জুলাই সনদ উপেক্ষা ও গণভোটের রায় বাতিলের সিদ্ধান্ত বিএনপিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শিশির মনির।
বুধবার (৬ মে) বিকেলে ‘জুলাই ঐক্য’ সিলেট আয়োজিত ‘গণরায় বাস্তবায়ন ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন।
শিশির মনির বলেন, ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যারা বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার সুযোগ করে দিয়েছে তাদেরকে তারা রক্ষা করতে চায় না। এজন্য তাদেরকে ভবিষ্যতে কঠোর মূল্য দিতে হবে। আমাদেরকে এখন কোনটা সংস্কার কোনটা সংশোধন সেটা শেখানো হচ্ছে। অথচ জুলাই সনদের প্রথম কথাই হচ্ছে সংস্কার। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে জাতীয় সংসদের পাশাপাশি নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। কিন্তু বিএনপি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
তিনি বলেন, তারা আবার সেই কথা বড় গলায় সংসদেও তুলে ধরছে। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী বলছেন- ঐ সময় জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করলে যদি নির্বাচন না দেয়, তাই রাজি হয়েছিলাম। একজন মন্ত্রী পার্লামেন্টে এমন মিথ্যা প্রতারণা মুলক বক্তব্য দিতে পারেন না। এই ঘটনা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে হলে ইতোমধ্যে তাকে পদত্যাগ করে চলে যেতে হতো। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরও যদি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা না হয় তাহলে দেশে ৫ বছর পর অটোমেটিক ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা হবে। এর বিপরীতে ফের গণঅভ্যুত্থান হবে।
তিনি বলেন, বিএনপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো- তাদের যারা রক্ষা করতো তাদেরকে তারা রক্ষা করতে পারে না। ফলে এর পরিণতি তাদেরকেই বরণ করতে হয়। ১৯৭৫ সালে বিএনপিকে যারা ক্ষমতায় আনার পথ তৈরি করেছিল বিএনপি তাদের রক্ষা করতে পারেনি। এবারো সেটাই দেখা যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সিলেটে এসেছিলেন। এখানে খাল খননসহ বিভিন্ন প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে গেছেন। এগুলো কি প্রধানমন্ত্রীর কাজ? খাল খননের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড আছে, খেলাধুলার জন্য ক্রীড়া অধিদপ্তর এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উচিত সঠিক লোককে সঠিক জায়গায় বসানো। তাহলে অটোমেটিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। আর এটাই হবে পরিবর্তন কিংবা সংস্কার।
তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সঠিকভাবে কাজ না করলে সুনামগঞ্জের হাওর রক্ষা করা সম্ভব হবে না। এজন্য পাউবোকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না এবং গণতন্ত্র টেকসই হবে না। রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব নিশ্চিত করা না গেলে দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না। এজন্যই প্রয়োজন সংস্কার।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আমরা দীর্ঘ ৮ মাস ২৭টা দেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক সিস্টেমকে পর্যালোচনা করে জুলাই সনদ প্রস্তুত করেছিলাম। ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে বিএনপিই প্রথম গণভোটে রাজি হয়েছিল। যখন জুলাই চার্টার হলো তখন তারা বললেন, এটি কিভাবে বাস্তবায়ন হবে। তখন সংবিধান স্থগিত করে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করা হয়। তখন তারা বললো, আমরা গণভোটে রাজি আছি। কিন্তু এখন বিএনপি গণভোটের রায়কেই বাতিল করে দিয়েছে। এজন্য তাদের জন্য খারাপ পরিণতি অপেক্ষা করছে।
সবশেষে শিশির মনির আশা প্রকাশ করেন, বিএনপির শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। তারা জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিবেন। অন্যথায় ইতিহাস তাদেরকে ক্ষমা করবে না। কারণ এদেশে আবারও গণঅভ্যুত্থান হবে।
সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুক্তাবিস উন নুরের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ডা. ইসমাঈল পাটোয়ারী। জুলাই ঐক্য সিলেটের অন্যতম সমন্বয়ক ও সিলেট জেলা বারের আইনজীবী মোহাম্মদ আব্দুর রবের সঞ্চালনায় নগরের দরগাগেইটস্থ কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ-কেমুসাসের শহীদ সুলেমান হলে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কেমুসাসের সভাপতি ভাষাসৈনিক অধ্যক্ষ মাসউদ খান, সাবেক অধ্যক্ষ কবি কালাম আজাদ, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সিলেট মহানগর সভাপতি মাওলানা এমরান আলম, সিলেট মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী, এনসিপি সিলেট মহানগর যুগ্ম আহ্বায়ক নেসারুল হক চৌধুরী ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই যোদ্ধা দেলোয়ার হোসেন শিশির। সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন জুলাই ঐক্য সিলেটের প্রধান সমন্বয়ক ড. নূরুল ইসলাম বাবুল।




