খেজুর গাছের কাণ্ডের ওপর দাঁড়ানো পাতা দিয়ে ঘেরা মসজিদে নববি। নিচে মাটি। এই মাটিতে সেজদা দেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ হজরত মুহাম্মদ (সা.)। এটা তার প্রিয় জায়গা। ভালোবাসার স্থান। প্রভু প্রেমে মজে যাওয়ার নিবিড় গৃহ। মদিনার মুসলমানরা এখানেই নামাজ পড়তে আসেন। এখানে বসে দ্বীন শেখেন। মদিনায় নবী (সা.) ও সাহাবিদের কাছে এর চেয়ে প্রিয় আর কোনোটিই ছিল না।
একদিন নবী (সা.) সাহাবিদের নিয়ে মসজিদে নববিতে বসে আছেন। দ্বীনের তালিম দিচ্ছেন। এক কাফের দৌড়ে এসে মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করল। সাহাবিরা চটে দাঁড়িয়ে গেলেন। ‘আমাদের প্রাণের জায়গায় কাফের প্রস্রাব করছে!’ রেগেমেগে ছুটলেন তার দিকে। আজ বুঝি তার রেহাই নেই। কিন্তু নবী (সা.) তাদের থামিয়ে দিলেন। লোকটিকে আরামে প্রস্রাব সারতে দিলেন। মসজিদ নাপাক করে দিচ্ছে, অথচ তিনি কিছু বলছেন না।
কাফের লোকটির প্রস্রাব শেষ হলে নবী (সা.) তাকে ডেকে আনলেন। বললেন, ‘তোমাদের উপসনালয় যেমন তোমাদের কাছে পবিত্র, আমাদের উপসনালয়ও আমাদের কাছে পবিত্র। এটা প্রস্রাব করার জায়গা নয়।’ এরপর নবী (সা.) সাহাবিদের বললেন, তাতে এক বালতি পানি ঢেলে দাও। লোকটি নবীর ব্যবহারে বিমোহিত হয়ে মুসলমান হলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০২৫)
ভাবা যায়! কতটা দরদি ছিলেন মহানবী (সা.)। কেমন ছিল তাঁর আচরণ। কত বড় মায়ার সাগর ছিল তাঁর হৃদয়। আর আমরা তাঁরই উম্মত হয়ে সামান্য ময়লার অজুহাতে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দিই। ময়লা পোশাকের কাউকে আমাদের এসি রুমে ঢুকতে দিই না। রিকশাচালক আমাদের বহুতল ভবনের বড় কামরার আলিশান সোফাতে বসতে ইতস্ত বোধ করে। গ্রামের আত্মীয়রা আমার অফিস বা ঘরে এলে স্বচ্ছন্দে চলতে পারে না। আমরা আমাদের পৃথিবীকে এতটাই কৃত্রিম বানিয়ে ফেলেছি, এখানে স্বাভাবিকতার মৃত্যু হয়েছে। সহজ বন্ধনের বিদায় হয়েছে।
মুহাম্মাদ (সা.) সব কাজে নম্রতা অবলম্বন করতেন। দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদি ছাড়া কোনো ব্যাপারেই কঠোরতা প্রদর্শন করতেন না। এমনকি অমুসলিমদের সঙ্গেও কোমল আচরণ করতেন। নম্রতার পাঠ দিতেন সাহাবিদেরও।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রের পরিচালক। একবার তাঁর কাছে ইহুদিরা এলো। তিনি তাদের বসতে দিলেন। কুশল জানলেন। অথচ যৌবনে চাচা আবু তালেবের সঙ্গে ব্যবসায়িক সফর অসমাপ্ত রেখে সিরিয়া থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল। এর নেপথ্যে ছিল ইহুদিদের ষড়যন্ত্র ও নবী (সা.)-কে হত্যার চেষ্টা। নবুওয়াত লাভের আগে যতবার জীবননাশের হুমকির কথা শুনেছেন, ততবার ইহুদিদের নাম এসেছে। নবুওয়াত লাভের পর সেই ইহুদিরা তাঁর সাম্রাজ্যে এসেই তাঁর মৃত্যু কামনা করল। তিনি তাদের প্রতি রাগ করেননি। উদ্ধত হননি। তাড়িয়ে দেননি। তাদের সঙ্গে নম্র আচরণ করেছেন।
আয়েশা (রা.) ছিলেন উপর্যুক্ত ঘটনার সাক্ষী। তিনি বলেন, ‘ইয়াহুদিদের একটি দল রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বলল, ‘আসসামু আলাইকুম’ (তোমার মৃত্যু হোক)। আমি জবাবে বললাম, ‘ওয়ালাই কুমুসসামু ওয়া লানাতু’ (তোমাদের ওপরও মৃত্যু এবং অভিসম্পাত)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে আয়েশা, থামো। আল্লাহ সব কাজে নম্রতা পছন্দ করেন।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি শোনেননি, তারা কী বলেছে?’ তিনি বলেন, ‘আমি তো বলেছি, ‘আলাইকুম’।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০২৪)
নবী (সা.) শত্রুকেও ভালোবাসতেন। তাদের জন্য মনের অলিন্দে মায়া পুষতেন। তিনি কারও জন্য বদদোয়া করতেন না। আর আমরা মনমতো না হলে মুসলমান ভাইয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিই। আল্লাহর কাছে তার জন্য গজব প্রার্থনা করি। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘একবার কিছু সংখ্যক সাহাবি কাফেরদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করার জন্য আবেদন করলেন। তাঁদের আবদার রাসুল (সা.) অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি অভিসম্পাতকারী হিসেবে প্রেরিত হইনি, রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮৩২)
আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী, আমি তোমাকে সারা বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭)




