কোনো খাবারের লেবেলে ‘চিনি’ সবসময় সরাসরি এই নামেই লেখা থাকে বিষয়টি এমন না। বাস্তবে চিনির ৬০টিরও বেশি ভিন্ন নাম রয়েছে। ফলে অনেক সময় না বুঝেই আমরা অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ করি নানান খাবারের সঙ্গে। তবে সব ধরনের চিনি একরকম নয়। কিছু চিনি তুলনামূলক কম ক্ষতিকর, আবার কিছু শরীরের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
চিনি মূলত দুই ধরনের, প্রাকৃতিক চিনি এবং খাবারে কৃত্রিমভাবে যোগ করা চিনি।
প্রাকৃতিক চিনি পাওয়া যায় ফল, কিছু সবজি, দুধ ও শস্যে। এসব খাবারে শুধু চিনি নয়, ফাইবার, ভিটামিন, মিনারেল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও থাকে। ফলে এই চিনি শরীরে ধীরে শোষিত হয় এবং হঠাৎ রক্তে শর্করা বাড়ায় না। তাই সাধারণত প্রাকৃতিক চিনি নিয়ে খুব বেশি উদ্বেগের কারণ নেই, যদি না চিকিৎসক বিশেষভাবে তা গ্রহন করতে নিষেধ করেন।
অন্যদিকে কৃত্রিমভাবে যোগ করা চিনি হলো সেসব চিনি, যা খাবার তৈরির সময় আলাদা করে যোগ করা হয় (যেমন প্যাকেটজাত খাবার, কোমল পানীয়, মিষ্টি বা ডেজার্টে)। গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারের অধিকাংশ প্রক্রিয়াজাত খাবারেই কোনো না কোনোভাবে কৃত্রিমভাবে যোগ করা চিনি থাকে। অতিরিক্ত এই চিনি গ্রহণ করলে ওজন বৃদ্ধি, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের মতো শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে।
সব ধরনের চিনি শরীরে ভেঙে শেষ পর্যন্ত গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজেই পরিণত হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়। তবে বিভিন্ন চিনির প্রভাব একরকম নয়। কিছু চিনি দ্রুত শর্করা বাড়ায়, আবার কিছু তুলনামূলক ধীরে কাজ করে। এ ছাড়া এগুলোর প্রভাব রক্তচাপ, প্রদাহ এবং ক্ষুধার ওপরও ভিন্ন হতে পারে বলে জানাচ্ছে বিভিন্ন গবেষণা।
কৃত্রিমভাবে যোগ করা সব চিনি একদম এক নয়। কিছু কিছু চিনিতে সামান্য পুষ্টিগুণও থাকে। যেমন-
মধু: এতে অল্প পরিমাণ ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এটি রক্তে শর্করা তুলনামূলক ধীরে বাড়াতে পারে এবং এতে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণও রয়েছে।
ম্যাপল সিরাপ: এতে কিছু খনিজ উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। কিছু গবেষণায় এটি অন্ত্রের স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব দেখিয়েছে।
মোলাসেস (আখের ঘন সিরাপ): এতে আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজ পাওয়া যায়।
তবে মনে রাখতে হবে, এগুলোর পুষ্টিগুণ থাকলেও এগুলোও চিনি। অর্থাৎ বেশি খেলে ক্ষতির ঝুঁকি থেকেই যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনিক মোট ক্যালোরির একটি ছোট অংশের বেশি যেন যোগ করা চিনি না হয়। সাধারণভাবে-
নারীদের জন্য: সর্বোচ্চ ২৫ গ্রাম (প্রায় ৬ চা-চামচ)
পুরুষদের জন্য: সর্বোচ্চ ৩৬ গ্রাম (প্রায় ৯ চা-চামচ)
প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় লেবেল ভালোভাবে পড়া জরুরি। ‘–ose’ (যেমন গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, সুক্রোজ) বা ‘সিরাপ’ (যেমন কর্ন সিরাপ) শব্দ থাকলে বুঝতে হবে সেখানে চিনি যোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘no added sugar’, অর্থাৎ কোনো চিনি যোগ করা নেই লেখা থাকলেও প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি থাকতে পারে, এ বিষয়টিও খেয়াল রাখা উচিত।
মনে রাখবেন, চিনি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে সচেতনভাবে গ্রহণ করা জরুরি। প্রাকৃতিক উৎস থেকে চিনি নেওয়া নিরাপদ, আর যোগ করা চিনি যতটা সম্ভব সীমিত রাখা উচিত। সুষম খাদ্যাভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি




