হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর মা আমেনা। তিনি মুহাম্মদের (সা.) সুস্থ মেধা বিকাশ, উত্তম আচরণ ও বিশুদ্ধ ভাষা শেখানোর লক্ষ্যে মক্কার বাইরে অবস্থানকারী বিবি হালিমাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব দেন। তখন তিনি আট দিনের শিশু। তাঁর শৈশব কেটেছে বিবি হালিমার কাছে। পাঁচ-ছয় বছর বয়সে তিনি মায়ের কাছে ফিরে আসেন।
মায়ের মমতাজড়ানো স্নেহে কিছুটা সময় কেটেছে তাঁর। এক দিন মায়ের সঙ্গে বাবার কবর জিয়ারতে রওনা করেন। কবর জিয়ারত শেষে বাড়ি ফেরার পথে অসুস্থ হয়ে মক্কা-মদিনার মধ্যবর্তী আবওয়া নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন প্রিয় আম্মাজান। তখন তিনি ছয় বছরের বালক। তাই মাতৃসেবার তেমন সুযোগ পাননি। মা-বাবার কথা মনে করে তিনি কাঁদতেন। তাঁদের কবর জিয়ারত করতেন। তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন প্রাণভরে।
বিবি হালিমা মুহাম্মদের (সা.) দুধমাতা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তিনি ছিলেন বনু সাদ গোত্রের এক ধার্মিক নারী। তার ঘরেই কেটেছে শিশুনবীর শৈশব। নবী তাকে মা বলে ডেকেছেন। নবুওয়ত লাভের পর একসময় তিনি মদিনার অধিপতি হলেন। দুজাহানের সরদার তিনি। কিন্তু দুধমা হালিমাকে ভুলে যাননি। সবসময়ই খোঁজখবর নিতেন এই দুধমাতার। সম্মান-সমীহ করতেন। তিনি নবীর (সা.) কাছে এলে, তার সম্মানার্থে উঠে দাঁড়াতেন। তিনি আসছেন বলে খবর পেলে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য এগিয়ে যেতেন। বসার জন্য নিজের পরনের চাদর বিছিয়ে দিতেন। একবার তাঁর কাছে মা হালিমা আগমন করলে তিনি নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে বসতে দেন।
তখন ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ, হুনাইনের যুদ্ধ হয়। মক্কার মুসলমানদের সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ স্থানীয় ও তায়েফের বেদুইনরা। ভয়াবহ এক যুদ্ধ। মুসলমানরা জয়লাভ করেন। (সুরা তওবা, আয়াত: ২৫-২৬)। প্রচুর ধনসম্পদ, পশু ও ফসল দখলে আসে। একটি সূত্রমতে, এ সময় ৬ হাজার যুদ্ধবন্দি, ৪০ হাজার ছাগল, ২৪ হাজার উট ও ৪ হাজার উকিয়া রৌপ্যমুদ্রা মুসলমানদের করতল হয়।
যুদ্ধবন্দিদের একজন ছিলেন মা হালিমার কন্যা শায়মা। তিনি নবীর দুধবোন। পরিচয় পাওয়ার পর মুসলমানরা শায়মাকে তাঁর কাছে নিয়ে এলেন। তিনি তাঁর চাদর বিছিয়ে শায়মাকে বসতে দিলেন। মেহমানদারি করেন। মা হালিমা ও বোনের সম্মানে সবাইকে মুক্তি দিয়ে তাদের মধ্যে উপহারসামগ্রী বিতরণ করলেন খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আরেক মা ছিলেন উম্মে আয়মান (রা.)। তিনি তাঁর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পাশে ছিলেন। তিনি তো আপন মায়ের সেবা করার সুযোগ পাননি, দুধমাতা হালিমাও থাকতেন দূরের শহরে। কিন্তু কৈশর, যৌবন এবং নবুওয়ত পরবর্তী মদিনার বাদশাহি জীবনে কাছে পেয়েছেন উম্মে আয়মানকে (রা.)।
উম্মে আয়মান আফ্রিকান কালো নারী। নবী পরিবারের গৃহপরিচারিকা ছিলেন তিনি। মা আমেনার সেবার জন্য নবীর (সা.) পিতা আব্দুল্লাহ তাকে কিনে এনেছিলেন। (মুখতাসারু সিরাতির রাসুল, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দিল ওয়াহহাব আন-নাজদি, পৃষ্ঠা : ১২)। নবী (সা.) তাঁকে মায়ের মর্যাদা দিতেন। আম্মা বলে ডাকতেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের সময় উম্মে আয়মান (রা.)-এর বয়স ছিল ১৩ বছর। তাঁকে তিনিই প্রথম কোলে নেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তিনি তাঁকে আমৃত্যু মায়ের মমতা, আদর-সোহাগ দিয়ে দেখাশোনা করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ছয় বছর বয়সে আমেনা তাঁকে নিয়ে মদিনা সফর করেন। সঙ্গে ছিলেন উম্মে আয়মান (রা.)। তখন তার নাম ছিল বারাকা।
মদিনায় এক মাস অবস্থান শেষে আব্দুল্লাহর কবর জিয়ারত করে মক্কায় ফিরছিলেন তারা। আবওয়া নামক স্থানে নবীমাতা আমেনা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘বারাকা, আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই এ দুনিয়া ছাড়ব। আমি আমার সন্তানকে তোমার হাতে দিয়ে যাচ্ছি। গর্ভে থাকাকালে সে তার পিতাকে হারিয়েছে। এখন তার চোখের সামনে মাও চলে যাচ্ছে। এখন থেকে তুমি তার মা। কখনো তাকে ছেড়ে যেয়ো না। তাঁকে তাঁর দাদার কাছে তুলে দিও।’ বলা বাহুল্য, একজস সামান্য দাসী হয়েও অসামান্য এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন বারাকা। (সিরাত ইবনে হিশাম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৬৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন কিশোর। উম্মে আয়মানকে বললেন, আপনাকে আমি মুক্ত করে দিয়েছি। আপনি যেখানে ইচ্ছা যেতে পারেন। উম্মে আয়মান তাঁকে ছেড়ে কোথাও যাননি। তাঁর সেবায় নিয়োজিত থেকে গেলেন। বললেন, ‘আমি তোমাকে ছেড়ে কোথায় যাব না।’
রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে খাবার খাওনোর জন্য জোরাজোরি করা যেত না। তবুও একমাত্র উম্মে আয়মানই এই কাজটি করতে পারতেন। বিয়ের সময় নববধূ খাদিজার (রা.) সঙ্গে বারাকাকে মা বলে পরিচয় করিয়ে দেন। খাদিজা (রা.) তাঁকে অনেক উট ও ছাগল উপহার দেন। সেসময় রাসুলুল্লাহ (সা.) দায়িত্ব নিয়ে তাঁর বিয়ে দেন। দাম্পত্য জীবনে তিনি ছেলে সন্তানের মা হলে ছেলের নাম রাখা হয় আয়মান। এরপর থেকে লোকেরা তাকে উম্মে আয়মান নামে চেনে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে সবসময় আম্মা বলে ডাকতেন। জায়েদ বিন হারেসা (রা.)-এর সঙ্গে উম্মে আয়মানের দ্বিতীয় বিয়ে হয়। তিনি বিয়ের দিন জায়েদকে বুকে জড়িয়ে আনন্দ ও ভালোবাসায় কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন, ‘তুমি কাকে বিয়ে করেছো, জানো জায়েদ?’ জায়েদ বললেন, ‘হ্যাঁ, উম্মে আয়মানকে।’ তিনি বললেন, ‘না, তুমি বিয়ে করেছ আমার মাকে।’
মদিনায় হিজরতের পর দীর্ঘ যাত্রা শেষে উম্মে আয়মান ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর গায়ের চাদরের একটা অংশ পানিতে ভিজিয়ে উম্মে আয়মানের মুখের ঘাম ও ধূলোবালি নিজ হাতে মুছে দিতে দিতে বলেছিলেন, ‘আমার মা, জান্নাতে আপনার এইরকম কোনো কষ্ট হবে না।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) বুঝতে পারলেন প্রিয় বন্ধু ডাকছেন। এবার তবে যেতে হবে। তিনি সাহাবিদের ডেকে উপদেশ দিলেন। সেরা নসিহতগুলো শোনালেন। জীবনের শেষবেলায় এসেও এই মায়ের কথা ভুললেন না তিনি। বললেন, ‘তোমরা উম্মে আয়মানের যত্ন নেবে, তিনি আমার মায়ের মতো। তিনিই একমাত্র নারী, যিনি আমাকে জন্ম থেকে শেষ পর্যন্ত দেখেছেন।’




