হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যবহার ছিল প্রভাতে ফোটা গোলাপের নরম কুসুমের মতো কোমল। তাঁর হৃদয় আকাশের মতো উন্মুক্ত ছিল সব মানুষের জন্য। দাস-দাসী, কৃষ্ণাঙ্গ, খর্বাকায়, কৃশকায়সহ সবাই তাঁর কাছে সমান মর্যাদা পেত। তাঁর দরাজ দিল ছিল মানুষের জন্য ভালোবাসায় পূর্ণ।
আনাস (রা.) ছিলেন তাঁর একান্ত খাদেম। দশ বছর খেদমত করেছেন। আনাস (রা.) তখন কিশোর। কাজে ভুল করতেন। কোথাও পাঠালে পথে কাজের কথা ভুলে যেতেন। সমবয়সীদের সঙ্গে খেলায় মেতে থাকতেন। এদিকে নবী (সা.)-এর কাজ পড়ে থাকত। তিনি তাঁকে কিছুই বলতেন না।
মুহাম্মদ (সা.) আনাস (রা.)-কে কোনো দিন কটু কথা বলেননি। রাগ ঝাড়েননি। ধমক দেননি। কাজ থেকে অব্যাহতি দেননি; বরং আনাসের দুরন্তপনা আর ভুলে যাওয়ায় তিনি হাসতেন। খাদেমের মুখেই শোনা যাক মালিক মুহাম্মদ (সা.)-এর সহনশীলতার স্মৃতি।
আনাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) চরিত্রের দিক থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন। একদিন তিনি আমাকে কোনো কাজে পাঠালেন। আমি বললাম, ‘আল্লাহর কসম! আমি যাব না। কিন্তু আমার অন্তরে ছিল, নবী (সা.) আমাকে যে কাজে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে যাব। আমি বাজারে যাচ্ছিলাম। পথে খেলাধুলায় মত্ত ছেলেদের পেয়ে খেলায় মজে গেলাম। পেছন দিক থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এসে আমার ঘাড়ে হাত রাখলেন। পেছনে ফিরে দেখি তিনি হাসছেন। বললেন, ‘হে উনাইস, আমি তোমাকে যেখানে যেতে বলেছি, সেখানে যাও।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, হ্যাঁ, আমি এক্ষুণি যাচ্ছি।’
আনাস (রা.) আরও বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি সাত বছর অথবা নয় বছর তাঁর খেদমত করেছি। কিন্তু আমার মনে পড়ছে না, তিনি আমার কোনো কাজের জন্য আমাকে বলেছেন—‘তুমি এটা কেন করলে?’ অথবা কোনো কাজ না করলে তিনি আমার কৈফিয়ত তালাশ করেননি—‘এ কাজ কেন করলে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৭৩)
বর্তমান পৃথিবীর কতজন মানুষ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহনশীলতা ও উদারপন্থি মনোভাবের চর্চা করছে, আমরা আমাদের চারপাশে তাকালেই তা বুঝতে পারি। চারদিকে মানুষ অসহনশীলতার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অন্ধকার যুগের অত্যাচারী মানুষের মতোই আমাদের চলাফেরা। অনেক ক্ষেত্রে সে যুগকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের আচার-ব্যবহার। সে যুগে দাস-দাসী ছিল। তাদের সঙ্গে মালিকেরা যাচ্ছেতাই আচরণ করত। মারধর করত নির্মমভাবে। কঠিনতম শাস্তি দিত। এখনকার কিছু মানুষও কর্মচারী বা গৃহপরিচারিকার সঙ্গে জঘন্য আচরণ করেন। টিভি-পত্রিকা ও ফেসবুকে এমন বহু খবর চোখে পড়ে, কর্মচারীকে মালিক পিটিয়েছে বা বুয়ার শরীরে গৃহকর্তী গরম তেল ঢেলে দিয়েছে কিংবা পরিচারিকাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে মালিক। কিংবা গৃহকর্মীকে করা হয়েছে যৌন নির্যাতন।
কর্মচারী বা অধীনস্তদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে হবে। তাদের ওপর জুলুম করা যাবে না। অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়া যাবে না। তাদের ঠকানো যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা তোমাদের কাজ করছে, তারা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তোমরা যা খাবে, তা থেকে তাদের খাওয়াবে এবং যা পরিধান করবে, তা তাকে পরতে দেবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৪৫)
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘এক লোক একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চাইল, গৃহকর্মীদের আমরা আর কত ক্ষমা করব। তখন তিনি চুপ থাকেন। লোকটি আবার একই প্রশ্ন করল। এভাবে তিনবার প্রশ্ন করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তাদের দৈনিক ৭০ বার করে ক্ষমা করো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৪৯৬)




