীগের অপকর্ম পছন্দ করে না, এ রকম কাউকে যদি দায়িত্ব দেওয়া যায় তাহলে ভালো হয়। তাহলে সে সরকারের দিক থেকে চাপ এলে সেটাও সামলাতে পারবে, আবার আন্দোলনটা টেনে নিতে পারবে।
দু-তিনজনের নাম পর্যায়ক্রমে আসে। প্রথমে তারা রাজি হলেও পরে আবার আপত্তি জানায় এই ভেবে যে, তাদের হল থেকে বের করে দেবে। নানামুখী চাপের ভেতর সর্বশেষ হাসান আল মামুনকে রাজি করানো হয় আহ্বায়ক হিসেবে। তারপর যুগ্ম আহ্বায়ক পর্যায়ক্রমে আমি, রাশেদসহ আরও কয়েকজন। নুরুল হক নুরের নামটাও যুগ্ম আহ্বায়কের তালিকার চার কি পাঁচ নম্বরে ছিল। প্রথম দিকে ছাত্রলীগ তেমন বাধা দেয়নি। কিন্তু যখন এই আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে; শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয় এক পর্যায়ে আন্দোলন বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ইউনিভার্সিটিতে ছড়িয়ে গেল, তখনই ছাত্রলীগের টনক নড়ে উঠল। আওয়ামী লীগ থেকে তাদের চাপ দেওয়া হলো, এটাকে থামাতে হবে। নইলে সরকারের জন্য এটা বিপদ ডেকে আনবে।
আমাদের নানাভাবে বাধা দেওয়া শুরু হলো। অনেকে হুমকি দিচ্ছে। অনেকের ওপর হামলা করা হচ্ছে। তারপর নানামুখী বাধার পরও কোনোভাবেই আমাদের আটকাতে পারেনি। ওই সময় ছাত্রলীগের একটা অংশ সত্যিকার অর্থে অপকর্মকে পছন্দ করতেন না। ধরা যাক এটা পাঁচ বা দশ ভাগ। তারা ভবিষ্যতে চাকরি করবে, ভালো একটা লাইফ লিড করবে—এরকম চিন্তা ছিল একটা অংশের। তারা আমাদের সঙ্গেই ছিল।
আমরা আন্দোলন বেগবান করছি। তো এই পর্যায়ে চলতে চলতে আন্দোলন বাংলাদেশের একবারে ৬৪ জেলাতেই ছড়িয়ে গেল। প্রত্যেকটি কলেজ, ইউনিভার্সিটি—সব জায়গায়। তখন আর কোনোভাবেই এরা আর আমাদের সহ্য করতে পারছে না। শুরু হলো আক্রমণ। ৮ এপ্রিল ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভয়াল একটা কালরাত পার করে। সেই একাত্তরের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অনুরূপ একটি আবহ তৈরি করা হয়। গুলি ও টিয়ারশেলে আমরা অনেকেই আহত হলাম। তারপর আমাকে গুম করে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা অজ্ঞাত স্থানে রাখে ডিবি। আমাকে মেরে রক্তাক্ত করে তারপর ডিবির হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে চোখ-হাত-পা বেঁধে কালো মাইক্রোবাসে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল আমি নিজেও জানি না। সেখান থেকে ডিবির মিন্টু রোডে যাওয়ার পর আমার জ্ঞান ফেরে।
এশিয়া পোস্ট: ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি মনে করা হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে। এর সঙ্গে আপনাদের সম্পৃক্ততা কেমন ছিল?
ফারুক হাসান: ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের বীজ আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৮ সালে বপন করা হয়। ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন যেহেতু আমরা নেতৃত্ব দিয়েছি, আমাদের একটা বড় ধরনের অভিজ্ঞতা আছে দীর্ঘ ছয়-সাত বছরের। এই আন্দোলনকে আমরা টেনে নিয়ে আসছি। আমরা দেখলাম, একটি আন্দোলন যদি থেমে যায় তাহলে এর পরের স্টেজে আসলে কি হয়? এর পরের স্টেজ হচ্ছে জেল, জরিমানা, হামলা-মামলা, রিমান্ড—মানে একেবারে নাজেহাল অবস্থা।
আমাকে যখন গুম করা হয়, তখন আমার মা একজন সুস্থ-সবল মানুষ ছিলেন। উনি কাঁদতে কাঁদতে দুই মাস একরকম না খেয়ে ছিলেন। টানা দুই দিন একেবারে না খেয়ে ছিলেন। আমি ছোট সন্তান, পরিবারের ভীষণ আদরের। অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। আমার বাবা কৃষক। কৃষক পরিবারের সন্তান আমি। আমার পরিবারের স্বপ্ন ছিল, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি। এখান থেকে বের হয়ে ভালো একটা জায়গায় আমি যাব, পরিবারকে আমি সুন্দরভাবে পরিচালনা করব। পরিবারকে একটা নিশ্চয়তা দেব। সেই স্বপ্নে চিড় ধরিয়ে আমাকে যখন মামলা-হামলা করা হয়, তাদের মারাত্মকভাবে এফেক্ট করে। এ কথাগুলো বললে আমার হৃদয়টা ফেটে যায়। গ্লানিবোধ আসে। আমরা আসলে কোনো অন্যায় করিনি।
দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে এই যে নির্যাতন-জুলুমের শিকার হয়েছি, এটা তো ব্যক্তিগত লাভের আশায় করিনি। আমরা একটি বৈষম্যমুক্ত, দেশের মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আন্দোলনটা করছি। আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী আবারও কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রজ্ঞাপন বাতিল করেন। ফলে আবার বিক্ষোভের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাহিদ, আসিফ ও আখতার বললেন, এখন কি করা যায়? আমরা বললাম, এটা কোনোভাবেই মানা যায় না। এখনই তোমাদের আন্দোলনে নামতে হবে। যে দিন রায় হলো, ওই দিনই কিন্তু আমরা বিক্ষোভের ডাক দিয়েছি সন্ধ্যাবেলা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা স্পষ্ট জানালাম, যদি এই আন্দোলনে আমরা সামনে থাকি তাহলে এই আন্দোলনটিকে একটি রাজনৈতিক কালারিং দিয়ে দেওয়া হবে। ফলে একটি অরাজনৈতিক রূপ দিতে হবে। যাতে আন্দোলনটা একটা সর্বজনীন চেহারা পায়।
আমাদের পরামর্শের আলোকে তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে প্রথম কর্মসূচির ডাক দিল। সেখানে সবাই ছিল। তারপর ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদসহ অন্যান্য যে ছাত্র সংগঠন ছিল, আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে আমরা তাদের নার্সিং করেছি, পরামর্শ দিয়েছি। তাদের মিছিলে পানি সরবরাহ থেকে শুরু করে খাবার আমরা প্রোভাইড করেছি। সার্বক্ষণিক আমাদের তিন-চারজনকে ওদের সঙ্গে রাখছিলাম, যেন যে কোনো মুহূর্তে সাপোর্ট দেওয়া যায়। এভাবেই এ আন্দোলনটাকে আমরা কিন্তু সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছি। আসিফ, নাহিদ, হাসনাত এরা ফ্রন্টে ছিল। কিন্তু আমরা পিছন থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি।
এশিয়া পোস্ট: রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অভিপ্রায় বা মূল্যবোধকে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে এবং বাইরে থেকে নানাভাবে ব্যর্থ করে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ শোনা যায়। চূড়ান্তভাবে জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বা উদ্দেশ্য সফল হয়েছে কিনা?
ফারুক হাসান: গণঅভ্যুত্থান বা জুলাই বিপ্লব যেটাই বলেন না কেন এটা তো আসলে করেছে এ দেশের জনগণ। একক কোনো সংগঠন, ব্যক্তি, রাজনৈতিক দলের ক্রেডিট এখানে নেই। কৌশলগত কারণে আমরা ছাত্রদের তথা নাহিদ-আসিফদের ফ্রন্টে রেখেছিলাম। পিছন থেকে আমরা সবাই কিন্তু এই আন্দোলনে ছিলাম। এখানে আমরা কাউকে অস্বীকার করতে পারব না। জামায়াত-শিবির, বিএনপি বা অন্যান্য যে ছাত্র সংগঠন বা দলগুলো আছে তারা ছিল। এই জায়গাতে আন্দোলন আমরা সফল করেছি, সুন্দরভাবে জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। এই আন্দোলনে ছিল কৃষক-শ্রমিক- দিনমজুর-হকার সবার, বাট আন্দোলন পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনের যে ফসল সেই ফসলটা জনগণের পকেটে যায়নি। জনগণের ঘরে যায়নি।
জুলাই আন্দোলনের ফসল আসলে একরকম ছিনতাই হয়ে গেছে। যে যার মতো লুট করেছে। আমি যদি প্রশ্ন করি আন্দোলন কৃষক ভাইরা করেনি? অবশ্যই করেছে। ওই কৃষক, ওই যে রিকশাচালক—ঢাকায় যারা রিকশা চালাত তারা রিকশা নিয়ে মিছিল করেছে। ২২ জন সম্ভবত, রিকশাচালক হোক আর যারা ফুটপাতে ব্যবসা করে তারা তো শাহাদাত বরণ করেছে। তাহলে এই হকার ভাইদের জন্য এই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কিছু কী করা হয়েছে? বেশকিছু পথশিশুও মারা গেছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এক ধরনের একটা লুটপাটতন্ত্র আমরা এখানে দেখলাম। আমাদের তো আকাঙ্ক্ষা এরকম ছিল না। যেমন ধরুন প্রথম স্টেজে আমরা কিন্তু একটি বিপ্লবী সরকার চেয়েছিলাম। গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লব মানেই বিপ্লবী সরকার হবে।
ওই পুরাতন ধারার পুরাতন যে গতানুগতিক সিস্টেমের পুরাতন সংবিধান, আইন-কানুন এসবের কোনো বালাই কিন্তু আর এখানে রাখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ আইন মেনে, সংবিধান মেনে এই গণঅভ্যুত্থান হয়নি। এই গণঅভ্যুত্থান হয়েছে ওই সব পুরাতন তন্ত্র, পুরাতন সংবিধান, আইন ওসব—ছুড়ে ফেলে দিয়ে। বিপ্লবী সরকার কেন হলো না? এটি আরেক প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে অনেক বড় বড় রাজনৈতিক দলের মন খারাপ হয়ে যাবে।
এশিয়া পোস্ট: আপনার বক্তব্যের সূত্র ধরে জানতে চাই, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিপ্লবী সরকার কেন হলো না?
ফারুক হাসান: আমরা গণঅভ্যুত্থান সফল করলাম ৫ আগস্ট। এরপর তড়িঘড়ি করে দুপুরবেলা ক্যান্টনমেন্টে একটি বৈঠক হলো সেনাপ্রধানের আমন্ত্রণে। বৈঠক হওয়াটা দোষের কিছু না। কিন্তু ওই বৈঠকে কারা উপস্থিত ছিলেন? স্রেফ চার-পাঁচটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। আমি যদি এখন প্রশ্ন করি, ওই চার-পাঁচটি দলই কি গণঅভ্যুত্থান করেছে? করেনি। এই গণঅভ্যুত্থানে ওই সময়ের ছাত্র সমন্বয়করা ছিল, অন্য দলগুলো ছিল, আমরা ছিলাম, অন্যান্য যে কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতা তাদের প্রতিনিধি কিন্তু ওই বৈঠকে ছিল না। বৈঠকে ছিলেন গুটি কয়েক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। সেখানে বসে ওরা সিদ্ধান্ত নিল যে, একটি ইন্টেরিম সরকার করতে হবে। সংবিধান মেনে শপথ নিতে হবে, এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তাদের কে দিয়েছে? এই প্রশ্নটি করলে দেখবেন যে, অনেকের গায়ে লাগবে। এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল উন্মুক্ত মঞ্চে, উন্মুক্ত জায়গায়। শহীদ মিনারে, জাতীয় সংসদের সামনে কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত ময়দানে। আলোচনা হবে যে, আমরা গণঅভ্যুত্থান সফল করেছি এখন আমরা আসলে কীভাবে দেশটি পরিচালনা করব তার জন্য আলোচনা দরকার। সে আলোচনাটা হয়নি। হয়েছে ইনডোরে গোপন রুমে। তারপর তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করলেন। সেখান থেকে বঙ্গভবনে নিয়ে গেলেন নেতাদের।
সেখানে তারা সব ফাইনাল করলেন। এরপরের ইতিহাস তো সবাই জানেন। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে শপথ নেওয়া হলো। এই ঘটনা নিয়ে এখন একজন আরেকজনকে দোষারোপ করে, এক দল আরেক দলকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে। আমি মনে করি, ওই দিন যারা ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিল প্রত্যেকে দায়ী।
এশিয়া পোস্ট: আপনি ঠাকুরগাঁও-২ আসনে নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ থাকলেও স্বপ্নটা কেন পূরণ হয়নি?
ফারুক হাসান: নির্বাচন মানেই আসলে জয়-পরাজয়। অনেক ক্যান্ডিডেট থাকে, প্রার্থী থাকে, সবাই তো আর বিজয়ী হবে না। বিজয়ী হবে একজন। যার ভাগ্যে আছে সেই হবে। নির্বাচনে ব্যক্তিগতভাবে আমার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছি।
বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোটারদের টাকা ছেটানো একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে আওয়ামী লীগ। কোনো আসনে যদি খরচ করা হয় ১০ কোটি, আমার আসনে করতে হবে কমপক্ষে ৩০ কোটি—তিন গুণ বেশি। এরকম একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি ওখানে তৈরি হয়ে আছে। সবাই টাকা পেয়ে অভ্যস্ত। মানে টাকা দেবেন না মানে আপনার দিকে তাকাবে না। আমরা ক্যাম্পেইনে গেলে বলে, টাকা কই টাকা নিয়ে আসছেন? আমাদের খাওয়াবেন না। আমি বলি, আমি তো টাকা দিয়ে ভোট কিনতে চাই না। আমি চাই এমপি হওয়ার পরে আপনার কল্যাণে ভূমিকা রাখার জন্য। আপনার আসলে টাকা দরকার ৫০০-১০০০, নাকি আপনার রাস্তাটা দরকার? আমি এই রাস্তাটা করে দেব। আমি এই মসজিদ করে দেব। মন্দির বানিয়ে দেব। এই জিনিসগুলো তারা তো সহজে বুঝতে পারে না। কারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি ডার্টি হয়, নোংরা হয়ে যায়—এটাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনি ক্লিন করবেন, পরিবর্তন করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু হবে না।
এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের দেওয়া একটি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তাকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রাজসাক্ষী বলছেন বিরোধীদলীয় কেউ কেউ। আপনার কী মনে হয়?
ফারুক হাসান: তাদের আন্ডারেই তো নির্বাচনটা হয়েছে। ফলে নির্বাচন হওয়ার পর যিনি নির্বাচনের দায়িত্বে ছিলেন উনি নিজেই যদি এরকম একটা বক্তব্য দেন যে, আমরাই আসতে দেইনি। কাদের আসতে দেইনি? নিশ্চয় যারা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে থেকে কাউকে না কাউকে আসতে দেননি—নাম্বার ওয়ান। এখন নাম্বার টু উনি যে ব্যাখ্যাটা দিয়েছেন, উগ্রবাদী শক্তিকে আমরা পাওয়ার আসতে দেইনি।
দেখেন ভেরি ইন্টারেস্টিং অ্যান্ড ভেরি ভেরি ইম্পর্টেন্ট পয়েন্ট ‘উগ্রবাদী’। এখন আমি যদি উনাকে প্রশ্ন করি, যারা উগ্রবাদী তাদের তো আইনগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কোনো সুযোগ থাকার কথা নয়। হয় তারা নিষিদ্ধ হবে, নয়তো তারা কোনোভাবেই এখানে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তাহলে আপনারা কি জেনে বুঝে এরকম কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন, দল বা কোনো নিষিদ্ধ শক্তিকে এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিয়েছিলেন? নাম্বার থ্রি, যদি কোনো গ্রুপ গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে থাকে, তার মানে শতভাগ তারা ভ্যালিড বৈধ নিবন্ধিত। কারণ বৈধ কোনো শক্তি ছাড়া তো এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কথা না। তাহলে এরকম একটি বাংলাদেশের বৈধ রাজনৈতিক শক্তিকে আপনি যখন বলেন, আমরা আসতে দিইনি, তার মানে তো আসলে আপনি ইঞ্জিনিয়ারিং করেছেন। মানে আপনি মেকানিজম করে আসতে দেননি। এই লায়াবিলিটি তো উনার।
আমি মনে করি, আমাদের সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান নিজেকে অতি বিএনপি সাজানোর চেষ্টা করছেন। কারণ, বিগত সময়ে তার স্বামীর নামে মিডিয়ায় যে নিউজগুলো এসেছে সব তো আর মিথ্যা না। সাবেক এক আওয়ামী লীগ মন্ত্রীর অবৈধ এই সাম্রাজ্যের ঠিকাদার ছিলেন, টিকিয়ে রাখার পাহারাদার ছিলেন তিনি। রিজওয়ানা হাসানের এই মন্তব্য যে বিএনপির জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে, এটা তিনি নিজেও হয়তো টের পাননি, চিন্তা করেননি। এখন বিএনপি একেবারে ফাঁদে পড়ে গেছে। বিরোধীরা এটাকে লুফে নেবে স্বাভাবিক। ওরা এই এজেন্ডাকে সামনে এনে এখন রাজপথ গরম করছে। বিএনপির জন্য এটা একটা খাল কেটে কুমির আনার মতো অবস্থা। এ বিষয়ে রিজওয়ানা হাসানকে ব্যাখ্যা দিতে হবে, পরিষ্কার করতে হবে তিনি আসলে কি মিন করেছেন। কোন দলকে ইন্ডিকেট করেছেন, তিনি কীভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং করেছেন, না করেননি। আমি মনে করি, রিজওয়ানা হাসানকে গ্রেপ্তার করে বা আইনের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। প্রশাসনের উচিত অনতিবিলম্বে উনাকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা। কারণ এই জিনিসটি সুরাহা না হলে আগামীতে প্রশ্ন আরও বাড়তে থাকবে।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কিছুদিন পর শেখ হাসিনা সরকারের নিয়োগ করা রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের জন্য বঙ্গভবনের সামনে আপনারা আন্দোলন করেছেন। কে বা কারা তখন বাধা দিয়েছিল?
ফারুক হাসান: মহামান্য রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন সাহেবকে অপসারণ নিয়ে এখন অনেক কথা হচ্ছে। বিএনপিকে অনেকেই দায়ী করে গালিও দিচ্ছেন। হ্যাঁ, আমিও বিএনপিকে দায়ী করতে চাই; কিন্তু বিএনপিকে দায়ী করার আগে আমি আসলে বলতে চাই, প্রশ্ন করতে চাই, এই শাহাবুদ্দিন সাহেব আজকেও যে চেয়ারে বসে আছেন, এটার জন্য কি একা বিএনপি দায়ী? আমি তা মনে করি না। পৃথিবীর ইতিহাসে যতগুলো গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানের পরে কখনোই ফ্যাসিবাদের প্রোডাক্ট বা আইকন এরা কখনোই পরবর্তী সময়ে আর কোনো চেয়ারে থাকার সুযোগ থাকে না।
আমরা যেহেতু গণঅভ্যুত্থান করেছি, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের চেয়ারগুলোতে ফ্যাসিবাদের দোসররা বসা থাকবে এটা তো হতে পারে না। আপনারা রাষ্ট্রপতিকে রাখলেন, উনার কাছ থেকে শপথ নিলেন, খুব ভালো কথা। আপনারা আইনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, পরিবেশের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, উপায় ছিল না এটাও বলেছেন, সবই মেনে নিলাম। আমরা নিজেরাই আন্দোলন করেছি। যেখানে এনসিপি, বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীরা ছিলেন। আমরা সবাই বঙ্গভবনের সামনে সেদিন গিয়েছিলাম। আমরা একটাই আওয়াজ দিয়েছি, আমরা এই রাষ্ট্রপতিকে চাই না। আন্দোলন চলছে, ওই সময় তৎকালীন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলমরা আমার ফোনে শত শতবার কল দিয়েছে। আমাকে অনুনয়-বিনয় করেছে যে, ভাই যে কোনো মূল্যে এই আন্দোলনটা বন্ধ করতে হবে। আপনারা ফিরে আসেন। আমরা বললাম, ফিরে আসব মানে? এটা তো আমাদের গণদাবি। সবারই দাবি তোমরা সরকারে আছ। সরকারকে চাপ দাও, প্রধান উপদেষ্টাকে গিয়ে ধর, বলো যে উনাকে আর রাখা যাবে না। উপায় বের করো। যেখানে বাংলাদেশের সংবিধানে নেই, আইনে নেই, কোনো জায়গায় নেই, তারপরও যদি ইন্টেরিম সরকার হতে পারে তাহলে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে নতুন রাষ্ট্রপতি বানানো অসম্ভব ছিল না। ঠিক কি না? এই কথাগুলো তখন আমি নিজে নাহিদকে বলেছি—আমার ফোনে অসংখ্যবার কল দিয়েছে তারা।
আপনারা নিজেরা নাহিদ ইসলামকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। অনেক অনুনয়-বিনয় করেছে। আমরা যখন কথা শুনিনি, বলেছে, ভাই তাহলে কিন্তু আমরা পুলিশকে অ্যাকশনে যেতে নির্দেশ দেব। মানে আমাদের উপরে আক্রমণ হবে, গুলি চালাবে, টিয়ারশেল মারবে। হয়েছে তাই। এরপর সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল মেরেছে, ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। আর আজকে এসে যদি ঢালাওভাবে বিএনপির দিকে আঙুল তোলা হয়, তাহলে আমি বলব যে, বিএনপির দিকে আঙুল তোলার আগে ওদের দিকেও তোলা উচিত, তুলতে হবে। তারাও দায়ী। তারা তো ওই সময় সরকারে ছিল। তখন কেন বাধ্য করা হলো না? ওরা মিডিয়ার সামনে এসে প্রকাশ্যে বলে দিতে পারত যে, আমরা রাষ্ট্রপতি অপসারণের আলোচনা করছি, এখানে বিএনপি বাধা দিচ্ছে। যেমন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিষয়টিতে প্রথম দিকে বিএনপি পক্ষে ছিল না। তারপর আন্দোলন হয়েছে, বিএনপি এক প্রকার বাধ্য হয়েছে যে, ঠিক আছে মেনে নিলাম। তাহলে আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তো বাস্তবায়ন হয়েছিল, তাহলে এটা কেন হয়নি? এখানে এনসিপির নাহিদ-আসিফরা নিজেদের ধোয়া তুলসীপাতা মনে করলে হবে না, ওরাও দায়ী এবং প্রথম দায়ী ওরাই। ওদের কারণেই সাহাবুদ্দিন এখন পর্যন্ত চেয়ারে।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ অফিস খুলে দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে নির্বাচন-পূর্ববর্তী কোনো সমঝোতা হয়েছে বলে কি না?
ফারুক হাসান: অবশ্যই। বিষয়টি বিএনপি সরকারের জন্য একটা মারাত্মক বিপজ্জনক পরিস্থিতি সামনে তৈরি করবে। অনেক জায়গায় অফিস চালু হচ্ছে, অফিস খুলে দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বহাল তবিয়তে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু তাই না, বেশ কয়েকটি জায়গায় দেখলাম বিএনপির উপরে হামলাও চালানো হয়েছে। পেপার- পত্রিকা-মিডিয়াতে সবাই নিশ্চয়ই দেখেছেন।
বিএনপির উচিত এ বিষয়ে ন্যূনতম ছাড় না দিয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা। মানে বিএনপি যদি এটা ভুলে যায়, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসন আমলকে আমরা বলি একটা গ্লোরিয়াস শাসন আমল। বাট উনার যদি কোনো ভুল থেকে থাকে, রাজনৈতিক ভুল, আমি বলব ওই যে খাল কেটে কুমির এনেছিলেন, ইন্ডিয়া থেকে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রীকে দেশে নিয়ে এসেছিলেন।
তারপর বাংলাদেশকে একেবারে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছেন। সে ইতিহাস থেকে যদি শিক্ষা আমরা না নেই, তাহলে ভবিষ্যৎ পরিণতি এরকমই হবে। এজন্য বিএনপির প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, আপনারা ওই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন। নতুন করে ভুল করবেন না, ওরা বিষাক্ত সাপ ছোবল মারবেই, আজ হোক বা কাল।
এশিয়া পোস্ট: একটি জাতীয় দৈনিক অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধ বলে উল্লেখ করেছে। তাহলে সেই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন বৈধ হবে কি না?
ফারুক হাসান: ফ্যাসিবাদীরা তো সব জায়গায় বসা আছে, গণমাধ্যম-মিডিয়া অধিকাংশই তো ফ্যাসিবাদের দখলে। এখন শুধু খোলস পাল্টানো হয়েছে। যে মিডিয়া আগে তারেক রহমানকে বাংলাদেশের এক নম্বর ভিলেন বানিয়েছে, সেই তারেক রহমানকে এখন বাংলাদেশের এক নম্বর হিরো বানিয়ে দিয়েছে। এখানে বিএনপিকে সতর্ক এবং সজাগ থাকতে হবে। তারেক রহমানের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, আপনি সতর্ক থাকুন, সজাগ থাকুন।
এরা কারা—এদের ইতিহাস, এদের চরিত্র সবই মানুষ জানে। সুতরাং এরা এখন পাশে এসে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলে। অনেক সুন্দর সুন্দর বিশেষণ যুক্ত করে। কিন্তু এই বিশেষণে নিজেকে গুলিয়ে ফেললে হবে না। এই যে গণমাধ্যমটির কথা বললেন—তারা কারা সবাই জানেন। তারা তো এই ফ্যাসিবাদের দোসরই।
ফ্যাসিবাদের আমলে ফ্যাসিবাদকে তারা সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছে। তারা সুযোগ পেয়ে ছোবল কিন্তু একটা মেরে দিয়েছে। সরকার অবৈধ! ইউনূস সরকার অবৈধ হলে ইউনূস সরকারের নির্বাচন কীভাবে বৈধ হয়? এই প্রশ্নটি কিন্তু করতে হবে। ইউনূস সরকার যদি অবৈধ হয় তাহলে ইউনূস সরকারের আমলে যতগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে প্রত্যেকটিই অবৈধ। নির্বাচন তার আমলে হয়েছে, তার সিদ্ধান্তে হয়েছে। এটি অবৈধ। তাহলে আজ যিনি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তিনি কি বৈধ, না অবৈধ? এটা ওই মিডিয়া হাউজকে বলতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: বেগম খালেদা জিয়া একসময় বাহাত্তরের ‘ফ্যাসিবাদী’ সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা বললেও বিএনপি সংবিধান রক্ষার কথা বলছে—এটা কি সাংঘর্ষিক নয়?
ফারুক হাসান: এটা অবশ্যই সাংঘর্ষিক। বিএনপি এখন জুলাই সনদ নিয়ে যা শুরু করেছে, এটা আসলে কোনোভাবেই কাম্য না। প্রত্যাশিত না। মনে রাখতে হবে, এই জুলাই সনদ জুলাই গণভ্যুত্থান থেকে এসেছে। আর এই জুলাই গণভ্যুত্থানটা কি?
এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেটাই যেটা তারেক রহমানকে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনেছে। এই জুলাই সনদ সেটাই যেটা তারেক রহমানকে আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে। এই জুলাই সনদ সেটাই যেটা আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী বাংলাদেশের আপসহীন নেত্রী, বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছে।
আজ যদি আমরা এই জুলাই সনদকে অস্বীকার করি, জুলাই সনদ মানতে না চাই তাহলে আমাদের ওই যে দেড় বছরের পিছনের ইতিহাসের দিকে একটু ফিরে তাকানো দরকার। বেগম খালেদা জিয়াকে আমরা দুই বছরেও জেল থেকে মুক্ত করতে পারিনি? আপনারা কি এটা ভুলে গেছেন?
এই গণঅভ্যুত্থান না হলে তিনি হয়তোবা কারাগারে মৃত্যুবরণ করতেন। আল্লাহর অশেষ রহমত, জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী, বাংলাদেশের আপসহীন নেত্রী কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। নিজের দেশকে বিকিয়ে দেননি। নিজের রাজনৈতিক ইমানকে বিকিয়ে দেননি। এজন্যই বাংলাদেশের সর্বমহলে উনি এখনও প্রশংসিত। আজ এই জুলাই সনদ নিয়ে যা বলা হচ্ছে, এগুলো আসলে আমি মনে করি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ একটি অন্ধকারের দিকে পরিকল্পিতভাবে নিয়ে যাওয়ার একটা চেষ্টা হচ্ছে। এই ৫৪-৫৫ বছরে তো নতুন ইতিহাস নতুন সংবিধান হয়নি। নতুন সংবিধান তো আর বানানো হয়নি। আওয়ামী লীগ একটি বয়ান দিয়েছে দীর্ঘ ১৭ বছর যে, আমরা ৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাব। এগুলো আওয়ামী লীগের বয়ান, আওয়ামী লীগের স্টেটমেন্ট, আওয়ামী লীগের বক্তব্য—আপনারা কেন সেম বক্তব্য দিচ্ছেন।



