বাইরে কড়া রোদ। সবকিছু যেন ঝলসে যাচ্ছে। শাশ্বত সুন্দরের আকাশে চোখ মেলে তাকানো যায় না। এমন দিনে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে বের হয় না। আমি জানালার পর্দা নামিয়ে আলস্য পোহাচ্ছি। কেফায়েত ভাই ঘর্মাক্ত হয়ে বাসায় ফিরলেন। কাপড়ে ঘামেভেজা ছোপ ছোপ দাগ। জিজ্ঞেস করলাম, এভাবে কোত্থেকে এলেন। খানিকটা বিরক্তমাখা স্বরে উত্তর দিলেন, ‘আর বলো না, জন্মনিবন্ধনে সিগনেচারের জন্য চেয়ারম্যানের অফিসে গিয়েছিলাম। পেলাম না। অথচ আগের দিন ফোন করে সিডিউল নেওয়া ছিল। তাকে এখন পাওয়াই যায় না। একটা সিগনেচারের জন্য তার পেছনে এক মাস ঘুরতে হয়। তার বাড়ি গ্রামে। সে পড়ে থাকে শহরে। সে আবার জনপ্রতিনিধি। অথচ ভোটের আগে আমাদের পায়ে পায়ে লেগে থাকত। মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ভোট ভিক্ষা চাইত।’ তার কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস টানলাম বুকের ভেতর।
আপনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। আপনাকে মানুষের প্রয়োজন পড়ে। তারা আপনার সান্নিধ্য কামনা করে। কিন্তু পায় না। আপনার সঙ্গে মানুষ কথা বলতে চায়, অথচ আপনার সময় হয় না। আপনি নানা অজুহাতে দূরে সরে থাকেন। কালক্ষেপণ করেন বিভিন্নভাবে।
আপনি সরকারি আমলা। মানুষ আপনার টেবিল পর্যন্ত যেতে পারে না। আপনার থেকে পরামর্শ নিতে পারে না। জনগণকে গুরুত্ব দেন না আপনি। কৃষক, শ্রমিক, জেলে ও দিনমজুর আপনার সঙ্গে কথা বলতে ভয় পায়। আপনি কৃত্রিম ভাব-ভঙ্গিমা নিয়ে থাকেন।
আপনি সমাজের বিত্তবান মানুষ। গরিবকে পাশ কাটিয়ে চলছেন। তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না কোনোভাবেই।
সহকর্মীদের কথা শোনার সময় থাকে না ব্যবস্থাপনা পরিচালকের। বসগিরি মনোভাব নিয়ে অতি গাম্ভীর্যে চলাফেরা করে। জুনিয়রের দুঃখ শোনার ফুরসত মেলে না সিনিয়রের।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে কোনো ব্যক্তি প্রয়োজন নিয়ে এলে গুরুত্বসহকারে তার কথা শোনতেন। অভিযোগ-অনুযোগ শোনার সময় হতেন পূর্ণ মনোযোগী। ব্যক্তির কথা শেষ না হলে তিনি মনোযোগ সরাতেন না। ব্যক্তির মুখ না সরানো পর্যন্ত তিনি নিজের কান সরাতেন না। অথচ তিনি তখন মদিনার অধিপতি। মসজিদে নববির ইমাম। সাহাবিদের শিক্ষক। দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ছুটে চলেন দিগ্বিদিক। বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কের কাছে চিঠি লিখেন। যুদ্ধে যান। যুদ্ধের ছক আঁকেন। পৃথিবীর সকল মানুষ এবং অনাগত মানুষ নিয়ে চিন্তা করেন। ঘরে দশজন স্ত্রীকে সময় দেন। কত ব্যস্ততা তাঁর।
আনাস (রা.) বলেন, ‘নবীর (সা.) কাছে এসে কেউ কানে কানে কথা বললে সে তার মুখ না সরানোর আগে তাঁকে কখনো নিজের কান সরাতে দেখিনি। কেউ তাঁর হাত ধরলে যতক্ষণ সে হাত না ছাড়ত, ততক্ষণ তিনি (নবী) তাঁর হাত সরাতেন না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৯৩)
প্রতিনিয়ত মানুষ সভ্যতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পান থেকে চুন খসলেই শুরু হচ্ছে বাজে মন্তব্যের উল্লম্ফন। দেখা যায়, কারও ভুল হলে মানুষের উপস্থিতি উপেক্ষা করে তাকে লজ্জা দেওয়া হচ্ছে। নাম ধরে ধরে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। অনেক সময়, ব্যক্তির দোষ না থাকলেও মানুষের সামনে দোষ বলে বেড়ানো হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক মঞ্চগুলো যেন হয়ে উঠেছে গিবতের মঞ্চ। পরনিন্দার প্রতিযোগিতামূলক সংস্কৃতি আমাদের ঘিরে ধরেছে। কাউকে পছন্দ না হলে তার কোনো ভালো গুণেরও স্বীকৃতি দিতে চাই না। সর্বাবস্থায় তার দোষ খুঁজে বেড়াই।
শাশুড়ির বিরুদ্ধে পুত্রবধূর অভিযোগের শেষ নেই। পুত্রবধূর কিছুই শাশুড়ির মনমতো হয় না। সহোদর ভাই-বোন, দম্পতি, বন্ধু-বান্ধব, কলিগ—সবখানে দোষচর্চার ডালি। এদিকে নবী (সা.) কারও ভুল হলেও সরাসরি তার দোষ বলতেন না। কারও দোষ সাব্যস্ত হলেও লজ্জার আশঙ্কা থাকলে সামগ্রিক মানুষের ওপর কথা বলতেন। প্রয়োজনে অন্য মানুষ দিয়ে তাকে শোধরিয়ে দিতেন।
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীকে (সা.) কোনো ব্যক্তির কোনো বিষয়ে জানানো হলে তিনি এভাবে বলতেন না—‘তার কি হলো যে সে এ কথা বলে’, বরং তিনি বলতেন, ‘লোকদের কি হলো; তারা এই কথা বলে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮৮)




