আপনি নফল নামাজ পড়ছেন, ওই দিকে আপনার মা ডাকছেন। ভাবছেন, এদিকে আমার নামাজ, ওই দিকে মা ডাকছেন; এ অবস্থায় কী করতে পারি। হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ বিষয়ের সমাধান দিয়েছেন। তিনি চান, আপনি নফল নামাজ ছেড়ে মায়ের ডাকে সাড়া দিন।
প্রখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দোলনায় শুধু তিন ব্যক্তিই কথা বলেছে। মরিয়মের ছেলে ইসা (আ.) ও জুরাইজের সঙ্গী। জুরাইজ ছিল একজন ইবাদতকারী ও আল্লাহভীরু মানুষ। সে একটি গির্জা নির্মাণ করেছিল। একদিন গির্জায় নামাজরত ছিল। এমন সময় তার মা এসে ডাকলেন—জুরাইজ। জুরাইজ তখন মনে মনে ভাবতে লাগল, ‘হায় আল্লাহ! একদিকে আমার মা আরেক দিকে নামাজ।’ সে নামাজে মন দিল। তার মা ফিরে গেলেন।
পরদিন মা আবার এলেন। তখনও জুরাইজ নামাজে। মা ডাকলেন—জুরাইজ। জুরাইজ মনে মনে ভাবল, হায় আল্লাহ! আমার মা আমার নামাজ...।’ তারপর সে নামাজে মনোযোগী হলো। মা চলে গেলেন।
পরের দিন যথারীতি তিনি আবার এলেন। জুরাইজ তখনও নামাজে মশগুল। মা ডাকলেন—জুরাইজ।’ জুরাইজ মনে মনে বলল, হে আল্লাহ, আমার মা একদিকে অন্যদিকে আমার নামাজ...।’ (আমি কোন দিকে যাব!) এই ভেবে সে নামাজে মন দিল। তখন মা বললেন, হে আল্লাহ, কোনো বারাঙ্গনার মুখ না দেখা পর্যন্ত ওর মৃত্যু দিয়ো না।’
বনি ইসরায়েলের মধ্যে জুরাইজের ইবাদত-বন্দেগি বিপুল চর্চা পেল। মানুষের মুখে মুখে জুরাইজ। এদিকে এক গণিকা নারী ছিল প্রবাদতুল্য সুন্দরী। সে বলল, তোমরা চাইলে আমি জুরাইজকে পরীক্ষায় ফেলে দিতে পারি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এরপর সেই গণিকা জুরাইজের কাছে এলো। জুরাইজ তার দিকে তাকাল না। এদিকে গির্জায় এক রাখালের যাতায়াত ছিল। অপরাধিনী তার কাছে গেল। তাকে পাপ কাজের সুযোগ দিল। রাখাল তার সঙ্গে মিলিত হলো। এরপর সে গর্ভধারণ করল। সন্তান প্রসব করে বলে বেড়াল, এটা জুরাইজের সন্তান।
গণিকার এ কথা শুনে বনি ইসরায়েলের লোকেরা ছুটে এল। জুরাইজকে গির্জা থেকে টেনে-হিঁচড়ে নামাল। গির্জা ভেঙে ফেলল। মারধর করল। বিস্মিত জুরাইজ জানতে চাইল, ‘তোমাদের কী হয়েছে?’
লোকেরা বলল, তুমি এই বারাঙ্গনার সঙ্গে পাপ কাজ করেছ। সে তোমার সন্তান প্রসব করেছে। জুরাইজ জিজ্ঞেস করল, প্রসবিত সেই শিশুটি কোথায়?
তারা শিশুকে নিয়ে এল। জুরাইজ বলল, আমাকে নামাজ পড়তে দাও। সে নামাজ আদায় করল। এরপর শিশুটির কাছে এসে পেটে খোঁচা দিয়ে বলল, ‘এই খোকন, তোমার বাবা কে?’
শিশুটি রাখালের নাম বলল। এরপর সবাই ছুটে এলো জুরাইজের দিকে। তার কপালে চুমো খেল। তাকে ছুঁয়ে বরকত নিতে নিতে বলল, ‘আমরা সোনা দিয়ে তোমার গির্জাঘরটি বানিয়ে দিই।’ জুরাইজ বলল, ‘না, মাটির ছিল, মাটি দিয়েই বানিয়ে দাও।’ তারা তাই করল।’ তৃতীয়জন বনি ইসরায়েলের এক শিশু। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৩৬)
মনীষী মুহাম্মাদ ইবনে মুনকাদির (রহ.) বলেন, ‘আপনি নামাজ (নফল) পড়াবস্থায় যদি আপনার বাবা ডাক দেন, তাহলে নামাজ ছেড়ে তার ডাকে সাড়া দেবেন।’
আমরা হয়তো মোবাইলে ব্যস্ত বা পড়াশোনা করছি কিংবা সামান্য কাজে লেগে আছি—ওই দিকে মা-বাবা আমাদের ডাকছেন—তখন অনেকেই বলি, একটু পরে আসছি। সাধারণত নিজেদের ব্যস্ততা বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। কখনো আবার ইচ্ছে করে না শোনার ভান করে থাকি বা সাড়া না দিয়ে এড়িয়ে যাই তাদের আহ্বান।
আমাদের কাছে শিক্ষকের আহ্বান, বন্ধু-বান্ধবের আড্ডা, খেলাধুলা মা-বাবার ডাকের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়। তাদের ডাকে সাড়া দেওয়ার মতো সময় থাকে না। মনে রাখতে হবে, নফল নামাজের চেয়ে মা-বাবার ডাকে সাড়া দেওয়া, তাদের কথামতো চলা, তাদের জন্য সময় দেওয়া অধিক সওয়াবের কাজ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন মসজিদে নববিতে বসে আছেন। এক সাহাবি মা-বাবাকে কাঁদিয়ে তাঁর কাছে এলেন। উদ্দেশ্য বাইয়াত নেবেন। নবী (সা.) জানতে পারলেন, লোকটি তার মা-বাবাকে কাঁদিয়ে এসেছে। তিনি বললেন, ‘তুমি তাদের কাছে ফিরে যাও। তাদের যেভাবে কাঁদিয়েছ, সেভাবে গিয়ে হাসাও।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫২৮)




