“দ্য শ্যাডোয়ি লাইট” গানটা আমার কাছে অনেক গভীর অনুভূতির। বারাণসি ভ্রমণে গিয়ে পবিত্র গঙ্গার কোল ঘেষে চলতে চলতে অনেক কিছু কাছে থেকে দেখেছি। আর সেই সাথে জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছি, বুঝতে পেরেছি যে আমি কে ছিলাম আর এ পৃথিবীতে আমার কী করবার ছিল!’
গানটা বেশিদিন আগের নয়। চলতি বছরের মার্চ মাসেই মুক্তি পেয়েছে ব্রিটিশ রক ব্যান্ড ‘গরিলাজ’ এর ‘দ্য মাউন্টেইন’ অ্যালবামটি। তারই মধ্যে ‘দ্য শ্যাডোয়ি লাইট’ শিরোনামের একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন আশা ভোসলে। খুব সম্ভব এটাই তার সর্বশেষ কাজ ছিল। এই গানের সাথে সাথে নিজের জীবন, কাজ, সঙ্গীত—সব নিয়েই আশা কিছু কথা বলেছিলেন, যেটি ‘গরিলাজ’ এর ফেসবুক প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করা হয়েছিল।
এই গান নিয়ে বলতে গিয়ে আশা যেন নিজের জীবনের প্রকৃত উপলব্ধিই তুলে ধরেছিলেন, ‘এই গানে যে গভীর নদী আমি পেরিয়ে গেছি, সেটি আমার জীবন যাত্রারই রূপক। আমার জন্ম, সম্পর্ক, গানের জন্য আমার আত্ম-অবদান, আমার প্রাপ্তি এবং একজন কন্যা, মা, বোন, স্ত্রী ও সর্বোপরি হিন্দু নারী হিসেবে আমার দায়িত্ব—সবকিছুই। এই মাঝিই আমার সঙ্গীত, জীবনের নদীপথে আমার পথ-প্রদর্শক। যখন আমি নদীর ওপারে পৌঁছে যাব, আমার এই পথচলার সমাপ্তি হবে। আমাদের চারপাশের সহস্র শব্দের মাঝে যখন আমি মিলিয়ে যাব, তখনই আমি মোক্ষ (সত্যিকারের মুক্তি) লাভ করব। আপনি তার কিছু কিছু শব্দ যখন একসাথে জুড়বেন, তাতে সৃষ্টি হবে সুমিষ্ট কোনো সুর। তারপর, সেই সুরের মধ্যেকার শব্দগুলোর একটি আমি হয়ে উঠব, যার অনেকগুলো মিলে তৈরি হয়ে উঠবে একটি গান, আর হাজার বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই গান শুনে যাবে। প্রকৃতির সাথে এই একাত্মতা, এই মুক্তিই আমার জন্য নদীর আরেক পারে অপেক্ষা করে রয়েছে।
‘দ্য শ্যাডোয়ি লাইট’ গানটি আশা ভোঁসলের অসাধারণ ক্যারিয়ারের এক আবেগঘন শেষ অধ্যায় যেন। গানটিতে আরও অংশ নিয়েছেন গ্রাফ রাইস, বাঁশিবাদক অজয় প্রসন্ন, সরোদশিল্পী আমান আলি বাঙ্গাশ এবং আয়ান আলি বাঙ্গাশ। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে এক্সপেরিমেন্টাল ব্রিটিশ অল্টারনেটিভ পপের এক অনন্য যুগলবন্দী এই গানটি। গরিলাজের নবম স্টুডিও অ্যালবাম দ্য মাউন্টেইন ভারতীয় সঙ্গীত ও শিল্পীদের সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততার জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভারতে রেকর্ড করা এই অ্যালবামে আরও সহযোগিতা করেছেন সংগীতশিল্পী আনুশকা শংকর এবং গায়িকা আশা পুথলি।
গানটি শুনুন এখানে—
‘গরিলাজ’ ব্যান্ডের সঙ্গীত পরিচালক ডেমন অলবার্ন ১৯৬০ ও ৭০ এর দশকের বলিউড সঙ্গীতের ভক্ত। রাহুল দেব বর্মণের কাজ তার খুবই পছন্দের। তিনি প্রায়ই পুরোনো ভারতীয় চলচ্চিত্রের সঙ্গীতকে গরিলাজের বৈচিত্র্যময় বৈশ্বিক সাউন্ডের অন্যতম প্রভাব হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সত্তরের দশকে আশা ভোঁসলের গানের ‘সাইকেডেলিক’ ও ‘এক্সপেরিমেন্টাল’ বৈশিষ্ট্যের প্রশংসা করেছেন তিনি।
‘দ্য শ্যাডোয়ি লাইট’ ছাড়াও আরও অনেক বিদেশি গানের সঙ্গী হয়েছেন আশা। ২০০০ সালের দিকে ‘দ্য ব্ল্যাক আইড পিস’ তাদের জনপ্রিয় গান ‘ডোন্ট ফাংক উইদ মাই হার্ট’ এর সাথে যোগ করে আশা ‘অ্যায় নওজওয়ান হ্যায় সবকুছ ইয়াহাঁ’ গানটি। ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ ব্যান্ড কর্নারশপের গান ‘ব্রিমফুল অব আশা’ মিউজিক চার্টের শীর্ষে উঠে আসে।
আশা ভোঁসলে সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক ব্যান্ড ক্রনোস কোয়ার্ট্রেটের সাথে ২০০৫ সালে ‘ইউ হ্যাভ স্টোলেন মাই হার্ট’ নামে একটি অ্যালবাম রেকর্ড করেন। এই অ্যালবামে বলিউডের গানের আধুনিক ধ্রুপদী রূপান্তর উঠে এসেছে, একই সাথে এটি আশার স্বামী এবং সঙ্গীতজীবনের অন্যতম সঙ্গী রাহুল দেব বর্মণের কাজের প্রতিও এক শ্রদ্ধার্ঘ্য ছিল। এই প্রকল্পে প্রখ্যাত তবলাবাদক ওস্তাদ জাকির হুসাইনও অংশ নিয়েছিলেন। ২০০৬ সালে অ্যালবামটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিল। মাইকেল স্টাইপের সঙ্গে তিনি ‘ওয়ান জায়ান্ট লিপ’ অ্যালবামের ‘দ্য ওয়ে ইউ ড্রিম’ গানেও কাজ করেন।
আশা ভোঁসলের সঙ্গীতজীবনে তার স্বামী, প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মণ অবিচ্ছেদ্য এক অধ্যায়। ‘পঞ্চম’ নামে বিখ্যাত রাহুল দেব বর্মণ ষাট-সত্তরের দশকে পশ্চিমা সুর এবং যন্ত্রের ছোঁয়ায় বলিউডের সঙ্গীত জগতে বিপ্লব ঘটান। তার অসাধারণ সব গানের শিল্পী ছিলেন আশা, আর সে সুবাদে পশ্চিমা গান, সুরের সঙ্গে আশার একাত্মতাও ছিল দুর্দান্ত।
১৯৩৩ সালে জন্ম নেওয়া আশা ভোঁসলে বহু ভাষা ও ঘরানায় হাজার হাজার গান রেকর্ড করেছেন। ২০১১ সালে গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে সঙ্গীত ইতিহাসের সর্বাধিক গান রেকর্ডকারী শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।



