বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভাইস চেয়ারম্যান নেতা ড. আসাদুজ্জামান রিপন। আশির দশকে কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে অগ্রগামী ছাত্রনেতাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন তিনি। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতেও আন্দোলন-সংগ্রামে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেবে আটকে না থেকে দলের প্রতি আনুগত্য অটুট রেখেছেন সবসময়। বিগত দেড় দশকের লড়াই-সংগ্রাম, কারাবরণ এবং চরম ক্রান্তিকালে ঝুঁকি নিয়েও বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সমসাময়িক নানা ইস্যু নিয়ে আসাদুজ্জামান রিপন কথা বলেছেন এশিয়া পোস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘আলাপন’-এ। সঞ্চালনায় ছিলেন রাহাত রূপান্তর
এশিয়া পোস্ট: ছাত্ররাজনীতিতে আপনার সম্পৃক্ততার গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই।
আসাদুজ্জামান রিপন: আমার রাজনীতির হাতেখড়ি বলা যেতে পারে ষাটের দশকের শেষ প্রান্তে—যখন আমি স্কুলে পড়ি। পরিবার যেহেতু রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট ছিল, তো আইয়ুব খানের জমানায় তখন স্কুলে একটা পাঠ্যবই ছিল ‘দেশ ও কৃষ্টি’। ওই বইয়ে মূলত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিষয়টার প্রতিফলন ছিল না; ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সেখানে প্রতিফলিত হয়নি। অথচ বইটি বাধ্যতামূলক ছিল ক্লাস নাইন থেকে। আমরা যদিও তখন নবম শ্রেণির ছাত্র নই, কিন্তু আমাদের রাজনীতির বড় ভাইয়েরা ‘দেশ ও কৃষ্টি বাতিল করো’ বলে একটা আন্দোলন শুরু করলেন। বড় ভাইয়েরা যখন স্কুলে এসে ক্যাম্পেইন করতেন এবং ক্লাসরুম থেকে আমাদের বের করে নিয়ে আসতেন, আমরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হতাম। সেই হাফপ্যান্ট পরার যুগে বড় ভাইদের সঙ্গে স্লোগানে শামিল হওয়ার মধ্য দিয়েই আমার রাজনীতিতে হাতেখড়ি; অনেকটা মিছিলে অংশগ্রহণ।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্ররাজনীতির শুরুতে তো বামপন্থায় আকৃষ্ট হয়েছিলেন।
আসাদুজ্জামান রিপন: মুক্তিযুদ্ধ হলো, তারপর স্বাধীন বাংলাদেশ হলো, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে না ঘটার কারণে তখন আবারও আমরা সোচ্চার হই এবং সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হই। তখন আমি বামপন্থার ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি। আমার পরিবারে বামপন্থা রাজনীতির সঙ্গেই সবার সংশ্লেষ ছিল, বলা যেতে পারে এটা অনেকটা পারিবারিক প্রভাবের জন্যও দায়ী। আমি মনে করি, মানুষের আকাঙ্ক্ষা যত দিন পূরণ না হবে, মানুষ তত দিন বিক্ষুব্ধ হবে, প্রতিবাদী হবে এবং রাজপথে নেমে আসবে। আমি একজন ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ নাগরিক হিসেবে আজও সেই স্বপ্নটাই লালন করি যা তরুণরা দেখছে। কারণ, আমার সে স্বপ্ন আজও পূরণ হয়নি।
এশিয়া পোস্ট: তার মানে রাজনীতি করতে এসে পরিবারের সমর্থন পেয়েছেন?
আসাদুজ্জামান রিপন: পরিবারের সমর্থন ছাড়া তো আমি ভিন্ন ট্র্যাকে আসিনি। তবে এটা ঠিক যে আমি আমার বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে হিসেবে রাজনীতির এই ঝুঁকি আর অনিরাপত্তা—এগুলোর কারণে স্বাভাবিকভাবেই পরিবার থেকে সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করার ব্যাপারে তাদের একটা নেতিবাচক ধারণা ছিল। কিন্তু আসলে আমি ভাগ্যলিপিতে অনেক বেশি বিশ্বাস করি। আপনার জীবনের পথরেখা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেভাবে নির্দেশ করে রেখেছেন, ইটস বেসিক্যালি এ ম্যাপ; ইটস লাইক এ সিডি। আপনার জীবনটা কীভাবে চলবে এবং কোথায় সমাপ্ত হবে, তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ফিক্সড করে দিয়েছেন, ইউ ক্যানট চেঞ্জ ইট—এটাই বাস্তবতা।
এশিয়া পোস্ট: আপনার বর্তমান কথায় ধর্মীয় চেতনার প্রকাশ ঘটছে, অথচ বাম রাজনীতির দর্শন তো ভিন্ন। এই দুই বিপরীত স্রোতের সমন্বয় আপনি কীভাবে করেন?
আসাদুজ্জামান রিপন: এটা একেবারেই অমূলক। আমি বামপন্থা বলতে বোঝাচ্ছি বেসিক্যালি সোশ্যালিস্ট, নট কমিউনিস্ট। যেমন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি নিজেকে কী পরিচয় দিয়েছেন? উনি বলেছেন ‘আই অ্যাম আ মুসলিম’; দ্যাট ইজ হিজ ফান্ডামেন্টাল আইডেন্টিটি। পাশাপাশি তিনি বলেছেন ‘আই অ্যাম আ সোশ্যালিস্ট’; অর্থাৎ সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি সোশ্যালিস্ট এবং তিনি একজন ডেমোক্র্যাট বা গণতন্ত্রী। বামপন্থার ব্যাখ্যা আমি খুব সহজভাবে দিই—ডানপন্থার লোকেরা যে প্রতিক্রিয়াশীলতার মধ্য দিয়ে চলতেন, ঠিক তার উল্টো পথে চলতেন বামপন্থার লোকেরা। অর্থাৎ তারা সমাজটা বদলাতে চাইতেন, বিধি-ব্যবস্থা বদলাতে চাইতেন। আমাদের ছেলেরা এখন যে ‘নতুন বন্দোবস্ত’ শব্দটা বলে, এই ভাবনাটাই আসলে বামপন্থার লোকেদের মূল সুর ছিল। এটার সঙ্গে ধর্মের কোনো সংঘর্ষ নেই এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিম।
এশিয়া পোস্ট: নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সেনানী আপনি। ২০২৬ সালের এই মুক্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে নব্বই এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের নায়কদের লড়াইকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
আসাদুজ্জামান রিপন: লড়াইটা এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম চলবে, মেলানোর কোনো ব্যাপার নেই। তবে এখানে একটা সবচেয়ে বড় ভুল যেটা আমাদের ছেলেরা করেছে বা এদের পেছনের লোকেরা করেছে, সেটা হচ্ছে তারা মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-কে অর্থাৎ ৭১ এবং ২৪-কে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। এটা একেবারেই ভুল। মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার, বাংলাদেশ আমার অহংকার। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেই আমি আজ এত বড় একটা রাজনৈতিক দলের ভাইস চেয়ারম্যান হতে পেরেছি। আমি কেন আমার এই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অহংকার করব না? ৭১-এর স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি বলেই ৭৫-এর ৭ নভেম্বর, ৮০-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে ২০২৪-এ আরেকটি অভ্যুত্থান হলো। যদি জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ না হয়, রাষ্ট্র যদি গণতান্ত্রিক না হয় বা ফ্রিডম অব স্পিচ না থাকে, তবে মানুষ আবারও প্রতিবাদ করবে। এটাকে কখনোই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে মেলানো ঠিক না; মুক্তিযুদ্ধ একটা মহান প্যারামিটার।
এশিয়া পোস্ট: পাকিস্তান আমলের কাঠামোগত কোন সংকটগুলো আমাদের অনিবার্যভাবে মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত করেছিল বলে আপনি মনে করেন?
আসাদুজ্জামান রিপন: খোলামেলা বলি, ৭১ কেন হলো? ৭১ হলো যে আপনি পাকিস্তানি ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যেই ইউ কুড নট এক্সপ্রেস ইয়োর ইনটেনশন; আপনি আপনার মত প্রকাশ করতে পারতেন না। পাকিস্তান রাষ্ট্রটা গণতান্ত্রিক চরিত্র গ্রহণ করেনি কখনো; ওটা একটা রিপ্রেসিভ স্টেট বা দমনমূলক রাষ্ট্র ছিল। বিরোধী মতকে কালাকানুনের মধ্য দিয়ে দমন করত এবং জেলখানায় পুরে রাখত। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ীদের দীর্ঘ সময় মেনে নিতে পারেনি এবং ১৯৭০-এর নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছেও ক্ষমতা হ্যান্ডওভার করেনি। এই অগণতান্ত্রিক চরিত্রের কারণেই মূলত মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল।
এশিয়া পোস্ট: ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আসাদুজ্জামান রিপন: আপনি যদি ভিন্নমতকে সাপ্রেস (দমন) করেন, কাউকে কথা বলতে না দেন বা রাজনৈতিক দল গড়তে না দেন, তবে মানুষ তো প্রতিবাদ করবেই। আপনি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা করবেন এটা তো আপনার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা না। ৭৫ সালে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা হলো এবং সংবিধানে বলা হলো যে ‘শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’ এটার জন্যই ৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা রাজপথে নেমে এসে পরিবর্তন আনল এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ধারা সূচিত হলো।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণজাগরণ বা অভ্যুত্থানের তাৎপর্য কী?
আসাদুজ্জামান রিপন: যতবার আপনার আকাঙ্ক্ষায় আঘাত আসবে, যতবার আপনার মুখ বন্ধ করে দিতে চাইবে এবং যতক্ষণ রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক চরিত্রে ফিরবে না, ততক্ষণ মানুষ আবারও প্রতিবাদ করবে। তার ফর্ম বা রূপ আলাদা হবে; কখনো জুলাই হবে, কখনো নভেম্বর হবে। যেমন একবার ৭ নভেম্বর হলো, এবার জুলাই হলো, তার আগে ৯০-এর ডিসেম্বর হলো। আকাঙ্ক্ষা থেকে এই প্রতিবাদ বিভিন্ন মাসে বিভিন্ন সালে নতুন নতুন রূপে আসবে, এটা অনিবার্য।
এশিয়া পোস্ট: রাজনৈতিক বক্তব্যে আজকাল একাত্তরের সঙ্গে চব্বিশকে তুলনার জায়গায় নিয়ে আসছেন। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?
আসাদুজ্জামান রিপন: মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কেন? যারা প্রশ্ন তুলছেন, তাদের একটা অসৎ উদ্দেশ্য আছে—সেটা হলো ৭১-কে আন্ডারমাইন করা। ইউ ক্যানট আন্ডারমাইন, কারণ আপনার ভিত্তিটা ওই জায়গায়, আপনার রাজনৈতিক জমিন হচ্ছে ৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়া। রিয়ালিটি হচ্ছে, ইউ ক্যানট ডিনাই ইয়োর প্যারেন্টস; আপনি আপনার বাবা-মাকে যেমন অস্বীকার করতে পারেন না, তেমনি ৭১-কেও অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্ররাজনীতির সোনালী সময়ে ছাত্রদলের মতো বৃহৎ সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন আপনি। সেই সময়ে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে এখনকার কী কী পার্থক্য দেখতে পান? বর্তমান ছাত্ররাজনীতি আগের মতো আদর্শিক জায়গায় আছে?
আসাদুজ্জামান রিপন: ছাত্ররাজনীতি বলে কিছু না, আসলে ছাত্র আন্দোলন থাকে। আমি যখন ছাত্রদলের প্রেসিডেন্ট হলাম (৮৭-৮৮ সালে), তখন একটা সামরিক শাসন ছিল। আমাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল সামরিক শাসনের অবসান ঘটানো এবং একটা ডেমোক্র্যাটিক পলিটি বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এখনকার ছাত্রদের ১৯৮৭ বা ৮২-৮৪ সালের মতো বিহেভ বা আচরণ করার প্রয়োজন নেই। কারণ, প্রেক্ষাপটটাই তো তা না। ২০২৬ সালের পর যখন দেশে একটি নির্বাচিত সরকার থাকবে, তখন ছাত্ররা ভিন্ন ফরম্যাটে কথা বলবে।
এশিয়া পোস্ট: ২০১৫ সালের পর তৎকালীন সরকারের চাপের মুখে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা যখন আড়ালে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, আপনি তখন একাই দলের মুখপাত্র হিসেবে মিডিয়ার সামনে এসেছিলেন। তখনকার অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
আসাদুজ্জামান রিপন: আমি কোনো চাপ বোধ করিনি। কারণ, আমি ঝুঁকি নিতে পছন্দ করি। ২০১৫ সালে যখন দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা রুহুল কবির রিজভী গ্রেপ্তার হলেন, তখন তারেক রহমান লন্ডন থেকেই আমাকে মুখপাত্র হিসেবে মনোনীত করেন। তখন পার্টির তরফে আমার নামে বিবৃতি যেত। ম্যাডাম যখন আমাকে অফিশিয়ালি ডাকলেন, আমি হেসে বললাম যে তারেক রহমান তো আমাকে সংকটকালে অলরেডি মুখপাত্র হিসেবে কাজ করাচ্ছিলেন। ঝুঁকি ছিল এবং থাকবে, আর আমি ঝুঁকি নেওয়া মানুষ।
এশিয়া পোস্ট: আপনার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা নিয়ে কোন স্মৃতি বেশি মনে পড়ে?
আসাদুজ্জামান রিপন: আদালতে আমাদের অনেক মামলায় যখন চার্জ ফ্রেম হয়, তখন প্রথা হচ্ছে আসামিরা বলেন তারা দোষী না। আমি চিন্তা করলাম শুধু নির্দোষ বলব না, কেন নির্দোষ তা এক্সপ্লেইন করব। আমি ১৬ পৃষ্ঠার একটি লিখিত স্টেটমেন্ট জমা দিয়েছিলাম যা বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আমি সাহসের সঙ্গে আদালতের পারমিশন নিয়ে ১৬ পৃষ্ঠা লিখেছিলাম এবং কয়েক পাতা বলার পরে আদালত বিব্রত হয়ে আমাকে থামিয়ে দেন।
এশিয়া পোস্ট: বিচার বিভাগের দলীয়করণ এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে আপনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো কী ছিল?
আসাদুজ্জামান রিপন: আমি সরাসরি বলেছি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ছাত্রলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং জাস্টিস এনায়েতুর রহিম ছাত্রলীগের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। বিচার বিভাগের শীর্ষ জায়গায় যখন আপনি ছাত্রলীগের নেতাদের বসিয়ে দেবেন, তখন সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাবে কীভাবে? যেখানে বেগম খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না, সেখানে আসাদুজ্জামান রিপন কীভাবে ন্যায়বিচার পাবে?
এশিয়া পোস্ট: সজীব ওয়াজেদ জয়ের দায়ের করা মামলা এবং সেই সময়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার ভূমিকা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আসাদুজ্জামান রিপন: সজীব ওয়াজেদ জয় একটি মামলা করেছেন এবং তিনি নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে বিচার প্রার্থনা করতেই পারেন। কিন্তু উনাকে দেখলাম যে সিটিং বিচারক প্রোটোকল দিয়ে রিসিভ করতে আসছেন। এটি বিচার বিভাগের জন্য কী জঘন্য এবং করুণ অবস্থা ছিল। শেখ হাসিনা যদি আর কয়েক মাস থেকে যেতেন, তবে আমার কমপক্ষে ৩৬ বছর জেল হতো।
এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে আপনার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা হয়েছে। কারাবরণও করেছেন। এই দীর্ঘ লড়াই আপনার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শনে কী পরিবর্তন এনেছে?
আসাদুজ্জামান রিপন: ওটাকে আমি একটা রুটিন ম্যাটারের মধ্যে ফেলে দিয়েছি। রাজনীতি করলে মামলা হবে এবং জেলে যেতে হবে—এটাই স্বাভাবিক। ন্যায় এবং সত্য উচ্চারণের বেলায় কোনো গ্লানি আমার নেই। আমি মনে করি আমি আমার সময়কালে সঠিক কাজটি পালন করেছি। মানুষ যখন নিজের কাজের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তখন তার কোনো রিগ্রেট থাকে না।
এশিয়া পোস্ট: ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আপনার প্রার্থিতা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে জানতে চাই।
আসাদুজ্জামান রিপন: ২০১৫ সালে বেগম খালেদা জিয়া আমাকে ঢাকার মেয়র নির্বাচনে বিকল্প প্রার্থী বা ‘স্ট্যান্ডবাই ক্যান্ডিডেট’ হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। মির্জা আব্বাস তখন ফরমালি মনোনীত ছিলেন এবং তার মার্কা ছিল মগ। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের সময় উনার নির্বাচন না করার একটা আশঙ্কা ছিল। পার্টি ওই আশঙ্কা থেকে আমাকে অল্টারনেটিভ ক্যান্ডিডেট হিসেবে রাখল যাতে মির্জা আব্বাস যদি ইন এনি ওয়ে নির্বাচন করতে না পারেন, তবে পার্টি আমার নাম ঘোষণা করবে এবং আমি কাজ করব।
এশিয়া পোস্ট: সেই সময়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার নিয়ে কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ জটিলতা হয়েছিল?
আসাদুজ্জামান রিপন: ম্যাডাম যখন আমাকে ডাকলেন, আমি একটা উইথড্র লেটার বা প্রত্যাহারপত্র লিখে নিয়ে গিয়েছিলাম। কারণ, মহানগর নেতা আব্দুস সালামকেও উইথড্র করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ম্যাডাম আমাকে বললেন, ‘আমি তোমাকে প্রত্যাহার করার জন্য ডাকিনি, তুমি বিকল্প প্রার্থী হিসেবে থাকবে।’ সাংবাদিকরা যখন আমাকে জিজ্ঞেস করত প্রার্থী কে, আমি বলতাম মির্জা আব্বাস। কারণ, একটা দলে দুইজন প্রার্থী থাকতে পারে না।
এশিয়া পোস্ট: সামনে তো সিটি করপোরেশন নির্বাচন। অংশগ্রহণের বিষয়ে কিছু ভাবছেন নাকি?
আসাদুজ্জামান রিপন: আমি নির্বাচন করতে আগ্রহী ছিলাম। কারণ, আমি জানি ঢাকা শহর একটা জঞ্জাল হয়ে গেছে এবং এটা বসবাসযোগ্য না। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ধীরগতির শহর এটা, শব্দদূষণের মাত্রা এখানে অন্য দেশের তুলনায় ৫০ গুণ বেশি এবং পরিবেশগতভাবে এটা নিকৃষ্ট। এটাকে চেঞ্জ করতে হলে স্বপ্ন থাকতে হবে। যেমন আমাদের নেতা তারেক রহমান বলছেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’, সিমিলারলি আই হ্যাভ এ ভিশন।
এশিয়া পোস্ট: ঢাকা সিটি করপোরেশন পুনরায় একীভূত করা নিয়ে আপনার বর্তমান অবস্থান বা দাবিটি কী?
আসাদুজ্জামান রিপন: নিউইয়র্ক সিটির আয়তন গোটা বাংলাদেশের প্রায় ৭৫ শতাংশের সমান। সেই শহরটি ম্যানেজ হয় মাত্র একজন মেয়র দিয়ে। সেখানে অসংখ্য মিউনিসিপাল হসপিটাল আছে যা সিটির অধীনে চলে। নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এবং শিক্ষা ডিপার্টমেন্ট সব সিটির অধীনে। অথচ ঢাকা সিটিতে উত্তর-দক্ষিণ করার কী দরকার ছিল? আমার নতুন দাবি হবে—‘ওয়ান সিটি, ওয়ান ঢাকা, ওয়ান মেয়র’। শেখ হাসিনা ঢাকাকে উত্তর-দক্ষিণে বিভক্ত করেছিলেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং সাদেক হোসেন খোকাকে বিদায় করার জন্য। খোকা ভাই এই বিভক্তির প্রতিবাদে হাইকোর্টে মামলাও করেছিলেন। বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল ক্ষমতায় গেলে ঢাকাকে পুনঃএকত্রীকরণ করবে। দুইটা সিটি হওয়ার কারণে নাগরিকরা শুধু বেশি বেশি মশা ছাড়া আর কিছুই পায়নি।
এশিয়া পোস্ট: একটি আদর্শ সিটি করপোরেশনের প্রকৃত দায়িত্ব ও অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আসাদুজ্জামান রিপন: সিটি করপোরেশনের কাজ কেবল মার্কেট বানানো নয়। মেয়রের কাজ হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন করা। ঢাকা সিটিতে কিছু স্কুল আছে যেখানে সিটি করপোরেশনের সুইপারদের ছেলে-মেয়েরাও পড়তে যায় না, এত বেহাল দশা। আমি দায়িত্ব পেলে পরিত্যক্ত স্কুলগুলোকে স্মার্ট স্কুল করব। মার্কেট বানানোর ধান্দা করলে হবে না।
এশিয়া পোস্ট: ঢাকা শহরের জরাজীর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা এবং অসহনীয় যানজট নিরসনে আপনার বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে?
আসাদুজ্জামান রিপন: পরিত্যক্ত স্কুলগুলোকে স্মার্ট স্কুল করার মাধ্যমে আমি একটি উদাহরণ সৃষ্টি করতে চাই যেখানে বিত্তবানদের সন্তানরাও পড়তে চাইবে। রাস্তা আর ফুটপাত দখল হয়ে গেছে, বিদ্যুৎ চুরি করে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে। আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঢাকা শহরকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে হবে, নতুবা ১৫-২০ বছরের মধ্যে এই শহর পরিত্যক্ত করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
এশিয়া পোস্ট: ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনের পর গত দেড় মাসে বিএনপির সামগ্রিক কর্মকাণ্ড বা অবস্থানকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আসাদুজ্জামান রিপন: ফ্যান্টাস্টিক। তারেক রহমান আসলে বর্তমানে জনগণের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠেছেন। গত কয়েক দিনের উনার কার্যক্রম দেখেন—৯টা ১ মিনিটে অফিসে যাওয়া এবং ঈদের ছুটির পর ও ১১ ঘণ্টা করে কাজ করা। উনি উত্তরাধিকার সূত্রে একটা মেসড কান্ট্রি বা জঞ্জালে ভরপুর দেশ পেয়েছেন। উনি এখন সবকিছু রিফরমেটিং বা ফরম্যাট করছেন।
এশিয়া পোস্ট: তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রতি তারেক রহমানের মূল বার্তাটি কী এবং দল হিসেবে বিএনপি এখন কোন পথে চলছে?
আসাদুজ্জামান রিপন: তারেক রহমান বার্তা দিয়েছেন যে দলের নেতাকর্মীরা যদি ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে থাকেন, তবে সরকার সমৃদ্ধ হবে। দলের সুনাম যেমন সরকারের ওপর বর্তায়, বদনামও সরকারের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই দলের কর্মীদের ইতিবাচক শক্তির সঙ্গে থাকা উচিত।
এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের পর অভিযোগ উঠছে—বিগত ১৫ বছর যাদের রাজপথে খুঁজে পাওয়া যায়নি, এখন তারা হঠাৎ করেই দলে ভিড় করছেন। তৃণমূলের ত্যাগী কর্মীরা অনেকেই ক্ষোভ বা অভিযোগ তুলছেন। এই ভিড়ে আপনাদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীরা কি হারিয়ে যাচ্ছেন না?
আসাদুজ্জামান রিপন: যারা গত ১৭ বছর নিখোঁজ ছিলেন এবং হঠাৎ ৫ আগস্টের পর বিএনপি সেজে গেছেন, তাদের আমি ‘রাজু বান গায়া জেন্টলম্যান’ সিনেমার মতো মনে করি। অনেক সচিব আগে আমাকে দেখলে এড়িয়ে যেতেন যাতে তাদের চাকরিতে সমস্যা না হয়, এখন তারা এসে পুরোনো ছবি দেখিয়ে সম্পর্ক ঝালাই করতে চান। আমি তৈলাক্ত কথায় বিশ্বাস করি না এবং এসব লোকজনকে আমি খুব একটা আমল দিই না।
এশিয়া পোস্ট: প্রশাসন এবং দলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তনের জন্য আপনি কোন বিষয়টির ওপর জোর দিতে চান?
আসাদুজ্জামান রিপন: আমাদের প্রশাসনে এবং পরিবারে ‘ক্যান আই হেল্প ইউ?’—অর্থাৎ ‘আমি কি আপনাকে কোনো সাহায্য করতে পারি?’—এই স্পিরিটটা দরকার। এটি সাহায্য করা মানে টাকা দেওয়া নয়, বরং সেবার মানসিকতা দেখানো। এই নতুন সংস্কৃতি তৈরি করা উচিত যেখানে মানুষের প্রতি সম্মান থাকবে।
এশিয়া পোস্ট: তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
আসাদুজ্জামান রিপন: ওনার নিশ্চিতভাবেই নিরাপত্তার ঝুঁকি ছিল এবং আছে। এটি রাষ্ট্র এবং নিরাপত্তা বিভাগ ভালো বলতে পারবে। আর আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের সামর্থ্য অলরেডি হারিয়ে ফেলেছে। শেখ হাসিনার কর্মীদের ওপর উনার এখন আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তারা উনার গ্রিপের বাইরে চলে গেছে। উনার অডিও ক্লিপগুলোই তার প্রমাণ।
এশিয়া পোস্ট: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও অর্জনকে কি তৃণমূল নেতাকর্মীদের কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ম্লান করে দিচ্ছে?
আসাদুজ্জামান রিপন: এই বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করার সময় এখনও আসেনি। কারণ, এই সরকারের বয়স মাত্র ৩৫ বা ৪০ দিন। একে আমি একটি ‘আঁতুড়ঘরের গভমেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করতে চাই। এই গভমেন্টের এখনই সব ত্যাগ ম্লান হয়ে যাবে—এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে বিএনপির বিরুদ্ধে আসা এসব অভিযোগের মধ্যে অনেক ‘বাড়তি প্রোপাগান্ডা’ যেমন রয়েছে, তেমনি কোথাও কিছু হচ্ছে না—তাও আমি সরাসরি অস্বীকার করব না। নিশ্চয়ই কোনো কোনো জায়গায় কেউ কেউ বাড়তি অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছেন, যা তার দায়িত্ব নয়। আমি মনে করি, এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা মূলত প্রশাসনের দায়িত্ব এবং প্রশাসনের উচিত হবে কোনো কিছুর দিকে না তাকিয়ে শক্ত হাতে একে ট্যাকেল করা। আর মেয়র নির্বাচনের প্রসঙ্গে আমার অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়—আমি যদি মেয়র হিসেবে জয়ী হই, তবে চাঁদাবাজ-দুর্বৃত্তদের জন্য কোনো জায়গা থাকবে না। আমি নিজে এক পয়সা হারাম খাই না, এটিই স্ট্রেটকাট কথা। আমি যেহেতু নিজে হারাম খাই না, তাই কাউকে হারাম কর্মকাণ্ড করতেও দেব না। এটাই আমার ফাইনাল ইস্যু।
এশিয়া পোস্ট: যারা নতুন রাজনীতিতে আসতে চায়, সেই তরুণদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী? তারা কি শুধু পদ-পদবির পেছনে দৌড়াবে নাকি আদর্শের?
আসাদুজ্জামান রিপন: তরুণদের জন্য প্রথম পরামর্শ হলো—দেশটা মাথায় নিতে হবে যে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। আর সবচেয়ে বড় কথা, আল্লাহকে ভয় পেতে হবে। আপনি যদি মানুষের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলেন, তবে এই মানুষগুলো আল্লাহর কাছে বলে দেবে এবং আল্লাহ ছাড়বেন না। সেই সিরিয়ান শিশুর কথা মনে রাখতে হবে যে বলেছিল— ‘আমি সব আল্লাহকে বলে দেব’। মানুষের পক্ষে থাকতে হবে, নতুবা নিস্তার নেই।



