আপনি কোনো সভায় কথা বলার দায়িত্ব পেয়েছেন; কথা বলার আগে বিষয়বস্তু ঠিক করে নিন। মনে মনে একটি খসড়া নোট সাজিয়ে রাখুন। এরপর তা তুলে ধরার চেষ্টা করুন একদম স্পষ্ট ভাষায়। অবশ্যই নির্ধারিত সময়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। শ্রোতাদের মনোযোগের দিকে খেয়াল রাখাটাও জরুরি। কেননা তাদের মনোযোগ থাকা মানে তারা আপনার কথা বুঝতে পারছে। এমকি আপনার কথাগুলো শোনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারছে সাগ্রহে।
আপনি মসজিদের খতিব। জুমার দিন আলোচনা করছেন; আলোচনার এত গভীরে প্রবেশ করেছেন, ফলে আর কোনোকিছুই খেয়াল করতে পারছেন না। এদিকে নামাজের নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেছে। মুসল্লিরা হাঁসফাঁস করছে। কারও হয়তো নামাজ শেষে কোথাও যাওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কেউ হয়তো সময়মতো গাড়ি ধরবেন। কারও হয়তো বাড়িতে মেহমান আসার সিডিউল রয়েছে; তাকে সময়মতো অভ্যর্থনা জানাতে হবে। একজন খতিবের উচিত, এসব বিষয় খেয়াল করে খুতবা দেওয়া।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিভিন্ন প্রয়োজনে কথা বলতেন। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। কথা বলতেন ধীরগতিতে। মুখে ছিল না কোনো জড়তা কিংবা আড়ষ্টতা। ফলে শ্রোতারা সহজেই তাঁর কথা বুঝতে পারত। তাঁর সুস্পষ্ট মধুময় কোরআন তিলাওয়াত মুগ্ধ হয়ে শুনত কাফের নেতা আবু জাহেলও। তৎকালীন আরবের সব শ্রেণি, গোত্র ও পেশার মানুষ সহজে তাঁর কথা বুঝতে পারত। তিনি মানুষের অবস্থাভেদে কথার আওয়াজ, তাল-লয় ঠিক রাখতেন। সময়ানুবর্তিতা, স্থান-কাল-পাত্র ইত্যাদি প্রতিটি বিষয় খেয়াল করেই তিনি কথা বলতেন।
নবীর (সা.) বাচিক গুণের উল্লেখ পাওয়া যায় আয়েশার (রা.) জবানিতে। তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহর (সা.) বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট। প্রত্যেক শ্রোতাই তাঁর বক্তব্য বুঝতে পারত।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৯)
তখন জেলা শহরে থাকতাম। এক শুক্রবার বিকালে ঢাকার বারিধারায় কাজ পড়েছে। রুমমেট সৈকত বলল, পৌনে ২টায় তিতাস কমিউটার ট্রেন আছে। দেড়টায় স্টেশন মসজিদে নামাজ। নামাজ পড়ে ট্রেন ধরতে কোনো অসুবিধে হবে না। সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে রুম থেকে বের হলাম। স্টেশন থেকে ১ মিনিটের দূরত্বে মসজিদ। খতিব সাহেব আলোচনা করছেন। মসিজদ নির্মাণে দান করার ফজিলত ও সওয়াবের কথা বলছেন। এভাবে দেড়টা বেজে গেল। তখন তিনি শুরু করলেন মসজিদের তিন তলা নির্মাণের জন্য কালেকশন।
সময় বয়ে যায়। তিনি কালেকশন করে চলেন। আমরা পরস্পরের দিকে তাকাই মুহুর্মুহু। যাদের নামাজ পড়ে ট্রেন ধরবার কথা রয়েছে, তারা গাঁইগুই শুরু করেন এর মধ্যে। তাদের চোখে-মুখে বেশ বিরক্তির ছাপ। এর মধ্যে দুয়েকজন কথা বলতে লাগলেন খতিব সাহেবের কমনসেন্স নিয়ে। দীর্ঘ হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন থামল স্টেশনে। মানুষজন ছুটতে লাগল স্টেশনের দিকে। তখনও খতিব সাহেব আর দুই মিনিট সময় চেয়ে নিচ্ছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) অবস্থা বিবেচনায় রেখে কথা বলতেন। মুগ্ধ হয়ে শ্রোতারা তাঁর কথা শুনত। তাঁর কথা শুনে শ্রোতাদের কখনও বিরক্তি আসত না, সেটা দীর্ঘ কথাবার্তা হলেও। তবে তিনি অল্প কথা বলতেন। সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতেন। সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা পছন্দ করতেন তিনি।
আমর ইবনে আস (রা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে সুদীর্ঘ বক্তৃতা করলে আমর (রা.) বলেন, যদি সে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করত তবে তার জন্য ভালো হতো। কেননা আমি রাসুলুল্লাহকে (সা.) বলতে শুনেছি, আমার কাছে উপযুক্ত মনে হয়েছে অথবা আমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে ভাষণ সংক্ষিপ্ত করার জন্য। কেননা, সংক্ষিপ্ত আলোচনা উত্তম।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০০৮)
মানুষের কাছে নিজের মতামত বা মতাদর্শ তুলে ধরার অনন্য মাধ্যম বক্তৃতা ও আলোচনা। ভালো বক্তৃতার মাধ্যমে নিজের উদ্দেশ্য অর্জনে কাজ করা যায়। মানুষের ভেতর পরিবর্তন সাধিত হয়। গণজোয়ার থেকে তৈরি হয় গণবিপ্লব। সুস্পষ্ট তেজস্বী বক্তৃতা শ্রোতার হৃদয়ে মুহূর্তে বিস্ফোরণ সৃষ্টি করে।
নানা ইস্যু, বিভিন্ন সভা-সমিতি, আয়োজন, মজলিশে মানুষ বক্তৃতা করে। ইসলাম বলছে, বক্তৃতায় আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কথা থাকতে হবে। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি প্রশংসা বাক্য বলতে হবে। যে বক্তৃতায় আল্লাহ ও রাসুলের প্রশংসা থাকে না, সে বক্তৃতা নিষ্প্রাণ। সে বক্তৃতা ইসলামের চোখে মৃত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে বক্তৃতায় আল্লাহর একাত্ববাদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য থাকে না, তা পঙ্গু হাতের মতো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৪১)




