বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়া শিশু-কিশোরদের জীবনের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা, বিনোদন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ—সবকিছুই এখন স্ক্রিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা ফোনে ডুবে থাকে।
অনেক অভিভাবকই চিন্তায় থাকেন, কীভাবে এই অভ্যাস কমানো যায়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখে। বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামের মতো অ্যাপে ইনফিনিট স্ক্রলের মতো ফিচারকে আসক্তি তৈরির জন্য দায়ী করা হয়েছে।
এই রায়কে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করলেও, বাস্তবে এটি অভিভাবকদের জন্য খুব বেশি সমাধান এনে দেয় না। কারণ প্রতিদিনের জীবনে সন্তানদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর উপায় অনুসরণ করলে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
অনেক অভিভাবক ভাবেন, সন্তানের হাতে ফোন বা ট্যাব দেওয়া ভুল হয়েছে এবং সেটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কিন্তু হঠাৎ করে সব বন্ধ করে দেওয়া কার্যকর নয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অভ্যাস পরিবর্তন ধীরে ধীরে করতে হয়। ঝগড়া বা উত্তেজনার মুহূর্তে নয়, বরং শান্ত সময় বেছে নিয়ে নিয়ম তৈরি করা ভালো। উদাহরণ হিসেবে, বাসায় একটি নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক করা যেতে পারে যেখানে সব ডিভাইস রাখা হবে। যেমন রাতে ঘুমানোর আগে ফোন চার্জে রেখে দেওয়া।
বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা বেশি কার্যকর। তাদের বোঝাতে হবে যে সোশ্যাল মিডিয়া তাদের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম—এটি স্বীকার করাও জরুরি। এরপর ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, কীভাবে স্ক্রিনের বাইরে কিছু সময় রাখা যায়।
সন্তানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এতে তারা সহজে সহযোগিতা করতে আগ্রহী হয়।
শুধু নিষেধ না করে, স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়টি শেখার অংশ হিসেবেও নেওয়া যেতে পারে। অভিভাবকরা সন্তানকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে কাজ করে, কেন মানুষ বেশি সময় ধরে এগুলো ব্যবহার করে এবং এগুলো কীভাবে অর্থ উপার্জন করে।
একই সঙ্গে অনলাইনের তথ্য সত্য কিনা তা যাচাই করার অভ্যাসও গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। এতে তাদের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়বে।
শিশুরা সাধারণত অভিভাবকদের অনুসরণ করে। তাই শুধু সন্তানকে দোষ না দিয়ে নিজের স্ক্রিন ব্যবহারের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। হালকা মজার ভঙ্গিতে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করলে সন্তানও বিষয়টি সহজভাবে নেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঝে মাঝে একঘেয়েমি বা বোর হওয়াও ভালো। কারণ এই সময়েই মানুষ চিন্তা করে, কল্পনা করে এবং সৃজনশীলতা বাড়ে।
ডিজিটাল যুগে সন্তান লালন-পালন করা সহজ নয়। অনেক সময় অভিভাবকরা অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের মস্তিষ্ক খুবই অভিযোজিত। তারা দ্রুত নতুন কিছু শিখতে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া মনোযোগ নষ্ট করে না, বরং সেটিকে অন্যদিকে টেনে নেয়। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে প্রযুক্তি সৃজনশীলতা, শেখা এবং অনুসন্ধানের সুযোগও তৈরি করে।
সন্তানের স্ক্রিন টাইম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, আবার সেটি প্রয়োজনীয়ও নয়। বরং সচেতন ব্যবহার, নিয়মিত যোগাযোগ এবং ধীরে ধীরে অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তানকে বোঝা এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়েই বড় ফল পাওয়া সম্ভব। তাই ভয় না পেয়ে ধৈর্য ধরে এগোলে, প্রযুক্তির এই যুগেও সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিত করা সম্ভব।
সূত্র : বিবিসি




