সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাহেদ আলম। প্রায় ৯ বছর প্রবাসে থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রেক্ষপটে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিপক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাক্টিভিজম করেছেন। জুলাই আন্দোলনে ছাত্রজনতাকে সাহস জুগিয়েছেন। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর দেশে ফিরে নিয়মিত গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। সমসাময়িক ও আগামীর রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে এশিয়া পোস্টের আয়োজন ‘আলাপন’—এ অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।
এশিয়া পোস্ট: আপনার বেড়ে ওঠার এবং সাংবাদিকতার শুরু কেমন ছিল?
সাহেদ আলম: আমি মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম একজন ব্যারিস্টার বা বিচারক হতে। সেই লক্ষ্যেই পড়াশোনা করতাম। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় আমার মেধা তালিকায় অবস্থান ছিল ১২৮, যার ফলে আমি ল ডিপার্টমেন্টে পড়ার সুযোগ পাইনি। তখন হঠাৎ করেই মনে হলো সাংবাদিকতা পড়ব। আমার সাতক্ষীরার বাড়িতে একজন ব্যাংকার ভাড়া থাকতেন। ছোটবেলায় যখন অন্যরা খেলাধুলা করত, আমি তখন উপন্যাস, গান বা কবিতা লিখতাম। এটি দেখে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘সুযোগ হলে সাংবাদিকতা পড়ো, তোমার মেধার বিকাশ হবে।’ ভাইভায় গিয়ে যখন দেখলাম এলএলবি পেলাম না, তখন ভাবলাম সাংবাদিকতাই ট্রাই করি। আমি ১৯৯৬ সালে প্রথম ঢাকায় আসি এবং তিতুমীর কলেজে পড়াশোনা করি, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। আমার লক্ষ্য ছিল নিজের উৎকর্ষ বৃদ্ধি এবং দেশের প্রয়োজনে কাজ করা। ব্যারিস্টার হয়ে হয়তো তা করতে পারতাম না, তবে এই পেশাতেও আমি অনেকখানি করতে পেরেছি বলে মনে করি।
এশিয়া পোস্ট: সাংবাদিকতায় এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কোনটা ছিল?
সাহেদ আলম: আমি অনেক চ্যালেঞ্জিং মুহূর্ত পার করেছি। ২০০৩ সালে বিবিসির ইন্টার্ন হিসেবে কাজ শুরু করি এবং পরে এনটিভিতে আসি। বিবিসির প্র্যাকটিক্যাল জার্নালিজম আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মিশেলে আমি যে রিপোর্টগুলো করেছি, সেগুলোই আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে ২০০৭ সালের সিডর কাভার করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। মোংলা ও দুবলার চর থেকে করা সেই কাভারেজ আমাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার এনে দেয়। এ ছাড়া চ্যানেল ২৪-এ থাকাকালীন ২০১৪ সালের নির্বাচন কাভার করা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। রানা প্লাজা ধসের সময় মৃতদেহের পচা গন্ধের মধ্যে এক কাপড়ে টানা ছয় দিন লাইভ করা এবং খুঁটিনাটি বের করে আনাও অনেক কঠিন ছিল। এ ছাড়া শেখ হাসিনার গত ১০ বছরের শাসনকালে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এশিয়া পোস্ট: সাংবাদিকতা করতে গিয়ে কেন দেশান্তরী হতে হলো?
সাহেদ আলম: এটি ছিল ধারাবাহিক ঘটনার পরম্পরা। ২০০৮ সালের নির্বাচন আপাতত ভালো মনে হলেও আমি তখন থেকেই কথা বলা শুরু করি। ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল আমার নিজের চোখে দেখা ভোটারবিহীন একটি সাজানো নির্বাচন। শত শত মানুষের লাইন থাকলেও ভেতরে ভোট পড়ত না। এই সত্য তুলে ধরার পর থেকেই আমি ক্ষমতাসীন দলের টার্গেটে পরিণত হই। নানাভাবে হেনস্তা করা, অফ স্ক্রিনে রাখা, ডিজিএফআই দিয়ে চাপ দেওয়া এবং মোটরসাইকেল বাহিনী লেলিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল।
এশিয়া পোস্ট: আপনি যখন প্রবাসে ছিলেন, সেই সময় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোনো প্রলোভন বা অফার পেয়েছিলেন কি না?
সাহেদ আলম: আমি যদি নিজেকে বিক্রি করে দিতে চাইতাম, তবে সেই সময় আমার চেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়তো আর কেউ হতো না। আওয়ামী লীগের লোকজন আমাকে অপছন্দ করলেও তারা জানত যে আমি যুক্তি ও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে কথা বলি। তারা আমার প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচন আমি একাই সোশ্যাল মিডিয়ায় চ্যালেঞ্জ করেছিলাম এবং মানুষকে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিলাম। আমি নেতা হতে চাইনি, নেতা তৈরি করতে চেয়েছিলাম। ২০২৪-এর আন্দোলনে যারা ভূমিকা রেখেছে, এমনকি বিএনপির প্রতিষ্ঠিত তরুণ রাজনীতিবিদদের অনেকেই আমাকে বলেন যে আমি তাদের অনুপ্রাণিত করেছি।
এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত পিনাকি ভট্টাচার্য বা ইলিয়াস হোসাইনদের সঙ্গে আপনাদের একটা ঐক্য ছিল। ৫ আগস্টের পরেই আপনাদের মধ্যে বিভেদ তৈরির মূল কারণ কী?
সাহেদ আলম: এই বিভেদ হয়তো আমি নিজেই তৈরি করেছি, এটি একটি আদর্শিক লড়াই। ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর আমি দেখলাম যে ‘জয় বাংলার’ নামে করা ফ্যাসিবাদের জায়গায় ‘ধর্মের নামে ফ্যাসিবাদ’ প্রতিষ্ঠা করার একটা চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ হাসিনার ফ্যাসিবাদ খারাপ কিন্তু আমাদেরটা ভালো—এমন একটি মনোভাব তৈরি হচ্ছিল। মাজার পুড়িয়ে দেওয়া বা সংখ্যালঘুর অধিকার হরণ করার মাধ্যমে ধর্মের নামে সব জাস্টিফাই করার চেষ্টা আমি লক্ষ করেছি। আমরা তো এমন রাষ্ট্র কাঠামোর জন্য লড়াই করিনি। আমি চেয়েছি রাষ্ট্র সেকুলার থাকবে, যেখানে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার থাকবে এবং নারীর ওপর কোনো পোশাক চাপিয়ে দেওয়া হবে না। এই অবস্থানের কারণেই আমার সহযোগীদের সঙ্গে আমার বিভাজন তৈরি হয়।
এশিয়া পোস্ট: জামায়াত বা এনসিপি নিয়ে আপনার যে চিত্রায়ণ, এর পেছনে কোনো লক্ষ্য ছিল কি না?
সাহেদ আলম: লক্ষ্য অবশ্যই ছিল। রাজনীতি হলো বয়ানের খেলা। যখন দেখলাম রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হবে, তখন আমাকে এই অবস্থান নিতে হয়েছে। ধর্মের নামে ফ্যাসিবাদে একবার প্রবেশ করলে আগামী ১০০ বছরেও তা সরানো সম্ভব হবে না। ‘নারায়ে তাকবির’ বলে কেউ যখন আপনাকে আঘাত করবে, তখন প্রতিবাদ করার লোক পাবেন না কারণ তারা এটিকে ধর্মযুদ্ধ বানিয়ে ফেলবে। ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে মানুষকে ভুল পথে চালানো খুব সহজ।
এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের পর থেকে আপনার অ্যাক্টিভিজম সবকিছু বিএনপির পক্ষে। কেন?
সাহেদ আলম: যুক্তি একটাই—আওয়ামী লীগের পর ধর্মের নামে ফ্যাসিবাদকে আমি রাষ্ট্র কাঠামোয় ঢুকতে দেব না। বিএনপি ছাড়া এই মুহূর্তে এমন কোনো দল নেই যারা রাষ্ট্রকে মধ্যপন্থায় চালাতে পারে। আমি কখনোই জামায়াতে ইসলামীকে একটি ভ্যালিড পলিটিক্যাল ফোর্স মনে করি না। বিএনপিকে সফল হতে হবে কারণ তাদের গঠনটাই এমন যে তারা চাইলেও ফ্যাসিস্ট হতে পারবে না। তারা সংখ্যালঘু এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দায়বদ্ধ। তারেক রহমান নারী স্বাধীনতার অভিভাবক এবং বেগম জিয়া নারী শিক্ষার প্রতীক। জাইমা রহমান বা ডা. জোবাইদা রহমানের দ্বারা প্রভাবিত দলে নারীর মর্যাদা সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকবে।
এশিয়া পোস্ট: গুম অধ্যাদেশ বাতিল এবং গণভোট বাতিল হওয়া নিয়ে আপনি বর্তমান সরকারকে কীভাবে দেখছেন?
সাহেদ আলম: আমি তাদের আইডিয়াগুলোকে সমর্থন করছি। গুম কমিশন গঠন ভালো পদক্ষেপ, তবে জামায়াত ঘরানার স্কলার নাবিলা ইদ্রিসের নেতৃত্বে এই কমিশন সেনাবাহিনীর ভেতর একটি অস্বস্তি তৈরি করেছে। সেনাবাহিনীকে আস্থায় না নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কিছু পক্ষের এজেন্ডা ছিল সেনাবাহিনীকে ভেঙে ফেলা। কিন্তু বর্তমান সরকার গুম অধ্যাদেশ বাতিল করেনি, তারা বলেছে আরও কার্যকর কিছু করবে। আমি তাদের এই অবস্থানের পক্ষে।
এশিয়া পোস্ট: একটি ভাইরাল ভিডিওতে আপনাকে বিএনপি ও তারেক রহমানকে ‘দুর্বলতম’ বলতে দেখা যায়। এখন কেন তাদের পক্ষে কাজ করছেন?
সাহেদ আলম: সেটি ছিল একটি কাটপিস ভিডিও। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি যখন রাস্তায় নামতে পারছিল না এবং অল্প কয়েকটি আসন নিয়ে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, তখন আমি যৌক্তিক সমালোচনা করেছিলাম। তারেক রহমান এখন একজন অত্যন্ত শক্তিশালী নেতা, যার কথা বিদ্যুৎগতিতে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তখনকার পরিস্থিতির তুলনায় এখন বিএনপির অবস্থানে বিশাল পরিবর্তন এসেছে।
এশিয়া পোস্ট: তারেক রহমান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
সাহেদ আলম: তিনি একজন ‘ট্রেন্ড সেটিং’ লিডার হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয়েছেন। আমি নিজেকে জিয়াউর রহমানের সন্তান হিসেবে দেখি। জিয়াউর রহমান ৪৬ বছর বয়সে যা অর্জন করেছেন তা বিরল। আমি দেখছি তারেক রহমান এখন তার পিতার জায়গা নিচ্ছেন এবং তার ভিশন অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি হয়তো জিয়াউর রহমানকেও ছাড়িয়ে যেতে পারেন।
এশিয়া পোস্ট: জামায়াত আমিরের মন্তব্য যে নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে—এটি কি সত্যি?
সাহেদ আলম: এটি একেবারেই মিথ্যা এবং মনগড়া কথা। নেত্র নিউজের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও কোনো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রমাণ পায়নি। ইঞ্জিনিয়ারিং যদি হয়ে থাকে তবে হয়তো ওনার নিজের আসনেই হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: শাহবাগ থানায় ডাকসু নেতাদের ওপর ছাত্রদলের হামলার অভিযোগ এসেছে। এটি কি ‘মব’ নয়?
সাহেদ আলম: আমাদের দেশে এখন মব সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা মূলত চাপিয়ে দেওয়া জাস্টিস। জুবায়ের মুসাদ্দেকের ওপর যা হয়েছে তা মোটেও ঠিক হয়নি। তবে দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থায় যে ‘ইতরপনা’ আমরা দেখেছি, সেটিরই বহিঃপ্রকাশ এই গণমানুষের ক্ষোভ।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে মূল পার্থক্য কী দেখেন?
সাহেদ আলম: শিবির দাবি করে তারা মেধার সংগঠন, কিন্তু আমি তাদের মধ্যে কোনো মেধা বা সততা দেখি না। কোনোমতে জোড়াতালি দেওয়া একটি সংগঠন হিসেবে তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
এশিয়া পোস্ট: ইদানীং গুপ্ত ট্যাগ দিয়ে কি রাজনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে?
সাহেদ আলম: এটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরির অংশ। ৫ আগস্টের পর বিএনপিকে ভারতীয় দল হিসেবে ট্যাগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা চাই না গুপ্ত ট্যাগ দিয়ে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটুক।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপি সরকারের কোনো সমালোচনা কি আপনার আছে?
সাহেদ আলম: বিএনপি তাদের নিজস্ব সফলতাগুলো তুলে ধরার ক্ষেত্রে খুবই দুর্বল। গত কয়েক মাসে তারা অনেক ভালো কাজ করেছে, যেমন ৬৪ জন ডিসির মধ্যে ১৬ জন নারী এবং নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটেনি—কিন্তু তারা এগুলো প্রচার করতে পারছে না।
এশিয়া পোস্ট: 'সেন্ট্রিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক সংগঠনের সঙ্গে আপনি আছেন কি না?
সাহেদ আলম: এটি শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম। আমি সবখানেই মিশতে পারি। সেই হিসেবেই আমি সেখানে গিয়েছি।
এশিয়া পোস্ট: সরকারের কোনো পদে যাওয়ার অফার পেয়েছেন?
সাহেদ আলম: আমি নিজেকে এই সরকারেরই অংশ মনে করি। প্রধানমন্ত্রী আমাকে ডেকে সম্মানিত করেছেন এবং আমরা একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়েছি। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে আমার পরামর্শ চেয়েছেন এবং আমি তা দিয়েছি।
এশিয়া পোস্ট: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কী খেলেন?
সাহেদ আলম: ছোট মাছ, লাউ চিংড়ি, করলা ভাজি, দুই পিস মুরগির মাংস, পাতলা ডাল আর ভর্তা ছিল। তিনি হেসে বললেন, ‘ভাবি পাঠিয়েছে, চলেন একসঙ্গে খাই।’ একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে চড়ে ঘোরার এই সম্মান আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।
এশিয়া পোস্ট: এই ৩ মাসে সরকারকে ১০-এ কত দেবেন?
সাহেদ আলম: আমি সরকারকে ১০-এ ১০ দিতাম। তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের কারণে আমি এই মুহূর্তে তা করতে পারছি না। এই ছোটখাটো সীমাবদ্ধতা বাদ দিলে আমি তাদের পূর্ণ নম্বরই দেব।



