সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ বিশেষজ্ঞ মেজর (অব.) দেলোয়ার হোসেন খান; যিনি ডেল এইচ খান নামে বেশি পরিচিত। তীক্ষ্ণধার রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তিনি। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘জনতার দলের’ প্রধান সমন্বয়ক ও মুখপাত্র হিসেবে। এশিয়া পোস্টের ‘আলাপন’ অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন তিনি। কথা বলেছেন গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ, রাষ্ট্র সংস্কার এবং জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে। আলোচনায় উঠে এসেছে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ আরও নানা বিষয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবিদ আজম।
এশিয়া পোস্ট: আপনার দীর্ঘ সামরিক জীবন—বোমা নিষ্ক্রিয়করণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা, সেখান থেকে এসে লেখালেখির জগত। তারপর হঠাৎ প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আসার কারণ কী?
ডেল এইচ খান: ৫ আগস্টের পর সবাই প্রত্যাশা করেছিলাম একটা বড় পরিবর্তনের। আসলে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিজম বাংলাদেশের ওপর এমনভাবে চেপে বসেছিল যে, বিএনপি সেখানে রাজপথে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারছিল না। জামায়াতও নিবন্ধনের অভাবে কোণঠাসা ছিল। ৫ আগস্টের পর আমরা ভাবলাম, এই যে তথাকথিত রাজনীতিবিদরা গত ৫৪ বছর ধরে আমাদের পচা ‘অ্যান্টিবায়োটিক’ খাইয়েছেন, তাদের এবার বিদায় দেওয়ার সময় এসেছে। এদের অধিকাংশেরই প্রকৃত দেশপ্রেম নেই, এরা নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য দেশ বিক্রি করতেও কার্পণ্য করে না।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখবেন, ১৯৭১ সালেও যখন রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তখন একজন মেজর জিয়াউর রহমান এসে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর বাকশালের দুঃসহ সময়ের পর এবং জিয়ার শাহাদাত-পরবর্তী শূন্যতায় বারবার সামরিক কর্মকর্তারা দেশের হাল ধরেছেন। আমি মনে করি, দেশপ্রেমিক সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে যে শৃঙ্খলা এবং দেশ গড়ার আকুলতা থাকে, তা সাধারণ পেশাদার রাজনীতিবিদদের মধ্যে কম দেখা যায়। সেই চেতনা থেকেই ২০২৫ সালের ২০ মার্চ আমরা ‘জনতার দল’ গঠন করি। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—শিক্ষিত, মেধাবী এবং সৎ মানুষদের সংসদে পাঠানো। তারা যদি আইনপ্রণেতা হন, তবেই রাষ্ট্র কল্যাণকর হবে। এই তাগিদ এবং দায়বদ্ধতা থেকেই আমার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আসা। আমরা চাই এমন একটি নেতৃত্ব তৈরি করতে যারা বিদেশি শক্তির কাছে মাথা নত করবে না।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের যে আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কতটা পূরণ করতে পেরেছে এবং বর্তমান নির্বাচিত সরকার কতটুকু পূরণ করতে পারবে বলে মনে করেন?
ডেল এইচ খান: ৫ আগস্ট আমাদের রাষ্ট্রটি একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। রাষ্ট্র তখন এমন অবস্থায় ছিল যেন তাকে আইসিইউতে নিতে হয়েছে। প্রায় দেড় বছর এই রাষ্ট্রকে বিভিন্ন ‘লাইফ সেভিং ড্রাগ’ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিছু সংস্কার প্রস্তাব বা ‘প্রেসক্রিপশন’ তৈরি করেছিলেন যাতে রাষ্ট্র পুনরায় সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হলো তখন, যখন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নির্বাচিত সরকারের হাতে অর্থাৎ বিএনপির হাতে তুলে দেওয়া হলো। তারা বিপুল জনমত নিয়ে ক্ষমতায় এলো ঠিকই, কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনই বিএনপি ঘোষণা করল যে, তারা সংবিধান সংস্কারের বা রিফর্মের কোনো শপথ নেবে না।
অর্থাৎ তারা সংস্কারের প্রক্রিয়াটিকে শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করল। এটা একটা বড় জাতীয় সংকট। আমরা যদি গত ৫৪ বছরের পচা সিস্টেমকেই আবার ফিরিয়ে আনি, তবে এই জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে। নির্বাচিত সরকারকে বুঝতে হবে যে, মানুষ কেবল ক্ষমতার বদল চায়নি, মানুষ সিস্টেমের বদল চেয়েছিল। যদি সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হয়, তবে মানুষের ক্ষোভ আবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়তে পারে।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপি সংস্কারের ফলাফল মানতে বা কার্যকর করতে একমত হতে পারছে না। এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান বা বিএনপির জন্য রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হতে পারে কিনা?
ডেল এইচ খান: বিএনপিকে খুব পরিষ্কারভাবে একটি সত্য বুঝতে হবে যে—জুলাই অভ্যুত্থান না হলে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনাই ছিল না। শেখ হাসিনা যেভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন, তাতে নির্বাচন ছাড়াই তিনি আরও বহু বছর ক্ষমতায় থাকতেন। এখন যদি কেউ এই জুলাইয়ের অর্জনকে বা গণআকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করতে চায়, তবে সেটা হবে চরম পর্যায়ের ‘জাতীয় গাদ্দারি’।
মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষ বা বর্তমানের এই ‘জেন-জি’ জেনারেশন কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রতারণা মেনে নেবে না। ১৭ বছরের লৌহমানবী শেখ হাসিনা এবং তার বিশাল বাহিনীকে যদি সাধারণ ছাত্র-জনতা এক ধাক্কায় দেশছাড়া করতে পারে, তবে নতুন সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও তারা রাজপথে নামতে দ্বিধা করবে না। তাই বিএনপির উচিত হবে সংস্কারের কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং জনগণের পালস বোঝা। যদি তারা তা না করে কেবল ক্ষমতার দাপট দেখাতে চায়, তবে তারা নিজেদের জন্য একটি আত্মঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করবে।
এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি ১/১১-এর অন্যতম কুশীলব সাবেক সেনাকর্মকর্তা জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
ডেল এইচ খান: ১/১১-এর সময় যারা সংবিধান লঙ্ঘন করে অপরাধ করেছিল, তাদের বিচার গত ১৭ বছরে কেন হয়নি? এর উত্তর খুব সহজ—কারণ যারা সেই অবৈধ শাসনের সরাসরি সুবিধাভোগী ছিল, তারাই পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় ছিল। আওয়ামী লীগ এবং ১/১১-এর কুশীলবদের মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা ছিল। এখন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিচার হওয়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। বিচার তো সবার জন্য সমান হওয়া দরকার।
আমাদের ‘জনতার দল’-এর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গীকার হলো—বিচার বিভাগকে এমনভাবে স্বাধীন করা যাতে কোনো সরকারের হস্তক্ষেপ না থাকে। বিচারক যদি নিরপেক্ষ হন এবং পুরো প্রক্রিয়াটি যদি জনসম্মুখে স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়, তবে শাস্তির ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, বিচার যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়। অপরাধের তথ্য-প্রমাণ ও আইনিভিত্তিতে যেন প্রকৃত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ সংবিধান অবমাননা করার সাহস না পায়।
এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় এবং তার পরবর্তী সময়ে অনেককে সেফ এক্সজিট দেওয়ার অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
ডেল এইচ খান: এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর প্রশ্ন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫ আগস্ট একটি মাইলফলক, কিন্তু এর পরবর্তী অনেক কর্মকাণ্ড এখনও অস্বচ্ছ। প্রশ্ন জাগে—কোন আইনের বলে বা কার নির্দেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষ হেলিকপ্টারে করে ভারতে পৌঁছে দেওয়া হলো? যারা এই ‘সেফ এক্সজিট’ নিশ্চিত করেছে, বর্তমান সরকার কি তাদের কখনও জবাবদিহিতার আওতায় আনবে?
শুধু তাই নয়, সেনানিবাসে যে ৬২৬ প্রভাবশালী ব্যক্তি আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারা শেষ পর্যন্ত কোথায় গেলেন? কাকে কখন, কার নির্দেশে মুক্তি দেওয়া হলো এবং তারা কীভাবে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেন—তার কোনো দাপ্তরিক রেকর্ড জনগণের সামনে আনা হয়নি। আমাদের দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোও এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো করতে কেন জানি ভয় পায়। যদি বর্তমান সরকার নিজেদের স্বচ্ছ এবং জনবান্ধব দাবি করে, তবে তাদের উচিত এই বিষয়গুলোর ওপর একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং প্রকৃত সত্য শ্বেতপত্রের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরা। যদি পর্দার আড়ালে কোনো আপস হয়ে থাকে, তবে সেটি হবে শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি।
এশিয়া পোস্ট: আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা—বিশেষ করে এয়ার ডিফেন্সের বর্তমান অবস্থা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ আছে। আমাদের সীমাবদ্ধ কী কী? সমাধান কী?
ডেল এইচ খান: আমার কথা হচ্ছে যে ইনসিওর করতে হবে সেটা হচ্ছে যে আমার দেশের একজন মেজর ভারতীয় একজন মেজরের চেয়ে কম মেজর না, অবশ্যই সমানে সমান। আপনি যদি মনে করেন যে আপনার দেশের পেঁয়াজ আমাকে খাওয়াবেন। এগুলা বেয়াদবি কথাবার্তা বললে আবার টাইট দিব। তো এই জায়গাটাতে আমাদের ওই আত্মসম্মানটা রাখতে হবে। কারণ বাংলাদেশের শক্তি হচ্ছে অন্য জায়গায়। প্রথম শক্তি হচ্ছে দেখেন—এটি হচ্ছে মুসলিম একটা দেশ। মানে কোন দেশকে এত ভয় পাওয়া বা তাদের তাবেদারি করার কিছু নেই। এটি বলতে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, কিন্তু গত ১৭ বছরের শাসনামলে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার বদলে দুর্বল করা হয়েছে। আমাদের এয়ার ডিফেন্স বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে ‘নিয়ার জিরো’ পর্যায়ে রয়েছে। এমনকি আকাশসীমা সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত রাডার ব্যবস্থাও আমাদের নেই। তবে ভারত সরাসরি বড় কোনো আক্রমণে যাওয়ার আগে দশবার ভাববে, কারণ বাংলাদেশের প্রায় ১৮ থেকে ২০ কোটি জনসংখ্যা তাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। যদি যুদ্ধ লাগে এবং সেটি লম্বা হয়, তবে কোটি কোটি রিফ্যুজি বা শরণার্থী ভারতে ঢুকে পড়বে, যা সামলানোর ক্ষমতা ভারতের নেই এবং এতে ভারত কয়েক টুকরো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
ভারত মূলত নদী নিয়ন্ত্রণ করে ওয়াটার টেরোরিজম এবং সীমান্তে নিরস্ত্র মানুষ হত্যার মাধ্যমে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। আমাদের উচিত মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং নিজেদের আত্মসম্মান বজায় রাখা। কোনোভাবেই তা তাবেদারি করা উচিত নয়। আত্মমর্যাদাবোধই হোক আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।
এশিয়া পোস্ট: মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ কী? বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যের ক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকা কেমন?
ডেল এইচ খান: ইরান একটি ঐতিহাসিকভাবে লড়াকু জাতি এবং পারস্য সভ্যতার উত্তরসূরি। তারা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অবরোধের মধ্যে থেকেও নিজেদের সামরিক শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমানে রাশিয়া এবং চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তায় ইরান এমন কিছু ড্রোন এবং মিসাইল সিস্টেম তৈরি করেছে, যা সরাসরি ইসরায়েল বা মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত করতে সক্ষম। এখানে একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ হলো ‘পেট্রো-ইউয়ান’, যা মার্কিন ‘পেট্রো-ডলার’-এর একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে অনৈক্যই আমাদের বড় দুর্বলতা। সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক মিলে যদি একটি ‘ইসলামিক ন্যাটো’ গঠন করতে পারে এবং নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিজেরা নিতে পারে, তবেই বিশ্বে আমাদের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার সম্ভব।
এশিয়া পোস্ট: আমরা দেখেছি যে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচিত সরকার আসার পর সেই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের গতি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। আপনি কি মনে করেন রাজনৈতিক দলগুলো আসলে প্রকৃত সংস্কার চায়?
ডেল এইচ খান: এটি একটি রূঢ় বাস্তবতা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রকে সুস্থ করার জন্য যে ‘প্রেসক্রিপশন’ বা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা দল বিএনপি দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনই জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা সংবিধান সংস্কারের ওই শপথ নেবে না। তারা সংস্কারের এই প্রেসক্রিপশনটি শুরুতেই ফেলে দিতে চাইছে। আমি মনে করি, সিস্টেম সংস্কার না করে কেবল নির্বাচন দিলে আমরা আবারও সেই একই পচা রাজনৈতিক চক্রে আবর্তিত হব। যদি পুলিশ বা নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী না করা হয়, তবে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে। মনে রাখতে হবে, পচা ভিত্তির ওপর কখনোই টেকসই কোনো ইমারত নির্মাণ করা সম্ভব নয় এবং যে জাতি বীরদের সম্মান দিতে জানে না, সেখানে বীর জন্মায় না।
এশিয়া পোস্ট: দেশের বিচার বিভাগ নিয়ে আপনি সবসময় সোচ্চার। বিশেষ করে সাবেক সেনাকর্মকর্তাদের বিচার বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিচার প্রক্রিয়ায় যে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়, তা নিরসনে আপনার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা কী?
ডেল এইচ খান: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমে থাকলে চলবে না, এর প্রয়োগ থাকতে হবে। বাংলাদেশে বিচার বিভাগকে সবসময় নির্বাহী বিভাগের একটি বর্ধিত অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোতে সরকারের সবুজ সংকেত ছাড়া কোনো রায় আসত না। আমরা প্রস্তাব করেছি, প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন কমিশন থাকতে হবে যেখানে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না।
এছাড়া উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও সততাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, দলীয় আনুগত্যকে নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। আমলাতন্ত্র এবং বিচার বিভাগের এই যে অশুভ আঁতাত, তা ভাঙতে হবে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো এবং ডিজিটাল সিস্টেম চালু করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিচারে বিলম্ব মানেই ন্যায়বিচারের অমর্যাদা।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সেক্টর কমান্ডারদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিশেষ করে মেজর জলিলের মতো বীরদের আমরা যথাযথ সম্মান দিতে পারিনি। এই বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ডেল এইচ খান: এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি ট্র্যাজিক অধ্যায়। মেজর এমএ জলিল ছিলেন ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার। একজন সেক্টর কমান্ডার হওয়া সত্ত্বেও তাকে কেন ‘বীর উত্তম’ খেতাব দেওয়া হলো না, তার কোনো সদুত্তর বিগত সরকারগুলো দিতে পারেনি। যুদ্ধের ময়দানে তার বীরত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু স্বাধীনতার পর ভারতীয় বাহিনীর লুণ্ঠনের প্রতিবাদ করায় তাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। এটি ছিল একজন দেশপ্রেমিক সৈনিকের জন্য চরম অপমানজনক।
পরবর্তী সরকারগুলোও এই অন্যায়টি সংশোধন করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। মেজর জলিল আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার অবদান চিরকাল অম্লান থাকবে। আমাদের দাবি হলো—অবিলম্বে রাষ্ট্রীয়ভাবে তার বীরত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে মরণোত্তর ‘বীর উত্তম’ খেতাব প্রদান করা হোক। একজন বীরকে তার প্রাপ্য সম্মান দিলে রাষ্ট্রের মর্যাদা কমে না বরং বাড়ে। আমরা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় এবং বর্তমান সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি—এই ঐতিহাসিক ভুলটি সংশোধন করার এখনই সময়। এটি কেবল মেজর জলিলের প্রতি সম্মান নয়, বরং এটি পুরো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।
এশিয়া পোস্ট: পার্বত্য চট্টগ্রাম বা সীমান্ত এলাকায় অস্থিরতা তৈরির নেপথ্য কী?
ডেল এইচ খান: অবশ্যই। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি সবসময়ই ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সবসময়ই চেষ্টা করে এই অঞ্চলটিকে অশান্ত রাখতে, যাতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ সংকটে ব্যস্ত থাকে। ‘কুকি-চিন’ বা অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর হঠাৎ উত্থান এবং তাদের হাতে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র আসা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এর পেছনে বাইরের ইন্ধন ও অর্থায়ন রয়েছে।
আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও পেশাদার হতে হবে। গত ১৭ বছরে আমাদের গোয়েন্দা বিভাগকে কেবল বিরোধী দল দমনের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। সীমান্ত এলাকায় বিজিবিকে আরও আধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত করতে হবে এবং ড্রোন নজরদারি বাড়াতে হবে। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই। পাহাড়ের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন এবং গোয়েন্দা তৎপরতা—উভয় ক্ষেত্রেই সমন্বয় প্রয়োজন।
এশিয়া পোস্ট: ভারত ও চীনের মধ্যকার প্রতিযোগিতার মাঝে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে?
ডেল এইচ খান: আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়’। কিন্তু গত দেড় দশকে আমরা দেখেছি, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ছিল মূলত একদেশকেন্দ্রিক। একটি নির্দিষ্ট প্রতিবেশী দেশের তুষ্টির ওপর ভিত্তি করে আমাদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হতো, যা আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য শুভকর ছিল না। চীন ও ভারত—উভয় দেশই আমাদের উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে, কিন্তু কাউকেই আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
আমাদের উচিত হবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা। চীনের কাছ থেকে আমরা প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিতে পারি, আবার ভারতের সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে সম্মান জানিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখতে পারি। তবে মনে রাখতে হবে, ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটির নামে দেশের নিরাপত্তা যেন বিঘ্নিত না হয়। আমাদের সমুদ্রসীমা এবং ব্লু-ইকোনমি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বেরও গভীর আগ্রহ রয়েছে। তাই কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আমাদের কূটনীতি সাজাতে হবে। যে রাষ্ট্র আমাদের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করবে, আমরা তাদের সঙ্গেই গভীর বন্ধুত্ব রাখব।
এশিয়া পোস্ট: তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি বা গঙ্গার পানি চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের যে অমীমাংসিত সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলো সমাধানে আপনার দলের বা আপনার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি কী?
ডেল এইচ খান: পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া আমাদের আন্তর্জাতিক অধিকার। ভারত আমাদের উজানের দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক নদী আইন মেনে চলতে বাধ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা বছরের পর বছর কেবল আলোচনার কথা শুনি, কাজের কাজ কিছুই হয় না। শুষ্ক মৌসুমে আমরা পানি পাই না, আবার বর্ষাকালে যখন ভারত বাঁধ খুলে দেয়, তখন আমাদের উত্তরাঞ্চল প্লাবিত হয়। এটি এক ধরনের আগ্রাসন।
বর্তমান সরকারের উচিত হবে এই বিষয়টি কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক ফোরামে নিয়ে যাওয়া। বিশেষ করে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক আদালতে এই সমস্যাটি উত্থাপন করা প্রয়োজন। আমাদের দেশেও পানির বিকল্প উৎস তৈরি করতে হবে, ড্রেজিং বা নদী খননের মাধ্যমে আমাদের নদীগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে। গঙ্গার পানি চুক্তির নবায়ন বা তিস্তা চুক্তি যদি আমাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তবে সেটি আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। পানি নিয়ে রাজনীতি করে একটি স্বাধীন দেশকে মরুভূমি বানানোর অধিকার কারও নেই।
এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি দেশের অর্থনৈতিক সংকট এবং ডলার সংকট নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এখন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আপনি এই অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে কীভাবে দেখেন?
ডেল এইচ খান: বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মূলত কৃত্রিমভাবে তৈরি। গত ১৭ বছরে দেশ থেকে যেভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে, তার ফলে ব্যাংকিং খাত আজ ধ্বংসের মুখে। বড় বড় মেগা প্রজেক্টের নামে যে লুটপাট হয়েছে, তার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। ডলার সংকটের মূল কারণ হলো আমাদের রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় অনেক বেশি দেখানো হয়েছে এবং সেই বাড়তি অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
অর্থনীতি সংস্কারের জন্য প্রথমেই আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরকে মাফিয়াদের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর আইন করতে হবে এবং যারা টাকা পাচার করেছে, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে যাতে প্রবাসীরা হুন্ডির পরিবর্তে বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহী হন। আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো কৃষি এবং পোশাক শিল্প। এই দুই খাতের শ্রমিক ও কৃষকদের জীবনমান উন্নত না করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। মনে রাখবেন, কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন থাকলে তার রাজনৈতিক স্বাধীনতাও হুমকির মুখে পড়ে।
এশিয়া পোস্ট: তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জির রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
ডেল এইচ খান: আমি এই তরুণ প্রজন্মের ওপর অত্যন্ত আশাবাদী। ৫ আগস্ট তারা প্রমাণ করেছে যে, তারা কেবল কিবোর্ডে টাইপ করতে জানে না, বরং রাজপথে নেমে স্বৈরাচারকে উৎখাত করতেও জানে। প্রথাগত রাজনীতির যে নোংরামি, চাটুকারিতা এবং পেশিশক্তির ব্যবহার—তরুণরা তা ঘৃণা করে। তারা চায় একটি মেধাভিত্তিক এবং স্বচ্ছ রাষ্ট্রব্যবস্থা।
আমরা ‘জনতার দল’ থেকে সবসময় তরুণদের উৎসাহিত করি। আমাদের লক্ষ্য হলো আগামী নির্বাচনে অন্তত ৫০ শতাংশ তরুণ প্রার্থী দেওয়া যারা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবে। তরুণদের কেবল স্লোগান দেওয়ার জন্য বা মিছিল করার জন্য ব্যবহার করার দিন শেষ। এখন সময় তাদের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে আসার। তরুণরা যদি রাজনীতিতে না আসে, তবে মেধাহীনরাই দেশ শাসন করবে, যা আমাদের জন্য হবে ভয়াবহ। তাই আমি তরুণদের বলব—রাজনীতি থেকে দূরে থাকবেন না, বরং রাজনীতিকে শুদ্ধ করতে আপনারা এগিয়ে আসুন।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতে আপনার সুনির্দিষ্ট মতামত কী?
ডেল এইচ খান: প্রতিরক্ষা নীতি কেবল অস্ত্র কেনা নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল। আমাদের প্রতিরক্ষা নীতি হতে হবে প্রতিরোধমূলক। অর্থাৎ, আমাদের সামরিক শক্তি এমন পর্যায়ে থাকতে হবে যেন কোনো শত্রু রাষ্ট্র আমাদের আক্রমণ করার সাহস না পায়। গত কয়েক দশকে আমাদের প্রতিরক্ষা নীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করেছে।
আমাদের সামরিক বাহিনীকে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আলোকে পুনর্গঠন করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের নৌবাহিনীকে একটি শক্তিশালী ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে আমাদের বিশাল সমুদ্রসীমার সম্পদ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। আকাশ প্রতিরক্ষায় আমাদের চরম দুর্বলতা রয়েছে; ড্রোন প্রযুক্তি এবং মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমে আমাদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এছাড়া সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জীবনমান ও পেশাদারিত্বের দিকেও নজর দিতে হবে। সৈনিকদের আবাসন, শিক্ষা এবং চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা এমন হতে হবে যেন তারা নিশ্চিন্তে দেশের জন্য জীবন দিতে পারে। আমরা চাই একটি স্মার্ট এবং আধুনিক সেনাবাহিনী, যারা বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে যেমন সফল হবে, তেমনি দেশের সীমানা রক্ষায়ও হবে অপরাজেয়।
এশিয়া পোস্ট: আপনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং আপনার লেখায় প্রায়ই ‘বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশ’ নিয়ে কথা বলেন। এই বিপ্লবের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সবচেয়ে বড় বাধা কোনটি বলে আপনি মনে করেন?
ডেল এইচ খান: বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় বাধা হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনও সেই ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারার মানুষ রয়ে গেছে যারা ফাইল আটকে রাখে বা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে প্রতিহিংসার সংস্কৃতি, তা বড় বাধা। এক দল ক্ষমতায় গিয়ে অন্য দলকে নির্মূল করার যে খেলা বাংলাদেশে চলে আসছে, তা বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষ কখনোই বিপ্লবের সুফল পাবে না।
আরেকটি বড় বাধা হলো দুর্নীতি। ৫ আগস্টের পর অনেক জায়গায় চাঁদাবাজির হাতবদল হয়েছে মাত্র, কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত আইনের শাসন এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর না হবে, ততক্ষণ সাধারণ মানুষের মুক্তি নেই। আমাদের দরকার একটি জাতীয় ঐক্য, যেখানে দল-মত নির্বিশেষে সবাই দেশের স্বার্থে কাজ করবে। বিপ্লব মানে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বিপ্লব মানে হলো মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
এশিয়া পোস্ট: একজন লেখক এবং বিশ্লেষক হিসেবে আপনি পাঠকদের জন্য অনেক কাজ করেছেন। আপনার ভবিষ্যৎ লেখালেখি বা গবেষণার কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে কি?
ডেল এইচ খান: হ্যাঁ, আমি বর্তমানে বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাস এবং ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পেছনের না বলা ঘটনাগুলো নিয়ে একটি বইয়ের কাজ করছি। আমি চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানুক কীভাবে একটি জাতি একতাবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচারকে পরাজিত করেছিল। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছি। রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও আমি আমার কলম থামিয়ে দিতে চাই না। কারণ কলম হচ্ছে সত্য প্রকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।
এশিয়া পোস্ট: এশিয়া পোস্টের দর্শকদের উদ্দেশ্যে আপনার কোনো মন্তব্য থাকলে বলবেন।
ডেল এইচ খান: আমি দেশবাসীকে বলব—আপনারা হতাশ হবেন না। ৫ আগস্ট আমাদের যে নতুন সুযোগ দিয়েছে, তা যেন আমরা হাতছাড়া না করি। রাষ্ট্র সংস্কারের এই প্রক্রিয়ায় আপনাদের সচেতন থাকতে হবে। সরকারকে যেমন সহযোগিতা করতে হবে, তেমনি তাদের ভুলগুলোও ধরিয়ে দিতে হবে। আমরা ‘জনতার দল’ থেকে একটি বৈষম্যহীন, ইনসাফভিত্তিক এবং সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিয়েছি। আপনাদের সমর্থন ও দোয়া থাকলে আমরা ইনশাআল্লাহ সফল হব। বীর শহীদদের স্বপ্ন আমরা বৃথা যেতে দেব না। মনে রাখবেন, দেশটা আমাদের সবার, তাই একে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের সবার।
এশিয়া পোস্ট: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের স্টুডিওতে আসার জন্য এবং এত গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে আপনার মূল্যবান মতামত ও বিশ্লেষণ তুলে ধরার জন্য।
ডেল এইচ খান: আপনাকে এবং এশিয়া পোস্টের সব কলাকুশলীকেও অনেক ধন্যবাদ। আল্লাহ হাফেজ।



