সন্তানের মুখে উচ্চারিত প্রথম শব্দ আম্মা-আব্বা বা মা-বাবা। সন্তানের প্রথম প্রভাত থেকে আম্মা-আব্বাই সঙ্গী। তারাই জীবনের প্রথম ও সেরা শিক্ষক। তাদের কাছে সন্তান শেখে—কীভাবে বসতে হয়, হাঁটতে হয়, খাওয়ার ধরন, পোশাক-পরিচ্ছদ পরার স্টাইল, পাঠশালায় যাওয়া ও পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তা। সর্বোপরি জীবনের প্রয়োজনীয় সবকিছুই মানুষ শেখে তার পরিবার থেকে। আর এর উত্তম শিক্ষক মাতা-পিতা।
সন্তানের জন্য মায়ার ভান্ডার সঞ্চিত থাকে প্রতিটি মায়ের মনে। বাবার হৃদয়জুড়ে আছে অফুরন্ত শুভকামনা। আম্মা-আব্বা নির্ভয় ও নির্ভরতার আশ্রয়স্থল। পবিত্রতার পরশে বেড়ে ওঠার আঁতুড়ঘর। তাদের কোমল স্পর্শ আর ছায়ায় সন্তানের আত্মা পরিতৃপ্ত হয়। তাদের ছায়ার মতো এত পবিত্র, নির্মল, বিশ্বাসী ছায়া পৃথিবীতে আর একটিও নেই। এ ছায়া নিঃস্বার্থ, ভালোবাসার, দয়া-মায়ার, ভরসার, সৌভাগ্যের, কল্যাণ ও প্রার্থনার।
সন্তান গর্ভধারণের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কষ্ট শুরু হয়ে যায়। পর্যায়ক্রমে কষ্ট বাড়তে থাকে। বেদনা, ভয় ও উৎকণ্ঠা মায়ের সবকিছু বিপন্ন করে রাখে। সন্তান জন্মদানের সময় কষ্টের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। কষ্টের তীব্রতায় প্রতিটি মা ভাবেন, এরপর আর সন্তান নেবেন না। কিন্তু সন্তানের নিষ্পাপ মুখ দেখে মা সব ভুলে যান। শত কষ্ট সত্ত্বেও মা হওয়ার মধ্যেই লুক্কায়িত আছে বিপুল সুখ। মা হওয়ার জন্য প্রতিটি নারীর কী অদম্য আগ্রহ। ডাক্তার-কবিরাজের কাছে নিঃসন্তান নারীদের কত দৌড়ঝাঁপ।
এদিকে প্রসবের সময় মায়ের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবসংক্রান্ত জটিলতায় বিশ্বজুড়ে প্রতি দুই মিনিটে একজন নারীর মৃতু হয়। তবে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে তা কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
মায়ের কষ্টের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আমি মানুষকে তার আম্মা-আব্বার সঙ্গে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার আম্মা কষ্ট ভোগ করতে করতে তাকে গর্ভধারণ করে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার শুকরিয়া ও তোমার আম্মা-আব্বার শুকরিয়া আদায় করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৪)
বাবার জীবনে সন্তান আগমনের শুভসংবাদ তাকে অন্যরকম মানুষে রূপান্তরিত করে। তার জীবনে যুক্ত হয় নতুন অধ্যায়। যেন বুক তার সন্তানের হৃদয়। সন্তানকে ঘিরেই তার পৃথিবী সাজে। তার চিন্তার দিগন্ত খোলে। নিজের শখ-আহ্লাদ এমনকি জরুরি প্রয়োজনগুলোও হয়ে যায় একেবারেই গৌণ। পরিশ্রমটা আগের চেয়ে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেন শুধু সন্তানের ভাবনায়। নিজস্বী বিসর্জন দিয়ে বাবা হয়ে যান কেবলই সন্তানের। সন্তানের ইচ্ছে ও স্বপ্নগুলোই তখন বাবার কাছে সবচেয়ে বড়ো বিষয় হয়ে ওঠে।
সন্তানের জন্য আম্মা-আব্বা আমৃত্যু একজন যোদ্ধা হয়ে বেঁচে থাকেন। যৌবনে যেমন পাঁজর শক্ত করে সন্তানের বেড়ে ওঠায় ছায়া হয়ে মিশে থাকেন, তেমনি শেষ বয়সে সর্বোচ্চটুকু উজাড় করে দিয়েই পাশে থাকেন। সন্তানকে দুধে-ভাতে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা তাদের। আম্মা-আব্বার চেয়ে বড়ো যোদ্ধা পৃথিবীতে আর কে থাকতে পারে? আম্মা-আব্বা স্নেহ, আদর, ভালোবাসা ও কল্যাণকর শাসনে সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে নির্মাণ করতে আমৃত্যু সাধনা করেন।
মাম-বাবার প্রতিও রয়েছে সন্তানের কিছু দায়িত্ব। মা-বাবার অসুস্থতা, বার্ধক্য ও বেদনার দিনগুলোতে ভালোবাসা, আদর ও সেবার ব্রত নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করা শুধুই দায়িত্ব নয়, রয়েছে বিশেষ সওয়াবও। তাদের দেখাশোনা করা ইবাদত।
আম্মা-আব্বাই সন্তানের জান্নাত-জাহান্নাম। সন্তানের জান্নাত-জাহান্নাম নির্ধারণ হয় আম্মা-আব্বার খুশি-অখুশির ওপর। জান্নাতের স্বপ্ন দেখে মানুষ তখনই তৃপ্তি পাবে, যখন তার ঘরের জান্নাত আম্মা-আব্বা তার ওপর সন্তুষ্ট। ঘরের জান্নাত অসন্তুষ্ট কিংবা তাদের মনে কষ্টে দিয়ে কেউ জান্নাতের অধিবাসী হতে পারবে না। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পিতা-মাতাই তোমার জান্নাত ও জাহান্নাম। অর্থাৎ তুমি ইচ্ছা করলে তাদের খেদমত করে উত্তম আচরণের মাধ্যমে জান্নাত অর্জন করতে পারো; আবার ইচ্ছা করলে অবাধ্যতার ফলস্বরূপ জাহান্নামে প্রবেশ করতে পারো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২১)
আম্মা-আব্বার চেয়ে শ্রেষ্ঠ সম্পদ পৃথিবীতে আর কী আছে? তাদের মতো এত যত্ন নিয়ে, মায়া-মমতার সঙ্গে নিখুঁত ও নির্ভেজাল ভালোবাসা আর কে দিতে পারে?
আমরা আমাদের জীবনসঙ্গিনী ও প্রেমিককে নানাভাবে ভালোবাসা বোঝানোর চেষ্টা করি। কারও প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে বর্ণিল আয়োজন করি। মনকাড়া সুন্দর সুন্দর উপহার দিই। খুব যতনে বুকের তুরঙ্গে তুলে রাখি ভালোবাসার অনবদ্য ৭০০ কবিতা। এনে দিতে চাই ১০৮টা নীলপদ্ম। শহরের দেয়াল ছেয়ে দিতে চাই প্রণয়ের পোস্টারে। কিন্তু কখনোও কি খুব আয়োজন করে আম্মা-আব্বাকে বলেছি, ভালোবাসি। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর কখনো কি ইচ্ছে হয়েছে, আম্মা-আব্বার দরজায় কড়া নেড়ে বলি, ভালোবাসি।
আমরা বোধহয় জীবনে সবচেয়ে বেশি ভুল করি আম্মা-আব্বার সঙ্গে। জীবনে সবচেয়ে বেশি জ্বালাতন করি তাদের। অথচ কোনো দিন বলা হয় না, ‘সরি, আমার ভুল হয়েছে। আমাকে ক্ষমা করো।’ আর ওই মানুষগুলো সন্তানের জন্য দুঃখ পুষে রাখেন না। দুঃখকে বড়ো করেন না। সন্তান শত কষ্ট দিলেও প্রভুর কাছে প্রতিটি সেজদায় বলেন, ‘আমার নাড়িছেঁড়া ধনকে তুমি ভালো রেখ আল্লাহ।’
জীবনে কত মানুষের প্রশংসা করেছি এবং কতজনের প্রশংসা করছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এদিকে যে আম্মা-আব্বা এত যতনে আমাদের ভালোবাসেন, এক জীবনে তাদের প্রশংসা করা হয় না।
চলুন, চোখ বন্ধ করি। মনে করি আম্মা-আব্বাকে। তাদের স্মৃতিগুলো। তাদের ভালোবাসা, আদর, যত্ন আর ত্যাগসমূহ। তাদের জন্য জীবন সাজাই। তাদের মুখে হাসি ফোটাই। তারা খুশি হয়, এমন কাজ করি। হৃদয়ের গভীর থেকে পাঠ করি—




