দেশে গত দেড় মাসে হামে মারা গেছে ২৭৬ শিশু। আক্রান্ত ছাড়িয়েছে ৪২ হাজার। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে মৃতের তালিকা। কিন্তু এত প্রাণহানির পরও কোনো ডেথ রিভিউ (মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা) করছে না সরকার। অর্থ সংকটের কথা বলে দায় এড়াচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত হামের চিকিৎসা নেওয়া ৪২ হাজার ১৫৫ জনের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৭৬ জনের। বৃহস্পতিবারের (৩০ এপ্রিল) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এক হাজার ২৩৫ জনকে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে দুজনের।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগ। এখানে ২১ হাজারের বেশি মানুষকে হামের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে ১৩৬ জনের। রাজশাহীতে আক্রান্ত প্রায় আট হাজার, মৃত্যু ৭৫ জনের। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগ।
রাজধানীর ডিএনসিসি হাসপাতাল, মুগদা হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। রোগীর চাপ প্রতিদিনই বাড়ছে।
ঠিক কী কারণে এত মৃত্যু হচ্ছে, কোন জটিলতায় প্রাণ হারাচ্ছে শিশুরা, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো অবহেলা ছিল কি না। এসব জানতে প্রয়োজন ডেথরিভিউ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার অধীনে এ কাজের জন্য বিশেষজ্ঞ প্যানেল রয়েছে। কিন্তু অর্থ সংকটে সেটি হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিডিসির পরিচালক ডা. হালিমুর রশীদ বলেন, ‘হাসপাতালগুলোই ডেথ রিভিউ করছে, অধিদপ্তর থেকে কোনো রিভিউ হচ্ছে না।’
মাঠপর্যায়ে নমুনা সংগ্রহেও গড়িমসির অভিযোগ উঠছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘সবসময় নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে যে, রোগী ছোট শিশু হওয়ায় অনেক অভিভাবকও নমুনা দিতে চান না। সবগুলো মৃত্যুর যে ডেথ অ্যানালাইসিস হয়েছে তা বলা যাবে না।’
রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্যবিদরা এই পরিস্থিতিকে দেখছেন চরম উদ্বেগজনক হিসেবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ভবিষ্যতে রোগীর চিকিৎসা ও পরবর্তী প্রকোপের বিষয়ে চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতার জন্য মৃত্যু পর্যালোচনা জরুরি। সেভাবে তারা হাসপাতালকে প্রস্তুত করতে পারেন। একই সঙ্গে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কেমন হওয়া উচিত, সেটিও ডেথ রিভিউর মাধ্যমে জানা যায়।’
ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৩০ শতাংশের মৃত্যু
সরেজমিনে রাজধানীর তিনটি হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, গত ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সেগুলোতে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৫৮ শিশু। এদের ৩০ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। একটি হাসপাতালে মারা গেছে ৯ শিশু। এর মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, বাকি চারজন মারা যায় তিন থেকে ছয় দিনের মাথায়। হাসপাতালের তথ্য বলছে, মৃত ৯ শিশু ছিল অপুষ্টির শিকার। তাদের কেউ হামের টিকা পায়নি।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মারা যাওয়া ৩৪ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি ১০টি মৃত্যুর মধ্যে তিনটি ঘটেছে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, আরও চারটি হয়েছে দুই থেকে চার দিনের মধ্যে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই হাসপাতালে সরাসরি হামে মৃত্যু হয়েছে দুজনের। তবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেই প্রতিষ্ঠানটির কাছে। শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে মারা যাওয়া ১৫ শিশুর চিত্র কিছুটা আলাদা। তাদের সবাই ভর্তির অন্তত তিন দিন পর মারা যায়।
মৃতদের প্রায় সবার নিউমোনিয়া
চিকিৎসকরা বলছেন, মারা যাওয়া প্রায় সব শিশুরই ছিল হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া। এর পাশাপাশি মস্তিষ্ক ও মস্তিষ্কের আবরণে সংক্রমণ চিকিৎসকদের সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে। প্রতি তিন শিশুর একজনের ক্ষেত্রে এই জটিলতা পাওয়া যাচ্ছে।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরিচালক ডা. এম এ আসমা খান বলেন, ‘জ্বর হলে অনেক সময় মায়েরা বুঝতে পারেন না, এটি হামজনিত জ্বর। যারা চিকিৎসা নিতে আসছে, প্রায় প্রত্যেকের নিউমোনিয়া রয়েছে। যারা মারা গেছে, তাদের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন ছিল।’
দুই ডোজ টিকা নিয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হামে আক্রান্তদের ৭৪ শতাংশ কোনো টিকা পায়নি। মাত্র ১৩ শতাংশ প্রথম ডোজ এবং ১২ শতাংশ দুই ডোজ টিকা পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে গত ৫ এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফ বাংলাদেশের হেলথ ম্যানেজার (ইমিউনাইজেশন) ডা. রিয়াদ মাহমুদ জানান, উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ ৩০ উপজেলায় ৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়ার পর নতুন করে হামে আক্রান্ত রোগী প্রায় নেই বললেই চলে।
একই ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, প্রথম পর্যায়ে ৫ এপ্রিল থেকে ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও ১৩টি পৌরসভায় টিকাদান শুরু হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, ময়মনসিংহ এবং বরিশাল সিটি করপোরেশন যুক্ত হয়। ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সি সব শিশুকে বিনামূল্যে এক ডোজ হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৬১ শতাংশ। মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় টিকা ও সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে নতুন চালান হাতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) শ্যামলীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পেইন শুরুর পর ইতোমধ্যেই ৬১ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। অনেক এলাকায় শতভাগ কাভারেজ অর্জিত হয়েছে।’
চলমান হাম পরিস্থিতি আগামী মে মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘টিকা হাতে পাওয়ার পর দ্রুত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের জন্য অপেক্ষা করা হয়নি। আগামী ৫ মে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি ছিল। কিন্তু আমরা তা ১৪ দিন এগিয়ে এনে ২০ এপ্রিল থেকেই শুরু করেছি।’




