জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে আলোচনায় আসেন জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সমসাময়িক ইস্যুতে আলোচনায় বক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে নরসিংদী-২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এশিয়া পোস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘আলাপন’-এ সারোয়ার তুষার এসেছিলেন অতিথি হয়ে। কথা বলেছেন রাজনীতি, নির্বাচন, তরুণদের রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাহাত রূপান্তর
এশিয়া পোস্ট: কেমন আছেন?
সারোয়ার তুষার: জি, ভালো আছি।
এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই। এই নির্বাচন সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা অর্জন করতে পেরেছে বলে মনে করেন?
সারোয়ার তুষার: অনেক দিন পরে বাংলাদেশে একটি নির্বাচন হয়েছে। টানা তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এই নির্বাচন ঘিরে মানুষের মধ্যে বেশ আশা ও উদ্দীপনা ছিল। আমার মনে হয় বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোট দিতে গিয়েছে। মানুষের অংশগ্রহণের দিক থেকে বলতে গেলে বোঝা যায় যে, দীর্ঘদিন ধরে মানুষ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চাইছিল এবং সেই প্রত্যাশা অন্তত আংশিকভাবে পূরণ হয়েছে। তবে মানুষ কেন ভোট দেয়, সেই প্রশ্নটাও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ চায় তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত হোক। সেই প্রত্যাশাগুলো কতটা পূরণ হবে, তা সামনে বোঝা যাবে। আপাতত বলা যায়, নাগরিক হিসেবে মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার, অর্থাৎ ভোটাধিকার, তারা প্রয়োগ করতে পেরেছে। এই দিক থেকে বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচক। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হলো ভবিষ্যতে যেন এই ভোটাধিকার আর কখনো বাধাগ্রস্ত না হয় এবং নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে নির্বাচন আয়োজন করা যায়।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের পর বিরোধী মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে যে, এই নির্বাচনেও নানাভাবে পরিকল্পিত কার্যক্রম হয়েছে এবং ফলাফলে প্রভাব ফেলতে নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আপনার পর্যবেক্ষণে এমন কিছু কি ঘটেছে?
সারোয়ার তুষার: ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ আছে। তবে আমি বলব, ভোটের দিন মাঠে মানুষের ভোট দেওয়া এবং ভোট গণনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানদণ্ডে যে ধরনের সুষ্ঠু নির্বাচন আমরা আশা করি, সে ধরনের নির্বাচনই হয়েছে। তবে ফলাফল ঘোষণার সময় কোনো ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে কি না, সেটি প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ আসছে। কিন্তু তাদের উচিত প্রতিটি কেন্দ্র বা আসনভিত্তিক প্রমাণ সংগ্রহ করা, যাতে তাদের বক্তব্য শক্ত ভিত্তি পায়। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কথা বললে তা খুব বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। কংক্রিট প্রমাণ থাকলে তবেই বিষয়টি অর্থবহ হবে। তবে মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনটি অবিশ্বাস্য রকমের সুষ্ঠু হয়েছে। কোনো বড় ধরনের সহিংসতা ছিল না। কিছু ভয়ভীতি অবশ্যই ছিল, যা আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, কিন্তু সামগ্রিকভাবে নির্বাচনটি সহিংসতামুক্ত ছিল। সেই দিক থেকে এটি একটি অর্জন। প্রধান উপদেষ্টা যখন বলেছিলেন তিনি একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন করবেন, তখন আমরা খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম না। কিন্তু অন্তত মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনটি যথেষ্ট সুষ্ঠু হয়েছে। ফলাফল নিয়ে যে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আলোচনা আছে, তা প্রমাণের ওপর নির্ভর করবে।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের পর সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে যতটা আলোচনা হচ্ছে, তার চেয়েও বেশি আলোচনা হচ্ছে নির্বাচনের পর থেকেই আওয়ামী লীগের পুনরায় সক্রিয় হওয়া নিয়ে। বিভিন্ন জায়গায় তাদের কার্যালয় খোলার ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন? একই সঙ্গে একটি প্রশ্ন উঠছে, বিএনপি কি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট পাওয়ার কারণে তাদের প্রতি কিছুটা সহনশীল আচরণ করছে?
সারোয়ার তুষার: এটি কোনো অভিযোগ নয়, আমরা বাস্তবেই দেখছি বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের অফিস খুলে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির নেতারাও সেখানে উপস্থিত থেকেছেন। পঞ্চগড়সহ কয়েকটি জায়গায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। আজও খবর এসেছে, আওয়ামী লীগের একজন নেতাকে কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় ফুলের মালা দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন একজন সংসদ সদস্য। আমার মনে হয় না বিএনপি এটি কৃতজ্ঞতার জায়গা থেকে করছে। রাজনীতিতে কৃতজ্ঞতার ধারণা খুব বেশি কার্যকর নয়। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক কৌশল। সেই কৌশল হলো আওয়ামী লীগের যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংগঠনিক লোকবল রয়েছে, সেটি ধীরে ধীরে নিজেদের প্রভাবের ভেতরে নিয়ে আসা। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, আওয়ামী লীগের অনেক ব্যবসা এখন বিএনপির প্রভাবের মধ্যে চলে গেছে এবং তাদের অনেক কর্মীকেও আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। আরেকটি দিক হলো, আওয়ামী লীগকে কিছুটা রাজনৈতিক স্পেস দিয়ে মূলত এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো শক্তিগুলোকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিএনপি বিরোধী দল হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এনসিপি যে ধরনের নতুন রাজনীতি বা তরুণদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে, সেটির সঙ্গে বিএনপি তেমন অভ্যস্ত নয়। তারা রাজপথের দখল ও সহিংসতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে বেশি অভ্যস্ত। এখন তারা সরকারে আছে। তারা মনে করছে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সেটিকে সামাল দেওয়া যাবে। কিন্তু এনসিপির উত্থানকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তবে আমার ধারণা এই হিসেব একসময় বুমেরাং হতে পারে। কারণ আওয়ামী লীগকে যদি তারা সাধারণ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করে স্পেস দেয়, তাহলে সেটি ভবিষ্যতে বিএনপির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এশিয়া পোস্ট: তাহলে কি বলা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে দুই বড় শক্তির কথা বলা হয়, তার কাঠামো বদলে যাচ্ছে এবং সেখানে নতুন শক্তি হিসেবে এনসিপি বা জামায়াতের উত্থানের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে?
সারোয়ার তুষার: এনসিপির উত্থান নির্ভর করবে তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতার ওপর। তবে বিএনপির রাজনৈতিক হিসাব ভুল প্রমাণিত হতে পারে। বিএনপির রাজনীতি মূলত মধ্যমপন্থি ডান ধারার, যেখানে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ। এখন তারা যদি সেকুলার বা প্রগতিশীল ব্লকের সমর্থন পেতে বাম দিকে ঝুঁকে যায়, তাহলে তাদের মূল সমর্থকগোষ্ঠীর একটি অংশ এনসিপি বা জামায়াতের দিকে সরে যেতে পারে। তখন বিএনপিকে আওয়ামী লীগের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সুযোগ পেলেই বিএনপিকে ছেড়ে দেবে। বিএনপির যে সুবিধাবাদী রাজনীতি দেখা যাচ্ছে, তার ফল হয়তো পাঁচ বা দশ বছর পরে স্পষ্ট হবে। বিএনপি যখন বাম দিকে সরে যাচ্ছে, তখন মাঝামাঝি রাজনৈতিক অবস্থানের একটি শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। এনসিপি সেই জায়গাটি পূরণ করতে পারে। আমরা দেখব ঈদের পর বিএনপি আরও আগ্রাসী রাজনৈতিক অবস্থান নেবে। তখন তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ হতাশ হয়ে বিকল্প খুঁজতে পারে এবং সেই জায়গায় এনসিপি যদি সক্ষমতা দেখাতে পারে, তাহলে তাদের জন্য সুযোগ তৈরি হবে। আমরা চাই প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি থাকুক, কিন্তু সেটি যেন সহিংসতামুক্ত হয়।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ফেরার খবরের পাশাপাশি একাধিক স্থানে বিএনপির কর্মী-সমর্থক নিহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীকে এই বিষয়ে খুব একটা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে দেখা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
সারোয়ার তুষার: যারা বলছে আওয়ামী লীগ খুব দ্রুত ফিরে আসবে, তাদের অনেকেই আসলে সেই প্রত্যাবর্তনই দেখতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা খুব শক্ত নয়। তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং বিগত তিন নির্বাচনের অনেক সংসদ সদস্যই নানা অপরাধের অভিযোগের সঙ্গে জড়িত। এখন প্রশ্ন হলো, তাদের বিকল্প নেতৃত্ব কোথা থেকে আসবে। ১৯৭৫ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা ঠিক হবে না। তখন তারা নিজেদের ভিকটিম হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিল। এখন সে অবস্থান তাদের নেই। আওয়ামী লীগের ভেতরে এমন নির্দাগ নেতৃত্ব খুব বেশি নেই, যারা সহজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যদি আমরা রাজনৈতিক স্পেস ধরে রাখতে পারি, তাহলে তাদের ফিরে আসা সহজ হবে না। প্রধানমন্ত্রীর নীরবতার প্রসঙ্গে বলতে গেলে, তারেক রহমান ব্যক্তিগত ইমেজ বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। কিন্তু বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন যেমন—জুলাই সনদ, গণভোট বা সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান দিচ্ছেন না। শুধু মিডিয়ায় ব্যক্তিগত জীবনধারা দেখানো বা জনসংযোগের মাধ্যমে রাজনীতি চালানো দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোট নিয়ে বিএনপির অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা আছে। আপনার দৃষ্টিতে তাদের অবস্থান কী?
সারোয়ার তুষার: আমার মনে হয় বিএনপির অবস্থান শুধু অস্পষ্ট নয়, কিছুটা প্রতারণামূলকও। তারেক রহমান গণভোটের পক্ষে সমর্থন চেয়েছিলেন এবং মানুষও ভোট দিয়েছে। কিন্তু এখন তিনি সেটিকে আদালতের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এটি এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল বা চাতুরী। বিএনপির ইতিহাসে গণভোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে। কিন্তু এখন তারা বিষয়টিকে ঘোলাটে করছে। রাজনৈতিক প্রশ্নকে আদালতের ওপর ছেড়ে দিলে সরকার নৈতিক অবস্থান থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এশিয়া পোস্ট: তারেক রহমানের জনসংযোগ ও জনঘনিষ্ঠতার প্রচেষ্টা আপনি কীভাবে দেখছেন?
সারোয়ার তুষার: তিনি নতুন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো মোকাবিলা না করলে এই প্রচেষ্টা খুব কার্যকর হবে না। জিয়াউর রহমানের একটি রাষ্ট্র প্রকল্প ছিল। কিন্তু তারেক রহমানের ক্ষেত্রে আমরা সে ধরনের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দেখি না। বরং কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো ধরনের দখলদারিত্বের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে যাদের বসানো হয়েছে, তারাই আবার সামনে নির্বাচন করবেন। এটি নতুন কোনো রাজনৈতিক দর্শন নয়। তিনি হয়তো বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত অনেক কিছুই বেশ ক্লিশে মনে হচ্ছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের যে রাজনৈতিক মানদণ্ড ছিল, অন্তত সে মানদণ্ড পূরণ করা জরুরি।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের আগে ও পরে চাঁদাবাজির পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। আপনার পর্যবেক্ষণে এই পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি?
সারোয়ার তুষার: আমার মনে হয় চাঁদাবাজি কমেনি। খুলনায় ডিশ ব্যবসার দখল নিয়ে হুমকির ঘটনা আমরা দেখেছি। বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে হুমকি দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। অনেকেই নির্ভয়ে এসব করছে। মন্ত্রী যে ‘সমঝোতার’ কথা বলেছেন, সেটি আমার কাছে ভুল মনে হয়েছে। বরং তার উচিত ছিল সিস্টেম সংস্কারের কথা বলা। অনেক সময় কল্যাণ সমিতির নামে যে টাকা তোলা হয়, সেটির চাপ শেষ পর্যন্ত যাত্রী বা সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। অথচ সেই অর্থ শ্রমিকদের প্রকৃত কল্যাণে খুব বেশি ব্যবহৃত হয় না।
এশিয়া পোস্ট: আপনারা সংসদে বিরোধী দলের অংশ হয়েও অনেকের মতে খুব সক্রিয়ভাবে দেখা যাচ্ছেন না। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
সারোয়ার তুষার: আমরা নীরব নই। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোতে এনসিপি নিয়মিত প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। আমাদের বিভিন্ন ইফতার আয়োজনে রাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। রমজানের সময় স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা কম দৃশ্যমান হয়, কারণ অনেক কিছুই ইফতারকেন্দ্রিক হয়ে যায়। তবে গণভোট নিয়ে সরকারের যে গড়িমসি, সে বিষয়ে আমরা সমালোচনা করেছি। এছাড়া নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে মামলার বিষয়েও আমরা অবস্থান জানিয়েছি। আমরা বলেছি, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরে আসুক তা আমরা চাই না। বিএনপি ওই ঘটনার পর শোকজ করেছে, যা ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ।
এশিয়া পোস্ট: নরসিংদী-২ আসনে নির্বাচনের সময় আপনার সঙ্গে জামায়াত প্রার্থীর অসহযোগিতার অভিযোগ ছিল। জোট রাজনীতির কথা বলা হলেও এই ধরনের দূরত্ব কেন তৈরি হয়েছিল?
সারোয়ার তুষার: জোটটি নির্বাচনের খুব অল্প সময় আগে হয়েছিল। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে বার্তা পৌঁছাতে সময় লেগেছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আন্তরিক ছিল। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী অন্য একটি পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে আমাকে হারানোর জন্য নানা কৌশল নিয়েছিলেন। তিনি শেষ পর্যন্ত মনোনয়নও প্রত্যাহার করেননি। ফলে ভোট বিভক্ত হয়ে যায়। আমি মনে করি দলটির উচিত বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনো বাস্তব পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন?
সারোয়ার তুষার: বাস্তব পরিবর্তন এখনো খুব বেশি হয়নি। তবে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে যে পুরোনো ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত, সেটিকে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু তরুণ সমাজ পরিবর্তন চায়। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই রাজনীতি এগোবে।
এশিয়া পোস্ট: তরুণদের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে আসার ক্ষেত্রে ঝুঁকি কতটা?
সারোয়ার তুষার: ঝুঁকি অবশ্যই আছে। হাদির ঘটনার মতো উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। তবুও তরুণরা ঝুঁকি নিতে জানে। গত এক বছরে আমাদের নিয়ে অনেক অপপ্রচার হয়েছে। কিন্তু মানুষ শেষ পর্যন্ত আমাদের গ্রহণ করেছে। তরুণরা যদি তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা এগিয়ে যাবে। যেমনটা আমরা হাদির মাঝে দেখেতে পেয়েছিলাম। গত দেড় বছরে তরুণরা যথেষ্ট পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: এনসিপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?
সারোয়ার তুষার: আমার মনে হয় এনসিপির সবচেয়ে বড় বাধা এনসিপি নিজেই। কারণ দলের অধিকাংশ নেতা প্রায় একই বয়সি। ফলে চেইন অব কমান্ড বজায় রাখা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের আহ্বায়ক অত্যন্ত মুন্সীয়ানার সঙ্গে সংগঠন পরিচালনা করছেন। তবে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা যেন সংগঠনকে দুর্বল না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এই মুহূর্তে সমাজে বিকশিত হওয়ার সব সুযোগ আমাদের আছে। আমাদের সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: আগামী দশ বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
সারোয়ার তুষার: আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। যখন গণঅভ্যুত্থান হলো, তখন মনে হয়েছে এটাই আমাদের সময় এবং তখনই সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি নিজেকে একজন জনপ্রতিনিধি নিজেকে চিন্তা করি। জনগণের পক্ষে নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে চাই। এবার ফলাফল আমার পক্ষে আসেনি। তবে সামনে আবার চেষ্টা থাকবে।
এশিয়া পোস্ট: তরুণদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
সারোয়ার তুষার: তরুণরা একটি ভিন্ন ধরনের দেশ চায়। পুরোনো ব্যবস্থা আমাদের খুব বেশি কিছু দিতে পারেনি। তাই আমাদের গ্রাউন্ড থেকে সংগঠিত হতে হবে। মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারলেই আমরা এগিয়ে যেতে পারব।
এশিয়া পোস্ট: আমাদের সঙ্গে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
সারোয়ার তুষার: আপনাকেও ধন্যবাদ।



