
বাংলাদেশের রক সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড নেমেসিস উদযাপন করতে যাচ্ছে তাদের সংগীতযাত্রার ২৫ বছর। আন্ডারগ্রাউন্ড মিউজিক সার্কিট থেকে শুরু করে দেশের মূলধারার রক সংগীতের শীর্ষ সারিতে উঠে আসা এই ব্যান্ডের দীর্ঘ পথচলাকে ঘিরে আগামী ২২ মে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশেষ আয়োজন— ‘এত দিনের পরেও যে’। অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হবে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা-এর উইন্টার গার্ডেনে। যার টিকিট পাওয়া যাচ্ছে ‘গেটসেটরক’ ওয়েবসাইটে।

স্বপ্ন থেকে শুরু
১৯৯৯ সালের গ্রীষ্মে কয়েকজন তরুণের স্বপ্ন থেকেই শুরু হয় নেমেসিসের যাত্রা। সদ্য স্কুলজীবন শেষ করা সাবের ও রিশাদ একত্র করেন মাহের খান ও ইয়াওয়ার মেহবুবকে। পরে মাহের তার ভাই সাবিনকে নিয়ে গড়ে তোলেন তিন সদস্যের একটি ব্যান্ড। নতুন বছরের এক ছাদ পার্টিতে প্রথমবার একসঙ্গে পারফর্ম করার মধ্য দিয়েই শুরু হয় তাদের সংগীতযাত্রা। সেখানেই পরিচয় হয় জোহাদের সঙ্গে, যিনি পরে ব্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন। ২০০০ সালের শুরুতে সাবিন ব্যান্ড ছেড়ে দিলে ইয়াওয়ার নিয়ে আসেন নন্দিতো ও রাতুলকে। সেই সময় থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় ‘নেমেসিস’ নামে। শুরুতে তারা মূলত কভার গান পরিবেশন করলেও ধীরে ধীরে নিজেদের মৌলিক সংগীত নিয়ে কাজ শুরু করেন।

২০০৩ সালে মিক্সড কম্পাইলেশন অ্যালবাম ‘আগন্তুক টু’-এ প্রকাশিত হয় নেমেসিসের প্রথম সিঙ্গেল ‘অবচেতন’। গানটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেললে ব্যান্ডটি তাদের প্রথম অ্যালবামের জন্য জি-সিরিজের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম অ্যালবাম ‘অন্বেষণ’। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় জনপ্রিয় গান ‘ধূসর ভাবনা’, ‘জয়ধ্বনি’ ও ‘মৃত্যুছায়া’; যা রেডিও ফুর্তির টপ চার্টে জায়গা করে নেয়। এই সময় থেকেই নেমেসিস দেশের মূলধারার রক শ্রোতাদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
সামাজিক সচেতনতা থেকে মূলধারার সাফল্য
সংগীতের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগেও সক্রিয় ছিল নেমেসিস। ‘সেই নো টু ড্রাগস’, ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’, ‘স্ট্যান্ড আপ অ্যাগেইনস্ট পোভার্টি’ এবং ‘ভোট ফর সুন্দরবন’-এর মতো সচেতনতামূলক কনসার্টে অংশ নিয়ে তারা তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়েছে। এছাড়াও ব্যান্ডটি অংশ নিয়েছে ‘বাংলালিংক মিউজিক ফেস্টিভ্যাল’সহ অসংখ্য বড় মাপের কনসার্ট ও ট্রিবিউট শোতে।

‘তৃতীয় যাত্রা’ ও নতুন অধ্যায়
প্রথম অ্যালবামের ছয় বছর পর, ২০১১ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘তৃতীয় যাত্রা’। অ্যালবামের গান ‘কবে’ প্রকাশের পরই শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। একই বছর মুক্তি পায় গানটির মিউজিক ভিডিও। এই অ্যালবাম সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসে ‘বেস্ট ব্যান্ড’, ‘বেস্ট সাউন্ডিং অ্যালবাম’ ও ‘বেস্ট মিউজিক ভিডিও’ বিভাগে মনোনয়ন পায়। ২০১৩ সালে নেমেসিস জিতে নেয় সমালোচক পছন্দের ‘বেস্ট ব্যান্ড’ পুরস্কার। পরবর্তী সময়ে ব্যান্ডের সদস্য পরিবর্তন হলেও থেমে থাকেনি তাদের পথচলা। নতুন সদস্যদের নিয়ে নেমেসিস প্রকাশ করে ‘ঘুড়ি’র মতো জনপ্রিয় গান।

কঠিন সময় পেরিয়ে ‘গণজোয়ার’
২০১৭ সালের ১০ মে প্রকাশিত হয় নেমেসিসের তৃতীয় অ্যালবাম ‘গণজোয়ার’। তবে এর পরের বছরই ব্যান্ডটি কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়, যখন ড্রামার ডিও হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় ব্যান্ডের কার্যক্রম। পরে জেফরি অভিজিৎ (ওভি) ড্রামার হিসেবে যোগ দিলে নেমেসিস আবার লাইভ পারফরম্যান্সে ফিরে আসে। যদিও ডিও নিয়মিত লাইভে অংশ নেননি, তিনি এখনও রেকর্ডিং ও ব্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে যুক্ত আছেন।

ভিআইপি: নতুন সময়ের প্রতিচ্ছবি
দীর্ঘ আট বছর পর, ২০২৫ সালের ২৩ মে প্রকাশিত হয় নেমেসিসের চতুর্থ স্টুডিও অ্যালবাম ‘ভিআইপি’। ১০ ট্র্যাকের এই অ্যালবামে উঠে এসেছে বৈশ্বিক মহামারির পর সামাজিক বাস্তবতা, ব্যক্তিগত উপলব্ধি এবং সময়ের পরিবর্তনের নানা প্রতিচ্ছবি। অ্যালবাম প্রকাশের আগেই ‘ঘোর’ ও ‘ভাঙা আয়না’ সিঙ্গেল দুটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। অ্যালবাম প্রকাশের পর দেশজুড়ে ট্যুর শুরু করে ব্যান্ডটি এবং নতুন, আরও পরিণত সাউন্ড নিয়ে আবারও নিজেদের অবস্থান শক্ত করে বাংলাদেশের রক সংগীতের শীর্ষ সারিতে। বর্তমানে ব্যান্ডের সদস্যরা হলেন— জোহাদ রেজা চৌধুরী — ভোকাল ও গিটার, সুলতান রাফসান খান — লিড গিটার, ইফাজ আবরার রেজা — গিটার, রকিবুন নবী রাতুল — বেজ, জেফরি অভিজিৎ ঘোষ — ড্রামস।

২৫ বছরের উত্তরাধিকার উদযাপন
আন্ডারগ্রাউন্ড মঞ্চ থেকে শুরু করে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া নেমেসিস এখন বাংলাদেশের রক সংগীতের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাদের গান, সংগ্রাম ও যাত্রা জড়িয়ে আছে হাজারো শ্রোতার স্মৃতির সঙ্গে। সেই দীর্ঘ পথচলার উদযাপনেই আসছে বিশেষ অনুষ্ঠান ‘এত দিনের পরেও যে’।




