খাবার উপভোগ করাই হতে পারে ওজন কমানোর চাবিকাঠি
আপনি কী খান, সেটাই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনি খাবারটিকে কীভাবে দেখছেন, সেটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের মন ও শরীরের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্ক ক্ষুধা ও তৃপ্তির অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। আমরা কী খেয়েছি—এ নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা মস্তিষ্কে ক্ষুধার অনুভূতিকে বদলে দিতে পারে।
ধরুন, আপনার সামনে একটি চকলেটবার এবং একটি কম ক্যালরির স্বাস্থ্যকর বিকল্প রাখা হলো। আপনি কোনটি বেছে নেবেন?
বাস্তবে অনেকেই জানেন স্বাস্থ্যকর খাবারই ভালো, কিন্তু সুস্বাদু খাবারের প্রতি আকর্ষণ এড়িয়ে চলা কঠিন। বিশেষ করে যারা ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য ডায়েট ধরে রাখা অনেক সময় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বেশি ক্যালরিযুক্ত ও মিষ্টি খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এর পেছনে বিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। আমাদের পূর্বপুরুষদের টিকে থাকার জন্য এ ধরনের খাবার প্রয়োজন ছিল।
এর পাশাপাশি, বর্তমান সময়ে আমাদের চারপাশে অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত (ultra-processed) খাবারের প্রাচুর্য রয়েছে, যা খাওয়ার পর অনেক সময় অপরাধবোধও তৈরি করে।
মনোবিজ্ঞানী অ্যাশলে গিয়ারহার্ড বলেন, ‘এ ধরনের খাবার যেন উচ্চ শব্দের কনসার্টের মতো। এগুলো অন্য সবকিছুকে ঢেকে দেয়। ফলে ফল বা সবজির মতো স্বাভাবিক খাবারের প্রতি মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’
গবেষণা কী বলছে
গবেষণা বলছে, শুধু কী খাচ্ছেন তা নয়; খাবার নিয়ে আপনার মানসিকতা (mindset)ও গুরুত্বপূর্ণ। বরং খাবার উপভোগ করার মধ্যেও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা থাকতে পারে। কারণ, এটি ক্ষুধা ও তৃপ্তির অনুভূতিকে প্রভাবিত করে।
প্রায় ১৫ বছর আগে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ কী খাচ্ছে বলে মনে করে, তা শরীরের প্রতিক্রিয়াকে বদলে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী আলিয়া ক্রামের নেতৃত্বে করা এক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের একই মিল্কশেক দেওয়া হয়। তবে একদলকে বলা হয় এটি ১৪০ ক্যালরির ‘স্বাস্থ্যকর’ শেক, আরেকদলকে বলা হয় এটি ৬২০ ক্যালরির ‘মজাদার’ শেক।
তবে বাস্তবে শেকটি ছিল ৩৮০ ক্যালরি।
ফলাফল দেখায়, যারা ‘মজাদার’ শেক খাওয়ার কথা ভেবেছিল, তাদের শরীরে ক্ষুধা-সম্পর্কিত হরমোন ঘ্রেলিন দ্রুত কমে যায়। অর্থাৎ তারা বেশি তৃপ্তি অনুভব করে। কিন্তু যারা ‘স্বাস্থ্যকর’ শেক ভাবছিল, তাদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন কম ছিল।
কর্মের ব্যাখ্যায় ক্রাম বলেন, ‘আপনি যদি মনে করেন আপনি যথেষ্ট খেয়েছেন, তাহলে শরীরও সেইভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখায়।’
লেবেলিংয়ের প্রভাব
খাবারের লেবেলও আমাদের অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, একই পুষ্টিগুণের একটি প্রোটিন বারকে ‘স্বাস্থ্যকর’ বা ‘সুস্বাদু’ হিসেবে লেবেল দেওয়া হলে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়।
যারা ‘স্বাস্থ্যকর’ লেবেলযুক্ত খাবার খেয়েছিল, তারা কম তৃপ্তি অনুভব করে এবং পরে বেশি খাবার খায়। এতে বোঝা যায়, ‘স্বাস্থ্যকর’ শব্দটি অনেক সময় খাবারের আনন্দ কমিয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, খাবারকে শুধু পুষ্টি বা ক্যালরির দৃষ্টিতে না দেখে উপভোগ্য হিসেবে ভাবা উচিত। কারণ, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা বঞ্চনার মানসিকতা অনেক সময় উল্টো ফল দেয়।
কী করা উচিত
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো খাবার উপভোগ করুন, অপরাধবোধ নিয়ে খাবেন না। অপ্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন প্রোটিন, ফল ও সবজি বেশি খান ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমান। এ ছাড়া কম, লাইট বা ডায়েট ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসুন।
অ্যাশলে গিয়ারহার্ড বলেন, ‘খাবারকে যদি শুধুই নিয়ন্ত্রণের বিষয় বানানো হয়, তাহলে এটি একসময় বিরক্তিকর হয়ে যায়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝে মাঝে পছন্দের খাবার খাওয়া এবং তা উপভোগ করা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনেরই অংশ। সঠিক ভারসাম্য বজায় রেখে খেলে এবং ইতিবাচক মানসিকতা রাখলে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা আরও সহজ হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি