সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আইন অঙ্গনের আলোচিত নাম ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। যুক্তরাজ্য থেকে বার এট ল’ সম্পন্ন করে আইন চর্চা করছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে। পাশাপাশি সংবিধান, রাজনীতি ও নাগরিক অধিকার বিশ্লেষণ এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বরাবরই উচ্চকণ্ঠ তিনি। আইনি প্রতিষ্ঠান ‘থ্রি এস চেম্বার্সের’ হেড অব চেম্বার; একইসঙ্গে ‘সেন্টার ফর সিভিল রাইটস-সিসিআরের’ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এশিয়া পোস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘আলাপনে’ ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কথা বলেছেন দেশের আইন, সংবিধান, গণভোট, রাজনীতি ও সমসাময়িক নানা বিষয়ে। সঞ্চালনা করেছেন আবিদ আজম
এশিয়া পোস্ট: শুরুতেই আপনার বেড়ে ওঠার গল্পটা জানতে চাই। একই সঙ্গে জানতে চাই প্রবাসের স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন ছেড়ে দেশের ফেরার কারণ কী?
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির: পৃথিবীতে সুখের কোনো মহাকাব্য লেখা হয় না। দুঃখ ছাড়া, ট্র্যাজেডি ছাড়া ভালো কিছু অর্জন হয় না। আমার এই পথ চলাটা স্মুথ ছিল না, ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বিদেশের মতো জায়গায় ১৫-১৬ বছর থাকার পর সেখান থেকে সবকিছু গুটিয়ে একটা অনিশ্চিত জীবনে এসে পদার্পণ করা এবং সেটাও একটা আদর্শের জন্য… এটাও খুব কঠিন ছিল। তারপর আল্লাহর কাছে অনেক শুকরিয়া। আল্লাহ অনেক ভালো রেখেছেন, তবে যে জন্য আসা, যে স্বপ্নটা দেখা, স্বপ্ন হয়তো শেষ পর্যন্ত দেখে যেতে হবে। আল্লাহ যেদিন চাইবেন, সেদিন হয়তো কবুল হবে। সেই স্বপ্নটা হলো একটা সোনার বাংলাদেশ। আধিপত্যবাদী শক্তির কবল থেকে বাংলাদেশ সুরক্ষিত থাকবে। সেই স্বপ্নটা কী? সবার আগে বাংলাদেশ। এটা খালি মুখে বলা না, এটা বিশ্বাস করা। ১৯৭১ সালে একটি মানচিত্র এবং পতাকা পেলেও প্রকৃত স্বাধীনতা আমরা পাইনি।
আমরা প্রকৃত স্বাধীনতাটা পেয়েই মরে যেতে চাই। একমাত্র চাওয়া এমনই।
এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আপনার দৃষ্টিতে কতটা সুষ্ঠু হয়েছে এবং কী কী ত্রুটি ছিল বলে মনে করেন?
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হাদি হলে আমি একটা ক্লাসে খুব সুন্দর করে বলেছিলাম এবারের ইলেকশনটা ২০০৮ সালের স্টাইলে হবে, কিন্তু একদম ২০০৮ সালের মতো হবে না।
সেখানে আরও বলেছিলাম, ৪টা পর্যন্ত ভোট ফেয়ার হবে, মানুষজন দেখবে; কোনো ভোটের বাক্স ছিনতাই হবে না। দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু সব জায়গায় মোর অর লেস সুষ্ঠুভাবে ইলেকশনটা হবে এবং তারপর ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং যেটা আমরা বলি সেটা হবে।
ভোট কাউন্ট ঠিক থাকলেও ফলাফলটা পাল্টে দেওয়া হবে। একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ দিই। আগের দিন ফলাফল শিটের সই নেওয়া হয়েছে। ইলেকশনের আগের রাতে বাংলা এডিশনের অনুষ্ঠানে আমি আর সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা পুতুল অতিথি ছিলাম। রাতের বেলা ১২টার পর হঠাৎ করে উনি বললেন যে, আমাকে এখনই যেতে হবে হবে। কেন? আমার এজেন্টরা ফোন দিচ্ছে, ফলাফল শিটে এখনই সই দিতে বলছেন। ভোট তো সকালবেলা। ইটস অন রেকর্ডেড।
আপনারা চাইলে বাংলা এডিশন থেকে নিতে পারেন। উনি বললেন, আমি তো আজকে আর এখানে থাকতে পারছি না। আজকে ফলাফল শিটে সাইন নেওয়ার কোনো বিধান নাই।
পূর্বনির্ধারিত ফলাফল। তার মানে মানুষ যে ভোট দিয়েছে ভোটের ওপর ভিত্তি করে মানুষের ভাগ্যের যে পরিবর্তন, সেই পরিবর্তন আর আমার-আপনার হাতে নাই। যে সংগ্রাম, যে যুদ্ধ, যে দ্বিতীয় স্বাধীনতার কথা বলা, এই দ্বিতীয় স্বাধীনতা ২০২৪ সালে ৫ তারিখে ছাত্রদের হাত থেকে ছিনতাই হয়ে গেল। যেমন ১৬ ডিসেম্বর ইন্ডিয়া ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। জুলাইয়ে আইন উপদেষ্টা গং সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রপতি এই কনস্টিটিউশন রেখে দিলেন। খুব সুপরিকল্পিতভাবে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এই বিপ্লবকে ব্যর্থ ঘোষণা করলেন। এর জন্য কেবল ছাত্রদেরকে একা দোষ দিয়ে লাভ নাই। আমি আপনি সবাই দায়ী, আমি বা আমরা যত চিৎকারই করি না কেন!
এশিয়া পোস্ট: অনেক পোস্টাল ব্যালট বাতিল করা হয়েছে। সেটার পরিমাণ কেমন বলে আপনার কাছে তথ্য আছে এবং এর যৌক্তিকতা আছে কি না?
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির: ভোটের দিন ৪টা পর্যন্ত কোন ভোট সেন্টারে উপচে পড়া লাইন ছিল না। দ্বিতীয় কথা, আপনাকে দুইটা ভোট দিতে হবে। টোটাল ভোটার ১২ কোটি। কথাটা হলো ভোট ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে কি হয়নি? গেজেট অনুযায়ী, মোট বাতিলকৃত গণভোটের সংখ্যা হচ্ছে ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৭৩৭টি। মোট ভোট পড়েছে ৭ কোটি ৭৬ লাখ, ১১ পারসেন্টের কাছাকাছি। এই ভোটগুলো বাতিল করলেন কীভাবে, গেজেটের নিচে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আক্তার আহমেদের সাইন আছে। ভোটটা ডাকা হয়েছে ১১ ডিসেম্বর।
১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনের পক্ষে একই দিন আপনি ভোট করতেছেন দুইটা, আপনি দুইটা তফসিল করলেন কেন? একটা হচ্ছে ন্যাশনাল ইলেকশন এবং আরেকটা হচ্ছে গণভোট। হঠাৎ করে বিএনপি আজকে যে যেটা বলতে চাচ্ছে, সেটা কিন্তু হঠাৎ করে আসেনি। ইটস এ ব্রেন চাইল্ড। এই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং নির্বাচন কমিশনের ব্রেন চাইল্ড। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদকে সরাতে দাবি জানিয়েছে। বিএনপি বলছিল, ওনাকে সরালে নির্বাচনই করব না।
আরেকটা কথা। আপনি দুইটা ইলেকশন করলেন তাহলে তো আপনি শপথ কি করার কথা? শপথ তো তাহলে দুইটা আলাদা আলাদা হওয়ার কথা না? দুইটা আলাদা নির্বাচন হলে আপনাকে ইলেকশন কমিশন আপনাকে শপথ পড়াবেন, তাহলে দুইটা লেটার ইস্যু করার কথা ছিল না, আপনি এখন আজকে সকাল ৮ ঘটিকার সময় পার্লামেন্ট মেম্বার হিসেবে শপথ নেবেন আর আপনি দুপুর ১টার সময় আপনি সংবিধান সংস্কার পরিষদের মেম্বার হিসেবে শপথ নেবেন।
কিন্তু ইলেকশন কমিশন এক্সপোজড হয়ে গেল। আজকে বলা হচ্ছে, দুইটা আলাদা নির্বাচন। তাহলে বলি, গণভোটকে আপনি কেন আলাদা করছেন? কারণ এই গণভোটের প্রস্তাবক কে ছিলেন? জনাব সালাহউদ্দিন আহমেদ। আজকে আপনি গণভোটকে কেন অস্বীকার করতেছেন? তাহলে গণভোটকে অস্বীকার করা কি জুলাই কে অস্বীকার করার নামান্তর নয়? ইলেকশন প্রচারণা সময় আমি চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করছিলাম, যে বিএনপি জুলাইকে কোনোদিন ধারণ করে না। কারণ তারা হাঁ-এর পক্ষে কোথাও ভোট চাচ্ছে না। সর্বশেষে একদিন দলটির চেয়ারম্যান সাহেব রংপুরে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট চাইলেন। একদিন চাইছেন, কিন্তু চাইছেন তো। আর্টিকেল সেভেনে বলা হয়েছে, All power in the Republic belong to the people. অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রের (রাষ্ট্রের) সমস্ত ক্ষমতার মালিক জনগণ।
এশিয়া পোস্ট: সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য জারি করা রাষ্ট্রপতির আদেশকে জাতির সঙ্গে প্রতারণার দলিল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আপনার মন্তব্য কী?
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির: প্রথম কথা হলো উনি প্রতারণার অংশীদার। এই আদেশ পাশ হওয়ার পর আপনি এটা রিট ফাইল করতে পারতেন না? অনেক রিট বিএনপি ফাইল করলেও এটা ফাইল করেনি। যাদের ডুয়েল সিটিজেনশিপ তাদের বিরুদ্ধে রিট কেন অ্যাপ্লাইড ডিভিশন পর্যন্ত গেলো না? এটার উত্তর আবার দিয়ে দিয়েছেন সংসদের স্পিকার। বলেছেন, তখন এটা বলিনি, কারণ বললে তো ভোট ওনারা দিতেন না। এটা কি অসততা নয়? এবার আপনার কথায় চলে যাই। ধরে নেন সালাহউদ্দিন সাহেব বললেন যে, এইটা কি? এই দলিলটা কি? বলেন এখনই যে প্রশ্নটার মধ্যে কী লেখা আছে? এই আদেশটা কে সাইন করল? রাষ্ট্রপতি করেছে। তাহলে প্রতারণা কে করল? রাষ্ট্রপতি করল। আইনমন্ত্রী কিন্তু একই কথা বলছেন।
রাষ্ট্রপতি যদি ফ্রড করে থাকে, তাহলে এই যে কিছুদিন আগে আমি যে রিট ফাইল করছি যে রাষ্ট্রপতি রিমুভের, এখন তো আপনি আমার প্রধান এভিডেন্স হয়ে গেলেন। রাষ্ট্রপতিকে কখনও অভিশংসন করা যায়? যখন সে তার শপথ ভঙ্গ করবে। তার শপথ তে কি লেখা আছে? I will defend this constitution. অর্থাৎ আমি এই সংবিধানকে রক্ষা করব। তাহলে প্রথম হচ্ছে সে এই রাষ্ট্রপতি শপথের বিশ্বস্ততা হারালেন। দ্বিতীয় সংবিধানের রক্ষা করার পরিবর্তে সংবিধানের সঙ্গে সে প্রতারণা করলেন। তাহলে তার শপথ ভঙ্গ করলেন। শপথ ভঙ্গ করলে কী হয়?
শপথ ভঙ্গ করে থাকলে রাষ্ট্রপতিকে অভিসংশন করার কথা বলা হয়েছে সংবিধানে। আপনি যদি অভিশংসন বিল না আনেন তাহলে আপনার আসল উদ্দেশ্যটা প্রকাশিত হবে। আপনি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করছেন, জুলাই নিয়ে। আমরা ল’য়্যাররা বলি, উই প্লে উইথ দা ওয়ার্ডস। অর্থাৎ আমরা শব্দ নিয়ে খেলা করি। এই সংবিধান এটাকে বলা হয় প্রাইমারি ল। এই সংবিধান যদি আপনাকে ক্ষমতা দেয় কিছু করার আপনি পারবেন। ক্ষমতা না দিলে পারবেন না। এই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বিপ্লবের ফসল। আর এগুলো সবই সম্ভব হইছে জুলাই সনদের জন্য।
এশিয়া পোস্ট: একটি বক্তব্যে আপনি বলেছেন, এই সংবিধান আজ্ঞাবহ বিশেষ একটি দেশের লিখে দেওয়া। এর স্বপক্ষে কী প্রমাণ আছে?
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির: এই কনস্টিটিউশন কি আপনার ভোটের ভাতের কোনো অধিকার দিয়েছে? গুম-খুন থেকে সংবিধান রক্ষা করতে পারছে? কেন পারেনি। কারণ সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে আছে, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা। এতে বলছে বিদেশি রাষ্ট্রসহ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে আপনি কোনো কথা বলতে পারবেন না। তাহলে আমরা ‘রুশ ভারতের দালালরা হুঁশিয়ার সাবধান’ বলি এ কথা বলার বাকস্বাধীনতা থাকছে না। মৃত্যু আর বিপ্লব ছাড়া ক্ষমতা পরিবর্তনের কোনো পথ এই কনস্টিটিউশনের মধ্যে নেই। সেই জন্যই কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল এবং সেটাকে আবার বিলুপ্ত করা হয়। কারণ ৭২-এর সংবিধান হচ্ছে এক নায়কতন্ত্র, বাকশালের কাঠামো তৈরি করে দিয়েছে।
১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদ গঠিত হয়। পাস হলো প্রথম ৪৩০ জন মেম্বার নিয়ে, এসেম্বলি করা হলো ৪৩০ জন সদস্য নিয়ে। যাতে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কেউ ছিল না। তারপর নভেম্বরে বলা হলো কনস্টিটিউশন রেডি, মানে ড্রাফট রেডি, মানে ছয় মাসের মধ্যে। সংবিধান তৈরি করতে পাকিস্তানের লাগছে ১২ বছর। ভারতের লাগছে সাড়ে তিন বছর। আর এখানে ছয় মাসের মধ্যে এই ১৫৩ ধারার একটা কনস্টিটিউশন রেডি করা হলো। ড. কামাল হোসেনের সাক্ষাৎকার আছে। তিনি বলেছেন, আমরা যখন ড্রাফট অক্টোবর মাসে নিয়ে গেলাম, শেখ সাহেবের কাছে, তিনি পকেট থেকে একটা কনস্টিটিউশন বের করলেন। কথা হলো, শেখ সাহেবকে কনস্টিটিউশন কে লিখে দিলেন? সবসময় চোর কিছু সিম্পটম রেখে যায়।
এশিয়া পোস্ট: একজন আইনজ্ঞ হিসেবে আপনার পরামর্শ কী—এই সংবিধান কি পুরোপুরি রহিত করতে হবে নাকি সংস্কার, সংযোজন নাকি পুনর্লিখনের প্রস্তাবনা রাখছেন?
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির: পুনর্লিখন করতে হবে না, এটা সংস্কার করতে হবে। আর সংস্কার করতে গেলে দেখা যাবে যে টু-থার্ড এ কনস্টিটিউশন চেঞ্জ হয়ে যাবে। যেটা নতুন করা হবে তার নাম তো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধান লেখা হবে। তো পরিবর্তন সংস্কার মানেটা কী? আমার জায়গা আমি নতুন করে বাড়ি করব। এটার নাম হতো সংস্কার। বাড়ি পুনর্নির্মাণ করব। সে জন্য তো সংস্কার বলা হইছে। আমি সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। রাষ্ট্রের মালিক আমি। অর্ডার দেওয়ার ক্ষমতা কার? জনগণের। গণভোটে ৭০ ভাগ জনগণ অর্ডার দিছে, যা আছে এই জুলাই সনদে হুবহু আপনি কি করবেন? বাস্তবায়ন করবেন। আপনাকে এই ক্ষমতা দিল কে? এটা কি নিয়ে প্রশ্ন তোলার? আমি জনগণ আপনাকে অর্ডার দিচ্ছি। জুলাই সদ বাস্তবায়ন করেন।
আপনারা ৫৫ কিংবা ৫১ ভাগ ভোট পাইছেন। ৭০ ভাগ লোক আমরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বললাম, এইটা তুমি পালন করবা। ভাড়াটিয়াকে বললাম, বাড়ি কিন্তু তুমি করতে পারবা না। ওখানে ঘর করতে গেলে তোমাকে বের করে দেব। ঘরের মালিক হলো জনগণ আর সংসদ সদস্যরা হলেন ভাড়াটিয়া।
এশিয়া পোস্ট: প্রধানমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত থাকার পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘সংসদ নেতার পক্ষে’ সংবিধান সংশোধনী কমিটি করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির: সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রস্তাব তো সুন্দর। ২৭০ দিন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে খাননি জনগণের টাকায়? এটা আমার-আপনার ট্যাক্স পেয়ারের টাকায়। গণভোটের প্রস্তাবক আপনি সালাহউদ্দিন। আজকে আবার কোন কমিটিতে দিয়ে আবার ২৭০ দিন কাটাবেন, কমিটির কথা কেন বলতেছেন জানেন, ওই যে বলছে কত ১৮০ দিনের বাধ্যবাধকতা (সংবিধান সংস্কারের কাজ)। ওই ১৮০ দিনের বাধ্যবাধকতা থেকে বাড়াতে আবার একটা মুলা-ঝুলা দিছেন। চলো কমিটিতে যাইয়া বসে আবার চা বিস্কুট খাই ২৭০ দিন। তারপর আবার একটা এই কথার মারপ্যাঁচে এই জাতির মুক্তি অর্জন করতে দিবেন না। সেই জন্যই বলছিলাম যখন বাংলাদেশে এসেছেন কোথাও দস্তখত দিয়ে এসেছেন এবং আমি এই কথাগুলো বলি আপনার মাধ্যমে বলি। জীবনের রিস্ক নিয়ে বলি।
সাধারণ মানুষ জানে কি জানে না জানি না। আমার এই কথাগুলো কিন্তু আমার জীবনের চরম রিস্ক। কারণ আমি এমন একটা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতেছি, সংগ্রাম করতেছি, দেখা যাবে একসময় বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল হয়তো আমার পেছনে থাকবে না। আমি সবসময় বিশ্বাস করি আমার নিরাপত্তার মালিক, রক্ষার মালিক আল্লাহ সুবহানাল্লাহ। সে জন্য আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি। কারণ সবাই কম্প্রোমাইজ করলে হবে না, দেশটাকে রক্ষা করতে হবে। আপনি লালমনিরহাট বেজ করবেন না বলেই তো দস্তখত দিলেন। আপনি মিরের সরাইয়ে ডিফেন্স ইপিজেট করবেন না বলে তো দস্তখত দিয়েছেন । তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প চুক্তি এখনও শুরু হচ্ছে না। আপনি ফ্যামিলি কার্ড শুরু করতে পারেন, কৃষি কার্ড শুরু করতে পারেন, তাহলে আমার তিস্তা শুরু হয় না কেন? লালমনিরহাটে কেন অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি শুরু হয় না?
কেন মিরসরাইয়ে আমার ডিফেন্স ইপিজেড শুরু হয় না? ওই তো ৯০০ একর জমি তো ইন্ডিয়ার সঙ্গে আমি ক্যানসেল করে দিছি। আপনি আজকে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কাছে যাচ্ছেন টাকা সাহায্য চাইতে। চীন তো আপনাকে টাকা দেওয়ার জন্য ৩০ হাজার বিলিয়ন কোটি টাকা নিয়ে বসে আছে। আপনি কেন সে টাকা নিচ্ছেন না? জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবেন না। এই কনস্টিটিউশনে হাত দেবেন না। কেন হাত দেবেন না? এটা তো দাদার করা। দাদার করা এই কনস্টিটিউশনে হাত দিলে দাদা ফেলে দেবে। আর যদি সংশোধন না করেন, ইনশাআল্লাহ এই দেশের মানুষ আপনাকে ফেলে দেবে। এখনি চিন্তা আপনাকে করতে হবে। আর সালাহউদ্দিন সাহেব যতই চেষ্টা করুক, জীবনে উনি সমস্ত রক্ত দিয়ে দিক। উনি কোনোদিন বিএনপির প্রেসিডেন্ট হতে পারবে? বিএনপির চেয়ারম্যান হতে পারবে? মানুষ তাকে মেনে নেবে না। কারণ বিএনপির দলটা হচ্ছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের। জিয়া পরিবারের বাইরে, মানুষ কাউকে ভোট দেবে না।
এশিয়া পোস্ট: আপনি যে মতাদর্শের রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেন, তারা অদূর ভবিষ্যতে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারবে বলে মনে হয়?
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির: জাতির ক্রান্তিকালের সময়ে আমরা সামনে না এসে পারিনি। পাঁচ তারিখে যে ভুলগুলো হয়েছে, এগুলো দেখে আর কতক্ষণ চুপ থাকা যায়? কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ কাকে কখন ক্ষমতায় বসাবেন তার একমাত্র মালিক আল্লাহ। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতি নয়, রাজনীতি তো করতে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন জন্য। বিএনপিকে দিয়ে যদি আমি কাজ করাতে পারি, আমার বিএনপিকে ফেলায় দেওয়ার দরকার নাই। তারেক জিয়া যদি হুবহু এই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করে, উনি আগামী ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকবে, তাকে কে সরাবে? তারেক জিয়াকে ফেলে দিয়ে এলাম আরেকজনকে নিয়ে আসলাম, সে আবার দেখা গেলে এই জুলাই জাতীয় সনদে আগুন ধরিয়ে দিল, লাভ আছে আমার? আমরা কতবার জীবন দেব? কেন আমরা বলি দ্বিতীয় স্বাধীনতা?
এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ তুলেছেন কেউ কেউ। ড. আসিফ নজরুলকে নিয়ে কিছু অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির: ড. ইউনূসকে লন্ডন নিয়ে যাওয়ার পর সব লেজেগোবড়ে হয়ে যায়। কেন বলি আসিফ নজরুল খারাপ? আসিফ নজরুল সাহেব ড. ইউনূসকে ট্র্যাপে ফেলে দিয়েছিলেন। ইউনূস সাহেব কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ভ্যাট-ট্যাক্স সব মাফ করে দিছেন, এসআরও দিয়ে। আপনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, আপনি বললেন এই সরকার কোনো অর্ডার দিতে পারবে না, যখন সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো বলল, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে পয়জন করা হচ্ছে, তাকে এখনই মুক্তি দিতে হবে। এটা কোন আদেশ ছিল? আসিফ নজরুল কত বড় চালাক, জুলাইয়ের ছেলেগুলোর বিরুদ্ধে বদনাম রটিয়ে দিয়েছে, আবার ইউনূস সাহেবকে তার গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৬০০-৭০০ কোটি টাকার কর মওকুফ করিয়েছে। তারপর ড. ইউনূসের গ্রামীণ শক্তির ৫০ পারসেন্ট টাকা ফেরত দিছে। শেখ হাসিনার আমলে গ্রামীণ শক্তির যে টোটাল ডিউ ছিল সেই টোটাল ডিউটা ইউনূস সাহেব দিতে বাধ্য হইছে ৫৫০ কোটি টাকা।
কারণ রিজওয়ানা ইন্ডিয়ান ব্লকের না। আসিফ নজরুল হচ্ছে ইন্ডিয়ান ব্লকের। আজকের এই সর্বনাশের মূলে আছে একমাত্র আসিফ নজরুল এবং আসিফ নজরুল গং। ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত যার এত এক্সপেরিয়েন্স, যে নির্বাচন কমিশনার ছিল তাকে আপনি নির্বাচনের সময় কেন অন্ধকারে রাখলেন? আপনি আসিফ নজরুল কেন এই ইলেকশনটা এভাবে ম্যানিপুলেট করলেন? একটু ওয়েট করেন আপনার বিচার যদি না হয় তাহলে জুলাই ভূলুণ্ঠিত হয়ে যাবে।
এশিয়া পোস্ট: পিলখানা হত্যাকাণ্ডে বিদেশি শক্তির সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে কমিশনের প্রতিবেদনে এসেছে। তারা কারা বলে আপনি মনে করেন?
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির: এটা ইন্ডিয়ান। একদম র-এর কাজ এটা। র কেন এর প্রতিশোধ নিছে? এটা সবাই জানে। তো কমিশনের রিপোর্ট পড়লেই মানুষ জানবে। অতএব সব বিষয়ে সবার মাথা ঘামানো দরকার নাই। এই রিপোর্ট পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র চলছে, যা প্রতিহত করতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: স্বাধীনতার পরে দুর্ভিক্ষ কেন হয়েছিল এবং আপনি বলেছিলেন যে মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। এর ব্যাখ্যা কী?
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির: প্রথম কথা হলো ২৫ মার্চ ১৯৭১ আমার সুটকেস গোছানো হলো। তার মানে আমি সারেন্ডার করার জন্য রেডি। আমি সারেন্ডার করলে ক্র্যাকডাউন হবে না। তাদের হাতে দিয়ে ধরা দিলাম। ওই রাতে আমি আবার বলে দিছি, তোরা আমাকে দেশদ্রোহী বানাবি নাকি স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে? তার মানে আমি স্বাধীনতা চাইনি এবং আপনারা একটা জিনিস অবাক হয়ে যাবেন। উনি যখন এই দেশে আসছেন, আসার আগে কিন্তু উনি ইন্ডিয়ায় গেছেন। ইন্ডিয়া যেখানে ২৫ দফা চুক্তি সাইন করেছে। যাতে সব লিখে দিয়ে আসলেন, খালি মাটিটা কোদাল দিয়ে কেটে নিয়ে যেতে পারেননি। আমার মা বোনের সম্ভ্রমের কথা খুব বড় বড় করে বলেন। চলেন প্রতিটা গ্রামে গ্রামে যাই পাকিস্তানি সৈন্যরা কোন গ্রাম থেকে কাকে তুলে নিয়ে গেছে।
আমি একদম চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি এ দেশের মানুষকে। ৭১ সালে আমার মা বোন যতটা সম্ভ্রম হারায়নি, এই ৭২ সালে ইন্ডিয়ান সৈন্য যাওয়ার আগে আমার মা বোনরা তত সম্ভ্রম হারাইছে। কাদের দ্বারা? এই ইন্ডিয়ান সৈন্য দ্বারা। পাকিস্তান সৈন্যদের দ্বারা যতখানি হইছে তার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি হইছে ইন্ডিয়ান সোলজারের দ্বারা। নয় মাসে যা হইছে যা হয়নি এই পরবর্তীকালে ৭২ সালে তাই হইছে। এমন কোন শহরের এমন কোনো দোকান দেখাতে পারবেন যে দোকানে জাপানিজ কাপড় ছিল। মেশিনপত্রসহ জাপানিজ প্যান্টের কাপড় তুলে নিয়ে চলে গেছে।
ইন্ডিয়ান অফিসারদের ডিসি নিয়োগ করা হয়। এরপর আপনি কোন স্বাধীনতার গল্প বলেন? ইন্ডিয়ান অফিসারদেরকে আপনি ডিসি নিয়োগ করলেন প্রত্যেকটা জেলায়। তখন ১৮ টা জেলা। আর দুর্ভিক্ষের কথা বলেন? দুর্ভিক্ষ কেন হলো?
এশিয়া পোস্ট: জামায়াতে ইসলামকে রাজাকার এবং যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিহিত করেন অনেকে। দলটির নেতারা স্বীকার করেছেন, যে তারা পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে কাজ করেছেন। দৈনিক সংগ্রামে অনেক বিবৃতি পাওয়া যায় এ রকম। বিষয়টি নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির: আমার কথা হলো ৭১ সালে জামায়াতে ইসলামসহ ২৫ মার্চের পরে যারা অখণ্ড পাকিস্তান চেয়েছিলেন, সে দলগুলো হলো আওয়ামী লীগ ও মুসলিম লীগ। নেজামে ইসলাম পার্টিসহ এদের সবার রাজনৈতিক ভুল ছিল কারণ। মালেক মন্ত্রিসভায় এরা সবাই মন্ত্রী ছিল। তখন স্বাধীনতার সময় এই মন্ত্রিসভায় ১৪ জন মন্ত্রী ছিলেন। যার ভেতরে পাঁচজন মন্ত্রী ছিলেন মুসলিম লীগের।
আওয়ামী লীগের ছিলেন তিনজন। তারপরে জামায়াতের ছিলেন দুইজন। নেজামে ইসলাম পার্টির ছিলেন দুইজন। তাহলে যদি আপনি বলেন রাজনৈতিক ভুল তাহলে রাজনৈতিক ভুল এদের সবারই। অখণ্ড পাকিস্তান চাওয়াটা ছিল একটি রাজনৈতিক ভুল।
ভারতের কূটচাল সেই ৪৭ থেকে শুরু হয়েছিল। কিন্তু আমার মনে হয় ২৫ মার্চের পরে পাকিস্তান যে আক্রমণ করছে তারপরে আর অখণ্ড পাকিস্তান চাওয়াটা কোনো রাজনৈতিক দলের উচিত হয়নি। কোনো রাজনৈতিক দলেরই আর তখন মালেক মন্ত্রিসভায় সমর্থন করা উচিত হয়নি। আরেকটা জিনিস এ দেশের মানুষকে বলব ডেড রেকর্ডিং সর্মিলা বসুর বইটা পড়তে। ৩০ লাখ নাকি ৩০ হাজার ওখানে সুন্দর পরিসংখ্যান দেওয়া আছে।



