বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) উপাচার্য (ভিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কম্পিউটার প্রকৌশলী ড. এবিএম শওকত আলী। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘ ২৪ বছরের সফল এবং সম্ভাবনাময় একাডেমিক ক্যারিয়ার ছেড়ে বছর দেড়েক আগে দেশে ফিরে বিইউবিটির দায়িত্ব নেন তিনি। দেশীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা, শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ, মেধাসত্ত্বের অধিকার এবং দেশ থেকে মেধা পাচারসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে খোলামেলা আলোচনা করেছেন শওকত আলী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জায়েদ আল মাহবুব
এশিয়া পোস্ট: বিশ্বের নামিদামি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ২৪ বছরের সফল একাডেমিক ক্যারিয়ার আপনার। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার ফেলে দেশে ফিরে BUBT-এর দায়িত্ব নিলেন কোন ভাবনা থেকে? এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রেরণা পেলেন কীভাবে?
ড. শওকত আলী: ১৯৬৯ সালে আমি বর্তমান জামালপুর জেলার সদর উপজেলার রাজাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করি। আমার শৈশব এবং প্রাথমিক স্কুল জীবনটা ওখানেই কাটে। আমি আমার বাড়ির পাশেই একটা হাইস্কুলে পড়াশোনা করি। পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সুযোগ হয় এবং আমার শিক্ষাজীবনের অন্যতম সেরা সময় কেটেছিল ওই দুই বছর। এরপর আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সে সময় এখনকার মতো এত বেশি ফ্যাকাল্টি ছিল না। সায়েন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং মিলিয়ে একটিই ফ্যাকাল্টি ছিল এবং আমি ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করি।
আমার এই সূচনালগ্ন থেকেই মূলত শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নটি দানা বাঁধে। আমি শুনেছিলাম, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয় তারা সরাসরি শিক্ষক হয়ে যায়। আমি যেহেতু প্রথম হয়ে ভর্তি হয়েছি, তাই মনে মনে লক্ষ্য স্থির করলাম যে আমাকেও ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হতে হবে এবং শিক্ষক হতে হবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অনেক প্রিয় শিক্ষক ছিলেন, বিশেষ করে প্রফেসর সাইদুর রহমান খান স্যার এবং প্রফেসর আবুল হাশেম স্যারদের কথা আমি আজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা দেখে আমি কিছুটা আগ্রহ থেকেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়াতে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করি। সেখানে তিন বছর থাকার পর আমি অস্ট্রেলিয়ার নামকরা মোনাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার স্কলারশিপ পাই। মোনাস হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার ‘টপ এইট’ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি। সেখানে যাওয়ার পর আমার জীবনটা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। আজ অবাক লাগলেও সত্যি যে, কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও সে সময় আমার কোনো নিজস্ব ল্যাপটপ ছিল না। এমনকি আমাদের বিভাগেও শিক্ষার্থীদের জন্য কম্পিউটার বরাদ্দ থাকলেও শিক্ষকদের জন্য আলাদা কোনো কম্পিউটার ছিল না।
আমি অত্যন্ত গর্ববোধ করি যে আমি কৃষকের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছি এবং নানারকম প্রতিকূলতা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিদেশে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। অস্ট্রেলিয়ার সরকার ও সাধারণ মানুষের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ যে তারা তাদের করের টাকা দিয়ে আমাকে সহায়তা করেছিল। আমি যে বিষয়ে পিএইচডি করি তা আজকের সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় বিষয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এর গুরুত্ব বোঝাতে আমি প্রায়ই একটি উদাহরণ দেই—আপনি যদি মানবদেহের কোনো জায়গায় আঘাত করেন, তবে আসলে মস্তিষ্কে আঘাত লাগে। আপনার মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ না করলে আপনি ঢলে পড়ে যাবেন। আমরা মনে করি আমরা যখন দাঁড়াই তখন পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়াই, কিন্তু এটি পুরোপুরি সত্য নয়। আমাদের পা-কে আসলে দাঁড় করিয়ে রাখে আমাদের মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্কের সঙ্গে যদি আমি এআইকে তুলনা করি, তবে সেই মস্তিষ্কই হলো ‘মেশিন লার্নিং’।
মেশিন লার্নিংয়ের ওপর পিএইচডি করার সময়টি ছিল চরম পরিশ্রমের। এটি তখন একদম নতুন বিষয় ছিল। বহু দিনরাত আমি অনিশ্চয়তায় ভুগেছি, এমনকি একবার ভেবেছিলাম ডিগ্রি ছাড়াই দেশে ফিরে যেতে হবে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আমি ল্যাবে পড়ে থাকতাম। নিজস্ব কোনো গাড়ি ছিল না বলে কখনও সাইকেলে আবার কখনও হেঁটে ল্যাবে যাতায়াত করতাম। ঘুমের সময় ছিল দৈনিক মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। এই কঠিন সংগ্রামের ফলস্বরূপ আমি যখন পিএইচডি শেষ করি, তখন আমি মোনাস ইউনিভার্সিটির অ্যাওয়ার্ড পাই। এই সাফল্যের কারণে রেজাল্ট প্রকাশের আগেই আমি একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষকতার অফার পাই।
আমি মোনাস ইউনিভার্সিটি, সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি এবং ডিকন ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছি। পরবর্তী সময়ে ইউরোপ থেকে অফার থাকলেও আমি ফিজিতে শিক্ষকতা করতে যাই এবং সেখানে আমার ক্লাসরুমগুলো সব সময় শিক্ষার্থীপূর্ণ থাকত। কোভিডের সময় অস্ট্রেলিয়ায় ফিরলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার ফিজিতে ব্যাক করি। এরপর বাংলাদেশ সরকার ও বিইউবিটি ট্রাস্ট থেকে ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং আমি কোনো প্রশ্ন ছাড়াই এই বড় সুযোগটি লুফে নিই। আমি মনে করি, দীর্ঘ ২৪ বছর প্রবাসে থাকার পর এখন সময় হয়েছে আমার দেশের জনগণ ও ছাত্রদের কিছু দেওয়ার।
এশিয়া পোস্ট: অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত রাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশে শিক্ষকতা বেশ চ্যালেঞ্জিং পেশা। তারপরও দেশে ফিরলেন কিসের তাগিদে?
ড. শওকত আলী: বিদেশে থাকার সময় আমরা কয়েকটি জিনিস খুব বেশি মিস করি- নিজের দেশ, নিজের ধর্ম আর নিজের মাকে। প্রবাসে আমার ধর্মীয় চর্চাও অনেক বেড়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে আমার মনে একটি প্রশ্ন খুব নাড়া দিত। আমি আমার মেয়েকে অস্ট্রেলিয়াতে পড়াচ্ছিলাম এবং তার স্কুলের বার্ষিক টিউশন ফি দিতে হতো ৫০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার। অথচ আমার দেশের সরকার আমাকে নামমাত্র খরচে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা দিয়েছে। হলে থাকার সময় ডাবল বেডের রুমে থেকে মাসে মাত্র ২০ টাকা দিতাম। পৃথিবীর আর কোথাও এমন অকল্পনীয় সুবিধা পাওয়া যাবে কি না আমার জানা নেই। আমার সরকার ও এ দেশের মানুষ আমাকে ঋণী করেছে এবং আমি বিশ্বাস করি, এই ঋণ শোধ না করে মারা যাওয়া ঠিক হবে না। মূলত সেই নৈতিক দায়বদ্ধতা ও ঋণ শোধের তাগিদেই আমি দেশে ফিরে এসেছি।
এশিয়া পোস্ট: বিইউবিটির ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্বে দেড় বছর পার করেছেন। এ সময়কালে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কতটা এগিয়ে নিতে পেরেছেন? নিজের কার্যক্রম কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ড. শওকত আলী: আমাদের দেশে পেশার মূল্যায়ন নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণা আছে। যেমন একটি মেয়ে মেডিকেল পড়লে আমরা তাকে অনেক সম্মান দিই, কিন্তু নার্সিং পড়লে তাকে ভিন্ন চোখে দেখি—এটা অন্যায়। উন্নত বিশ্বে নার্সরা ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কার এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা চিকিৎসকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেখানে তাদের বেতনের পার্থক্যও খুব সামান্য। আমি মনে করি, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময় এসেছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আগে মানুষের মনে যে নেতিবাচক ধারণা ছিল, তা এখন ইতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে অর্ধেকের বেশি বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারি এবং সরকার সেগুলোকে সমান গুরুত্ব দিয়ে অর্থায়ন করে। আমি মিডিয়ার মাধ্যমে একটি অনুরোধ করতে চাই, আমরা যেন ‘প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়’ না বলে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়’ বলি। কারণ ‘প্রাইভেট’ শব্দটি শিক্ষকদের আত্মসম্মানে আঘাত করে। আমরা কোনো ব্যক্তিগত বা প্রাইভেট মালিকানাধীন কাজ করছি না; আমরা রাষ্ট্রের জনগণের সেবক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছি।
আমি যখন বিইউবিটিতে যোগ দিই, তখন গবেষণার র্যাংকিং ছিল ৩০তম। আমার সহকর্মী এবং শিক্ষার্থীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় মাত্র দেড় বছরের মধ্যে আমরা সেটাকে ১১-তে নিয়ে আসতে পেরেছি। এটি আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন। আমাদের শিক্ষার্থীরা এখন ইংরেজিতে অনেক বেশি দক্ষ হচ্ছে এবং তারা আন্তর্জাতিক জার্নালে পাবলিকেশন নিয়ে বিদেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ পাচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ অনেক সময় একাডেমিক ক্ষতি করে, যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে হওয়ার সুযোগ কম। তবে আমরা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ বিকাশের জন্য ক্লাবের মাধ্যমে গণতন্ত্রের চর্চা করাচ্ছি। আমি নিজে একটি ইলেকশন টুল তৈরি করেছি যার মাধ্যমে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভোট দিয়েছে এবং কোনো অভিযোগ আসেনি। আমরা বিইউবিটিতে নিজস্ব একটি ডেমোক্রেসি মডেল চালু করেছি যেখানে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তি সভাপতি হন এবং নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া নারীকে সহসভাপতি করা হয়। ক্লাবগুলোর জন্য আমরা প্রায় ৮০ লাখ টাকা বাজেট দিয়েছি। এখন আমাদের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং নেতৃত্বগুণসম্পন্ন হিসেবে গড়ে উঠছে।
এশিয়া পোস্ট: দেশের বাইরের শিক্ষার্থী আর দেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য দেখছেন?
ড. শওকত আলী: আমাদের বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আমি অত্যন্ত গর্বিত। তারা অনেক বেশি স্মার্ট ও সৌভাগ্যবান। প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের গভীর সম্পৃক্ততা তাদের অত্যন্ত চৌকস করে তুলেছে। আমাদের সময় আমরা শিক্ষকদের দেখলে পথ পরিবর্তন করতাম, কিন্তু আজকের প্রজন্ম অনেক বেশি সাহসী। তারা ক্লাসরুমে প্রশ্ন করতে দ্বিধা করে না এবং শিক্ষকের মতের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে প্রতিবাদও করতে জানে, যা জানার পরিধি বাড়াতে সহায়ক। বর্তমান প্রজন্ম অত্যন্ত প্রযুক্তিবান্ধব। আজকের একজন শিক্ষার্থী ল্যাপটপ নিয়ে ঘরে বসেই মাসে কয়েকশ ডলার আয় করছে।
আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। প্রবাস ফেরত অনেক শিক্ষিত তরুণ এখন চাকরির পেছনে না ছুটে ফার্মিং বা উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে ঝুঁকছে। আমাদের সমাজ এটাকে অনেক সময় ছোট করে দেখে, অথচ উন্নত বিশ্বে কৃষকের সন্তানরা গর্ব করে তাদের বাবার পেশার কথা বলে। আমাদের উচিত এই তরুণদের স্বাগত জানানো। সরকার যদি প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলো শিক্ষার্থীদের হাতে সহজভাবে পৌঁছে দেয়, তবে কর্মসংস্থানের চাপ অনেকটাই কমে যাবে।
এশিয়া পোস্ট: বিইউবিটির শিক্ষার্থীদের তৈরি বিভিন্ন প্রজেক্ট এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনে উৎসাহী করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কীভাবে সাহায্য করছে?
ড. শওকত আলী: সম্প্রতি চীন-মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত টেক-এক্সপোতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বিদেশে শিক্ষার্থীরা সরাসরি ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে কাজ করে, কারণ ইন্ডাস্ট্রি সব সময় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। আমি দেশে এসেও সেই পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছি। আমি বিইউবিটির ভেতরেই ‘বিইউবিটি হাব’ (BUBT HUB) নামে একটি ইন্ডাস্ট্রি বা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছি যেখানে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা সরাসরি কাজ করে বিভিন্ন প্রোডাক্ট তৈরি করবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, যে বইটি পড়তে চাও সেটি যদি কোথাও না পাও, তবে বইটি নিজে লেখো। আমি ভাবলাম আমার ছাত্ররা যদি বাইরে পর্যাপ্ত সুযোগ না পায়, তবে আমি নিজেই তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করব। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কোনো উদ্ভাবক যদি কোনো পণ্য তৈরি করে, তবে সেই লভ্যাংশের ৮০ শতাংশ সরাসরি উদ্ভাবককেই দেওয়া হবে। বিশ্বের কোথাও সম্ভবত এমন উদার আইন বা নজির নেই, কিন্তু বিইউবিটি ট্রাস্ট এটি অনুমোদন করেছে।
এশিয়া পোস্ট: উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই প্রবাসে স্থায়ী হয়ে যান। এমন প্রবণতাকে সোজা ভাষায় ‘ব্রেইন ড্রেন’ বা ‘মেধা পাচার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মেধা পাচারের বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ড. শওকত আলী: মেধা পাচার একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। মানুষ যখন অর্থনৈতিক বা সামাজিকভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তখনই দেশ ছাড়ে। আধুনিক অর্থনীতিতে দক্ষ জনশক্তিই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদ। চীন ২০০৮ সালে ‘প্রফেসর হান্টিং পলিসি’ গ্রহণ করে বিদেশে থাকা তাদের মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে এনেছিল। তারা প্রস্তাব দিয়েছিল, বিদেশে যে বেতন ও সুবিধা পাচ্ছ, আমরা দেশেও তাই দেব, শুধু নিজের দেশকে অন্তত কয়েক বছর সেবা দাও। এর ফলে তাদের শিক্ষার্থীরা বিদেশে না গিয়ে নিজ দেশে থেকেই পিএইচডি করার সুযোগ পেল।
আমাদেরও এমন কিছু পলিসি ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। আমরা হয়তো সবাইকে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারব না, কিন্তু বিদেশে কর্মরত শিক্ষকদের সঙ্গে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারি। তারা বছরে একবার এসে যদি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভিজিট করেন বা প্রবাসে থেকেই আমাদের শিক্ষার্থীদের গাইড করেন, তবে দেশের চেহারা বদলে যাবে।
এশিয়া পোস্ট: স্বাধীনতার পর আমাদের অবস্থান থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোর কাতারেই ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তারা অনেক এগিয়ে গেলেও আমাদের অগ্রগতি সে তুলনায় অনেকটাই কম। এক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা উন্নয়ন পরিকল্পনার কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না?
ড. শওকত আলী: বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি হলো গণিত। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে গণিতে ভারতীয় উপমহাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে আছে, অর্থাৎ আমরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান জাতি। কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে আমাদের প্রতিভা বিকশিত হচ্ছে না। একটা সময় দক্ষিণ কোরিয়া এবং বাংলাদেশের জিডিপি সমান ছিল, কিন্তু আজ তারা গবেষণায় পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করে বলেই প্রযুক্তি ও সংস্কৃতিতে বিশ্ব শাসন করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদন জগৎ আজ বলিউড বা হলিউডকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
আমাদেরও শিক্ষা ও গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং সেই বিনিয়োগের ফল পেতে অন্তত পাঁচ বছর ধৈর্য ধরতে হবে। জাপানি ব্র্যান্ড টয়োটা বা দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই আজ রোবটিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বজয় করছে। আমি হুন্দাইয়ের ফ্যাক্টরি ভিজিট করে দেখেছি সেখানে মানুষের চেয়ে রোবট বেশি কাজ করে। আমাদের নীতিনির্ধারক ও শিক্ষকদেরও এই আধুনিক চিন্তাধারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আমরা যদি আসলেই উন্নয়ন চাই, তবে উন্নত বিশ্বের এই ভালো কনসেপ্টগুলো গ্রহণ করতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: পৃথিবীতে এখন দাপট দেখাচ্ছে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। আপনি এ বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। আপনার এই বিশেষায়িত জ্ঞান বিইউবিটির শিক্ষার্থীদের মাঝে কীভাবে ছড়িয়ে দিতে চান? একই সঙ্গে জানতে চাই আগামী ১০ বছরে এই প্রতিষ্ঠানটিকে কোন অবস্থানে নিয়ে যেতে চান?
ড. শওকত আলী: বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশাল ছাতার মতো; আমার লক্ষ্য হলো একে দ্রুততম সময়ের মধ্যে টেকনোলজির মাধ্যমে ট্রান্সফর্ম করা এবং স্বচ্ছতা বা ট্রান্সপারেন্সি নিশ্চিত করা।
বিইউবিটিতে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে এবং ৬৫০ জনেরও বেশি স্টাফ এখানে কাজ করছেন। বর্তমানে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তির সময় কোনো তথ্য জানতে চাইলে তাকে হয়তো সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টে দৌড়াতে হয়, আবার আর্থিক বিষয়ে জানতে অ্যাকাউন্টস বিভাগে যেতে হয়। আমি চাচ্ছি, এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে এআইয়ের মাধ্যমে ‘অটোমেশন’-এ নিয়ে আসতে। একটি টার্মিনাল কম্পিউটারে ভয়েস কমান্ড বা টাইপ করার মাধ্যমেই একজন শিক্ষার্থী তার যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।
বিইউবিটির নিজস্ব অর্থায়নে আমরা একটি ‘হিউম্যান রোবট’ বানাচ্ছি। এই রোবটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে যে কোনো অতিথিকে স্বাগত জানাবে এবং তাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য করবে। মেশিন লার্নিংয়ের ‘এনএলপি’ (Natural Language Processing) মডিউল ব্যবহার করে আমরা এটি করছি। আমি ঘোষণা দিয়েছি, ২০২৬ সালের মধ্যেই বিইউবিটি হবে বাংলাদেশের প্রথম ‘ক্যাশলেস ক্যাম্পাস’। শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ডেই সব লেনদেন হবে, যা আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং অ্যাকাউন্টস বিভাগের কাজের চাপ কমাবে। ইনশাআল্লাহ, আগামী পাঁচ বছরে বিইউবিটি হবে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়।
এশিয়া পোস্ট: পিছিয়ে পড়া মেধাবীদের কারিগরিভাবে দক্ষ করতে আপনাদের বিশেষ কোনো উদ্যোগ আছে কি?
ড. শওকত আলী: আমরা বিইউবিটিতে ‘বিইউবিটি টেফ’ (BUBT TEF) নামে একটি বিশেষ ইউনিট খুলেছি। এখানে অভাবী শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল মার্কেটিং বা ডেটা কালেকশনের মতো কাজ শেখানো হয় যেন তারা ঘরে বসেই আয় করতে পারে। আমাদের এই কোর্সগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছে। এমনকি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্টাফদের আইটি দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আমরা বিনামূল্যে ট্রেনিং দিয়েছি যেন তারা পেপারলেস অফিসের কাজ করতে পারে। এর ফলে আমাদের ইন্টারনাল এবং আউটসাইড কমিউনিটি উভয়ই উপকৃত হচ্ছে।
প্রযুক্তির দাপটের এই সময়ে আমাদের সন্তানদের রোবটিক সার্জারির মতো উন্নত বিষয়ের জন্য প্রস্তুত করতে হবে যেন জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে না থাকি। সামনের দিনগুলোতে ‘রোবটিক সার্জারির’ বিপ্লব আসছে। একজন সার্জন আমেরিকায় বসে বাংলাদেশে রোগীর অপারেশন করবেন। আবার নার্সদের যে ক্রাইসিস আসছে, সেখানেও আমাদের রোবটিক সলিউশনে যেতে হবে। একজন লিডার তখনই প্রকৃত লিডার যখন তিনি ঝড় আসার আগেই তার প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন। পৃথিবী যখন উন্নত প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে, আমাদের সন্তানরা যদি পিছিয়ে থাকে, তবে জাতি হিসেবে আমরা আরও পিছিয়ে পড়ব।
এশিয়া পোস্ট: একজন শিক্ষার্থী কেন বিইউবিটিকে বেছে নেবে? আপনাদের বিশেষত্ব কী?
ড. শওকত আলী: আমরা শিক্ষার্থীকে আগে ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিই। বিইউবিটি মুনাফার জন্য নয়, বরং আদর্শিক জায়গা থেকে পরিচালিত হয়। ট্রাস্টি বোর্ড আমাকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তারা টাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বানাননি। তাদের এই মানবিকতাকে সম্মান জানিয়ে আমরা টিউশন ফি বাড়াইনি এবং আমাদের লেভেলের যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমানে র্যাংকিংয়ের শীর্ষে আছে, আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি তাদের মধ্যে আমাদের টিউশন ফি সব থেকে কম। আমরা শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাসের সুবিধা দিয়েছি যা সম্পূর্ণ ফ্রি। শিক্ষার্থীদের বছরে প্রায় ১৭ কোটি টাকা বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। আমাদের এখানে পর্যাপ্তসংখ্যক পিএইচডিধারী শিক্ষক রয়েছেন এবং কারিকুলাম আন্তর্জাতিক মানের।
সম্প্রতি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে আমরা বিশেষ সুবিধায় ভর্তি করেছি এবং সে এখন ভালো ফল করছে। আমরা চাই বিইউবিটি হবে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানবিক মূল্যবোধের একটি কেন্দ্র।
পরিশেষে আমি আমাদের প্রিয় শিক্ষার্থীদের বলতে চাই, তোমরা যারা আগামীর উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছো, বিইউবিটি তোমাদের সেই স্বপ্ন পূরণের সারথি হতে প্রস্তুত।
তোমরা যারা একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং একইসঙ্গে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চাও, তোমাদের বিইউবিটিতে স্বাগত জানাই। এখানে তোমরা যেমন বিশ্বমানের ল্যাবরেটরি ও পিএইচডিধারী অভিজ্ঞ শিক্ষকদের সান্নিধ্য পাবে, তেমনি পাবে গবেষণায় সরাসরি আর্থিক সহায়তা এবং উদ্ভাবনের স্বীকৃতি। আমরা কেবল তোমাদের হাতে একটি সার্টিফিকেট তুলে দিতে চাই না, বরং একজন যোগ্য ও দক্ষ মানুষ হিসেবে তোমাদের তৈরি করতে চাই। তোমাদের আগামী দিনের পথচলা বিইউবিটির হাত ধরেই শুরু হোক, এটাই আমার প্রত্যাশা।



