টানা বৃষ্টি, দমকা হাওয়া ও বজ্রপাতের কারণে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন কৃষকরা। গত রোববার বিকেল থেকে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত চলা বৈরী আবহাওয়ায় পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকায়। একই সঙ্গে বাজারে ধানের অস্বাভাবিক কম দাম কৃষকদের দুর্দশাকে আরও গভীর করেছে। জেলার অষ্টগ্রাম, ইটনা, ও মিঠামইন উপজেলা হাওরের বিভিন্ন এলাকায় গত দুই দিনের বৃষ্টিতে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে বলে কৃষকদের দাবি। বজ্রপাতের আতঙ্কে অনেকেই মাঠে নামতে পারছেন না।
হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় যেখানে কয়েক দিন আগেও বাতাসে দুলছিল সোনালি ধান সেখানে এখন থইথই পানি। অনেক কৃষক গলাডোবা অবস্থায় কোমরপানিতে নেমে ধান কাটছেন। কেউ নৌকা দিয়ে, কেউবা ডুব দিয়ে পচা ধান কেটে ভেলায় তুলে আনছেন। তবে অনেক জমির ধান ইতোমধ্যেই সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুর হাওরের কৃষক রতন মিয়া ১০ একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন ঋণ নিয়ে। কিন্তু আকস্মিক বৃষ্টিতে তার সব ধান পানির নিচে চলে গেছে। তিনি বলেছেন, আর চার-পাঁচ দিন পর কাটতে পারতাম। একটা ধানও ঘরে তুলতে পারলাম না। পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব, ঋণ শোধ করব কিভাবে কিছুই বুঝতে পারছি না।
একই এলাকার কৃষক হযরত আলী জানিয়েছেন, উজানের পানি নামলেই হাওরে ঢুকে পড়ে। নদী ভরাট ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে প্রতিবছরই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। কৃষক নজরুল ইসলামের ৯ একরের মধ্যে ৭ একরই ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি কৃষকদের আরেকটি বড় সংকট ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া। নিকলী, করিমগঞ্জ উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। যেখানে উৎপাদন খরচই প্রায় ১ হাজার টাকা। অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে দৈনিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়। ফলে দুই মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি মেটানো যাচ্ছে না।
নিকলীর কৃষক আব্বাস আলী বলেন, এভাবে কৃষি করে লাভ নেই। দুই মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের টাকা দিতে হচ্ছে। তাই ছেলেদের বিদেশে পাঠানোর কথা ভাবছি।
কৃষাণী হালিমা খাতুন বলেছেন, আমরা গরিব মানুষ ঋণ নিয়ে জমি চাষ করে থাকি। এর মধ্যে ধানের ফলন হলেও দাম নাই। সুদে ঋণ নিয়ে এই বছর ধান চাষ করছি। ঋণ দেওয়া এখন কষ্ট হয়ে যাবে। আর কৃষিকাজ করব না। করে লাভ নাই। ধান চাষ করা, শ্রমিকের মজুরি, আমাদের পরিশ্রমসহ যেই টাকা খরচ হয়ছে সেই টাকায় তুলতে পারবো কিনা সন্দেহ আছে।
হাসিনা আক্তারের ভাষ্য, ধান চাষ করে লোকসানে পড়েছি। এখন ঘরের গরু বিক্রি করে মানুষের কাছ থেকে যে ঋণ নিয়ে আসছি সেই ঋণ দিতে হবে। লাভ তো অনেক পরের কথা। ছোট সময় থেকে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত এই পেশাটা ছাড়তেও পারি না। ছাড়লে চলব কি করে। তাই প্রতিবছর লোকশান হলেও ধান চাষ করে থাকি।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যার মধ্যে হাওরাঞ্চলে রয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৩৫ হেক্টর (৬২ শতাংশ)। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টন ধান এবং ৭ লাখ ৯৬ হাজার টন চাল। ইতোমধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেছেন, পলি জমে পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় অষ্টগ্রামের হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। তবে রোববার বিকেলে থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত থেকে থেকে বৃষ্টিসহ ঝড় তুফান হওয়ায় আর বজ্রপাতে ভয় থাকায় কৃষকেরা মাঠে নামছেন না। ধান ৫-৬ দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। তিনি ৮০ শতাংশ পাকা ধান দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন। সরকার প্রতি কেজি ধানের মূল্য নির্ধারণ করেছে ৩৬ টাকা (মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা)। সরকারিভাবে ধান ক্রয় শুরু হলে বাজারে দাম বাড়বে বলে আশা করছি।




