জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া—
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি অঙ্গনের আলোচিত মুখ। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন রাজপথে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হয়ে সামলেছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। বর্তমানে এনসিপির হয়ে নতুন ধারার রাজনৈতিক কাঠামো গঠন এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের চ্যালেঞ্জ, অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা, তারুণ্যের রাজনৈতিক সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে এশিয়া পোস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘আলাপন’-এ খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। সঞ্চালনায় ছিলেন রাহাত রূপান্তর
এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের পর ফিরেছেন সাধারণ জীবনযাপনে। এখনকার জীবন আর তখনকার জীবনের মধ্যে কী পার্থক্য অনুভব করছেন?
আসিফ মাহমুদ: আমার মনে হচ্ছে আমি আমার স্বাভাবিক জায়গায় ফিরে এসেছি। দীর্ঘ পাঁচ-ছয় বছর ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অ্যাক্টিভিজমে জড়িত ছিলাম। গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সরকারে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করাটা আমার কাছে অনেকটা 'সাফোকেটিং' বা দমবন্ধকর মনে হতো; বিশেষ করে ওই নাইন-টু-ফাইভ অফিস এবং প্রোটোকল। তবে মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ পাওয়াটা অবশ্যই আনন্দের ছিল। এখন আবার জাতীয় রাজনীতিতে পা রাখা এবং আমাদের দল এনসিপিতে সহযোদ্ধাদের সাথে কাজ করতে পেরে খুব ভালো লাগছে।
আসলে 'যায় দিন ভালো যায়'। স্টুডেন্ট পলিটিক্সের সময়টা খুব এনজয়েবল ছিল। তবে এখন জাতীয় রাজনীতিতে আমরা নতুন, অনেক কিছু শিখছি। প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জনমানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার চেষ্টা করছি এবং জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করছি। শেখার এই সুযোগটার কারণে বর্তমান সময়টাকেই বেশি ভালো লাগছে।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এমন কোনো স্মৃতির কথা জানতে চাই যা এখনো আপনাকে আবেগপ্রবণ করে তোলে।
আসিফ মাহমুদ: সে সময়ের প্রতিটি মুহূর্তই স্মরণীয়। তবে বিশেষ করে যখন আবু সাঈদ প্রথম শহীদ হয়, সেই সময়টার কথা খুব মনে পড়ে। আমরা তখন শহীদ মিনারে কর্মসূচি করছিলাম। খবর এলো যে, আবু সাঈদ শহীদ হয়েছে, প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। পরে সাংবাদিকদের মাধ্যমে নিশ্চিত হলাম। ওই মুহূর্তটাই ছিল টার্নিং পয়েন্ট। মনে হয়েছিল, যেহেতু আমাদের একজন ভাই শহীদ হয়েছেন এবং সরকার ক্র্যাকডাউন শুরু করেছে, তাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে এখন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। সেই ট্রানজিশনাল পিরিয়ডটা আজও আমাকে নাড়া দেয়।
এশিয়া পোস্ট: জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই সময়কার অনুভূতি এবং এখনকার পরিস্থিতি নিয়ে আপনার অনুভূতি কী?
আসিফ মাহমুদ: এটা আমাদের সৌভাগ্য যে, মহান আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন, হয়তো আরও কিছু কাজ বাকি আছে বলে। আমাদের চারপাশে দুই সহস্রাধিক সহযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। আমরা সামনের সারিতে থেকেও বেঁচে আছি, এটা মাঝেমধ্যে অস্বাভাবিক লাগে। আমি নিজে গুমের শিকার হয়েছি, ডিবিতে ছিলাম। ৫ আগস্ট আমার চোখের সামনে চানখাঁরপুলে ৩-৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্য দিয়ে বেঁচে ফিরে আসা আমাদের প্রজন্মের জন্য নতুন জীবন পাওয়ার মতো।
এশিয়া পোস্ট: ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিটি ৭ আগস্ট হওয়ার কথা থাকলেও হঠাৎ ৫ আগস্টে এগিয়ে আনা হয়েছিল। এর পেছনে বিশেষ কোনো কারণ ছিল কি?
আসিফ মাহমুদ: আমাদের পরিকল্পনা ছিল কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। কিন্তু ৪ তারিখ থেকে গোলাগুলি এবং নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আমরা খবর পাচ্ছিলাম ঢাকার আশপাশ থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঢাকা দখলের পরিকল্পনা করছে। এছাড়া আবারও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের জোর গুজব ছিল। তখন নাহিদ ভাইসহ অন্যদের সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাচ্ছিলাম না, কারণ নিরাপত্তার জন্য সবার ফোন বন্ধ ছিল। রাত ১১টার দিকে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে দেরি করলে ঢাকার বাইরে থেকে মানুষ আসতে পারবে না। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং ব্ল্যাকআউট এড়াতে একদিন এগিয়ে ৫ই আগস্ট ঘোষণা করা হয়।
এশিয়া পোস্ট: সেই মুহূর্তে এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং এখন পেছনে ফিরে তাকালে কী মনে হয়?
আসিফ মাহমুদ: তখন অনেক অনিশ্চয়তা ছিল। ভয় ছিল যে, মানুষ এত দ্রুত সাড়া দেবে কি না বা ঢাকার বাইরে থেকে আসতে পারবে কি না। তবে এখন মনে হয় সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ আমরা দেরি করলে তারা ঢাকার দখল নিতে পারতো এবং আবারও ব্ল্যাকআউট করে আন্দোলন দমনের সুযোগ পেত। ব্যর্থ হলে গুম-খুন আরও বাড়ত। পরে আমরা শেখ হাসিনার কল রেকর্ডেও হত্যার নির্দেশনার কথা শুনেছি। ৫ তারিখে মানুষের ব্যাপক সমর্থন ও রাজপথে নেমে আসা এবং একদিনে প্রায় ৪৫০-৫০০ মানুষের আত্মত্যাগের ফলেই এই সফলতা এসেছে।
এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্ট যে গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত রূপ ঘটবে, তা কি আগে থেকে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন? সেদিন আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
আসিফ মাহমুদ: একদফা ঘোষণার পর আমাদের ফেরার কোনো পথ ছিল না; সেটা ছিল 'ডু অর ডাই' পরিস্থিতি। তবে এত দ্রুত পতন হবে সেটা ভাবিনি। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তুতি ছিল। ৫ তারিখ সকালেও যখন চানখাঁরপুলে ছিলাম, দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছিল। সেখানে আমার সামনেই কয়েকজন শহীদ হন। তখন মনে হচ্ছিল আমরা হয়তো সফল হতে পারব না। কিন্তু মানুষের যে অদম্য স্পৃহা ছিল—একজন গুলি খেয়ে পড়ে যাচ্ছে আর আরেকজন সামনে এগিয়ে যাচ্ছে—সেই সাহসিকতার কারণেই সেদিন আমরা সফল হয়েছি।
এশিয়া পোস্ট: আন্দোলনের কঠিন সময়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন কীভাবে? পরিবারের সদস্যদের তখনকার অনুভূতি কেমন ছিল?
আসিফ মাহমুদ: আমার পরিবার অরাজনৈতিক। প্রথম দিকে তারা জানত না আমি আন্দোলনে এত গভীরভাবে যুক্ত। যখন আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন তারা জানতে পারে এবং আমাকে খোঁজাখুঁজি বা ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করে। ডিবি থেকে ফেরার পর তারা আমাকে বাড়িতে চলে যেতে বলেছিল, কিন্তু আমি শুনিনি। ওই সময়টা তাদের জন্য খুব কষ্টের ও নতুন অভিজ্ঞতার ছিল।
এশিয়া পোস্ট: আন্দোলনের অনেক সহযোদ্ধা এখন ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে। জুলাইয়ের সেই ঐক্য কেন ধরে রাখা গেল না?
আসিফ মাহমুদ: জুলাই অভ্যুত্থান রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সবাই যে একটাই দল করবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। যত বেশি প্ল্যাটফর্ম হবে, জুলাই স্পিরিট তত শক্তিশালী হবে। সবার স্ট্র্যাটেজি বা আদর্শ আলাদা হতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য জুলাইয়ের চেতনা হওয়া উচিত। সবাই যে যার জায়গায় থেকে গ্রো করুক, তবে কালেক্টিভলি আমাদের জুলাইয়ের শক্তিকে সংহত রাখতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা অবস্থায় দেশের সমস্যা সমাধানে ও মানুষের প্রত্যাশা পূরণে নিজেকে কতটা সফল মনে করেন?
আসিফ মাহমুদ: মানুষ রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন ও সংস্কার চেয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই ড্রাস্টিক চেঞ্জ বা বড় পরিবর্তন সেভাবে সম্ভব হয়নি। সরকারের লেজিটিমেসি বা কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে একটা জনঅংশগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখন দেখছি সবকিছু ডিনাই করা হচ্ছে। অধ্যাদেশ বাতিল এবং গণভোট বাস্তবায়ন না করার ফলে মনে হচ্ছে আমরা আবার সেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার দিকেই ফিরে যাচ্ছি।
এশিয়া পোস্ট: শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে আপনার মেয়াদে শ্রমিক অসন্তোষ দমনে আপনি কতটা সফল ছিলেন? বর্তমানে দাবি-দাওয়া নিয়ে শ্রমিকদের আগের মতো মাঠে নামতে দেখা যাচ্ছে না—এর কারণ কী?
আসিফ মাহমুদ: আমি মাত্র তিন মাস ওই দায়িত্বে ছিলাম এবং সেটা ছিল অত্যন্ত ক্রুশিয়াল সময়। প্রতিদিন গড়ে ১২০-১৩০টি জায়গায় শ্রমিক অসন্তোষের রিপোর্ট আসত। আমরা মালিক, শ্রমিক ও সরকার মিলে ট্রাইপারটাইট মিটিংয়ের মাধ্যমে ১৮ দফা চুক্তি করি। এর মাধ্যমে খুব দ্রুত আন্দোলন কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিকভাবেও (ILO-তে) এটি প্রশংসিত হয়েছিল। আগে অনেক আন্দোলন ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে উসকে দেওয়া; এখন বিএনপিপন্থি বা আওয়ামীপন্থি সে সংগঠনগুলো সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় থাকায় হয়তো কোনো আন্দোলন দেখা যাচ্ছে না।
এশিয়া পোস্ট: উপদেষ্টা হিসেবে আপনার শেষ কার্যদিবসে ড. ইউনূসের সঙ্গে শেষ কথোপকথনে কী নিয়ে আলাপ হয়েছিল?
আসিফ মাহমুদ: ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস আমার রাজনৈতিক জীবনের জন্য শুভকামনা জানিয়েছিলেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছিল। আমার মনে হয়, তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা প্রয়োগে যথেষ্ট কঠোর হতে পারেননি। তবে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে তার সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি ছিল না।
এশিয়া পোস্ট: এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন। সিটিবাসীর জন্য আপনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী?
আসিফ মাহমুদ: স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে থাকার সুবাদে আমি ঢাকার সমস্যাগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছি। ঢাকা টপ ফাইভ জনবহুল শহরের একটি এবং এটি অত্যন্ত অপরিকল্পিত। তবে সদিচ্ছা থাকলে একে ট্রান্সফর্ম করা সম্ভব। বিশেষ করে দক্ষিণ ঢাকার ৪০০ বছরের যে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য বা হেরিটেজ আছে, সেগুলোকে প্যারিস বা ইস্তাম্বুলের মতো প্রিজার্ভ এবং প্রমোট করতে চাই। ঢাকার পুরনো গৌরব পুনরুদ্ধার এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নই আমার মূল লক্ষ্য।
এশিয়া পোস্ট: সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোটের সম্ভাবনা বা এনসিপির প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে আপনাদের বর্তমান অবস্থান কী?
আসিফ মাহমুদ: আমরা আপাতত এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়ায় আছি। ইতোমধ্যে পাঁচটি সিটির প্রার্থী দিয়েছি, বাকি সাতটিও দেওয়া হবে। তবে নির্বাচন নিয়ে এখন সংশয় আছে। বিএনপি সরকার যেভাবে প্রশাসক নিয়োগ দিচ্ছে, তাতে নির্বাচন দেওয়ার সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জোট নিয়ে এখনও অফিশিয়াল কোনো আলোচনা আমাদের সম্মিলিত ফোরামে হয়নি।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের পর বিএনপি সিটি কর্পোরেশনগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ করেছে। এতে নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে কি না? আর যদি নির্বাচন না হয়, তবে আপনারা কী করবেন?
আসিফ মাহমুদ: নির্বাচন দেওয়ার সদিচ্ছা থাকলে প্রশাসক নিয়োগের প্রয়োজন ছিল না। প্রশাসক দেওয়া হয়েছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে দখল করার জন্য। আমরা দেখছি প্রশাসকরা মেয়রের চেয়ারে বসে নিজেদের পোস্টার লাগিয়ে ভোট চাচ্ছেন, যা গণতন্ত্রের পরিপন্থী এবং লেভেল প্লেইং ফিল্ড নষ্ট করছে। বিএনপি একসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন করলেও এখন নিজেদের প্রার্থীদের প্রশাসক বানিয়ে নির্বাচন ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করছে। তারা আসলে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নিজেদের 'কিংস পার্টি' পরিচয়কেই পুনরুজ্জীবিত করছে।
এশিয়া পোস্ট: অনেকে বলেন, আওয়ামী লীগ যেন কখনো রাজনীতিতে ফিরতে না পারে সেজন্য আপনারা (জামায়াত-এনসিপি) বিএনপিকে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। এমন কোনো অঘোষিত চুক্তি সত্যিই হয়েছে নাকি?
আসিফ মাহমুদ: এ ধরনের কোনো আলোচনার কথা আমি শুনিনি। সত্যি বলতে বিএনপি এখন আর আগের সেই বিএনপি নেই, তারা অনেকটা আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ যা করত, বিএনপি এখন তাই করছে। তারা জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিল করে দিচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের। তারা সংসদে দাঁড়িয়ে সাদা মিথ্যা বা 'হোয়াইট লাই' বলছে। তারা জবাবদিহিতা এড়াতে সংস্কারের অধ্যাদেশ বাতিল করছে কিন্তু ক্ষমতা বৃদ্ধির অধ্যাদেশগুলো রেখে দিচ্ছে।
এশিয়া পোস্ট: আপনি বলেছেন, ‘ডিপ স্টেট’ ২০২৯ সাল পর্যন্ত আপনাদের ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব দিয়েছিল। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে চাই।
আসিফ মাহমুদ: আমরা এ ধরনের কোনো আলোচনায় কখনোই আগ্রহ দেখাইনি। অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য ছিল সংস্কার ও বিচারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করে নির্বাচন দেওয়া। বিভিন্ন মহল থেকে এ ধরনের অফার থাকলেও সরকার জনগণের প্রতি কমিটমেন্টের জায়গা থেকে কোনো ফাঁদে পা দেয়নি। তবে নির্বাচনের পর সেই কমিটমেন্টগুলো রক্ষা না হওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। জনগণের স্বার্থ বিঘ্নিত করে কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে বোঝাপড়া করা যে কোনো সরকারের জন্যই ক্ষতিকর।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের পর থেকেই আওয়ামী লীগ ফেরার আলোচনা বা তাদের অফিস খোলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কেমন দেখছেন এবং এনসিপির অবস্থান কী?
আসিফ মাহমুদ: অনেক এমপি-প্রার্থী ভোটের জন্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন। তারা প্রকাশ্যেই আওয়ামী লীগকে নিরাপত্তা ও রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলছেন। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—জুলাই গণহত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত এবং নিঃশর্ত ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। যারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সমঝোতার মাধ্যমে খুনিদের রাজনীতিতে ফেরানো জনগণের সাথে বেইমানি।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপি জুলাই সনদ ও সংস্কার চায় না বলে অভিযোগ করেছেন আপনারা। এ বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত হলেন?
আসিফ মাহমুদ: তাদের কর্মকাণ্ডেই তা স্পষ্ট। তারা কাগজে-কলমে সংস্কারের অধ্যাদেশ বাতিল করছে কিন্তু মুখে বলছে শক্তিশালী করবে। বিচারক নিয়োগ থেকে শুরু করে সব ক্ষমতা তারা নির্বাহী বিভাগের অধীনে রাখতে চায়। তারা এখন গণভোটকে ‘নির্বাচনী কৌশল’ বলে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। জুলাই অভ্যুত্থানের অর্জন ধরে রাখতে আমরা সংসদে প্রতিবাদ করছি এবং প্রয়োজনে রাজপথে আবারও আন্দোলন করব।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে সংসদে গণভোট নিয়ে যে বিতর্ক চলছে তা কীভাবে দেখছেন?
আসিফ মাহমুদ: জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে এই ধৃষ্টতা দেখানো অত্যন্ত দুঃখজনক। পলিটিশিয়ানদের সাথে রাজনীতি করা যায়, কিন্তু জনগণের সাথে রাজনীতি করার ফল ভালো হয় না। পিপলস উইল বা জনগণের ইচ্ছা সবকিছুর উপরে। সালাউদ্দিন আহমেদ একসময় বলেছিলেন সংবিধানে না থাকলেও গণভোট করা যায়, এখন তিনিই একে প্রতারণা বলছেন। তারা আসলে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারে বাধা দিচ্ছে। সংসদ যদি জনগণের আকাঙ্ক্ষিত এই সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না পারে, তবে এটি তার আবেদন হারাবে।
এশিয়া পোস্ট: সংসদে তিন প্রধান দল (এনসি, বিএনপি, জামায়াত)-এর মধ্যে যেমন সৌহার্দ্য দেখা যাচ্ছে, আবার গণভোট নিয়ে দূরত্বও বাড়ছে। এই পরিবেশ কি বজায় থাকবে?
আসিফ মাহমুদ: আমরা জাতীয় স্বার্থে ঐক্য চাই এবং সংকটকালে সরকারকে সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত। কিন্তু যখন জুলাই সনদ বা গণভোটের মতো মীমাংসিত বিষয়ে তারা জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে যায়, তখন আমাদের রাজপথে নামা বা বিরোধিতা করা ছাড়া উপায় থাকে না। সরকারের সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করবে রাজপথে আন্দোলন হবে কি না। আমরা চাই দেশ ভালো দিকে যাক, কিন্তু জনগণের রায় বাস্তবায়ন না হলে সমঝোতা সম্ভব নয়।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমান সরকারের দুই মাসের কার্যক্রমকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন? দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে তারা কেমন করছে?
আসিফ মাহমুদ: আমি বলব এখন পর্যন্ত সরকার ব্যর্থ। তারা শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই ভঙ্গ করেনি, দৈনন্দিন কাজ যেমন ঈদ যাত্রা বা বাজার নিয়ন্ত্রণেও লেজেগোবরে অবস্থা করে ফেলেছে। ওনারা সমস্যাগুলো স্বীকারও করেন না। বাসের যাত্রীদের দাঁড় করিয়ে রেখে মন্ত্রীর ৩-৪ ঘণ্টার ফটোসেশন আমরা দেখেছি। এই যে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া এবং মানুষের কষ্ট না বোঝা—এগুলো সরকারের বাজে পারফরম্যান্সেরই প্রমাণ।
এশিয়া পোস্ট: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভূমিকা এবং তার নেতৃত্ব নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আসিফ মাহমুদ: আসলে বোঝা মুশকিল যে প্রধানমন্ত্রী কে? তারেক রহমান নাকি সালাউদ্দিন আহমেদ? সংসদে তারেক রহমানকে প্রশ্ন করলে সালাউদ্দিন আহমেদ উত্তর দিচ্ছেন। এটা অনেকটা বাচ্চাদের নাম বাবা-মা বলে দেওয়ার মতো অবস্থা। প্রধানমন্ত্রী কি কথা বলতে পারেন না, নাকি উনাকে কোনো চাপে রাখা হয়েছে? প্রধানমন্ত্রীর রোলটা শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইব ক্রিয়েট করা নয়, বরং রাজনৈতিক ও জাতীয় ইস্যুতে কথা বলা। ডক্টর ইউনূসকে তারা দুর্বল বলতেন, কিন্তু এই প্রধানমন্ত্রী আগের সরকারের প্রধান উপদেষ্টার চেয়েও দুর্বল মনে হচ্ছে।
এশিয়া পোস্ট: ভারতের সঙ্গে বর্তমান সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি কেমন দেখছেন?
আসিফ মাহমুদ: আওয়ামী লীগের সময় ভারতের স্বার্থই বেশি দেখা হতো। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের বলিষ্ঠ অবস্থানের কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা শীতল ছিল। এই সরকারের সাথে এখন পর্যন্ত কোনো বড় সমঝোতা হয়নি। আরও কিছুদিন পর বোঝা যাবে যে, এই সরকার জাতীয় স্বার্থ কতটা রক্ষা করতে পারে।
এশিয়া পোস্ট: এনসিপির ভবিষ্যৎ লক্ষ্য এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য আপনার বার্তা কী?
আসিফ মাহমুদ: আমরা এনসিপিকে একটি শক্তিশালী মধ্যমপন্থি জনমানুষের দল হিসেবে গড়তে চাই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে প্রত্যাশার বীজ বোনা হয়েছে, আমরা তা ব্যর্থ হতে দেব না। বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা যুবশক্তিকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে চাই। বেকারত্বসহ তরুণদের সব সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে একটি উন্নত ও সুন্দর বাংলাদেশ নির্মাণই আমাদের মূল অঙ্গীকার। এই লড়াইয়ে আমরা জনগণের সমর্থন প্রত্যাশা করি।



